‘মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়’ : বেলাল চৌধুরী

ক্রোড়পত্র : শামসুর রাহমান

মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়,

বৃথা যায়, বৃথা যায়’

বেলাল চৌধুরী

কবি ও কবিতা আর শামসুর রহামান- আমার কাছে ও কথাগুলো এমনভাবে মিলেমিশে অচ্ছেদ্য ও একাকার হয়ে আছে যে, এগুলোর আলাদা কোনো অস্তিত্ব আমার কাছে নেই।

তবু হৃদয়বান শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার দেখা এবং প্রীতি সম্ভাষণ বিনিময় হতো, মেশামেশিও করতাম কখনো কখনো- তবে এসবই সামাজিক, সাংসারিক, বন্ধুবৎসল, গৃহী, সম্পাদক, সজ্জন, মৃদুভাষী লাজুক শামসুর রাহমানের সঙ্গেই। আর কবি শামসুর রাহমান, যিনি কবিতা লেখেন, তাকে তো মাটি থেকে পাহাড়ের চূড়া দেখার মতোই আমার দেখা দেখি।

শামসুর রাহমান বহু দিন হলো ধূমপান ছেড়ে দিলেও অশেষ সৌভাগ্যবশত তার কাব্যসুধারস থেকে তিনি আমাদের বঞ্চিত করেননি। শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিন কয়েকটি ছাড়া।

বাংলা কাব্যে শাম্স-সূর্যের মতোই যিনি নিয়ত বহমান এবং বিস্তৃত। সূর্যের প্রধান কাজই তো চারদিক আলোকিত করে তোলা। আমাদের গৌরব-রবিও তাই করে গেছেন।

চলে যাওয়ার আগে যিনি ৭৮ বছর বয়সে সমান দাপটে কবিতা লিখে প্রমাণ করে গেছেন যে, কবিরা যা বলেন তা কখনোই বাগাড়ম্বর নয়। কবিতাঅন্তঃপ্রাণ শামসুর রাহমানই বলতে পারেন, ‘একদিনও যদি বেশি বাঁচি তাহলেও কবিতা লিখে যাব।’ কি বিস্ময়কর এবং আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে কত অনায়াস-দক্ষতায় তিনি এটা চিরায়ত ‘করে গেছেন’ না বলে ‘যেতে পেরেছেন’ বলাটাই অধিকতর সঙ্গত। নিরলস ও ব্যাপক সৃজনশীল তাঁর রূপালি আঙুল অবিরাম ঝর্ণাধারার মতো আধুনিক বাংলা কবিতার অন্তরঙ্গ বহিরঙ্গকে সার্বিক পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে সমৃদ্ধতর করে গেছেন। তাঁর আন্তরিক সৎ, নিষ্ঠাপূর্ণ ও পরিশ্রমী পরিচর্যায় বাংলা কবিতা যে সুপুষ্ট স্বাস্থ্যবান ও অনিন্দ্যকান্তি ধারণ করেছে সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। তিনি যে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং স্থায়ী আসনের অধিকারী সে ব্যাপারেও দ্বিমত পোষণ করার উপায় নেই।

বিগত ছয় দশক ধরে তিনি অসামান্য স্থিতিস্থাপক শিল্পনৈপুণ্য ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে অবিশ্রান্তভাবে পরিণত দূরদৃষ্টির সঙ্গে লিখে গেছেন স্ফূলিঙ্গসম সব পঙ্ক্তিমালা, তাতে রীতিমতো দাবানল হয়ে উঠলেও কারোরই কিছু বলার থাকে না। তাঁর কবিতার অন্তর্ভুক্ত চিন্তাশীলতা, ভাষার ঐন্দ্রজালিক নির্মাণ এবং অভ্রান্ত স্বাতন্ত্র্য তাকে তার সমকালীন সহকবিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করে তুলেছে। বাস্তবতার জগৎ ও কল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে কবিতার নিংড়ানো নির্যাসটুকুই ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। তাঁর কবিতার প্রাসঙ্গিক উপাদান স্বদেশ সমকাল হয়েও বিশ্বজনীন। বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের জীবনব্যাপী দৈনন্দিন কাব্যিক ব্যবহারেও তিনি সাবলীল এবং স্বতঃস্ফূর্ত। ফলত তাঁর কবিতা এমন একটি ভূমণ্ডল নির্মাণ করে, যা তন্মহূর্তে অর্থাৎ যে সময়ে আমরা এবং স্বয়ং কবি যুগপৎভাবে বসবাস করে আসছি বা করছি কবিতার মধ্যে সেই অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাতেই বসবাস করে আসছি বা করছি কবিতার মধ্যে সেই অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকেই অবলীলায় সঞ্চারিত করতে পারেন তিনি, যে নিঃসন্দেহে মহৎ কবি। তা না বললে গুরুতর অপরাধ হয়। শামসুর রাহমানের সমগ্র সৃষ্টির বর্ণনা বোধহয় একজন মানুষের জীবনের মাঝেই বর্ণনীয় হতে পারে যিনি কবিতাকে বাস্তব ও স্থায়ী জীবনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ কবির বোধোদয় ঘটল পাকিস্তানিদের বর্বরতার সঙ্গে আর বেশি দিন আমাদের সম্পর্ক টেকার নয়। তারপর সেই অনিবার্য ৭ মার্চের আকস্মিক বিস্ফোরণের পর বেশ ভালো করেই টের পাওয়া গেল এদের বর্বরতা কোন পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে। অবশ্য ভাষা আন্দোলন থেকেই সেটা প্রকট রূপ ধারণ করে আসছিল। পরবর্তী সময়ে একের পর এক শাসন-শোষণের নিগড় যতই কঠিন থেকে কঠিনতর দিকে এগোচ্ছিল, ততই যেন আপাদমস্তক রোমান্টিক শামসুর রাহমানের ভেতরও একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছিল। অর্থাৎ তার কবিতায় ক্রমশ সমকালীন বাস্তবতার ছাপ পড়তে শুরু করেছে। এসব পর্যায়ে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের শহীদকে নিয়ে ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ তার কবিতায় ঝলসে উঠতে থাকে হীরক দ্যুতিতে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কবিকে পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিতে হয় নিজ বাসভূমি পাড়াতলী গ্রামে। পলাতক জীবনেও কবির কলম কিন্তু কোনো সময়ই থেমে ছিল না। লিখে গেছেন একের পর এক অগ্নিঝরা কবিতা। যেগুলো মুক্তিযোদ্ধারা বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায়। সেখানে তার কবিতার অন্যতম গুণগ্রাহী মনীষী আবু সয়ীদ আইয়ুব কবিতার উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ জড়ানো স্বতোৎসারিত কবিতাগুলোকে এক সঙ্গে গ্রথিত করে পুস্তকাকারে বের করা হয়েছিল ‘নিজ বাসভূমে’ নামে। শুধু কবির নিরাপত্তার দিকে চেয়ে কবির নামকরণ করেছিলেন মজলুম আদীব বা নির্যাতিত মানবাত্মা নামে। পরবর্তী সময়ও কবির কলম সমান গতিতে চলতে চলতে অসংখ্য স্মরণীয় পঙ্ক্তিমালা উপহার দিতে থাকে জাতিকে। বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর কবির কলম যেন আরো শাণিত হয়ে ওঠে।

এভাবে আশির দশকের শুরুতে ধীরে ধীরে স্বৈরাচার তার লক্ষণবিশিষ্ট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। এসব সুযোগে ধর্মান্ধ মৌলবাদ তার প্রকৃত রূপ ধারণ করতে থাকে। কবির নিজের লেখনী থেকেই বলা যাক, ‘সম্ভবত ১৯৮১ সালে একটি কি দুটি করে উট আটরশির পীর সাহেবের উৎসাহ এবং উদ্দীপনায় বাংলাদেশে আসতে শরু করে। আমি সেই উটদের স্বচক্ষে দেখিনি। কিন্তু সেই বছরেই আমি একটি কবিতা লিখে ফেলি। কবিতাটির নামÑ ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ সেই কবিতার দুটি পঙ্ক্তি এ রকমÑ ‘উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়, মুক্তিযুদ্ধ/হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায় বৃথা যায়।’

“তখন জেনারেল এরশাদের আমল শুরু হয়ে গেছে। আমি যে পঙ্ক্তি দুটি রচনা করেছিলাম তার মর্মার্থ ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এর দু’তিন বছর পর এক দুপুরে, তখন আমি দৈনিক বাংলার সম্পাদক, দফতরে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ রাস্তা থেকে কলরব ঢুকে পড়ল আমার কামরায়। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি উটের কাফেলা চলছে। অনেকগুলো সুসজ্জিত উট। উটগুলোর পেছনে অনেক মানুষ ছোটাছুটি করছে। ঢাকা শহরের সবখানে সেই কাফেলার কথা রটে গেল।

পরে শুনলাম, সে সব উটের প্রস্রাব সেবন করলে বিমারি গায়েব হয়ে যাবেÑ এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে অনেকেই উটের কাফেলার পিছু নিয়েছে। সেই দাওয়াই পান করে তাদের রোগমুক্তি অথবা আশা পূর্ণ হয়েছিল কিনা, তা জানা আমার সাধ্যাতীত ছিল, এ কথা জানতে আমি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করব না। তবে এ কথা সহজেই বলতে পারি, আরবের উটের পিঠে কিনা, উদ্ভট হয়ে পিঠে সওয়ার হয়ে যে আমাদের প্রিয় দেশ ক্রমাগত দিশাহারা হয়ে পড়েছে খানাখন্দে পড়ছে বারবার এবং অসহায় আমরা অনেকেই যে ‘মুক্তিযুদ্ধ, হায় বৃথা যায়, বৃথা যায় বৃথা যায়’ বলে বিলাপ করেছি, এটা তো সত্যি- কিন্তু মনে হয় এই বিলাপ অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছু নয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কি কিছু অবশিষ্ট আছে আর? আমাদের স্মৃতিতে ধোঁয়াশার মতো রয়ে গেছে যেন। শুধু ধূসর কিছু স্মৃতি, এটাই কি মেনে নিতে হবে আখেরে? কারা এই জবাব দেবে? কত কাল আমরা উদ্ভট উটের পিঠে সওয়ার হয়ে থাকব?” 

বারবার শুনে এসেছি এবং বিশ্বাসও করি কবিরা দ্রষ্টা। শামসুর রাহমান যে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে।

মৃত্যু আছে বলেই জীবন এত সুন্দর। নইলে জীবন তো জরাগ্রস্ত হতো। মৃত্যু এসে জীবনের সমস্ত আবিলতাকে মুছে দেয়। এ জন্যই হয়তো শামসুর রাহমান মৃত্যুকে অতিক্রম করে জীবনের চির অগ্রসরমান গতি বা সারাৎসারকে এমন গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন। মহাজনবাক্যে নিবদ্ধ-মৃত্যু কখনোই জীবনকে পরাস্ত ও ব্যর্থ করে না। মৃত্যুই বরং জীবনকে সার্থক ও পরিপূর্ণ করে তোলে। যেমনটা দেখা যাচ্ছে আমাদের গৌরবরবি অস্তাচলে যাওয়ার পরও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares