প্রচ্ছদ রচনা : আঠারোর রূপকথা : শাহানা কায়েস

প্রচ্ছদ রচনা

আঠারোর রূপকথা

শাহানা কায়েস

এখন শুধুই ফিরে দেখা-

আমার হেঁটে বেড়ানো কন্যা, আমার আকাশ ছুঁই ছুঁই পুত্র, ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফেলে-আসা অপরূপ নিস্তব্ধ ঘোর লাগা শৈশবের ইশারা। সদ্যশ্মশ্রুমণ্ডিত পুত্র অরণ্য কলেজ আর বই নিয়ে মগ্ন। ওদের বাবা ব্যস্ত রোগী আর লেখালেখি নিয়ে। আমার কথা বলার এবং কথা শোনার অবসর একমাত্র কন্যা নক্ষত্র। আমরা দু’জনে কথা বলি বয়সের সীমারেখা ভুলে। আমরা ছবি আঁকি, বই পড়ি, ফুলপাতা কুড়োইÑ দেখি সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের রঙ। আর তখন আমার মনের মধ্যে কেবলই হারানো দিন এসে টুপটাপ জমা হতে থাকেÑ সেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বন্ধুত্বের প্যারিস রোড, আলভিজিয়ার দিঘল ছায়া, চিনেবাদাম- সিঙাড়া-আইসক্রিমের খুনসুটি।

কখনও কন্যার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজি। ও হাসে, হাত-পা নাড়িয়ে নানারঙে, নানাঢঙে, নানাগল্প করে। তখন আমাদের এই গল্প আরও জ্যোৎস্নাময় হয়, শীতার্ত হয়, রঙদার হয়। আমি ওর খেলার ঘরে যাই। সেখানে কত রকমের পুতুল, নানান নাম তাদেরÑ মাশা, শাশা, লোটি, লিসা আরও কত কি। কখনও ওকে সঙ্গে নিয়ে নদী দেখতে যাই, নদীর বাঁকে নৌকা চেনাই। কাশফুল, মাছরাঙা, ভাটিয়ালি চেনাই। জ্যোৎস্নারাতে ওকে নিয়ে বারান্দায় বসি। যে কয়েকটা রূপকথা জানি, কন্যা তা শুনতে শুনতে হাসি মুখে ঘুমোয়। কোথাও এক অচিন পাখি ডেকে ডেকে হয়রান হয়। আদিগন্ত জ্যোৎস্নার ঐ রাতও দীর্ঘ হয়। আরও দীর্ঘ, আরও নিঃসঙ্গ হয়। তখন ভাবি, কন্যাকে ডেকে বলি, অনেকদিন আগে আমার বয়স তখন আঠারো, তখন আমার ভেতর নিবিড় এক দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। যোগাযোগ হয়েছিল এক বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে। তাঁর নাম হুমায়ূন আহমেদ। তিনি আমার জন্য চিঠি লিখে লিখে অসীম এক আকাশ তৈরি করেছিলেন। সেই আকাশজুড়ে ছিল আনন্দ, বিষাদ এবং অলৌকিক এক ভালোলাগা। আমার রাজকন্যা নক্ষত্রকে মনে মনে আরও বলি, তোমাদের কালে চিঠি লেখার যুগ শেষ হয়ে গেছে কবে, আমাদের সময়ে যোগাযোগের এত মাধ্যম তো ছিল না। আমরা আমাদের চিঠির মাধ্যমে প্রিয়জনদের সঙ্গে সমস্ত আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করতাম।

আর শোনো, লেখকদের থাকে এক আশ্চর্য ক্ষমতা; শব্দ-বাক্য নিয়ে এরা অনর্গল নতুন নতুন চিহ্ন তৈরি করে; চেনা জিনিসের অন্য নাম দেয়, নাম বদলায় অথবা চেনা নামটিই অস্বীকার করে কখনও। সুবিখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে চা খেতে খেতে, পথ হাঁটতে হাঁটতে একদিন এমনি এক উপনিবেশ তৈরি হয়েছিল আমাদের ছাদে, বারান্দায় এবং বন্ধুবলয়ে। হুমায়ূনের সঙ্গে কথা হলে, শুকনো খট-খট রাস্তায়ও যেন নদীর আঁকা-বাকা জল এসে জমা হতো অনায়াসে। ছইতোলা নৌকা, মাছরাঙা পাখি, এবং স্নানরত শালিক দেখা যেত ওঁর বাক্য-শব্দের শরীর জুড়ে। দেখা যেত কালো অক্ষরের ভেতর বৃষ্টি, পাহাড় এবং সন্ধ্যাতারা। স্মরণ হয়- ওঁর গ্রন্থের, ওঁর চিঠিপত্রের, ওঁর বাক্যের শূন্যস্থানে, অনেক কাল আগে আমরা হেলান দিয়ে জ্যোৎস্না ও নবান্ন উৎসবের ছবি দেখি। দেখি গহিন সন্ধ্যা, কাকতাড়ুয়া, চন্দ্রগ্রহণ এবং বালিকা বিদ্যা। আকাশের জ্যোৎস্না রং ঘষে ঘষে আমরা সবুজ করি এবং সাঁতারে অপটু হয়েও আমরা মাছ দেখার জন্য পুকুরপাড়ে দাঁড়াই।

শব্দের এই সব ডালপালার ভেতর হুমায়ূন তখন মেসবাড়ি দেখান। দেখান- ঘুড়ি ওড়া আকাশ, শ্রাবণের মেঘ, বন পিঁপড়ে, ডোবাজল, অপ্রচল রূপকথা, নিশাচর পাখি, ক্ষমতাধর পুলিশ, রবীন্দ্রনাথ, দিঘল দীঘি, ঝরাপাতা, অনুকাব্য, আমাদের বিভ্রম, আমাদের অভিপ্রায়, আমাদের  অভিসম্পাত, আমাদের কথামালা, আমাদের সংশয়সূত্র এবং আমাদের চিঠিপত্র।

অথবা তখন আবিষ্কৃত হয় সন্ধ্যার আঁধার। হয়তো ধূসর পেঁচা এবং অগ্রহায়ণের অন্ধকার। হুমায়ূনের গল্পগাছা এবং উজ্জ্বল-অমর বাক্যরাশি চুইয়ে বিমর্ষ পাখির রং ভাসে আমাদের ঘর বাড়িতে। জ্যোৎস্নার ভেতর শব্দ এবং শব্দহীনতা বুঝতে শিখি। নক্ষত্রময় বিশাল আকাশ দেখার চোখ হয়। রৌদ্রের গন্ধ চেনান হুমায়ূন। আধো ঘুমের ভেতর শিরিষ এবং ঝাউয়ের পাতা কাঁপে। ভোরের শিশির, পুরোনো শিশিতে জমা করার খেলা শিখি, প্রিয় মৃত মানুষদের মুখ কল্পনা করে চোখ ভেজাই। কখনও মনে হয়, একদিন চমৎকার রাত এসেছিল আমাদের ড্রইংরুমে। গল্পে গল্পে সে রাতে প্রবল বাতাস এলো জানালা বেয়ে। আমরা এবং আর সবাই দুরন্ত বাতাসে দোলায়িত হচ্ছি। দিগন্তের মাথায় নদী এবং ধান ক্ষেত কল্পনা করার শক্তি হয়। হয়তো গুলির শব্দ হয়। আমাদের স্তব্ধতা নিভে আবার শান্ত হয়। দূর থেকে ইঞ্জিন গর্জনের শব্দ হয়। আমরা আবারও শব্দহীন হই অথবা শব্দমুখর হই। চাঁদ, শঙ্খমালা এবং চিতা নিয়ে হুমায়ূন ভয়ের গল্প ফাঁদেন। হয়তো আনন্দের গল্পই শোনাতে চান। রোদ দেখে ভাবি কমলা রঙ; কথা হয় মানুষের বিলুপ্ত হৃদয় এবং স্বপ্ন আকাক্সক্ষা নিয়ে। কথা হয় পথ হাঁটা নিয়ে। হাঁটাপথে চোরকাঁটা বিঁধে যাওয়ার অস্পষ্ট আনন্দ ভাসে। আমাদের বিস্ময় বাড়ে, আমরা নির্জন হই। আমরা ঋণী হই, আমরা গুঞ্জন করি, আমরা জিজ্ঞাস্য হই; এবং শেষমেষ স্বপ্নের ধ্বনিরা মিলিয়ে গেলে একদিন আবিষ্কার করি আমরা সবাই এক একটি দূরতম দ্বীপের অধিবাসী।

কন্যাকে আবার বলি, রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে তুমি তো আনন্দে হাততালি দিয়ে বলো ‘নবীন্দ্রনাথ’Ñ তো নবীন্দ্রনাথের কথা ধরেই বলি- ‘…চিঠিপত্র এত ভালোলাগে তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছেÑ প্রত্যেক অক্ষরটি পর্যন্ত একটি একটি ফোঁটার মতো করে নিঃশেষপূর্বক গ্রহণ করবার অবসর পাওয়া যায়; মনের কল্পনা ওর প্রত্যেক কথায় লতিয়ে লতিয়ে, জড়িয়ে জড়িয়ে ওঠে- বেশ অনেকক্ষণ ধরে একটা গতি অনুভব করা যায়।’

ঘুম-ঘুম কন্যার মুখে রোদ্দুর এসে পড়ে। ওর চোখে-মুখে যেন আলো এসে না পড়ে সেজন্য পর্দা টেনে দিই। পুরোনো চিঠির বাক্সটা বিছানার একপাশে রাখি। চার দশক আগের চিঠিগুলো কেমন হলদেটে, ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে গেছে। চিঠিগুলো সংগ্রহশালায় যাবে নাকি খোলাম কুচির মতো ছড়িয়ে দেব চিরকালের পৃথিবীতেÑ ধন্দে পড়ি।

চিঠির অক্ষরগুলোয় আবারও এলোমেলো উল্টে যাই- চিঠির ভেতর একদিন বিস্তর আনন্দ গান তৈরি হয়েছিল। অল্প বিস্তর আবেগপ্রবণ হয়েছিলাম আমরা, ঝগড়াও হয়তো হয়েছিল- কালো কন্যা-ফর্সা কন্যার কথা উঠেছিল। ভূতের গল্প ভেসে আছে একটি চিঠিতে। হুমায়ূন নামক একজন রসায়ন বিশেষজ্ঞ ‘সাতটি অমরাবতী’ হাতে গুঁজে দেয়ার দুর্বল প্রতিজ্ঞা করেছিলেন একদিন। কবে বান্ধবীকে লেখা চিঠি ভুল হয়ে হুমায়ূনের ডাকবাক্সে চলে যায়। কবে রাগ করে পোষ্ট অফিসে দাঁড়িয়েই দু’এক কথা লিখে ফেলেছিলাম। আমার পোষা কবুতর, বিড়াল এবং গায়ের তিল নিয়ে হুমায়ূন অদ্ভুত গল্প বানান। আর ভয় ভয় স্বপ্ন দেখা নিয়ে ঠাট্টা করেন। একদিন গ্রন্থ উৎসর্গ করার কথা বলেন; শেষমেশ কথাটি রক্ষা না হলেও আমার নাম প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৭১ নামক ওনার উপন্যাসে।

সামান্য শীত শীত, নভেম্বরে জুবেরী হাউসের ১৩৭ নম্বর রুম থেকে হুমায়ূনকে জব্দ করে বাসায় আনা হলো। সেই রাতে গল্প গুলতেকিন ভাবি হয়ে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে ওনার বাবার শহীদ হওয়ার দৃশ্যে পৌঁছে যায়। হুমায়ূনের বর্ণনা গুনে আমি যেন তৎক্ষণাৎ বন্দুকের গুলি শুনতে পাই- যেন ওঁর বাবা গুলিবিদ্ধ হয়ে চিরকালের জন্য বলেশ্বর নদীতে নিমজ্জিত হলেন। তখন যেন বারুদ পোড়া বাংলার জনপদ উন্মোচিত হচ্ছে। মানুষের আহাজারি, মানুষের পলায়ন, শরণার্থী জীবন, মানুষের ক্ষুধা, অগনিত মৃতদেহ এবং রক্তময় জলরাশি আমাদেরকে ভয়ার্ত করে।

একবার রাজশাহী এসে বাসায় না উঠে অন্য কোথাও ওঠেন। আমি খুব ভোরে ক্লাসে যাবার কথা বলে দেখা করার জন্য ক্যাম্পাসে যাই। দু’জনে ক্যাম্পাসের রাস্তায় হাঁটি। প্যারিস রোড ধরে সিলসিলায় নাস্তা খেতে যাই। উনি আমার ডায়েরির পাতায় লিখে দেন :

সে তো গাছের ফুলের মত নয়

সে তো আকাশের বৃষ্টি ভেজা সহজলভ্য চাঁদের মত নয়

সে অন্য রকম, ভীষণ অন্য রকম।

চিঠিতে অনেক রকম প্রতিজ্ঞাও করেন- মালা তুমি যেখানেই থাকো যেভাবেই থাকো আমি তোমাকে আমার একজন প্রিয় মানুষ হিসেবেই জানব। প্রিয় মানুষ, নিতান্তই কাছের একজন প্রিয়জন। জানি না ২৫ বছরের অদেখায় এইসব কথা তাঁর মনে ছিল কিনা। কখনো ভাবি হুমায়ূন কি এই কথাগুলো লিখেছিলেনÑ ‘একদিন তুমি আমার সব চিঠি ফেলে দেবে’- না ফেলা হয়নি। পরম যত্নে রাখা চিঠির গুচ্ছ, চিঠির খাম, গোছাতে গোছাতে কন্যার ঘুমন্ত চোখে আবারও চোখ রাখি। দূর থেকে ভেসে আসা পাখিদের কল্লোল শুনি। অনুভব হয়, অনেককাল আগে একটি শান্তিময়, স্বপ্নময় খুব বিস্তৃত বৃহৎ অথচ সংযত মাত্রায় বাঁধা একটি সংগীত তৈরি হয়েছিল আমার মলিন চিঠির অক্ষর ছুঁয়ে। আমার রাজকন্যা নক্ষত্রকে সেই গল্পটাই আমি শোনাতে চাই একদিন। তবে এখন নয়, ও’ আগে আঠারোয় পড়ুক তারপর।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares