লিটল ম্যাগ : চিহ্ন ৩৮ : একুশকে নতুন করে চেনা : নাজমুল হাসান পলক

একুশ; বায়ান্নর একুশ কথাটি বাঙালির কাছে কোনো দিন রঙরিক্ত হবে না। তার কারণ শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয় যে- বাঙালির বিদ্রোহী পরিচয়ে একুশ যুক্ত করেছিল এক নতুন পালক; কিংবা, পূর্ব-বাংলার প্রধান শহর ঢাকার ফুটপাতে সেদিন ফুটেছিল কৃষ্ণচূড়ার দিন; ভাষার জন্য রক্তদানের এক আপাত বিরল ঘটনা। এর আর্থ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটিই সবথেকে গুরুত্বের দাবিদার। যে দ্রোহের গড়ন চলছিল চল্লিশের দশকের অন্তিম পাদ হতেই। ভাষা আন্দোলন মানুষকে বাধ্য করেছিল ভাষার প্রতি নতুন করে দৃষ্টি ফেরাতে, ভাষাকে ভালোবাসতে। স্বদেশ এবং বাঙালিত্বের প্রতি আপ্লুত পণ্ডিত আহমদ শরীফের বিখ্যাত এক মন্তব্য রয়েছে- ‘মা জন্ম দেয়, মাটি লালন করে। তাই, দেশের মাটিকে মায়ের মতোই ভালোবাসতে হয়।’ মা ও মাটি যা নিয়ে জড়িয়ে থাকে, স্পন্দমান থাকে; ভাষা তার সবথেকে অনিবার্য অঙ্গ। বাঙালির তুল্য ভাষাভিত্তিক জাতির জন্য ধারণাটি আরও বেশি করে সত্য; ভাষাই বাঙালি জাতির ঐক্যসূত্র। এ কারণে, বাংলা ভাষা নিয়ে, ভাষা আন্দোলন নিয়ে, এর চেতনা নিয়ে চিন্তা, চর্চা অব্যাহত থাকবেÑ এটি ব্যক্ত করাই বাহুল্য। চিহ্নর গত সংখ্যায় ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণার পথিকৃৎ ও চিন্তক বদরুদ্দীন উমরের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা যাকে অভিহিত করেছিলাম চিহ্নর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে। ভাষা আন্দোলনের বিবিধ পরিচিত ইতিহাস, কিংবদন্তি তিনি সাক্ষাৎকারটিতে স্বভাবসুলভ বক্তব্যে বাতিল করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য মননশীল মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে দিতে, উস্কে দিতে যথেষ্ট ক্রিয়াশীল বলেই মনে হয়েছে আমাদের। খানিকটা সেই পথ বেয়েই হাজির হলো চিহ্ন ৩৮; ‘বায়ান্নর একুশ’ ক্রোড়পত্র-শিরোনাম নিয়ে। এর সমান্তরালে নিয়মিত বিভাগসহ এবারের আয়োজনে আরেকটি ক্রোড়পত্র রয়েছে বাঙালির সবথেকে চরিত্রবান সন্তান ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে; যিনি এ বছর দুই শতাব্দী পূর্ণ করছেন। আমরা যাকে বলি ভাষিক চেতনা; কথাটিকে সারলীকরণ করলে অর্থ দাঁড়ায় ভাষার প্রতি টান। এটি প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলন উত্তরকালে। এ নিয়ে হুমায়ুন আজাদের এক আবেগমথিত উচ্চারণ রয়েছে- ‘বায়ান্নোর বিশ আর একুশ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শতাব্দীর ব্যবধান : একুশের রক্তাঞ্জলির পর আর কিছুই আগের মতো থাকেনি পাকিস্তানের পূর্বখণ্ডে।’ এটি এই ভূখণ্ডে একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের জন্যও প্রকটভাবে সত্য। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে আশ্রয় করে একালে রচিত হয়েছিল অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং মননশীল প্রবন্ধ, গদ্য। চিহ্নর বর্তমান সংখ্যাটি আরম্ভ হয়েছে ভাষা আন্দোলনের তাৎক্ষণিক চেতনাশ্রিত কিছু পুনর্মুদ্রিত কবিতার মাধ্যমে। আল মাহমুদের পঙ্ক্তিমালায় তারই সহজাত প্রকাশ- ‘তাড়িত দুঃখের মতো চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল/ রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ, উত্তেজিত হাতের টঙ্কারে/ তীরের ফলার মতো/ নিক্ষিপ্ত ভাষার চিৎকার;/ বাঙলা, বাঙলা।’

‘একুশকে নতুন করে চেনা’ শিরোনামটি একারণে নির্ধারণ করেছি যে- বর্তমান বৈশি^ক চেতনা এক যন্ত্রসর্বস্ব, প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তুলেছে; তাদের শরীর ও মানস দুটিই স্থুল, ভাবলেশহীন, শ্রমরিক্ত। ভাষা আন্দোলন নিয়ে, একুশ নিয়ে তাদের রয়েছে স্কুলপাঠ্যের ছোট্ট পরিচ্ছদের জানাশোনা টুকুই। এদেরকে নতুন করে, একুশকে চেনাতে চিহ্নর এবারের সংখ্যাটি বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। এ ধারণাটি স্পর্শ করেই গুরুত্ব দাবি করে ক্রোড়পত্রের প্রথম অংশে পুনর্মুদ্রিত সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধটি। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অধিকারের প্রশ্নে এমন বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ আর রচিত হয়নি বললেই চলে। ‘কল্লোল’ উত্তর লেখকদের প্রিয় সৈয়দ’দা নিজের সহজাত পাণ্ডিত্যে-প্রতিভায় উর্দু ও বাংলা ভাষার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করে এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দেখিয়েছেনÑ কেন বাংলা পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবিদার। এ অংশে আরও রয়েছেÑ আবদুল হক, হুমায়ুন আজাদ, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিনের প্রবন্ধ। ভাষা আন্দোলন নিয়ে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বিচ্ছুরিত হয়েছে তাঁদের প্রবন্ধগুচ্ছে। এর বাইরে মুর্তজা বশীরের ‘একটি বেওয়ারিশ ডায়েরির পাতা’ এবং জহির রায়হানের একুশের গল্প র পুনর্মুদ্রণ; আমাদের ভাষা আন্দোলনকে বিষয় করে রচিত এই গল্প দুটি নতুন করে পাঠের অবকাশ দেয়। এখানে প্রশ্ন উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে- এত পুনর্মুদ্রণ কেন? ব্যক্ত করার বিষয় হলোÑ  কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে সংখ্যাটি আদ্যোপান্ত পাঠ করেন; তবে এ প্রশ্ন তার মস্তিষ্ক থেকে অপসারিত হতে বাধ্য। কারণ, বাস্তবতা হলো- ‘বায়ান্ন একুশ’কে উপস্থাপনের যে প্রকল্প কিংবা পরিকল্পনা; তার পূর্ণতার জন্য এ পুনর্মুদ্রণ অনিবার্য ছিল। আর, এটি বড় সত্য- সৈয়দ মুজতবা আলী, হুমায়ুন আজাদ, হাসান আজিজুল হক যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাষা আন্দোলনকে দেখেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন; তার বিকল্প আমাদের সামনে নেই। কিন্তু, তাঁদের লেখাগুলোর অনিবার্যতা এখনও রয়ে গেছে রচনাকালের তুল্যই। ভাষা আন্দোলন বাঙালির আত্মজাগরণে এক বড় নিয়ামক শক্তি ছিল; যার চেতনা বর্তমান সময়েও বহমান। ‘বায়ান্নর একুশ’ ক্রোড়পত্রের দ্বিতীয় অংশটি এমন বক্তব্য নিয়েই সংযোজিত হয়েছে। এই অংশটিতে ক্রম পেয়েছে- ইমতিয়ার শামীম, উদয় শংকর বিশ^াস, এম আবদুল আলীম, সাদ্দাম হুসাইন, শামীম সাঈদ এবং কুমার দীপের প্রবন্ধ। ইমতিয়ার শামীম তার গদ্যে নতুনভাবে দেখার প্রয়াস চালিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ইতিহাসকে; এক্ষেত্রে উদয় শংকর বিশ^াসের বিষয় ‘ফিলাটেলিক শহীদ মিনার’। ‘ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব : ইতিহাসের কল্পকাহিনী বনাম বাস্তব সত্য’ শিরোনামের দীর্ঘ গদ্যে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করেছেন ভাষা আন্দোলন গবেষক এম আবদুল আলীম। বদরুদ্দীন উমরের তুল্য গবেষক-ঐতিহাসিকরা যে ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন দীর্ঘকাল ধরে; নানা তথ্য, উপাত্তের আলোকে জনাব আলীম সেই ইতিহাসকে খণ্ডন করার প্রচেষ্টা দেখিয়েছেন এখানে। সেই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে নতুনভাবে তুলে ধরার আহ্বান রেখেছেন তিনি। সাদ্দাম হুসাইনের গদ্যে উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলনের এক আপাত ক্ষুদ্র রূপরেখা। শামীম সাঈদ তার গদ্যে ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকটির সমান্তরালে আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিকটিও স্পর্শ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। ‘একুশের চেতনা : ভূতে ও ভবিষ্যতে’ শিরোনামে কুমার দীপ চিন্তার বিষয় করেছেন ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক কবিতাকে।

ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে ‘নবযুগের মানুষ বিদ্যাসাগর’ শিরোনামে বিনয় ঘোষ একদা লিখেছিলেন- ‘আমাদের এই মানুষের সমাজে, দেবতার চেয়ে অনেক বেশি দুর্লভ মানুষ। তপস্যা করে দেবতার দর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু সহজে এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না, যিনি মানুষের মতো মানুষ। মানুষের পক্ষে এ সমাজে দেবতায় রূপান্তরিত হওয়া যত সহজ, মানুষ হওয়া তত সহজ নয়।’ বিনয় ঘোষের দৃষ্টিতে এই ‘মানুষ’ বিদ্যাসাগরকে নিয়ে চিহ্নর একটি বিশেষ আয়োজন; পুরোনো দিনের মানুষের ভাষায় বললেÑ ‘পুণ্যকর্মই বটে’। কারণ- যাই করা হোক, যতটুকুই করা হোক; বিদ্যাসাগরের প্রতি বাঙালির ঋণ অশোধ্য। এই মহাত্মা বাঙালিকে নিয়ে আটটি গদ্য সন্নিবেশিত হয়েছে ‘দ্বিশতবর্ষে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ শিরোনামে; গদ্যগুলো- সনৎকুমার নস্কর, ইমানুল হক, কানাই সেন, শহীদ ইকবাল, তরুণ মুখোপাধ্যায়, কর্ণ মণ্ডল, মুহাম্মদ ফরিদ হাসান এবং আলী আনোয়ারের। গদ্যগুলোতে ব্যক্তি, লেখক ও সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগরকে মূল্যায়নের বহুমাত্রিক প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। চিহ্নর এবারের সংখ্যায় নিয়মিত বিভাগ আরম্ভ হয়েছে দুটি সাক্ষাৎকার দিয়ে; একটি শাহ্যাদ ফিরদাউসের, অপরটি প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর। পরিপাটি গাঁথুনির প্রস্তুতি নিয়ে শাহ্যাদ ফিরদাউসের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অদ্রীশ বিশ^াস; যেখানে লেখক তাঁর রচনাভাবনা এবং সাহিত্যজীবন নিয়ে আলাপ চালিয়ে গেছেন। ব্যাস, আলতামাস্রে মতো উপন্যাস নিয়ে, পুরাণ নিয়ে এখানে তার বিস্তারিত বক্তব্য বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। অপরপ্রান্তে শেখ শহীদুল্লাহর সঙ্গে কথপোকথনে উঠে এসেছে তাঁর কর্মময় জীবন এবং দেশ, তেল, গ্যাস, বন্দর, বিদুৎ, বনভূমি রক্ষায় ভূমিকার প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ নিয়ে এখনও আশাবাদ পোষণ করেন, স্বপ্ন দেখেন এই দীর্ঘজীবী, নিখাদ দেশপ্রেমিক মানুষটি- ‘আমি আশাবাদী একসময় তরুণরা সঠিক পথে আসবে, তারা আন্দোলন করবে, তারা শ্রেণিস্বার্থের বিপরীতে জনগণের স্বার্থে কথা বলবে। আপ্স অ্যান্ড ডাউন তো হয়ই। এখন আপাত দৃষ্টিতে হতাশাব্যঞ্জক হলেও পুনরায় উত্থান হবে।’ ‘কি লিখি, কেন লিখি’ বিভাগে এবারে স্থান পেয়েছেন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বিজ্ঞানের সহজপাঠে রয়েছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান’ প্রবন্ধটি। শিক্ষা ও বিজ্ঞান নিয়ে প্রবন্ধটিতে এই কিংবদন্তি বিজ্ঞান সাধকের যে ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে তা সার্বিক অর্থে চিরায়ত। এমনকি প্রায় আট দশক পূর্বেই তিনি স্বীকার করেছিলেন মার্তৃভাষায় শিক্ষার উপযোগিতা- ‘কিছুদিন আগে আমি এই প্রস্তাব এনেছিলাম যে, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরেই শিক্ষার বাহন হিসেবে মার্তৃভাষার ব্যবহারের সময় এসে গেছে।’ নিয়মিত বিভাগে- গল্প ও কবিতার স্তর অতিক্রম করে অনুবাদ কবিতাগুলো বিশেষ দৃষ্টি দাবি করে। যেখানে মাহবুব অনিন্দ্য হাজির করেছেন সমকালীন জাপানী নারীদের কবিতা; এবং প্রত্যয় হামিদের অনুবাদে উঠে এসেছে মায়া অ্যাঞ্জেলোর কবিতা। ‘প্রবন্ধে’ মর্ত্তুজা খালেদ বিষয় করেছেন উনিশ শতকের বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি; মহীবুল আজিজের ধারাবাহিক রচনা ‘ঘৃণার ব্যাকরণে’র দ্বিতীয় কিস্তিও সন্নিবেশিত হয়েছে বিভাগটিতে। ‘শেষ পাতার আহ্বানে’ এবারের শিরোনাম ছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত পঙ্ক্তি ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’। বিষয়টি নিয়ে ছয় জন তরুণের মুক্তগদ্য এখানে জায়গা পেয়েছে। তবে, ব্যক্ত করার বিষয় হলো- গদ্যগুলোতে বর্তমান সময় নিয়ে তারুণ্য-কল্লোলিত যে ভাবনা আপাত প্রত্যাশিত ছিল, তা দুঃখজনকভাবে অনুপস্থিত। ‘সব কিছু ভেঙে পড়া’র এ যুগে তরুণরা নিজেদের এতটা নির্ভার ভাবছেন কেন? এটি আমাদের সামনে এক বড় প্রশ্ন। গত বছর প্রয়াত হয়েছেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের শক্তিমান ব্যক্তিত্ব রিজিয়া রহমান; চিহ্নর এবারের সংখ্যার আরম্ভে একটি ছোট্ট গদ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি তর্পণ করা হয়েছে তাঁকে। যেখানে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানকে স্মরণ করা হয়েছে গুরুত্ব দিয়ে।

আমরা বাণিজ্যিক সাহিত্যের কাগজ বলতে যা বুঝি; চিহ্ন সেই গোত্রভুক্ত নয়। চিহ্নকর্মীদের নিকটে আজও পত্রিকা প্রকাশ করাটা পেশা নয়; সার্বিকভাবে নেশা। যুগের চলতি হাওয়ায়, গড্ডলস্রোতে নিজেদের না ভাসিয়ে তারা কাগজ করে চলেছেন; আত্মীয় জ্ঞানেই জড়িয়ে রয়েছেন কাগজের সঙ্গে। ফলেÑ কাগজটি নিয়ে এর কর্মীদের রয়েছে নানা আবেগ; পত্রিকাটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে তার আলতো স্পর্শ। আবার, আমরা যখন বলি যেÑ কাগজ বা ম্যাগাজিনই সাহিত্যের সূতিকাগার; তখনÑ লেখক পাঠকদের আবেগও কাগজকর্মীদের আবেগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়। চিহ্নর এবারের সংখ্যাটি পূর্ণপাঠে এই প্রত্যয় হলো যে- পত্রিকাটির প্রতি গত প্রায় এক দশক ধরে আমরা যে আশা লালন করে চলেছি; চিহ্ন তা পূরণ করতে সার্বিকভাবেই সক্ষম। এমন অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস থেকেই বলা চলে- এবারের সংখ্যাটির প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা যথেষ্ট রুচিশীল, আভিজাত্যপূর্ণ; মুদ্রণ প্রমাদও প্রায় দৃষ্টিগোচর হয় না বললেই চলে। এই সু-সম্পাদনা নিঃসন্দেহে বন্দনাযোগ্য। আমরা পূর্বে প্রত্যক্ষ করেছি সু-সম্পাদিত পত্রিকাগুলোই কালের পরিক্রমায় বাংলা সাহিত্যে যুগপ্রবর্তক হয়ে উঠেছে। এর প্রমাণ হিসেবে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয়; কিংবা, বাংলাদেশে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত একবিংশ পত্রিকা নাম করা যেতে পারে। চিহ্নর আগামী এই পথেই অগ্রসর হচ্ছে বলে আমাদের শক্ত বিশ্বাস।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares