কবি শামসুর রাহমান : একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি : সেলিনা হোসেন

ক্রোড়পত্র : শামসুর রাহমান

কবি শামসুর রাহমান : একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি

সেলিনা হোসেন

২০০৫ সালের নভেম্বরের কোনো এক সময়ে দিল্লি থেকে অন্তরা দেবসেনের একটি ফোন পাই। অন্তরা দিল্লি থেকে প্রকাশিত The Little Magazine ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক। ও বলল, আমি দক্ষিণ এশিয়ার লেখকদের জন্য একটি পুরস্কার প্রবর্তন করতে যাচ্ছি। পুরস্কারের নাম TLM SALAM. সার্কের সাত দেশ থেকে সাতজন লেখককে নিয়ে জুরি বোর্ড তৈরি হবে। বাংলাদেশ থেকে তুমি এই বোর্ডে থাকবে। ওর কথা শুনে প্রথমে আমি ঘাবড়ে যাই। বলি, এ কাজটা কীভাবে করব। আমি কয়জনের খবরই বা রাখি। সাত দেশের লেখকদের মধ্যে থেকে বাছাই সহজ কথা নয়।

ও মৃদু-কড়া স্বরে বলে, এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? আমরা নিজেরা প্রাথমিক বাছাই করব। সবার নাম, কাজের ধরন, বইয়ের নাম দিয়ে দেব। অনেক লেখকের লেখাই তোমাদের পড়া আছে। নিজস্ব ধরনের মূল্যায়নও আছে। তার ভিত্তিতে তোমরা নম্বর দেবে। ওর এমন জোরদার কথায় আর পেছানোর পথ পাই না। রাজি হতেই হয়।

পুরস্কারের মূল নাম The Little Magazine South Asian Literary Award for Masters. সংক্ষেপে TLM SALAM. বিষয়টি মাথায় নেয়ার পরে প্রথম মাথায় আসে দুটি কথা। এক. আমার দেশকে পুরস্কারের তালিকায় দেখতে হবে। দুই. আমার মাতৃভাষাকে এ তালিকায় দেখতে হবে। দুই বিষয় আমার মাথায় স্বপ্ন ঘনিয়ে তোলে। যে কবিকে পুরস্কারের তালিকায় আনব বলে মনস্থির করি তিনি কবি শামসুর রাহমান। আমার সুযোগ ছিল যে রাহমান ভাইয়ের অনেক কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে, সেগুলো বই হয়েছে। আমি বিভিন্ন মেইলে শামসুর রাহমানের কবিতা পাঠাই এবং পাশাপাশি এটাও বলি যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং শামসুর রাহমান বাংলা ভাষার বড় কবি। কেউ কেউ উত্তর দেয় যে, তাঁর কবিতা আমরা আগে পড়েছি। কেউ কেউ বলে, তাঁর কবিতা পড়ে ভালো লেগেছে। ইত্যাদি নানা কিছু। একসময় আমার মতামত দিয়ে অন্তরার কাছে নাম পাঠাই। অন্তরা ঠিক করেছিল যে, তিনজন লেখককে পুরস্কৃত করা হবে।

নাম পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। মাস দুয়েক পরে জবাব আসে।  South Asian Literary Award for Masters পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বাংলা ভাষার কবি শামসুর রাহমান। মালয়ালাম ভাষা থেকে হয়েছেন কমলা দাস এবং মারাঠী ভাষা থেকে হয়েছেন বিজয় তেন্ডুলকার। আমার আনন্দের সীমা নেই। রাহমান ভাইকে ফোন করি। খবরটা বলে বলি, অন্তরা আপনাকে ফোন করবে। ইমেইল পাঠাবে। আপনি আমাদের গৌরব বাড়িয়েছেন রাহমান ভাই। স্বল্পভাষী রাহমান ভাই মৃদু হাসেন। আমি বললাম, দিল্লি যেতে হবে। পুরস্কার আনতে।

তিনি বলেন, আমার শরীরতো ভালো নেই। যেতে পারব কি?

বলি, রাহমান ভাই কোনো অজুহাত চলবে না। যেতেই হবে। দরকার হলে ওদেরকে বলব, একজন তরুণ কবিকে আপনার সঙ্গে দিয়ে দিতে। তাহলে হবে তো?

তিনি আবারও মৃদুস্বরে বললেন, দেখি।

২০০৬ সাল শুরু হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে অন্তরার ফোন আসে। বলে, ২৭ মার্চ পুরস্কার প্রদান করা হবে দিল্লির হ্যাবিট্যাট সেন্টারের স্টেইন মিলনায়তনে। কবি শামসুর রাহমানকে অবশ্যই আনতে হবে। তিনি অসুস্থ শুনেছি। আসতে পারবেন তো? আমি অন্তরাকে বলি, তুমি আমাকে যাওয়ার টিকিট না দিয়ে একজন তরুণ কবিকে রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে দাও। তিনি ওকে নির্ভর করে যেতে পারবেন। অন্তরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে, জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে তোমাকে মঞ্চে থাকতে হবে। ও আরও বলল, তুমি নিজে কোনোভাবে কবিকে দিল্লিতে আন। দিল্লিতে তাঁকে দেখাশোনার লোক দিয়ে দেব। 

অন্তরার কথা মানতেই হলো। যথাসময়ে টিকিট এলো। ঢাকা বিমানবন্দরে কবিকে দেখে এয়ারওয়েজ বিমানের একজন ছুটে এসে বলল, কবির জন্য একটা হুইল চেয়ার আনি? আমি বললাম, হুইল চেয়ারের কথা বলেছি। দেবে নিশ্চয়। লোকটি বলল, কখন আনবে কে জানে? আমি এখনই একটা আনি। অল্পক্ষণে হুইল চেয়ার নিয়ে এলো লোকটি। আমি মুখের দিকে তাকালাম। মনে হলো, কবিকে ভালোবাসে লোকটি। দেখেই চিনতে পেরেছে। ছুটে গিয়েছে। এখন নিজেই চেয়ারটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞ বোধ করলাম দেশের মানুষের প্রতি। এভাবেই কবি ও কবিতার জন্য ভালোবাসা প্রকাশ করে মানুষ। আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল কলকাতা বিমানবন্দরে। প্লেন ল্যান্ড করার পরে সব যাত্রী নেমে গেলে এয়ারহোস্টেস বললেন, আপনারা অপেক্ষা করুন। কবিকে হুইল চেয়ারে নামাতে হবে। সেজন্য হাই-ট্রলি আসবে। কবি সিঁড়ি দিয়ে নামবেন না। হাই-ট্রলি এলো। সেই ট্রলি প্লেন বরাবর উঁচু করে সমান করে দিলে তার উপর হুইল চেয়ার বসিয়ে কবিকে সরাসরি নিচে নামানো হলো। বড় ট্রলিতে হুইল চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে আমিও নামলাম। কবি যতক্ষণ ট্রলির জন্য অপেক্ষা করলেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করল বিমানবালারাও। কেউ প্লেন ছেড়ে এভাবেই দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছানো। জিজ্ঞেস করলাম, কষ্ট হয়নি তো রাহমান ভাই? তিনি মৃদু হেসে বললেন, না। দিল্লিতে দু’টি ছেলেমেয়ে তাঁকে দেখাশোনা করেছে। মেয়েটি সারা দিন তাঁর সঙ্গে থাকতো। ছেলেটি রাতে থাকতো। অন্তরা নিজে খোঁজ-খবর নিত। ওষুধ বা অন্যকিছু  লাগবে কিনা জানতে চাইত। দু’টো দিন ভালোই ছিলেন রাহমান ভাই। হাসিখুশিতেও ছিলেন।

২৭ মার্চ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। দিল্লির হ্যাবিট্যাট সেন্টারের স্টেইন মিলনায়তনে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা সামনের সারিতে বসেছেন। কমলা দাস এসেছেন হুইল চেয়ারে। তিনজন পুরস্কৃত লেখককে পুরস্কার তুলে দেবেন তিনজন খ্যাতিমান মানুষ। রাহমান ভাইকে দেবেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনিও এসে পৌঁছেছেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন গিরিশ কন্নড়। তিনি বোম্বে থেকে এসেছেন। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব। বেশ জমজমাট অনুষ্ঠান। মিলনায়তন ভর্তি দর্শক।

গিরিশ কন্নড় একে একে পুরস্কৃতদের মঞ্চে ডাকতে শুরু করলেন। প্রথমে গেলেন কমলা দাস। পরে শামসুর রাহমান। তিনি রাহমান ভাইয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, হি ইজ ফ্রম বেঙ্গল। আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, হি ইজ নট ফ্রম বেঙ্গল। হি ইজ ফ্রম বাংলাদেশ। পাশ থেকে অমর্ত্য সেনও সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, সেলিনা ঠিকই বলেছে। বাংলাদেশ বলুন। গিরিশ কন্নড় প্রথমে একটু থমকে গিয়েছিলেন। বুঝতে পারছিলেন না ভুলটা কোথায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে এরপরে বাংলাদেশই বললেন। রাহমান ভাই মঞ্চে গেলেন। পুরস্কার নিলেন। নিজের অনুভূতির কথা জানালেন। কবিতা পড়লেন। এক পর্যায়ে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আমরা সাত দেশের সাতজন লেখক মঞ্চে গেলাম।

এক সময় শেষ হলো অনুষ্ঠান। মিলনায়তনের লাউঞ্জে গিরিশ কন্নড় জিজ্ঞেস করলেন, আমার কি ভুল হয়েছিল? আমি বললাম, ’৪৭-এর আগে ইস্ট বেঙ্গল, ওয়েস্ট বেঙ্গল মিলে বেঙ্গল ছিল। এখন আমরা স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশের সীমান্তে বন্ধু-রাষ্ট্র ভারতের কয়েক হাজার সেনা সদস্যের রক্ত আছে। সে সময়ের সরকারের সহযোগিতার কথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের ভালোবাসার কথা আছে। গিরিশ কন্নড় মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ইয়েস ইউ আর রাইট। বুঝতে পারছি আমি। আমি নিজেও একটু কনফিউশনে ছিলাম। তোমাদের কবি যে কবিতাটি পড়লেন সেটি আমার ভালো লেগেছে। তোমাকে ধন্যবাদ। গিরিশ কন্নড় সরে গেলে আমি রাহমান ভাইয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তাকিয়ে থাকি কবির দিকে, এক অসম্ভব সরল মাধুর্যে তিনি কথা বলছেন অমর্ত্য সেনের সঙ্গে।

মনে পড়ে ‘পাক্ষিক অনন্যা’ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে নারী লেখকদের জন্য সাহিত্য পুরস্কার চালু করে। প্রথমবার পুরস্কারটি আমি পেয়েছিলাম। পুরস্কার প্রদান করেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শামসুর রাহমান। দু’জনের কেউই আজ বেঁচে নেই- আছে স্মৃতি।

স্মৃতি এমনই- লিখতে বসে এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই কেন, নিজেকে সামলাই। সেদিন একটি স্থির ছবি দেখেছিলাম। যখন অমর্ত্য সেন তাঁর সম্পর্কে বক্তৃতা করছিলেন, মিলনায়তন ভর্তি দর্শক স্তব্ধ তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকে তখন দর্শকদের সারিতে বসে ভাবছিলাম, আমি শুধু একজন কবিকে দেখছি না, দেখছি তার স্থির ভাস্কর্য- বুকে তার বাংলাদেশ- নিজের গৌরবের সবটুকু নিবেদন করেছেন দেশের জন্য- তিনি একজন কবি নন, তিনি একাই বাংলাদেশ- চৌদ্দ কোটি মানুষ।

আমি তার অবয়বে বাংলাদেশের আকাশ দেখি, সব নদী দেখি- কোটি কোটি মানুষের বিশাল জনগোষ্ঠী দেখি। কবি শামসুর রাহমান দেশ, সাহিত্য, জীবন এবং শিল্পের প্রেক্ষাপটে এক পূর্ণ অবয়ব। আগামী প্রজন্ম রূপকথার গল্পের মতো শুনবে তাঁর পূর্ণতার গাথা।      

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares