বইকথা : বাস্তবতা ও বিভ্রমের গল্প : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

২০১৯ এর একুশে বইমেলায় বেরিয়েছিল রাজিব মাহমুদের হ্যাঁ অথবা না এর গল্প। ২০২০ এর একুশে বইমেলায় বেরোতে যাচ্ছে গল্পগ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ। একজন নতুন লেখক হিসেবে এই কৃতিত্বটি বিশেষ উদযাপনের দাবি রাখেÑ রাজিব এ রকমটি ভাবতেই পারেন। কিন্তু নিজের লেখালেখির বাইরের (অর্থাৎ কাঠামোগত বা ফর্ম সংক্রান্ত) বিষয়গুলোর-যেমন প্রকাশনা, বিক্রয়, আলোচনা, সমালোচনা- চাইতে ভেতরের (অথবা সাব্সটেন্স) অর্থাৎ লেখার বিষয়-আশয়, বয়ান কৌশল ও ভঙ্গি, চরিত্র, স্থান, কাল, পরিসর এর মতো বিষয়গুলো তার কাছে মুখ্য। তবে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কৃতিত্বে নিশ্চয়ই রাজিব খুশিই হবেন এই ভেবে যে, আর কিছু না হলেও অনেক পাঠক তার গল্পগুলো পড়েছেন, সেগুলো নিয়ে ভেবেছেন এবং কেউ কেউ হয়তো তাদের গল্পগুলো পাঠের অভিজ্ঞতা একে অন্যের সাথে মিলিয়েও দেখেছেন।

এ সত্যটি মূল্যায়নের অপেক্ষা রাখে।

দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোনোর বিষয়টি আমাকে আনন্দ দিয়েছে এ কারণে যে রাজিব যে ধরনের গল্প লেখেন তা-তারই একটি গল্পের ভাষা থেকে ধার করে বলা যায়Ñ পাঠক ‘রসগোল্লা খাবার মতো করে কামড়ে ধরে’ খেতে পারবে না বরং তাকে রীতিমতো ভাবতে হবে, গল্পের চিন্তাগুলোর ভেতরে ঢুকতে হবে, এদের কোনো কোনোটির রূপক বা প্রতীকী বয়ানের মর্মার্থে পৌঁছাতে হবে এবং ভাষাতত্ত্বের কিছু সূত্রের আলোকে সেগুলোর অর্থও অনুধাবন করতে হবে। অর্থাৎ একটা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পর্বে তাদের পৌঁছুতে হবে। পরিশ্রমী পাঠক না হলে এ কাজটি কেউ করতে চাইবেন না। আমরা ধরে নিতে পারি প্রথম সংস্করণের পাঠক পরিশ্রমী ছিলেন। তবে এতে করে রাজিবের কাজটাও যে বেড়ে গেল, তা বলা যেতেই পারে এবং এটি আমার আনন্দের দ্বিতীয় কারণ।

হ্যাঁ অথবা না এর গল্প, এর পাণ্ডুলিপি, পড়ে আমার মনে হয়েছিল যে এই লেখককে পাঠক একবার আবিষ্কার করলে তার কাছে তাদের দাবি বাড়বে। তাকে আরও গল্প লিখতে হবে, যেমন গল্প আমাদের জীবনের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বেদনাকে একটা গভীর তল থেকে অনুসন্ধান করে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে ও সেগুলোর ওপর এমন জায়গা থেকে আলো ফেলে যার নিচে অনেক চেনা ছবিও অচেনা হয়ে যায় অথবা অচেনা ছবির ওপর  চেনা-জানার একটা অধিকার জন্মে যায়। এই অভিজ্ঞতা পাঠকের সচরাচর জোটে না। রাজিব অবশ্য বিষয়টা অনেকটা নিস্পৃহভাবেই দেখেন এবং এ কারণে তিনি বইটির প্রচারে যেন বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়া বা এতে শামিল হওয়ার  কোনো তাড়া অনুভব করেননি। 

এ পর্যন্ত রাজিব সম্পর্কে যা বলা হলো তাতে তার গল্পভুবনের দুটি চিহ্ন আমরা পেরিয়ে এলাম। এর একটি ভাষা  সম্পর্কিত ও অন্যটি চরিত্র-সম্পর্কিত। গল্পগ্রন্থের কয়েকটি গল্পের বেশ ক’টিতে সাধারণভাবে এবং একটিতে (স্বপ্নবড়ি) নির্দিষ্টভাবে তিনি ভাষা ও এর ভেতর-বাহির নিয়ে যে তর্ক এখনও চলছে তার কিছুর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘স্বপ্নবড়ি’ গল্পে তো সুইস ভাষাবিদ ফার্ডিন্যান্ড ডি সস্যুর (১৮৫৭-১৯১৩) স্বশরীরেই আবির্ভূত। সস্যুর বলেছেন যে ভাষা একটি ফর্ম মাত্র, একটি পদ্ধতি, একটি কাঠামো এবং এর কোনো সাব্সটেন্স বা নিজস্ব বিষয় নেই; এমনকি এর তৈরি চিহ্নগুলোও নিতান্ত আপতিক, ধ্রুব নয় কোনোভাবেই ইত্যাদি। তবে এই দাবির সবটা গল্পের বর্ণনাকারী মেনে নিতে পারছেন না, এবং সস্যুরের সঙ্গে রীতিমতো তর্ক জুড়ে দিয়েছেন (যদিও সস্যুরের প্রকৃত পরিচয় গল্পের পুরোটা সময়জুড়েই বর্ণনাকারীর কাছে অজানা রয়ে যায়)। আর এই তর্কটি ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্য ও অন্যান্য বয়ানের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য তা নিয়ে নানা চিন্তা-ভাবনা শুধু এই গল্পটিতে নয়, চলতে থাকে অন্যান্য গল্পেও। আর এ তর্কেরই একটি প্রকাশ ঘটে ভিন্ন, কিন্তু সম্পর্কিত, অনেক দ্বিতত্ত্বতা, বা বাইনারিকেÑ যেমন প্রকৃত- অপ্রকৃত, সত্য-অসত্য, বাস্তব-বিভ্রম- ভেঙে এদেরকে বিজোড় করে দেখার ভেতর।  

‘স্বপ্নবড়ি’র বর্ণনাকারী যেমন স্বীকার করতে রাজি নন যে ভাষার কোনো সাব্সটেন্স নেই, তেমনি রাজিবও মনে করেন যে গল্পের কাঠামো ও বিষয়ের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে, এবং কোনো কোনো গল্পের কাঠামো তাদের বিষয় নির্দিষ্ট করে দিতে পারে, যদিও সচরাচর উল্টোটা ঘটে অর্থাৎ বিষয়ই কাঠামো তৈরি করে দেয়। কাঠামো চিন্তাটি আধুনিকতার সক্রিয় চিন্তারই একটি ছিল, কিন্তু কাঠামো গুরুত্ব পেলে গল্পের প্রাণটা একটুখানি হাঁসফাঁস করে। তবে রাজিবের গল্পে এমনটা ঘটে না কেননা ছবিগুলোকে তিনি দূরবিনের দু’দিক থেকেই দেখেন। আর সে কারণে তার ‘স্বপ্নবড়ি’র কাঠামো স্থিতিস্থাপক, কোথাও এলিয়ে পড়ে না। আবার ‘গিভিং বার্থ’ গল্পে যেহেতু নারীতত্ত্বচিন্তার একটি প্রকাশকে বাস্তব ও বিভ্রমের আলোতে দেখা হয় তাই এর কাঠামো বেশ ঋজু। সেটা না না হলে এতে বর্ণনা-ব্যাখ্যার অংশটি দীর্ঘ হতো কিন্তু তা হয়নি।  

দ্বিতীয় চিহ্নটি রাজিবের চরিত্র-ভাবনা সম্পর্কিত। তার গল্পের চরিত্ররা প্রায়ই নিঃসঙ্গ। ‘স্বপ্নবড়ি’ গল্পের বড়িওয়ালা অথবা বর্ণনাকারী ও ‘সত্যাসত্য’র সত্য সন্ধানকারী প্রধান চরিত্রটি, ‘লাল ঘাম কিংবা ডিওভান’ এর ছেলেটি,  শ্রেণিশত্রু’র ভুল রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে দেশ-পালানো যুবকটি, অথবা ‘গল্পঘর’ এর লিয়াকত মান্নান-এদের সবাই নিঃসঙ্গ মানুষ; সঙ্গী যে তাদের একেবারেই নেই তা নয় কিন্তু চিন্তা-ভাবনায় তারা একেকজন একেকটি পৃথিবীর একাকী বাসিন্দা। রাজিব এই একা মানুষদের পছন্দ করেন কারণ তারা আমাদের সময়ের একটি বড় হেত্বাভাসকে তুলে ধরেন :

কোটি জনসংখ্যার শহরে মানুষ মূলত একা-ই।  

ওপরের চরিত্রগুলোর একাকিত্বের মূলে রয়েছে জীবন ও বাস্তব নিয়ে তাদের বিভ্রম, তাদের একান্ত ধ্যানের (সৃজনের, স্বপ্নের, নিজস্বতার) নিমগ্নতাও। ‘স্বপ্নবড়ি’র বড়িওয়ালা বাস্তব পৃথিবীর কেউ না, ‘গল্পঘর’র লিয়াকত মান্নান গল্প করে তার সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে, ‘শ্রেণিশত্রু’র দেশ-পালানো যুবকটি বিবাহিতা ও দুই সন্তানের মা একাকী এক নারীর সাথে বন্ধুত্ব করে কিন্তু নারীটি তার কল্পনাকে স্পর্শ করতে পারে না। আমার ধারণা রাজিব মাহমুদ নিজেও তার সৃজন-পৃথিবীতে ভ্রমণের সময় বাস্তবকে ভুলে যান; বই যে বিক্রির জিনিস সেটিও তার খেয়াল থাকে না। আমি নিশ্চিত তিনিও তার চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলেন। দু’টি কারণে আমার এমন ধারণা : প্রথমত, চরিত্রদের অন্তর-বাহির তিনি জানেন বলে তাদের ভেতরের না-বলা কথাগুলো তিনি শোনেন আর তাই তারা এমন জীবন্ত হয়ে ওঠে তার গল্পগুলোতে। দ্বিতীয়ত, ‘গল্পঘর’ সহ অন্তত তিনটি গল্পের প্রধান চরিত্র একজন গল্পকার অথবা কবি, অর্থাৎ রাজিব নিজে। আর তাই গল্পগুলোকে শুধু গল্প নয়, আত্ম-বয়ানও বলা যায়, নয় কি? 

প্রথম সংস্করণের ভেতর-মলাটে রাজিব মাহমুদ সম্পর্কে আমি কিছু কথা বলেছিলাম, কিছু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম। আমি এর কোনোটিরই পুনরাবৃত্তি করছি না। এখানেও আমার রয়েছে দু’টি কারণ Ñপ্রথমটি হলো এই  যে, রাজিবের গল্পগ্রন্থটিতে লেখক হিসেবে তার সক্ষমতা ও সাফল্যের অনেক সাক্ষ্যও যে রয়েছে সেদিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। প্রথম সংস্করণে যা বলেছি, তার বাইরেও অনেক কথা বলার থেকে যায়। পাঠকরাও তার গল্প পড়ে বুঝবেন তার বিষয়বস্তু, গল্প বলার কৌশল এবং তার গল্পদর্শনের বহুমাত্রিকতা। রাজিবের চিন্তাবিশ্বে সমকালীন সমাজ-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের নানা চিন্তার ছায়াপাত ঘটে। দ্বিতীয়টি এই, আমি চাই রাজিবের গল্প নিয়ে পাঠকরাও লিখুন। তার সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হোন। এখন তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ কাজটি সহজেই করা সম্ভব। গল্প নিয়ে লেখালেখি যত বাড়বে, গল্পের শক্তিও তত বাড়বে। এই ‘চমকের সমাজে’ শুধু ছবি কেন থাকবে, ভাষা কেন তার সাব্সটেন্স হারিয়ে ফেলবে? গল্প নিয়ে যত কথা হবে, চমকের পেছনের কার্যকারণ এবং এর সূত্রগুলোকে আমরা তত বুঝতে পারব কেননা গল্পের চমক তার বহিরঙ্গে নয়, তার গভীরেই দৃশ্যমান। এজন্যই কি-না, রাজিব তার গল্পে পাঠককে বাইরে থেকে ভেতরে টানেন, উপরিতল থেকে আহ্বান করেন গভীরে প্রবেশের। 

হ্যাঁ অথবা না এর গল্প এর দর্শনজগৎটা আছে গল্পগুলোর  ভেতর-কাঠামোয়।

শেষ, আর একটি কথা। রাজিব তার গল্পে গল্প ও কবিতাকে মেলান। এর প্রমাণ তার চিত্রকল্প-নির্ভর অনেক বাক্য: ‘চায়ের লিকার গাঢ় হওয়ার মতো আস্তে আস্তে গাঢ় হচ্ছে বাইরের অন্ধকার’, ‘কচি ডাবের টাটকা পানির মতো ঘাম-ল্যাপ্টানো সাদা শার্ট গায়ে’, ‘মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অপরাধী কিশোরদের সারির মতো ঝুঁকে থাকা সোডিয়াম বাতির সারিগুলো’ ইত্যাদি। হ্যাঁ অথবা না এর গল্প অনেক চমক উপহার দেয়, কিন্তু তা করে চিন্তার গভীর থেকে। 

আমি নিশ্চিত, রাজিব তার পরের গল্পগুলোতে চমকের এই চলমানতা বজায় রাখবেন। 

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares