শামসুর রাহমানের শহরের আড়ালে পরাবাস্তব চিত্রকল্প : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শব্দঘর, নভেম্বর ২০১৫

বিশেষ প্রচ্ছদ রচনা

শামসুর রাহমানের শহরের আড়ালে পরাবাস্তব চিত্রকল্প

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

শামসুর রাহমান নিজেকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’ গ্রন্থে, যার নাম ‘পারিপার্শ্বিকের আড়ালে’। ঐ কবিতার ক’টি লাইন :

শামসুর রাহমান বলে আছে একজন, নিজের কাছেই

বন্দি সর্বক্ষণ।

প্রতিদিন শহরের সবচেয়ে করুণ গলির মুখচ্ছবি

মুখের রেখায় নিয়ে হাঁটে ফুটপাতে…

এই শহুরে যে দৃশ্য কবির মুখের রেখায় অঙ্কিত হয়ে আছে, তা তার একান্ত নিজস্ব এক শহরের। তার নাম ঢাকা বটে, নিজেই তিনি বলেন এ শহর ঢাকা এবং আপাত দৃষ্টিতে এই মতের বিপরীতে যাবার কোনো কারণ নেই; কিন্তু এ শহর যে অন্য যেকোনো শহর হতে পারে তারও কিছু প্রমাণ রয়ে যায়। তার নিজস্ব নির্মাণের এই শহরে ঢাকার মতো গলি- ঘুপচি আছে, আছে নাগরিকের ক্লান্তি, অবসাদ ও বিবমিষা, তার উল্লাস ও আনন্দ। এই শহরে কবি থাকেন, এই শহর থাকে কবিতে। নিজের কায়া ও ছায়ার মতো সহঅবস্থিত তারা। এবং আলোকের বিপরীতে না দাঁড়ালে যেহেতু ছায়াকে প্রসব করা যায় না, কবিও দাঁড়ান, মাঝে মধ্যেই একটি আলোর বিপরীতে। ঐ আলো মধ্যরাতের, নির্জন চাঁদের, পরাবাস্তবের । আমরা এই প্রবন্ধে এই আলোকে শনাক্ত করার একটি চেষ্টা চালাবো। তবে, আপাতত দেখা যাক ‘পারিপার্শ্বিকের আড়ালে’র সমাপ্তি কিভাবে টানা হয় :

শুধু মধ্যরাতে ঢাকা তার রহস্যের অন্তর্বাস খুলে বলে-

ফিরে এসো তুমি

শুধু মধ্যরাতে ঢাকা বড়ো একা বড়ো ফাঁকা হয়ে যায়,

অতিকায় টেলিফোন নেমে আসে গহন রাস্তায় জনহীন

দীর্ঘ ফুটপাত

ছেয়ে যায় উঁচু ঘাসে আর সাইনবোর্ডের বর্ণমালা

কী সুন্দর পাখি হয়ে রেস্তোরাঁর আশপাশে ছড়ায় সংকেত

একজন পরী হ্যালো হ্যালো বলে ডায়াল করছে অবিরাম

মধ্যরাতে ঢাকা বড়ো একা বড় ফাঁকা হয়ে যায়।

কবিতাটি কিন্তু এভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল না। কবির যে Persona ঐ মধ্যরাত অধ্যুষিত শহরে, ঐ unreal city ঢাকার অলিগলি চষে বেড়ায় কবিতার জন্য উন্মাদ হয়ে, এ কবিতা তাকে নিয়েই। কিন্তু এক সময় image transfer এর মতো persona transfer হয়। কবির স্থান দখল করে শহর, সীমিত বৃত্ত থেকে মধ্যরাতের সীমাহীন বিস্তারে কবির নান্দনিক চিন্তাটি পরিব্যাপ্ত হয়। ব্যক্তির খোলস পেছনে ফেলে ব্যৈক্তিক এক বিস্তারে পাখা মেলে কবির কল্পনা। যদি বিশেষকে নিয়ে আবদ্ধ থাকতেন কবি, এটি সম্ভব হতো না- তাকে নির্বিশেষকে ধারণ করতে হলো। অতিকায় টেলিফোন যে মুহূর্তে নামল গহন রাস্তায়, আমরা যারা শামসুর রাহমানের পরাবাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত, তারা ঐ পুরাতন দৃশ্যকল্পের দেখা পেয়ে যাই। আমরা অবশ্য জানি, এই পরাবাস্তবতা তাকে দেশকালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ে যাবে- মার্ক শাগালের সেই ভয়ানক পরাবাস্তব চিত্রকলাসমূহের মতো, যেখানে মানুষ, জন্তু, অট্টালিকা সবই ঊর্ধ্বগামী, উন্নদ্ধ। শামসুর রাহমানের ঢাকা এই ভাবে পরিবর্তিত হয়, অপ্রকৃত হয়ে দাঁড়ায়, উন্নিদ্র মধ্যযামিনীতে দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। তখন যে চিন্তা জাগ্রত থাকে, তা থাকে পরাবাস্তবের অন্তঃস্থিত নান্দনিকতায় আচ্ছন্ন। এই নান্দনিকতা যখন তিনি অর্জন করেন, তখন শহরটি ভূগোল অতিক্রম করে, ইতিহাস অতিক্রম করে, আধুনিক যেকোনো শহরের মতো, এলিয়টের লন্ডন, জয়েসের ডাবলিন, উইলিয়ামসের প্যাটারসন-এর মতো এক নান্দনিক যাত্রায়। ম্যালকম ব্র্যাডবারি কথিত ফর্মের পরিবর্তন অথবা metamorphosis of form-এর মাধ্যমে সকল নগরীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। সমসাময়িক হয়।

তিরিশের নাগরিক কবিদের মধ্যে যাদের এই নান্দনিক যাত্রার আয়োজন ছিল, যারা শুধুই ভূগোল এবং পৌর মাইল ফলকে নিজেদের আবদ্ধ রাখেননি, তারাও অর্জন করেছেন বিশ্বজনীন এরূপ একটি মাত্রা। তাদের শহরও হয়েছে ফর্মের প্রতিরূপ, এমনকি ঐ ফর্মটিই যোগান দিয়েছে তাদের শহর। শহরের শৃঙ্খলাহীন, কদাকার বিস্তার, তার ধূসর, নিরানন্দ জীবন, একাকিত্ব, দীর্ঘ দূরত্ব, তার নিষ্ঠুর স্বজনহীনতা এসবই আধুনিক কবিতার ফর্মের অন্তর্ভুক্ত এবং ফর্ম এসব নিয়ে গঠিত। এরিক হোমবার্গার তার এক প্রবন্ধে উদ্ধৃত করেন উইলিয়াম ডীন হাওয়েলসকে, যিনি হেনরি জেমস-কে লেখা এক চিঠিতে বলেন, হৃদয়ের নিভৃতে আসলে আমরা সবাই নিউইয়র্কের মতো এবং এই শহরের বিশাল, আনন্দিত অথচ আকরহীন জীবনের কিছুটা আমি আমার উপন্যাসে ব্যবহার করতে চাই।

শামসুর রাহমান হৃদয়ের নিভৃতে ছিলেন- এখনও রয়ে গেছেন- ঢাকার মতো। ঢাকার জীবনকে তিনি কবিতায় ব্যবহার করতে চেয়েছেন, এই উদ্দেশ্যটি তিনি চরিতার্থ করেন একটি নিজস্ব উপায়ে। তিনি তিরিশের কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, কিন্তু তার স্বাতন্ত্র্য প্রশ্নাতীত। তিরিশের অন্তত একজন কবি, সমর সেন, সর্বত্র শহরকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি একটি ভিন্ন শহরের- এলিয়েটের- লন্ডনের প্রতিরূপ স্থাপন করতে চেয়েছেন তার নিজের শহরে। এজন্য শহরে উট এনেছেন, তার নিগর্স দৃর্শে মরুভূমি ও ক্যাকটাস দেখা দিয়েছে- কিন্তু এতে একটি অপ্রকৃত দর্শনের জন্ম হয়েছে। সমর সেন তখন লেখেন-

হে শহর, বিষন্ন শহর/ সূর্য অস্ত গেলে/

কোনো কোনো পথে/ছায়া পড়ে মন্থর উটের/

মরুভূমির ক্লান্তি পায়ে লাগে/হে শহর,

বিষন্ন শহর/  লোকের হাটে

আমরা তার বিষণ্নতার স্পর্শ পাই বটে, কিন্তু একই সঙ্গে অনুভব করি ঐ শহরে আমরা সম্পূর্ণ প্রবিষ্ট হতে পারি না। শহরটি সময় ও কালে আমাদের সমসাময়িক হলেও আমাদের চেতনার গভীরে তাকে পাই না। কবিতাটির কার্যকরণ সূত্রে উত্থাপিত বর্ণনা একটি সরলরৈখিক বোধকে সক্রিয় করে- শহরটি বড় জোর অবাস্তব হয়, পরাবাস্তবের রেখা-বিধ্বংসী, সময়-কালের নিজস্ব চিহ্নগুলো মুছে ফেলা অলীক বিস্তার তাতে থাকে না। এই শহরটি শেষ বিচারে সংবাদপত্রের নগর-প্রতিবেদকের পাঠানো কোনো রুগ্ন-রিপোর্টের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। শামসুর রাহমান সেই তুলনায়, প্রথমেই, মিশে যান শহরের অস্থিমজ্জায়। অথবা আমরা একটু ঘুরিয়ে বলতে পারি। ওই শহরে মিশে থাকে তার অস্থিমজ্জা। তার কবিতার বিষয় ও ফর্ম একই সঙ্গে হয়ে দাঁড়ায় ঐ শহর। এজন্য, কবিতার অন্তিম স্তবকে, যখন তিনি সরে যান ও শহরটি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা বুঝতে পারি, কত গভীর এই শহরের উপস্থিতি তাঁর কবিতায়। আমরা আরও বুঝতে পারি, তার নগরবিষয়ক কবিতায় কেন তে আত্মদর্শনের তোড়জোড়। শহর ও কবি পরস্পর পরস্পরের স্থান দখল করে, করতে পারে। আমরা যদি উমবার্তো ইকোর একটি উক্তি এখানে স্মরণ করি যে আধুনিকতা যতটা ব্যৈক্তিক এবং আত্মনিরাসক্ত বলে দাবি করে, আসলে ততটা নয়, বরং উল্টোটি সত্য যে, আধুনিকতা একটি ভিন্ন মোড়কে আত্মদর্শনেরই কথকতা, তাহলে শহরের স্থানে কবিকে বসালে ঐ আত্মদর্শনের আয়োজনই সারা হয়। ‘পারিপার্শ্বিকের আড়ালে’ কবিতা যে পরাবাস্তব চিত্রকল্প দিয়ে শেষ হয়, সেখানে, মার্ক শাগালের সেই ভয়ানক আত্মদর্শী পরাবাস্তব চিত্রকলাসমূহের মতোই, নিজেকে ভিন্ন দূরত্ব, ভিন্ন মাত্রায় এবং গভীরতায় অবলোকনের প্রচেষ্টাটিই প্রধান। মধ্যরাতে ঢাকা যখন জননী-দয়িতার মতো ইডিপাস সদৃশ কবির কাছে ধরা দেয়, তখন আধুনিক মানসের এক ভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক জটিলতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে না শুধু, শহরের সঙ্গে কবির নিয়তি-নির্ধারিত এক উদ্ধারহীন সম্পর্কের বিষয়ও প্রকাশিত হয়। একজন পরী, যে শাগালের চিত্রকলা থেকে এই মাত্র যেন উঠে আসে, সে টেলিফোনে হ্যালো হ্যালো করতে থাকলে তাকে সাইরেন অথবা সার্সির মতো এক ভয়ানক- নারী বা Femme Fatale মনে হওয়া স্বাভাবিক। তখন কবিকে ইউলিসিসের মতো, গ্রিক পুরান অথবা টেনিসনের অথবা জেমস জয়েসের- এই শেষোক্ত উদারণটিই- যথাযোগ্য- এক স্বপ্ন তাড়িত, মাতাল অভিযাত্রীরূপে কল্পনা করতে অসুবিধা হয় না। এই অভিযাত্রী তার শহরের সকল প্রকাশ্য নিষিদ্ধ স্থানে কবিতার জন্য ঘুরতে থাকে, কারণ ‘জানেনা সে কোথায় যে নিরাময় তার/ হাসপাতালের বেডে’ নাকি কোনো নারীর হৃদয়ে।

শহরের জন্য শামসুর রাহমান প্রায়শই যে হাহাকার করেন, আবাল্যের শহরকে স্বপ্নে ও কল্পনায় ধরে রাখতে পরিশ্রমী হন, শহরের গোপন আনন্দ বিষাদের উৎসগুলো থেকে জল ও গরল আহরণ করতে থাকেন, তখন ঐ নিরাময়হীন অসুখটি বড় হয়ে ওঠে। আধুনিক কবিতায় শহর কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, একটি বা একাধিক মনো-অবস্থার প্রতীক তা, কিছু কিছু প্রকাশ-অযোগ্য, সঞ্চারণ-অসাধ্য ভাবনা বা চিন্তার দ্যোতক ঐ শহর। এইভাবে শিল্প পরবর্তী যুগে শহরকে দেখা শুরু হয়। আমরা এরূপ উৎপ্রেক্ষা প্রতীকের শহরের আদি এক ব্যবহারকারী বোদলেয়ারের কথা স্মরণ করতে পারি, যার শহর তা এক প্রতিকারহীন ইন্দ্রিয়-বৈকল্যের মুখোমুখি করে দেয়। ঐ ইন্দ্রিয়-বৈকল্য আসলে পরাবাস্তবের আদি অনুভূতি। ইউরোপের শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার নিপীড়ন বোদলেয়ারসহ বহু কবিকে উদ্বাস্তু করেছে, তারা শহরের সঙ্গে নাড়ির যোগাযোগটি হারিয়ে শুধুই রাস্তায় ও পার্কে জনস্রোতে ঘুরেছেন, স্বস্তি পান নি, নিরাময় লাভ করেননি ঐ অসুখ থেকে। বিংশ শতাব্দী যখন নগরায়নের চূড়ান্ত ঘটিয়ে দিতে শুরু করল, মহাযুদ্ধের রক্তাক্ত ক্ষত চেপে বসল শহরের বুকে, তখন বাস্তবতা থেকে পালানোর প্রচেষ্টাই হয়ে দাঁড়ালো যুক্তিসঙ্গত। শতাব্দী শুরুর সকল কবির মধ্যে এই প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু এলিয়ট তার অপ্রকৃত লন্ডন নিয়ে যখন উপস্থিত হলেন, দেখা গেল, শহর থেকে পালানো সম্ভব নয়। কারণ শহর আছে আমাদের ভিতরে, আমাদের স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের রাস্তা ধরে অস্তিত্বের একেবারে কেন্দ্রে চলে গেছে এর বাহু-বিস্তার। শহর পরিণত হলো মানুষের মানসিক, বৌদ্ধিক, নান্দনিক অবস্থাসমূহের প্রতীক। উত্তর কাঠামোবাদী ও বিনির্মাণবাদীরা বলেন, শহরকে এই প্রতীকে রূপান্তরিত করার মধ্যে দিয়ে আধুনিক মানুষ আসলে তার গূঢ় একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে চায়- মুক্ত নিসর্গে, আদিম প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাকে। শহুরে সকল নির্মাণ আসলে এক ধরনের প্রবঞ্চনা, যা নিসর্গের সঙ্গে মানুষের দূরত্বের জন্যই সংঘটিত এবং ঐ দূরত্ব আপাত দুর্লভ্য বলে ঐ নির্মাণসমূহকে যত সুরক্ষিত করা যায়, ততই মানুষের পক্ষে স্বস্তি অর্জন সম্ভব। অথচ, বিনির্মাণবাদীরা বলেন, মানুষের নির্মাণের মধ্যে যে ফাঁক থাকে, নির্মাণের কাঠামোগুলোর বিন্যাসে সাদা অঞ্চল থাকে, তাদের খুঁটি দেখলে ভিন্ন ইচ্ছাটাই প্রকাশিত হতে দেখা যায়। গ্রামের মানুষ ঘরে জানালার তেমন প্রয়োজন অনুভব করে না- বাংলাদেশের কুঁড়েঘরে জানালা কই- কিন্তু শহুরে মানুষ জানালাকে প্রাধান্য দেয়। অট্টালিকা উর্ধ্বমুখী হয়, প্রকৃতির অনুকরণে, প্রবৃত্তির উচ্চতার আদর্শগুলোও বৃক্ষ ও পাহাড়-অনুকরণে। এলিয়টের কবিতা ‘পড়লে, বিশেষ করে’ দি ওয়েস্ট ল্যান্ড- বিনির্মাণবাদী চিন্তার সঙ্গে এর নাগরিক নির্মাণের নৈকট্য চোখে পড়ে। টাইরেসিয়াস, যে একই সঙ্গে ঐ কবিতার প্রধান চরিত্র এবং তার আত্মা, spirit যে অন্ধ তার পৌরাণিক কারণ ছাড়াও ঐ অল্পত্বের একটি ব্যক্তিগত কারণ খোঁজা যায়। অন্ধত্ব, রোনাল্ড বার্থস-এর চিন্তার প্রতিষ্ঠান করে বলা যায়, সময় ও দেশের বিরুদ্ধে অর্থাৎ এ দুয়ের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। এ আগ্রাসন সকল কবি অনুভব করেন, শহরের কারাগার সদৃশ- সীমাবদ্ধতা, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক সকল ক্ষেত্রে শহরের আগ্রাসন সামান্য অনুধাবনেরই বিষয়। এজন্য অনেক নাগরিক কবি কল্পনায় ব্যাপ্তি খোঁজেন শহরের, এবং মনস্তত্ত্বের আকীর্ণ অঞ্চলে যখন ঐ শহর স্থাপিত হয়, দেশকে নিজস্ব উপায়ে সাজান কবি। সময়কে, একইভাবে ভাঙেন নাগরিক কবি। সময়ের সরলরৈখিক বিস্তারকে প্রথমেই, অতঃপর তার প্রথাগত নানা প্রকাশকে। ঘড়ির সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন কবি, দিনের বাস্তবতাকে উপেক্ষা অথবা পরিহার করেন। মধ্যরাতের পটভূমিতে এক সময়হীন নির্জনতায় উত্তীর্ণ হন সময়ক্লিষ্ট কবি।

শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রায়শই যে পরাবাস্তব আলো তেড়চা হয়ে পড়ে, তা নিতান্ত চিত্রকল্পের দায়ে প্রক্ষিপ্ত হয় না। এই আলোয় নিজের কথা থেকে একটি ছায়া বেরায়, যা আসলে তার নিমগ্ন সত্তার এবং ছায়াটি- তার শহরের। এই আলোয় সময় নিমগ্ন হয়, তার সম্মুখ বিস্তারী যাত্রাটি রহিত হয়, তার চক্রাকার আবর্তন কবির মনস্তাত্ত্বিক সময়ের সঙ্গে সুসঙ্গত হয়। সময়কে এভাবে পরাস্ত করেন কবি। ‘বন্দী শিবির থেকে’ গ্রন্থের দুটি কবিতা, প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাতে তুলে নিলেও এইসব চিন্তাকে বৈধতা দেয়। ‘সম্পত্তি’ কবিতায় আছে :

দাঁড়ালে দেয়ালে পড়ে ছায়া,

আমার নিজেরই ছায়া। চশমার আড়ালে

আছে দুটি চোখ, দেখি খাকির মিছিল

শহরে প্রত্যহ।

এ হলো সমাজ বাস্তবতা, সমকালীন রাজনীতির কঠোর নীতিহীন, বিবেকহীন বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দেয়ালের ছায়াটি লক্ষণীয়। কি এই ছায়া? কবির অন্তর্গত আরেকটি সত্তার, যা এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে, যার বুকের তলায় হৃৎপিণ্ডের টিক টিক অবিরাম চলে, অথচ যার কলম ক্যাপবন্দি। পরের কবিতা, ‘উদ্বাস্তু’তে “একটি রাত্তিরে আমার সারাটা মাথা বিষম রূপালি হয়ে যাবে” এরূপ একটি আর্তনাদ আছে। “আমি কি কখনো জানতাম এত দ্রুত/শহরের চেনা দৃশ্যাবলী লুপ্ত হয়ে যাবে”- এর পর। এ কবিতা বন্দি শিবিরের একটি ছবি আঁকে, যার বাস্তব ক্লিনারগুলো এতটা তীক্ষè এবং ধার যে পরাবাস্তবের একট নিস্তেজ ছবি তা থেকে কিছুতেই উঠে আসে না। কিন্তু বন্দি শিবিরের উৎপ্রেক্ষা ঐ শহরে কেন? কেন এই শহর এক বিশাল রাজনৈতিক প্রশ্নের সমার্থক? আমাদের কোনো স্বাধীনতা নেই, হত্যা এবং নির্যাতন আমাদের নিত্যসঙ্গী, বিভীষিকাময় আমাদের জীবনে- এ সত্যগুলো বোঝাবার জন্য শহর কেন? কারণ শহর শুধু স্থান নয়, কালও নয়, কারণ শহরকে সহজেই স্থানচ্যুত ও স্থানের অতীত নিয়ে যাওয়া যায়, সময়কে করা যায় কবির চিন্তার অনুগামী। ‘সম্পত্তি’ কবিতার দেয়ালের ছায়া বাস্তবের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা একটি ভিন্ন অস্তিত্ব, যার বিচরণ ক্ষেত্র একটি স্বপ্নের শহর, যে শহরের সাথে সংঘাত হয় বাস্তব শহরের। এই সংঘাতের ফলাফল সবারই জানা। কিন্তু ঐ ছায়া যে-আলোর বিপরীতে উদ্গত, সে আলো বাস্তবের অধিক কোনো মনো-বাস্তব থেকে প্রক্ষিপ্ত।

পরের কবিতার ‘এক রাত্তিরে’ কবির সারাটা মাথা ‘বিষম রূপালী’ হয়ে যাবার মধ্যে ঐ মধ্যরাত্রির সময়হীন আলোর ইঙ্গিত রয়ে যায়।

শহরকে আশ্রয় করে আধুনিক কবিতার অনেক বিক্ষিপ্ত চিন্তা সংহত হয়। অখণ্ড পূর্ণতা যে জীবনে নেই, যেখানে সম্পূর্ণের আভাসটুকুও তিরোহিত, সে জীবনের পূর্ণতার দিকে মানুষের যাত্রা শুধুই প্রহসনে পরিণত হয়। আধুনিক শহরে চলে জীবনকে খণ্ড খণ্ড করার নানা প্রকাশ্য-গুপ্ত প্রয়াস এবং খণ্ডায়নের সীমাহীন প্রক্রিয়ায় জীবনকে ব্যবচ্ছেদের টেবিলে শোয়ানো হয়। শামসুর রাহমানের কবি মানস এই খণ্ডায়ন এবং তার পরিণতিতে যে বিচ্ছিন্নতার প্রাদুর্ভাব, তাকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য। বিচ্ছিন্নতা আক্রান্ত হলে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে পরিবর্তন, তার চিত্রকল্প উৎপ্রেক্ষা উপমায় সম্পূর্ণতার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। এমন উদাহরণ তার কবিতা থেকে অসংখ্য দেয়া যাবে, যেখানে কবি বিচ্ছিন্নতার সংক্রমণে পর্যুদস্ত এবং তা থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টায় নিমজ্জিত। কিন্তু পায়ের নীচে শক্ত মাটি নেই যে সভ্যতার সেখানে ঐ চেষ্টা নিষ্ফল হয়। কিন্তু একস্থানে এসে কবির প্রয়াস কিছুটা হলেও অর্থবহ হয়। তিনি যখন শহরকে নির্ভর করে তার চিন্তাকে বিস্তৃত করেন, তখন শহর সংহত করে তার বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে। এর কারণ দুটি প্রথমত শহরের সীমাবদ্ধ ভূগোলে ল্যাণ্ডমার্কগুলো পরিচিত, এর পৌরবিন্যাস পরিচিত, এ- কারণে একটি পরিচিত আবহ একটি চেনা প্রেক্ষাপট আগে থেকেই নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। ঐ চেনা প্রেক্ষাপটে কবির চিন্তাগুলো যখন স্থাপিত হয়, তখন একটি সঙ্গতি আপনা থেকেই অর্র্জি হয় : দ্বিতীয়ত, শহরের বাস্তবতা একটি বর্গমাইলে সীমিত স্থানে উন্মোচিত হয় বলে একটি তীব্রতা এবং তীক্ষ্ণতা যেমন তার থাকে, তেমনি থাকে ঐ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের একটি উহ্য আহ্বান। আমরা উল্লেখ করতে পারি স্টিভেন ডেডেলাসের দ্বন্দ্বের, যখন তার প্রিয় নগরীর রাস্তা দিয়ে সে হাঁটে এবং তার চেনা দৃশ্যপট-ঘরবাড়ী, যানবাহন, গীর্জা অথবা সমাধিক্ষেত্র তার পরিকল্পনাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করে সময়ের ও স্থানের যুগল সাঁড়াশির নীচে ফেলে ফেলে এবং আমরা অনুভব করি যত স্টিভেন পরিচিত দৃশ্যাবলী দ্বারা আক্রান্ত ও ব্যতিব্যস্ত হয়, তত তার ঐ বাস্তবতাকে অতিক্রম করে সময় ও দেশহীন এক নির্বিশেষ বোধ অর্জনের ব্যস্ততা। শামসুর রাহমানের শহরÑ ঢাকা অথবা নামহীন, নিশানাহীন এক archetypal শহর, মহাদেশহীন, শতাব্দীবিহীন- অতি অবশ্যই চেনা দৃশ্যপটে উন্মোচিত হয়; কিন্তু ঐ দৃশ্যপটের ভিড়ই অবধারিত করে একটি পরাবাস্তবে উত্তরণকে। ‘পারিপার্শ্বিকের আড়াল’-এর মতো আরও অনেক কবিতা আছে শামসুর রাহমানের (‘চায়ের দোকানে বসে’, ‘আঘাটায়’, ‘তুমি বলেছিলে’- তালিকাটি অনন্ত করা যায়) যেখানে একটি প্রকাণ্ড টেলিফোনের মতো, অকস্মাৎ, বাস্তবের মাপজোক, তার জ্যামিতিক বিন্যাস অথবা কার্যকারণ সূত্রকে উপেক্ষা করে একটি পরাবাস্তব সত্য মূর্ত হয়, এক ঝলকে যা আমাদের শিকড়হীন বিচ্ছিন্নতা- স্পৃষ্ট জীবনকে একটি গভীর সমতলে স্থাপন করে। শহর যে সমাধান দেয় নাগরিকের অ্যাবসার্ড অস্তিত্বের আরও অ্যাবসার্ড সব সঙ্কটের, তারা ঐ একটি ভিন্ন প্রেক্ষিতে, সময়কাল ও স্থানহীন এক বিচ্যুতিতে অর্থবহ হয়। বাস্তবের মাপকাঠিতে এ কোনো সমাধানই নয়, কিন্তু নাগরিকের এছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

শামসুর রাহমানের যে সকল কবিতায় নগর এক এক একটি জটিল মানসিক অবস্থার দ্যোতক, বা প্রতীক এবং যেখানে পরাবাস্তব সমাধান অর্জিত হয়, বা অর্জনের প্রচেষ্টা হয় (পরাবাস্তবের অঞ্চলে এ দুয়ের মধ্যে কোনো মূল্যগত ব্যবধান নেই) সেসব কবিতার তালিকা ক্রমশই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম হচ্ছে (তিনি ক্রমাগত লিখে যাচ্ছেন, বছর বছর কবিতার বই বেরুচ্ছে তার)। তার তিরিশ-ঊর্ধ্ব সংখ্যক কাব্যগ্রন্থের যে কোনোটি হাতে নিলে, এবং তা থেকে যে-কোনো কবিতা বেছে নিলে এমন অবস্থার হয়তো আমরা মুখোমুখি হব যেখানে বাস্তবতার প্রবল দংশনে কবি ক্রমাগত শহরের নিবিড় ভূগোলে প্রবিষ্ট হচ্ছেন, ক্রমাগত তার চেনা দৃশ্যপটের ওপর একটি চাদর পড়ছে এবং তিনি ও তার শহরের মুখশ্রী পরিবর্তিত হচ্ছে। এই নকশাটি মোটামুটি একটি চিহ্নিত নক্সা তার কবিতায়, ঘুরে ফিরে আসে নানাভাবেÑ হয়তো উপাদানসমূহের বিন্যাস হয় ভিন্ন, অর্থের ভেতরের যে মিহি অর্থ কবিতার একটি চিত্রকল্প, শব্দকল্প অথবা এমনকি শব্দও আদায় করে নেয় তার সুবাদে; কিন্তু কিছু উপাদানের পরিবর্তন হয় না। রাস্তাঘাট, পার্ক ও দেয়াল এবং মধ্যরাত ও জ্যোৎস্না-প্রায়শঃই অপরিবর্তিত থাকে, এমনকি যখন বাস্তব শহরের এক বিকল্পও নির্মিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তখনও এইসব চেনা-অচেনার যুগলবন্দিতে সেসব উপস্থাপিত হয় :

মাঝরাতে যখন ভীষণ একা আমি,

যখন আমার চোখে ঘুম নেই একরত্তি, আমি

বিপর্যস্ত বিছানায় পড়ে আছি ক্রুশের মতন,

তখন অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে

কে এক নৃমুশুধারী অশ্ব এসে বলে :

শোনো হে তোমার

নিজের শহরে আজ আমাদের রাজ

পাকাপোক্ত হলো

(‘কবির অশ্রুর চেয়ে দামী’/‘ইকারুসের আকাশ’)

মাঝরাত, একাকিত্ব, নিরাময়হীন অসুখ এবং পরাবাস্তব ঘোড়া। শাগালের চিত্রকলা আবার জীবন্ত হয়। আমরা জানি এ কবিতায় একটি জোলো আশাবাদ পরাজিত হয় বাস্তবতার কশাঘাতে, কবিতার শেষ স্তবকে কবি এইসব কথা লিখে অধিক রাত্তিরে কাঁদতে থাকেন, প্রতিকারহীন তার সেই কান্না। কিন্তু যেহেতু আমরা শামসুর রাহমানের শহরকে চিনি, তার নান্দনিক পরাবাস্তবিক metamorphosis–এর লক্ষণগুলোকে চিনি এবং কখন কোন অবস্থায় ঐ মেটামরফোসিস শুরু হবে তা জানি, কাজেই উপাদানগুলোকে একটি ভিন্ন বিন্যাসে স্থাপন করে ভিন্ন একটি নক্সা পেয়ে যাই। ‘তোমার শহরে, শোনো, একটিও ভিক্ষুক নেই আর।/হাসপাতালের সব বেড খালি, কেননা এখন/আর রোগী নেই কেউ’ ইত্যাদি তখন নিতান্ত জোলো আশাবাদের উচ্চারণ থাকে না আর, একটি অর্জনযোগ্য অবস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক কবিতায় শহর সবসময় তার বাস্তবতার পরোক্ষ একটি বিকল্প অবস্থা নির্দিষ্ট করে। এলিয়টের লন্ডন শুধু অলীক অসম্ভবের শহর নয়, এর নিসর্গ ধূসর এবং জরাগ্রস্ত নয় শুধু, ‘দি ওয়েস্টল্যাণ্ড’-এর দীর্ঘ ধ্রুপদী প্রেক্ষাপটে অতীতের (এলিজাবেথ ও লিস্টারের এলিজাবেথিয় লন্ডনের বিভা ও জৌলুস একটি নস্টালজিক চিত্রকে ভাষা দেয়) কিছু ঔজ্জ্বল্য বর্তমানের গ্লানিকে ঢেকে ফেলে এবং একটি বিকল্প সম্ভাবনাকে মূর্ত করেÑ যে সম্ভাবনা পূর্ণতার। শামসুর রাহমানের শহর মাঝে মধ্যে বদলে যায়, তার স্থানে স্বপ্নের কিছু নির্মাণ দাঁড়িয়ে যায়। যদিও আধুনিক শহরে একটি শর্তই হলো এই যে, এর থেকে কারো পরিত্রাণ নেই এবং এর বিস্তার ক্রমশই ক্রুর ও করাল হতে থাকে, কিছু কিছু স্বপ্নের ভগ্নাংশ তবুও তার বিস্তারের বাইরে থেকে যায়। তার ওপর ভর করে কবি তার পাঠককে কিছুটা অনুপ্রেরণা দিতে চান। কিন্তু আধুনিক কবিতার কবি ও পাঠক উভয়ের একটি অভিন্ন অনুধাবন এই যে, বাস্তবতাকে কোনো নির্মাণের পেছনেই আড়াল করা যায় না- সে বড় হƒদয়হীন এবং নিষ্করুণ। এ জন্য কবির আশাবাদ কবিতার গণ্ডীর বাইরে বিস্তৃত করতে উৎসাহী হয় না পাঠক, তার অভ্যাসজাত fatalism-এর জন্য। এবং যেহেতু কবিতার সীমিত পরিসরে পাঠক পূর্ণ নম্বর দেয় কবিকে, দিতে হয় বলে, কবি অর্জন কের নেন বলে, বিকল্প চিত্রগুলো এতটা আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায়।

শামসুর রাহমানের শহরও, একই কারণে বাস্তব এবং বাস্তব-অতিরিক্ত, বাস্তব-উত্তর কোনো ভিন্ন মাত্রায় বৈধ শহর; একই সঙ্গে textual-এবং extratextual. শামসুর রাহমান বাংলা ভাষার আধুনিক কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ- তা তার চিন্তা, ভাবনা, ভাষা, ফর্ম, অবস্থান, তার সামগ্রিক modernist প্রকৃতি-প্রবৃত্তি ইত্যাদির জন্য এবং শহরকে modernism- এর প্রধান রীতিতে ব্যবহারের জন্য। আধুনিকবাদ যতটা থাকে text-এ, তার বেশি থাকে তার বাইরে এবং তাকে আত্মস্থ করতে হলে আধুনিকতার সমগ্র ধারাটিকে বেষ্টন করতে হয়। শহর অনেক কবিতায়, আধুনিক কবিতা বা শামসুর রাহমানের কবিতায়, একটি দূরস্থিত আভাস মাত্র হতে পারে; এমনকি ইট সিমেন্ট বা দালান-অট্টালিকার পরিচিত অনুষঙ্গে মূর্ত না-ও হতে পারে। ইউরোপে দ্ইু মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের নগরপীড়িত বহু কবি শহরকে ভূগোল-নিরপেক্ষ একটি বোধের প্রকাশে মাত্র পরিণত করেছেন। অসুখ কথাটি উচ্চারিত হলেই নগরের ধূসর পঙ্গুত্বকে পাঠক স্মরণ করে, গ্লানি, অবসাদ, ennui ছাড় textual signifier স্থাপনের প্রয়াস। এর পেছনে আধুনিক মনস্তত্ত্ব যেমন প্রভাব রাখে, তেমনি রাখে ফর্ম নিয়ে আধুনিক শিল্প সাহিত্যে প্রচণ্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষ করে- চিত্রকলার ফর্ম ভাঙা, জ্যামিতি-নির্ভর (কিউববাদকে জ্যামিতির পরাবাস্তবতা বলা যায় কি?) আন্দোলনটি, যাকে কিউববাদ বলে আমরা জানি। এইভাবে একটি অন্তঃসারকে আকারের আদল দেয়ার চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়- বোকাচিও তার ‘ডেকামেরন’- এ সবগুলো গল্পে অনুপস্থিত নগরকে উপস্থিত করেন, কোনো বর্ণনা, ব্যাখ্যার মধ্যদিয়ে নয়; শুধুই আভাসে এবং ইঙ্গিতে। কবে শেষ হবে মহামারি- এই মনখারাপ করা প্রশ্নটি তেমন নষ্টালজিয়াকে প্রাণ দেয়, যা শহুরে মানুষ শহর ছাড়া হলে অনুভব করে। বোকাচিও অবশ্য বলেন না মহামারি ঐ নগর সভ্যতার অবদান; হয়ত বলেন কিন্তু তার বক্তব্য স্পষ্ট নয় কখনও কিন্তু আমরা জানি শহর থেকে দূরে স্বাস্থ্যবান প্রকৃতি-সান্নিধ্যে এলেও নগরÑ অধিকৃত মানুষজনের নষ্টালজিয়ার প্রকৃত অর্থ কি। দাঁন্তের নরকের এক চরিত্র যেমন বলে, নরক তো সঙ্গে নিয়েই এসেছি, তেমনি আধুনিক শহরবাসী তার অন্তহীন নরকবাসের কথা মনে করে।

শামসুর রাহমানের শহর অনেক সময় ঐরূপ সংক্ষিপ্ত একটি চিত্র, একটি আভাস, বা অসুখ এবং অবসাদ ইত্যাদি উপচেপড়া শব্দের সাহায্যে অঙ্কিত হয়। কখনও কখনও এজরা পাউন্ডের সেই মেটো স্টেশনে দেখা কালো ফুলের পাপড়ির মতো মানুষজন নির্দেশ করে, নিতান্ত ইমেজিস্টিক পদ্ধতিতে, তার শহর। অনেকে মনে করেন, নগর মানেই এক বোধহীন বিস্তার এবং তার উপস্থাপনায় কবিকে বর্ণনার দ্বারস্থ হতে হবে, অনেকটা বেশি পরিমাণেই, কারণ কোনো বর্ণনাই শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত নয় ঐ protean, চির-পাল্টাতে থাকা দৃশ্যাবলী- সমৃদ্ধ নগরের রূপায়নে। কিন্তু সব বর্ণনাই কি text  নির্ভর হবে, সব বর্ণনাই হবে ভাষা নির্ভর? শব্দ যখন বাড়তে থাকে, শব্দের জরুরি অবস্থা নির্ধারণ করে চিন্তা, thought- কে, একথা বলেন রোনাল্ড বার্থ। চিন্তাও যখন বিমূর্ত হতে হতে অস্পষ্ট অথবা খুবই সূক্ষ্ম concept- এ পরিণত হয়, তখন কি থাকে? শামসুর রাহমানের একটি কবিতার নাম অন্ধ দেয়ালের সাথে, (‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’)। কবিতার মূল বিষয় নিয়ে পাঠকের কোনো দ্বিধা থাকে না, শিরোনামে তা প্রকাশ্য। কিন্তু ওটিকে প্রচলিত শহুরে কবিতা বলা যাবে না। প্রচলিত নগর- চিত্রকল্পগুলো অনুপস্থিত এ-কবিতায়। কিন্তু যে গভীর অবসাদবোধ, অতীতমুখিতা এবং অস্তিত্ববাদী শূন্যতা এ কবিতার ভিতরে সুর তোলে, তাদের সঙ্গে কবিতার-বাইরে কিছু বিষয় যুক্ত হয়। তারা যুক্ত হয় মনস্তত্ত্বের জটিল বন্ধনে, অভ্যাসের চর্চায়, সভ্যতার নগর ভিত্তিক নানা উপাচারের বাহুল্যে। এক সময় এ রকম উচ্চারণ শুনি :

কতিপয় উপরাজ ল্যাম্পপোস্ট পেরিয়ে এই যাওয়া

স্বপ্নের ভেতরে হেঁটে যাওয়ার মতন মনে হয়-

এবং আমরা আবিষ্কার করি শামসুর রাহমানের নিজস্ব নাগরিক ভুবন। যেন একটি চিত্রের কিছুটা আভাস দেন আমদের। বাকিটা, আধুনিক কবিতার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাঠকের মতো, কবির সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ ষড়যন্ত্রে অভ্যস্ত ইয়ারের মতো আমরা পূরণ করে নিই। এই না-বলা অংশটি, এই টেকসট,-বহির্ভুত, নির্মাণটি আধুনিক পাঠকের প্রতি-উপাচার; এর নির্মাণেই আসলে কবির শক্তিটি প্রকৃতভাবে ধরা পড়ে।

একথা সত্যি যে শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি বলে আমরা একটি চিহ্নিত আসনে বসিয়ে রেখেছি- সিনেমার পরিচালকের ক্যাম্বিসের চেয়ারের মতো একটি প্রথাগত আসনে; কিন্তু নাগরিক তিনি কি অর্থে? তার শহর, যার ভৌগোলিক নামটি প্রয়োজনীয় নয়, এখন কমবেশি সর্বত্র বিস্তৃত; শুদ্ধ নিসর্গবাদী ছাড়া সকল কবি এর নাগরিক। শুধু শহর নিয়ে লিখলেই নাগরিক কবি হওয়া যায় না, একথাটি সরল পাঠকেরও জানা। শামসুর রাহমান যে অর্থে নাগরিক, তা ঐ শহরকে একটি বোধের একটি প্রতীক অথবা অপরিহার্য উৎপ্রেক্ষার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার; সভ্যতার একটি স্তরে কতটা মানুষের চিন্তার উত্তরণ হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করে তার শহর। তার শহর আমরা আমাদের ভিতর আবিষ্কার করি, যতটা আমরা নিজেদের দেখি ঐ শহরে। এই যুগপৎ কর্মটি সাধারণ নাগরিক কবিরা সম্পাদন করতে সাহায্য করতে পারেন না। সর্বোপরি শামসুর রাহমানের শহর, কিউবিস্ট চিত্রকর পরাবাস্তব জ্যামিতির মতো, যে-বাস্তবের সারাৎসারকে তুলে ধরে, তা থেকে আমাদের একান্ত নিজস্ব শহরটি আমরা চিনতে পারি, নির্মাণ করতে পারি। তার শহর একসময় শহুরে-ল্যান্ডমার্ককেই ধ্বংস করে, অস্বীকার করে এবং আমাদের সময় ও দেশহীন এক পরাবাস্তব মাত্রায় নিয়ে যায়। সেখানে, আমরা জানি, আমাদের চিত্তের মুক্তি হলেও হতে পারে, বাস্তবে নেমি ও নিগড় থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি।

গ্রন্থপঞ্জি

উমবার্তো ইকো, ‘দি মিথ অফ সুপারম্যান (১৯৭২)

‘এ থিওরি অফ সেমওটিকস’ (১৯৭৫), রোনাল্ড বার্থস, ‘ক্রিটিক্যাল এসেজ’ (১৯৬৪/৭২) ‘রাইটিং ডিগ্রি ডিরো’ (১৯৬৭),

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares