উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু : প্রশান্ত মৃধা

‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘স্বদেশকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে আমরা উপলব্ধি করিতে চাই। এমন একটি লোক চাই যিনি আমাদের সমস্ত সমাজের প্রতিমাস্বরূপ হইবেন। তাঁহাকে অবলম্বন করিয়াই আমরা আমাদের বৃহৎ স্বদেশীয় সমাজকে ভক্তি করিব, সেবা করিব। তাঁহার সঙ্গে যোগ রাখিলেই সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষিত হইবে।’ [পৃ. ১৯১] মিল্টন বিশ্বাস তাঁর রচিত উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু বইয়ে এই উদ্ধৃতিটি যথার্থই ব্যবহার করেছেন শেষ দিকে ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু প্রতিফলনের মৌল বৈশিষ্ট্যসমূহ’ অংশে। এরপর তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যের সূত্র ধরে বলতে হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই ব্যক্তি যাঁর মধ্যে আমরা স্বদেশকে উপলব্ধি করেছিলাম। তিনি ছিলেন সমস্ত সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিভূ।’ [পৃ. ১৯১]

মিল্টন বিশ্বাসের এই মন্তব্য দুই দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। এক. ‘তাঁহাকে অবলম্বন করিয়া’ যে উপন্যাস রচিত হবে, সেখানে ‘… সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষিত হইবে’Ñ সেই যোগ রক্ষা করা গবেষণা ও কল্পনা -সাধ্য, ঔপন্যাসিকের সে-পথ ভীষণ বন্ধুর; দুই. যিনি ‘সমস্ত সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিভূ’ তাঁকে একইসঙ্গে ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিক- এই দুই জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত রেখে উপন্যাস-শিল্পের শর্ত রক্ষা দুঃসাহসিক অভিযাত্রার সামিল। অন্তত বিভিন্ন ভাষায় এমন ‘সমস্ত সমাজের প্রতিমাস্বরূপ’ যুগান্তকারী ব্যক্তিকে যখন উপন্যাসে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে ঔপন্যাসিক এই সংকটে পড়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই যুগান্তকারী নব ইতিহাস রচয়িতাকে নিয়ে শেষপর্যন্ত গদ্যকাহিনিই রচিত হয়েছে, উপন্যাস হিসেবে তা প্রায়শ সফল হয়নি। কারণ, উপন্যাস আখ্যান বা উপাখ্যান নয়, নয় শুধু কাহিনি; আবার ইতিহাসও নয়; বরং, বলা হয়ে থাকে, কাহিনি সেখানে গৌণ, আর ইতিহাসের যেখানে শেষ উপন্যাসের সেখান থেকে শুরু।

ধারণা করি, উপন্যাসের বঙ্গবন্ধু বইটির রচয়িতা মিল্টন বিশ্বাস এতগুলো উপন্যাস পাঠ করতে করতে নিজেও ওই সমস্ত উপন্যাসের ভাষ্যকার হিসেবে একই সঙ্গে সংকটটা বুঝে নিয়েছেন।

এই বইটি রচনার জন্যে মিল্টন বিশ্বাসকে ধন্যবাদ জানাই। এই বাক্যটি দিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হতে পারত। কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্রে রেখে যত উপন্যাস রচিত হয়েছে, সবকটিকেই তিনি আলোচনায় রেখেছেন। আমাদের জানা আছে, এই বইয়ে অধ্যাপক বিশ্বাস তা উল্লেখও করেছেন যে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর লোক গান, লোক-ছড়া রচিত হয়েছে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষ আর ষাটের দশকে। ছয় দফা নিয়ে লোকগান মানুষের মুখে মুখে ফিরত। স্বাধীনতার আগে কম হলেও, পরে, এবং ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পর থেকে তাঁকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা রচিত হয়েছে; দেশে ও বিদেশে, বাংলা ও অন্যান্য ভাষায়। তাঁকে নিয়ে ছোটোগল্পও রচিত হয়েছে প্রচুর। আয়তনের কারণে উপন্যাস কম রচিত হবে, তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু এই গ্রন্থের রচয়িতার বিশেষ কৃতিত্ব এখানেই যে কবিতা ও ছোটোগল্প নিয়ে একটি বই রচনার জন্যে যে শ্রম ও অধ্যাবসায় ব্যয় করতে হয়, উপন্যাসের পাঠক হিসেবেই সেটি নিশ্চিত অনেক বেশি।

২.

মিল্টন বিশ্বাস ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রকাশিত উনতিরিশটি উপন্যাসের আলোচনা করেছেন। এই উপন্যাসের কোনওটি এক খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ, কোনওটি দুই বা তিন খণ্ডে। কোনওটির এ পর্যন্ত চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, বাকি খণ্ড প্রকাশিতব্য। লিখেছেন ২১ জন ঔপন্যাসিক। নামের বর্ণানুক্রমে : আউয়াল চৌধুরী, আনিসুল হক, আবদুল মান্নান সরকার, আহমদ ছফা, এ্যালভীন দীলিপ বাগচী, ড. এ এইচ খান, মহিবুল আলম, মাসরুর আরেফিন, মাসুদ আহমেদ, মুনতাসীর মামুন, মোস্তফা কামাল, মোস্তফা মীর, মোহিত কামাল, শেখ সাদী, শামস সাইদ, স.ম. শামসুল আলম, সমীর আহমেদ, সেলিনা হোসেন, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদ ও হুমায়ূন মালিক। তন্নিষ্ঠ পাঠক ছাড়া সাধারণের পক্ষে কোনওভাবেই একসঙ্গে এতগুলো উপন্যাসের হদিস জানা সম্ভব নয়।

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু বইটিকে রচিয়তা প্রধানত তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়টি চারটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। অধ্যায় ও পরিচ্ছেদ বিভাজক শিরোনাম ও উপশিরোনামগুলোর এইভাবেÑ প্রথম অধ্যায় : উপন্যাসে ইতিহাস ও রাজনীতির মেলবন্ধন; দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ : কাহিনিবৃত্তে বঙ্গবন্ধু, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : বঙ্গবন্ধু চরিত্রের রূপায়ণ, তৃতীয় পরিচ্ছেদ : উপ-কাহিনিতে বঙ্গবন্ধু, চতুর্থ পরিচ্ছেদ : উপন্যাসের ভাষা ও সংলাপে বঙ্গবন্ধু, তৃতীয় অধ্যায় : উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু প্রতিফলনের মৌল বৈশিষ্ট্যসমূহ। এর বাইরে আছে, একটি আলোচনাগ্রন্থে স্বাভাবিকভাবে যা থাকে, শুরুতে ‘প্রসঙ্গকথা’ ও ‘পরিপ্রেক্ষিত’; শেষে ‘উপসংহার’ ও ‘গ্রন্থপঞ্জি’।

পরিপ্রেক্ষিত অংশে মিল্টন বিশ্বাসের আলোচিত উপন্যাসগুলোর বাইরে মুক্তিযুদ্ধ- ভিত্তিক উপন্যাসসহ অন্যান্য ইতিহাস- ভিত্তিক উপন্যাসে যেভাবে বঙ্গুবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন আলোচিত হয়েছেÑ তা উল্লেখ করেছেন নিজের আলোচনা সূত্রপাত করার জন্যে। এই অংশটুকু বইয়ের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একপ্রকার তুলনামূলক আলোচনা। এই বইয়ের ঔপন্যাসিকদের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করতে চেষ্টার জন্যে সহায়ক। এখানে ঔপন্যাসিকের কল্পনার যথার্থতা প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য : ‘‘কল্পনা’র এই ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েই উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু গ্রন্থের আলোচিত উপন্যাসগুলোতে ইতিহাসই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। সেখানে ব্যক্তিগত জীবনসমস্যা ইতিহাসের অনুবর্তনমাত্র।’ [পৃ. ২৭]

এখানে তাঁর আলোচনার শুরুতে গবেষণার সিদ্ধান্তটিও জানিয়ে দেন : ‘মূলত উপরি-উক্ত বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, উপন্যাসের কাহিনিতে কেউ কেউ স্মৃতির জানালা খুলে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন, কেউ বা নিরাসক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেছেন, কেউ আবার গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও ব্যক্তিমানুষের আকাক্সক্ষা সবকিছুই একত্রিত হয়েছে আখ্যানে। উপরন্তু কারো কারো লেখায় নির্মোহ পর্যালোচনা রয়েছে; করেছেন ইতিহাসের পুনর্পাঠ।’ [পৃ. ২৭]

গবেষকও তাঁর পর্যালোচনায় সেই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত পাঠ করতে চেষ্টা করেছেন যথেষ্ট নির্মোহভাবে।

৩.

মিল্টন বিশ্বাস আলোচিত উপন্যাসগুলোর প্রতিটির সময় ও সমকালীন রাজনীতির ঘটনাক্রমের সঙ্গে তুলনা করেছেন প্রথম অধ্যায়ে : ‘উপন্যাসে ইতিহাস ও রাজনীতির মেলবন্ধন’ শিরোনামে। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর জীবনের যে সময় এইসব উপন্যাসে ঔপন্যাসিকরা ব্যবহার করেছেন রচনায় তার অনুপুঙ্খ বিবরণ। দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ : ‘কাহিনিবৃত্তে বঙ্গবন্ধু’ এই বইয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়। এখানে আলোচিত হয়েছে ঔপন্যাসিকরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁদের উপন্যাসে কীভাবে স্থাপন করেছেন। এরপর পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ‘বঙ্গবন্ধু চরিত্রের রূপায়ণ’ ও ‘উপ-কাহিনিতে বঙ্গবন্ধু’। উপশিরোনামেই বোঝা যায় আলোচকের গন্তব্য। তবে, ‘বঙ্গবন্ধু চরিত্রের রূপায়ণ’ অংশে তিনি একটি তীব্র মন্তব্য করেছেন : ‘বাস্তবতার সূত্রে উপন্যাসের সঙ্গে ইতিহাস, জীবনী, ভ্রমণকথা এমনকি সংবাদেরও বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তফাৎ এতটুকুইÑ এসব শিল্প নয়। এখানে কল্পনা নেই, অলংকার, রূপ, রস, হিউমার নেই। অন্যদিকে উপন্যাসে কল্পনার মিশ্রণ আছে। হিউমার আছে, অলংকার আছে, রূপ আছে, রস আছে। শুধু কল্পনায় রচিত উপন্যাস বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ নাও হতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ এখানে সত্য আছে। তাই এই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারেন না ঔপন্যাসিকরা। উপন্যাস রচনার আগে অনুসন্ধান করতে হয় ইতিহাসের পেছনের গল্প বা ইতিহাসের অন্তর। ইতিহাসের সেই সত্য আবিষ্কার করেই নির্মাণ করতে হয় উপন্যাসের শরীর। ইতিহাসের বিকৃত বা অসত্য ঘটনা দিয়ে উপন্যাসের শরীর নির্মাণ করা যায় না। সেটা শরীর হয় না। সেটা হয় ইতিহাসের কঙ্কাল। যা কখনো প্রাণবন্ত হয় না। সে উপন্যাস সমাদৃতও হয় না।’ [পৃ. ১৪৬]- এই মন্তব্যে আলোচিত উপন্যাস- গুলোতে তাঁর সমালোচক দৃষ্টি প্রতিফলিত।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ : ‘উপন্যাসের ভাষা ও সংলাপে বঙ্গবন্ধু’Ñ এই অংশে আলোচক প্রতিটি উপন্যাসে ঔপন্যাসিক কাহিনি নির্মাণের জন্যে ভাষা এমনকি উপভাষা আর সংলাপের ক্ষেত্রে যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে, তা আলোচনা করেছেন। তবে তার দৃষ্টি এড়ায়নি রাজনৈতিক ঘটনাক্রম কীভাবে ঔপন্যাসিক কলমকেও ব্যাহত করে : ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাঁরা নতুন লেখার অবতারণা করেছেন সকলেই সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছেন। কারণ তাঁদের আন্তরিকতা ও শিল্পসচেতনার যৌথায়ন ঘটেছে লেখনিতে। আসলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিজনিত শূন্যতা কথাসাহিত্যিকদের অন্তর্মুখী করে তোলে। এজন্য তাঁকে নিয়ে রচিত উপন্যাসে প্রথম দিকে মনোকথন ও অন্তর্সংলাপের প্রাধান্য দেখা যায়।’ [পৃ. ১৭২]

তৃতীয় অধ্যায় : ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু প্রতিফলনের মৌল বৈশিষ্ট্যসমূহ’ মিল্টন বিশ্বাস তার ইতিপূর্বেকার প্রায় দুশো পৃষ্ঠার আলোচনার কিছুটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ফলে, ঔপন্যাসিকদের সফলতাকে তিনি যেভাবে চিহ্নিত করেছেন, একই সঙ্গে মন্তব্যের ভিতরে লুকানো আছে সামান্য খেদ আর উচ্ছ্বাস উপলব্ধির মিশেল। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুকে চরিত্র হিসেবে রূপয়নের ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকদের যদি কোনও ব্যর্থতা থাকে তা উপন্যাস নামক শিল্পমাধ্যমে আমাদের সৃজন ব্যর্থতা। সফলতার যা আছে, সেভাবেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত উপন্যাসে তা চিত্রিত হয়েছে। এই সত্যের বাইরে যাবার কোনও উপায় নেই।

অধ্যাপক বিশ্বাস লিখেছেন : ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু অঙ্কিত হয়েছেন উদার, দূরদর্শী, রাজনৈতিক সহকর্মীর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, বয়োজ্যেষ্ঠকে সম্মান দেখানো, চারিত্রিক দৃঢ়তা, লড়াই, সংগ্রাম ও সাহসী হিসেবে। পরিবার, সমাজ ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতার অসাধারণ ব্যঞ্জনা রয়েছে, আছে শিশুদের প্রতি গভীর মমত্ববোধে। লেখককে সামাজিক দায় মেনে নিয়ে নিজস্ব অভিরুচিকে প্রকাশ করতে হয় তাঁর সৃষ্টিকর্মে। তাঁকে হতে হয় সচেতন শিল্পী; বহির্জগতের প্রতিটি ঘটনা ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় রাখতে হয়। সাহিত্যে মনুষ্যত্ব রূপায়ণ ও উদ্বোধন একটি প্রধান কাজ। অভিজ্ঞতা ও সহানুভূতির ব্যাপকতা দিয়ে সাহিত্যিক মনুষ্যত্ব প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত উপন্যাসে তারই প্রকাশ লক্ষণীয়।’ [পৃ. ১৯২]

এছাড়া এ অংশে মিল্টন বিশ্বাস তেরোটি মন্তব্য করেছেন। [ক থেকে ড]- এগুলো এই আলোচনার প্রায় নির্যাস। এর থেকে খুবই সংক্ষেপে কয়েকটির চুম্বক অংশ : ‘১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে বেশি সংখ্যক উপন্যাস রচিত হয়েছে।’, ‘মৃত বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে বেশি জাগ্রত সৃষ্টিশীল আখ্যানে। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী পুরুষের গৌরবগাথা এখন বেশি জনপ্রিয়।’, ৭ই মার্চের ভাষণের ‘গুরুত্ব অনুধাবন করে উপন্যাস রচিত হয়েছে।’, ‘জন্মভূমি টুঙ্গিপাড়া ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির কথা এসেছে আখ্যানে।’, ‘হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের বাণী, তীব্র ঘৃণা, হত্যার বিচার দাবি করেছেন সাহিত্যিকরা।’ আর, ‘আঙ্গিকে নতুনত্ব এনেছেন কোনো কোনো কথাকার। নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়েছে বর্ণনায়। উপন্যাসের কাহিনি উপস্থাপনায় প্রথাগত রীতির বাইরেও নানা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। কখনো ইতিহাসের উপকরণের হুবহু বর্ণনা, কখনো আবার আত্মজৈবনিক কৌশল কিংবা নিজের অনুভূতির প্রসারণ ঘটেছে আখ্যান বুননে।’ [পৃ. ১৯৪]

৪.

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু বইটির প্রাক্-মুদ্রণ পাঠক হিসেব এইসঙ্গে আরও দু-একটি কথা পুরো বইটি পড়ার পরে মনে হয়েছে। এমন একটি আলোচনাগ্রন্থে রচয়িতার মন্তব্যের সুযোগ খুব একটা থাকে না। দান্তে বলেছেন, আমি যা দেখেছি তারই লিপিকার,Ñ এর বাইরে যাবার সুযোগ কম। এক্ষেত্রে অধ্যাপক বিশ্বাস যে লেখাগুলো পেয়েছেন, তাই ঐকান্তিক নিষ্ঠায় আলোচনা করেছেন। সর্বত্র নির্লিপ্ত থাকতে পারেননি। তা সম্ভবও হয়তো নয়। এর কারণ, বঙ্গবন্ধুর মতো অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব যখন উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে রক্তমাংসে হাজির সেখানে পাঠক হিসেবে নিজস্ব উচ্ছ্বাস কখনও কখনও ভর করতে পারে। আবার ঔপন্যাসিকের সংকটও তো সেখানেই, তাঁর আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র বঙ্গবন্ধু, সঙ্গে আছেন এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে বদলকারী তাঁর সহযোগী নেতৃবৃন্দ। ফলে, আখ্যান-রচয়িতা হিসেবে তাঁর পক্ষে ব্যক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে সব সময় যথার্থ রূপ দেওয়া সম্ভব হয় না। আমাদের ঔপন্যাসিকেরা অনেকেই সে আবেগের বাইরে নন, অনেক সময় নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির অভাবও চোখে পড়ে। কোনও কোনও উপন্যাসের পাঠক হিসেবেও এই ঝোঁকের বাইরে যাওয়া যে কোনও ব্যক্তির পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। হয়তো এজন্যেই রচয়িতার আপাত উচ্ছ্বাসী মন্তব্য : ‘তবে সব ঔপন্যাসিকের হাতেই বঙ্গবন্ধু কালের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বকালের হয়ে উঠেছেন। নির্মাণকুশলতায় ঐতিহাসিক বিষয় ও চরিত্রসমূহের কাঠামোটিকে লেখকরা উপন্যাসের প্রাণস্পন্দনে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আত্মত্যাগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করা হয়েছে।’ [পৃ. ১৯৭]

মিল্টন বিশ্বাস অন্তর্গত উচ্ছ্বাসের সংকট পেরিয়ে পরিশ্রমী গবেষকের চোখে বিশ শতকের পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ সন্তান ও আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাকে নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলোর আলোচনা করেছেন। তাঁকে আবারও ধন্যবাদ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares