প্রচ্ছদ রচনা : গৌরীপুর জংশন : উন্মলিত মানুষের কাহিনি : হরিশংকর জলদাস

প্রচ্ছদ রচনা

গৌরীপুর জংশন :

উন্মলিত মানুষের কাহিনি

হরিশংকর জলদাস

হুমায়ূন আহমেদ লিখিত আমার মনে ধরা উপন্যাস কোনটি- কেউ জিজ্ঞেস করলে কেন জানি চট করে গৌরীপুর জংশন- এর কথা মনে পড়ে। আমার কথা শুনে প্রশ্নকর্তা প্রথমে একটু বিচলিত হন। পরে মৃদু একটা হাসির রেখা তাঁর মুখেমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, সেই হাসির অবস্থান মুহূর্তকাল। ওই হাসির অর্থ আমি বুঝি। প্রশ্নকর্তা ভাবেন- হুমায়ূন আহমেদের এত এত খ্যতিমান উপন্যাস থাকতে গৌরীপুর জংশন কেন? নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, মধ্যাহ্ন, বাদশা নামদার, দেয়াল, জোছনা ও জননীর গল্প- এরকম নানা উপন্যাসের মধ্যে গৌরীপুর জংশন এমন কী আর উল্লেখযোগ্য? আর এই উপন্যাসটি কতটুকুই বা বড়? মাত্র ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠার উপন্যাস। আর এটাকে আপনি উপন্যাসই বা বলছেন কেন? অনেক লেখকের গল্পই তো এই চেহারার!

প্রশ্নকর্তার এসব ভাবনার মমার্থ আমি বুঝি। বুঝেও গৌরীপুর জংশন থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছা করে না। বারবার ওই জংশনে আটকে যায় মন। গৌরীপুর জংশনে নেমে দুদ- আলাপ করতে ইচ্ছে করে জয়নালের সঙ্গে। মন চুকিয়ে তার খিস্তি খেউড় শুনতে ইচ্ছে করে। আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে- ‘জয়নাল, তুমি এই গৌরীপুর জংশনে কেন?’ আচ্ছা জয়নাল, তোমার মুখ এত খারাপ কেন? কী সুখ পাও তুমি এরকম  গালিগালাজ করে?

আমি জানিÑ আমার প্রশ্নের প্রথম অংশের সে উত্তর দেবে না। শুধু ম্লান-বিষণœ একটু হাসবে। সেরকম হাসি যারা হাসতে পারে, তাদের মুখে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আর মুখে যদি উত্তর দেয়ই বা তাহলে ভদ্দরলোকদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে তাদের ক্লেদাক্ত আভাস ভেসে উঠবে। তাই জয়নালদের মতো উন্মূলিত মানুষদের ইতিহাস জানতে না চাওয়াই মঙ্গল।

আমার প্রশ্নের শেষাংশ শুনে জয়নাল চমকে আমার দিকে তাকাবে। তারপর হা হা হা করে  হেসে উঠবে। তার হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর একটা কচি কণ্ঠের হাসিও শুনতে পাব আমি। সে বজলুর কণ্ঠ। মা-বাপ মরা বজলুকেই তো তার সম্পন্ন চাচা রেলস্টেশনে ফেলে চলে গিয়েছিল। একসময় ওদের হাসি থেমে যাবে। জয়নাল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যাবে। স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ঘসাং ঘসাং করে মাথায় ডান হাতের পাঁচটা আঙ্গুল চালাবে। তারপর শিক্ষিত লোকদের মতো কণ্ঠ করে বলবে :

‘যাদের মুখ খারাপ তাদের মনটা থাকে ভালো। যা কিছু খারাপ মুখ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। জমে থাকছে না। ভদ্রলোকরা খারাপ কিছুই মুখ দিয়ে বলেন না। সব জমা হয়ে থাকে। তাদের জামা-কাপড় পরিষ্কার, কথাবার্তা পরিস্কার, চাল-চলন পরিষ্কার আর মনটা অপরিষ্কার। এমনই অপরিষ্কার যে সোডা দিয়ে জ¦াল দিলেও পরিষ্কার হবার উপায় নেই।’

ভদ্রলোকদের দু’চোখে দেখতে পারে না জয়নাল। কেন দেখতে পারে না, তার কোনো ব্যাখ্যা ঔপন্যাসিক গৌরীপুর জংশনে দেননি।  তার পরেও আমাদের বুঝতে বেগ পেতে হয় না, বিপুল ক্ষোভ পোষণ করে জয়নাল ভদ্রলোকদের ওপর। জয়নালের এই যে ছন্নছাড়া জীবন, পরিবার-পরিজনহীন নিঃসঙ্গ অভাবী জীবন, তার জন্য তো দায়ী অর্থ বন্টনের বৈষম্য। ভদ্রলোকেদের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময়, পরিষ্কার জামাকাপড় তাদের. একটা সিগারেটের জন্য, দুটো পরোটা আর এক বাটি ডালের জন্য অন্যের সামনে হাত পাততে হয় না তাদের। তাদের ধবধবে সাদা বিছানা, তাদের মাথার ওপর ফ্যান, সামান্য জরজারি হলে বড় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। কিন্তু জয়নালের কী আছে। গহিন শীতে ছালার বস্তা গায়ে জড়িয়ে কুকুরকুণ্ডলী পাকিয়ে মালঘরে বা ফ্লাটফরমের এক কোণে শুয়ে থাকে। ভদ্রলোকদের ফেলে দেওয়া সিগারেটের শেষাংশে সুখটান দেয়। আর কোনো দুর্ঘটনায় শরীরের কোনো প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে গেলে বিধাতার উদ্দেশ্যে বলে- আল্লাহ, আমারে ভালো কইরা দাও। ডাক্তার-বদ্যির কাছে যাওয়ার ক্ষমতা নেই  তাদের। উদর পূর্তির জন্য দু’চার দশ টাকা জোগাড় করতে পারে না, তার চিকিৎসা!

জয়নালের ওপর তিনমণি বস্তা পড়ল। জয়নাল কোসর-ভাঙা কুকুরের মতো হয়ে গেল। গরিবের দুর্গতি ওখানেই থেমে থাকল না। তার একটা পা শুকিয়ে দড়ি হয়ে গেল। জয়নাল ভাবে আল্লাহর কী অবিচার! পা তো কোনো দোষ করেনি, অথচ পা-টারই শাস্তি হয়ে গেল।

জয়নালের পা শুকালো কিন্তু বেঁচে থাকার আশা শুকালো না। যেভাবেই হোক পা-টাকে ভালো করে তুলতে হবে । চিকিৎসা করিয়ে আগের মতো সুস্থ করে তুলতে হবে। কিন্তু চিকিৎসা করতে  গেলে তো ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, ওষুধ কিনতে হবে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বা ওষুধ কেনার জন্য তো টাকা প্রয়োজন। জয়নাল যে কপর্দকশূন্য । কুচ্ছ পরোয়া নেহি। গরিবের গরিবি-চিকিৎসা। কী গরিবি-চিকিৎসা? কেন পেট্রোল- চিকিৎসা? সকাল-বিকাল দুবেলা পায়ে পেট্রোল মালিশ করলে জয়নালের পা-টা আগের মতো তরতাজা হয়ে উঠবে। কিন্তু  জয়নালের তিন-আঙুল পেট্রোল কেনারও টাকা নেই। তার কাছে পাঁচ টাকা অনেক টাকা। সেই টাকা জোগাড় করার মুরোদ নেই জয়নালের। তার মতো সর্বহারা মানুষরা শেষ পর্যন্ত পির বাবাদের পদতলে নিজেদের সপে দেয়। মাদার গঞ্জের পির সাহেবের লালসুতা পায়ে বেঁধে সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় বুক বাঁধে জয়নাল। সে বিশ্বাস করে, পির-ফকিররা ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করতে পারেন। তাঁদের জিন-সাধনা থাকে।

জয়নালের মতো উন্মূলিত মানুষদেরও ভরসার জায়গা আছে। বজলুর মতো নাবালকটির আশ্রয়স্থল যেমন জয়নাল, তেমনি জয়নালের মতো সহায়- অবলম্বনহীন মানুষের আশ্রয়স্থল- মালবাবু। গৌরীপুর রেলস্টেশনের মালবাবু খারাপ লোক না ভালো বুঝে উঠতে পারে না জয়নাল। মালবাবু যদি খারাপ লোক হন, তাহলে পৌষের কঠিন শীতে জয়নালের মতো ভিক্ষুক শ্রেণির মানুষটির প্রাণ যখন যায় যায়, তখন  মোটা এই কম্বলটি কেন তার দিকে ছুড়ে বলেন- ‘যা, এটা নিয়ে ভাগ। হারমজাদা বান্দীর পুলা তোরে যেন চোখের সামনে না দেখি।’ মালবাবুর এই এক খাসলত, শুধু অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। গালি দিতে পারলে তিনি খুব স্বস্তিবোধ করেন। ‘শুয়োরের বাচ্চা, চোরের ঘরের চোর, গোলামের ঘরের গোলাম- এসব গালি মালবাবুর মুখে লেগেই থাকে। জয়নালের বিবেচনায় তারপরও মালবাবুর মতো মানুষ হয় না। তিনি বুভুক্ষু মানুষের বন্ধু। অনাহারক্লিষ্ট জয়নালকে একদিন মালবাবু ডেকে দশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন, ‘জয়নাল, যা তো পাঁচ কাপ চা নিয়ে আয়।’

সেই পাঁচ কাপ চা কিন্তু জয়নাল শেষ পর্যন্ত মালবাবুর অফিসে পৌঁছায়নি। ক’বেলার অভুক্ত তখন জয়নাল। হাঙ্গর ইজ মোর পাওয়ারফুল দেন রুলার। মালবাবুর রক্তচক্ষু, গালিগালাজ-ধমকের ভয় জয়নালের সামনে থেকে উঠে গেল। সে গিয়ে ঢুকল মজিদের ভাতের দোকানে। ইরিচালের মোটা ভাত আর মলা মাছের ঝাল তরকারি দিয়ে উদর পূর্তি করে খেল সে । সাত দিন মালবাবুর সামনে দিয়ে হাঁটেনি জয়নাল। সাতদিন পর দেখা হলে দশ টাকার ঘটনা ভুলে গিয়ে মালবাবু জয়নালকে জিজ্ঞেস করল, ‘কি রে, তোর খোঁজ-খবর নাই। কোথায় ছিলি?

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে মালবাবু কি ভুলো মন? যে  মালবাবু গৌরীপুর জংশনের মালপত্র-চালানের অনুপুঙ্খ হিসের রাখেন তিনি কী করে ভুলে যান জয়নালের অপরাধের ঘটনা? পাঁচ কাপ চায়ের কথা বলেছেন, নিশ্চয় তার অফিসে মেহমান ছিল? তাহলে অতিথিদের কাছে হীন হয়ে যওয়ার ক্রোধ তো মালবাবুকে কুরে কুরে খাওয়ার কথা! কিন্তু সাতদিন পর জয়নালের সঙ্গে যখন দেখা হলো মালবাবুর, তখন তো তাঁর রাগের কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন না তিনি। উলটো জয়নালের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন।

মালবাবুদের মতো মানুষরা ঝুনা নারকেলের মতো। ভেতরে শাঁশ, মিষ্টি জল। কিন্তু ঝুনা নারকেলের বাইরে ছোবড়া, কঠিন মাল। এই ধরনের মানুষরা গরিব গুর্বাদের ভালোবাসেন মনে প্রাণে, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশ্যে দেখায় না। কোনো ছল-ছুতা অবলম্বন করে অসহায়দের পাশে দাঁড়ান মালবাবুরা। দশ টাকার ঘটনাটাও তা-ই। হয়তো জয়নালের অভুক্ত শুকনা মুখ দেখে মালবাবুর হৃদয় কেঁদে উঠেছিল। হয়তো জয়নালকে খাবারের টাকা দেওয়ার ইচ্ছেটা মালবাবুর মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মালবাবুরা তো প্রকাশ্যে দয়া দেখান না। তাই তিনি চা আনতে দশ টাকা দিয়ে ইচ্ছে করে ভুলে যান। ভুলে গিয়ে বড় তৃপ্তি পান মনে মনে। যেদিন বাংলাদেশে মালবাবুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, যেদিন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পালটে যাবে।

যে সাহিত্যকর্ম বাস্তবতালগ্ন নয়, তা নিতান্তই ঠুনকো। এই ঠুনকো সাহিত্য পাঠকরা পড়ে তাৎক্ষণিক কিছু সময় হয়তো আহা-উহু করবে, তারপর দূরে ছুড়ে ফেলবে। আর যে সাহিত্যে জীবন-ঘষা ফুলকি আছে, সেই সাহিত্যে যুগ থেকে যুগান্তরে অবগাহন করে যায় মানুষ। আমার বিবেচনায় হুমায়ূন আহমেদের গৌরীপুর জংশন সাধারণ মানুষের জীবন-ঘষা স্ফুলিঙ্গ। রেলস্টেশন মানবজীবনের হাটবাজার। এখানে জীবনের সকল ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়। হাসি-কান্না, ভালোবাসা-প্রতারণা, জিঘাংসা-রিরংসা, রাগ-আনুরাগ- সকল ধরনের কর্মকাণ্ডের মঞ্চ যেন এক একটা রেলস্টেশন। গৌরীপুর জংশনও তার ব্যতিক্রম নয়। এই উপন্যাসের অনুফার জীবনকেও অস্বীকার করেননি হুমায়ূন আহমেদ। পরিত্যক্ত ওয়াগনগুলোতে সেই আঁধার জীবনের মঞ্চায়ন। এখানে ছিন্নমূল মানুষের জীবনচিত্র যেমন পাওয়া যায়, তেমনি দেখা মেলে দেহপসারিণীদের। হুমায়ূনের লেখা থেকে চালচিত্রটা তুলে দেওয়া যাক-

‘পনেরোটার মতো মালগাড়ির পুরনো ওয়াগন বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে। এই সব ওয়াগনে দিব্যি সংসারধর্ম চলছে। একেকটা ওয়াগন একেকটা বাড়ি। এই সবই মোবারকের দখলে। সে প্রতিটি পরিবার থেকে মাসে একশ টাকা ভাড়া কাটে। ভাড়ার অংশ বিশেষ স্টেশনের বড় অফিসাররা পায়, সিংহভাগ যায় মোবারকের পকেটে। একটা ওয়াগনে কয়েকজন দেহপসারিণী থাকে মোবারক তাদের তত্ত্বাবধায়ক।’

অনুফাকে ঘিরে একদা জয়নালের একটা স্বপ্নজগৎ তৈরি হয়েছিল। অনুফাকে বিয়ে করেছিল জয়নাল। ওদের মধ্যে ভালোবাসাবাসিও ছিল। কিন্তু সেই অনুফার একদিন ঠাঁই হল বেশ্যাপাড়ায়। কেন? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশের কোনো এক গাঁয়ে জয়নালদের বাড়ি ছিল। তাদের এক চিলতে উঠান ছিল। উঠান ঘিরে আম-জাম-কাঁঠালের গাছ ছিল। সেই গাছে পাখি ছিল- টুনটুনি, দোয়েল, চড়ুই। উঠানে তৈরি হতো রৌদ্র-ছায়ার কারুকাজ। হয়তো একটা পুকুর ছিল। সেই পুকুরে সাঁতার দিত পাতিহাঁস। জয়নালের বাপের হয়তো একখণ্ড ধানি জমি ছিল। পাশের করালগ্রাসী নদীটি হয়তো এক ঝড়জলের দিনে জয়নালের সবকিছু খেয়ে ফেলল। অথবা গাঁয়ের কোনো জোতদারের চোখ পড়েছিল জয়নালের বাস্তভিটার ওপর। তাই একদিন তাদের হতে হলো- সর্বহারা, উন্মূলিত।

একদিন সর্বস্ব খুঁইয়ে জয়নালের বাপ দুজন ছেলেমেয়ে নিয়ে গৌরীপুর স্টেশনকে ঠিকানা বানাল। বৈরী পরিবেশে জয়নালের বাপ বেশিদিন টিকল না। টুপ করে মারা গেল। বোনটি ইস্টিশন মাস্টারের বাসায় কাজ নিল। মাস্টার বদলি হয়ে গেলে বোন শাহেদাও তাঁর সঙ্গে গেল। তার পর শাহেদা কোথায় যে হারিয়ে গেল এই এতদিন পরও জয়নাল তার হদিস পেল না। জয়নাল ট্রেনে ট্রেনে চা বেচল, চা-দোকানে বয়-এর কাজ করল, যাত্রীদের মালপত্র টানল। চুরিটুরিও শুরু করল। এই সব আলো-আঁধারের ভেতর দিয়ে জয়নাল জোয়ান হয়ে উঠল। জোয়ানকির তাগাদায় একদিন জয়নাল অনুফাকে শাদি করল। কঠোর প্ররিশ্রম করে করে সে দাম্পত্য জীবনটাকে সাজাতে চাইল। কিন্তু নিয়তি তা হতে দিল না। লেখকের ভাষায় ‘তিন মণি’ বস্তা পড়ে জয়নাল পঙ্গুঁ হয়ে গেল। অভাব তার ঘরে ঢুকল। প্রেম- ভালোবাসাবাসি দারিদ্র্যের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল। অনুফা মনে গভীর বেদনা নিয়ে জয়নালের ঘর ছাড়ল। ছমিরুদ্দিন রিকশাওয়ালা, কাঠমিস্ত্রির হাত ঘুরে অনুফার ঠাঁই হলো গঞ্জের দেহবিক্রির জায়গায়। মেয়েদের হাত-ঘুরে যে জীবন তা দারুণ দক্ষতায় কলমের দু’চারটি ঘষায় স্পষ্ট করে তুলেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

গৌরীপুর জংশনের এক একটি চরিত্র এক এক রকম। একটার সঙ্গে অন্যটার মিল খায় না। মোবারকের সঙ্গে হাশেমের মিল নেই, বেশ্যা অনুফার সঙ্গে ফুলি চরিত্রের খাপ খায় না। চা-দোকানদার পরিমল, সিগন্যাল ম্যান রমজান, ভিক্ষুক বেলায়েতÑ এসব চরিত্ররা আলাদা স্বভাবের । ভিন্ন ভিন্ন মেজাজে এরা কথা বলে। এই উপন্যাসের এক একটা চরিত্রকে নিয়ে আলাদা আলাদা এক একটা গল্প হতে পারে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ কম কথার লেখক। ‘অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি’ রবীন্দ্রনাথের সেই গানটির মতন যেন হুমায়ূন আহমেদ। অল্পকথার বুননে জীবনের বহু বড় বড় রহস্যকে উপস্থাপনা করেছেন তিনি তাঁর উপন্যাসসমূহে। তাঁর আধিকাংশ উপন্যাস ক্ষুদ্রকায়। ক্ষুদ্রদেহের উপন্যাসগুলো তেমনি জীবনের বিরাট রহস্যের উন্মোচন আছে। আর ওখানেই হুমায়ূন আহমেদের মুনসিয়ানা।

মানবজীবনের বেশ কিছু বাস্তব কথা লেখক গৌরীপুর জংশনে বলেছেন। দু’একটি এই রকম- কাঁচা পয়সার ধর্ম হচ্ছে মানুষের মন ভালো করা; ইস্টিশনে কেউ না খেয়ে খাকে না- ইত্যাদি।

জয়নাল চুরি করা ফ্লাস্ক বেচা টাকায় পরিমলের দোকানে খেতে বসেছে। তার পকেটে তরতাজা শতিনোট। খওয়া শেষে পরিমলকে একশ টাকার নোট দেয় জয়নাল। পরিমল খাবারের দাম কেটে রেখে ভাঙতি টাকা জয়নালকে ফেরত দিয়েছে , টাকা ফেরত পেয়ে জয়নালের মধ্যে ভীষণ এক প্রতিক্রিয়া হলো। এই প্রতিক্রিয়া হিন্দু-মুসলমানের স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে। এই প্রতিক্রিয়ার ভাষা জয়নালের নিজস্ব। সে তো অশিক্ষিত দরিদ্র মানুষ। তার বাইরে জীবনচর্যা যেমন, তার ভেতরের বাচনভঙ্গিও তেমনি চাঁছাছোলা। তার ভাবনা যেমন তার প্রকাশভঙ্গি তেমনি। কোনো রাখ-ঢাক নেই। স্পষ্ট ভাষায় সে তার জীবনদর্শন প্রকাশ করে । পরিমল ভাঙতি টাকা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার পর অনেকটা বিস্মিত হয়ে ভেবেছে :

‘(পরিমল) ভাংতি টাকা সবই ফেরত দিয়েছে। মালউন জাতের এই এক গুণ, টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুব সাবধান। মুসলমান হলে বলত, টাকা থাকুক আমার কাছে। এখন ভাংতি নাই। ভাংতি হলে নিবি। তারপর আজ দিব কাল দিব করে খালি ঘুরাত’

যে কটি উপন্যাস বহু বছর পরেও হুমায়ূন আহমেদকে চেনাবে, গৌরীপুর জংশন, তাদের মধ্যে একটি হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares