লিটল ম্যাগ : মুক্তিযুদ্ধে রেডিও : ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল : সুমনকুমার দাশ

মুক্তিযুদ্ধে বেতার ছিল অন্যতম অস্ত্র’Ñসম্পাদকীয়তে আবু সাঈদ এ কথা লিখেছেন। সত্যিই তো! জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ থেকে শুরু করে সংবাদ-কথিকা আর দেশাত্মবোধক গান-আবৃত্তি প্রচারÑসবকিছুই মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছে। বেতার যেমন একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রকৃত চিত্র বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছে, তেমনই এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা পালনকারী বেতার নিয়ে খুব যে একটা বইপুস্তক রচিত হয়েছে, তা কিন্তু বলা যায় না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কলা-কুশলী-শিল্পীদের স্মৃতিচারণ আর মুক্তিযুদ্ধে বেতারের ভূমিকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন লেখকের রচিত অল্পবিস্তর প্রবন্ধ-নিবন্ধই যা সার! এ প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ’৭১-এর ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ সংখ্যাটি বিশিষ্টতার দাবি রাখে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে এমন কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি অভিনব ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগও বটে।

‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ সংখ্যাটিতে ২৫টি ছোটো-বড়ো পর্ব রয়েছে। এসব পর্বে মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির লেখা সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থভুক্ত লেখাগুলোকে প্রবন্ধ, সীমানা পেরিয়ে, শব্দসৈনিক, অতিথি শিল্পী, জয় বাংলা রেডিও, সাক্ষাৎকার, ইতিহাসের সাক্ষী, দলিলপত্র, আকাশবাণী, আত্মজীবনী, মুক্তির গান, কথিকা, দিনলিপি, বিজয় ঘোষণা, পরিক্রমা, স্মৃতিতে রেডিও, যোদ্ধার দৃষ্টিতে, গল্প, কবিতা, প্রতিবেদন, বিশ্বজুড়ে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত স্লোগান, শ্রোতা, প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচিতি ও বই আলোচনা শীর্ষক নাম দিয়ে পর্ব-বিন্যাস করা হয়েছে। পর্বভুক্ত লেখাগুলোর মধ্যে যেমন নতুন নতুন লেখা রয়েছে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা পুনর্মুদ্রণও করা হয়েছে।

দুই

‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ শীর্ষক সংখ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ ইতিহাসই বর্ণিত হয়েছে। লেখকেরা মুক্তিযুদ্ধে রেডিও-র ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে মুক্তিযুদ্ধের খুঁটিনাটি ও পারিপাশির্^ক অবস্থারও বয়ান দিয়েছেন। গভীর বিশ্লেষণ আর তথ্য-উপাত্তের সমন্বয়ে লেখকরা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চিত্র আর অভিজ্ঞতার মিশেলে অনন্য এক ইতিহাস রচনা করেছেন। প্রতিটি লেখাই অনন্য, রচনাশৈলীতে স্বাদুও বটে।

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’, ‘আকাশবাণী’, ‘বিবিসি’, ‘ভয়েস অব আমেরিকা’, ‘রেডিও অস্ট্রেলিয়া’, ‘রেডিও জাপান’-সহ বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সংবাদ, বুলেটিন, কথিকা, সংবাদ পর্যালোচনা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন-সম্পর্কিত খবরাখবর নিয়েই লেখকরা তাঁদের রচনা তৈরি করেছেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘রেডিও পাকিস্তান’ কী ধরনের অপপ্রচার চালিয়েছিল, সেসব ঘটনার বয়ানও রয়েছে।

সংখ্যার প্রারম্ভিক সংকলিত লেখাটিই সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এরপর আশফাকুর রহমান খান ‘৭ মার্চ ও বাংলাদেশ বেতার’ শীর্ষক লেখায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদানকৃত ভাষণ প্রচার না-করতে পারার ঘটনাটুকু সবিস্তারে উপস্থাপন করেছেন। এ লেখার পর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কীভাবে বেতারে প্রচারিত হয়েছিল, সে সম্পর্কিত দলিলপত্র মুদ্রিত হয়েছে। এর পরের লেখাটি হচ্ছে শামসুল হুদা চৌধুরীর। তিনি ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ শীর্ষক লেখায় স্বাধীনতা-প্রত্যাশী বেতারকর্মীদের পরিচয় আর প্রচারিত অনুষ্ঠানাদির পরিপূর্ণ বিবরণ এবং শিল্পীসহ সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীদের পরিচিতি উল্লেখ করেছেন। শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদের ‘শোনেন বলি নতুন করে পুরান ঘটনা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক রচনাটি এ সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা। একই রকমভাবে শব্দসৈনিক আ. ম. শারফুজ্জামানের ‘বিমান হামলা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ রচনাটিও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনবদ্য এক দলিল।

‘ইতিহাসের সাক্ষী’ বিভাগে সুবিদ আলী ভূঁইয়ার রচিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ৪৮ ঘণ্টা’ শীর্ষক আত্মজৈবনিক লেখাটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। মুজিবনগর সরকার গঠনের পরদিন ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণটিও সংকলনটিতে ‘দলিলপত্র’ বিভাগে মুদ্রণ করা হয়েছে। এ সংকলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ, মোহাম্মদ মাহবুবুল হক, মুহাম্মদ লুৎফুর হক, প্রিয়জিৎ দেব সরকার ও ইসলাম খান, সঞ্জিত দত্ত, এ কে এম শাহনাওয়াজ, মো. এমরান জাহান, আনোয়ার হোসেন শিকদার, সাজেদুল আলম এবং সাব্বির হোসেন। ‘সীমানা পেরিয়ে’ শীর্ষক বিভাগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘স্থির করলাম, একটা গাড়ির ওপর রেডিও ট্রান্সমিটার বসাতে হবে…’ শীর্ষক আত্মস্মৃতিমূলক রচনা ঠাঁই পেয়েছে। ‘শব্দসৈনিক’ বিভাগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন জহির রায়হান, অজিত রায়, আলী যাকের, নাসরিন আহমেদ, তপন মাহমুদ, আশরাফ উল্লাহ, আখতার হুসেন ও আবদুল্লাহ আল রাফি সরোজ। ‘অতিথি শিল্পী’ বিভাগে নাজমুল হুসাইন স্মৃতিচারণধর্মী লেখা লিখেছেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানী ও ‘আকাশবাণী’তে মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মরত কণ্ঠসৈনিক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি সাক্ষাৎকার মুদ্রিত হয়েছে। এ দুটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন যথাক্রমে রুবানা শারমীন ও সোহরাব হাসান। ‘দলিলপত্র’ বিভাগে আলমগীর কবির ও কল্যাণ মিত্রের রচনা রয়েছে। এ ছাড়া কলকাতার বেতার কেন্দ্র ‘আকাশবাণী’ ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, উপেন তরফদার, পঙ্কজ সাহা, জগন্নাথ বসু, ভবেশ দাস, দ্বীপেশচন্দ্র ভৌমিক, বিবেকানন্দ রায়, মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় ও শঙ্কর দাশগুপ্ত। এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’, জাহিদ সিদ্দিকীর লেখা ও আশরাফুল আলম অনূদিত ‘একটি উর্দু কথিকা’ এবং বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম কথিকা’ শীর্ষক রচনা ‘কথিকা’ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। মনিরউদ্দীন ইউসুফের ‘আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক আত্মজীবনীটি এ সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর একটি। একইভাবে শফিকুল ইসলাম স্বপনের ‘দিনলিপির পাতা থেকে’ শীর্ষক রচনার প্রসঙ্গও বলা যেতে পারে।

‘মুক্তির গান’ অংশে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোর প্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত অসংখ্য গণজাগরণের গানের পঙ্ক্তি, শিল্পী ও সুরকারের নাম উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিভাগটি গ্রন্থনা করেছেন আবু সাঈদ। সৈয়দ শামসুল হকের ‘সে এক দারুণ সময় ছিল আমার জন্যে’ শীর্ষক লেখাটিও এ সংকলনের প্রণিধানযোগ্য একটি রচনা। ‘স্মৃতিতে রেডিও’ শীর্ষক বিভাগে স্মৃতিচারণা করেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সেলিনা হোসেন, শামীম আজাদ, রাশেদা নাসরীন, দেদারুল আলম মুরাদ ও ফারাহ দিবা আহমেদ। ‘যোদ্ধার দৃষ্টিতে’ শীর্ষক বিভাগে লিখেছেন মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদুর রহমান বীরপ্রতীক ও ডা. এম এস এ মনসুর আহমেদ। ‘আকাশ বাণী’তে প্রচারিত প্রণবেশ সেনের লেখা দুটি ‘সংবাদ পরিক্রমা’ এখানে সংকলতি হয়েছে, যার আবেদন ঐতিহাসিকতার বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেগম মুশতারী শফী ও মনি হায়দারের লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্পও সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ সংকলনে কবিতা লিখেছেন শিকদার ইবনে নূর, নাসিম চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মুসা সাদেক, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ও সুব্রত বড়ুয়া। ‘প্রতিবেদন’ অংশে পাঁচটি লেখা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সাজেদুল আলমের ‘সিরাজগঞ্জের জয়বাংলা বেতার কেন্দ্র’, ফারুখ আহমেদের ‘তিন ব্যান্ড ফিলিপস রেডিওর বিবিসি বাজার’, আশফাকুজ্জামানের ‘একজন মোফাজ্জলের রেডিও অতঃপর…’, সংগীতা আচার্য্যরে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের অর্থ সংগ্রহ’ ও আবু সাঈদের ‘পাঁচির চায়ের দোকানে শোন একটি মুজিবরের থেকে গানটি যেভাবে জন্ম’। এ ছাড়া ‘বিশ^জুড়ে’, ‘বইয়ের পাতায় রেডিও’, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত স্লোগান’, ‘শ্রোতা’ ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচিতি’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অধ্যায় সংকলনটিতে রয়েছে। ‘বই আলোচনা’ বিভাগে এম আর আখতার মুকুল রচিত চরমপত্র নিয়ে লিখেছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি। বিভিন্ন রচনার ফাঁকে ফাঁকে বেশকিছু দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রও ঠাঁই পেয়েছে।

তিন

স্বপ্ন ’৭১ সম্পাদক আবু সাঈদ ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ সংখ্যা প্রকাশের আগে তাঁর পত্রিকার ‘গণহত্যা ৭১’ ও ‘গণ-অভ্যুত্থান ৫০ বছর’ শীর্ষক দুটি সংকলন প্রকাশ করে প্রচুর সাড়া পেয়েছেন, প্রশংসিতও হয়েছেন। একই ধারাবাহিকতায় চলতি সংখ্যাটিও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। এ রকম অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বহুল পঠিত হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করি।

চলতি সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আবু সাঈদ জানিয়েছেন, আগামী সংখ্যাটি হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষকে উপলক্ষ করে। প্রকাশিতব্য এ সংখ্যাটিও নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ও অনন্য হবে, এমন প্রত্যাশা রইল। আবু সাঈদ ও তাঁর স্বপ্ন ’৭১ এর জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

লেখক : লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares