প্রবন্ধ : রোকেয়া-চেতনা : উন্নততর মানবসংস্কৃতির পাথেয় : দিল মনোয়ারা মনু

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নারী জাগরণ ও নারী মুক্তি আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নেত্রী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে বৈরী সমাজের বিরুদ্ধে নারীশিক্ষা, নারীমুক্তি ও মর্যাদার লক্ষ্যে আন্দোলন ও লেখালেখি শুরু করেছিলেন, দীর্ঘ সমাজ পরিক্রমা ও ব্যাপক আন্দোলনের পরও আজ তা যথাযথভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। বদলায়নি চিত্রপট বরং এই চিত্রপটের ভয়াবহতা বেড়েছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রতিমুহূর্তে এক অনিশ্চিত শঙ্কা, উদ্বেগ এবং হতাশার জন্ম দিচ্ছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই কন্যাশিশুর বিবাহ, দ্বিতীয় ও বহুবিবাহ, নারী নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও নির্যাতন শেষে নির্মম মৃত্যুর অসংখ্য ঘটনা প্রতি মুহূর্ত আমাদের স্তম্ভিত করে তুলছে।

রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী মহল ও ধর্মান্ধদের দৌরাত্ম্যে নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মতো প্রতিকারহীন বর্বর ঘটনা ঘটে চলছে অবিরাম অথচ ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভোররাতে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সমাজ দরদি নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন লিখে গেছেন পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহ তথা নারীর প্রতি অবমাননা এবং নারীর অমর্যাদার প্রতিবাদে, নারীর অধিকার শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। সেই সময়ের সমাজের বঞ্চনার চিত্র সেখানে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

বঙ্গনারী শিক্ষা সম্মেলনে সভানেত্রীর ভাষণে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন বলেছিলেন “ভারতবর্ষে অবরোধ প্রথা স্ত্রীলোকদের পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক। ‘আমাদের সমাজের সর্বপেক্ষা যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত। ভারতীয় পর্দার সহিত শাস্ত্রীয় পর্দার কোনো সম্বন্ধ নেই বললে অত্যুক্তি হইবে না। ভারতবর্ষে অবরোধ প্রথা স্ত্রীলোকদের পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক। বলা হয়ে থাকে মেয়েদের যেন সামান্য উর্দু এবং কোরান শরিফ শিক্ষা দেয়া হয়Ñ বিশেষত ইংরেজি শিক্ষা যেন দেওয়া না হয়। স্ত্রীশিক্ষার বিরোধীগণ বলেন যে, শিক্ষা পাইলে স্ত্রীগণ অশিষ্ট ও অনন্যা হয়। ধিক! ইহারা নিজেকে মুসলমান বলেন, অথচ ইসলামের মূল সূত্রের এমন বিরুদ্ধাচরণ করেন। যদি শিক্ষা পাইয়া পুরুষগণ বিপথগামী না হয়, তবে স্ত্রী লোকেরা বিপথগামী হইবে কেন? এমন জাতি যাহারা নিজেদের অর্ধেক লোককে ‘মূর্খতা ও পর্দা’ রূপে কারাগারে আবদ্ধ রাখে, তাহারা অন্যান্য জাতির যাহারা সমানে সমান স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন করিয়াছে, তাহাদের সহিত জীবন সংগ্রামে কিরূপে প্রতিযোগিতা করিবে? সুতরাং স্ত্রীলোকদের উচিত তাহারা বাক্সবন্দি হইয়া মালগাড়িতে বসিয়া স্বশরীরে স্বর্গলাভের আশায় না থাকিয়া স্বীয় কন্যাদের সুশিক্ষায় মনোযোগী হন। কন্যার বিবাহের সময় যে টাকা অলংকার যৌতুক হিসেবে ব্যবহার করেন তাহার কিয়দংশ তাদের সুশিক্ষায় ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যয় করুন।

[তথ্য সূত্র : সওগাত, চৈত্র ২৩৩৩]

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন তার অর্ধাঙ্গী শীর্ষক লেখায় বলেছেন, ‘আমি ভগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাদের ধর্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাহাদিগকে একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাই না। মানসিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুকে হিন্দুত্ব বা খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানী ছাড়িতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। আপন আপন সম্প্রদায়ের পার্থক্য রক্ষা করিয়াও মনটাকে স্বাধীনতা দেওয়া যায়। আমরা যে কেবল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অবনত হইয়াছি, তাই বুঝিতে এবং বুঝাইতে চাই।’

১৮১১ সালে এই উপমহাদেশে ড. উইলিয়াম কেরির স্কুল দিয়ে নারীশিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল তার ঠিক একশ’ বছর ১৯১১ সালে কলকাতায় এবং এর আগে ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। যদিও এর আগে তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নারীমুক্তির প্রবক্তা ও প্রগতিশীল লেখক হিসেবে তিনি বাঙালি সমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি তার ‘বোরকা’ নামক গল্পে বলেছেন : ‘অদূরদর্শী পুরুষেরা ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার জন্য এতদিন আমাদিগকে শিক্ষা হইতে বঞ্চিত রাখিতেন।’ তিনি আরও বলেন : ‘শিক্ষার অভাবেই আমরা স্বাধীনতা লাভের অনুপযুক্ত হইয়াছি। অযোগ্য হইয়াছি বলিয়া স্বাধীনতা হারাইয়াছি।’

রোকেয়া তাঁর স্কুলে মেয়েদের পাঠানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি অভিভাবকদের অনুরোধ করতেন। তার অদম্য আগ্রহ, চেষ্টা ও আন্তরিকতায় ১৯১৭ সালের মধ্যে স্কুল উচ্চ ইংরেজি স্কুলে এবং ১৯৩০ সালে সাখাওয়াত স্কুল উচ্চ ইংরেজি স্কুলে পরিণত হয়। তার এই নারীশিক্ষার প্রসারের স্বপ্নের ছবি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গল্পে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উঠে এসেছে। শিক্ষা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল গতানুগতিকের অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি বলেছেন শিক্ষা অর্থ কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অনুকরণ না। ঈশ^র মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই জ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমে তা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা। সেই অন্ধ সময়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন লেখাপড়া পরীক্ষা পাসের জন্য নয়, জ্ঞান লাভের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু এই অতিসম্প্রতি আমরা হতবাক হয়ে দেখছি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান লাভের জন্য নয়, পরীক্ষার্থী তৈরি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ১৭৯২ সালে মেরিওলস্টোন ক্রাফট তার মুক্তির প্রথম ইশতেহারে উল্লেখ করেছিলেন নারীকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে সক্ষম করাই যথার্থ, নারীশিক্ষার লক্ষ্য। সেই চিন্তাধারাই পরবর্তী সময়ে রোকেয়াকে অনুপ্রাণিত করে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই। পেরেছি কি আমরা শিক্ষাকে সেই ’কাক্সিক্ষত অবস্থানে নিয়ে যেতে? আমরা কি গভীরভাবে হিসাব করেছি সমাজে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে কত নারীর উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে? আমরা কি পেরেছি নারীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নারীর প্রতি সংবেদনশীল একটা সমাজ গড়তে। রোকেয়ার অবদান বাঙালি সমাজে নানাভাবে বিধৃত। কোনোটির চেয়ে কোনোটিকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। একশ’ বছর আগে নারী পুরুষের সমতাভিত্তিক যে সমাজ গঠনের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, আমরা সেই সমাজ গড়তে এখনও প্রতি মুহূর্তে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। সেই অন্ধ, কূপমণ্ডূক বৈরী সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি উচ্চ হৃদয়বৃত্তির সংস্কৃতি নির্মাণের জন্য যুদ্ধ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন আমাদের বাঙালি সমাজের জ্ঞান জগতের একজন প্রতিনিধিত্বকারী অভিভাবক। আমাদের চেতনার সংস্কৃতি নির্মাণের একজন অগ্রগামী সৈনিক। আমরা জানি সংস্কৃতির মধ্যেই বিরাজ করে জীবনের বিচিত্র অবস্থা, পদ্ধতি, মানবিক অধিকার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও বিশ্বাস। সংস্কৃতির এই আধুনিক ধারায় আলোকিত হয়েই নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আমরা রোকেয়াকে পেয়েছি। এই আলোকেই মানবিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন করেছেন তিনি তাঁর সারাজীবন। দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য আমাদের চলমান সমাজে নারীর অর্জন যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের পেছনে টেনে ধরার জন্য পুরুষতান্ত্রিক শক্তি সমভাবে ক্রিয়াশীল রয়েছে।

রোকেয়া নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এমন পরিবার ও সমাজ, রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে জীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ সম-অধিকার পাবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারী গুরুত্ব পাবে। ২০১০ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্লোগানে ‘সমঅধিকার ও সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যাবো একসাথে’ এই ভাবনাই মূল প্রতিপাদ্যে ছিল। একশ’ বছর পরও, এখানেও, আমরা রোকেয়ার চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পাই। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া। রোকেয়ার উত্তরসূির হিসেবে এই প্রক্রিয়াকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন যে বৈরী সমাজের বিরুদ্ধে নারীশিক্ষা, নারীমুক্তি, মর্যাদার লক্ষ্যে আন্দোলন ও লেখালেখি শুরু করেছিলেন, বাস্তবতা হচ্ছে দীর্ঘ সমাজ পরিক্রমা ও ব্যাপক আন্দোলনের পরও বদলায়নি সেই চিত্রপট। প্রতিদিনের খবরের কাগজে পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুকের বলি নারী হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করছে। ফতোয়াবাজ প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে নারীদেহে দোররা, পাথর ছুড়ে মারা, এসিড নিক্ষেপের মতো বর্বর ঘটনাও ঘটেছিল একটা সময় জুড়ে। সেই ধরনের নির্যাতন এখন কিছুটা কম হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ বেড়েছে বহুগুণ।

আমাদের সমাজে অনেক কিছুরই হিসাব মেলানো ভার। যে পুরুষটির হাত ধরে একটি মেয়ে তার বাবা, ভাই, বোনÑ  কথায় তার পরিচিত জগতের সবাইকে, সবকিছুকে পেছনে ফেলে চলে আসে, অন্যত্র স্বপ্ন দেখেÑ সেই পুরুষটিকে নিয়ে একটি সমঝোতাপূর্ণ সুখের আবাস গড়ে তোলার, সেই স্বামী নামের লোকটি যখন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে, এসিড ছুড়ে মারে এমনকি শ^াসরুদ্ধ করে হত্যা করে, তখন মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থান বলে আর কিছু থাকে না। সবচেয়ে আপনজনই যখন হত্যাকারী বা নির্যাতনকারী, তখন আইন প্রণেতা ও প্রশাসনকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর ও অনমনীয় হতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে সচেতন করার জন্য সামাজিক সংগঠনগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

আমরা আজকের এই অবস্থার পরিবর্তন চাই। কেবল আইন প্রণয়ন করেই যে নারী নির্যাতন বন্ধ সম্ভব নয় সে কথা আমরা বারবার সভা-সেমিনারে বলেছি। আমরা এখনও মনে করি শিক্ষা ও নারীর আর্থিক স্বাবলম্বনই পারে নারীকে বর্তমানের এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে। আর এর জন্য চাই যুগপৎভাবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ। দেশের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার আলো পৌঁছে দিতে পারলে, তাদের মানবিক বোধটাকে জাগিয়ে দিতে পারলে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পারলেই কেবল এই নৈরাজ্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভাবতেই অবাক লাগে কোনো আধুনিক সেক্যুলার পরিবারে রোকেয়া লালিত-পালিত না হয়েও, ১৮৮০ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি, সেই সময়ে উপরোক্ত এই চরম সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন। সেই সময়ে এই পর্দা প্রথা কত কঠোর ছিল তা রোকেয়ার নিজের কথা থেকেই তা জানা যায়। বাড়িতে কোনো স্বল্প পরিচিত মহিলা বেড়াতে এলেও পাঁচ বছরের রোকেয়াকে পর্দা করতে হতো। অবরোধের দারুণ যন্ত্রণা ব্যক্তিগত জীবনেই রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন। নারীসমাজকে মুক্ত করতে হবে শতাব্দীর দৃঢ় মূলবন্ধন থেকে এই চেতনা তিনি কোথা হতে পেয়েছিলেন তা এখনও বলা কঠিন। ষোলো বছর বয়সে তার বিয়ে হয় বিলেত ফেরত অবাঙালি দোজবর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পাত্রের সাথে। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এই বিয়েই একসময় রোকেয়াকে মুক্ত করেছিল পৈতৃক পরিবারের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে। আর এই মানুষটির সাহচর্যই রোকেয়াকে অসাধারণ ঔদার্য দান করেছিল।

ব্যক্তি ও সংগঠন কীভাবে সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখবে সেটি রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়ে গেছেন, আরও দেখিয়েছেন নারীরা সচেতন হওয়ার সাথে সাথে কীভাবে সংগঠিত হবেন। পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি ভাঙার বীজ হিসেবে ধর্মের নামে পিতৃতন্ত্রের এই কৌশলের বিরুদ্ধে আরও কৌশলী হয়ে কীভাবে আন্দোলন করবেন। আমরা জানি রোকেয়ার সংস্কৃতি ছিল মূলত নারী জাগরণের সংস্কৃতি ও শিক্ষার সংস্কৃতি। তার সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজের ধারণা পাই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও ১৮ বছরের নিচে আইনের বিধান রেখে বিয়ের বয়স নির্ধারণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের বাংলাদেশে যে বাল্যবিবাহের সংস্কৃতি তা নিঃসন্দেহেই আমাদের পেছনের দিকে টানছে। পিতৃতন্ত্র নারীকে বিভিন্নভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করছে পরিণতি হিসেবে দেখছি নারী জঙ্গিদের আবির্ভাব। স্বামীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তারা ক্রমান্বয়ে এই কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন। পিতৃতন্ত্রের কশাঘাতে নারীরা সাইবার ক্রাইমের মতো সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কাজেই পিতৃতন্ত্রের এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে উন্নত মানব সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সামনে এখন আর কোনো বিকল্প নেই। আশার কথা বর্তমানে রাজনীতিতে এবং বিভিন্ন পেশায় নারীর প্রবেশের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রোকেয়ার ভাবনার অনেকটাই বাস্তবায়ন ঘটেছে। নারীশিক্ষায় বিপ্ল¬ব ঘটেছে, বেড়েছে নারীর ক্ষমতায়ন। কিন্তু তার পরও নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের জন্য অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। হাঁটতে হবে আরও বহুদূর। যেহেতু সংগ্রাম করেই নারীকে এগোতে হয় এবং অস্বীকার করার উপায় নেই সেই সংগ্রাম এখনও চলছে। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া রাজনীতিতে গণনারীদের অংশগ্রহণ, সম্পদ সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার, অভিন্ন পারিবারিক আইন নারী উন্নয়ন নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন, সিডও সনদের ২ ও ১৬ (১) অনুচ্ছেদ থেকে সরকারি সংরক্ষণ তুলে নেওয়াসহ জেন্ডার সমতা অর্জনের জন্য সমাজবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন নারীর মুক্তি আলোর দিশারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের উত্তরসূরি হিসেবে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবার সমাজ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনকে আরও সুদূরপ্রসারী এবং শক্তিশালী করার জন্য একযোগে কাজ করার।

দিল মনোয়ারা মনু : প্রাবন্ধিক, সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares