প্রচ্ছদ রচনা : তিনিই হুমায়ূন আহমেদ : মোহিত কামাল

প্রচ্ছদ রচনা

তিনিই হুমায়ূন আহমেদ

মোহিত কামাল

পাসপোর্ট ও সার্টিফিকেটে লেখা জন্ম তারিখ ১০ এপ্রিল ১৯৫০। অথচ হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮। নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে নানার বাড়িতে জন্মেছেন এই যশস্বী কথাশিল্পী। গবেষকরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। গবেষণার জন্য প্রয়োজন হয় নথিপত্রের। জন্মতারিখ ও সাল প্রমাণের জন্য প্রয়োজন এসএসসি পরীক্ষার সন কিংবা পাসপোর্ট। কেন এ ভুল, জানতেন না তিনি। বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। নিজের বইতে এই ভুলের কথা অপকটে তুলে ধরেছেন লেখক। এ কথা বলা যায়, সাদামাটা জীবনযাপনের মধ্যদিয়ে হুমায়ূনের চলার পথটি নানা বৈচিত্র্যে ভরা। রহস্যের কিছু না থাকলেও কৌতূহলের শেষ নেই পাঠকমনে। হুমায়ূন আহমেদের মতে, ‘রহস্যময় এই জগতের বিপুল রহস্যের অতি সামান্যই আমরা জানি। আমাদের উচিত এই সামান্য জ্ঞান নিয়েই তুষ্ট থাকা। বেশি জানতে না চাওয়া’-হুমায়ূনের এই কথার সঙ্গে একমত হবে না বিজ্ঞান। রহস্যের জট খুলে-খুলে এগিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞান। তথ্য-প্রযুক্তিতে ঘটে গেছে বিস্ময়কর বিপ্লব। সেই বিপ্লবের ঢেউ লেগেছে আমাদের শহুরে সংস্কৃতিতেও। সূক্ষ্মপথে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে আড়ালে, গোপনে। রহস্য ক্রমাগত টানছে আমাদের? কোথায়? সামনে, না পেছনে? ভাবতে হবে বর্তমান প্রজন্মকে।

হুমায়ূন আহমেদের বিপুল রহস্যের ধারে-কাছেও হয়ত চিন্তা করতে পারছি না আমরা, কেবল বিজ্ঞানের দেয়াল তুলে হয়ত ঠেকানোর চেষ্টা করব তাঁকে, ঠেকানো সহজ নয়। হুমায়ূন আহমেদের উক্তিও ঠেকাতে পারবে না লেখক হুমায়ূনকে। মানবমনের বিপুল রহস্যসম্ভারকে উপজীব্য করে তিনি উপহার দিয়ে গেছেন মিসির আলী সিরিজ। সেই রহস্যের মধ্যেও আছে বিজ্ঞান টপকে যাওয়া মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, আছে অতলস্পর্শী মানবতাবোধের রহস্যময় ছোঁয়া, রহস্যমন্দ্রিত ছাপ। হিমুকে দিয়েও অমীমাংসিত কল্পরহস্যের দরজায় ধাক্কা দিয়েছেন, খোলার চেষ্টা করেছেন জীবনরহস্যের মূল ফটক। এ কাজে ব্যবহার করেছেন কল্পনাশক্তি। এই ক্ষুরধার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কি তৃপ্ত ছিলেন অসামান্য হুমায়ূন আহমেদ? ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর ছোটবোন মমতাজ শহীদের লেখা পড়ে জানা যায়, রাজশাহী বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন ওই সময়ের মেধাবী কিশোর হুমায়ূন। বগুড়া জিলা স্কুলের গৌরব কিশোরটি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলেও পড়াশোনা করেছিলেন।

‘সাহিত্য সমালোচনা’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সাহিত্যবিশ্লেষণ’ শব্দটির ওপর গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন সমসাময়িক বিশ্লেষকরা। এটা বিশ্বজনীন চিত্র। এই ধারার বাইরে নয় বাংলাসাহিত্য। সাহিত্যবিশ্লেষণও এক ধরনের সাহিত্য।  সাহিত্যবিশ্লেষণ মানে শিল্পীর কাজ নিয়ে আলোচনা করা, শিল্পকে ব্যবচ্ছেদ করা, শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়। শিল্পীর দিকে অশ্লীল ভাষা ছুড়ে দেওয়া অশোভন। সাহিত্যবিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করা আমার কাজ নয়। আমার দায়িত্ব হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে একটা নিবন্ধ লেখা। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে জানাশোনা ছিল আমার। জানাশোনার সঙ্গে আবেগের একটা সম্পর্ক থাকে। আবেগতাড়িত হওয়ার বিষয় থাকে। আবেগ হচ্ছে মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। সাহিত্য রচিত হবে, আবেগ থাকবে না, আবেগ উসকে উঠলে সাহিত্য দুর্বল হবে, দুর্বল হয়ে যায়, এমন যারা ভাবেন তাদের উদ্দেশে বলছি, হুমায়ূন আহমেদ মানবমনের গূঢ়-অপার রহস্য জানতেন। আর তাই সাহিত্যের শব্দবিন্যাসের মধ্যে দিয়ে ঢুকে যেতে  পেরেছেন মানুষের অন্তজর্গতে। কলমের দোর্দণ্ডপ্রতাপে বর্ণের মালা গেঁথে যে শব্দ হয়, শব্দ থেকে যে বাক্য তৈরি হয়, সেই বাক্যটি পাঠকের কোথায় গিয়ে টোকা দেয়, কোথায় নাড়া দেয়? কেন জেগে ওঠেন পাঠক? সমসাময়িককালের সাহিত্যবিশ্লেষক তরুণ-লেখকদের প্রিয় গল্পকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কী ভাবেন হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়ে, আসুন জেনে নিই। তাঁর গল্পসমগ্র পড়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছেন, ‘আমার মনে হয়েছে, তিনি মানুষের মনের অনেক হদিস জানেন, আর সেগুলো আমাদের জানাতে পারেন।’ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের দুটো শব্দ গ্রহণ করতে চাই-‘মনের হদিস।’ ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন তিনি। এখানে কেবলমাত্র ‘মনের হদিস’ শব্দটির বিশ্লেষণ করব বিজ্ঞানের চোখে।

বাক্য বা শব্দ চোখ দিয়ে ব্রেনে চালান করে দেন পাঠক। বাক্য বা শব্দটি বিশ্লেষিত হয় ব্রেনে। এই প্রক্রিয়ায় শব্দ বা বাক্যটির অর্থপূর্ণ উপলব্ধি নাড়া দেয় বোধশক্তি। এটাকে বলে প্রত্যক্ষণ। এই প্রসেসে নাড়া খায় চিন্তন-প্রক্রিয়া, থট প্রসেস। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে থট প্রসেস। তখন উসকে উঠতে পারে আবেগও। নানা ধরনের আবেগ রয়েছে-পজিটিভ ইমোশন (ভালোবাসা, আনন্দ, সুখ, শান্তি), নেগেটিভ ইমোশন (রাগ, দুঃখ কষ্ট), অপোজিট ইমোশন (ভালোবাসা ঘৃণা), মিশ্র আবেগ (জেলাসি=ভালোবাসা+ক্রোধ) ইত্যাদি। তীব্রতার মানদণ্ডেও শ্রেণিভুক্ত করা হয় আবেগ। আবেগের পরিবর্তন, চিন্তন বা থট প্রসেসে নাড়া খাওয়ার কারণে বদলে যেতে পারে আচরণ। শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনও ঘটে যায় দেহে। থট প্রসেস, আবেগ, আচরণ, শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন এবং পরিবেশের উদ্দীপক-এই পাঁচটি ফ্যাক্টর একে অন্যের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে হদিস দিয়ে যায় মানবমনের সচেতন অস্তিত্বের । জীবনের সকল ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে। তখন কেবল দুটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না ‘মনের হদিস’। একটি ভালো সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সৃষ্টিশীল লেখক নাড়া দিতে পারেন পুরো জীবন। মনের হদিস পাইয়ে দিতে পারেন মানুষকে। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যবিশ্লেষণে সহজ শব্দের মাধ্যমে ব্যাপক মনঃবিশ্লেষণের দ্বার খুলে দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এখানে কেবলমাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

জীবনের সঙ্গে ‘সহিত’ শব্দটি ব্যবহার করে সাহিত্যের স্বরূপ বোঝাতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবনের মৌলিক স্তরে ঢুকতে পারলে, ‘সহিত’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ যথার্থতা পায়। সৃষ্টিশীল লেখকেরা জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সংযোগ ঘটাতে পারেন, অর্থাৎ কল্পনাশক্তির  মাধ্যমে  ঢুকে যেতে পারেন জীবনের মৌলিক স্তরে। মৌলিক স্তরে ঢোকা মানে জীবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানটাও ছুঁয়ে দেওয়া। অর্থাৎ লেখক নাড়িয়ে দিতে পারেন অন্তর্গত প্রেষণা-আকাক্সক্ষা, চাহিদা, উৎসাহ। চিন্তার জগত ও কল্পনাশক্তিতে ঢুকিয়ে দিতে পারেন অদৃশ্য গতি। সুদৃঢ় করতে পারেন মৌলিক বিশ্বাস, উন্নত করতে পারেন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বা সোশ্যাল কগনিশন। এজন্য সাহিত্যিকও একজন বিজ্ঞানী। যিনি ‘মনের হদিস’ দিতে পারেন সাহিত্যিক হয়েও তিনি বিজ্ঞানী, সন্দেহ নেই। এটাও একক একটি বিশ্লেষণ মাত্র।

নিবন্ধের মধ্যে একটি উপগল্প বলছি, শুনুন। এটি বাস্তব গল্প। ব্যক্তি হুমায়ূনকে বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিকও বটে।

আত্মহত্যার চেষ্টা করে বিফল হয় এক কিশোরী। আত্মীয়স্বজনরা তাকে নিয়ে এসেছে আমার চেম্বারে (লেখক একজন  মনোচিকিৎসক)। চেম্বারে মেয়েটি বসে আছে আমার সামনে। কাঁদছে সে। এক সময় কান্না থামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। কিছুতেই সমস্যার কথা বলছে না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমার সব ধরনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এক সময় আবৃত্তি করলাম :

‘কষ্টের কথা কী বলিব

কষ্ট কাকে বলে

কষ্ট হচ্ছে মনের আগুন,

বুকের মধ্যে জ্বলে।’

আবৃত্তি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকাল মেয়েটি। অথচ মেজর ডিপ্রেশন থাকলে বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না, আত্মহননের অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছার টান তৈরি হয় মনের ভেতর থেকে। এই মেয়েটিও মেজর ডিপ্রেশনে ভুগছিল। কিন্তু আবৃত্তি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো বাস্তব জগতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়ে গেছে তার। সুযোগটি কাজে লাগালাম আমি।

‘এটা কার কবিতা,  বলতে পারবে?’

প্রথমে হাঁ-সূচক মাথা দোলাল মেয়েটি। তার পর মাথা নিচু করে থাকল আবার।

‘বলো, কার কবিতা? মাথা দুলিয়ে নয়, মুখে বলো।’

এবার স্পষ্ট উচ্চারণ করল মেয়েটি, ‘হুমায়ূন আহমেদের কবিতা।’ নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্ধকার মুখে আলো ফুটল। গড়ে উঠল চিকিৎসকের সঙ্গে চিকিৎসা-যোগাযোগ ।

জানতে চাইলাম, ‘তাঁর বই পড়ো?’

‘হুঁ।’

‘ক’টি বই পড়েছ?’

মুখে হাসি ফুটল। বিষণ্ন মনের হাসি! বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয় চমকে উঠবেন। আমিও চমকালাম। মেয়েটির স্বরের জড়তা কেটে গেছে, হাসিমুখে জানাল, ‘ওনার সব বই পড়েছি আমি’।

‘হুমায়ূন আহমেদকে কিছু বলার আছে তোমার?’

‘ওনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

‘দেখা না করে কথা বললে চলবে?’

মাথা দুলিয়ে জানাল, ‘চলবে।’

সেলফোনে কল করলাম আমি। আমার নম্বরটি সেভ করা ছিল হুমায়ূন আহমেদের সেটে। মিরাকল! কল রিসিভ করলেন ‘গর্তজীবী’ হুমায়ূন আহমেদ। সংক্ষেপে মেয়েটির কথা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হুমায়ূন ভাই, কথা বলবেন মেয়েটির সঙ্গে?’

রাজি হয়ে গেলেন তিনি। অনেকক্ষণ কথা বললেন। আমি তাকিয়েছিলাম মেয়েটির মুখের দিকে-তার অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠছিল ইতিবাচক ঢেউ। উচ্ছ্বাস ঝরে পড়েছিল কণ্ঠে। হুমায়ূনের বিভিন্ন বই নিয়ে নানা প্রশ্ন করল সে। মন ভালো হতে থাকল মেয়েটির।

ওই মেয়েটি তখন এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শেষবর্ষের ছাত্রী। প্রিয় পাঠক, হয়ত ভাবছেন অতিমানব বানানোর চেষ্টা করছি হুমায়ূন আহমেদকে। মোটেই সত্য নয় আপনার ভাবনাটি। আসল সত্য হচ্ছে রহস্যের ভেতরও আছে রহস্য -সেই রহস্য জানার চেষ্টা থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারেননি রহস্যময় হুমায়ূন আহমেদ। জাদুর ছোঁয়া দিতে জানতেন তিনি। সে-ছোঁয়া দিয়ে মুগ্ধ করে গেছেন পাঠককে, পাল্টে দিয়েছেন অনেক জীবন। জীবনের হদিস কি তিনি পাইয়ে দেননি পাঠককে? লেখক হুমায়ূন নিজেকে কি দিতে পেরেছেন সেই উত্তর?

আরেকটা ঘটনা বলি : সময় প্রকাশন-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদের ব্যবস্থাপনায় নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে একবার এই যশস্বী শব্দ কারিগরের সঙ্গে গিয়েছিলাম কক্সবাজার।  আমার বন্ধু কাস্টমস কর্মকর্তা আমিনের বাসায় তাঁর নিমন্ত্রণ। খবরটি গোপন রাখা হয়েছিল। তবুও খবর রটে গেল। একটি উচ্ছল তরুণী খবর পাওয়ামাত্রই ছুটে এল। তার হাতে একটা ডায়েরি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে, তার বুক ওঠানামা করছে, হাঁপাচ্ছে সে। বিস্মিত হয়ে বড়ো বড়ো চোখ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে আছে সে।

আমি তাকিয়ে আছি মেয়েটির দিকে।

মনে হচ্ছিল সে চারপাশের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। প্রিয় লেখকের মুখের আলো স্থির হয়ে আছে তার চোখের ওপর।

মনে হচ্ছিল এই বুঝি সে জড়িয়ে ধরবে তার প্রিয় মানুষটাকে, এক্ষুনিই বিব্রত অবস্থায় ফেলে দেবে আমাদের!

না, সে তা করল না। কম্পমান হাতে  ডায়েরিটি বাড়িয়ে দিল অটোগ্রাফের জন্য। পরিচ্ছন্ন কণ্ঠে বলল, ‘আমি যদি কক্সবাজারের ডিসি হতাম, তাহলে আপনার আসার সংবাদে পুরো শহরটিকে লাল কার্পেট দিয়ে মুড়ে দিতাম।’

আমার শরীর শিরশির করে উঠল।

হুমায়ূন আহমেদও তীব্র নাড়া খেলেন। চোখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকালেন। তাকিয়েই থাকলেন কতক্ষণ। মেয়েটিও সরাসরি তাকিয়ে থাকল।

লেখক কি মেয়েটির জন্য অসম্ভব সুন্দরতম এক ভালোবাসা নিজের ভেতর অনুভব করলেন! মেয়েটি হুমায়ূন আহমেদের কাছে ঘেঁষে বসল, বসে থাকল কতক্ষণ, যেন একটু পরশ নিল প্রিয় মানুষের।

এবার উঠে দাঁড়াল সে। বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘স্যার, আপনার পা ছুঁয়ে একটু সালাম করব।’

লেখক উঠে দাঁড়ালেন, মেয়েটি পা ছুঁয়ে সালাম করল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এক বিপুল শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা লাভ করে ওই মুহূর্তে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখী তরুণী।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে একক বইমেলার উদ্বোধন করা হয়েছিল রাজধানীর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্বরে। মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল তিনটি বই- ম্যাজিক মুনশি (অন্যপ্রকাশ), হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী-৪ (অন্যপ্রকাশ), সেরা হুমায়ূন (অনন্যা)। ম্যাজিক মুনশির ভূমিকায় হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘ম্যাজিক মুনশিকে কি উপন্যাস বলা যাবে?  উপন্যাস বললে প্রকাশকের সুবিধা হয়। পাঠকরা উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন। সমস্যা হচ্ছে ম্যাজিক মুনশিকে কোনো পর্যায়ে ফেলা যাচ্ছে না। ম্যাজিক মুনশি হলো রহস্যময়তার বর্ণনা এবং কিছুটা বিশ্লেষণ। উপন্যাসের কাঠামো অবশ্যি ব্যবহার করা হয়েছে।’

ট্র্যাডিশনাল ধারার বাইরেও কিছু করার তাগিদ বোধ করতেন স্পষ্টবাদী হুমায়ূন আহমেদ। পুরোনো ফরমেট ভেঙে নতুন ফরমেট গড়ার চেষ্টাও করে গেছেন। মূলধারার সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে থেকেও নতুন পতাকা ওড়ানোর চেষ্টা করে গেছেন তিনি। ম্যাাজিক মুনশি বইতে এক পর্যায়ে হুমায়ূন আহমেদকে উদ্দেশ করে মুনশি বলছেন, ‘আপনি আমার কাছে কিছু আতর চেয়েছিলেন। এই আতর আপনার স্ত্রীর কাছে আছে বলে দিলাম না।’

‘আমার স্ত্রীর কাছে এই আতর আছে?’

মুনশি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। কোনো কথা বলল না।

ঢাকায় এসে হুমায়ূন আহমেদ জানতে পারেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনের কাছে একটা পারফিউম আছে, নাম Elizabeth Arden-যার রয়েছে অবিকল চায়ের গন্ধ। আতর ও পারফিউম নিয়ে শাওন ও হুমায়ূনের মধ্যে কথোপকথন চলছে। এক পর্যায়ে পারফিউম বিষয়ে হুমায়ূনকে উদ্দেশ করে শাওন বললেন, ‘কী করবে?’

‘কিছু করব না। কিছুক্ষণ গায়ে মেখে বসে থাকব।’

ছোট্ট পর্বটি পুরো বইয়ের নির্যাস শুষে নিয়ে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে পাঠকের মস্তিষ্কে? বিপুল বিস্ময়ে আলোড়িত হবে মন? কীভাবে সম্ভব,  চায়ের গন্ধের মতো গন্ধযুক্ত পারফিউমের খবর জানলেন কীভাবে মুনশি?

এই রহস্যের কূল নেই।

এখানে কি লুকিয়ে আছে কোনো বিজ্ঞান? ম্যাজিকসূত্র?

বর্তমান সময়ে গবেষণা চলছে ইএসপি বা ‘এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশন’ নিয়ে। ইএসপি বলতে এখন বলা হয় ‘পারসেপশন বাই মাইন্ড’ অর্থাৎ মন দ্বারা প্রত্যক্ষণ। অবিশ্বাস্য অনেক অতীন্দ্রিয় ঘটনা ঘটে যেতে পারে মন দ্বারা প্রত্যক্ষণের শক্তি অর্জনের মাধ্যমে। এখানে মনের কল্পনাশক্তিটাও চলে আসে সামনে। আলোড়িত হলেও মূল উত্তর পাবেন না পাঠক। উত্তর কি জানা ছিল হুমায়ূন আহমেদের? তা কি তিনি দিয়ে যেতে পেরেছেন উত্তর-প্রজন্মকে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares