হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ : মৃত্যুর কোলে মাথা রেখে ওরা জীবনের গান গায় : মোহিত কামাল

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

মৃত্যুর কোলে মাথা রেখে ওরা জীবনের গান গায়

মোহিত কামাল

হুমায়ূন-সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। উপন্যাসে, ছোটগল্পে, নাটকে বিভিন্নভাবে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা-চেতনা, ভাবাবেগ, প্রভাব। সেই ধারাবাহিকতা তিনি বজায় রেখেছেন চলচ্চিত্রেও।

শিল্পসৃষ্টিতে স্রষ্টার অন্তর্দৃষ্টি, অন্তর্লোক কিংবা অন্তর্জগতের তন্ময়তা, প্রজ্ঞা, আত্মদর্শন, ইত্যাদি মননশীল বিষয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দর্শক, শ্রোতা কিংবা পাঠকের ভাবনার জগৎ তখন নাড়া খায়, চিন্তারাজ্যে আলোড়ন ওঠে। নতুন ভাবোচ্ছ্বাস কিংবা ভাবতরঙ্গে দুলে ওঠে মন। একাত্তরের বাংলাদেশের মানুষের মনের অবস্থা তথা চিন্তা, বিশ্বাস, সংকল্প- পাকহানাদারদের প্রতি অন্তরের ঘৃণা, ক্ষোভ, ক্রোধ- ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়- বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন হুমায়ূন আহমেদ। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন বিজয়ের জন্য মানুষের দৃঢ় সংকল্প, আত্মত্যাগ। বিপর্যয়ের আশঙ্কা মাথায় নিয়েও গেরিলাযোদ্ধাদের প্রতি দেশের মানুষের মমতা ও ভালোবাসার তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন হচ্ছে হুমায়ূন-চলচ্চিত্রের আর একটি বড় দিক।

আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়েছে অবরুদ্ধ ঢাকার গেরিলা যুদ্ধের ভিত্তিতে; শুরু হয়েছে থিম সংগীত বা সূচনাসংগীতের মধ্যদিয়ে :

হাতে তাদের মারণাস্ত্র চোখে অংগীকার

সূর্যকে তারা বন্দি করবে এমন অহংকার

ওরা কারা/ ওরা কারা / ওরা কারা?

ওরা কারা/ ওরা কারা/ ওরা কারা?

দীপ্ত চরণে যায়

মৃত্যুর কোলে মাথা রেখে ওরা জীবনের গান গায়।

ছবির শুরুতেই এই গান দর্শকশ্রোতার মনে তৈরি করে একধরনের ফোর্স বা শক্তি। গানটির সুর এবং গায়কী প্রথমেই জাগিয়ে তুলবে দর্শকদের, আন্দোলিত করবে অন্তর্গত প্রেরণা। উদ্যম জেগে উঠবে ভেতর থেকে। ওই সময়ের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে বাধ্য হবেন দর্শক। সূচনাসংগীতটি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ নিজেই।

১৯৭১ সালের মে মাস। অবরুদ্ধ ঢাকায় নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ছুটছে হানাদার বাহিনীর সাজোয়া গাড়ির বহর। তীব্র হতাশা, ভয়ঙ্কর ভয়ে কাঁপছে মানুষ। অবরুদ্ধ ঢাকার একটি পরিবারের কর্তা মতিন সাহেব ট্রানজিস্টার শোনার চেষ্টা করছেন মৃদু ভলিউমে। ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনার চেষ্টা করছেন। নব ঘোরাচ্ছেন ট্রানজিস্টারের। হঠাৎ শুনতে পেলেন বজ্রকণ্ঠের অংশবিশেষ:                     

মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি

রক্ত আরও দিব…

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

শুরুতেই আগুনের পরশমণি ছবিটি দেখে কেন জেগে উঠেছেন দর্শক? কেন নাড়া খেয়েছে অন্তর্গত প্রেষণা? প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার নিশ্চয় আর প্রয়োজন নেই। কেন দর্শক একাত্ম হয়ে গেলেন ছবিটির সঙ্গে? এ প্রশ্নটির উত্তরও নিশ্চয় পেয়ে গেছেন পাঠক। এখানেই লুকিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের মোটিভেশনাল ফোর্স।

ভয়াবহ পরিবেশ প্রথমে নাড়িয়ে দেয় চিন্তন প্রক্রিয়া। তৈরি হয় আবেগ। এই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয় মোটিভেটেড আচরণ, তাগিদ। ইমোশন ও মোটিভেশন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মোটিভেশনের মূল উপাদান হচ্ছে আকাক্সক্ষা, চাহিদা ও উৎসাহ  যা লক্ষের দিকে টেনে নেয় মানুষকে। মনস্তত্ত্বের এই দিকগুলো রয়েছে আগুনের পরশমণি ছবিতে।  মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত মানুষের আবেগে রসদ ঢেলেছে চিন্তন প্রক্রিয়া। অন্তর্গত প্রেরণা বা মোটিভেশনের গতি বেগবান হয়েছে বঞ্চনা, নিপীড়ন, নির্যাতনের ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণে। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, চাহিদা এবং উৎসাহের টানের নেপথ্যে রয়েছে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নির্মম হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস। প্রতিউত্তর হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ; ঢাকা শহরে গেরিলা আক্রমণ। পাক হানাদারদের নৃশংসতা মুক্তির জন্য ওই সময়ের মানুষের আবেগ তীব্রতর করেছিল।  মৃত্যুকে তুচ্ছ করে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার লালসূর্য ছিনিয়ে আনার প্রত্যয়ে। এটাই মোটিভেট আচরণ। আবেগই উদ্দীপ্ত করেছিল এই আচরণ-আবেগের কারণেই লক্ষ্যে পৌঁছোনোর দুর্নিবার তাগিদ জেগেছিল মানুষের মনে। এটা হচ্ছে আগুনের পরশমণি ছবিটির মনস্তত্ত্বের সূচনা।

হুমায়ূন কখনো নিজে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেন না; যা বলতে চান, প্রকাশ করতে চান, চরিত্রের আচরণের মধ্যদিয়ে প্রকাশ করে থাকেন। দৃশ্য তৈরির মাধ্যমে আত্মদর্শন জানান দেন দর্শক শ্রোতাদের।

মতিন সাহেবের চরিত্রটি রূপায়ণ করেছেন শক্তিমান অভিনেতা আবুল হায়াত। মতিন সাহেবের ঘরোয়া চিত্রটির দিকে বারবার ফিরে তাকাতে হয়েছে দর্শকদের। বাইরে গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল শুরু হয়েছে। পুরুষদের সাজোয়া গাড়িতে তুলে নিচ্ছে পাকিস্তান হানাদার ও তাদের দোসররা। গোলাগুলির শব্দ ও কান্নার রোল হচ্ছে বাইরের উদ্দীপক। এই উদ্দীপক আলোড়ন তুলেছে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর মনে। এই আলোড়নই হচ্ছে আবেগ-ভীতি, শঙ্কা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। এগুলো হচ্ছে আবেগের একান্ত অনুষঙ্গ। চমকানো, শিউরে ওঠা, বুক কাঁপা, কাঁটা দেওয়া, গা ছমছম করা, শরীর হিম হয়ে আসা, বুক শুকানো, মুখ শুকানো, বিবর্ণ হওয়া, বুক দুপদুপ বা ঢিপ ঢিপ করা, আল্লাহকে ডাকা ইত্যাদি হচ্ছে আবেগের শারীরবৃত্তীয় এবং এক্সপ্রেসিভ অভিব্যক্তি। আবেগের তিনটি অংশ-ব্যক্তিগত অনুভূতি, শারীরবৃত্তীয় আলোড়ন এবং অভিব্যক্তির পরিবর্তনগুলো অসাধারণ নৈপূণ্যের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন মতিন সাহেব, তার স্ত্রী সুরমা (ডলি জহুর), বড় মেয়ে রাত্রি (বিপাশা হায়াত), ছোট মেয়ে অপালা (শীলা আহমেদ) এবং কাজের মেয়ে বিন্তির (হোসনে আরা পুতুল) চরিত্রে রূপদানকারী পাত্রপাত্রীরা। একটি পরিবারের ভীতিকর অভিজ্ঞতার চিত্রের মাধ্যমে পুরো ঢাকা শহরের প্রতিটি ঘরের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। দরজায় টোকা পড়লেই কেঁপে উঠছে পুরো পরিবার। অর্থাৎ তাদের মনস্তত্ত্বের প্রত্যক্ষণের মধ্যে দেখা যায় অতিরিক্ত সচেতনতা, অ্যালার্টনেস। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে এভাবে ঢাকা শহর তথা সমগ্র দেশের মানুষ কাটিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের দিন আর রাতগুলো। আতঙ্কগ্রস্ত থাকলে সামান্য শব্দকেও ভুল বিশ্লেষণ করতে পারে মানুষ। দরজার বাইরে রক্ত চেটে খাচ্ছিল একটি কুকুর। শব্দ হচ্ছিল বাইরে। সেই শব্দকে ভয়াবহ সংকেত হিসেবে ভেতরের সবাই প্রত্যক্ষণ করেছে, অভিনয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য ফুটে উঠেছে দৃশ্যপটে। অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে এমন শঙ্কায় যে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রগুলো-মনস্তত্ত্বের ভাষায় তা অনবদ্য, জীবন-ঘনিষ্ঠ।

কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ছবি লাগাচ্ছিলেন মতিন সাহেব। পেরেক ঠুকছিলেন হাতুড়ি দিয়ে। ঠুকতে গিয়ে আঙুলে চোট লাগে। রক্ত বের হয়। রক্তের দাগ বসিয়ে দেন জিন্নাহর মুখে। অন্তরের ঘৃণা ও ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশের অসাধারণ শৈল্পিক দৃশ্যচিত্র এটি । বাঁচার আকাক্সক্ষা, সম্ভ্রম রক্ষার তাগিদ দুর্নিবার থাকে মানুষের মনে। এই তাগিদ থেকে ছবি টানানোর দৃশ্যটির মধ্য দিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চিত্র দেখা যায়। হালকা দৃশ্য নয় এটি; জানান দিয়ে যায় সত্যিকারে মনস্তাত্ত্বিক দর্শন। একই রকম ক্ষোভ ও ঘৃণা দেখা যায় পানের দোকানদার ইদ্রিস মিয়ার (সালেহ আহমেদ) আচরণেও। জীবন বাঁচানোর তাগিদে দোকান খুলে বসেছেন ইদ্রিস মিয়া। ইয়াহিয়া খানের ছবি বাঁধাই করে রেখেছেন। ছবিতে থু থু ছিটিয়ে দিচ্ছেন। আবার গামছা দিয়ে মুছে দিচ্ছেন- দেখা যায় ঘৃণার বিস্ফোরণ। ইদ্রিস মিয়ার অনন্য অভিনয় শৈলী নির্মাতা হুমায়ূনের অন্তরধ্বনি প্রতিফলিত করেছে বলেই বিশ্বাস। এই ঘৃণা কেবল ইদ্রিস মিয়ার নয়। এই ঘৃণা ছিল ওই সময়ের সমগ্র দেশবাসীর। মনস্তত্ত্বের কী ভাষা কাজ করেছে এখানে? ঘৃণা হচ্ছে নেগেটিভ ইমোশন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘৃণা তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। ওপরে ওপরে পাকিস্তানি বাহিনীর অনুগত থাকার নমুনা দেখালেও অন্তরে ঘৃণার প্লাবন রুখতে পারেননি ইদ্রিস মিয়া। ‘ইগোডিফেন্স মেকানিজম’র ‘রিঅ্যাকশন ফরমেশনে’র সঙ্গে মেলানো যায় এই ভাবাবেগটিকে। ‘রিঅ্যাকশন ফরমেশন’-এ মনের ভেতরে ক্রোধ কিংবা ঘৃণা থাকলেও বাইরে থাকে শ্রদ্ধাবোধের নমুনা।  ছবিটি টানিয়ে রেখে পাকিস্তানিদের সঙ্গে একাত্মতার মেকি ভাণ করলেও অন্তরে ছিল ঘৃণা। এই আচরণ মিলে যায় ‘রিঅ্যাকশন ফরমেশনে’র সঙ্গে-থু থু ছিটানোর বিষয়টি মেলে না। তবে অতল মনের ঘৃণার সঙ্গে বাইরের আচরণের সামঞ্জস্য দেখা যায় এই চিত্রে। পুরো ছবিতে অসাধারণ চিত্রকল্পটি সত্যিকার ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

গেরিলা নেতা বদিউল আলম বদিকে প্রথমে গ্রহণ করতে পারেননি সুরমা। পরে সুরমা চরিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন দর্শক। বদির জন্য কোরআন পড়ছেন সুরমা, দোয়া করছেন। দুই সত্তার অপূর্ব উপস্থাপনা বিমুগ্ধ করেছে দর্শকদের। এই সঙ্গে দেখা যায় রাত্রির পরিবর্তন। বড় মেয়ে রাত্রি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিল বাসায় আসা নবাগত দাড়িওয়ালা ছেলেটির ওপর। মায়ের নিকট ছেলেটির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অস্ত্রটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে মা-কে জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘উনি মুক্তি বাহিনীর ছেলে! উনি মুক্তি বাহিনীর ছেলে!’ ইতিপূর্বে বিরক্তিতে ভরেছিল রাত্রির মন। বিরক্তি হচ্ছে নেগেটিভ ইমোশন। অস্ত্রটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় বিরক্তি-বিস্ময় ও আনন্দে নড়ে ওঠে রাত্রির পুরো সত্তা। ‘আনন্দ’ হচ্ছে পজেটিভ ইমোশন আর ‘বিস্ময়’ হচ্ছে মিক্সড ইমোশন। দর্শক হিসেবে মনে হয়েছে কেবল রাত্রি নয়, সমগ্র দেশের মানুষেরই অন্তরধ্বনি করেছে রাত্রি। বিরক্তির শীর্ষচূড়া থেকে আনন্দের হিমালয়চূড়ায় চড়ে বসেছে রাত্রি। রাত্রি চরিত্র রূপায়ণে বিপাশা হায়াত অসাধারণ অভিনয় করেছেন। দেখিয়েছেন অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিক্ষেপণ। নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের অন্তরের সমগ্র উল্লাস কি ফুটে ওঠেনি ওই দৃশ্যপটে? আসলে রাত্রি ভালোবেসেছে একজন নিবেদিতপ্রাণ গেরিলাযোদ্ধাকে, মুক্তিবাহিনীকে। তার অন্তরের ভালোবাসা ব্যক্তি বদির চেয়ে প্রকট মুক্তিবাহিনীর দলনেতা বদির প্রতি। ঘড়ি বন্ধ করে রেখেছে রাত্রি। পাখি পরিচর্যা করছে খাঁচার ভেতর। যেদিন দেশ স্বাধীন হবে, ঘড়ি চালু হবে, পাখি মুক্ত করে দেবে, রাস্তায় নেচে নেচে হারমোনিকা বাজাবে-রাত্রির এই আকাক্সক্ষার সঙ্গে অন্তর্লীন হয়ে যায় দেশের মানুষের ইচ্ছা, আগ্রহ, অভিলাষ, অভিপ্রায়। এই আকাক্সক্ষা বাঁচিয়ে রাখে মানুষের মনঃশক্তি, মনের জোর, আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়। এই বিশ্বাস ও প্রত্যয় হচ্ছে মনস্তত্ত্বের  শক্ত ভিত। এই ভিত ও এই জোর ছবিটির এক গোপন প্রাণশক্তি। মনস্তত্ত্বের এই গোপন বিষয় চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে অসাধারণ কৌশলে দর্শকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ।

ধরা পড়েও গেরিলাযোদ্ধা রাশেদুল করিম (ফজলুল কবীর তুহিন)  জিজ্ঞাসাবাদের সময় থু থু ছিটিয়েছেন পাকিস্তানি মেজরের মুখে। হাতের আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে তাঁর। মাথা নোয়াননি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন রাশেদুল করিম। তেজ, সাহস, আর বীরত্বের প্রতীক হচ্ছেন রাশেদুল করিম। রাশেদুল করিম আসলে একজন নন। অজস্র গেরিলাযোদ্ধার প্রতীক হচ্ছেন মুক্তিবাহিনীর এই সাহসী সদস্য। মামারূপী (মোজাম্মেল হোসেন) সরকারি আমলা ডেপুটি সেক্রেটারিকে বদির প্রতি প্রথম ক্রোধ ঝাড়তে দেখেছেন দর্শক। তারপরই দেখেছেন ভাগ্নের প্রতি মমতার আরেক দৃশ্য। রাগ আর ভালোবাসার উত্থান-পতনের চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে অসাধারণ। বদির মামা নির্ভয়ে প্রাণ দিয়েছেন। মাথা নত করেননি বন্দুকের নলের সামনে। বুলেটবিদ্ধ হওয়ার সময় মামার দেহ দেখানো হয়নি ছবিতে। দেখানো হয়েছে ছলকে ছুটে আসা রক্তধারা। এই রক্ত আসলে প্রতিনিধিত্ব করে ত্রিশ লক্ষ শহীদেরই রক্ত। এই রক্তও আমাদের সামনে উপহার দেয় সাহসী মানুষের প্রতিকৃতি।

বদি চরিত্রটির নির্মোহ অভিব্যক্তি তুলে ধরেছে অবিচল লক্ষে স্থির এক সাহসী যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। লক্ষে অবিচল থাকা যেকোনো সাফল্যেরই পূর্বশর্ত। দৃঢ়প্রত্যয়ী বদির মধ্যে সাহস দেখেছেন দর্শক। ভীরুতা দেখেননি। এই গুণই ছিল গেরিলাযোদ্ধাদের প্রধান হাতিয়ার। অনন্য অভিনয় শিল্পী আসাদুজ্জামান নূর চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রটি। গ্রেনেড হামলার সময় ইয়ামিনসহ কয়েকজন দুর্বিনীত সাহসী মুক্তিযোদ্ধার জীবন উৎসর্গ করার চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের অনন্য এক জীবন্ত তথ্যচিত্র উপহার দিয়েছে জাতিকে।

শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিটির কোর-বিলিভ অথবা মূলে রয়েছে আদর্শের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব গ্রথিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কথিত জমিদার ইরতাজ উদ্দিন ও তার ছেলের মধ্যে। ছবিটিতে ইরতাজ উদ্দিনের ছেলের চরিত্রটি দেখানো হয়নি। দুই নাতনির গ্রামের বাড়িতে আগমনের মধ্যদিয়ে জানা যায় ইতিহাসে গ্রথিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ইরতাজ উদ্দিনের ভূমিকা। ইরতাজ উদ্দিন জমিদার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বাবার এই কর্মকাণ্ড ছেলের মনে পুষে রেখেছিল তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ, বিদ্বেষ। এই ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও ঘৃণার অদৃশ্য ভিতের ওপর গড়ে উঠেছে শ্রাবণ মেঘের দিন’র কাহিনি। অতীত অভিজ্ঞতা প্রভাবিত করে সমগ্র জীবন। সেটা প্রভাবিত করেছে শাহানা ও মিতুর বাবার মনোজগৎকে। ইরতাজ উদ্দিনের প্রতি হয়তো ছেলের (শাহানা ও মিতুর বাবা) কতগুলো গভীর বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, যেমন হতে পারে, ‘বাবা একটা রাজাকার, তিনি দেশের শত্রু, বাবা একটা বেইমান ইত্যাদি’। এই গভীর বিশ্বাসই বাবার প্রতি ছেলের ক্ষোভ ও ঘৃণার মতো নেতিবাচক অনুভূতি এবং ২৪ বছর যাবৎ বাবার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ার মতো আচরণ তৈরি করেছে। শুধুমাত্র তার ছেলে নয় গ্রামবাসীরাও তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। তাদেরও নিশ্চয়ই তার প্রতি কতগুলো গভীর বিশ্বাসই রয়েছে। দৃশ্যপটের আড়ালে থাকলেও শাহানা ও মিতুর বাবার চিন্তনের জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেছে পুরো ছবিটি। অসাধারণ একটি ব্যাপার। চরিত্রটি নেই চলচ্চিত্রে। কিন্তু ছবিটির নিয়ন্ত্রক হচ্ছে চরিত্রটি। দুই নাতনি বিশেষ করে বড় নাতনি ডা. শাহানার সমাজমুখী আচার-আচরণ, মানবিক মূল্যবোধ আমূল বদলে দেয় ইরতাজ উদ্দিনকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও তিনি বুঝতে পারেননি কত বড় ভুল করেছেন, কত বড় অপরাধ করেছেন। এই ভুল ও অপরাধের জন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত, সেটা স্বীকার করেননি। মানুষের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করেছেন, যেমন- আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, চুল কেটে দেওয়া ইত্যাদি, যা অনেকটা অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি-র বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে ইরতাজ উদ্দিনের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন, নাতনির সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটিয়ে এককালের জমিদারি দাপটের বিপরীতে সাধারণ মানুষের বিজয়োল্লাস প্রতিধ্বনিত করেছেন। ইরতাজ উদ্দিন ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি খুব বড় একটা অন্যায় করেছি, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে, আপনাদের সবার কাছে, দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি আমি’। বর্তমান প্রজন্মের দুই পৌত্রী বদলে দেয় ইরতাজ উদ্দিনকে। ইরতাজ উদ্দিনের বাইরের নিষ্ঠুরতা দেখেছেন দর্শক, দেখেছেন জাত্যাভিমান। আবার তার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দেখেছেন অন্তর্গত মমত্ববোধের চিত্র। সেই মমতার মোড়ক উন্মুক্ত করে দিয়েছে দুই নাতনি। সহায়-সম্পত্তি বাড়ি দান করে দিয়েছেন, হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। এটা হচ্ছে অন্তর্লোকের পরিবর্তন। এই পরিবর্তন মনস্তাত্ত্বিকভাবে শুভ কাজের যথা মানবসেবার প্রেরণা দেয়।

শ্যামল ছায়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি প্রতীকধর্মী ছবি। গণহত্যা, লুণ্ঠন, নারকীয় নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচার জন্য নৌকায় চড়ে একদল মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাত্রার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাকামী দেশের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ স্বপ্ন দেখেছে একটি নিরাপদ স্বস্তিকর আশ্রয়ের-এই আশ্রয়ই হচ্ছে শ্যামল ছায়া। নৌকায় সব ধরনের, সব ধর্মের যাত্রী ছিল। পদেপদে মৃত্যুর আশঙ্কাযুক্ত ভয়াবহ পথযাত্রায় তারা ভুলে যায় বিভেদ। সবাই এক হয়ে যায়। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি, সামাজিক অবস্থা মানুষের মধ্যে তৈরি করেনি প্রভেদ। এভাবে সংঘবদ্ধ থাকার সংকেত দিয়েছেন হুমায়ূন।

জীবনের সৌন্দর্য অনুসন্ধান করে বেড়ান হুমায়ূন আহমেদ। সৌন্দর্যবোধ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে নতুন সৌন্দর্য সৃষ্টিতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তরে সঞ্চারিত করতে চান দেশপ্রেম ও সৌন্দর্যবোধ।

মোহিত কামাল : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares