কবি যখন সাংবাদিক : মালেকা বেগম

শোকাঞ্জলি

কবি যখন সাংবাদিক

মালেকা বেগম

কবি বেলাল চৌধুরীকে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন কবিতার ছত্রে ছত্রে। মানুষের জন্য, দেশের জন্য, প্রকৃতির জন্য তিনি আকুলতা প্রকাশ করেছেন। সহজ-সরল জীবনযাপনের অনাড়ম্বর হাসি তিনি সকলকেই উপহার দিয়েছেন। শেষ দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন সম্ভবত সেই হাসি হেসেই। অনুমান আমার। কেননা হাসি ছাড়া সরল বেলাল চৌধুরী এক মুহূর্তও কাটাননি। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তাঁর চোখে-মুখে হাসির রেখা ম্লান হয়নি।

আধুনিক বাঙালি কবি তিনি। খ্যাতি পেয়েছেন সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রবন্ধ লেখক, অনুবাদক পরিচয়ে। ২০১৪ সালে একুশে পদক সম্মানে ভূষিত কবি চিরঅম্লান থাকবেন।

বেলাল ভাই আমাকে ‘পিসিমা’ ডাকতেন। কোন্ দূর-সম্পর্কের জের টেনে তিনি মধুর গলায় বলতেন ‘পিসিমা’- ডাকটি মধুর স্মৃতি জাগানিয়া।

মোহিত কামাল ভাই যখন তাঁর শব্দঘর ম্যাগাজিন-এর জন্য বেলাল ভাই স্মরণে একটি লেখা চাইলেন চব্বিশ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে; না করিনি। বরং এই শ্রদ্ধা নিবেদনের আহ্বানে আমি কৃতার্থ হলাম।

খুবই সাদামাটা সরল ব্যক্তি- কবি বেলাল চৌধুরীর কাছ থেকে জেনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী (মাস্টার্স ১৯২২-২৩) লীলা নাগ (যিনি প্রতিবাদ জানিয়ে নিষিদ্ধ ‘সহশিক্ষা’- চালু করেন)-এর না-জানা অনেক সাহসী রাজনৈতিক পদক্ষেপের কথা। লীলা নাগ রায় (২ অক্টোবর, ১৯০০-১১ জুন, ১৯৭০)-এর সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষদর্শী বেলাল চৌধুরীর কাছ থেকে জেনেছি দেশভাগের পর ভারতে যেতে বাধ্য হয়ে লীলা নাগ কলকাতায় কিভাবে কাজ করেছেন পূর্ববঙ্গ-ত্যাগে বাধ্য ও বাস্তুচ্যুত জনগণের জন্য। কবি সুফিয়া কামালের কাছে জেনেছিলাম ঢাকায় ১৯৪৭ থেকে ’৫০ পর্যন্ত কিভাবে লীলা নাগ কাজ করেছিলেন দেশভাগের রাজনীতির বিরুদ্ধে, দাঙ্গার বিরুদ্ধে।

তাঁর সাথে আবার এই আলোচনার সূত্রে লীলা নাগ-কে সম্পূর্ণ জানার সুযোগ হওয়ায় বেলাল ভাই-এর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

সচিত্র সন্ধানী পত্রিকায় আমার পেশাগত কাজের সূত্রে (১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ সাল) বেলাল চৌধুরী ভাইয়ের সঙ্গে জানা-চেনার সুবর্ণ সুযোগ ঘটেছিল। নানাসময়ে নানাকর্মক্ষেত্রে ছুটেছিলাম এম. এ. (বাংলা ও সমাজবিজ্ঞান) পাশ করে ১৯৬৮ সাল থেকে। ১৯৭৯ সালে তেমনি নতুন কাজের খোঁজে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই ও কাইযুম চৌধুরী বেলাল ভাইয়ের জিম্মায় বসিয়ে দিলেন অনভিজ্ঞ (সাংবাদিকতায় এবং সাহিত্যরচনায়) আমাকে। লেখালিখির প্রবণতা ছিল- দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা পত্রিকায়। বেলাল ভাই আমাকে কাজ দিলেন বিভিন্ন বিখ্যাত নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণের। ‘অপর পক্ষ’ কলামে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্ত্রী জাহানারা আবেদিন থেকে শুরু করে সংগীতজ্ঞ ফিরোজা বেগম, সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহিত্যিক আবুল ফজল-এর অন্দরমহল থেকে বহির্মহল পর্যন্ত দৌড়েছি। কাইয়ুম ভাই, গাজী ভাই, শফিক ভাই, সৈয়দ শামসুল হক ভাইয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ও সহযোগিতায় কয়েকটি কলাম লেখা সম্ভব হলো। অপরপক্ষ, শুভ্রসমুজ্জ্বল ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে বেলাল ভাইয়ের সম্পাদনায় লেখক পরিচয়ে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। তাঁর প্রতি প্রথম যেমন শ্রদ্ধা জানিয়েছিলাম, আজও তেমনি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

তাঁর বাড়িতে প্রয়োজনে যাওয়ার অনুমতি ছিল। ভাবি কামরুন্নেসা চৌধুরীকে বিরক্ত করেছি। তিনি বিরক্ত হননি। বেলাল ভাই কাজ শিখিয়েছেন, স্বাধীনতা দিয়েছেন। আড্ডা প্রিয়, কবি-সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের আকর্ষণ তৈরিতে আগ্রহী বেলাল ভাই হঠাৎ করে সচিত্র সন্ধানীর দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

আমি দায়িত্ব পেয়েছিলাম নির্বাহী সম্পাদক পদে। কাজ শিখেছিলাম বেলাল ভাইয়ের কাছে।

আমাদের বৈঠকী সম্পাদকীয় আলোচনায় যুক্ত ছিলেন সুশান্ত মজুমদার এবং আরও অনেকে। প্রদায়ক  ছিলেন বহুজন। সকলের মধ্যমণি হয়ে আছেন আমাদের  সকলের প্রিয় বীথি ভাবি।

বেলাল ভাইয়ের সান্নিধ্যে সচিত্র সন্ধানীর কাজের পরিবেশ হয়ে উঠেছিল সক্রিয়-সাবলীল এবং আনন্দময়। বেলাল ভাইকে স্মরণ করি, করব নানাসূত্রে।

হারিয়েছি গাজী শাহাবুদ্দীন ভাইকে, কাইয়ুম ভাইকে, সৈয়দ শামসুল হক-কে। হারালাম বেলাল ভাইকে। সকলের প্রতি জানাচ্ছি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা।

  লেখক : অধ্যাপক, নারী অধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares