বন্ধু শামসুর রাহমানকে নিয়ে : সৈয়দ শামসুল হক

ক্রোড়পত্র : শামসুর রাহমান

বন্ধু শামসুর রাহমানকে নিয়ে

সৈয়দ শামসুল হক

এই লেখা উঠে এসেছে তোমার স্বদেশের বুক থেকে,

এই লেখা উঠে এসেছে এ দেশের প্রতিটি নদী থেকে

যে সব নদী তরঙ্গায়িত হতো তোমার শিরা-উপশিরায়,

এই লেখা উঠে এসেছে সে সব ক্ষেত থেকে

যাদের ফসলের ঢেউ ধারণ করতো তোমার হৃদয়।

শামসুর রাহমান : তোমারই পদধ্বনি

কবির কবরের মাটি ভিজে যাচ্ছে প্রবল বর্ষণে। শুধুই কি ভাদ্রের বৃষ্টি? অশ্রুও কি নয়? মানুষের সুখ-দুঃখে প্রকৃতিও থাকে না উদাসীন কিংবা দূরে- বলেছেন শেক্সপিয়র; তাই মেঘ বৃষ্টি ঝরিয়ে চলেছে। শামসুর রাহমানকে মাটিতে রেখে আসবার পরদিন ভোরে একাকী গিয়েছিলাম বনানী কবরস্থলে। ভোর কী বিষণ্ন হয়ে আছে! চারদিকে নত ফুলগাছ প্রতিটি কবরে- যেন ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এই মাটি, এই মৃতদের সমাবেশস্থলে মাটি গ্রহণ করেছে বাংলার শ্রেষ্ঠ এক সন্তানকে আমাদের প্রথম কবিকে, শামসুর রাহমানকে। নির্জন নিস্তব্ধ ভোরে কবির কবরের দিকে তাকিয়ে দেখি লালচে মাটির সেই বুকে ঘাস- অন্য কোনো মাটি থেকে ঘাসের চাপড় এনে ঘাস কেউ বিছিয়ে দিয়েছে সবুজ গালিচা করে, কবরের বুক ঢেকে, অতলে শায়িত কবির দেহ আবৃত করে। এতই তাজা সে ঘাস, যেন কতদিন আগে চলে গেছেন শামসুর রাহমান; বাংলার সবুজ আঁচল যেন তাকে বড় জড়িয়ে রয়েছে।

বাংলা ছিল তাঁর নিজবাসভূম। কেবলি তা শারীরিক নয়, ভৌগোলিক নয়, বরং অধিক সেটি মানসিক, মননে-  চৈতন্যে। বাংলা তো একটি দেশ মাত্র নয়, বাংলা একটি অনুভব। কবি তিনি। শব্দ তাঁর বর্ণ আর স্বর। সেই স্বরের বাহন যে শব্দ, উচ্চারণ যে ভাষা, সেই ভাষার বর্ণমালা ছিল তাঁর নিজবাসভূমে গৃহের কাঠামো। সেই বর্ণমালার উদ্দেশে শামসুর রাহমানের গাঢ় উচ্চারণ আমার কানে পশে তাঁর কবরের পাশে এসে ভোরে দাঁড়িয়েÑ

আজন্ম আমার সাথী তুমি,

আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে,

তাইতো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে পড়ে

আমার বন্দরে।

সেই সুনন্দ জাহাজের আরোহী আজ ত্রিলোকের শেষলোকে চলে গেছেন। আমি পড়ে আছি। তাঁর সবসময়ের একমাত্র কবিতার আমি- শেষ আমি, এই আমি। দুঃসহ শোক ও শূন্যতায় এখন আমার প্রতিটি কোষ কেঁপে উঠছে। জীবন অগ্রসর হয়ে চলে, আমরাও এগিয়ে যাব, বাংলা কবিতাও এগিয়ে যাবে, এগিয়ে তো চলেছে। আমি অবসন্ন, এখন আমাকে পেছন ফিরে দেখতে হচ্ছে- কাকে? সেই কবিকে, তারও অধিক এক ব্যক্তিগত বন্ধু সতীর্থকে।

বাংলা এই শব্দ-বন্ধু-আমরা কী অবলীলায় প্রতিপদে বহুজনে ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু প্রকৃত যে বিভাব ওই বন্ধু শব্দে, আমরা কী বুঝে উঠি। সম্ভবত বুঝি যখন কেউ চলে যায়, তখনই যখন আমাদের আর্ত উচ্চারণে বিশ্বই যেন বিদীর্ণ হয় যে- এই তো সে জন যিনি বন্ধু যাঁকে আমি হারালাম। নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার বন্ধুজন কত কম। মাত্রই ক’জন, সাহিত্যের সংসারে তো একজনই ছিলেনÑ শামসুর রাহমান, যাঁর সঙ্গে একই পথে হেঁটেছি, একই সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, বয়সে তিনি আমার ছ’বছর আগে জন্ম নিলেও যাঁর সঙ্গে একই উদরের যমজ হয়ে উঠেছি সেই বাহান্ন সাল থেকে, রাষ্ট্রভাষার সেই বছর থেকে। বাহান্নরই সন্তান আমরা। বাহান্নর চেতনা থেকে জাত এই আমরা ক’জন। হাসান হাফিজুর রহমান চলে গেছেন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ আর নেই, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ গত, সেই সময়ের শামসুর রাহমান- বয়সে আমাদের সবারই ঈষৎ জ্যেষ্ঠ, তিনিও আজ শুয়ে আছেন তাঁর শ্যামলীর বাড়ি থেকে আমাদের কাঁধে কাঁধে বাহিত হয়ে বনানীর শ্যামল ঘাসের চাদরের তলে।

বৃষ্টি পড়ছে। অশ্রু পড়ছে। সেই বৃষ্টি আর অশ্রুর মিশে যাওয়া আলো-আঁধারির ভোরে শামসুর রাহমানের কবর থেকে উঠে আসছে এই লেখা। এই ‘উঠে আসবার’ কথাটিও তাঁর। ঘাতকের হাতে নিহত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে শামসুর রাহমানের বেশ কিছু কবিতার একটিতে তিনিই তো লেখার এই উঠে আসবার কথা বলেছিলেন। এই উঠে আসা-উৎসকে শনাক্ত করা। ‘তোমারই পদধ্বনি’ নামে শামসুর রাহমানের সেই কবিতা যে বাংলার নদী-বৃক্ষ-মাঠ, কৃষক, লাঙল, শ্রমিক ও ভূমিসংলগ্ন কত কিছুই না থেকে যে উঠে এসেছে, সে কেবল সেই বিশেষ কবিতার জন্যই সত্য নয়, সত্য তাঁর সমগ্র কবিতারই। শামসুর রাহমানের সমস্ত কবিতাই এই মাটি থেকে নির্গত, নির্মিত।

কিন্তু তারপরও পেছনে ফিরে দেখি, একদিন আমিই তাঁকে বলেছিলামÑ আপনার পা মাটিতে, এই মাটিতে, কিন্তু করোটি আপনার আছে পাশ্চাত্যের মনোভূম ছুঁয়ে। পঞ্চাশ-ষাট, সত্তরের দশক, এই দশকজুড়ে, তাঁর প্রথম কবিতার কাল থেকে তিরিশটি বছর আমি লক্ষ্য করি কি বিপুলভাবেই না তিনি ফিরে ফিরে গেছেন পাশ্চাত্যের জমিতে, পুরাণে, মহাকাব্যে, মিথে। সেখান থেকে বেছে নিয়েছেন উপমা, চিত্রকল্প, রূপকল্প- অবিরাম। স্মরণ হবে অনেক-অনেক কিছুর ভেতরে টেলিমেকাস, আগামেমনন, ইকারুস, স্যামসন, অডিসিয়সের উপস্থিতির কথা তাঁর কবিতার শরীরে। এমনও আমার মনে হতো, বলেওছি তাকেÑ এর কোনো কোনো কবিতা ইংরেজিতে লিখিত হলেও হতো সেটি খাঁটি কবিতা। আমি তাঁকে তাড়না করেছি, এবার শেষ করুন পাশ্চাত্যের ওই সম্ভার থেকে গ্রহণ, ফিরে তাকান আপনারই পায়ের দিকে, যে মাটিতে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। শামসুর রাহমানকে আমি পায়ের তলায় মাটি, যে মাটি সেই মাটির এক মিথের কথা বলেছিলামÑ চাঁদ সওদাগর। পরদিন কী অসামান্য এক কবিতা তিনি রচনা করেন ওই চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে। ভোরে আমার বাড়িতে এসে শুনিয়ে যান কবিতাটি। আর সেই ভোরে, আজ ভোরে তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে, আমি তাকে বলেছিলাম এবার আপনার পাশ্চাত্য ভূমি থেকে নেওয়া মিথভিত্তিক যাবত কবিতার একটি বই করুন- এই হোক আপনার ও ক্ষেত্রের ফসল নিয়ে শেষ বই। সেই বই করেছিলেন তিনি। নামটাও আমিই দিয়েছিলামÑ ইকারুসের আকাশ। তিনি গ্রহণ করেছিলেন। বইটি প্রকাশের জন্য দিয়েছিলাম আমারই ছোটভাই সৈয়দ আমজাদ হুসাইনের স্বল্পায়ু প্রকাশনা সংস্থা ‘সব্যসাচী’কে। সে বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলাম আমি শামসুর রাহমানেরই হস্তাক্ষর দিয়ে। পেছন মলাটে বইয়ের বিষয়ে নামহীন যে জ্ঞাপন- লেখাটি লিখেছিলাম, সেখানে বলেছিলাম শামসুর রাহমান সম্ভবত আমাদের শেষ ইয়োরোপমনস্ক কবি। অন্তরালের এই ইতিহাসের একটি স্বীকৃতি রয়ে গেছে শামসুর রাহমানেরই কলমে- ইকারুসের আকাশ তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন। চোখ ভিজে আসে স্মরণ করে। গৌরব হয় এ কথা ভেবে, এরপর তাঁকে আর ফিরে যেতে দেখিনি ইয়োরোপের মিথের ভাণ্ডারে।

আমার যেন মনে হয়, শামসুর রাহমান পুরাণ ও মিথ থেকে নিতে চেয়েছেন কবি জীবনের শুরু থেকেই, যেমন আমরা সকলেই কবিতার জন্য মিথের ভেতরে দেখি এক ঋদ্ধ ভাণ্ডারÑ কিন্তু তিনি মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন বলেই হয়তো হিন্দু বা ভারতীয় পুরাণের দিকে হাত বাড়াতে চাননি। কিন্তু কবিতার অন্তর্গত তাড়না তো রয়েছে, তাই তাঁকে অন্যত্র হাত বাড়াতে হয়েছে- ইয়োরোপে। এর সমর্থনটাও তিনি পেয়েছিলেন বাংলা কবিতার তিরিশের দশকের ইতিহাস থেকে। সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ তাঁকে পথটা দেখিয়েছেন। কিন্তু যে জীবনানন্দ ছিলেন শামসুর রাহমানের প্রথম জীবনের কবি-প্ররোচক, সেই জীবনানন্দই যেমন একদিন গভীরভাবে প্রবিষ্ট করিয়ে দেন বাংলার মাটির মিথে ও শ্যামশষ্পে, শামসুর রাহমানও ঠিক তা-ই করেছেন তাঁর কবিতার তিরিশটি বছর পার করে, পরবর্তী পঁচিশটি বছরে। কিন্তু জীবনানন্দ যেখানে তাঁর জীবদ্দশায় গোপন ও প্রকাশের বিবেচনারহিত করে রেখেছিলেন ‘রূপসী বাংলা’র কবিতাবলি, শামসুর রাহমান তা করেননি। সত্য শামসুর রাহমানের কবিতায় বাংলার ও বাঙালির পুরাণ ও মিথের ব্যবহার নেই-ই ওই চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে তাঁর কবিতাটি সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম, তারও আগে, একাত্তরে হঠাৎ একটি উচ্চারণ- ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা, আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন’, কিন্তু সে খাণ্ডবদাহনেরও উল্লেখ যতটা না ইমেজসমৃদ্ধ, তাঁর অধিক লোকপ্রাপ্ত বাগধারামণ্ডিত; কিন্তু শামসুর রাহমান বাংলার কথা, বাঙালির কথা তাঁর কবিতার একমাত্র বিষয় করে নেন। যদি বা নিজের কথাও তিনি বলে থাকেন, ব্যক্তি তাঁর কথা, তাঁর সেই ব্যক্তিসত্তাই হয়ে ওঠে এক উজ্জ্বল আয়না, যে আয়নায় আমরা দেখে উঠি আমাদেরই মুখ এবং আমাদেরই কাল।

শেষ দিকের কবিতাগুলোতে তিনি যে কৃষ্ণপক্ষের কথা, অমাবস্যার কথা অবিরাম বলে যাচ্ছিলেন, বলছিলেন তাঁর আপনারই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা, বারবার তাঁর কবিতায় যে অঙ্কিত হয়ে চলেছিল দুঃস্বপ্নের চিত্র, দুঃস্বপ্ন থেকে ধর্মাক্ত বিহ্বল হয়ে জেগে ওঠার চিত্র- তাঁর শেষ এসব লেখাগুলোর কলমের কালি এখনো শুকায়নি। সেই কালিই বুঝি আকাশের কালো মেঘ হয়ে এখন অশ্রুবৃষ্টি করছে কবির কবরের ঘাসে। সেখানে তো তিনি শুয়ে আছেন তাঁরই প্রয়াত জননীর দেহাবশেষের কোলে। জননী শুধু একটি শব্দ নয়, জননী প্রতীক- দেশের, মানুষের এবং ভাষার। সেই ভাষার কোলে কবি এখন শুয়ে আছেন। সেই মানুষের স্মরণের ভেতরে তিনি এখন। আর আমি? আমি এই ভাষার প্রাঙ্গণে কবিতার সংসারে বায়ান্নর সন্তান প্রজন্মের শেষ একজন দাঁড়িয়ে আছি বনানীতে আমার বন্ধুর বুকে বাংলার সবুজ ঘাস ও তাঁর বিস্তার ছুঁয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares