কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রেম প্রকৃতি ও পুরাণ : তপন বাগচী

বিশেষ প্রচ্ছদ রচনা

কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রেম প্রকৃতি পুরাণ

তপন বাগচী

শামসুর রাহমান বাংলাভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবি। তিরিশের পাঁচ কবি ও জসীমউদ্দীনের পরেই কবি শামসুর রাহমানের নাম সর্বমান্য। পেশায় সাংবাদিক আর প্রতিভায় তিনি কবি। তাঁর কবিখ্যাতি এমন তুঙ্গে উঠেছিল যে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের ও জনপ্রিয় একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদক পরিচয়টাও গৌণ হয়ে পড়ে। যেহেতু শামসুর রাহমান ছিলেন সৃষ্টিশীল মানুষ, তাই তাঁর প্রতিভার বিকিরণ কেবল কবিতাতেই নয়, সাহিত্যের অন্যান্য ধারাতেও প্রবহমান ছিল। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন, সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে তিনি কলামনিবন্ধ করেছেন। ‘মৈনাক’ ছদ্মনামের কলামগুচ্ছ তাঁকে জাপানের মিতসুবিসি পুরস্কার (১৯৮২) এনে দেয়। মনের আবেগেই তিনি রচনা করেছেন গান-গল্প-উপন্যাস, অনুবাদ করেছেন বিদেশি সাহিত্য এবং লিখেছেন প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা। আর  ছড়াসাহিত্যে তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। বলা যেতে পারে, প্রায় সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেছেন। কবিতায় তাঁর অবদান প্রধান হলেও অন্য সকল ক্ষেত্রে তাঁর এই পরিভ্রমণ পূর্ণ সাহিত্যসত্তারই সম্প্রসারিত রূপ।

বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন মানে বাঙালির আনন্দের একটি দিন। আমাদের প্রজন্মের সৌভাগ্য যে তাঁকে চাক্ষুষ করেছি, আমরা মাইকেলকে দেখিনি, রবীন্দ্রনাথকে দেখিনি, নজরুলকে দেখিনি, জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব-সুধীন- অমিয়- বিষ্ণুকে দেখিনি, সুকান্তকে দেখিনি, জসীমকে দেখিনি, কিন্তু রাহমান-সুনীল-শক্তি-বিনয়-মাহমুদকে দেখেছি। নিজের দশকের শীর্ষস্থানীয় তো বটেই নিজের সময়ের বড় কবি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন। কবিতা ছাড়াও শিশুসাহিত্য, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধসাহিত্য, অনুবাদসাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি ব্যাপক সাফল্যের নজির রেখে গেছেন।

শামসুর রাহমান চলমান রাজনীতির প্রায় সকল গণমুখী কর্মসূচির সঙ্গে একাত্ম হয়ে কবিতা লিখেছেন। গণমানুষের কবি হিসেবে তিনি সম্মান পেয়েছেন।

১৯৯৭ সালে পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করতাম। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা লেখকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন রচনার উদ্যোগ নিই ফেব্রুয়ারি মাসে। পঞ্চাশের কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ, ষাটের কবি রফিক আজাদ ও মাহবুব সাদিক এবং সত্তরের কবি আবিদ আনোয়ারের সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরিকল্পনা করি। রাহমান ভাই আমাকে বলেন, ‘তুমি যে অর্থে মুক্তিযোদ্ধা বলছ, আমি তা নই। আমি অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করি নাই, কবিতা হাতে যুদ্ধ করেছি।’

জাতির ক্রান্তিÍলগ্নে তিনি বালিতে মুখ লুকিয়ে থাকেননি, কলম হাতেই ছুটে গেছেন রাজপথে। ৮০র দশকে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সত্তরের অন্যতম প্রধান কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও কবি মোহন রায়হানের আহ্বানে গঠন করেছেন জাতীয় কবিতা পরিষদ। এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি হিসেবে শামসুর রাহমান স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। এশিয় কবিতা উৎসবের নামে ধামাধরা কবিদের আস্ফালন বন্ধ করেছেন। পরিণামে দৈনিক বাংলার সম্পাদকের চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তবু পিছপা হননি। তাঁর নেতৃত্বে সারা দেশের কেবল কবিরা নন, সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত হয়েছেন। এরশাদের পতনের আন্দোলনে শামসুর রাহমানের নেতৃত্বকে আমরা সম্মান জানাই।

শামসুর রাহমানকে ‘নাগরিক কবি’ বলে অনেকটাই খণ্ডিত করে ফেলা হচ্ছে। এই ব্যাপারে প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁর সময়ের আরেক প্রতিভাবান কবি সৈয়দ শামসুল হক। তিনি বলেন :

 ‘…পঞ্চাশের দশকে একটা রব উঠেছিল, শামসুর রাহমান ‘নাগরিক কবি’Ñ এ রবের উদগাতা ছিলেন যাঁরা, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক অথবা ওই সাহিত্যেরই একদা ছাত্র। জসীমউদদীন যে ‘পল্লীকবি’ বলে একদা বর্ণিত হতেন, তাঁর লেখা গানের প্রথম দীর্ঘবাদন রেকর্ড যখন বেরোয় ষাটের দশকে, মনে পড়ে আমি সেই রেকর্ডের মলাটে তাঁর এই ‘পল্লীকবি’ বর্ণনার প্রতিবাদ করি; সম্ভবত সেটাই ছিল এ-বিষয়ের প্রথম প্রতিবাদ। আমার ধারণা শামসুর রাহমানের ‘নাগরিকত্ব’ এবং জসীমউদদীনের ‘পল্লীত্ব’Ñ এই দুই-ই প্রমাণ করেÑ আমাদের সমালোচকদের তো বটেইÑ সৃষ্টিশীল কবি সাহিত্যিক অনেকেরই কিংবা তৎকালীন প্রধানদেরই- ইউরোপ-দাস্যতা ও আধুনিকতা সম্পর্কে ঔপনিবেশিক ধারণার।’

(মহান সতীর্থ শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমান স্মারকগ্রন্থ, শামসুজ্জামান খান ও আমিনুর রহমান সুলতান সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১০, পৃ. ১৮)।

শামসুর রাহমানকে রাজনৈতিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করা একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর ‘রাজনৈতিক কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছিলেন, ‘প্রথম যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন চতুর্দিকে পাহারা বসিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আমার কাব্যক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না ঘটে। সেকালে, বলা যায় আমার ধারণা ছিল যে, কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে অহিনকুলের সম্পর্ক বিদ্যমান। কলাকৈবল্যবাদের প্ররোচনায় আমি সেই ধারণায় বশীভূত হয়েছিলাম এবং একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই।’ তিনি স্বীকার করেছেন যে তাঁর এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবে। কিন্তু পরে তিনি এই বিশ্বাস থেকে সরে আসেন। এবং আমরা দেখতে পাই যে বাঙালির এমন কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই, যার প্রতিবিম্ব শামসুর রাহমানের কবিতায় পাওয়া যায় না। ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘সফেদ পঞ্জাবি’, ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে’, ‘একটি মোনাজাতের খসড়া’, ‘আসাদের সার্ট’, ‘নিজেকে নিয়ে পঙক্তিমালা’, ‘গর্জে ওঠো স্বাধীনতা’ প্রভৃতি কবিতা বাংলাভাষায় রাজনৈতিক কবিতার ভাণ্ডারে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু রাজনৈতিক কবিতা সময়ের দায়পূরণে সৃষ্টি হয়। কবিসত্তার অনুসন্ধানে যদি আমরা আরও গভীরে যাই, দেখতে পাব, শামসুর রাহমানের কবিতা প্রেম, প্রকৃতি ও পুরাণ তুমুল গুরুত্বে স্থান পেয়েছে।

প্রেমের কবিতা লেখেন নাই এমন কোনো কবিকে পাওয়া যাবে না। এই প্রেম হতে পারে দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, সৃষ্টিপ্রেম প্রভৃতি। আমরা নর-নারীর প্রেমানুভূতির কথাও পাব যেকোনো কবির কলমে। শামসুর রাহমান তাঁর ব্যতিক্রম নন, অনেক সার্থক প্রেমের কবিতার সৃষ্টা তিনি। তাঁর প্রেমের কবিতায়ও সমকালীন সমাজ-রাজনীতি ফুটে উঠছে তুমুল দক্ষতায়। কবি যখন বলেন :

‘যখন তোমার সঙ্গে আমার হলো দেখা

লেকের ধারে সঙ্গোপনে,

বিশ্বে তখন মন্দা ভীষণ, রাজায় রাজায়

চলছে লড়াই উলুর বনে।

যখন তোমার পায়রা-হাতে হাতটা রেখে

ডুবে থাকি স্বর্গসুখে,

তখন কোনো গোলটেবিলে দাবাড় ছকে

শ্বেত পায়রাঁ মরছে ধুঁকে।

আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো

মিলি রাতের গভীর যামে,

তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা,

পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে।’

                (প্রেমের কবিতা)

আবার এই কবি-ই তুমুল আবেগে উচ্চারণ করেন :

‘কেউ কি এখন এই অবেলায়

আমার প্রতি বাড়িয়ে দেবে হাত?

আমার স্মৃতির ঝোপেঝাড়ে

হরিণ কাঁদে অন্ধকারে,

এখন আমার বুকের ভেতর

শুকনো পাতা, বিষের মতো রাত।’

                (কেউ কি এখন)

কবি কেন প্রেমের আহ্বান জানাচ্ছে অবেলায়, আমাদের জানা হয়ে ওঠে না। কিন্তু অন্ধকারের হরিণের কান্না কিংবা হরিণের ডাকের মধ্য দিয়ে কামকাতরতা এবং বুকের ভেতর শুকনো পাতার প্রতীকে অস্থিরতা ও শূন্যতার কথা প্রকাশ করেছেন। স্বরবৃত্ত ছন্দের হালকা চালে কী চমৎকার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয় তাঁর প্রেমের অনুভূতি! আবার পুরানো প্রেমের প্রতি এক ধরনের তীব্র স্মৃতিকাতরতা, যা প্রেমেরই প্রতিরূপ :

‘যে আছে দাঁড়িয়ে অতিদূর পাড়াগাঁয়ে

দীপ হাতে সেই অভাবের সংসারে

সত্যি মিথ্যে যদি ফিরে যাই হঠাৎ সেখানে তার

বিবর্ণ খেলাঘরে

সে কি আর ভাঙা পুতুল কুড়াবে

কাকডাকা রাতে একা?’

                (মনে মনে)

এইসব প্রেমের কবিতা পাঠ করে শামসুর রাহমানকে প্রেমের কবি হিসেবে আখ্যা দিতে পারি। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ‘নাগরিক কবি’ এই খণ্ডিত অভিধায় তাঁকে চিহ্নিত করার ধারা বয়ে চলছে। শামসুর রাহমানের কবিতায় যেখানে নাগরিক জীবনযন্ত্রণা ফুটে উঠেছে, সেখানেও আমরা তার প্রেমানুভূতির তীব্র প্রকাশ দেখতে পাই।

বাঙলার এই বিশাল প্রকৃতি শামসুর রাহমানকে কবি বানিয়েছে। প্রকৃতিপ্রেম দেশপ্রেমেরই নামান্তর! কবি দেশকে ভালোবেসে যে কবিতা লিখেছেন তার অনেকটা রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু নিপাট সৌন্দর্য বর্ণনায় কবি যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তাঁর স্বতন্ত্র কবিসত্তা প্রকাশিত। আমরা লক্ষ্য করি যে রাজনৈতিক কবিতা, কিংবা পুরাণের প্রেক্ষাপটে বক্তব্য প্রকাশের সময়েও কবি প্রকৃতির অনুষঙ্গ টেনে এনেছেন যৌক্তিক প্রক্রিয়ায়। পুরাণ ও প্রকৃতি রাহমানের কবিতায় পাশাপাশি হেঁটেছে। যেমন :

হে নিশীথ, আজ আমি কিছুই করতে পারবো না।

আমার মগজে ফণিমনসার বন বেড়ে ওঠে,

দেখি আমি পড়ে আছি যুদ্ধবিধ্বস্ত পথে কী একাকী;

ভীষণ আহত আমি, নেকড়ের মুখে আফ্রোদিতি।

(নেকড়ের মুখে আফ্রোদিতি/বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে)

এখানে আফ্রোদিতি সৌন্দর্যের প্রতীক, নেকড়ে হচ্ছে ধ্বংসের প্রতীক। স্বৈরাচার গিলে খাচ্ছে প্রিয় দেশ, এমন বক্তব্য রয়েছে এই কবিতায়। কিন্তু কবি তাঁর অসহায়ত্ত প্রকাশ করছেন রাত্রির কাছে। এভাবে প্রকৃতি ও পুরাণ তাঁর কবিতায় যুগপৎ ধরা দেয়।

পুরাণ বলতে আমাদের সমালোচকবৃন্দ গ্রিক পুরাণকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কোন কবি গ্রিক পুরাণের কতখানি প্রয়োগ করল তার উপর নির্ভর করে তাঁর কবিখ্যাতি। এরকম একটি পর্যবেক্ষণ থেকে আমাদের সমালোচনা সাহিত্যকে উদ্দেশ্য করে কবি লেখেন :

রাত্রির পীড়নে উড়ে উন্মথিত আমি নক্ষত্রের ঝড়ের মতো

শব্দপুঞ্জ থেকে ছিঁড়ে আনি কবিতার অবিশ্বাস্য শরীর

সৌন্দর্যের মতো রহস্য-ঢাকা, নগ্ন আর উন্মীলিত।

আমার সেই নির্মাণে মাননীয় পক্বকেশ পণ্ডিত

হন্তদন্ত হয়ে খোঁজেন গ্রীক পুরাণের উল্লেখ,

(কাব্যতত্ত্ব/ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

এই কবিতার পাঠের পরে অনেকেই শামসুর রাহমানকে পাশ্চাত্য পুরাণের কবি হিসেবে আখ্যা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা দেখি কবি প্রাচ্য-পাশ্চাত্য উভয় পুরাণের পাশাপাশি সমকালীন বিষয়কেও উপস্থাপনা-গুণের পুরাণের মর্যাদা দিয়েছেন।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কবি একবার উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমাকে জড়ায় সত্য, অর্ধসত্য কিংবা প্রবচন,/ তবু জানি কিছুতে মজে না মন বাতিল পুরাণে।’(পুরাণ, বিধ্বস্ত নীলিমা), কিন্তু আমরা দেখতে পাই ‘সেই বাতিল’ পুরাণকেও তিনি আধুনিক করে তুলেছেন প্রয়োগের দক্ষতায়। পাশ্চাত্য পুরাণের যেসকল পুরুষ চরিত্র তিনি ব্যবহার করেছেন, তার মধ্যে অর্ফিউস, আগামেমনন, অ্যাপোলো, ইকারুস, টেলেমেকাস, ডেডেলাস, ট্যান্টালাস, ল্যাজারাস, স্যামসন, কেইন, একিলিস, প্যারিস, প্রমিথিউস, সিসিফাস, টাইরেসিয়াস, অডিসিউস, কিউপিড , অ্যাডোনিস, জেনাস, ইডিপাস, ক্রেয়ন, টাইটান, মেথুসেলা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আর নারীচরিত্র হচ্ছে আফ্রোদিতি, ইলেকট্রা, হেলেন, প্রসার্পিনা, হেরা, আর্টেমিস, কাসান্দ্রা, আন্তিগোনে, নেমেসিস, সার্সি প্রভৃতি। এছাড়া এসেছে পশুপাখি ও দানব চরিত্র, এবং রূপকথার সিন্ডারেলা বা ক্যাসোনোভা চরিত্র। পুরাণের নদনদী এবং স্থানের নামও এসেছে তাঁর কবিতায়। পবিত্র গ্রন্থ ‘বাইবেল’-এর কাহিনিও এসেছে পুরাণের আঙ্গিকে। পুরাণ ব্যবহারের সুবিধা এই যে এক-একটি চরিত্র যে কাহিনি বলে আমাদের চোখের সামনে তা ভেসে ওঠে, অল্পকথায় অনেক বিশদ কথা শুনিয়ে দেওয়া যায়। শামসুর রাহমান সেই গুপ্ত কৌশল জানতেন বলেই পুরাণের ব্যবহারে কবিতাকে ঋদ্ধ করার সুযোগ নিয়েছেন।

প্রাচ্যপুরাণের প্রতিও কবি ছিলেন সমান মনোযোগী। আদিতম মহাকাব্য ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘বেদ’ প্রভৃতি ভারতীয় গ্রন্থের কাহিনি-চরিত্র-স্থানকে তিনি কবিতায় প্রয়োগ করেছেন। ‘খাণ্ডবদাহন’, ‘জতুগৃহ’, ‘মারীচ’, ‘গঙ্গা’, ‘কালকূট’, ‘বাল্মিকী’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’, ‘শিখণ্ডী’, ‘ঋষ্যশৃঙ্গ’ প্রভৃতি শব্দবন্ধে প্রাচ্য পুরাণের দেখা মেলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত কবিতায় তিনি বলেছেন :

“তোমাকে পাওযার জন্য, হে স্বাধীনতা,

তোমাকে পাওযার জন্য আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?

আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা, সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,

সিঁথির সিদুর মুছে গেল হরিদাসীর।

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,

শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এল-

দানবের মত চিৎকার করতে করতে।”

                (তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা)

এখানে সকিনাবিবি, হরিদাসী প্রতীকী চরিত্র আর খাণ্ডবদাহন হচ্ছে মহাভারতের একটি ঘটনা। কিন্তু এখান থেকে কেবল দহন-জ্বালার প্রতীক হিসেবে একাত্তরের ঘরপোড়ার ঘটনাকে মেলাতে চাইছেন কবি। আমার কাছে এই প্রতীক যথাযুক্ত মনে হয়নি। একদিন শামসুর রাহমানের শ্যামলীর বাড়িতে আড্ডাস্থলে এই আপত্তি উত্থাপনও করেছিলাম। ইবাংলা লাইব্রেরি তথ্য থেকে খাণ্ডবদাহনের কাহিনিটুকু এখানে জুড়ে দিতে চাই, ‘শ্বেতকি নামে এক রাজা নিরন্তন যজ্ঞ করতেন। বারো বৎসর ধরে সেই যজ্ঞÑ ঘৃত পান করায় অগ্নিদেবের অরুচি রোগ হল। ব্রহ্মা অগ্নিদেবকে বললেন যে, খাণ্ডব বন দগ্ধ করে সেখানকার প্রাণীদের মেদ ভক্ষণ করলেই ওঁর এই রোগ নিরাময় হবে। অগ্নি সাতবার চেষ্টা করলেন খাণ্ডববন দহন করতে। কিন্তু বনহস্তী ও নাগগণ শুঁড় ও মাথা দিয়ে জলসেচন করে তাঁর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করলেন। তখন ব্রহ্মার উপদেশে অগ্নি কৃষ্ণার্জুনের শরণাপন্ন হলেন। অর্জুনরা তখন নিরস্ত্র ছিলেন বলে অগ্নিদেব বরুণকে অনুরোধ করলেন ওঁদের অস্ত্র দিতে। বরুণ অর্জুনকে দিলেন গাণ্ডীব ধনু, অক্ষয় তূণীর ও কপিধবজ রথ, আর কৃষ্ণকে দিলেন একটি চক্র আর কৌমোদকী গদা। কৃষ্ণার্জুন এই অস্ত্র দিয়ে অসুর, গন্ধর্ব, যক্ষ প্রভৃতিদের পরাজিত করে অগ্নিদেবকে খাণ্ডব বন দাহ করার সুযোগ করে দিলেন।’ অর্থাৎ এখানে অসুর-গন্ধর্ব-যক্ষরা পরাজিত হয়েছিল। যারা পুড়িয়েছিল, তারাই জিতেছিল। অথচ একাত্তরে যারা পুড়িয়েছিল তারা পরাজিত হয়েছিল। পুরাণের ব্যবহারে এখানে কিছুটা বিচ্যুতি দেখা দেয়। আমার আপত্তি শুনে সেদিন কবি শামসুর রাহমান হেসেছিলেন।

কবি শামসুর রাহমান প্রাচ্য পুরাণের অনেক সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন বিভিন্ন কবিতায়। তবে এর পাশাপাশি মঙ্গলকাব্য থেকেও তিনি পুরাণের অনুষঙ্গ গ্রহণ করেছেন। ‘মনসামঙ্গল’-কাব্যের চাঁদ সদাগর ও লখিন্দর এসেছে তাঁর কবিতায় চরিত্র হিসেবে। যেমন :

যতদিন হিন্তাল কাঠের লাঠি আছে হাতে, আছে

ধমনীতে পৌরুষের কিছু তেজ, যতদিন ঠোঁটে

আমার মুহূর্তগুলি ঈষৎ স্পন্দিত হবে, চোখে

নিমেষে উঠবে ভেসে কোনো শোভাযাত্রার মশাল,

করবো না আন্ধারের বশ্যতা স্বীকার ততদিন,

যতই দেখাক ভয় একশীর্ষ, বহুশীর্ষ নাগ,

ভিটায় গজাক পরগাছা বারংবার, পুনরায়

ডিঙার বহর ডোবে ডুবুক ডহরে শতবার,

গাঙ্গুড়ের জলে ফের যাক ভেসে লক্ষ লখিন্দর।

                (চাঁদ সদাগর, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ)

শামসুর রাহমানের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে সমকালীন চরিত্রকে মিথের মর্যাদায় প্রয়োগ করা। তাই লালন, হাসন, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু, সালাম, বরকত, আসাদ, মতিউর, নূর হোসেন তাঁর কবিতায় পুরাণরূপে স্থান পায়। কবি যখন বলেন, ‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/ সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’ তখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহিদ আসাদুজ্জামান হয়ে ওঠেন পুরাণের নতুন চরিত্র :

‘উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠ

রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য স্লোগান,

বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ

শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা

নূর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হৃদয়

ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ

বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার

বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।’

তখন নূর হোসেন গেয়ে ওঠেন সমকালের পুরাণ। এভাবে প্রেম ও প্রকৃতিকে বিষয় করে এবং পুরাণের সফল প্রয়োগ করে কবি শামসুর রাহমান হয়ে উঠেছেন তাঁর সময়ের তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আরাধ্য কবি। খণ্ডিত পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি দিন দিন পাঠকের কাছে পুণ্যবান ও স¦য়ম্ভু কবি হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছেন। জীবনানন্দ দাশের মতো, যত দিন গড়াবে, তত উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন বাংলাদেশের কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares