বইকথা : অমরাবতী : অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ : বাশিরুল আমিন

কিছু স্বপ্নকাতর মানুষ হঠাৎ-ই ভয়াল এক সময়ের মুখোমুখি হয়, নিজেদের আবিষ্কার করে এমন এক নরককুণ্ডে যেখানে জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। যেখানে প্রেমিকা ভুলে যেতে চায় তার প্রেমিকের মুখ, পিতার আবির্ভাব ঘটে সন্তানের হন্তারক হিসেবে আর জীবন থেকে পালিয়ে জীবন খুঁজতে অজানায় পাড়ি জমায় অজস্র নারী-পুরুষ। তবু মানুষ থামে না, থমকে যায় না। তারা স্বপ্ন দেখে এক স্বর্গের যা হবে নিরাপদ এক শান্তি উপত্যকা এবং তার নাম হবে- অমরাবতী। সেই অমরাবতীর কাহিনি-ই লিখেছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক রাসেল রায়হান।

অমরাবতী নামটা বাদলের দেওয়া। কথায় কথায় বাদল একদিন কান্তাকে জানায় যে তার গ্রামের নাম বৃষ্টিপুর। অদ্ভুত সুন্দর এক গ্রাম। কিন্তু বৃষ্টিপুর নামটা তার একদমই পছন্দ না। সে গ্রামের নাম বদলে অমরাবতী রাখতে চায়। যা হবে শান্তি ও স্নিগ্ধতায় ঘেরা ভূ-স্বর্গ।

 বৃষ্টিপুর বা অমরাবতীর সেই বাদল উদীয়মান ক্রিকেটার, ঢাকায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সেই সাথে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলার স্বপ্ন দেখে। বাদলের রুমমেট নিখিলই তাকে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যায় এবং তাকে পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে প্রস্তুত করে। কোচ মিনহাজ ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে নিখিল আর বাদল কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার সংগ্রাম চালিয়ে যায়, লক্ষ্য তাদের একটাই- জাতীয় দলে চান্স পাওয়া। তবে শঙ্কা-দ্বিধা আর ভয় তাদের পিছু ছাড়ে না; বিবিধ বাধা ডিঙিয়ে তারা কি পারবে তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে?

বাদলের ভয়Ñ তারা পূর্ব পাকিস্তানি হওয়ার কারণে সহজে তাদেরকে স্থান দিতে চাইবে না পশ্চিম পাকিস্তানিরা। খুবই বজ্জাত ওরা। তারা পূর্ব পাকিস্তানের লোকজনকে হীনচোখে দেখে, তাদেরকে কোথাও স্থান দিতে চায় না। তাছাড়া নিখিল ধর্মে হিন্দু, সাম্প্রয়িক পাকিস্তান তাকে কি সুযোগ দেবে? পরক্ষণে বাদল আবার স্বপ্ন দেখেÑ যদি তারা নিখিলকে নেয় তবে দারুণ হবে। ইতিহাস সৃষ্টি হবে। তার বন্ধু নিখিল হবে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম হিন্দু ক্রিকেটার। এভাবেই স্বপ্ন আর সম্ভাবনায় চলতে থাকে অমরাবতীর গল্প।

লেখক পাকিস্তানের তীব্র-প্রকট সাম্প্রদায়িকতা আর বৈষম্যকে চিত্রায়িত করেছেন সুনিপুণ কায়দায়। যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের একজন বাঙালি মুসলিম তরুণ তার স্বপ্নকে একজন হিন্দু তরুণের স্বপ্নের সাথে একাকার করে ফেলে, তারা কোনো ধর্ম দেখে না। সাম্প্রদায়িকতার সামান্যতম কোনো গন্ধ তাদের মধ্যে নেই।  নেই কোনো ফারাক।

বাদল স্বপ্ন দেখে নিখিলের হয়ে, নিখিলকে পর ভাবতে পারে না। নিখিলও আত্মীয়ভাবে বাদলকে। অসুস্থ বাদলের মাকে রক্ত দান করে নিখিল। এটাই বাংলার প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক রূপ। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের রূপটা একেবারেই আলাদা তারা ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক। তারা হিন্দুদের চায় না,  চায় না বাঙালিদের।

মনে-মননে ক্রিকেটার বাদলের প্রেমে পড়ে কান্তা। সুশ্রী-শিক্ষিত-ধনবান কান্তা, ক্রিকেট বুঝে না। সে বুঝে বাদলকে আর বাদল বুঝে ক্রিকেটকে। তবু এসব বোঝা না বোঝার মধ্যে পরস্পর আপন থেকে আপনতর হতে থাকে। তারা হাঁটতে থাকে- ভবিষ্যতের দিকে, অমরাবতীর দিকে। এমন-ই সময় : ১৯৭১ সালের মার্চ। বাদল যখন কান্তার সাথে তার বোনের শশুরবাড়ি যায়- শুরু হয় যুদ্ধ। বাদল কান্তাকে রেখে নেমে পড়ে যুদ্ধে, কথা হয় যুদ্ধ শেষে কান্তার কাছে ফিরবে বাদল, কান্তাও সেই অপেক্ষায় থাকবে। বাদল যোগ দেয় গেরিলা দলে।

বাদলের গল্পের সমান্তরালে চলে আরও বহু বাদলের গল্প যারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য দ্বিধাহীন চিত্তে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনই এক যোদ্ধা ফরহাদ, বৃষ্টিপুরে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া ফরহাদ। যার হৃদয়ে বসবাস করে রুকাইয়া। রুকাইয়াও অপেক্ষায় থাকে ফরহাদের।

বীভৎস সময়ের গল্প এগিয়ে যেতে থাকে। ধর্ম আর দেশ রক্ষার নামে জালিম পাকবাহিনী উন্মত্ত খুনের নেশায় দিগি¦দিক ছুটে যাচ্ছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে লোভী আর হীন কিছু বাঙালি রাজাকার। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম কিছু লোক। ইসলামের নামে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায় নির্বিচারে। অমুসলিম বাঙালিদের ওপরে চড়াও হয় বেশি। ধর্ষণ আর লুণ্ঠনে মেতে ওঠে তারা। হায়েনার লোলুপতা উস্কে ওঠে কিছু মানুষের মনে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের পিতা হয়ে যান রাজাকার বাহিনীর দলনেতা।

অপরদিকে হিন্দু হরিপদ তার পালিত মুসলিম সন্তান জামিলের কাছে সব সঁপে বেরিয়ে যায় অনিশ্চিত পথে, স্ত্রীর খোঁজে। আর মুসলিম কান্তা হিন্দু যুবতী তপতীকে নিয়ে ছুটে চলে নিরাপদ আশ্রয়ের খুঁজে। দুর্গম-দুর্বিষহ এক যাত্রা। যে যাত্রায় সন্তানকে বোঝা ভেবে পথে ফেলে দিতে হয় নিস্পৃহতায়।

একদিকে মাঠে যুদ্ধ করে প্রেমিক বাদল-ফরহাদরা অপরদিকে শরণার্থী শিবিরে আহতদের সেবা শুশ্রƒষায় নিজেকে বিলিয়ে দেয় প্রেমিকা কান্তা-রুকাইয়ারা।

আলাদা আলাদা গল্পের আলোকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার একটা সুযোগ তৈরি হয় রাসেল রায়হানের অমরাবতী উপন্যাসে। ইতিহাস ও নিজস্ব দায়বদ্ধতার তাড়না থেকে লেখা মুক্তিযুদ্ধের এ উপন্যাসটি খুব-ই সূক্ষ্মভাবে একটি জনযুদ্ধের গল্প বলে। যেখানে নির্মোহভাবে উঠে আসে- জনযুদ্ধের অন্তর্গত রূপ, দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষদের ঘুরে দাঁড়ানো, গ্রাম থেকে শহর, নারী থেকে পুরুষ সবার আত্মত্যাগের এক সম্মিলিত চিত্র। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষরা কীভাবে স্ব-স্ব স্থান থেকে একটি মুক্তি সংগ্রামে একাত্ম হয়েছিল- এর একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বয়ান মেলে এই আখ্যানে।

মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ওবায়েদ তার বন্ধু ফরিদ, আমজাদ ও আরও অনেকে সরাসরি মাঠে নেমে যুদ্ধ করার সুযোগ পায় না। কিন্তু তারা দমে যায় না। প্রতিশোধ আর প্রতিরক্ষায় ঘুরে দাঁড়ায়। আপাত নিরীহ মানুষগুলো একটা সময় হয়ে ওঠে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। নীরবে নেমে পড়ে ভয়ংকর এক অপারেশনে। তাদের কর্মস্থল চট্টগ্রাম সিএমএইচ-এ তারা রচনা করে দুর্বিনীত যুদ্ধ। আহত হয়ে মেডিকেলে আসা পাক সৈনিকদের হত্যা করতে থাকে একের পর এক।

এক সন্তানকে বাঁচাতে অন্য সন্তানকে মৃত্যুর মুখে রেখে পালিয়ে যান মা। রাজাকার বাবার হাতে ধরা পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান। স্বামীকে মারতে প্রস্তুত হন স্ত্রী। উল্টো দিকে পাক অফিসার নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে যেতে চান নিজ ঘরে এবং তার মেয়ের কণ্ঠে জয় বাংলা স্লোগান শোনার  অপেক্ষায় থাকেন।  সে এক প্রকট-খল সময়। সব কিছু ভেঙে পড়ে। সব কিছু বদলে যায়।

এসব খণ্ড খণ্ড আখ্যান এক হয়ে তৈরি হয় মৃত্যুর মহাকাব্য।

জাদুকরি গদ্য আর সাবলীল উপস্থাপনায় ভয়াল সময়ের অপূর্ব আখ্যান অমরাবতী। উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র যেন একেকটা ইতিহাস রচনা করে চলে। একেকটা গল্প একেক রকমের, যেখানে প্রতিটি মানুষ আলাদা, তাদের গল্পগুলোও আলাদা, তবু তারা এক। সবকিছু দিয়ে হলেও তারা একটা স্বাধীন ভূ-খণ্ড চায়। মুক্ত একটা আকাশ চায়। অমরাবতী একটা স্থান চায়।

মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাসটিতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের গল্পে অনুসন্ধিৎসু লেখক আবিষ্কার করেন সামগ্রিক এক মুক্তি চেতনাকে। বৈষম্য-সাম্প্রদায়িকতা, প্রেম-সাম্য আর দ্রোহকে নিবিষ্টভাবে দেখেছেন তিনি এবং  প্রবল প্রকাশটাকে আমাদের সামনে চিত্রিত করেছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক রূপটাকে লেখক তীব্র-তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবলোকন করার এক অনন্য প্রয়াস চালিয়েছেন, যা আমাদের বাংলা কথাসাহিত্যের পরিধিকে আরেকটু বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধি দান করবে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares