প্রচ্ছদ রচনা : মানবিক হুমায়ূন আহমেদ : ফরিদ আহমেদ

প্রচ্ছদ রচনা

মানবিক হুমায়ূন আহমেদ

ফরিদ আহমেদ

এদেশের অন্তত পঁচিশ হাজার পরিবারে একটি করে বইয়ের র‌্যাক থাকবে। আর সেই র‌্যাকে সাজানো থাকবে হুমায়ূন আহমেদের বই।’ এই উক্তি যখন করেছিলেন তখন তাঁর নতুন প্রকাশিত বইয়ের বিক্রির পরিমাণ বিশ হাজারের মাইল ফলক ছুঁয়েছে। দেশের জনসংখ্যা তখন দশ কোটি। অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন লোক বিশ শতাংশ। কিন্তু মধ্যবিত্তের উপস্থিতি তখনও টের পাওয়া যেত। এই শ্রেণিই এদেশের মেরুদণ্ড। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ গ্রহণ, রাজনৈতিক দিক নির্দেশনায় বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ভূমিকা অনস্বীকার্য। হুমায়ূন আহমেদ নিজে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে এসেছেন। এই শ্রেণিকে আশ্রয় করে, ব্যবহার করেই সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার কিংবদন্তি হয়েছেন।

তখন টেলিভিশন চ্যানেল ছিল মাত্র একটি। শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন। এই মাধ্যমটি হুমায়ূন আহমেদ বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন। এই মাধ্যমটিকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক এবং নিয়মিত দুই ঈদের বিশেষ নাটক প্রচারের ফলে গ্রামে-গঞ্জে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সৃজনশীল বইয়ের বাজার তখনও ততটা আধুনিক বা সম্প্রসারিত হয়ে ওঠেনি। আমরা কয়েকজন নবীন প্রকাশক অভিজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী বইমেলা করে বইয়ের প্রচার বৃদ্ধি ও মার্কেট প্রসারের চেষ্টা চালাচ্ছি।  বইমেলায় আমরা একটি নতুন মাত্রা যোগ করলাম- হুমায়ূন আহমেদের একক বইমেলা। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেন এবং আমাদের খুব সহযোগিতা করলেন।

বাংলাদেশের বড় বড় শহরে হুমায়ূন আহমেদের একক বইমেলার আয়োজন করি আমরা। সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, বগুড়া ও ময়মনসিংহের মতো বড় বড় শহরের পাশাপাশি জামালপুর এমনকি হবিগঞ্জ ও সীতাকুণ্ডের মতো ছোট লোকালয়েও একক বইমেলার আয়োজন করেছি আমরা কয়েকজন প্রকাশক মিলে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে থানা বা উপজেলাগুলো খুবই ছোট শহর ছিল। শহর বা নগরায়নও ছিল না অনেক উপজেলায়।

হুমায়ূন আহমেদ প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে পারতেন। সাহিত্যের পাঠক তৈরি, বইয়ের বিক্রি বৃদ্ধিÑ এই ধরনের প্রচেষ্টায় নিজ অবস্থান থেকে তিনি ভূমিকা রাখতেন। আমরা যেখানেই তাঁকে নিয়ে যেতে চাইতাম, তিনি আমাদের নিরাশ করতেন না। বিড়ম্বনাও হয়েছে অনেক। তাঁকে দেখতে এবং অটোগ্রাফ নিতে প্রচুর লোকসমাগম হতো। এটা ম্যানেজ করা খুব দুরূহ হয়ে যেত। অনেক বই চুরি হতো।

বইমেলায় লেখককে উপস্থাপনের এক নতুন টেকনিক উদ্ভাবন করলাম। ‘লেখক-পাঠক মুখোমুখি’ অনুষ্ঠান। মফস্সলে যখনি বইমেলা উপলক্ষে কোনো লেখক যেতেন, তখন সেখানকার মানুষজনের মধ্যে যে কৌতূহল সৃষ্টি হতো, তা মূলত লেখককে দেখার এবং তার মুখ থেকে তার নিজের কথা শোনার জন্য। লেখক সম্পর্কে অনেক কিছু জানার কৌতূহল ও আগ্রহ তাদের। তখন তো এত পত্রিকা ছিল না যে সেলিব্রেটি, হবু সেলিব্রেটি এবং তাদের সকল আত্মীয়-স্বজনদের কথা ছাপার অক্ষরে পুরো দেশবাসীর মুখস্থ থাকবে। এই দু’টি অনুষঙ্গকে একত্রে পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য আমাদের এরকমের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা। তখন এ ধরনের বইমেলায় বা শহরে কোনো বিশিষ্ট লেখক-কবির আগমনে একটি ভারী আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সেখানে ওই শহরের প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতাবান ব্যক্তিগণ মঞ্চে সারি বেঁধে বসে থাকতেন। এসব অনুষ্ঠানে বক্তার সংখ্যা এত বেশি হয়ে যেত যে, কখনও কখনও দুই সারি চেয়ারে তাঁদের বসতে দিতে হতো।

ঢাকা থেকে আগত প্রধান অতিথিকে স্থানীয় সকল অতিথি তাদের বক্তৃতা শোনাতে চান। তাই সবাই বক্তব্য রাখবেন। খুব ছোট বক্তব্য রাখতে কেউই ইচ্ছুক নন। সব শেষে প্রধান অতিথির পালা। ততক্ষণে প্রধান অতিথি ক্লান্ত, দর্শক-শ্রোতা ক্লান্ত। বিভিন্ন মসজিদ থেকে ভেসে আসা মাগরেবের আজানের জন্য বক্তব্যে বিরতি। নামাজ পড়ার জন্যে দর্শক সারির একাংশ খালি। সন্ধ্যা হয়ে আসায় কিশোর-কিশোরীদের বাড়ি ফেরার তাড়াÑ সব মিলিয়ে যাকে দেখার জন্য, যার কথা শোনার জন্য এত অপেক্ষা করে আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, তার কথা, পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য শুনতে না পাওয়ার অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যাওয়া। এসব অভিযোগ অনেক শুনতে হয়েছে আমাদের। আমাদের মিশন হচ্ছে বইয়ের পাঠক তৈরি করা, পাঠক বাড়ানো, পাঠককে বাংলাদেশের বই পাঠে আগ্রহী করে তোলা। আমাদের লেখক, কবিদের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। এ কাজে লেখক-পাঠকের সরাসরি মেলবন্ধন তৈরি করতে চাইছিলাম। পাঠককে লেখকের কথা বেশি করে শোনার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া, লেখক সম্পর্কে আরও জানার ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়ার জন্য ‘লেখক-পাঠক মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। এখানে মঞ্চে থাকতেন একজনমাত্র বক্তা। লেখক নিজে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন সভাপতি থাকতেন। লেখক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার পর শ্রোতারা তাঁকে প্রশ্ন করতেন। লেখক সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেন। লেখালেখির স্বচ্ছতার জন্যও এটা খুব জোরালো ভূমিকা রাখতো। ঢাকার বাইরে বইমেলার আয়োজন, অনুষ্ঠান করা এবং সর্বোপরি ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য আমরা স্থানীয় কোনো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহযোগিতা নিতাম।

হুমায়ূন আহমেদ এমনিতে লাজুক স্বভাবের অমিশুক মানুষ ছিলেন। লোকজন অনেকে তাঁকে অসামাজিক বলেও দোষারোপ করত। কিন্তু যারা তাঁর কাছে আসতে পেরেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন, তারা জানতেন- হুমায়ূন আহমেদের একটা মানবিক রূপও আছে। এসব সমাবেশে প্রথমবার দেখা কিংবা স্বল্প পরিচিতদের সঙ্গে তাঁর মানবিক আচরণ উল্লেখ করার মতো ছিল।

টেকনাফে আমার প্রথম সফরেই এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল। তার নাম মনোয়ার হোসেন সাগর। টেকনাফ উপজেলা পরিষদে চাকরি করতেন। বেশ কয়েকবার টেকনাফ যাওয়ার ফলে তার সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। হুমায়ূন ভাইয়ের জন্য সেন্টমার্টিনে জমি কেনা এবং ‘সমুদ্র বিলাস’ বানাবার জন্য আমাকে প্রায়ই টেকনাফ হয়ে সেন্টমার্টিন যেতে হয়েছে। প্রবাল কচি-কাঁচার মেলার তখনকার পরিচালক মোহিত কামালের সুবাদে সে-সময় মেলার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসহ টেকনাফ উপজেলার অনেকের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হয়। হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে যখন যেতাম, তখন এসব তরুণরা আমাদের সঙ্গ দিতেন। পরবর্তীকালে টেকনাফ উপজেলার তরুণ অফিসাররা বদলি হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যান। তারা যেসব জায়গায় ছিলেন, হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে সেসব স্থানে বেড়াতে গেলে তাদের আতিথেয়তা নিতাম। তারা হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গ পেতে চাইতেন। উনিও তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেন।

মনোয়ার হোসেন সাগর বদলি হয়ে এসেছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদে। তার লেখালেখির সখ ছিল। সীতাকুণ্ডে এসে তার ইচ্ছে হলো এখানে হুমায়ূন আহমেদের একক বইমেলা করবেন। সেই সূত্রে হুমায়ূন আহমেদকে নিতে চান সীতাকুণ্ডে। ১৯৯৭ সালের কথা। সীতাকুণ্ড একটি ছোট উপজেলা। শহর বলতে কিছু গড়ে উঠেনি। সরকারি কার্যালয়গুলো নিয়ে একটি অফিসপাড়া এবং একতলা-দোতলা বেশ কিছু দোকানের সমাহারে একটি বাণিজ্যিক এলাকা। এগুলোই দৃশ্যমান ছিল। এত ছোট জায়গায় বইমেলা? তারপরও সাগরের অনুরোধে আমি সীতাকুণ্ড গেলাম। মিটিং করলাম, বইমেলার স্থান, অনুষ্ঠানের স্থান- সব কিছু দেখে, ঠিকঠাক করে এলাম। হুমায়ূন ভাইকে রাজি করালাম। সাগর তখন একটি পারিবারিক সংকটের মধ্যে ছিলেন। তার একমাত্র ছেলে স্বপ্নীল থেলাসেমিয়া মেজর রোগে আক্রান্ত। রক্তের হিমোগ্লোবিনের সমস্যা। লাল রক্ত কণিকা ভেঙে ভেঙে যায়। এ ধরনের রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা কম। খুবই ছোট বাচ্চা। তিন/চার বছর বয়স। ভারতে একবার চিকিৎসা নিয়ে এসেছে। তখন বাংলাদেশেই চিকিৎসা চলছিল। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর চট্টগ্রাম মেডিক্যালে যেয়ে রক্ত দিতে হয়। নিয়মিত রুটিন।

বইমেলার নির্দিষ্ট দিনে হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে সড়ক পথে রওয়ানা দিলাম সীতাকুণ্ড। দুপুরের পর আমাদের গাড়ি যখন উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রবেশ করল, তখন উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কোয়ার্টার থেকে মহিলা/পুরুষ প্রায় সবাই বেরিয়ে এসেছে ক্যাম্পাসে। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময়, দুপুরের খাবার, একটু বিশ্রাম। শুরুতেই যে বিষয়টি আমার নজর কাড়ল- হুমায়ূন ভাই প্রথবার এসেই সাগর পরিবারের সঙ্গে সাবলীলভাবে মিশলেন। সন্ধ্যায় চায়ের পর্বে স্থানীয় অফিসারদের সঙ্গে গল্পÑ সব শেষ করে বইমেলায় প্রবেশ। তারা জানালেন, মফস্সলে একটু রাত করে অনুষ্ঠান শুরু করতে হয়। এখানকার লোকজন সারাদিনের কাজকর্ম শেষ করে, ব্যবসায়ীরা দোকান-পাট বন্ধ করে অনুষ্ঠানে লেখককে দেখতে আসবেন। তাই তাদের জন্য একটু রাত করে অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে। তাই হলো। মিলনায়তনে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। কানায় কানায় পূর্ণ। সীতাকুণ্ড উপজেলার সব লোক চলে এসেছে বোধহয়! অনুষ্ঠান শুরু হলো। তবে বক্তৃতা পর্ব সীমিত রাখা যায়নি। উপজেলার কয়েকজন অফিসার, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি- তাদেরকেও বক্তৃতার সুযোগ দিতে হলো। সব শেষে হুমায়ূন আহমেদের বক্তৃতার পালা। তিনি বক্তব্য শেষ করে মাইকে ডাকলেন মনোয়ার হোসেন সাগরকে। সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের প্রায় সবাই এবং স্থানীয় অনেকে সাগর-পুত্রের ক্যান্সার হয়েছে বলে জানতেন। হুমায়ূন ভাই দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা জানেন, সাগরের বাচ্চা ছেলে জটিল রোগে ভুগছে। আমি তার সুস্থতার জন্য দোয়া করি। আপনারাও তার জন্য দোয়া করবেন। তবে আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া সবার আগে কবুল হয়। আমি সাগরকে মাইক দিচ্ছি। সে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করবে। আমরা সবাই তার সঙ্গে হাত তুলব।’ অপ্রস্তুত হয়ে মাইক হাতে নিলেন সাগর। কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন, বুঝতে পারছিলেন না। হুমায়ূন ভাই তাকে সাহস দিয়ে বললেন, ‘তুমি দোয়া-কালাম যা জানো তাই বলো, আর আল্লাহর কাছে তোমার ছেলের অসুখ ভালো হবার জন্য দোয়া করো। আমরা হাত তুললাম।’ বলেই হুমায়ূন ভাই হাত তুললেন।

মিলনায়তনের সবাই হাত তুললেন। সাগর কাঁপা কাঁপা গলায় সুরা পাঠ করা শুরু করলেন। এর পর মোনাজাত। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। কণ্ঠ দিয়ে কথার চেয়ে কান্নার শব্দই বেশি বেরিয়ে আসছিল। পুরো মিলনায়তন সাগরের সঙ্গে কান্নাকাটি করেছিল সেদিন। অনুষ্ঠান শেষে ডিনার করে অনেক রাতে আমরা সীতাকুণ্ড থেকে ঢাকার পথে রওয়ানা দিয়েছিলাম। এর পর সম্ভবত আর কোনোদিন ঐ পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করা হয়নি হুমায়ূন আহমেদের। এমনকী হয়তবা ওদের সঙ্গে আর দেখাও হয়নি।

পাঠকদের জানিয়ে রাখি। সেই ঘটনার বিশ বছর পরÑ এখন মাঝে মধ্যেই ফেসবুকে সাগর আর তার স্ত্রীর সঙ্গে তাদের সুদর্শন যুবক পুত্র স্বপ্রীলের ছবি দেখি। সে সুস্থ আছে দেখে আনন্দে মনটা ভরে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares