পুনর্পাঠ : কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য : খেলা : হুমায়ূন আহমেদ

পুনর্পাঠ

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য

খেলা

হুমায়ূন আহমেদ

খায়রুন্নেসা গালর্স হাইস্কুলের থার্ড স্যার, বাবু নলিনি রঞ্জন একদিন দুপুরবেলা দাবা খেলা শিখে ফেললেন। এই খেলাটি তিনি দুচোখে দেখতে পারতেন না। দুজন লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা বোর্ডের দিকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকবে; মানে হয় কোনো ? তবু তাঁকে খেলাটা শিখতে হলো। জালাল সাহেব জিওগ্রাফি স্যার, তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু। জালাল সাহেবের কথা ফেলতে পারলেন না। টিফিন টাইমে তিনি শিখলেন বড়ে কীভাবে চলে, ঘোড়া কী করে আড়াই ঘরের লাফ দেয়, গজ শুঁড় উঁচু করে কোণাকুণি দাঁড়িয়ে থাকে। জালাল সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, ব্রেইনের খেলা, বুঝলে পন্ডিত? বুদ্ধির চর্চা হয়।

বুদ্ধির চর্চা কী করে হয় নলিনি বাবু সেটা ঠিক বুঝতে পারলেন না, কিন্তু প্রথম খেলাতেই জালাল সাহেবকে হারিয়ে দিলেন। জালাল সাহেব ফ্যাকাশেভাবে হাসতে হাসতে বললেন, হেলাফেলা করে খেলেছি বলে এই অবস্থা। হবে নাকি আরেক দান?

আরেক দানের সময় ছিল না। ফোর্থ পিরিয়ডে ইংলিশ কম্পোজিশন। নলিনি বাবু উঠে পড়লেন। ক্লাসে ভালো পড়াতে পারলেন না। মাথার মধ্যে খুব সূক্ষ্মভাবে দাবা খেলাটা ঘুরতে লাগলো। এরকম তাঁর কখনও হয় না।

ছুটির পর দুহাত খেলা হলো । জালাল সাহেব শুকনো হাসি হেসে বললেন, তোমার সঙ্গে দেখি চিন্তাভাবনা করে ডিফেনসিভ খেলা দরকার।

তৃতীয় খেলাটিতে জালাল সাহেব প্রচুর চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন। তাঁর আছরের নামাজ কাজা হয়ে   গেল। খেলা চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত। দফতরি বাচ্চু মিয়া ঘর বন্ধ করতে না পেরে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। খেলার শেষে জালাল সাহেব ছোট্ট একটি নিশ্বাস ফেললেন। নলিনি বাবু বললেন, তুমি দেখি মনমরা হয়ে গেছ।

জালাল সাহেব বললেন, আরেক হাত খেল। লাস্ট দান। এইবার আর পারবে না, খুব ডিফেনসিভ খেলব।

আজ থাক। ট্যুইশনি আছে।

কতক্ষণ আর লাগবে! খেল দেখি।

শেষ খেলাটি অমীমাংসিতভাবে শেষ হলো। জালাল সাহেব ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। নলিনি বাবু বললেন, চল যাওয়া যাক।

আরেক হাত খেল।

আর না, রাত হয়েছে।

খেল তো, রাত বেশি হয় নাই।

নলিনি বাবু আবার বসলেন।।

তাঁর জয়যাত্রা শুরু হলো। নিয়ামতপুরের লোকজন কিছুদিনের মধ্যেই জেনে গেল এ শহরে অসম্ভব ভালো একজন দাবাড়– আছেন। তাঁকে কেউ হারাতে পারে না। তাঁর সেই খ্যাতি পরের পনেরো বছর পর্যন্ত অক্ষুণœ রইল।

পনেরো বছর দীর্ঘ সময়। এই সময়ে তাঁর দুটি দাঁত পড়ল। বাঁ চোখে ছানি পড়ল। এবং তিনি অ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার হিসেবে শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা দুপুরে রিটায়ার করলেন। তার বিদায় সংবর্ধনা উপলক্ষে লেখা মানপত্রে বলা হলো-‘বাবু নলিনি রঞ্জন দাবাড় জগতের একজন মুকুটহীন সম্রাট। তিনি বাংলাদেশে দাবাড় চ্যাম্পিয়ান জনাব আসাদ খাঁকে পর পর তিনবার পরাজিত করে দাবাড় জগতে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।’

কথাটি সত্যি। আসাদ খাঁর শালীর বাড়ি নিয়ামতপুর। তিনি কোনো এক অশুভক্ষণে শালীর বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন এবং কৌতূহলী হয়ে খেলতে বসেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল মফস্বলে যা হয়ে থাকে মোটামুটি ধরনের একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে সবাই মাতামাতি করে, এও সেরকম। খেলতে বসেও তার ভুল ভাঙল না। তিনি দেখলেন রোগা এবং বেঁটে এই লোকটি ওপেনিং সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না। যারা সাধারণ দু’একটা বইটই পড়ছে তারাও যেসব জানে, এ লোকটি স্বাভাবিক কারণেই সেসব কিচ্ছু জানে না। যার ফলে পঞ্চম চালের মাথায় আসাদ খাঁ নলিনি বাবুর সামনের বড়েটি নিয়ে নিলেন। তিনি অবহেলার একটা হাসিও হাসলেন। কিন্তু সেই হাসি তাঁর ঠেঁটে ঝুলে পড়ল যখন দেখলেন কৃশকায় এই বেঁটে লোকটি তার দুটি ঘোড়া নিয়ে হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আসাদ খাঁ খুবই অবাক হলেন, কিন্তু নিয়ামতপুরের লোকজন এমন ভাব করতে লাগল যে, এর কাছে হারার মধ্যে অবাক হবার কিছু নেই।

আসাদ খাঁর সে-বছর শালীর বাড়ি বেড়াতে আসার সমস্ত আনন্দ ধুয়েমুছে গেল। নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক পত্রিকায় লেখা হলো-‘নিয়ামতপুর নিবাসী প্রবীণ দাবাড়ু, খায়রুন্নেসা গালর্স হাইস্কুলের শিক্ষক বাবু নলিনি রঞ্জন বাংলাদেশ দাবাড় জাতীয় চ্যাম্পিয়নকে শেচনীয়ভাবে পরাজিত করিয়াছেন। উল্লেখ্য যে, নিয়ামতপুরের গৌরব এই কীর্তিমান দাবাড়ু বিগত দশ বৎসরে কাহারো নিকট পরাজিত হয় নাই…।’

ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্যি। নলিনি বাবু শুধু জিতেই গেছেন। অনেক দূর দূর থেকে লোকজন খেলতে আসত তার সঙ্গে। একবার দাবা ফেডারেশনের সেক্রেটারি এক বিদেশীকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। এতবড় ঘটনা নিয়ামতপুরে আর ঘটেনি। যারা দাবা খেলার কিছুই বুঝে না, তারাও এসে ভিড় করল। টিফিনের পর খায়রুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল ছুটি হয়ে গেল। ফেডারেশনের সেক্রেটারি দু’বার বললেন, আপনি খুব সাবধানে খেলবেন। যাকে নিয়ে এসেছি তিনি বেলজিয়ামের লোক। খুব উঁচুদরের খেলোয়াড়।

আমি সাবধানেই খেলি।

তাড়াহুড়া করে চাল দেবার দরকার নোই, বুঝলেন?

নলিনি বাবু মাথা নাড়লেন, বুঝছেন ?

এঁর সঙ্গে গিয়োকো পিয়ানো ডিফেন্স খেলাই ভালো। সেই ডিফেন্স জানেন তো? জি-না। জানি না।

সেক্রেটারি সাহেবের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। সেই কুঞ্চন আরও গাঢ় হলো যখন দেখলেন, নলিনি বাবু পিকে ফের-এর উত্তরে আর ফোর দিয়ে বসে আছেন।

কী করেছেন আপনি? এঁর সঙ্গে এক্সপেরিমেন্ট করছেন নাকি? এটা কী দিলেন?

সাহেবটিও ইংরেজিতে কী যেন বলল। বাবু নলিনি রঞ্জন ইংরেজির শিক্ষক, কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন না। সেক্রেটারি সাহেব মুখ কালো করে বললেন, প্রশিক্ষণহীন প্রতিভা দেখাতে নিয়ে এসে বড় বেইজ্জতীর মধ্যে পড়লাম দেখি।

খেলা হলো তিনটা। একটি ড্র হলো, দু’টিতে নলিনি বাবু জিতে গেলেন। সেক্রেটারি সাহেবের বিস্ময়ের সীমা রইল না।

আপনি ঢাকাতে খেলতে আসেন না কেন?

ট্যুইশনি আছে। তাছাড়া শরীরটা ভালো না। হাঁপানে।

আরে না না। আপনি আসবেন ভাই।

দরিদ্র মানুষ, টাকা-পয়সা নাই।

আরে আপনে আবার কিসের দরিদ্র?

সেক্রেটারি সাহেব  জড়িয়ে ধরলেন নলিনি বাবুকে ।

কাজেই শ্রাবণ মাসের মেঘলা দুপুরে বাবু নলিনি রঞ্জরনের বিদায় সংবর্ধনায় বারবার ঘুরেফিরে দাবাড় কথা এল। এবং সভার শেষে সভাপতি, স্কুল কমিটির সেক্রেটারি ও পৌরসভা চেয়ারম্যান, সরুজ মিয়া অত্যন্ত রহস্যময় ভঙ্গিতে ঘোষণা করলেন যে, নিয়ামতপুরের গৌরব দাবাড় অপরাজেয় নক্ষত্র বাবু নলিনি রঞ্জনের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের জন্য তিনি একটা ব্যবস্থা করেছেন। পনেরো হাজার টাকার একটি চেক দিচ্ছেন স্কুল ফান্ডকে। যদি কেউ নলিনি বাবুকে হারাতে পারে তাহলে তাকে এই টাকাটি দেয়া হব্ আর যদি কেউ না পারে, তা হলে স্কুল ফান্ড নলিনি বাবুর মৃত্যুর পরে এই টাকাটা পাবে।

সভায় তুমুল করতালি হলো। হেডমাস্টার সাহেবকে পনেরো হাজার টাকার চেকটি উঁচু করে সবাইকে দেখাতে হলো। সরুজ মিয়া যে এমন একটি নাটকীয় ব্যাপার করতে পারেন তা কারো কল্পনাতেও আসেনি।

আশ্বিন মাসের এক সন্ধ্যায় নলিনি বাবুর হাঁপানির টান খুব প্রবল হলো। বাতাস তার কাছে ক্ষীণ মনে হলো। ফুসফুস ভরাবার জন্যে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর গলার কাছে একটা রগ বরাবর ফুলে উঠতে লাগল। এই আবস্থাতেও তিনি তাঁর জীবনের শেষ খেলাটি খেলতে বসলেন। এই খেলাটি তিনি খেলবেন হারবার জন্যে। তিনি আজ হারবেন তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু জালাল সাহেবের কাছে। জালাল সহেব পনেবো হাজার টাকা জিতে নেবেন। সেই  টাকায় নলিনি বাবুর চিকিৎসা হবে। শীতের জন্য গরম কিছু কাপড় কিনবেন, শীতে বড় কষ্ট হয় তার।

খেলা হচ্ছে স্কুলঘরে। জালাল সহেব চ্যালেঞ্জের খেলা খেলছেন। অনেকেই এসেছে কৌতূহলী হয়ে। নলিনি বাবুর অবস্থা খারাপ হতে লাগল। একটা ভুল চালে তাঁর গজ খোয়া গেল। তার কিছুক্ষণ পর একটা নৌকা পিনিড হয়ে গেল। অস্ফুট গুঞ্জন উঠল চারদিকে। নলিনি বাবু দেখলেন জালাল সাহেবের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। পনেরো বছরের অপরাজেয় দাবা চ্যাম্পিয়ন আজ পরাজিত হতে যাচ্ছেন। জালাল সাহেবের মুখ অস্বাভাবিক বিবর্ণ। চাল দেবার সময় তাঁর হাত কাঁপতে লাগল।

হোমিওপ্যাথ ডাক্তার সোবাহান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, নলিনি বাবুর অবস্থা তো খুব খারাপ।

জালাল সাহেব ধারা গলায় বললেন, সব আমাদের নলিনির ভান, দেখবেন এক্ষুনি সব ঠিক করে ফেলবেন।

নলিনি বাবু ক্ষীণস্বরে বললেন, তুমি কাঁদছ নাকি জালাল?

না। চোখে কী যেন পড়ল।

জালাল সাহেব চোখের সেই অদৃশ্য জিনিসটা বের করবার জন্যে চোখ কচলাতে লাগলেন।

ক্ষীণ একটি হাসির রেখা কি দেখা গেল নলিনি বাবুর চোখে? তিনি ঘোড়ার একটি কিস্তি দিলেন্ রাজা সরে এল এক ঘর। দ্বিতীয় কিস্তি দিলেন বড়ে দিয়ে, রাজা আরো এক ঘর সরল। নলিনি বাবু যেন অদৃশ্য কোনো নগরী থেকে তাঁর কালো গজটি বের করে আনলেন। সোবাহান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কী সর্বনাশ! নলিনি বাবু গজটা বড়ের মুখে এগিয়ে দিয়ে বললেন, কিস্তি।

জীবনের শেষ খেলাটিতে বহু চেষ্টা করেও তিনি হারাতে পারলেন না। সহায় সম্বলহীন অসহায় প্রায় বিনা চিকিৎসায় নিয়ামতপুরের গৌরবের মৃত্যু হলো ১২ই নভেম্বর ১৯৭৫ সন। রোজ মঙ্গলবার। খায়রুন্নেসা গার্লস স্কুলে সে উপলক্ষে দুদিন ছুটি থাকল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares