প্রচ্ছদ রচনা : বেলাল ভাইকে নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ : হামিদ কায়সার

প্রচ্ছদ রচনা : বরণ্যে সাহিত্যিকদের জন্মদিনে শব্দ-আড্ডা

বেলাল ভাইকে নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ

হামিদ কায়সার

বেলাল ভাইকে নিয়ে কিছুতেই লেখা সম্ভব হচ্ছে না। একসঙ্গে এতো ছবি এত দৃশ্যপট এত কথা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়তে চাইছে যে, কোনটার আগে কোনটা লিখব একটা হতবিচ্ছিরি অবস্থা। তাও-বা যদি দৃশ্যগুলো পরম্পরায় আসত ধারাবাহিকতার শৃংখলা মেনেÑ যেমন আমি বেলাল ভাইকে যেদিন প্রথম দেখলাম, তারপর কীভাবে পরিচয় পরিপক্কতা পেল, কীভাবে আবার সে-যোগাযোগ আমারই কারণে শিথিল হয়ে গেল, শেষ-দেখার স্মৃতি… নাহ! সেভাবে আসছে না বর্ণনা, সেভাবে আসতে চাইছে না। আসছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চতুর্দিক থেকে! এই যদি বেলাল ভাইকে মতিঝিলের ফুটপাতে হাঁটতে দেখছি তো, ওই দেখ বসে আছে পল্টনের ঘরের ভেতর লেখার টেবিলে স্যান্ডো গেঞ্জি গায়, আবার দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ বিনম্রভাবে বক্তৃতা দিচ্ছে জাতীয় কবিতা উৎসবের মিটিংয়ে।

শুধু যদি কেবল বেলাল ভাইয়ের বিভিন্ন-মুহূর্তই ভেসে উঠত চোখের সামনে, তবু হয়তো লেখাটা অনায়াসলব্ধভাবে শুরু করা যেত, লিখতে গিয়েই দেখ হইহই করে একে ঠেলে ওকে মাড়িয়ে একসঙ্গে ঢুকে যেতে চাইছে সুনীল গাঙ্গুলি, বটুভাই মানে আমাদের প্রিয় মাহমুদুল হক, সমরেশ বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎ মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, রফিক আজাদ, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রশীদ করীম, এম আর আখতার মুকুল, তসলিমা নাসরিন, তুষার রায়, গুন্টার গ্রাসসহ আরও কত মানুষ কত বিচিত্র সব চরিত্র।

সত্যিই বেলাল ভাইয়ের চরিত্রে বর্নাঢ্যতার শেষ ছিল না। মনে আছে আমি তাকে দৈনিক সংবাদের পক্ষ থেকে এক সাক্ষাৎকার-গ্রহণকালে অফ দ্য রেকর্ড প্রশ্ন করে বসেছিলাম যে, ডুমুর পাতার আবরণের মতো এমন সুন্দর একটা উপন্যাস লেখার পর আপনি আর কোনো উপন্যাস কেন লিখলেন না? তার উত্তরে বেলালভাই শুধু একটা কথা দিয়েই সেরেছিলেন দায়, আমি খুব আলসে, বুঝেছ।

হ্যাঁ, আমারও মনে হতো যতবার বেলাল ভাইকে কাছ থেকে দেখেছি, তিনি একটু আলসেই বটে, আর সেকারণে লেখার চেয়ে পড়াতেই মগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন, পড়ার চেয়ে গল্পে জমে যেতে ভালোবাসতেন আরো তিন ডিগ্রি বেশি। গল্পের আসর পেলে বলার নেশা তাকে পেয়ে বসতো। আর ভাড়ারেও তো ছিল না কম-কথা! শৈশবের সেই সন্দ্বীপ থেকে শুরু, তারপর সাগরের আনাচ-কানাচ ঘুরে কলকাতা জয় করে ঢাকার স্বাধীনতা-পরবর্তী সাহিত্যবিকাশের ধারার সঙ্গী হয়ে পাঁচ-পাঁচটি দশকজুড়ে পরিভ্রমণ! তার কথার কী শেষ আছে? নাহ! আর না। এবার একটু শৃংখলিত হয়েই না হয় ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কথা বলা যাক।

 বেলাল ভাইয়ের ব্যক্তিত্বের মধ্যে যে একটা শ্যামলিমা স্নিগ্ধতার ব্যাপার ছিল, সেটা আমি টের পেয়েছিলাম, তার সঙ্গে চাক্ষুস দেখা হওয়ার অনেক অনেক আগ থেকেই। সেটা বোধহয় ১৯৮২/৮৩ সালের দিকে হবে, নাকি আরও পরে। আমার হাইস্কুলের এক প্রিয় স্যার সুভাষ দে-র কাশিমপুরের বাড়িতে আমি মাঝেমধ্যেই যেতাম বই আনতে। স্যারের কাছে নিমাই ভট্টাচার্য, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শংকরের বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহ ছিল। আর তখন বয়সটাই তো ওই রকম উপন্যাস পড়বার- গোধুলিয়া, মেমসাহেব, অদৃষ্টের খেলাঘর, পরের ঘরে আপন বাসা- আরও কত কি! আমি এক-একবার স্যারের বাসায় হানা দিয়ে একসঙ্গে চার-পাঁচটা বই নিয়ে আসতাম, আবার পড়া শেষ হলেই সেসব বই ফিরিয়ে দিয়ে নতুন করে নিয়ে আসতাম সেইসব মর্মের এক-একটা কাগজনদী।

এই যাওয়া-আসার ভেতরেই একবার স্যারের টেবিলের ওপর দেখতে পেলাম ভারত বিচিত্রার একটি সংখ্যা। তখন আমার কলকাতার দেশ, প্রতিক্ষণের সঙ্গে পরিচয় এবং দেখা-সাক্ষাত হয়ে গেছে, বিছানায় শোয়াশুয়িও। এ দুটোর ভিড়ে ভারত বিচিত্রা দেখে বেশ টাসকিই খেলাম। দেখে-পড়ে মনে হচ্ছে ভারতের পত্রিকা অথচ বাংলাদেশের লেখক-কবিদের লেখায়ও ভরপুর। আর কী সুন্দর গেটআপ মেকআপ। গল্প, গল্পের দারুণ মায়াময় ইলাসট্রেশন, ভ্রমণে লছমনঝুলিয়ার ঝুলন্ত ব্রিজের ছবি, গঙ্গার উৎসমুখের কী চমৎকার বর্ণনা, কবিলেখক, আর্টফিল্ম, শাবানা আজমী আর নাসিরউদ্দিন শাহর ছবি ছিল কোনো এক ফিল্মদৃশ্যের- খণ্ডহর! এখন মনে পড়ছে মৃণাল সেনের খণ্ডহর!-এই সবকিছুর সমাহার নিয়ে সে-যেন এক ঝুরিনামা বটগাছের মেলা-এক অন্য ভালো লাগার মোহমুগ্ধতার আবেশ। সেখানেই দেখলাম সম্পাদকের নাম বেলাল চৌধুরী। যেখানে বেলাল চৌধুরী সেখানেই বুঝি এমন মায়াময় স্নিগ্ধতার আবিলতা! কেননা, এই আবিষ্কারের আগেই যে তাকে ঘিরে আমার একটা ভালো লাগার আকাশ ছিল, স্বভাবতই সে-অনুভূতি আরও দৃঢ় হলো, সংবদ্ধ হলো।

হ্যাঁ, ভারত বিচিত্রার সম্পাদক বেলাল চৌধুরীকে আবিষ্কারের আগেই তার প্রতি আমার মুগ্ধতার জন্ম হয়েছিল, কোনো এক ঈদসংখ্যা রোববার বা ঈদসংখ্যা পূর্বাণীতে তার ডুমুরপাতার আবরণ উপন্যাসটি পড়ার পরপর, সে-সংখ্যাতে উপন্যাস ছিল মাহমুদুল হক, রিজিয়া রহমান, রাহাত খান, শওকত আলীর মতো আরও সব জাদরেল লেখকের। তাদের ভিড়ে বেলাল ভাইয়ের সে-উপন্যাসটি সমানভাবে আমার মন কেড়েছিল। ঢাকার নাগরিক জীবনের কিছু স্থির ছবি। কবি হিসেবেও তখন বেলাল চৌধুরী খুবই সরব। সেই ঈদসংখ্যা পূর্বাণীরই কোনো একবছরে সাত আটজন কবির কবিতা বিশেষ ইলাস্ট্রেশনে সমৃদ্ধ হয়ে বিশেষ যত্নে ছাপা হয়েছিল। এই কবিদের মধ্যে যাদের নাম মনে পড়ছে, তারা হলেন শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, রফিক আজাদ আরও যেন কে কে ছিলেন, তার মধ্যে বেলাল চৌধুরীরও একটি কবিতা ছিল ‘সার্বভৌম পাঁচটি আঙুল’ নামে। কবিতাটি মনে নেই। তবে কবিতার সঙ্গে করা কাজী হাসান হাবিবের ইলাস্ট্রেশন এখনও চোখে ভাসছে।

এই যে এভাবে কবিতা, উপন্যাস, ভারত বিচিত্রার মাধ্যমে যে বেলাল ভাই আমার মনোজগত অধিকার করে বসেছিলেন, তাকে নিয়েই যে আবার বা তার একটি কাজকে ঘিরেই যে আমাকে ছোটখাটো একটা লেখা অচিরেই লিখতে হবে, ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সূত্রে ঢাকার সাহিত্যজগতে দ্বারোদঘটন ঘটার কিছুদিনের মধ্যেই, কে জানত? ১৯৮৭ সালের ঘটনা সেটা। বিখ্যাত জার্মান কবি-লেখক গুন্টার গ্রাসের ঢাকা আগমন উপলক্ষে বেলালভাই চালচিত্র নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করেছিলেন। কী যে চমকপ্রদ ছিল সংখ্যাটি। আমাকে রিভিউ করতে হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাকে। তা রিভিউ করতে গিয়ে যে শুধু গুন্টার গ্রাসকেই জানা হলো, তা নয়, অনুবাদক বেলাল ভাইয়েরও সাক্ষাৎ লাভ ঘটল। সেই অনূদিত কবিতাগুলোর মধ্যে ‘ডিম্ববর্তী ভাইসব’ শিরোনামের কবিতাটি আমার মনে বুঝি চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেছে। অনুবাদেও যেন গুন্টার গ্রাসকে সমূলেই পাওয়া যায়, তার উইট তার বিদগ্ধতা, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যÑ যা আনা দুরূহ তো বটেই অনেক সময় অসম্ভবও। সে-কবিতাটি আমার মুখস্থ নেই বটে, তবে ওর মেজাজ-মর্জি অন্তর-আভাস এখনও হৃদয় ছুঁয়ে আছে : ডিম্ববর্তী ভাইসব! আপনারা বেরিয়ে আসুন! ডিমের খোলস থেকে বেরিয়ে আসুন সকলে!

সেবার গুন্টার গ্রাস ঢাকায় এসেছিলেন কলকাতা থেকে, আর কলকাতার অপর নাম যেন বেলাল চৌধুরী, হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই, দিন যত অতিক্রম হতে থাকে মনে হতে লাগলো আমার, সাহিত্যের আড্ডাবাজিতে- তখন আমি অনেক জায়গাতেই যাওয়া শুরু করেছি, প্রসঙ্গান্তরে আসে বেলাল চৌধুরী, তখন দেশ-সুনীল-সমরেশ বসু-শীর্ষেন্দু যুগÑতাদের সবার সঙ্গে কেমন যেন ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকেন বেলাল চৌধুরী, অনাহুতই, কারণ ছাড়াই, যেন প্রাকৃতিকই ব্যাপারটা। ততদিনে আমারও বেশ অনেক কবিসাহিত্যিক লেখকের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, জানাশোনা হচ্ছে, গল্পকার হিসেবে নাম ছড়াচ্ছে, লিখছি সচিত্র সন্ধানী, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলাসহ অনেক কাগজে, আড্ডায় যাচ্ছি এর ওর বাসায়। এমনকি বটুভাই, সাহিত্য জগত থেকে ততদিনে  স্বেচ্ছায় নির্বাসিত, এ-জগত সম্পর্কে নিস্পৃহ সে-মানুষটিও  : ‘জানো তো বেলালের কাণ্ড!’ বলেই থেমে গিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে নিলেন কায়দা করে, তারপর বসার ভঙ্গিটা পাল্টিয়ে একমুখ ধোয়া ছেড়ে হাসতে হাসতে : ‘একবার কী করেছিল জানো…’

বেলাল চৌধুরীর কলকাতার গল্পগুলো বটুভাইয়ের মুখে শুনে শুনে তাকে কেমন কিংবদন্তীর মতো লাগে। এহেন বেলাল চৌধুরীর কাছেই আমি একদিন হুঁট করেÑ তখন বোধহয় অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠেছি, তার ধানমণ্ডির ভারতীয় দূতাবাসস্থ ভারতবিচিত্রা অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। বেলালভাই আমাকে তার রুমে বসিয়ে রেখে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। ফিরলেন প্রায় পনেরো কী বিশ মিনিট পর। এসেই বললেন, আর বলো না, একজন লেখক ইন্ডিয়াতে যাবেন, তার ল্যাঠা সামলাতে হচ্ছে আমাকে! তার কথা শেষ হতে না হতেই ফোন এলো, এবং ফোনের পর ফোন আসতেই লাগলো! প্রায়ই সবই ওই ভারত যাওয়ার ব্যাপারে। শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট কেউ তখন ভারত যাওয়াসংক্রান্ত ভিসার কাজ পড়লেই শরণাপন্ন হতেন এই কবিমানুষটির! ভারত বিচিত্রা সম্পাদনার পাশাপাশি এই অনুরোধের ঢেঁকি গেলার ঠেলাও তাকে বেশ সামলাতে হতো। এবং, দূর থেকে পরবর্তীকালে এও খেয়াল করেছি, পরের মঙ্গলার্থে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করতেন।

কেউ ভারত যাবে, ধরো বেলাল চৌধুরীকে! বেলালভাইয়ের না নেই, কারও চিত্রকলার প্রদর্শনী হবে বা নৃত্যসন্ধ্যা বা সঙ্গীতসন্ধ্যা- সুভেনিরের মুখবন্ধটা লিখিয়ে নাও বেলাল চৌধুরীর কাছ থেকে, অমুকে বই লিখেছে বেলালভাইকে দিয়ে এডিট করিয়ে নাওÑ এইসব নানা হ্যাপা তাকে সামলাতে হয়েছে, তার মতো সৃষ্টিশীল একজন মানুষকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে নানা অকাজের ভিড়ে! এটা বেলাল ভাইয়ের উদারনৈতিক চরিত্রের কারণে যেমন হয়েছে, তেমনি শিল্প-সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণেও অবশ্যি হয়েছে। নিজের সৃষ্টিশীলতাকে যিনি ভালোবাসেন অন্যের সৃজনশীলতাকেও তিনি সমানভাবে দেখেছেন বলেই তাদের পেছনে সময় দিতে কার্পণ্য করেননি। এর অবশ্যি ভালোমন্দ দুদিকই আছে।

তো, সেদিন বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর, বেলাল ভাইয়ের কাছে ভয়ে ভয়েই আমার লেখা গল্পটা তুলে দিলাম তার হাতে, নগ্নিকা ও আবু হোসেন। বেলাল ভাই আমার হাতের লেখার খুব প্রশংসা করে তখন তখনই গল্পটার প্রথম পৃষ্ঠার প্রায় অর্ধেকটা পড়ে ফেললেন, এটা আমি ছেপে দেব, ছেপে দেব। তুমি মাঝে মধ্যে লেখা দিয়ো আমাকে, এটা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন, আবারও একটু যেতে হচ্ছে, তুমি কি বসবে আরেকটু? আমিও উঠে দাঁড়িয়ে বেলাল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসি। সেই যে ভারত বিচিত্রা থেকে বেরিয়ে আসা, তারপর আর কেন যেন যাওয়া হয়নি সেখানে, সে-গল্পটি ছাড়া আর কোনো লেখাও দেওয়া হয়নি! অথচ গল্পটা কী যত্ন করেই না ছেপেছিলেন বেলাল ভাই।

তারপরের দিনগুলো আর একরকম থাকে না। বদলে যায় মানুষ, বদলে যায় সময়, বদলে যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে যে একেবারে সংযোগ-বিচ্ছিন্ন থাকি, তাও নয়। একবার কর্মজীবনে প্রবেশের পর চলে যাই তার পল্টনের বাসভবনে। বেশ সময় দেন তিনি, সংবাদে প্রকাশিত আমার একটা গল্প ধরে গল্পের সুলুকসন্ধান করেন, সেদিন যে আমি কত উপকৃত হয়েছিলাম বলে শেষ করা যাবে না। কার গল্পে কীবা ধার, কার গল্পে কোথায় আঁধার, তা যেন খোঁড়াখুড়িতে মেতে উঠেছিলাম দুজন- প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিমল কর, এদিকে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মঞ্জু সরকার, কায়েস আহমেদ, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, তারপর বিদেশের অনেক গল্পকারের নাম ধরে ধরে আমাকে গল্পের যে নার্ভ বা ধমনীর স্পর্শ দিয়েছিলেন, বোধহয় আজন্মকাল আমি আমার গল্পলেখার সময় সেই আড্ডার প্রাণস্পন্দন দিতে পারবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশভারী অধ্যাপকের তত্ত্বকথার ধীরতায় নয়, সরস ভঙ্গিতে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়ানো সেই বলার ভঙ্গিমায় কত যে প্রাপ্তির খনি লাভ হলো, তার লোভে পড়ে আরও বেশ কবার গিয়েছি বেলাল ভাইয়ের বাসায়। তখনও অবশ্যি তার পড়ার জগৎ কিংবা জ্ঞানের সীমা জানার অনেককিছুই বাকি ছিল, সেটা জানার সুযোগ করে দিলেন এক সময়ের দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত।

সেটা ১৯৯৭ সাল। হাসনাত ভাই একদিন সংবাদে ডেকে নিয়ে আমাকে একটি দায়িত্ব দিলেন। কবি লেখকদের সাক্ষাৎকার নিতে হবে প্রিয় লেখক প্রিয় বই বিষয়ে। খুবই চমকপ্রদ একটা বিষয় মনে হলো আমার কাছে। আমিও সোৎসাহে শুরু করলাম সাক্ষাৎকার গ্রহণ। প্রায় তিরিশজন কবি লেখকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম সেবার। হাসনাত ভাইয়ের নিশ্চয় আগে থেকেই জানা ছিল বেলাল ভাইয়ের পড়ার সীমা-পরিসীমার গতিবিধি। তিনি আমাকে বেলাল ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নিতে উৎসাহিত করলেন। গেলাম একদিন তার বাসায়। বই নিয়ে কথা বলতে হবে শুনেই তো বেলালভাই আমোদিত। ‘জানো বই ভালোবাসি বলে যারা আমাকে ভালোবাসেন, তারা যে যেখানেই থাকেন না কেন, ভালো বই হলে সুযোগ পেলে সেগুলো তারা আমাকে পাঠান। স্নেহভাজন সৈয়দ শহীদ আছে আমেরিকায়, হাসান ফেরদৌস আছে আমেরিকায়, ওখান থেকেই ওরা আমার জন্যে বই পাঠায়, সুমন রহমান থাকে জাপানে- সে পাঠায়। ভাইপো শ্রীমান রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী আছে লন্ডনে, সেও পাঠায়। তারপর, জীবনানন্দ গবেষক ক্লিন্টন বুথ সিলি থাকেন মার্কিন মুল্লুকে। ওঁর আমার পরিচয় হয়েছিল কলকাতায়। একসময় ও পিস কোরের সদস্য হয়ে কাজ করেছিল বরিশালে। তখন আমি অবশ্যি কলকাতায়। ওঁর সঙ্গে আমার বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে দেখা। সেই সময়ে আমার চিঠিপত্র নিয়ে সে বাংলাদেশে এসেছিল। আমার দেশের বাড়িতে গিয়েছিল। ক্লিন্টন-এর সঙ্গে আমার বেশ হৃদ্যতা। সে আমাকে মাঝে মাঝেই বই পাঠায়। আমাকে পাঠানো বইগুলোর ওপর ক্লিন্টন পরিষ্কার ঝরঝরে বাংলায় লিখে দেয় ‘এই বইগুলো বেলাল চৌধুরীর জন্য পাঠানো, কেউ যদি চুরি করে নিজের লাভের উদ্দেশ্যে বেচে দেয়, সে লোকটা এবং তার চৌদ্দ পুরুষ সুদ্ধ চুলোয় (দোজখ) যাক।’ আরও পাঠান শ্রীমতী রুথ ব্রাইন, প্যারির মিরিয়াম ও ব্লয়। মুম্বাইতে থাকে বন্ধু গুলান; বেরুনো মাত্রই ও পাঠিয়েছিল অরুন্ধতী রায়ের গড অব স্মল থিঙ্কস। এমনকি আমাদের সকলেরই স্নেহাস্পদ আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন আমেরিকায় থাকাকালীন সময়ে একটি বই পাঠিয়েছিল আমার জন্য।’

বেলাল ভাইয়ের বই পাওয়া নিয়ে উচ্ছ্বাস থামতেই চায় না, ‘আমার বইভাগ্য খুব ভালো। নতুন কোনো বই বেরুলোই হলো, সেটা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, আমার কাছে খবর এসে যায়, সে-বই আমি না চাইতেই পেয়ে যাই।’ যেন বউভাগ্যের চেয়ে, অর্থভাগ্যের চেয়ে, বন্ধুভাগ্যের চেয়ে বইভাগ্যই সবচেয়ে ভালো- ভাগ্যশ্রেণির মধ্যে। আর সে প্রাপ্তিতেই এ-জীবন নিয়ে বড় তৃপ্ত বড় সন্তুষ্ট বেলালভাই। তারপর কত সব নতুন নতুন বই নিয়ে কথা, কত নতুন দিগন্তের উন্মোচন, ‘সম্প্রতি পড়লাম হোটেল মহেঞ্জোদারো। ৭১ তলা একটা হোটেল। স্থান করাচি, পাকিস্তান। সেখানে দেখানো হচ্ছে-বিজ্ঞানে, শিক্ষা-দীক্ষায়, অর্থনীতিতে, পাকিস্তানের বিস্ময়কর অগ্রগতি। তখন হঠাৎ একদিন শোনা গেল, একটি লোক চাঁদে পৌঁছে গেছে এবং সে একজন পাকিস্তানি। তো চতুর্দিকে একটা আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। গোটা পাকিস্তানজুড়ে আমোদ আহ্লাদের ঢেউ। এ ধরনের একটি ঘটনায় প্রমাণিত হলো যে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পাকিস্তান কত উন্নত। তো, চাঁদে যাওয়ার পরে, সেই চন্দ্রবিজয়ীকে তারা কীভাবে অভ্যর্থনা জানাবে এবং বিজয়ী-বীরের এই সাফল্যকে তারা কীভাবে উদ্যাপন করবে-এ নিয়ে চলতে লাগলো জোর প্রস্তুতি। কিন্তু বিধি বাম! হঠাৎ এক মোল্লা সাহেব বলে উঠলেন, ‘আরে এটা তো আল্লার কিতাবে নাই, মানুষ কী করে চাঁদে যায়? এটা তো হতে পারে না-এটা তো বেশরিয়তি আল্লা লানৎ নজদিগ’। এও বলা হলো যে, এটা বেদাতি কাজ, এটা হতে পারে না। সবাই একটু চমকে গেল। যে আনন্দের বন্যাটা বইছিল তা ক্রমে স্তিমিত হয়ে এল। এদিকে মোল্লারা পলিটিশিয়ানদের গালাগাল দিতে শুরু করে বলল যে, পলিটিশিয়ানরা ধর্মের সুরক্ষা দিতে পারছে না।

সুতরাং, এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী রাজনৈতিক দল। এইসব নিয়ে মহা হৈ-হল্লা। রাজনৈতিক দলগুলিও থমকে গিয়ে মোল্লাদের সঙ্গে তাল মেলালো। তখন মোল্লারা ফতোয়া দিতে শুরু করল। প্রথম ফতোয়া, ‘ইংরেজি নাছারা ভাষা, এটাকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’ করল নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় ফতোয়া, ‘জুমা মসজিদের উচ্চতার উপরে নতুন কোনো বিল্ডিং নির্মাণ হতে পারবে না’, এটারও সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। বোম্বিং-এ ঐ ৭১ তলা হোটেল মহেঞ্জোদারো উড়ে গেল। উড়েটুড়ে যাবার পরে-খুব সুন্দর এই জায়গার বর্ণনাটাসে জায়গাটা হচ্ছে, বিদেশ থেকে প্রচুর ট্যুরিস্ট এসেছে পাকিস্তানে। তারা এই ভগ্নস্তূপ যখন দেখছে, তখন গাইডরা তাদেরকে বলছে ‘এক সময় এখানে ৭১ তলা একটা হোটেল ছিল। এই হয়েছে, সেই হয়েছে’- তারপর আবার এক গাইড ৩ জন ট্যুরিস্টকে একটু আড়ালে নিয়ে বলছে, ‘আসলে এখানে কোনোদিন কোনো হোটেলই ছিল না, পাকিস্তানে ৭১ তলা হোটেল কখনওই হবে না’। আসলে এটাও প্রতীকী একটা ব্যাপার। পাকিস্তানের চিত্র। ফান্ডামেন্টালিজমের উপরে এরকম উঁচু মানের স্যাটায়ার আমি আর কখনও পড়িনি।

এমনি আরও কতসব নতুন নতুন বইয়ের কথা সেদিন শুনিয়েছিলেন বেলালভাই। তা একদিনে কি আর ফুরোয় বই নিয়ে তার সব কথা, আমাকে তিনদিন না চারদিন যেতে হয়েছিল বেলাল ভাইয়ের কাছে। বইয়ের প্রসঙ্গান্তরে চলে আসে আরও নানা বিষয় নানা আলোর দিক। মনে আছে প্রায় তিরিশটি সাক্ষাৎকারের মধ্যে কেবল বেলাল ভাইয়ের সাক্ষাৎকারটি একসংখ্যাতে ছাপানো যায়নি। দুটি সংখ্যায় ছাপাতে হয়েছিল। এরপর প্রায় তের বছর পর বেলাল ভাই আমার কাছ থেকে এই সাক্ষাৎকারের কপি চেয়ে নিয়েছিলেন, নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায় বইটি লেখার সময়। বোঝা গেল, নিজের সাক্ষাৎকার সমৃদ্ধ সংবাদের সেই দুটি সংখ্যা তার সংগ্রহে ছিল না। এই সূত্রেই আবার বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়। দেখলাম বয়সের ভালোই ছাপ পড়েছে, কিন্তু মনের বয়স তার একটুকুও বাড়েনি। এমনকি যে মৃত্যু, সে বেলাল ভাইকে কেড়ে নিলেও তিনি সে-রকমেরই বেলাল চৌধুরী রয়ে গেছেন তাঁর কবিতাগ্রন্থ নিষাদ প্রদেশে, বেলাল চৌধুরীর কবিতা, আত্মপ্রতিকৃতি স্থিরজীবন ও নিসর্গ, স্বপ্নবন্দী, সেলাই করা ছায়া, জলবিষুবের পূর্ণিমা, কবিতার কমলবনে, প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে, প্রাণকোকিলা, বত্রিশ নম্বর, যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে, বিদায়ী চুমুক, ভালোবাসার কবিতা, মুক্তিযুদ্ধেও কবিতা; কথাসাহিত্য গ্রন্থ স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল, ডুমুরপাতার আবরণ, চেতনার রঙ চন্দ্রশিলা, লাকসাম দাদা ও অন্যান্য গল্প; ভ্রমণকথা সূর্যকরোজ্জ্বল বনভূমি; আত্মজৈবনিক নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়; অনুবাদগ্রন্থ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুর কড়ানাড়া, তিন হাত ঘুরে, ত্রাস্তোরা, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১-৫ম খন্ড) Ñ এমনসব কর্মভাণ্ডারের মাধ্যমে। তাঁর সৃষ্টির আবেদন কোনোদিন ফুরোবে না, পুরনোও হবে না। বাংলা একাডেমি কি পারে না বেলাল ভাইয়ের রচনাবলী প্রকাশ করতে?

পুনর্কথন : পরিশেষে আমার নেওয়া সংবাদের সেই সাক্ষাৎকার থেকে বেলাল চৌধুরীর একটি মন্তব্য তুলে ধরতে চাই। বড় আক্ষেপ ছিল বেলাল ভাইয়ের এই কথাগুলো বলতে গিয়ে, ‘বই সংক্রান্ত টুকরো-টাকরা লেখা নিয়ে ‘কাগজ-কলমে’ নামে আমার একটি আট ফর্মার পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেছেন পল্লব পাবলিশার্স। এ ব্যাপারে বহু চেষ্টা করেও স্বত্বাধিকারী গোলাম আলির কাছে কোনো সদুত্তর পাইনি। তার দেখা পাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার। ব্যাপারটা আমার কাছে দিনে-দুপুরে রাহাজানির সামিল। কাফকার আঁকা একটি দুর্লভ স্কেচ দিয়ে বইটির একটি দুর্দান্ত প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন তরুণ শিল্পী ইউসুফ হাসান। বলা বাহুল্য সেটিও হারিয়ে গিয়েছে।’

এই পাণ্ডুলিপিটি কোথায় কী অবস্থায় আছে তা কি জানাবেন পল্লব পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী জনাব গোলাম আলি? সেটার সন্ধান মিললে বইপ্রেমীদের হাতে একটি চমৎকার উপহার তুলে দেওয়া যেত বলে আমি মনে করি।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares