শামসুর রাহমান : আলোর পথের যাত্রী : মতিউর রহমান

ক্রোড়পত্র : শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান : আলোর পথের যাত্রী

মতিউর রহমান

কবি শামসুর রাহমান আমাদের মাঝে নেই অনেক দিন হলো। কিন্তু তিনি আছেন আমাদের মাঝখানেই। শুধু অতীত নয়, বর্তমান নয়, ভবিষ্যতেও তিনি থাকবেন আমাদের সঙ্গেই। কবি শামসুর রাহমানকে ছাড়া আমরা সামনে এগোতে পারব না। দেশের অগ্রযাত্রার প্রতিটি উত্থান, প্রতিটি সাফল্যে আমরা তাঁকে পাশে পাব। তিনি থাকবেন আমাদের সঙ্গে তাঁর কবিতা, তাঁর গল্প, তাঁর উপন্যাস, তাঁর সমগ্র সাহিত্য নিয়ে। তিনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন একান্ত আপনজন হয়ে, অন্ধকারের মধ্যেও আলোর পথের যাত্রী হিসেবে।

ষাটের দশকে আমাদের সেই বিপুল আবেগ আর প্রচণ্ড সাহসের দিনগুলোয়, আকাশ-বাতাস যখন কেঁপে কেঁপে উঠছে বিদ্রোহের নিরন্তর ধ্বনিতে, সেই উত্তাল সময়ে কবিতা চাইতে গিয়েছিলাম তাঁর অফিসে। সেদিনই প্রথম পরিচয় হয়েছিল কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে। মনে পড়ে, ১৯৬৮ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সেই পরিচয়ের সূত্রে আরেকটি কবিতা চেয়েছিলাম। কয়েক দিন পর এক সকালে মাহুৎটুলির বাসায় কবি অপেক্ষা করছিলেন কবিতা নিয়ে। বললেন, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে তিনি কবিতাটি লিখেছেন। কবিতার নাম ‘আমার স্বরের ডালে’। সেদিন লাজুক স্বরে তিনি বললেন, ‘কবিতাটি পড়ি?’ এরপর তিনি কবিতা পড়তে শুরু করলেন। তিনি আবৃত্তি করে চলেছেন, আমরা শুনছি। এখনো মনে পড়ে, কী গভীর আবেগ নিয়ে তিনি পাঠ করছেন, ‘লোর্কার কণ্ঠ ওরা চিরতরে স্তব্ধ করবে ভেবেছিল/ কবির রক্তে রাঙিয়ে শূন্য, হা-করা প্রান্তর/ কিন্তু ঐ দ্যাখো তাঁর ক্ষত গোলাপের মতো জ্বলছে/ দুলছে কালকণ্ঠে/ শৃন্বন্তু অমৃতস্য পুত্রাঃ/ লোর্কার কণ্ঠ সেকালের সব পাহাড়, উপত্যকা, আপেলের বন/ প্রান্তর পেরিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে একালে।’ নিমগ্ন হয়ে পড়ে চলেছেন তিনি, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, এই গাছপালাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন/ ঘরের এক কোণে-রাখা ভাঙা হারিকেন/ সদ্য অধ্যুষিত গলির কানা বেড়াল/ অথবা মেথরপট্টির নেড়ী কুকুরটাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন/ আমরা সুখী নই/ বিশ্বাস করুন/ এ দেশের পোকা-মাকড়, জীবজন্তুগুলোসুদ্ধ ভীষণ অসুখী।’ তাঁর কবিতা পড়া শেষ হলো। সম্বিৎ ফিরে এলো, যেন স্বপ্নের আবেশ থেকে জেগে উঠলাম। এখনো ভাবলে কবিতার সেই অপ্রতিরোধ্য স্বর মনের গভীরে খুঁজে পাই, বুকের ভেতরে ভিন্ন এক আবেগ জেগে ওঠে। আর, স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরও বাংলাদেশে এ কথা আজও সত্যি যে, ‘আমরা সুখী নই’ কেউ। কবিতাটি হাতে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি কিন্তু রাহমান লিখি, রহমান নয়।’ অর্থাৎ, তিনি তাঁর নাম লেখেন শামসুর রাহমান। ‘রাহমান’ সেই থেকে আর কোনো দিন ‘রহমান’ হয়ে যায়নি। সেই যে ৪৬ বছর আগে পরিচয় হলো, তখনই দেশের শ্রেষ্ঠ কবির মুকুট তাঁর মাথায়। আমরা সমবয়সী ছিলাম না। তখনো আমি একজন ছাত্র-রাজনৈতিক কর্মী, তবে কবিতা আর শিল্পকলায় গভীরভাবে উৎসুক। তবু সেই প্রথম পরিচয় থেকেই আমাদের মধ্যে যে সখ্য গড়ে উঠল, তা ছিল আমার জন্য দারুণ এক অনুপ্রেরণার বিষয়। সেই পরিচয়ের পর থেকে, বিশেষ করে ঊনসত্তর, সত্তর আর একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আমাদের সময় কেটেছে কবিতা, সাহিত্য, গান, রাজনীতি আর আন্দোলন নিয়েÑকত না কথাবার্তায়।

সেই দিন আর রাতগুলোয় দেশের মানুষ ক্রমশ জেগে উঠছিল, ফুঁসে উঠছিল। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো তারা নেমে আসছিল রাস্তায় রাস্তায়। তখনই তো কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘পুলিশ রিপোর্ট’ কবিতায় লিখেছেন, ‘লোক, আমাদের চোখের পাতায় লোক/লোক প্রতিটি পাঁজরের সিঁড়িতে লোক/লোক ধুকপুকে বুকের ভেতরে লোক…।’

দেশজুড়ে মানুষের মনে যখন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি চলছে, সে সময় থেকেই শামসুর রাহমানকে নিবিড়ভাবে আমাদের প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করছিলাম, সমসাময়িক ঘটনাবলির সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ, একজন আধুনিক কবি কীভাবে বদলে যাচ্ছেন, কীভাবে তাঁর কবিতাগুলো হয়ে উঠছে শানিত তরবারির মতো, কীভাবে গণ-আন্দোলনের তরঙ্গমালার অভিঘাতে রাস্তার মিছিলে নেমে এসেছিলেন তিনি। সেই বর্ণাঢ্য দিনগুলোয়, আমাদের প্রজšে§র শ্রেষ্ঠ সময়ে আমরা তাঁকে আমাদের মধ্যে পেয়েছিলাম অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে। সেটা আমাদের জন্য বড় গর্ব ছিল, যা অটুট রয়ে গেছে আজও।

সেই ঊনসত্তর, সত্তর আর একাত্তরে কবি শামসুর রাহমানের কবিতার বহু পঙ্ক্তি পোস্টার আর স্লোগানে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। যেমন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘জীবন মানেই স্ফুলিঙ্গের মতো সব ইশতেহার বিলি করা আনাচে কানাচে’ অথবা ‘আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়’ ইত্যাদি। তিনিও সে সময়ে ওই কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছেন বহু সভা-সমাবেশে।

তারপর আমাদের বিজয়, স্বাধীনতা, নতুন আরও নানা পতন-অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে আমরা সত্তরের দশকে এসে পৌঁছাই। একাত্তরের স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার ঘটনাবলি, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী বছরগুলোতে স্বৈরাচারের উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে শামসুর রাহমান আরও এগিয়ে গেছেন।

কবিতা, সাহিত্য আর রাজনীতির আলোচনা, আড্ডা ও নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা আশির দশকে এসে পড়ি। শহীদ নূর হোসেনের আত্মাহুতির পর শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি মিশে যান মানুষের মিছিলে। মনে পড়ে, শামসুর রাহমানের এই সাহসী অবস্থান আমাদের উৎসাহ দ্বিগুণ করে তুলেছিল।

আমরা তাঁর কাছ থেকে সব সময় সাহায্য পেয়েছি। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দৈনিক পত্রিকা পরিচালনাসহ নানামুখী কাজ নিয়ে তুমুল ব্যস্ত দিন অতিক্রম করেছি। এ সময়ে কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কমেছে। তবু দুই পক্ষ থেকেই এই আস্থা ও ভরসা ছিল যে, যেকোনো সময়, যেকোনো প্রয়োজনে আমরা একে অপরের কাছাকাছি থাকব। রাহমান ভাইও সেটা জানতেন। সে জন্য নানা সময়ে কারও চাকরি, কারও চিকিৎসা বা প্রিয় নাতনির স্কুলে ভর্তির সমস্যা নিয়ে কবি-সুলভ ব্যাকুলতায় ফোন করেছেন বারবার। চিঠিও লিখেছেন মাঝেমধ্যে। সাধ্যমতো তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি।

আজ মনে পড়ে, শামসুর রাহমানের সঙ্গে কত না সময় কেটেছে তাঁর মাহুৎটুলি আর শ্যামলীর বাসায়। কত সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কেটেছে তুমুল গল্পে মেতে। স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে সৈয়দ শামসুল হক, রশীদ করীম, কাইয়ুম চৌধুরী, গাজী শাহাবুদ্দিন, বেলাল চৌধুরী, আবদুল বারিক চৌধুরী (এ বি সি), আবুল হাসনাত প্রমুখকে নিয়ে পার করে দেওয়া মশগুল সময়গুলো। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কখন যে রাত গভীর হয়েছে, সে খেয়াল ছিল না। দৈনিক, সাপ্তাহিক আর মাসিক পত্র-পত্রিকার জন্য কবিতা বা প্রবন্ধ চেয়ে তো কখনো বিফল মনোরথ হতে হয়নি। তাঁর সঙ্গে সব সময়েই অনুভব করেছি গভীর একাত্মতা।

দুই দশক আগে গণতন্ত্র ফিরে পেলেও কিছুতেই যেন আমরা আর এগিয়ে যেতে পারছি না। কেবলই পিছিয়ে পড়ছি, নিচে নেমে যাচ্ছি। তার পরও মানুষের মনে প্রেরণা জাগিয়ে তোলার জন্য, হতাশাগ্রস্তদের উজ্জীবিত করার জন্য, এমনকি নিজেকে সঞ্জীবিত করার জন্যও কবি শামসুর রাহমান লিখে গেছেন অবিরাম। নতুন শতাব্দী শুরুর বছরগুলোতেও মানুষের দুর্দশার উপলব্ধি, চোরাবালির সর্বনাশ সম্পর্কে উৎকণ্ঠা, তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের স্বপ্ন ও সাফল্যের আয়োজন শামসুর রাহমানের কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সে জন্যই আমরা তাঁর কবিতায় দুঃখিনী বাংলাকে, বাংলাদেশকে পেয়ে যাই। এভাবে পথ চলতে চলতে শামসুর রাহমান একসময় উন্নত শিরে মিছিলের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন। কবিতা আর শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা, একই সঙ্গে মানুষ আর সমাজের প্রতি ভালোবাসার নানা অভিজ্ঞতা আর ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি দেশবাসীর আলোর পথযাত্রী হিসেবে শামসুর রাহমানে পরিণত হয়েছিলেন।

মনে পড়ে, তাঁর চলে যাওয়ার আগে একদিন কথায় কথায় আমাকে বলেছিলেন, আমরা কেউ সমাজ আর দেশের বাইরে নই। মানুষ আর সমাজকে যা কিছু আন্দোলিত করে, তার বাইরে আমি কি থাকতে পারব? আমি তো এ সমাজেরই একজন মানুষ। আমি আমার সেসব কবিতাÑযাকে রাজনৈতিক কবিতা বলছেনÑনা লিখে তো পারিনি। আমি লিখেছি প্রাণের তাগিদে। ষাট দশকে যেমন লিখেছি, আজও সমাজ বা দেশ নিয়ে যা আমাকে আলোড়িত করে, সেসব আসে আমার কবিতায়। কখনো সরাসরি, কখনো প্রচ্ছন্নভাবে।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের কল্যাণের জন্য শিল্পসৃষ্টির কোনো বাঁধা ছক নেই। শামসুর রাহমান কোনো ছক ধরে চলেননি। তিনি এগিয়ে গেছেন নিজের অভিজ্ঞতার উপলব্ধিতে, স্বাধীনভাবে। তাঁর পথচলায় আলোকিত হয়েছে আরও অগণন মানুষের পথ। শামসুর রাহমান নিজে এক আলোর পথের যাত্রী, আমাদেরও তিনি সঙ্গী করে নিয়েছেন সেই মিছিলে।

প্রায় শেষ দিকের এক কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে’-এর (ফেব্রুয়ারি, ২০০৩) ‘পরস্পর হাতে হাত রেখে’ কবিতায় সবাইকে ডাক দিয়ে তিনি বলেছিলেন: ‘সূর্যোদয় এখনো অনেক দূরে/ অন্ধকার বটতলে বসে থাকা অর্থহীন/ বেশ কিছু পথ চলা বাকি আছে হে আমার ভাই-বোন/ চোখ খোলা/ রেখে এ মুহূর্তে যাত্রাপথে পা বাড়াও দ্বিধাহীন।/ রাহেলা, ফাতেমা, রাধা, অনিমা, নঈম, শাহরুখ,/ অনিল, গৌতম, শোনো, এখনই গা ঝাড়া দিয়ে পথে/ নেমে পড়ো।/ মনে দ্বিধা, আতঙ্ক, নিরাশা/ কিছুতেই কখনো দিও না ঠাঁই, পা চালাও দ্রুত।’

আসুন, আমরা দ্রুত পা চালিয়ে যাই সূর্যোদয়ের পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares