সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ রসরচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলী: কথাশিল্পী রিজিয়া রহমানের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলাসাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ রসরচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলী

কথাশিল্পী রিজিয়া রহমানের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অদ্ভুত যোগাযোগের ফলে অনেক তথ্য ও অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। শুনেছি র‌্যোন্ট্গেনের রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কার, ফ্যারাডের বৈদ্যুতিক শক্তির আবিষ্কার এরকম যোগাযোগের ফল। সাহিত্যে এ রকম ধারা বড়-একটা হয় না। শুধু ছোটগল্পের বেলা তাই হয়েছে।… মোপাসাঁ যদি সাহিত্য-সাধনায় পূর্বের থেকেই নিযুক্ত না থাকতেন, তবে ফ্লবেরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্পূর্ণ নিষ্ফল হত।’ মুজতবার এই সাহিত্য-বিশ্লেষণ ধারা বা অন্যবিধ রসরচনাসমূহ কি বিজ্ঞান, কি নৃবিজ্ঞান, কিম্বা ইতিহাস-সমাজদর্শনেরও নিবিড়-নিগূঢ় রসায়ন। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের লেখক শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার তাই বলেন : ‘বাংলার এক শ্রেষ্ঠ রসরচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলীর পাণ্ডিত্য, ভূয়োদর্শন, সহৃদয়তা এবং নানা গভীর মানবিক গুণ সম্বন্ধে অজস্র তথ্য তাঁর নিজের রচনা এবং অন্যদের স্মৃতিচিত্র থেকে পাওয়া যায়।’ আমরা লক্ষ করছি মুজতবা-রচনা ক্রমেই সমধিক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে চলেছে। বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কথাসাহিত্যিকের ১১৬তম জন্মদিন উপলক্ষে শব্দঘর শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছে।

কথাশিল্পী রিজিয়া রহমানের প্রয়াণ আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে। বাঙালির জাতীয় জীবন ও সাহিত্য নিয়ে এই অমর কথাশিল্পী আমাদের সঙ্গে কথোপকথনেও তাঁর আবেগমথিত গভীর চিন্তাশীলতার কথা প্রকাশ করতেন। বং থেকে বাংলা উপন্যাস নিয়ে তাঁর ছিল বিশেষ প্রত্যাশা, পাঠক-পাঠিকাদের কাছে। বাংলা ভাষার বিবর্তন ও বাঙালি জাতি-গঠনকে উপজীব্য করে, আড়াই হাজার বছরের পটভূমিতে, এ-উপন্যাসের আখ্যানভাগ বয়ন করেছেন। তিনি বলেন : ‘এটাকে অনেকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে থাকেন। কিন্তু আমি বলি, মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতার উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ একটি দেশ বা জাতির জন্য মাত্র নয় মাস সময়ে গড়ে ওঠে না।… আড়াইশ’ বছরে একটি জাতি তৈরি হয় না, এটার জন্য হাজার বছর সময় লাগে।… এই বোধ থেকে আমি বং থেকে বাংলা লিখেছি।’ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে হলেও শব্দঘর বিশেষ ক্রোড়পত্রে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছে। প্রজন্মান্তরের পাঠকদের কাছে তাঁর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে কথাশিল্পী লিটন মহন্ত লিখেছেন : ‘আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় যাঁরা সাহিত্যচর্চা করে এই ভাষার মর্যাদাকে উন্নত করেছেন এবং বাঙালির জীবন ও ইতিহাসকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রিজিয়া রহমান একজন। তিনি ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতায় ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন। সাহিত্য পত্রিকা ত্রিভুজয়ের সম্পাদক হিসেবে কর্মজবীন শুরু করেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে একুশে পদক পান। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবন-যাপন করতেন। অতি সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। গত ১৬ আগস্ট ২০১৯ এই মহিয়সী নারী পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।’

প্রচ্ছদ রচনায় পবিত্র সরকার তাঁর মূল্যবান লেখা দিয়ে আমাদের বাধিত করেছেন। লিখেছেন অপূর্ব শর্মা ও মুহিত হাসান। রয়েছে ‘সৈয়দ মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প’ শীর্ষক আবদুশ শাকুরের লেখার পুনর্মুদ্রণ। রিজিয়া রহমানকে নিয়ে লিখেছেন মালেকা বেগম, ইমতিয়ার শামীম, আহমেদ মাওলা ও উৎপল দত্ত। এছাড়া প্রবন্ধ, সেরা বাংলাসাহিত্যের অনুবাদ, ভ্রমণ, কবিতা, গল্প, চিত্রকলা, বই কথা, বিশ^সাহিত্য, লিটলম্যাগ। আমরা সকল লেখক শিল্পী পাঠক শুভানুধ্যায়ীদের জানাই কৃতজ্ঞতা।

প্রচ্ছদে ব্যবহৃত রিজিয়া রহমানের প্রতিকৃতি এঁকেছেন শিল্পী রফিকুন নবী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares