মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা

আমাদের জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও আত্মবিকাশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বাংলাভাষা। কবির ভাষায় তা-ই ধ্বনিত হয়েছে : মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!

‘পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ভাষা আছে বলে শোনা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের সংখ্যা দুই শয়ের বেশি নয়। সুতরাং প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রে একাধিক ভাষা ব্যবহৃত হয়। ভাষামাত্রই কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা।… কাকে বলে রাষ্ট্রভাষা? রাষ্ট্র তার সর্ববিধ কাজে যে ভাষাটি বা যে ভাষাগুলোকে ব্যবহার করে সেটিকে বা সেগুলোকে বলা হয় রাষ্ট্রভাষা।… মাতৃভাষা হচ্ছে বাতাসের অক্সিজেন বা আকাশের রোদের মতো। মানুষের এই সব স্বাভাবিক অধিকার উপভোগে কোনো রাষ্ট্র কখনও বাধা দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। মাতৃভাষার অধিকার হয় না, রাষ্ট্রভাষার অধিকার হয়। কোনো জনগোষ্ঠীকে কখনও মাতৃভাষার দাবি করতে হয়নি, কিন্তু রাষ্ট্রভাষার দাবি পৃথিবীর অনেক জনগোষ্ঠীই করেছে।…  একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা নয়, রাষ্ট্রভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রতীক।’ শিশির ভাট্টাচার্য্যরে এই বিশ্লেষণের মধ্য থেকে উঠে আসে মাতৃভাষার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের পক্ষে চাই রাষ্ট্রভাষার অধিকার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে ১৯৫২ সনের একুশে ফেব্রুয়ারির আগের ভাষা আন্দোলনের কথাও বর্ণনা করেছেন লেখক মুজিব। দুটি গ্রন্থে তিনি তুলে ধরেছেন পাকিস্তানি শাসক ও এদেশীয় দোসরদের বাংলা ভাষার প্রতি বিরূপ মনোভাব ও প্রতিহিংসার চালচিত্র। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করার কঠিন সময়ের কথাও লেখক নিজের জবানিতে বলে গেছেন নির্মোহভাবে।

২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলাভাষা ব্যবহারে সকলকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘ইদানীং বাংলা বলতে গিয়ে ইংরেজি বলার একটা বিচিত্র প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। জানি না, অনেক ছেলে-মেয়ের মাঝে এখন এটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। এভাবে কথা না বললে যেন তাদের মর্যাদাই থাকে না- এমন একটা ভাব।’ শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, ‘প্রমিত বাংলা শব্দের বানান এবং উচ্চারণ সুনির্দিষ্ট। এখানে কোনো আপস চলবে না। বাংলা ভাষাকে মিশ্রিত বা বিকৃত করে বলার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। তবে আঞ্চলিক ভাষাকে কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। কারণ, আঞ্চলিক ভাষাও বাংলা ভাষা, এর নিজস্বতা রয়েছে।’

মূলকথা মাতৃভাষাকে সুরক্ষার জন্য ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অপরিহার্য। রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাপিতজীবনেও সেই মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শব্দঘর (অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৯) প্রকাশ করেছিল ‘তরুণদের ৭১ গল্প : বাংলাদেশ ও ভারত’। প্রকাশিত সব গল্প নিয়ে নির্মোহভাবে সাহিত্য-বিশ্লেষণ করেছেন মোহীত উল আলম। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares