কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষ প্রসঙ্গে : শামসুজ্জমান খান

ক্রোড়পত্র : শামসুর রাহমান

বাংলা একাডেমির

কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষ প্রসঙ্গে

শামসুজ্জমান খান

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার আমাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে একদিন গণভবনে ডেকে নিয়ে বলেন: ‘আপনাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি আপনি রাজি হবেন। আপনি আগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই পদটি আপনার জন্য বড় কিছু নয়। আমরা বাংলা একাডেমির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মেতিহাসের সঙ্গে এর একাত্মতার ইতিহাস জানি। তাই বড় ভালোবাসি এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক সময় কেটেছে একাডেমির লাইব্রেরিতে। এখানে দেখেছি কত বিখ্যাত পণ্ডিত আর খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও কবিকে। জ্ঞানী-গুণীদের সেই প্রতিষ্ঠানকে বিগত আমলে (২০০১-০৬) বই পুস্তকের সঙ্গে সম্পর্কহীন লোকজনকে নিয়োগ দিয়ে বেহাল করে ফেলা হয়েছে। আমার বিশ্বাস এই অবস্থা থেকে আপনি একাডেমিকে উদ্ধার করতে পারবেন।’ দায়িত্ব নিতে সম্মতি জানিয়ে ফিরে এলাম।

বাড়ি ফিরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মনে মনে আবার অনুমান করে কীভাবে কী করা যায় ভাবতে থাকি। নানা চিন্তা ও করণীয়ের খসড়া নোটবুকে টুকে রাখি। কাটাকুটি চলে তাতে অনবরত। বাংলা একাডেমির সূচনালগ্নের ইতিহাস ঘাঁটি মনে মনে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. মুহম্মদ এনামুল হক কী করতে চেয়েছিলেন বুঝতে চেষ্টা করি। দৃষ্টিটা সৈয়দ আলী আহসান পর্যন্ত প্রসারিত করি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি চর্চার বাতিঘর বাংলা একাডেমির নবচেতনার সংগঠন প্রক্রিয়া ও অভিমুখটাও বুঝতে চেষ্টা করি।

এইসব ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মহান উত্তরসূরিদের চিন্তা ও কর্মকীর্তির সারসংকলন করে বিংশ শতাব্দীর বাংলা একাডেমির একটা চিত্র মনে মনে দাঁড় করাই। এবং সেখান থেকে কতটুকু নিয়ে একুশ শতকের বাংলা একাডেমিকে কোন আঙ্গিকে কীভাবে সাজানো যায় সেটা ভাবি। সব চিন্তাভাবনা ও করণীয় বিষয় নোট রাখি আমার হাতের কাছে থাকা নোটবুকে। কাটাছেঁড়া হলো, পুনর্লিখনও চলে যথারীতি।

নানা পরিকল্পিত গবেষণামূলক প্রকাশনা এবং সৃজন কাজের বিষয়টি মাথায় রাখি। গবেষণা কাজের মধ্যে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণকে এক নম্বরে রাখি। কারণ রবীন্দ্রনাথ- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী- দীনেশ সেন- রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ১৯০১ সালে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েক বছর চেষ্টার পরও সংস্কৃত পন্ডিতদের বিরোধিতায় সফল হতে পারেননি। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার ব্যাকরণবিদদের সহায়তায় এ কাজ আমরা ২০১১ সালে সম্পন্ন করেছি। বাংলাভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান-ও করা হয়েছে। তিন খণ্ডের এই অভিধান তিন হাজার পৃষ্ঠায় সংকলিত। এমন অভিধান বাংলা ভাষায় আগে প্রকাশিত হয়নি। আরো আছে বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রজীবনীর দুই খণ্ড, বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের তিন খণ্ড, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাস ইত্যাদি। পরিশেষে গুরুত্ব দিয়ে নবপর্যায়ে নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘উত্তরাধিকার’ মাসিক সাহিত্যপত্র।

বাংলা একডেমিকে একুশ শতকের উপযোগী করার লক্ষে এর অবকাঠামোগত দিকে নজর দিতে হয়েছে। এর ফলে গড়ে উঠেছে একাডেমির নান্দনিক নতুন প্রশাসনিক ভবন। বাংলা একাডেমির নামকরণ ও এর রূপরেখা নির্ধারণের কৃতিত্বও এই মহামনীষীর, তাই একবিংশ শতকের উপযোগী এই নতুন ভবনের নামকরণ করা হয়েছে ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভবন।’ নতুন স্থাপত্যকলায় নির্মাণ করা হয়েছে চমৎকার মিলনায়তন। এর নামকরণ করা হয়েছে বাঙালি মুসলমানের মধ্যযুগের বিশাল সাহিত্যকীর্তির আবিষ্কারক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের নামে। আর এই দুই মহান উত্তরসূরির একজনকে  মাথার উপরে রেখে আর একজনকে পাশে রেখে দাঁড়িয়ে আছে ‘কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষ’। এটি আসলে আমদের ছোট মিলনায়তন। এই মিলনায়তনের ব্যবহারই বেশি। বিংশ শতকের বাংলা একাডেমির কিছু ভাংচুর করে তার নবনির্মাণ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান হাউস ঠিকই থাকছে। প্রেস ভবনের নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘কবি জসীমউদ্দীন ভবন’। ওই ভবনের দোতলায় সেমিনারের নামকরণ করা হয়েছে ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভা কক্ষ। নির্মাণাধীন আধুনিক বহুতল বিক্রয় কেন্দ্রের নামকরণ করা হবে ‘ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবন’।

এদের সঙ্গে শামসুর রাহমানের নামে যে হল করেছি তার কারণ আমার একটা লেখা থেকে তুলে ধরছি “শামসুর রাহমানের কবিতা আর বাংলাদেশের রক্তক্ষরণময় উত্থান একাত্ম হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অস্তিত্বের ইতিহাস খুঁজতে গেলে শুধু ইতিহাস গ্রন্থ নয়, শামসুর রাহমানের কবিতায়ও তা খুঁজতে হবে। একজন কবির কবিতাÑ একটি দেশের জন্মের সঙ্গে কতখানি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে, তার নজির শামসুর রাহমান।

শামসুর রাহমান বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে তাঁর কবিতাকে একাত্ম করে তুলতে কী দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলেন তার উৎকৃষ্ট নজির তাঁর ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগুচ্ছ। পাক হানাদারকবলিত দেশ থেকে স্বাধীনতার অবিনাশী কবিতাগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠিয়ে তিনি যে অসীম সাহস ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন, তার তুলনা মেলা ভার। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাও রক্ত গরম করা বাক্যাবলি বা উচ্ছ্বাসময় বাণীঝঙ্কার নয়Ñ তাঁর বহু কবিতাই কালজ হয়েও কালোত্তর। কোনো কোনো কবিতা তো একেবারেই অবিনাশী, যেমনÑ ‘স্বাধীনতা তুমি’ বা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’।

শামসুর রাহমান আমাদের কালের এক প্রধান কবিপুরুষ। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে আধুনিক কবিতা জনপ্রিয় হয়েছে। তাঁর কবিতায় আমাদের কালের আশা-নিরাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অমর বাণীরূপ লাভ করেছে। তাই তিনি একালের যেমন, তেমনি ভবিষ্যতেও এক নন্দিত কবি হিসেবে সংবর্ধিত হবেন বলে আমরা মনে করি।”

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যাবে যে, বাংলা একাডেমির মতো বাঙালির জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক- প্রতিষ্ঠানের জন্যে স্বাধীনতার কবির নামে একটি হলের নামকরণ কতটা অপরিহার্য ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares