বেলাল চৌধুরী : জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন : গ্রন্থনা : তারিক সুজাত ও পিয়াস মজিদ

শোকাঞ্জলি

বেলাল চৌধুরী : জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন

গ্রন্থনা : তারিক সুজাত পিয়াস মজিদ

জন্ম : শর্শদি, ফেনী

তারিখ : ১২ নভেম্বর ১৯৩৮

মাতার নাম : মনির আখতার খাতুন চৌধুরানী

পিতার নাম : রফিকউদ্দিন আহমদ চৌধুরী

স্ত্রী : কামরুন্নেসা চৌধুরী বকুল

পুত্র-কন্যা : আব্দুল্লাহ প্রতীক ইউসুফ চৌধুরী, সাফিয়া আক্তার চৌধুরী মৌরী ও আব্দুল্লাহ নাসিফ চৌধুরী পাবলো।

শিক্ষা : স্বশিক্ষিত।

পেশা ও জীবনযাত্রা : উন্মুল-বাউণ্ডুলে জীবনের প্রবাহে ১৯৬৩ সালে কলকাতা গমন এবং ১৯৭৪-এ মায়ের আদেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। এরপর সাংবাদিকতা এবং সার্বক্ষণিক লেখালেখি ছিল তাঁর পেশা ও নেশা। কুমির চাষ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার  পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন প্রথম যৌবনে। ছাত্রজীবন থেকে সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক পল্লীবার্তা। কলকাতার প্রবাসজীবনে সম্পাদনা করেছেন তরুণ কবিদের মুখপত্র কৃত্তিবাস, দৈনিক কবিতা। নিয়মিত লেখালেখি করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, সাপ্তাহিক দেশ ও অমৃতবাজার পত্রিকায়। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন; দীর্ঘদিন সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের মুখপত্র মাসিক ভারত বিচিত্রায়। মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম-এর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। রূপালী, সাপ্তাহিক সন্দীপ, তারকালোক, ঞড়ফধু, অনন্যা, ইত্তেফাক সাহিত্যসহ নানা পত্রপত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সাহিত্য সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা শব্দঘর-এর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বল্লাল সেনের রোজনামা (জনকণ্ঠ) ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ময়ূরবাহন, সবুক্তগীন নামের আড়ালে লেখালিখি করেছেন।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা : গত শতকের পঞ্চাশ দশকে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যেমন জেল খেটেছেন তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে।

সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা : কবিতা সংগঠন পদাবলীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা পাঠ প্রর্বতনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সভাপতি (২০০০-২০০৩) এবং উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। জাতীয় পর্যায়ে বাংলা ১৪০০ সাল উদ্যাপন পরিষদের অন্যতম সংগঠক। ঢাকায় কবি পাবলো নেরুদা এবং জীবনানন্দ দাশ জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা।

সান্নিধ্য : কলকাতার যৌবন-জীবনে বন্ধুত্ব পেয়েছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, আয়ান রশিদ খান, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, ভাস্কর চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রমুখ নক্ষত্রপুঞ্জের। নোবেলবিজয়ী অক্টাভিও পাজ, গুন্টার গ্রাস, টেড হিউজ, অমর্ত্য সেনসহ অ্যালেন গিনসবার্গ, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুব, কমলকুমার মজুমদার, রামকিঙ্কর বেইজ, পরিতোষ সেন, সোমনাথ হোড়, ইন্দ্রনাথ মজুমদার, ননী ভৌমিক, সত্যজিৎ রায়, গৌরকিশোর ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সাগরময় ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ, বাদল বসুর মতো বিশিষ্টদের ঘনিষ্ঠ সংসর্গে এসেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাভোগকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ এদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাহচর্য লাভ করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের গুণীজনদেরও সাহচর্য-বন্ধুত্ব অর্জন করেছেন অগণন।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কবিতা : নিষাদ প্রদেশে (১৯৬৪); বেলাল চৌধুরীর কবিতা (১৯৬৮); আত্মপ্রতিকৃতি, স্থিরজীবন ও নিসর্গ (১৯৭৫);  ভালোবাসার কবিতা, যৌথ (১৯৮৩); স্বপ্নবন্দী (১৯৮৪); সেলাই করা ছায়া (১৯৮৫); জলবিষুবের পূর্ণিমা (১৯৮৫); প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি (১৯৮৬); কবিতার কমলবনে (১৯৯২); যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে (১৯৯৭); বত্রিশ নম্বর (১৯৯৭); ভালোবাসার কবিতা, যৌথ (১৯৯৭); প্রাণ কোকিলা (১৯৯৮); যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে (২০০৮); বিদায়ী চুমুক (২০১০); মুক্তিযুদ্ধের কবিতা (২০১১)।

কথাসাহিত্য : ডুমুরপাতার আবরণ ; স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল (২০০১); লাকসাম দাদা ও অন্যান্য গল্প; চেতনার রঙ চন্দ্রশিলা (২০১১); দ্য গ্রেট হ্যারি এস (২০১৩)। 

গদ্যনির্ঝর : কাগজে-কলমে (১৯৯৭); মিশ্রচিত্রপট (২০০৮); একুশের ভাবনা (২০১১); জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন (২০১২); সুন্দরবন সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ (২০১১) শামসুর রাহমান- রূপালি আঙুলের ঝর্ণাধারা (২০১৩); নবরাগে নব আনন্দে (২০১৪)।

আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা : নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায় (২০১০); সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে (২০১১)।

বিশ্বসাহিত্য : মুহূর্তভাষ্য (২০০৯); পূর্ণ মণিজালে (২০১৩)।

শিশুতোষ : সপ্তরত্নের কাণ্ড কারখানা (১৯৮১); সবুজ ভাষার ছড়া (১৯৮১); বত্রিশ দাঁত (১৯৮১); সাড়ে বত্রিশ ভাজা (২০০৬); কিশোর সঞ্চয়ন (২০১০), সেরা কিশোর গল্প (২০১৫) 

ভ্রমণকাহিনী : সূর্যকরোজ্জ্বল বনভূমি।

দিনলিপি : বল্লাল সেনের ব’কলমে বেলাল চৌধুরীর রোজনামা। (২০১০)

পত্রসাহিত্য : প্রাণের পত্রাবলি- বেলাল চৌধুরীকে লেখা দুই বাংলার কবি-লেখকদের পত্রগুচ্ছ (২০১৮, সম্পাদনা : তারিক সুজাত ও পিয়াস মজিদ)।

তরজমা : জর্মন নাট্যকার মাক্স ফ্রিশ-এর নাটক এ্যান্ডোরা, জর্মন নাটক মিনা, লাতিন আমেরিকার কালজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর মৃত্যুর কড়ানাড়া,  তিন হাত ঘুরে, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১-৬ খণ্ড)। তরজমা করেছেন বোর্হেস, নেরুদা, ডিলান টমাস, অক্টাভিও পাজ, কামিলো হোসে সেলা প্রমুখের লেখাপত্র।

সম্পাদনা : বিশ্বনাগরিক গ্যেটে, জাপানি গল্প সংকলন জলের ভেতরে চাঁদ ও অন্যান্য গল্প, দুর্ভিক্ষের গল্প সংকলন লঙ্গরখানা, পদাবলী কবিতা সংকলন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ হাসান হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ (২০০০), কিংবদন্তীর কথকতা : আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩), মনিরউদ্দীন ইউসুফ স্মারকগ্রন্থ (২০০৯), পাবলো নেরুদা : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি, কণ্ঠশীলন-এর শামসুর রাহমান সংবর্ধনাগ্রন্থ (২০০৩), শামসুর রাহমান স্মারকগ্রন্থ, বিচিত্রিতা (২০০২), মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফ, গল্প কোথা থেকে আসে, কবিতায় বঙ্গবন্ধু (বাংলাদেশ শিশু একাডেমী), স্বাধীনতার কবিতা সংকলন (২০১৩), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ রচনাসমগ্র (বাংলা একাডেমি, ২০১৪)। 

পুরস্কার : রাষ্ট্রীয় একুশে পদক (২০১৩); বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪); নীহাররঞ্জন স্বর্ণপদক (১৯৯২); কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৯৫); অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার ও স্বর্ণপদক (১৯৯৭); জাতীয় প্রেসক্লাব লেখক সম্মাননা (২০০৭ ও ২০০৯); জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার; জাতীয় কবিতা পরিষদ সম্মাননা; আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার ; মনিরউদ্দীন ইউসুফ পদক (২০০৮); সংহতি গুণীজন সম্মাননা, লন্ডন (২০০৮); দৈনিক আমাদের সময় সম্মাননা (২০১৪); কৃত্তিবাস ৬০ বছর পূর্তি সম্মাননা (২০১৩); মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা (২০১২); মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার (২০১৩) ইত্যাদি।

প্রয়াণ : ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ঢাকা। 

 লেখকদ্বয় : কবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares