আনোয়ারা সৈয়দ হকের এক ঝলক অলীক পিদিম শিখা : মোহিত কামাল

প্রচ্ছদ রচনা : বরেণ্য সাহিত্যিকদের জন্মদিনে শব্দ-আড্ডা

আনোয়ারা সৈয়দ হকের

এক ঝলক অলীক পিদিম শিখা

মোহিত কামাল

সমারসেট মম ভারতবর্ষ ঘুরে-বেড়িয়ে যে-শাদাকালো স্থিরচিত্রের মতো স্থানীয় আধিবাসীদের রোদে ঝলসানো গাত্রবর্ণ ও সংক্ষিপ্ততম পোশাকের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অবিকল অটুট ছিল, এই বাংলায়। কিন্তু অন্ধকারের যে-বর্ণনাটি বাংলাসাহিত্যে প্রায় বিরল, যা গ্রামীণ জনপদের বিদ্যুতায়নের আগে, কেবলই বিশ শতক পর্যন্তই আটুট ছিল এবং তা বিশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে, হাজার হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনশীল সেই চিত্রটিকে ভাষায় তৃষিতা উপন্যাস এঁকে দেখিয়েছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক: ‘… ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে ভীষণ ইচ্ছে করে- মাঝরাতে, ঘুমের ভেতর থেকে উজ্জীবিত আকাক্সক্ষায় উঠে বসি বিছানায়, অন্ধকার ঘরে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকি ঘণ্টার পর  ঘণ্টা- পাশে রুমমেটের কাতর নিঃশ্বাস পতনে শব্দ শুনি উন্মুখ হয়েÑ তারপর ধীরে ধীরে স্থির লক্ষ্যে এগিয়ে গিয়ে খুলে ফেলি দরোজা। কোথায় যাব, কি করব, কিচ্ছু জানি নে, শুধু জানি- আমাকে হাঁটতে হবে। সামনে, সকলকে ছাড়িয়ে, সব কিছু পেছনে ফেলেÑ অন্ধকার, হতাশা, মনোবিকার, অস্থিরতা- হাঁটতে হবে আলোর পিছু পিছু। সে আলো কোথায় জানি নে, কি সে আলো, তার রং কেমন তাও জানি নে, শুধু হাঁটব, তার অস্তিত্বের আভাসকে কল্পনা করে। শহর ছাড়িয়ে, জনপদ ছাড়িয়ে, নিঃশ্বাস ছাড়িয়ে, শব্দহীন অন্ধকারের ভেতর থেকে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পড়তে দেখবÑ দূর, বহুদূর গ্রামে গোলপাতার ছাউনী ঘেরা বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে ছোট্ট টিমটিমে এক কেরোসিন বাতি জ্বলছে, নিভু নিভু হচ্ছে। নিভছে না। সেই বাতির নিশানা করে আশায় উজ্জীবিত হয়ে যখন আমি সেখানে পৌঁছুব, তখন রাত গভীর; বাচ্চারা উদোম গায়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দাওয়ায়, বাঁশের মাচার নিচে মাটির চুল্লীর ওপরে টগবগ করে ফুটছে জাউÑ মাটি সোঁদা গন্ধে সুরভিত হচ্ছে উঠোন, বাড়ি, বাঁশ বাগান; নারকেল গাছের চওড়া ছড়ানো আবছা ছায়া মৃদু মৃদু উঠোনে, কুয়োর পাড়ে ধান সেদ্ধ করবার মাটির জালাগুলোকে মনে হচ্ছে ঠিক যেন ছোট বেলায় গল্পে শোনা সেই ডাইনি বুড়ির পোঁটলা। আমি সেখানে পৌঁছে, দাওয়ার এক পাশে গল্পেরত ঝিমুনো বুড়োদের মাঝখানে কাঁধের ঝোলা অতি কষ্টে নামিয়ে রেখে বলব, ‘আঃ বড্ড দূর থেকে এসেছি। এই বাতিটুকু চোখের সামনে না দেখতে পেলে হয়ত আর এখানে পৌঁছুতে পারতাম না।… আহা ভারী সুগন্ধ বেরিয়েছে, ছোটবেলার কথা মনে হচ্ছে, জাউ রান্না হচ্ছে বুঝি!’

আনোয়ারা সৈয়দ হকের গদ্য আখ্যানের কেন্দীয় চরিত্র উদ্ভিন্নযৌবনা তুলি (রাহিজা)। আবহমানকাল ধরে আদিগন্ত সমতলচরাচরব্যাপী সোনালি গোধূলি-ক্যানভাসকে কালো কালিতে চোব্রানো তুলির আঁচড়ে ঢেকে দিয়ে, সেই আন্ধারের পটে আনোয়ারা জ্বালিয়ে দিয়েছেন সোনালি পিদিম শিখা। মাটির সোঁদা গন্ধে সুরভিত উঠোন, বাড়ি, বাঁশ বাগান, নারকেল গাছের ছড়ানো আবছায়া পেরিয়ে কেবলই পিদিম শিখাকে নিশানা করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর মানসব্রত ধারণ করেন তুলি। এই তুলি-চরিত্রটির বরাতে উপন্যাসিক আনোয়ারা সৈয়দ হক এক ঝলক অলীক পিদিম শিখা এঁকে দেখিয়েছেন আমাদের হাজার-হাজার বছরের সুগন্ধ ভরা ভাত ও জাউয়ের ঐতিহ্যের ইন্দ্রজালিক দৃশ্যকল্প। যা কেবলই লেখকের কথন-উপকথন নয়, লেখক ধারণ করেন তা নিজ মর্মমূলে এবং কাল থেকে কালে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি আরও আরও ছবি আঁকেন অবিনশ্বর দৃঢ়তায় :

তোমাকে পাবো বলে, জেনে রেখো,

আমি বিসর্জন দিয়েছি আমার যাবতীয় অর্জন।

জেনে রেখো , আমার ভালোবাসার রক্তিম ছবি

 তোমার কপালে টিপ হয়ে জ্বলে

সবুজ আঁচলে আমার স্নেহটিকে আমি উড্ডীন করেছি বাতাসে

তোমাকে পাবো বলে,

জেনে রেখো,  আমি সাহসী হয়েছি।

নদ- নদী- সরোবর, অজস্র, অসংখ্য গহ্বর পার হয়েছি অবিরত

আমি কাদায়  লেপ্টে থেকেছি দিবারাত তবু তোমার স্বপ্ন দেখা  ছাড়িনি

আমি সংঘাতে সংঘাতে ছিঁড়ে ফেলেছি উন্মাতাল সব দিন,

বেহেড মাতালের স্নায়ুতন্ত্র, নারকীয় সব উল্লাস, বেয়োনেট, ত্রাস,

আমি খুঁড়ে তুলেছি কবর তাদের মিথ্যাকে শোয়াবো বলে

আমি ধৌত করেছি কালের কালিমা

আমার ভগ্নীর রক্ত দিয়ে তোমাকে স্নান করিয়ে আমি চলেছি নগ্ন পায়ে

সবুজ ও লালের ভেতরে আমার স্বপ্নকে জড়িয়ে নিয়ে

এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল পতাকাটিকে আকাশে ওড়াবো বলে

[তোমাকে পাবো বলে/ আনোয়ারা সৈয়দ হক]

২.

যদিচ তাঁর কাহিনিটি নিরাভরণ, চপলচরণ দু’পায়ে চলার মাধুর্যনির্ভর নাগরিক চিত্রনাট্য। তুলি  মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। তাঁর জীবনে প্রেম এসেছে। মুশতাক। একজন লেখক। সে তুলিকে ভালোবাসে। তুলিও ভালোবাসে মুশতাককে। তুলি ভাবে : ‘এসব কোনদিনও সত্যি হবে না। এ  কেবল মেয়েমানুষ হয়ে জীবন উপভোগ করবার কল্পনা- যে জীবন বর্ণময়, গন্ধময়, রোমাঞ্চকর এবং যে জীবন উপভোগ করবার সাহস বোধকরি কোনদিন হবে না।’ তুলির এই হৃদয়বৃত্তি শতদল পাপড়ি মেলতে চায়। তুলি ভাবে তার মুশতাক আছে। কিন্তু সুদর্শন পাঞ্জাবি যুবক ফাররুখ তুলির রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে অনুষ্ঠান শেষে তুলির সঙ্গ খুঁজে-পেতে দেখা করে। এই একতরফা দেখা করার বিরাম নাই। এদিকে মুশতাক যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। ঝোঁক চাপলে তুলি নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। তুলিকে পরামর্শ দিয়েছে মুশতাকÑ নিজেকে  স্থির রাখতে  পারাটাই নাকি বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু সমগ্র উপন্যাসে তুলি এই বুদ্ধির কাজটুকু করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা কি নারী-চরিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য? কুমকুম, লিলি, হাসিনাসহ সহপাঠিনীদের সঙ্গে যে শিক্ষাজীবন চলমান ছিল, তুলির সমুখে তার নিরুপদ্রুব পেমপ্রবাহ দ্বিধাবিভক্ত করে দেয় মিলি চৌধুরীর উপস্থিতি, যে মিলি চৌধুরী মুশতাকের পূর্ব পরিচিতা কিম্বা প্রেমিকা। এসব টানাপড়েন এক নাটকীয় অস্থিরতার জন্ম দেয় তুলির জীবনে। কিন্তু একসময় স্থিরতা ফিরে-পাওয়া তুলি নিজেই ফিরে আসে মুশতাকের বাড়িতে। এখানেই কাহিনি চরম পরিণতি পায়। চরম নাটকীয়তার মুখে মুশতাক তুলিকে কক্ষে বন্ধ করে পাশাপাশি বসে। তুলির কোনও ভয় নাই। মুশতাকেরও কোনও আগ্রাসী ঔদ্ধত্য নাই। আছে দুজনের চরম বিরক্তিকর মুহূর্তের মাঝেও অটুট অবিনাশী প্রেম। তারা কথা বলেÑ পাশাপাশি শুয়ে। তুলি প্রস্তাব দেয় সাতদিনের মধ্যেই বিয়ের আয়োজনের। তাদের কথন-উপকথনের মধ্য দিয়ে মুশতাক তার দার্শনিক ভাষ্য প্রকাশ করে। আর এভাবেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটে। তৃষিতা উপন্যাসের এ ভাষ্য চরিত্রদের স্বকীয় অভিজ্ঞতালব্ধ এক মূল্যবান সংযোজন : ‘মুশতাক ধীর গলায় বলল, ‘তুমি আমাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে অনেক ভেবেছি। রাতদিন ভেবেছি। ভেবেছি মৃত্যু কি? মৃত্যু হচ্ছে এই মহাজীবনেরই একটা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড। এক থেকে অন্য এক রূপান্তর। সেই হিসেবে সত্যিকারের মৃত্যু কখনওই নেই। আর ভালবাসা কি? ভালবাসা বলে কিছু নেই। স্থায়ী কিছু নেই। ভালোবাসা হচ্ছে, এই তুমি যেমন এখন আমার চোখের সামনে। এই বর্তমান। বর্তমানের এই মুহূর্তে। মুহূর্তের এই অনুভব।  এই আকুলতা। এই দেহ ও মনকে এই মুহূর্তে ছুঁয়ে যাবার বাসনা। এবং এ এমন একটা জিনিস যা আজ থেকে কাল, কাল থেকে পরশু রং পাল্টাচ্ছে। মিলির জন্যে আমার যে ভালবাসা তা বর্তমানে এক রূপান্তরিত শিলা। তার অবয়ব আছে কিন্তু আবেগ নেই। তা অনুভবহীন, শীতল। হয়ত সেই অর্থে আমি তোমাকেও একদিন ভালবাসব না। আমি কাউকেই আর একদিনও ভালবাসব না তুলি। সেদিন আর কোন বিচ্ছেদ আমাকে বিচলিত করবে না। কোন আক্ষেপও আমাকে আচ্ছন্ন করবে না অপরাধবোধে।’

জীবনের অগ্রগামী যাত্রাপথের শেষ নিঃশ্বাস মৃত্যু। তারপর কী? তারপর মহাজীবন। মহাজীবনের প্রবেশপথই মৃত্যু। ট্রানজিশনাল পিরিয়ড। শেষ বলে কিছু নেই। রূপান্তর ঘটে কেবল। জীবনের এ রূপান্তর অনিবার্যÑ এসব দর্শন-কথনের ভেতর লুকিয়ে আছে জীবনের প্রাণশক্তিও। শক্তির ক্ষয় নেই, লয় নেই। এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে তার রূপান্তর ঘটে। এ প্রক্রিয়ায় জীবনের নির্যাস অর্থাৎ ‘সময়’-এর যথাযথ ব্যবহার করে কর্মের মাধ্যমে অনন্ত সময় বেঁচেও থাকতে পারে মানুষ। তাই তো শব্দশৃঙ্খলে বেঁধে মুশতাক বলতে পারে, ‘সত্যিকারের মৃত্যু কখনোই নেই’।

৩.

সুখে-দুখে উপভোগ্য জীবনের আরেকটা অনিবার্য সত্য ‘আবেগ’।এটা সহজাত। ভালোবাসা. স্নেহ-মমতা, সুখ-আনন্দ, রাগ-ক্রোধ, ঈর্ষা-হিংসা ঘৃণা এসব আবেগের উদাহরণ। ভালোবাসাও এক পজিটিভ ইমোশন, ইতিবাচক আবেগ। এটাও একধরনের শক্তি, মনের শক্তি। মনের এ তীব্র টান, মনের আকুলতা-ব্যাকুলতা লুকিয়ে থাকে অন্তর্গত শক্তি বা তাড়না, ‘ইনার ফোর্সে’র মধ্যে। এ ভালোবাসা নিয়ে মুশতাক বলছে, ‘ভালোবাসা বলে কিছু নেই। স্থায়ী কিছু নেই।’

কী ভয়াবহ কথা! এমন কথা পড়তে গিয়ে চমকে উঠবেন পাঠক। এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে? আসুন বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে একবার ছিঁড়েখুড়ে দেখার চেষ্টা করি মুশতাকের কণ্ঠে উচ্চারিত এ দর্শনতত্ত্ব।

ভালোবাসার আছে নানা রূপ। সন্তানের জন্য ভালোবাসা, স্নেহমমতা কিংবা পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি, ভাইবোনের জন্য  আকর্ষণ ‘জেনেটিক কোড’ দ্বারা প্রভাবিত হয়। বার্ধক্যে বেঁচে থাকার আকুলতা কিংবা নাতি-নাতনিদের প্রতি নির্ভরতাÑ সবকিছুই একই আবেদনে অন্তর্লীন। কার জন্য কী ধরনের অনুভূতি বা ভালোবাসা পরিচালিত হবে সুশৃঙ্খলভাবে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রিত হয়। যৌবনেও প্রণয়যুক্ত হওয়ার ভেতর রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ। আর স্নায়ুতন্ত্র তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত :

অনুভাবক অংশ : যেমন চোখ, কান, ত্বক, নাক ও জিহ্বা। চোখ দিয়ে নর দেখে নারীর সৌন্দর্য, ধারালো শরীর, কমনীয়তা। নারী দেখে নরের সুঠাম দেহ, ব্যক্তিত্ব। কান দিয়ে উভয়েই শোনে মিষ্টি মধুর শব্দ অথবা উত্তেজক আহ্বান। ত্বকের স্পর্শে একটা আদিম অনুভূতি জাগে উভয়ের মধ্যে। শরীরের গন্ধ একে অপরকে করে সম্মোহিত। দেখা, শোনা, গন্ধ ও স্পর্শের উপলব্ধি বা তথ্যগুলো সরাসরি এসে জমা হয় ‘কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে’। এটি মূল অংশ। ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ড নিয়ে গঠিত। এখানে জমাকৃত তথ্য এবং অনুভূতিগুলো বিশ্লেষিত হয়। সুযোগ ও পরিবেশ অনুযায়ী করণীয় সিদ্ধান্ত স্থির হয়। সিগনাল তখন চলে যায় ‘গতিবিধায়ক’ অংশে। এ অংশের মাধ্যমে উদ্ভূত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত গতিতে শরীরের বিশেষ স্থানে পৌঁছে যায়। পজিটিভ সিগন্যাল পেলে আসক্তি বাড়ে। কাছাকাছি থাকার, মুখোমুখি বসে থাকার ইচ্ছা জন্মে। এ ছাড়াও রয়েছে ‘অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম’। এ স্বয়ক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র অবচেতন অনুভূতি চিন্তা-চেতনার ওপর কাজ করে। ইন্টারনাল অর্গান যেমন হৃৎপিণ্ডের কাজ এবং গ্রন্থিগুলোর হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিক মাত্রার যৌন হরমোন পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রভাবিত হয়, স্বাভাবিক যৌন আকর্ষণের ওপর ভূমিকা রাখে। শারীরিক গড়ন, কামতৃষ্ণা ছাড়াও রোমান্টিক আবেগ- অনুভূতির সঙ্গেও রয়েছে ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরনের গোপন খেলা। রাসায়নিক উপাদানের বিক্রিয়ার ফলে প্রেম, ভালোবাসা এবং মানবিক অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা আমরা লক্ষ্য করেছি তুলি ও মুশতাকের জীবনসত্তায়; সম্পর্কের গভীরতায়। মুশতাক আগ্রাসী ঔদ্ধত্য নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। তুলিকে উপদেশ দিয়েছে নিজেকে স্থির রাখার; আবেগের প্লাবন রোধ করে বুদ্ধি খরচ করে পথ চলার। এখানে আমরা দেখেছি মুশতাকের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। আর আবেগের টানে চলতে গিয়ে বুদ্ধির ধার কমে গেছে তুলির, তাও দেখেছি সমগ্র উপন্যাসে।

 কিছু কিছু রাসায়নিক উপাদান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। এই উপাদানগুলো হচ্ছে : এমফিটামিনস, ফিনাইলইথাইলামিন বা পি পদার্থ, নরইপিনেপ্রিন, এন্ডোরফিনস, অক্সিটোসিনন সেরোটোনিন, এসব। চকিত চাহনি, হাসির মোহনীয় আবেদন কিংবা হঠাৎ স্পর্শে মস্তিষ্কের ভেতর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমফিটামিনসের নিঃসরণ ঘটে যায়- ফিনাইলইথাইলামিন বা ‘পি পদার্থ’ ও নরইপিনেপ্রিনের মাত্রাও চকিতে ছলকে ওঠে, ভালোলাগা কিংবা ভালোবাসাবোধও ঢেউয়ের মতো জেগে ওঠে তখন। কিন্তু একই মুখ একই চোখ, একই স্পর্শে পি পদার্থের নিঃসরণের মাত্রা দীর্ঘদিন একই রকম উচ্ছ্বাসময় থাকে না। সময়ের পরিক্রমায় এটির নিঃসরণের মাত্রা এবং প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা হ্রাস পায়। ভালোবাসার উত্তাল জোয়ারে তখন চলে আসে ভাটির টান। এই পুলকের নিম্নগতি শুরু হলেই বিচ্ছেদের অশনিসংকেত বাজতে থাকে। এটি মূলত পশ্চিমের ট্রেডিশন, বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা অশান্তি তখন অনিবার্য সত্য হিসেবে হাজির হয়। শরীর-মনের পুলকিত তাগিদ কমে যায় রাসায়নিক উপাদানের টলারেন্সের কারণে। টলারেন্স বা সহনশীলতা তৈরি হতে স্নায়ুতন্ত্রের সময় লাগে ঊর্ধ্বে চার বছর। মূলত দুজন মানব-মানবী দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার কারণে একটি অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যান। এই বাঁধনে শক্ত গিঁট এঁটে দেয় এন্ডরফিনস নামক রাসায়নিক উপাদান এবং অক্সিটোসিন নামক হরমোন। এন্ডরফিনস দুজনার মধ্যে শান্ত সৌম্য নিরাপত্তার অনুভূতি জাগায়, বিশ্বাস জাগায়, উন্মাতাল ঢেউ জাগায় না। এ মায়ার বাঁধন ও নিরাপত্তা বোধের অসাধারণ স্কেচও আমরা দেখেছি তুলি আর মুশতাকের সম্পর্কে। প্রধানত উত্তাল অনুভূতি তৈরি হয় কমবয়সি প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে। ‘পি পদার্থের’, উপস্থিতিই এখানে মুখ্য। কম বয়সের প্রেম দ্রুত মিলিয়ে গেলেও নিঃশেষ হয়ে যায় না। এদের প্রেম পাত্র থেকে পাত্রে সঞ্চারিত হয়। নতুন মুখ, নতুন চোখ, নতুন হাসি তুমুল উদ্দীপনায় আবার মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে, নতুন করেই সমান মাত্রায় ‘পি পদার্থ’র নিঃসরণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। নতুন প্রেমের জোয়ার পুর্নোদ্যমে আবার চলে আসে এভাবেই। আর এন্ডরফিনসের কারণে ভালোবাসায় স্থিতি আসে বিধায় প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের অনেক ভুলত্রুটি সয়ে নিতে পারে। হুট করে এদের ভালোবাসা চলে যায় না, রং বদলায় না। এখানে ‘বিশ্বাস’ বড় শক্তিরূপে হাজির হয়। জনম জনম একে অপরকে ভালোবাসব ‘বর্তমান’-এর এ বিশ্বাসই বর্তমানকে রাঙিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে তা স্থায়ী না হলেও বর্তমান হয় উপভোগ্য, আনন্দময়। বিজ্ঞানের এসব সত্য-কথনও আমরা দেখতে পাই মুশতাকের দর্শনতত্ত্বে।  তাই জীবনের শেকড় উপড়ে মুশতাক বলতে পারে, ‘ভালোবাসা বলে কিছু নেই। স্থায়ী কিছু নেই।’

অর্থাৎ তৃষিতা উপন্যাসের গভীর তলে মনস্তাত্ত্বিক এক চেতনা-প্রবাহও রয়েছে নিয়তই বর্তমান। যা উপন্যাসটিকে অনন্য মর্যাদার আসনে তুলে ধরে রাখতে পেরেছে বলে বিশ্বাস।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক। সম্পাদক, শব্দঘর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares