হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’: হরিশংকর জলদাস

বিশেষ প্রচ্ছদ রচনা

আমার ১৯৭১

হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’

হরিশংকর জলদাস

‘তু হিন্দু অউর মুসলমান?’

‘জেলে স্যার। হাম জাইল্যা হায়।’

বুদ্ধিটা কে জুগিয়েছিল জানি না। পাশে শফিক ছিল। ভয়ে কাঁপছিল সে। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল সে।

আমারও শফিকের মতো অবস্থা হবার কথা। বরং ওর চেয়ে খারাপ অবস্থা হবার কথা। কারণ, শফিক মুসলমান আর আমি হিন্দু। কিন্তু কেন জানি না, সেই দুপুরে সাহস হারাইনি আমি। জ্বলজ্যান্ত পাকু সেনার প্রশ্নের উত্তরে ওপরের কথাগুলো বলেছিলাম।

যাচ্ছিলাম চট্টগ্রাম শহরে, বই ভাড়া আনতে। সময় মে, ১৯৭১। উত্তর পতেঙ্গা গ্রামে মিলিটারি ঢোকার আগেই হিন্দুরা পালাতে শুরু করেছিল, মুসলমানরা পালাবে কিনা দ্বিধায় ছিল। পাকুরা ঢোকার পর কর্ণফুলী পার হয়ে অজপাড়াগাঁয়ের দিকে চলে গিয়েছিল সচেতন মুসলমানরা, সপরিবারে।

 কৈবর্তরা ভেবেছিল- তাদের পালানোর দরকার নেই। তারা নিরীহ, দিন এনে দিনখাওয়া মানুষ। রাজনীতির কিছুই বোঝে না। শুধু জানে- অন্নচিন্তা চমৎকার। তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু একদিন যখন আক্রান্ত হলো জেলেরা, তখন পালানোর সকল পথ রুদ্ধ। জেলেপুরুষেরা পাকুদের হাতে, রাজাকারদের হাতে পড়ে পড়ে মার খেল, জেলেনারীরা হলো নির্যাতিতা।

অস্থির জীবন আমার। এসএসসির পরীক্ষার্থী। পালিয়ে বাঁচার জীবন তখন। দিনে কৈবর্তনারীরা গর্তে লুকায়, সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চা, যেমন করে শেয়ালি ছানাপোনা নিয়ে গর্তে লুকায়। পুরুষরা দিনমানে জঙ্গলে আর সমুদ্রপাড়ে আশ্রয় নেয়। রাতে জড়ো হয় সবাই। কারণ রাতে রাজাকার আর পাকুরা ‘মুক্তি’র ভয়ে গর্তে লুকায়।

আমার ঘরে যে দু’চারটা উপন্যাস ছিল, সেগুলো পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে পলিথিন মুড়িয়ে মাটির নিচে চাপা দিয়েছে বাবা। বিদ্যাচর্চার কথা বললেই বিপদ। রাজাকাররা পাকুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে- লেখাপাড়া জানা বাঙালি মাত্রই মুক্তিযোদ্ধা।

ছোটবেলা থেকে গল্প-উপন্যাস পড়ার তীব্র বাসনা। মোহগ্রস্ত আমি। সহপাঠী শফিককে বললাম, ‘চল, শহরে যাই। খুরশিদ মহল সিনেমার পাশে পানবিড়ির দোকানে বই ভাড়া পাওয়া যায়। চার আনা দিলে একটা উপন্যাস ৭ দিনের জন্য ঘরে নিয়ে আসা যায়।

এক টাকা জোগাড় করেছি। চারটা বই পাব। তুইও পড়তে পারবি।’

শফিক আমার মতো বইয়ের পোকা। রাজি হয়ে গেল। মা-বাবাদের না জানিয়ে দুজনেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। শহরটি উত্তর পতেঙ্গা থেকে আট মাইল দূরে। প্রথমে পায়ে দলে দুই মাইল যেতে হবে। পরের পথ বাসে।

পরতাম পাজামা। শফিক বলল, ‘লুঙ্গি পর। মুসলমান বলে পরিচয় দিবি। ওই দিন যে শিখিয়েছিলাম, কলমাগুলো মনে আছে তো?’

দুই মাইল হেঁটে কমলমুন্সির হাটে যখন পৌঁছালাম, পাকুসেনা পথ আগলে দাঁড়াল। প্রথম প্রশ্ন আমাকে- তু হিন্দু অউর মুসলমান?

মূর্খ পাকুরা ধরে নিয়েছিল- জাইল্যা হিন্দু নয়, পাকিস্তান অনুরাগী ভিন্ন কোনো সম্প্রদায় বুঝি।

এরপর শফিকের ওপর নজর দিয়েছিল পাকুরা। কলমা, নামাজ, সুন্নত- সবকিছু অবলীলায় পার হয়ে গিয়েছিল শফিক। আমাকে এসব পরীক্ষা নেওয়ার আগ্রহ হারিয়েছিল তারা। সবকিছুতে পার পেলেও সুন্নতে ধরা পড়তাম নির্ঘাৎ।

১৯৭১-এ উত্তর পতেঙ্গার জেলেরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিতে পারেনি, কিন্তু সমগ্র কৈবর্তসমাজ মুক্তিযুদ্ধানুরাগী ছিল। নিরাপদ ভেবে মুক্তিরা জেলে পাড়ায় আশ্রয় নিত। বাড়ি বাড়ি থেকে মুষ্টি চাল তুলে যোদ্ধাদের খাবার ব্যবস্থা করত কৈবর্তনারীরা।

 কৈবর্তপাড়ায় পাকুরা আগুন দিল এক বিকেলে। আগের দিন রাতে ধর্ষণ করতে এসে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল পাঞ্জাবি সেনাদের। আমাদের মানে জেলেপাড়ার তরুণদের হাতিয়ার ছিল ঢিল, লাঠি, আর প্রচণ্ড হুঙ্কার। প্রাণ নিয়ে পালিয়েছিল পাকুরা। পরের দিন প্রতিশোধ, জেলেপাড়ার ঘরে ঘরে আগুন দেওয়া।

দুটো ঘটনা এজন্য বলা, যুদ্ধে মগ্ন ছিলাম আমরা, যুদ্ধে লগ্নও ছিলাম। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঝাঁ ঝাঁ আগুন আমাদেরকেও পুড়িয়েছিল। শরীর যেমন পুড়েছিল, সম্ভ্রমও দগ্ধ হয়েছিল।

হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১ উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে, বহুদিন বাদে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ফিরে গেলাম আবার। ১৯৭১ উপন্যাসটি আমাকে, এই তেষট্টি বছর বয়সের আমাকে অতীতচারী করল, পুনরায়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু না কিছু লেখা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের জাতীয় কর্তব্য বলে আমি মনে করি। উপন্যাসকার হলে উপন্যাস, গল্পকার হলে গল্প, প্রবন্ধকার হলে প্রবন্ধ, নাট্যকার হলে নাটক, কবি হলে কবিতা। সবাই কিছু না কিছু লিখে জাতীয় ঋণ, সাংস্কৃতিক ঋণ শোধ করা উচিত বলে মনে করি।

এই ঋণ সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ সচেতন ছিলেন। তাই তিনি ‘জলিল সাহেবের পিটিসন’ নামের এক অসাধারণ গল্প লিখেছেন। আর লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আটটি উপন্যাস। উপন্যাসগুলো হলো- শ্যামল ছায়া (১৯৭৪), নির্বাসন (১৯৭৪), সৌরভ (১৯৭৮), আগুনের পরশমণি (১৯৮৬), সূর্যের দিন (১৯৮৬), সৌরভ (১৯৭৮), ১৯৭১ (১৯৮৬), সূর্যের দিন (১৯৭৪), অনিল বাগচীর একদিন (১৯৯২) এবং জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪)। ১৯৭৪ থেকে ২০০৪ মোট ৩০ বছর। ত্রিশ বছরে আটটি উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। সবচেয়ে বৃহৎ উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প। নামে গল্প, বিস্তৃতিতে উপন্যাস। পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩৯০। ক্ষুদ্রতম উপন্যাস শ্যামল ছায়া, ৩৩ পৃষ্ঠার। ১৯৭১ পঞ্চান্ন পৃষ্ঠার উপন্যাস। খ্যাত, স্বল্পখ্যাত মানুষদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আটটা উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। খ্যাতিমানদের মধ্যে উল্লেখ্য জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, সালেহ চৌধুরী, বীরপ্রসবিনী বেগম আশরাফুন্নিসা, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বাবাকে এবং মা-বাবাকে দু’দুটো উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন লেখক। শ্যামল ছায়া বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদকে এবং জোছনা ও জননীর গল্প মা বেগম আয়েশা আক্তার খাতুন এবং বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদকে যৌথভাবে।

শুধু সাল দিয়ে, তাও আবার সংখ্যায়, উপন্যাসের নাম রাখা যায়, তা হুমায়ূন আহমেদই আমাদের দেখালেন। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব কিছু সন-তারিখ আছে, যেগুলোর সঙ্গে ওই জাতির প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির স্মৃতি ইতিহাস জড়িয়ে থাকে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, হারানোর আর্তনাদ, স্বস্তির উল্লাসধ্বনি ওইসব সন-তারিখের সঙ্গে যুক্ত। তখন ওই সন-তারিখগুলো শুধু ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে ওই জাতির অস্তিত্বসংকট অথবা তৃপ্তির প্রতীক।

বাঙালিরও সেরকম কিছু সন-তারিখ আছে, চিরদিন স্মরণে রাখার মতো। যেমন ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৫-এসব।

১৯৭১ বাঙালি জাতির কাছে এমন একটা সন, যা মনে পড়লে স্মৃতিতে জেগে ওঠে হানাদারদের অশ্বের শতসহস্র পায়ে দলিত হতে থাকা শ্যামল মায়ের কথা, গ্রাম-শহরে, দাউ দাউ আগুনের কথা, বাঙালি নারীর সম্ভ্রম হারানোর আর্তনাদের কথা, হাজার লক্ষ বাঙালির রক্ত নিয়ে হোলিখেলার কথা, সর্বোপরি উদীয়মান লাল সূর্যের কথা।

এই ১৯৭১ সনটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের শিরোনাম হয়েছে। নীলগঞ্জ নামের একটি গাঁয়ের চল্লিশটি পরিবারের ভাঙাচোরা মানুষজনের আকুতি-আর্তনাদ এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। বিস্তৃত জলাভূমির বিচ্ছিন্ন জনপদ নীলগঞ্জের অসহায় মানুষজন পাকুদের হঠাৎ উপস্থিতিতিতে কী বিপুলভাবে আন্দোলিত হয়ে, উঠেছিল। তারই বিবরণ আছে ১৯৭১ উপন্যাসে। ঘটনার বর্ণনা এমন অসাধারণ ও বিশ্বাস্য যে, উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার পূর্বে উল্লিখিত দুটো ঘটনা মনে পড়ে যায়। কোনো লেখা যখন পাঠকের ভাবনার মূলে নাড়া দেয়, তখনই সেই লেখা যথার্থ লেখা বলে গণ্য হয়। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ আর পাকুদের অত্যাচার সচক্ষে দেখেছি, তারাই বুঝতে পারব, হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১-এর যুদ্ধকাহিনি বাস্তব, মর্মস্পর্শী এবং আহাজারিমগ্ন।

আজকের পাঠকের কাছে আজিজ মাস্টারের কাহিনিটি আজগুবি এবং অশ্লীল বলে মনে হতে পারে। যারা নিজেদের চোখে পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার দেখেছে বা ১৯৭১-এ নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারাই সাক্ষ্য দেবে পাকুদের এই নির্মমতার ঘটনা কত স্বাভাবিক ছিল সে-সময়ে। আজিজ মাস্টার বিদেশি মানে অন্য জেলার। নীলগঞ্জের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার। অবিবাহিত। কবিতা লেখেন। হাঁপানি ব্যারাম আছে, শীতে প্রকোপ বাড়ে। নীলগঞ্জের সবচাইতে ধনীব্যক্তি জয়নাল মিয়ার বাড়িতে থাকেন। অনেকটা আশ্রিত। জয়নাল মিয়ার রান্নাঘর থেকে আজিজ মাস্টারের খাবার আসে। জয়নাল মিয়ার স্ত্রীকে আজিজ মাস্টার ভাবীসাব ডাকেন। কিন্তু তার বড় মেয়ে মালাকে দেখলে বিচলিত বোধ করেন। মেয়েটির সামনে আজিজ মাস্টারের কান লাল হয়ে ওঠে। একধরনের সুখকর অস্বস্তি তাকে পেয়ে বসে তখন। মনে মনে আজিজ মাস্টার মালাকে স্ত্রী হিসেবে কামনা করেন।

একদিন নীলগঞ্জে হানাদার বাহিনী ঢোকে। নীলগঞ্জ প্রাইমারী স্কুলেই ঠাঁই নেয় পাকুরা। ক্ষুদ্র সৈন্যদলের অধিনায়কের নাম এজাজ আহমেদ। এজাজ আহমেদ নিষ্ঠুর, অশ্লীলতামনস্ক। একদিন এজাজ আহমেদ আজিজ মাস্টারকে স্কুলে ডেকে নেয়। নীলগঞ্জের জঙ্গলে কতজন বাঙালি সৈন্য আছে জিজ্ঞেস করে। মাস্টার অজ্ঞতা জানালে নানারকম নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করে কমান্ডার এজাজ। তার নিষ্ঠুরতার একটি হলোÑ আজিজ মাস্টারকে ন্যাংটো করা এবং তার শিশ্নপ্রান্তে ইটের টুকরা ঝুলিয়ে দেওয়া। ইতোমধ্যে এজাজ জেনে নিয়েছে- আজিজ মাস্টার জয়নাল মিয়ার কন্যা মালাকে পছন্দ করেন, তাকে বিয়ে করতে চান। আজিজ আর ইমাম সাহেবের কাছ থেকে বাঙালি সৈন্যের কোনো হদিস না পেয়ে কমান্ডার এজাজ জয়নাল মিয়াকে ডেকে পাঠায়। জয়নাল মিয়া স্কুলে এসে দেখেÑ আজিজ মাস্টার ন্যাংটো হয়ে একটি স্কুল কক্ষের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছেন। জয়নাল মিয়া হতভম্ব। এই সময় পাকু কমান্ডারটি বলে ওঠে, ‘ও তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু ওর যন্ত্রপাতি বেশি ভালো মনে হচ্ছে না। আমার মনে হয় ভয় পেয়ে ওঠার এই অবস্থা। আমি নিশ্চিত, উত্তেজিত অবস্থায় এটা আরও ইঞ্চিখানেক বড় হবে। কি বল জয়নাল? তবে আমি ঐ যন্ত্রটার জন্যে একটা এক্সারসাইজের ব্যবস্থা করেছি। আমি ঠিক করেছি- ওখানে একটা ইট ঝুলিয়ে দেব। এতে এটা আরও কিছু লম্বা হবে বলে মনে হয়।… আমি ঠিক করেছি মাস্টারকে এই অবস্থায় তোমার মেয়ের কাছে নিয়ে যাব। জিজ্ঞেস করব, এই সাইজে ওর চলবে কিনা।’ কী কদাকার অশ্লীল পরিহাস! বাপের কাছে কন্যাকে নিয়ে এরকম পরিহাসের ঘটনা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে হরহামেশা ঘটেছে। আজকের প্রজন্ম হয়ত ঠিকঠাক মতন অনুভব করতে পারবে না যে, কী বীভৎস অশ্লীলতা আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে সেই সময়ের মানুষজন দিনাতিপাত করেছে।

একটা সাদামাটা কাহিনি দিয়ে উপন্যাসটি শুরু করেছেন ঔপন্যাসিক। অন্ধ মীর আলী। বয়োভারে নত। বয়স সত্তর। রাতের বেলায় ঘন ঘন প্রস্রাব ধরে। ছেলের বউ অনুকা অথবা ছেলে বদিউজ্জামান মীর আলীর হাত ধরে উঠানে নিয়ে যায়। মীর আলী প্রশ্ন করে। ঘরে ফিরে, আবার প্রস্রাব ধরে। নাতনি পরীবানু কারণে-অকারণে কাঁদে। একরকম সাধারণ একটা গ্রাম্য পরিবারের কাহিনি দিয়ে শুরু ১৯৭১। বাংলাদেশের অন্যান্য হাজারো গ্রামের মতো অলসভাবে পড়ে থাকা ছোট একটি গাঁ, নীলগঞ্জ। এখানে দারিদ্র্য আছে, চঞ্চলতা নেই। হিংসাবিদ্বেষ, সামাজিক অনীতিও আছে। এই গাঁয়ের কৈবর্তপাড়ার চিত্রা বুড়ির ছেলে মনার বউয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। বুড়ির ছেলেকে খুন করে মনা কৈবর্ত এই অপরাধের বদলা নেয়। সমাজনেতাদের কাছে চিত্রাবুড়ি বিচার চাইলে জয়নাল মিয়া, চন্দ্রকান্ত সেনরা নির্বিকার থাকে। এসবকিছু সেদিনের যেমন, আজকের দিনেরও গ্রামীণ চিত্র। তারপরও জীবন চলছিল জীবনের মতো করে।

গ্রামজীবনে উতরোল উঠল, সেদিন একজন পাকিস্তানি কমান্ডার একটি ছোট পাকু সৈন্যদল আর রাজাকারবাহিনী নিয়ে নীলগঞ্জেও ঢুকল।

হুমায়ূন আহমেদ অধিনায়ক মেজর এজাজ আহমেদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেÑ ‘ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীর অধিনায়ক একজন মেজর- এজাজ আহমেদ। কাকুল মেলিটারি একাডেমীর একজন কৃতী ক্যাডেট। বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রামে।’ (পৃ. ৮৪) মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স)।

৯২ পৃষ্ঠায় লেখক ওই মেজর সম্পর্কে আবার লিখেছেন, ‘অত্যন্ত রূপবান একজন মানুষ। মিলিটারি পোশাকেও তাকে রাজপুত্রের মতো লাগছে।’ লক্ষ্য করুন মেজরটিকে ‘আপনি’র সম্মান জানানো হচ্ছে। ‘রাজপুত্র’ বাঙালি মানসে একজন স্বপ্নপুরুষ, সে কোনো অন্যায় কাজ করে না, রাজকন্যাকে পাওয়ার জন্য সাতসমুদ্র পাড়ি দিতেও পিছপা হয় না।

কিন্তু এই এজাজ আহমেদ এই উপন্যাসে একজন নৃশংস জল্লাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বেছে বেছে হত্যা করা, অশ্লীল খিস্তিখেউড় করা এবং মুক্তিবাহিনীর সন্ধানের অজুহাতে জয়নাল মিয়া, আজিজ মাস্টার আর ইমাম সাহেবদের বিনাকারণে অপমান অপদস্ত করা। এই উপন্যাসের সবচাইতে উজ্জ্বল চরিত্র বলতে আমার আজিজ মাস্টারের কথা মনে হয়েছে। এই আজিজ মাস্টার নির্বিরোধী এবং কবিমনস্ক লোক। ভালোবাসার নিবিড় আবেশকে যিনি নিজের মনের একান্ত প্রকোষ্টে লুকিয়ে রেখেছেন, সেই আজিজ মাস্টার লেখকের কাছে সম্মানিত নন, যত সম্মান ওই বর্বর হানাদার এজাজ আহমেদের জন্য। এটা হয়ত উপন্যাসকার অসচেতনভাবে লিখেছেন। লেখার পর যদি মনোযোগ দিয়ে লেখক পুনরায় পড়তেন, নিশ্চয়ই এই রকম ভুল সংশোধিত হতো।

লেখার পর পাণ্ডুলিপিটা যে লেখক পড়েননি, অন্যত্র তার প্রমাণ আছে। তা হলো নীল শার্টপরা রফিকের দৈহিক বর্ণনায়। ১১১ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন, ‘রফিককে দেখে বয়স আরও বেশি মনে হয়। রোগা এবং লম্বা।’

আবার ১৩৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘কৈবর্তপাড়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। আলো হয়ে উঠছে চারদিকে। রফিককে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এবার। ছোটখাটো অসহায় একটা মানুষ।’

দুটো জায়গায় রফিকের দেহগত যে বিবরণ তাতে বৈপরীত্য আছে নাকি?

কে এই রফিক? শেষ অধ্যায়ের আগ পর্যন্ত রফিকের আসল পরিচয় জানতে পারে না পাঠক। রফিকের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে উপন্যাসের মাঝামাঝি থেকে দু’একটা কথা লেখা হলেও শেষ অধ্যায়ের আগে তার প্রকৃত পরিচয় অনুদ্ঘাটিতই থেকে যায়।

প্রথম দিকে মনে হয়, বিএ পাস এই রফিক পাকিস্তানি কমান্ডার এজাজ আহমেদের পাচাটা কুকুর ছাড়া আর কিছুই নয়। মনে হয় বেইমানিতে রাজাকারকেও বুঝি ও হার মানায়। কমান্ডার ইংরেজিতে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এই রফিক তা বাংলায় তরজমা করে উফদ্দষ্ট ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেয়। মেজরের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। কমান্ডারের সঙ্গে সঙ্গে এই রফিকের প্রতিও পাঠকের ঘৃণা দানা বাঁধতে থাকে। শেষ অধ্যায়ে গিয়ে পাঠকরা বুঝতে পারে রফিক একজন স্বাধীনতামনস্ক, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণকামী একজন তরুণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

শেষ দৃশ্যে আমরা এরকম দেখি-

মেজর এজাজ আহমেদ রফিককে বিলের ঠান্ডা পানিতে ঠেলে দিয়েছে। বুক পানিতে গিয়ে দাঁড়াতে হবে তাকে। ইতোমধ্যে এজাজ বুঝে গেছে যে, একদিনের বিশ্বস্ত রফিক বাংলার একজন মুক্তিকামী তরুণ ছাড়া আর কেউ নয়। সে ঠিক করেছে রফিককে কঠিন সাজা দিতে হবে, বুক-পানিতে দাঁড় করিয়ে বুক বরাবর গুলি চালাতে হবে।

বুকজলে দাঁড়িয়ে থাকা রফিককে মেজর এজাজ জিজ্ঞেস করে; রফিক, তুমি বেঁচে থাকতে চাও?’

উত্তরে রফিক বলে; সবাই বেঁচে থাকতে চায়। আপনি নিজেও চান। চান না? এর পর তীক্ষè তীব্রকণ্ঠে রফিক বলে, ‘মেজর সাহেব, আমার কিন্তু মনে হয় না আপনি জীবিত ফিরে যাবেন এ দেশ থেকে।’ তারপর গুলি চালানোর নির্দেশ হলো। সেই গুলির অপেক্ষায় থাকল রফিক।

সকল রকম ঘৃণা আর কালিমা থেকে উঠে এল রফিক তরতাজা এক তরুণ। বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সে যুদ্ধ করল না বটে কিন্তু দেশের স্বাধীনতার জন্য সে বিনাদ্বিধায় এক বুক রক্ত ঢেলে দিল বিলের স্বচ্ছ নির্মল জলে।

নিরীহ বিবরণমূলক, সংলাপ প্রধান ১৯৭১ নামের উপনাসটি শুধু রফিকের আত্মদানের জন্যই মহত্তর উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares