শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী : মনি হায়দার

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের আগ্রাসী সৈন্যদের বিরুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউজইউক’ এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলাদেশের উপর একটি কভার স্টোরি প্রকাশ করেছিল। পত্রিকার কভারে লাল সবুজ পাতাকার সঙ্গে মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অসামান্য তেজোদীপ্ত একটি ছবিও ছেপেছিল। কভার স্টোরির ভেতরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিব সর্ম্পকে লিখতে গিয়ে  এক জায়গায় প্রতিবেদক, দুঃখিত প্রতিবেদকের নামটা ভুলে গেছি, শেখ মুজিবকে আখ্যা দিয়েছিলেন, ‘পোয়েট অব পরিটিক্স’।

সত্যিই শেখ মুজিব ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বাংলার রাজনীতির অনন্য অপ্রতিদ্ধন্ধি কবি হিসেবেই। প্রমাণ, তাঁর লেখা দুটি পুস্তক। ‘অসামাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং সম্প্রতি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘কারাগারের রোজনামচা’। দুটো পুস্তক যারা পাঠ করেছেন, অনিবার্যভাবে অনুভব করেছেন, শেখ মুজিবের অন্তর্লিন অনুভব আর শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে সরল নিটোল গতিময় লেখার উৎকর্ষ! স্মৃতির এমন প্রখরতা আর মননের এমন ঐশ^র্য, বাংলার রাজনীতিতে বিরল। কারাগারে থাকার সময়ে তিনি দেশ ও বিদেশের অনেক পুস্তকও পাঠ করেছেন, যার বিবরণ তিনি রেখে গেছেন দুটি বইয়ের পাতায় পাতায়। প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ চিরকালের। বৃক্ষের নিবিড় পরিচর্যা করেছেন কারাগারে। এভাবেই কালের কপোলে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষর রেখেছেন, রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির। তিনি জানতেন, সংস্কৃতি একটি জাতির প্রধান রক্ষাকবচ। সেই ধারণাকে তিনি আরও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিলেন, একাত্তরের সাত মার্চের ভাষণেও। তিনি ভাষণে বলেছিলেন, জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে, এই দেশ স্বাধীন হবে, এ দেশের মানুষ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। একটি জাতির জাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্য সাংস্কৃতিক মুক্তি খুব জরুরি। শেখ মুজিব, বাংলার রাজনীতির কবি ভালোভাবেই জানতেন। সেই জানার পরিচয় আরও স্পষ্ট, যখন পাঠ করি অসামাপ্ত আত্মজীবন’।

“তাড়াতাড়ি কোর্টে যেতে হবে। প্রস্তুত হয়ে কোর্টে রওয়ানা করলাম, এবার রাস্তায় অনেক ভিড়। বহু গ্রাম থেকেও অনেক সহকর্মী ও সমর্থক আমাকে দেখতে এসেছে। কোর্টে হাজির হলাম, হাকিম সাহেব বেশি দেরি না করে সাক্ষ্য নিতে শুরু করলেন। পরের দিন আবার তারিখ রাখলেন। আমি আমার আইনজীবীকে বললাম অনুমতি নিতে, যাতে আমার মা, আব্বা, ছেলেমেয়েরা আমার সাথে থানায় সাক্ষাৎ করতে পারে। তিনি অনুমতি দিলেন। গোপালগঞ্জের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারি এবং যিনি ফরিদপুর থেকে গিয়েছিলেন, তাঁরা আমাকে বললেন, বাইরের লোক দেখা করলে অসুবিধা হবে। আপনার আব্বা, মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা দেখা করলে কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আমাদের কর্মী ও অন্যান্য বন্ধুদের থানায় যেতে নিষেধ করলাম, কারণ এদের বিপদে ফেলে আমার লাভ কি? কোর্টেই দেখা হয়েছে সকলের সঙ্গে। থানায় ফিরে এলাম এবং দারোগা সাহেবের বাড়িতেই আমার মালপত্র রাখা হলো। আব্বা, মা, রেণু খবর পেয়ে সেখানেই আসলেন। যে সমস্ত পুলিশ গার্ড এসেছে ফরিদপুর থেকে তারাই আমাকে পাহারা দেবে এবং মামলা শেষ হলে নিয়ে যাবে। আব্বা, মা ও ছেলেমেয়েরা কয়েক ঘণ্টা রইল। কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসল না। দূর থেকে চেয়ে থাকে। ও বোধহয় ভাবত, এ লোকটা কে?”

পৃষ্ঠা ১৮৩, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানকে বুঝতে হলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা পাঠ করার দরকার নাই। উপলব্ধির জানালায় দাঁড়িয়ে উপরের লাইন কটি মননের সঙ্গে পাঠ করলে একজন কীর্তিমান সৃজনশীল মানুষের পরিচয় এবং তাঁর সাহসী আত্মপ্রকাশের মানচিত্র সহজেই আবিষ্কার করা যায়। আর যারা জ্ঞানপাপী, আত্মপ্রতারক, তারা পাবে ঢোল। নিজেই বাজাবে নিজেই শুনবে আর ভাববেÑ দুনিয়া জয় করছে!

প্রথম যখন শুনি শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী প্রকাশিত হচ্ছেÑবিশ্বাস করিনি। এ রকম গল্প আগে আরও শুনেছি। বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও তোয়াব খানের কাছে নাকি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীর ডিকটেশন দিয়েছিলেন। সেই জীবনী বেরুচ্ছে। অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা….। এক সময়ে বুঝেছি…ওসব কেবলই গল্প। কিন্তু এবার কোনো গল্প নয়, সত্যিই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের অসামাপ্ত হলেও একটি আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে। হাতে এসেছে। একনাগাড়ে পাঠ করেছি। কথাটা দেখুন, পড়িনি, পাঠ করেছি। আমার ধারণা পড়ার চেয়ে পাঠে অধিকতর মনোযোগ দিতে হয়। সেই মনোযোগে পাঠ করার পর পাঠের সুখে ও আনন্দে আত্মহারা হয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে বেদনায় হয়েছি বিমূঢ়। হায়, ১৯২০ সালে তাঁর জন্মের পর মাত্র ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত জীবনের ঘটনা তিনি বলেছেন। বাকি রয়ে গেছে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ও সুবর্ণ সময়ের গান। যে গানের তিনিই ছিলেন গায়ক, যে ইতিহাসের তিনিই ছিলেন নায়ক, তিনিই ছিলেন ঘটনার স্রষ্টা, তিনিই ছিলেন একমাত্র কণ্ঠস্বর, তিনিই ছিলেন সবারে ছাড়ায়ে একা একজন অদ্বিতীয়। তিনি যদি তাঁর উপলব্ধির সবটুকু নির্যাস ধারণ করে যেতে পারতেন, ইতিহাসের অনেক প্রশ্নবোধক প্রশ্নের সমাধান আমরা পেয়ে যেতাম। যাই হোক কি হইলে কি হইতে পারিত সে প্রসঙ্গ অন্য। যা পেয়েছি সেটা নিয়েই আলোচনা করি।

সমুদ্রের শুরু কোথায়, কেউ কি জানে?

এ প্রশ্নের উত্তর নাই। তেমনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শুরুটা কিভাবে কেমন করে হয়েছিলÑ এক কথায় বলা অসম্ভব। এক আশ্চর্য জননায়কের নাম শেখ মুজিব। সময়কে মুঠোয় পোরা সাহসী এক রাজপুত্রের নাম শেখ মুজিব। দরিদ্র আর বুভুক্ষ মানুষের মুক্তির নাম শেখ মুজিব। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ইতিহাসের ঠিকানা শেখ মুজিব। উনিশ একাত্তরের নাম শেখ মুজিব। উনিশশ’ একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যাবতীয় বিষ একা কণ্ঠে ধারণ করে তিনি হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ একজন, ত্রাতা। ভ্রাতা। সর্বজনগণমনঅধিনায়ক। কারণ, তিনি একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে কয়েক লক্ষ বাঙালির সামনে, শত বছরের, কয়েক হাজার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উচ্চারণ করেছিলেনÑ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই থেকে স্বাধীন বাঙালি। স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার সেই বিষের বাঁশি বাজানোর শ্রেষ্ঠ কারিগর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন আত্মজীবনী, যখন জানতে পারলাম, হোক অসমাপ্ত, তবুও তাঁর লেখা, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বইটি প্রকাশিত হওয়ার প্রথম সুযোগেই কিনলাম এবং রুদ্ধনিশ্বাসে পাঠ করতে থাকলাম। তাঁর লেখা এত বলিষ্ঠ, এতো আন্তরিক, এতো সহজ, এতো ইতিহাস নির্ভর, এতো কৌতূহলে পূর্ণ, এতো বিস্তৃত, এতো ব্যাপক, এতো বর্ণাঢ্য, এতো স্মৃতিময়, এত আমিত্ব বর্জিতÑ নিটোল আর মানুষ, গণমানুষ সংষ্টিÑতুলনা বিরল। পাঠ করছি, পাঠ করছি, ভেতরে প্রবেশ করছি আর মনে হচ্ছে গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমান আমার সামনে পাইপ টানতে টানতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে হাঁটছেন আর বলার মধ্যে দিয়ে এঁকে যাচ্ছেন নিজের জীবনের মানচিত্র।

শেখ মুজিবুর রহমানের বাল্যকালটাই ছিল অসাধারণ। তাঁর বাল্যকাল অসাধারণ হওয়ার প্রধান কারণ তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। পিতা ও পুত্রের বা সন্তানের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তারও একটা নজির বা দৃষ্টান্ত আমরা পেয়ে যাই শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে। তিনি লিখেছেন :

‘রেণু কয়েকদিন আমাকে খুব সেবা করল। যদিও আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়। ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়। জ্বর একটু ভাল হল। কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেই করি না। দিনরাত রিলিফের কাজ করে কূল পাই না। আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, … থাকলে জীবনে পরাজিত হবে না। একথা কোনোদিন ভুলি নাই।

আর একদিনের কথা, গোপালগঞ্জ শহরের কয়েক গণ্যমান্য ব্যক্তি আমার আব্বাকে বলেছিলেন, আপনার ছেলে যা করছে তাতে তার জেল খাটতে হবে। তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে, তাকে এখনই বাধা দেন। আমার আব্বা যে উত্তর করেছিলেন, তা আমি নিজে শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না, যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে, তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না। আমার মনে হয়, পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না।’’ অনেক সময় আমার সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন। আমাকে প্রশ্ন করতেন, কেন পাকিস্তান চাই? আমি আব্বার কথার উত্তর দিতাম।’  [পৃষ্ঠা ২১-২২]

এই সূত্রে আমরা এটাও জেনে যাই পিতা শেখ লুৎফর রহমানই ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দীক্ষাগুরু। যেমন তাঁর জননী সায়েরা খাতুনও প্রসঙ্গক্রমে তাঁকে বলেছিলেন : ‘বাবা, আর যাই কর, শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলিও না’।

আবারও প্রমাণিত হলোÑ শেখ মুজিবুর রহমানের মা ও বাবা ছিলেন প্রচণ্ডভাবে রাজনৈতিক সচেতন। এবং সে কারণেই সেই আধা সামন্ততান্ত্রিককালেও মানুষের জন্য কাজ করার পেয়েছিলেন পিতা ও মাতার অকুণ্ঠ সমর্থন। নিঃসন্দেহে তারা সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। আমরা যারা আধুনিককালের মানুষ বলে নিজেদের দাবি করি, আমরা কি এভাবে  সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করি? করি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ? বরং জীবন থেকে রাজনীতিকে কত দূরে রাখা যায়, তারই ষড়যন্ত্র করি। অবশ্য তারও কারণ আছে।

আপনাদের একটা প্রশ্ন করতে চাই। শুনেছেন কোনো দেশে পিতা ও পুত্রের দুটি ফুটবল দল? দুই দল পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলে? তাও প্রায় একশো বছর আগে? কষ্ট কল্পনায় কষ্ট করতে হবে না, এই ঘটনা ঘটেছিল গোপালগঞ্জে, শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে। পিতা ও পুত্রের মধ্যে। পাঠ করি তাঁর, মানে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা থেকে : ‘খেলাধুলার দিকে আমার খুব ঝোঁক ছিল। আব্বা আমাকে বেশি খেলতে দিতে চাইতেন না। কারণ, আমার হার্টের ব্যারাম হয়েছিল। আমার আব্বাও ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফির্সাস ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুলের টিম খুব ভালো ছিল। মহকুমার যারা ভালো খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।

১৯৪০ সালে আব্বার টিমকে আমার স্কুলের টিম প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করল।… আমরাতো ছাত্র, এগারজনই রোজ খেলতাম। আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত। আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আব্বা বললেন, “কালই সকালেই খেলতে হবে। বাইরের খেলোয়াড়দের আর রাখা যাবে না, অনেক খরচ।” আমি বললাম, “আগামীকাল সকালে আমরা খেলতে পারবো না, আমাদের পরীক্ষা।”

গোপালগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের সেক্রেটারি একবার আমার আব্বার কাছে আর একবার আমার কাছে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে বললেন, ‘‘তোমাদের বাপ ব্যাটার ব্যাপার, আমি বাবা আর হাঁটতে পারি না। ” [পৃষ্ঠা ১৪]

এইভাবে সেই কৈশোর, কিশোরকালেই শেখ মুজিবুর রহমানের জীবননদীতে জীবনের অন্যরকম বাণ ডেকেছিল। তৃষ্ণা আর প্রেরণার সংলাপ তৈরি হচ্ছিল, আর তাতে ঘি ঢেলে দিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বাঙালির সবচেয়ে মার্জিত, রুচিসম্পন্ন, মানবিক নেতা। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে অনেক নেতা ও মনীষী প্রভাব রেখেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বলা হয়Ñ তিনিই শেখ মুজিবের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত মানসিকতার মনন গঠনে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী মানুষ। আজকের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে সেইকালে রাখা ভূমিকা পাঠ করলে অবাক হতে হয়। কোথায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর কোথায় কিশোর বালক শেখ মুজিবÑ সংযোগ সেতু তৈরি হয় ১৯৩৮ সালে। পাঠকদের সঙ্গে সেই সম্পর্কের সুতো খুলে দিই শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা থেকেই : ১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তাঁরা গোপালগঞ্জে আসবেন। বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এগজিবিশন হবে ঠিক হয়েছে। বাংলার দুই নেতা একসাথে গোপালগঞ্জে আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হল। স্কুলের ছাত্র আমরা তখন। আগেই বলেছি আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার উপর।…হক সাহেব ও শহীদ সাহেব এলেন, সভা হল। এগজিবিশন উদ্বোধন করলেন। শান্তিপূর্ণভাবে সবকিছু হয়ে গেল। হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন আর শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে। তাই তাঁকে সংবর্ধনা দিলাম। তিনি স্কুল পরিদর্শন করে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের দিকে চললেন, আমিও সাথে সাথে চললাম। তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন, আমার নাম এবং বাড়ি কোথায়। একজন সরকারি কর্মচারী আমার বংশের কথা বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, “তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?” বললাম,“কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই।” তিনি আর কিছুই বললেন না, শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতায় গেলে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। আমিও তাঁর চিঠির উত্তর দিলাম। এভাবে মাঝে মাঝে চিঠিও দিতাম।  [পৃষ্ঠা ১১]

ভবিষ্যতের নেতা পেয়ে গেলেন বর্তমানের নেতা। ১৯৪১ সালে শেখ মুজিব মেট্রিক পাশ করে চলে গেলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন ইসলামিয়া কলেজে। থাকতে শুরু করলেন বেকার হোস্টেলে। চিরাচরিতভাবে তিনি হয়ে উঠলেন মুসলামান ছাত্রদের অদ্বিতীয় নেতা। যোগ দিলেন মুসলিম লীগে। গোপালগঞ্জে গঠন করলেন মুসলিম লীগ। নেতা সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আরও একজন নেতার সঙ্গে শেখ মুজিবের নিয়মিত যোগাযোগ হতোÑ তিনি আবুল হাশিম। দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। সকল কাজের কাজী শেখ মুজিব তাঁর কর্মীবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্ভিক্ষে দুর্দশাপীড়িত মানুষের সাহায্যে। একটার পর একটা রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছে তখন। ব্রিটিশ তখন টালমাটাল। সারা উপমহাদেশ জলন্ত কড়াইয়ের মতো ফুটছে টগবগ করে। দিল্লিতে মোহম্মাদ আলী জিন্নাহ কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেই আন্দোলনের কাণ্ডারী। সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য তরুণ ও জনপ্রিয়কর্মী শেখ মুজিবও শামিল হলেন পাকিস্তান আন্দোলনে। তার আগে মুসলমান ছাত্রদের সংগঠন নিয়ে বাংলাদেশের আনাচেকানাচে ঘুরেছেন। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠে নিবিড় পরিচয়। প্রত্যেকে তাঁর সাংগঠনিক ও আন্তরিক দক্ষতায় মুগ্ধ। সেইকালে বর্ণনা এতো সাবলীলভাবে লিখেছেন শেখ মুজিব, পাঠের সময়ে মনে হয়, ইতিহাসের প্রামাণ্য সিনেমা পাঠ করছি। ১৯৪৬ সালের ৭, ৮ ও ৯ এপ্রিল দিল্লি¬তে সমস্ত ভারতবর্ষের মুসলীম লীগপন্থি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের কনভেনশন ডেকেছেন জিন্নাহ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে শেখ মুজিব ট্রেন বোঝাই হয়ে গেলেন দিল্লি। কেমন ছিল সেই যাত্রা, বিবরণ পাই শেখ মুজিবের লেখায়। এবং তিনি সে-সময়ে ছাত্রদের কাছে কতটা গ্রহণীয় ও জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তার অভ্রান্ত প্রমাণ মেলে এখানে। শহীদ সাহেব স্পেশাল ট্রেনের বন্দোবস্ত করতে হুকুম দিলেন। বাংলা ও আসামের মুসলিম লীগ এমএলএ ও কর্মীরা এই ট্রেনে দিল্লি যাবেন। ট্রেনের নাম দেওয়া হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল’। হাওড়া থেকে ছাড়বে। আমরাও বাংলাদেশ থেকে দশ পনেরো ছাত্রলীগ কর্মী কনভেনশনে যোগদান করব। এ ব্যাপারে শহীদ সাহেবের অনুমতি পেলাম। সমস্ত ট্রেনটাকে সাজিয়ে ফেলা হল মুসলিম লীগের পতাকা ও ফুল দিয়ে। দুইটা ইন্টারক্লাস বগি আমাদের জন্য ঠিক করে ফেললাম। ছাত্ররা দুষ্টামি করে বগির সামনে লিখে দিল, ‘‘শেখ মুজিবর ও পার্টির জন্য রিজার্ভড’’। এ লেখার উদ্দেশ্য হলো আর কেউ এই ট্রেনে যেন না ওঠে। আর আমার কথা শুনলে শহীদ সাহেব কিছুই বলবেন না, এই ছিল ছাত্রদের ধারণা।’’ [পৃষ্ঠা ৫০]

গেলেন দিল্লি¬। সবাইকে নিয়ে সম্মেলনে যোগ দিলেন তরুণ তুর্কি শেখ মুজিব। সম্মেলন শেষে গেলেন দিল্লি¬র ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দেখতে। দেখলেন আকবরের তৈরি ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা গেট, সেলিম চিশতির দরগা। দেখেছেন দিন ও রাতের তাজমহল। দুই সময়ের তাজমহল দেখে মুগ্ধ শেখ মুজিব আবেগময় বর্ণনা দিয়েছেন। নিজ আগ্রহে দেখেছেন সংগীত সম্রাট তানসেনের বাড়ি। দিল্লি¬ ভ্রমণ শেষে কলকাতায় এসে পড়াশুনা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে ১৬ আগস্ট শুরু হলো জিন্নার ডাইরেক্ট একশান ডে। কলকাতা আর পাঞ্জাবে নেমে এলো কেয়ামত। হিন্দুর হাতে মুসলিম, মুসলিমদের হাতে হিন্দু জবাই হতে লাগলো। চিরকালের মানবিক সারথী শেখ মুজিব দলবল নিয়ে নেমে গেলেন দাঙ্গা প্রতিরোধে, দাঙ্গায় পীড়িত, আহত মানুষের সাহায্যে। নিজের জীবনপণ করে অজস্র মানুষের জীবন রক্ষা করলেন। কেবল কি কলকাতায় তিনি দায়িত্ব পালন করলেন? তিনি বিহারেও গেলেন। বিহার থেকে গেলেন আসানসোলে। উদ্দেশ্যÑ যেখানে দাঙ্গা সেখানেই শেখ মুজিব এবং তাঁর দল। ধর্ম যে মানুষকে কতটা পশুতে পরিণত করে শেখ মুজিবের এই দাঙ্গার বিবরণ পড়ে আবার নতুন করে প্রমাণ পাওয়া গেল। যাই হোক, দাঙ্গা একটু কমলে তিনি ফিরে এলেন কলকাতায়। অসুস্থ। সে সময়ের বিবরণ লিখেছেন তিনি এইভাবে : ‘বেকার হোস্টেলে এসেই আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমার জ্বর মোটেই ছাড়ছিল না। শহীদ সাহেব খবর পেয়ে এত কাজের ভিতরেও আমার মত সামান্য কর্মীর কথা ভোলেন নাই। ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিনের ইউরোপিয়ন ওয়ার্ডে আমার জন্য সিট ঠিক করে খবর পাঠিয়ে দিলেন। পনের দিন হাসপাতালে ছিলাম, তিনি ফোন করে প্রিন্সিপালের কাছ থেকে আমার খোঁজ নিতেন।’ [পৃষ্ঠা. ৭১] অজস্র লেখা বা শব্দের দরকার নাই, এই কয়েকটি লাইনের মধ্যে দিয়ে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক আমাদের কাছে স্পষ্ট। অনেক প্রাণ, অনেক রক্তপাত, অনেক রাজনৈতিক ভণ্ডামি, অনেক আত্মহননের ভেতরে দিয়ে উপমহাদেশ ভেঙ্গে জন্ম নেয় দুটি রাষ্ট্র, একটি ভারত, অন্যটি পাকিস্তান। শুরুতেই পাকিস্তান ছিল একটি অবাস্তব রাষ্ট্র। একটি রাষ্ট্রÑ দুইটি দেশ। দুইটি দেশের মধ্যে দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোনো কিছুরই সঙ্গে মিল নাই। সেই দেশটি টিকে থাকার জন্য যে প্রজ্ঞা, সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক বোধের দরকার ছিল, তার ছিটেফোটাও ছিল না ক্ষমতাকুক্ষিগত করা পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে। আর পাকিস্তান তৈরিতে বাঙালিদের অবদান, আত্মদান তাঁর লেখায় বিশ্বস্ত দলিলের মতো উঠে এসেছে। কিভাবে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছে, কলকাতা আমাদের পাওয়ার কথা থাকলেও কিভাবে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, আসাম করিমগঞ্জ কেন আমরা পাইনি, কেন ও কিভাবে আমাদের দেশকে একটি কুমিরের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে তার আদ্যোপান্ত সেইকালে রাজনৈতিক মাঠের ঘোড়সওয়ার শেখ মুজিব অত্যন্ত নিষ্ঠা আর বাস্তবতার আলোকে লিখেছেন। পাঠ করলেই রক্তাত ও বঞ্চিত ইতিহাস চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আর বেদনায় সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে।

অজস্র স্মৃতি আর রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে শেখ মুজিব এলেন ঢাকায়। যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য এতো লড়াই করলেন, সেই পাকিস্তান এখন গড়তে হবে। কিন্তু তিনি কি দেখলেন? এখানে, সাধারণ মানুষ সেই আগের মতোই উপেক্ষিত, নিপীড়িত আর অধিকার বঞ্চিত।

স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিব প্রতিবাদ করলেন। তার আগে সংগঠিত করলেন ছাত্রলীগ। কলকাতা থেকে আগেই লোক এসে ১৫০ মোগলটুলীতে অফিস করলেন। আর এই অফিসের দায়িত্বে ছিলেন শওকত মিয়া। শওকত মিয়া পাকিস্তানের এই পর্বে শেখ মুজিবের জন্য অনেক করেছেন। অনেক মানুষের নাম আছে গোটা বইতে, আছে ঘটনার পর ঘটনা। সাড়ে তিনশত পৃষ্ঠার বই এতটুকু আলোচনায় কিভাবে ঠেসে দিই? কোনটা রেখে কোনটা বলি বা লিখি? তার চেয়ে ভালো হয় না, অনুসন্ধিৎসু পাঠক যারা, তারা বইটি পাঠ করুন। আর ইতিহাসের খোলা দরজা সত্য ন্যায়নিষ্ঠ উঠোনে দাঁড়ান। খোলা চোখে অনেক মিথ্যা মিথ ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। আবার সেই পুরোনো কথাটাই বলিÑ ইতিহাসের পরিণতি কি জানেন? ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। ইতিহাস বড় নির্মম। নিজের মতো করে ইতিহাস কাজ করে যায়Ñ কেউ পছন্দ করুক আর নাই করুক। শেখ মুজিবও কারো মুখের দিকে তাকান নাই, স্মৃতি ও বাস্তবতার আলোয় তিনি যা দেখেছেন, করেছেন, অকপটে তাই লিখেছেন। এত নির্মোহ, এত অনানুষ্ঠানিক ইতিহাস এতটা পিরামি হয়ে উঠবেÑ প্রায় আশি বছর পর একটি স্বাধীন দেশের মানুষের কাছে, তিনি হয়তো ভাবতেও পারেননি। না ভাবাটাই স্বাভাবিক, কারণ ইতিহাস সব সময়ে নিজের মতো করে নিজের পথে সচল। অন্যের ধার ইতিহাস ধারে না। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের সেই ধার না ধরার ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়।

ছাত্রলীগতো হলো, কিন্তু কাজ করতে দেবে না সরকার। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতায়। পাকিস্তানের শুরুতেই তিনি এলেন না । তাঁর যুক্তিÑ তিনি চলে এলে ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানদের দেখবে কে? শেরে বাংলা, মাওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানে। শেরে বাংলার তখন পড়ন্ত কাল। ছাত্রলীগ নিয়ে তাঁর কথা :

‘ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠান গঠন করার সাথে সাথে বিরাট সাড়া পাওয়া গেল ছাত্রদের মধ্যে। এক মাসের ভিতর আমি সকল জেলায়ই কমিটি করতে সক্ষম হলাম। যদিও নইমউদ্দিন কনভেনর ছিল, কিন্তু সকল কিছু প্রায় আমাকেই করতে হত। একদল সহকর্মী পেয়েছিলাম যারা সত্যিকারের নিঃস্বার্থ কর্মী।’ [পৃষ্ঠা ৮৯]

শুরু হলো পাকিস্তানের ভাষা নিয়ে আন্দোলন। পাকিস্তানের শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ লোকের ভাষা বাংলা। যে ভাষার আছে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। উর্দুর মতো কোনো সেনাছাউনিতে গজিয়ে ওঠা ভাষা নয় বাংলা। আর মাতৃভাষা মানুষের কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়। এই স্বাভাবিক বোধটাও পাকিস্তানীদের ছিল না। তারা সব কিছুর মধ্যে ভারতের হিন্দুদের ভূত দেখতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব লেখেন :

দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। আরব দেশের লোকেরা আরবি বলে। পারস্যের লোকেরা ফার্সি বলে। তুরস্কের লোকেরা তুর্কি ভাষা বলে…চীনের মুসলমানেরা চীনা ভাষায় কথা বলে। এ-প্রসঙ্গে অনেক যুক্তিপূর্ণ কথা বলা চলে। শুধু পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মভীরু মুসলমানদের ইসলামের কথা বলে ধোঁকা দেওয়া যাবে ভেবেছিল, কিন্তু পারে নাই। যে কোনো জাতি তার মাতৃভাষাকে ভালোবাসে।…তারা শেষ ‘তাবিজ’ নিক্ষেপ করলেন। জিন্নাহকে ভুল বোঝালেন। এরা মনে করলেন, জিন্নাহকে দিয়ে উর্দুর পক্ষে বলাতে পারলেই আর কেউ বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহস পাবে না।’  [পৃষ্ঠা ৯৯]

ইতিহাস সাক্ষী, সাক্ষী বাংলার জল আর হাওয়া, আর শফিক, রফিক, বরকত, সালাম জব্বারÑ জিন্নাহকেও বাংলার মানুষ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। আর পেছনে ছিলেন শেখ মুজিব। ভাষার জন্য প্রথম আন্দোলনের পূর্ব পাকিস্তানে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন আইন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা কিছু যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামে। চিরকালের প্রতিবাদী আর ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠ শেখ মুজিব আন্দোলনে যুক্ত হলেন। কিন্তু অনেকের সঙ্গে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। সবাই গোপনে মুচলেকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপোস করলেন, কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম শেখ মুজিব। তিনি মুচলেকা দিতে রাজি হলেন না। কারণ তিনি মনে করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে কোনো অন্যায় করেননি। আর অন্যায় না করলে মুচলেকার প্রশ্নই আসে না।

শেখ মুজিব জেলে থাকা অবস্থায় মওলানা ভাসানী গঠন করলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ। তিনি সভাপতি, টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক আর শেখ মুজিবকে নির্বাচিত করা হলো যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নামলেন দল গঠনে। মাওলানা ভাসানীর পরামর্শে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। দেখা করলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। বললেন মুসলিম লীগ সরকারের জুলুম নির্যাতন আর নিপীড়নের কথা। নানা লোকের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেন পাকিস্তানে। সংবাদপত্রে দিলেন সাক্ষাৎকার। করলেন সংবাদ সম্মেলন। পূর্ব বাংলার মানুষ সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিলেন তিনি। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানেও হয়ে উঠলেন জনপ্রিয়। পশ্চিম পাকিস্তান সফর শেষ করে ভারত হয়ে তিনি মাতৃভূমিতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তিনি জানেন, দেশে প্রবেশ করা মাত্র তাঁকে গ্রেফতার করবে মুসলিম লীগ সরকার। সেই গ্রেফতার এড়িয়ে গ্রামের বাড়িতে অন্নর্পূণা প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তান, আর পিতামাতার কাছে তিনি যেভাবে পৌঁছলেন, সে এক দুর্ধষ স্পাইয়ের গল্প। সেই ঘটনা সরাসরি ‘অসামাপ্ত আত্মজীবনী’ বই থেকে পাঠ না করলে বোঝা যাবে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রটাই একটা দুঃস্বপ্ন। যে রাষ্ট্র আদায়ের জন্য শেখ মুজিব তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন, ভাগ্যর কী নির্মম পরিহাস, সেই রাষ্ট্ররই শাসকেরা আজ তাঁর বিরুদ্ধে নেমেছে লড়াইয়ে।

শেখ মুজিব, তিনি জনগণমননায়ক। আবার তিনি প্রিয়তম স্বামী। তিনি পিতা। আবার তিনি পিতারও সন্তান। সন্তান মাতারও। একই সঙ্গে অনেক মানবিক সর্ম্পকের ভেতর দিয়ে তাঁকে যাত্রা করতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। এবং তিনি সাফল্যের সঙ্গে সেই পথ অতিক্রম করেছেন। হ্যাঁ, কখনও কখনও মুষড়ে পড়েছেন, সহকর্মীদের বিশ্বাসঘাতকতায় ভেঙে পড়েছেন, কিন্তু তিনি বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের বিপদসংকুল সংগ্রামের পথ থেকে এক মুহূর্ত্যরে জন্য পথচুত্য হননি। মন্ত্রিত্ব ছিল তার কাছে একটি ফুটো পয়সার মতো। একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের মন্ত্রিত্ব নিয়ে যে নাটক হয়েছিল তার অসাধারণ বর্ণনা পাই অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায় পাতায়। ইতিহাসের অনেক অন্ধকার পৃষ্ঠা তিনি উন্মোচন করে দিয়েছেন। সব নেতার একটাই চাওয়াÑযে কোনো উপায়ে মন্ত্রিত্ব। মানুষ, মানুষের কল্যাণ, বাঙালির ভবিষ্যৎ চিন্তা তাদের মধ্যে আদৌ ছিল না। তিনি লিখেছেন :

আমি যখন আমার বাড়ি টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনের পরে ফিরে আসি, শহীদ সাহেব আমাকে একাকী ডেকে বললেন, ‘তুমি মন্ত্রিত্ব নেবা কি না?’

আমি বললাম, ‘আমি মন্ত্রিত্ব চাই না। পার্টির অনেক কাজ আছে, বহু প্রার্থী আছে দেখে শুনে তাদের দেন।’ [পৃষ্ঠা ২৫৯]

তখন শেখ মুজিবের বয়স কতো ছিলো? মাত্র চৌত্রিশ বছর। সদ্য তরুণ। এই বয়সে মন্ত্রিত্বের মতো পাওয়ারকে প্রত্যাখান করার মতো সাহস ও নৈতিকতা মুজিব কিভাবে অর্জন করেছিলেন? তাঁর চেয়ে বয়সে বড় সকলেই লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে ইঁদুর আর বিড়ালের মতো মন্ত্রী হওয়ার জন্য দৌড়ে লিপ্ত ছিল। বয়সের কারণে তাঁরতো মন্ত্রিত্বের অসীম পাওয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা ছিল। অথচ তিনি নেতাকে বলছেন : পার্টির কাজ আছে। এই ত্যাগের জন্য, এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য তিনি একটি দেশের স্রষ্টা। তিনি বাঙালি জাতির জনক। তিনি একক জনগণমননায়ক, অধীশ্বর অধিনায়ক। তিনি বার বার বলেছেন আমার মানুষ, আমার দেশ। এই যে একটি জাতিকে আমার করে তোলার অধিকার, সেটা এই দেশে, এই স্বাধীন ভূখণ্ডে শেখ মুজিবেরই একমাত্র অধিকার।

বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মায়ের সঙ্গে কয়েকদিন থেকে আবার এলেন ঢাকায়। যথারীতি গ্রেফতার হলেন। ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনার জেল মিলিয়ে শেখ মুজিবকে ছাব্বিশ মাস জেলে কাটাতে হয়েছে। জেলে দিনরাত কাটানোর যে দুঃসহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, পাঠ করে শিউরে উঠতে হয়। কি অবাক কাণ্ড, যে পাকিস্তানের জন্য কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় লড়াই করেছেন শেখ মুজিব, গোপলগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছেন মুসলীম লীগÑ সেই শেখ মুজিব সেই পাকিস্তান সরকারের বিষাক্ত কারাগারে। তবে তিনি যেখানে, যে কারাগারেই গেছেন মানুষ তাঁকে সম্মান করেছে। মানুষ জেনেছে এই মানুষটি আমাদের। এই মানুষটির ভেতর দিয়ে একদিন বাংলায় নতুন একটি সকাল আসবে, সার্বভৌম সকাল। জেলের অনুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর দিয়ে তাঁর সহনশীলতা, ত্যাগের পরাকাষ্ঠা, বাংলার মানুষের প্রতি আত্মনিবেদনের অঙ্গীকার, জুলুমের বিরুদ্ধে নিঃশব্দেও রুখে দাঁড়ানোর যে ভয়াল শক্তি আছে, অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় পাই তার অসামান্য বিস্তার।

শেখ মুজিবের জেল ও জেল যাত্রার বিবরণ দিই :

‘এদিকে জ্বর থেকে মুক্তি পেলেও হার্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। চোখের অসুখ বেড়েছে। পেটে বেদনা অনুভব করতাম। এইভাবে আরও একমাস কেটে গেল। গোপালগঞ্জে মামলার তারিখে আবার সেই পুরানা পথ দিয়ে যেতে হলো। এবার যেন সিন্ধিয়া ঘাট ডাকবাংলোকে আমার আরও ভালো লাগল। অনেকদিন পরে রাতে ঘরের বাইরে আছি। কত কথাই না মনে পড়ল। ১৯৪৫ সালে এই জায়গাটায় সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে নিয়ে একরাত কাটিয়েছিলাম। আমার বন্ধু ও সহকর্মী মোল্ল¬া জালালউদ্দিন আমার সাথে ছিল। এখান থেকেই পরের দিন নৌকায় তাঁকে গোপালগঞ্জে নিয়ে যায়। ফরিদপুরের জালাল ও হামিদ আমার সঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলনে কাজ করেছে।  [পৃষ্ঠা ১৮৯]

এদিকে পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র আজগরের মতো এগুচ্ছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে। বাঙালিও জেগে উঠছে। প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের। জেলের বদ্ধ কোঠায় থাকতে থাকতে শেখ মুজিবের সহ্যমাত্রা অতিক্রম করছে। তিনি অসুস্থ। হাসপাতালে। দেখা করতে এলেন অলি আহাদ, তোয়াহা। শেখ মুজিবের পরামর্শে রাতে আরও এলেন অনেক ছাত্রনেতা। তাদের সঙ্গে আন্দোলনের চূড়ান্ত ছক তৈরি হল। শেখ মুজিবের ভাষায় :

‘পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই এলো। সেখানেই ঠিক করা হল আগামী ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। আমি আরও বললাম, ‘আমিও আমার মুক্তি দাবি করে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন শুরু করব। আমার ছাব্বিশ মাস জেল হয়ে গেছে। ”  [পৃষ্ঠা ১৯৭]

পরিকল্পনা অনুসারে কাজ এগুচ্ছে। ষড়যন্ত্রে পটু পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনের অনশনের খবর পেয়ে তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা থেকে ফরিদপুরে নেয়া হচ্ছে। কাজ হচ্ছে গোপনে। যাতে কেউ জানতে না পারে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ এসে দেখা গেল জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে। রাতে থানায় থাকতে হবে। সুযোগটা কাজে লাগালেন বুদ্ধিমান শেখ মুজিব। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী নেতা শামসুজ্জোহাকে থানায় আসতে বললেন। রাতে খাবার খেতে মিলিত হলেন একটি হোটেলে। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন :

“সেখানে আগে থেকেই শামসুজ্জোহা আট দশজন কর্মী নিয়ে বসে আছেন। আমরা আস্তে আস্তে খাওয়া দাওয়া করলাম, আলাপ আলোচনা করলাম। ভাসানী সাহেব, হক সাহেব ও অন্যান্য নেতাদের খবর দিতে বললাম। খবরের কাগজে যদি দিতে পারে চেষ্টা করবে। বললাম, সাপ্তাহিক ইত্তেফাকতো আছেই। আমরা যে আগামীকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করব সেকথাও তাদের বললাম, যদিও তারা পূর্বেই খবর পেয়েছিল।… রাত এগারটায় আমরা স্টেশনে আসলাম। জাহাজ ঘাটেই ছিল, আমরা উঠে পড়লাম। জাহাজ না ছাড়া পর্যন্ত সহকর্মীরা অপেক্ষা করল। রাত একটার সময় সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। বললাম, ‘জীবনে আর দেখা না হতেও পারে। সকলে যেন আমাকে ক্ষমা করে দেয়। দুঃখ আমার নাই। একদিন মরতেই হবে, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যদি মরতে পারি, সে মরাতে শান্তি আছে।”  [পৃষ্ঠা ২০০]

দেখুন, মানুষটা বছরের পর বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাচ্ছেন জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকাল, কিন্তু সতত মননে জাগ্রত বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ। মৃত্যুকে শ্যাম সমান ভালোবেসে গেছেন, মৃত্যু তিনি কখনও ভয় পাননি। কারণ, তিনি জানতেন তাঁর মৃত্যুর ভিতর দিয়ে বাঙালি জাতি জেগে উঠবে ফিনিক্স পাখির মতো। তিনি এও জানতেন জীবনের দীর্ঘ সাধনায় বাঙালির জন্য যা করেছেন, তাতে বাঙালি জেগে উঠেছে। বাঙালি মরতে শিখেছে। তিনি বলেছেনÑ যে জাতি মরতে পারে, মরতে জানে সে জাতিকে ‘দাবায়ে’ রাখা যায় না। তারই চূড়ান্ত প্রতিধ্বনি শুনতে পাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণেÑ আমরা মরতে শিখেছি। আমাদের আর দাবায়ে রাখতে পারবা না। শেখ মুজিব আর মহিউদ্দিনকে নিয়ে আসা হলো ফরিদপুরে। সকালে ইচ্ছে করেই শহরে নাস্তা করতে বের হলেন। যদি কোনো কর্মীর সঙ্গে দেখা হয়। মহিউদ্দিন মহি নামে এক কর্মী সাইকেলে যাচ্ছিল, তাকে মুজিব ডাক দিলেন। মহির মাধ্যমে শেখ জানিয়ে দিলেন তারা ফরিদপুর কারাগারে। আগুন জ্বলে উঠল দুই জায়গায়। ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের জন্য মিছিল, পুলিশের গুলি। অন্যদিকে ফরিদপুর জেলে শেখ মুজিব আর মহিউদ্দিনের আমরণ অনশন। সিভিল সার্জন নাকের মধ্যে নল দিয়ে খাওনোর চেষ্টা করছে। ফরিদপুর জেলে পৌঁছেই ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন শুরু করেছেন দুজনে। তাঁদের অনশনের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকায়, বাংলাদেশের জনসভায় ভাসানী আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনের মুক্তি দাবি করছেন। ফরিদপুর উত্তেজনায় টালমাটাল। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী এক জায়গায় হলেই তাঁদের মুক্তি জানিয়ে স্লোগান দেয়।

শেখ মুজিব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন :

‘‘আমাদের অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে এসেছে যে, যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যুর শান্তি ছায়ায় চিরদিনের জন্য স্থান পেতে পারি। সিভিল সার্জন সাহেব দিনের মধ্যে পাঁচ সাতবার আমাদের দেখতে আসেন। ২৫ তারিখ সকালে যখন আমাকে তিনি পরীক্ষা করছিলেন হঠাৎ দেখলাম, তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। তিনি কোনো কথা না বলে মুখ কালো করে বেরিয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম, আমার দিন ফুরিয়ে গেছে। কিছু সময় পরে আবার ফিরে এসে বললেন, ‘এভাবে মৃত্যু বরণ করে কি কোনা লাভ হবে? বাংলাদেশ যে আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে।’ আমার কথা বলতে কষ্ট হয়, আস্তে আস্তে বললাম, ‘অনেক লোক আছে। কাজ পড়ে থাকবে না। দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তাদের জন্যই জীবন দিতে পারলাম এই শান্তি। ডেপুটি জেলার বললেন, ‘কাউকে খবর দিতে হবে কিনা? আপনার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী কোথায়? আপনার আব্বার কাছে কোনো টেলিগ্রাম করবনে?’ বললাম, ‘দরকার নাই। আর তাদের কষ্ট দিতে চাই না।’ [পৃষ্ঠা ২০৪]

২৭ তারিখ শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার। সঙ্গী কারাবন্দী মহিউদ্দিন ডাবের রস খাইয়ে তাঁর অনশন ভাঙ্গালেন। পাঁচদিন পর পৌঁছলেন বাড়ি। থাকলেন কয়েকদিন স্ত্রী, সন্তান, মা, বাবার সঙ্গে। চলে এলেন ঢাকায়। ঢাকা থেকে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। উদ্দেশ্য, আওয়ামী মুসলিম লীগকে আরও সংগঠিত করা। দেখা করলেন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। নতুন করে সংগঠিত করতে লাগলেন দলকে। লাহোর থেকে এলেন ঢাকায়। মাওলানা হাসপাতালে। শেখ মুজিব জেলায় জেলায় সভা করতে শুরু করলেন। দলের মধ্যে কোন্দল। আবদুস সালাম খান মনে করছেন দলে তার গুরুত্ব কম দেয়া হচ্ছে। গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি আতাউর রহমান খান। ভাষা আন্দোলনের সময়ে দলের সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক কারাগারে থাকায় তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। চারদিকে যখন ছেঁড়াবেরা অবস্থা তখন শেখ মুজিব দায়িত্ব নিলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি সম্মেলন হচ্ছে চীনে। আমন্ত্রণ পান শেখ মুজিব। সবাই মিলে গেলেন চীনে। গেলেন হংকং। যা দেখেছেন, শুনছেন একজন অনুসন্ধিৎসু মনের ধ্যানী মানুষের মতো লিখে গেছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। তিনি আত্মজীবনী লেখেন জেলে বসে। সেখানে বসে কারো সঙ্গে কোনো তথ্যের সত্যতা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল। কাউকে জিজ্ঞেস করারও সুযোগ ছিল না। উপমহাদেশ ভেঙে স্বাধীন দুটো দেশ হয়েছে ১৯৪৭ সালে। আর চীন স্বাধীন হয়েছে ৪৯ সালে। কিন্তু তিন বছরে চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর পাকিস্তান? মুসলীম লীগ নেতাদের হাতে পাকিস্তান ইসলামি জোশে খাবি খাচ্ছে, ডুবছে, ডুবছে আর ডুবছে। চীনের নানা স্থানের সুন্দর সুশৃংখল বর্ণনা দিয়েছেন। চীনা নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ঘটনা বলেছেন। ফিরে এলেন দেশে। সরকার নির্বাচন দিলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী আর শেরে বাংলা মিলে তৈরি হলো যুক্তফ্রন্ট। এখানে যত সহজে লিখলাম তৈরি হলো যুক্তফ্রন্ট, তত সহজে হয়নি। শেরে বাংলার বয়স হয়েছিল, শুধু বয়সের সম্মান দেখাতে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী তাঁকে মান্য করেছেন। নইলে শেরে বাংলারতো কোনো দলই ছিল না। তার উপর সৃষ্টি করছিলেন নানা প্রকারের কোটারী। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী অনেকের কেবল প্যান্ট শার্ট নয়, জাঙ্গিয়াও খুলে দিয়েছে। আমরা সেসব মানুষকে এখন ন্যাংটো দেখতে পাই। ইতিহাসের পাঠ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেই মানুষকে চিনতে পারছি, দেখতে পারছিÑ এই বইটির তাৎপর্য এখানেই আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

অনেক ঘাটের পানি পান করে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন হলো। শেখ মুজিবের এলাকার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবারে শোনাই তাঁর লেখায় :

‘আমি গোপালগঞ্জ যেয়ে দেখি মুসলীম লীগ মনোনীত প্রার্থী ওয়াহিদ্জ্জুামান সাহেব ময়দানে নেমে পড়েছেন। তিনি নিজের জীবনেই বহু অর্থের মালিক হয়েছেন। লঞ্চ, স্পিডবোর্ড, সাইকেল, মাইক্রোফোনের কোনো কিছুরই অভাব নাই। আমার একটা মাইক্রোফোন ছাড়া কিছুই নাই। গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়া এই দুই থানা নিয়ে আমাদের নির্বাচনী এলাকা। রাস্তাঘাট নাই। যাতায়াতের খুবই অসুবিধা। আমার নির্বাচন চালাবার জন্য মাত্র দুইখান সাইকেল ছিল। কর্মীরা যার যার সাইকেল ব্যবহার করত।… কয়েকটা সভায় বক্তৃতা করার পর বুঝতে পারলাম, ওয়াহিদুজ্জামান সাহেব শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করবেন। টাকায় কুলাবে না, জনমত আমার পক্ষে। আমি যে গ্রামেই যেতাম, জনসাধারণ শুধু আমাকে ভোট দেওয়ার ওয়াদা করতেন না, আমাকে বসিয়ে পানদানের পান এবং কিছু টাকা আমার সামনে নজরানা হিসাবে হাজির করত এবং না নিলে রাগ করত। তারা বলত, এ টাকা নির্বাচনের খরচ বাবদ দিচ্ছে।’ [পৃষ্ঠা ২৫৫]

মুসলিম লীগের ওয়াহিদুজ্জামান যখন বুঝতে পারলেন, যত টাকাই ব্যয় করুক তরী কূলে ভিড়বে না, তখন শেষ চাল চাললেন। অর্থাৎÑ ধর্ম ব্যবহার। নির্বাচনী এলাকায় অনেক আলেম, পীর, মওলানা হাজির করলেন। শেখ মুজিবের নিজের ইউনিয়নে একজন বিখ্যাত আলেম শামসুল হক। তাকে শেখ মুজিব খুব সম্মান করতেন। সেই লোকটিও ধর্ম ব্যবসায় নেমে ফতোয়া দিলো যে, শেখ মুজিবকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে। এদের সঙ্গে আরও যোগ দিয়েছিলÑ শর্ষীনার পীর, বরগুনার পীর, শিবপুরের পীর, রহমতপুরের পীর। যত রকমের ফতোয়া দেয়া যায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে, দিয়েছে তারা। টাকা আর ফতোয়া মিলেও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা দেখা গেল না, তখন নামলো প্রশাসন। ঢাকা থেকে পুলিশ প্রধান গোপালগঞ্জে হাজির হয়ে তার কর্মচারীদের পরিস্কার হুকুম দিলেনÑ মুসলিম লীগের প্রার্থীকে সমর্থন করতে। সরকারের পক্ষে কাজ না করায় ডিস্ট্রিক ম্যাজিষ্ট্রেট আলতাফ গওহরকে সরিয়ে আর একজনকে আনা হলো। সে নিজেই বক্তৃতা দিতে শুরু করলো শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের তিন দিন আগে সেন্টারগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়া হলো, যাতে ওয়াহিদুজ্জামানের পক্ষের লোকদের ভোট দিতে সুবিধা হয়। আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মীকে গ্রেফতারও করা হলো। অর্থাৎ শেখ মুজিবকে হারানোর জন্য যত রকম অন্যায় জবরদস্তী করা যায়, সবই করেছে মুসলীম লীগ সরকার। নির্বাচন শেষে ওয়াহিদুজ্জামান প্রায় দশ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছে। নির্বাচন শেষে শেখ মুজিব বাঙালির চেতনাকে মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে : এই নির্বাচনে একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেছে যে, জনগণকে ‘ইসলাম ও মুসলমানের নামে’ স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দেবে না।  [পৃষ্ঠা ২৫৮]

নির্বাচন হলো। সঙ্গে শুরু হলো করাচী থেকে মুসলিম লীগ নেতাদের সেই কদর্য আর নৃশংস রাজনৈতিক খেলা। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক দলের সুবিধাবাদী নেতাদের ডিগবাজি। অনেক ঘটনা ও অঘটনার পর শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিপরিষদ হলো। শপথ নেয়ার দিনই নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা লাগানো হলো। সেখানেও শেখ মুজিব। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে বাসায় গেলেন রাত একটায়। বেগম মুজিব মন্ত্রী স্বামীর জন্য অভুক্ত অপেক্ষা করছেন।

শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী-র এক একটা পৃষ্ঠা পাঠ করা মানে সেকালের অন্ধ স্বার্থান্ধ জটিল আর কুটিল রাজনীতির চমৎকার রঙ্গমঞ্চ আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা অর্জন। যাদের এতদিন আনত হয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি, তাদের চরিত্র মাধুর্য আর লোভের পাহাড় দেখে চমকে উঠবেন আমার সঙ্গে প্রতিজন পাঠক। যে সোহরাওয়ার্দীর জন্য শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন, পশ্চিমাদের খপ্পরে পড়ে তিনি উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করলেন। যে শেখ মুজিব পথে ঘাটে মাঠে ময়দানে হেঁটে হেঁটে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করলেন বাংলার মানুষের হৃদয়ে, যে শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের অন্যতম রূপকার, তাকে শেরে বাংলা শুরুতে মন্ত্রী পরিষদে নিতে চাননি, বুভুক্ষ নেতাদের পরামর্শে। স্মৃতি আর ইতিহাস মিলে শেখ মুজিবের অসামাপ্ত আত্মজীবনী প্রকারান্তরে বাংলাদেশেরই জীবনী।

শেখ মুজিবের, একজন শেখ মুজিব বা বাঙালি জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে অনেকের অবদান আছে নিঃসন্দেহে। এই বইটি পাঠ করার পর আমার মনে হয়েছে সবার অবদান ছাড়িয়ে দুজনের অবদান শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। একজন পিতার পিতা শেখ লুৎফর রহমান অন্যজন শেখ মুজিবের আবাল্যের সঙ্গী, স্ত্রী ফজিলাতুননেছা মুজিব রেণু। গোটা বইয়ে রেণুর প্রসঙ্গ এসেছে অনেকবার। প্রতিবারই তিনি রেণু লিখেছেন। পোষাকী নাম ব্যবহার করেননি। এই সাধারণের ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব আর তাঁর স্ত্রীর মধ্যে গভীর সর্ম্পকের সরলরেখাটি আবিষ্কার করা পাঠকের জন্য সহজ হয়ে ওঠে। এই নারী যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, এতদিন ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকেছেন। কিন্তু শেখ মুজিবের এই বইয়ের ভেতর দিয়ে বেগম মুজিব অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেলেন। শেখ মুজিব দ্বিধাহীনভাবে অসংখ্যবার লিখেছেনÑ আসার সময়ে রেণু কিছু টাকা দিল। রেণুতো কোনো চাকরি করতেন না। গ্রামীণ বাংলার স্বাভাবিক নারী। কিভাবে টাকা যোগাড় করছেন? সংসারের নানা জায়গা থেকে নানা অশে¬ষে টাকা যোগাড় করে রাখতেন, যা পারতেন। তিনিতো জানতেনÑ তাঁর স্বামী নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বাংলার মানুষের পিছনে। তাঁর আয় রোজগার নাই। অথচ খরচের হাত আছে। অনেককে টাকা দিতে হয়। অনেককে পালতে হয়। স্বামীর বিরুদ্ধে একবার মাত্র অভিযোগ করেছিলেন, যখন মুজিব কারাগারে দীর্ঘদিন অনশনে ছিলেন। মুক্তি পেয়ে বাড়ি গেলে নিজের জন্য নয়, সন্তানদের কথা ভেবে বলেছিলেনÑতোমার কিছু হয়ে গেলে ছেমেয়েদের কি হবে ভেবেছো? শেখ মুজিব কেবল বলেছিলেনÑউপায় ছিল না।

পিতার পিতা শেখ লুৎফর রহমান পুত্রের জন্য যে দরদ আর মমতা দেখিয়েছেন সারাজীবন ধরেÑ তার কেনো তুলনা হতে পারে না। শেখ মুজিব জেল খেটেছেন, রাজনীতি করেছেন আর তাঁর সংসার ছেলেমেয়ে স্ত্রী পরিপালন করেছেন তিনি। শেখ মুজিবের সারাজীবনের খরচ জুটিয়েছেন তিনি। এখানে ‘খরচ’ কথাটা খুব সাদামাটা হয়ে গেল, কারণ ছেলে রাজনীতি করে আর বাবা টাকা জোগায়Ñএমন বাবা কী আর বাংলার সংসারে হবে? অন্তরের গভীর থেকে প্রণাম জানাই শেখ লুৎফর রহমানকে।

শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দেবে, যারা ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে চান, তাদের জন্য। অনেক অন্ধকার দূর করে অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি বাংলার আকাশে আকাশে আলোর উৎসব নিয়ে এসেছে।

যাঁরা বইটি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা অবশ্যই উপযুক্ত মানুষ। তাঁদের শ্রম ও মেধাকে শ্রদ্ধা জানাই। তবে ‘জীবনবৃত্তান্তমূলক টীকা’র ক্ষেত্রে বেশ কয়েকজনের তথ্য আরও সংযুক্ত হলে ভালো লাগতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares