প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা: সুরসিক ব্যক্তিত্ব, অভিনব জীবনাচরণ : মুহিত হাসান

প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা

সুরসিক ব্যক্তিত্ব, অভিনব জীবনাচরণ

মুহিত হাসান

নিজের লেখার মতোই, সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্যক্তিত্বও ছিল একদম নিজস্ব ও স্বকীয়। শান্তিনিকেতনে পড়ার ফলে খুব ভোরে ওঠার অভ্যাস তাঁর তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সকালে উঠে নাশতা প্রায় করতেনই না। তিনি সকালে খেতেন শুধু এক কাপ চা। সৈয়দ মহবুব আলীর ধারণা, এর নেপথ্যে নাকি ছিল শান্তিনিকেতনে সৃষ্ট একটি দুর্ভোগ। তা হলো- তিনি যখন শান্তিনিকেতনে পড়তে গেছেন, তখন আশ্রমের তরফ থেকে সকালের খাবার হিসেবে বরাদ্দ ছিল মাত্র দুটি জিলাপি। তখন বিশেষ আর্থিক সঙ্গতি ছিল না প্রতিষ্ঠানটির, তাই এমন ব্যবস্থা। পকেটে পয়সা থাকলেও সেখানে খাবার কিনে খাওয়ার উপায় ছিল না, আশপাশে দোকানটোকান কিছু নেই। মুজতবা আলী তাই অভিমানে তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, সকালে উঠে তিনি জীবনে আর কিছু খাবেন না। অবশ্যি গোলাম মোস্তাকীমকে এই সকালে না খাওয়া প্রসঙ্গে মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘প্যারিসের খাঁটি বাসিন্দারা সাধারণত নাশতা করে না। …অবশ্য আমি তো আর প্যারিসিয়ান নই। তবু সারাজীবনে তাঁদের কিছু কিছু অভ্যাস রপ্ত করার চেষ্টা করেছি।’

তবে সুপাচকের হাতের রান্নার ওপর তাঁর দুর্বলতা ছিল। ভোজনরসিক ছিলেন, কিন্তু পেটুক নন। বেশি খেতেন না, কিন্তু যেটুকু খেতেন তা যত্ন করেই খেতেন। রান্নার সূক্ষ্মতা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে তাঁর বিশেষ নজর ছিল। শান্তিনিকেতনে থাকার সময় প্রতিদিনই দুপুরবেলা সরু আতপ চালের ভাত ঘি সহযোগে খেতে চাইতেন। পছন্দ করতেন ইলিশ মাছের অনেক পদ। যেমন সরষে দিয়ে ইলিশ রান্না বা সাদামাটা ভাজা ইলিশের পেটি। সাথে কাসুন্দির আচার থাকলে খুশি হতেন। ভাত-মাছ খাওয়ার পর দই খেতে পছন্দ করতেন। কিন্তু দইয়ের মানটা ভালো হতে হবে। নইলে তা তিনি ছুঁতেনও না। কলকাতায় পার্ল রোডের বাড়িতে তাঁর পাশের ফ্ল্যাটে একসময় প্রতিবেশী হিসেবে সপরিবারে থাকতেন লেখিকা সুস্মিতা ইসলাম, তিনি লিখেছেন, মাঝেমধ্যেই তাঁর ফ্ল্যাটে মুজতবা আলী এসে কী রান্না হয়েছে দুপুরে তা দেখে যেতেন। যদি কখনও এসে দেখতেন রান্না চলছে, তাহলে আবার রান্নার ধরন নিয়ে নানাপ্রকার মজার মজার মন্তব্য করতেন। সোনামুগের ডাল, গলদা চিংড়ি ও ইলিশ রান্না হতে দেখলে তিনি বিশেষভাবে আনন্দিত হতেন। লেখক অবধূত মুজতবা আলীর জন্য জ্যান্ত কই মাছ পাঠাতেন বলেও খবর মেলে। জার্মানিতে থাকার সময়ও সে দেশের দেশি রান্না চাখার ব্যাপারে মুজতবা আলীর আগ্রহ ছিল। জারক রসে কুচি করা বাঁধাকপি চুবিয়ে তৈরি জার্মানদের দৈনন্দিন খাবার ‘সাওয়ারক্রাউট’ প্রথম মোলাকাতেই চেখে দেখেছিলেন। তাঁর আরও ভালো লেগেছিল জার্মানির পল্লী এলাকার ‘চর্বিঘন- মাংসবহুল- তরকারি সংবলিত- মজ্জামণ্ডিত’ এক সুপ। সে ভালোলাগার মাত্রা এতটাই ছিল যে, একে বাঙালি মা-খালাদের হাতের রান্না করা বারোয়ারি খিচুড়ির সমতুল্য বলেও অভিহিত করেছিলেন। শেষ বয়সে মুজতবা আলী কলকাতার এক বিশেষ দোকানের কালোজাম মুড়ি দিয়ে মেখে খেতে ভালোবাসতেন।

বেশভুষার ব্যাপারে মুজতবা আলী পছন্দ করতেন পরিষ্কার, পরিপাটি কিন্তু জবরজংবিহীন পোশাক-আশাক। এ নিয়ে তাঁর খানিক বিলাসিতা ছিল। জীবনে কেউ তাঁকে ময়লা বা আধা-ময়লা কাপড়ে দেখেছেন বলে মনে করতে পারেননি। গ্যাবার্ডিন কাপড়ের সুট পরতে পছন্দ করতেন। ট্রাউজার পরতেন একটু সেকেলে ধরনের। ঘরোয়া পোশাক হিসেবে পায়জামা আর পাঞ্জাবি, সাথে বাহারি স্যান্ডেল পরিধানে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। এসবের পাশাপাশি নিজের সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ীদের পোশাক-আশাকের দিকেও তাঁর বিশেষ নজর ছিল। এরকম একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন সুস্মিতা ইসলাম। একদিন তিনি একতলা থেকে ওপরে উঠছেন আর মুজতবা আলী ওপর থেকে নিচে নামছেন। এমন সময় তাঁকে দেখতে পেয়েই মুজতবা বলে উঠলেন, ‘বাঃ, বটল গ্রিন শাড়ির সঙ্গে ক্যামরি ইয়োলো ব্লাউজ বেশ মানিয়েছে তো! একদম নতুন কম্বিনেশন!’ তিনি নানারকমের টাইও সংগ্রহ করতেন।

অবসরে নানা ধরনের গান শুনতে ভালোবাসতেন মুজতবা। বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত শোনাটা তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই প্রায় পড়ত। তবে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর যেভাবে ‘ন্যাকা’ ভঙ্গিতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হতো, তা নিয়ে তাঁর বিরক্তি ছিল। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সংগীতজ্ঞ সুভাষ চৌধুরী ষাটের দশকের শেষার্ধে একবার এক পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লেখা চাইতে গিয়েছিলেন  সৈয়দ মুজতবা আলীর কাছে। আলী সাহেব সমাচার শুনে বললেন, ‘লেখা তো দেব অবশ্যই, তবে একটা শর্ত আছে।’ ‘কী সেই শর্ত?’ সুভাষ জানতে চাইলেন সাগ্রহে। আলী সাহেব এবার বললেন, ‘এই যে সকালে ৭.৪০ মিনিটে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে গুরুদেবের গান সম্প্রচার হয়, ওইসব ছিঁচকাঁদুনে ন্যাকামিভরা গলাচাপা গায়ক-গায়িকার গলা টিপে ধরতে পারবেন? তাহলে লেখা পাবেন।’ সুভাষ চৌধুরী এমন রূঢ়বচন শুনে হতবাক। পরে আলী সাহেব ব্যাখ্যান করে বললেন: ‘আরে মশাই, আমি তো খোদ গুরুদেবের আশ্রমের লোক। শান্তিনিকেতনে পড়েছি তো বটেই, পড়িয়েওছি। বহু গান শুনেছিÑ বহুজনের কণ্ঠে। কস্মিনকালে অমন ন্যাকা ন্যাকা আধো আধো উচ্চারণে চাপাগলায় রবীন্দ্রসংগীত সেখানে শুনিনি। এসব কী হচ্ছে, অ্যাঁ?’ এই কারণে সম্ভবত তিনি ‘অ্যামেচার’ কি ‘নন প্রফেশনাল’ ধরনের গাইয়েদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে চাইতেন মাঝেমধ্যে। এমনকি একদিন রশীদ করীমের কণ্ঠে ইতস্তত গুনগুন রবীন্দ্রগান শুনে খুশি হয়েছিলেন। পরে তাঁকে এও বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রসংগীতের ঢঙটা তোমার মন্দ আসে না। চর্চা করলে পারতে।’

প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক স্থান দেখার ব্যাপারে তাঁর ঝোঁক ছিল। কিন্তু সে দেখা তাড়ায় থাকা চটপটে পর্যটকের চোখের নয়, বরং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে দেখা। দিল্লিতে থাকার সময় প্রতি রবিবার বা যেকোনো ছুটির দিন ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। উদ্দেশ্য, সেখানকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক জায়গা দেখা ও সেসবের ছবি তোলা। ফিরতেন একদম সন্ধ্যায়। একবার কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দিল্লিতে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। ইচ্ছা যে তাঁর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দিল্লি দেখবেন। মুজতবা তাঁকে সাতদিন ধরে টানা সময় দিয়েছিলেন। ওই সময়ের মধ্যে গোটা দিল্লি দেখে ফেলবার কথা থাকলেও আদতে তাঁরা সাত দিনে শুধু মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিটি দেখেছিলেন! সাথে ছিল একটি প্রত্নতত্ত্ব সংক্রান্ত বই, জনৈক ফার্গুসন সাহেবের লেখা। ওই বইয়ের বর্ণনা ধরে ধরে সমাধিটি খুঁটিয়ে দেখতে গিয়েই এত সময় পার হয়ে গিয়েছিল।

ওইসময় দিল্লিতে আরেকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুজতবার অসামান্য রসবোধ ও বাস্তবজীবনে কৌতুক করার ক্ষমতার নমুনা পেয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। দিল্লির এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় তাঁরা চা খেতে গিয়েছেন। সেখানকার ওয়েটারটা অনেকটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই তাঁদের চা পরিবেশন করে। বিল আসে মাত্র এক টাকা। প্রস্থানের আগে মুজতবা আলী বেয়ারাদের হাতে দশ টাকা বখশিস ধরিয়ে দেন। তাঁদের তো চক্ষু চড়কগাছ! পরে আরেকদিন দু’জনে মিলে একই রেস্তোরাঁয় এসে রীতিমতো ভূরিভোজ করলেন। বেয়ারারা এবার তাঁদের যারপরনাই সমাদর করল। কিন্তু এবারে বিল পরিশোধের সময় তিনি বখশিস দিলেন একটি মাত্র সিকি। আর বললেন, আজকের যে বখশিস সেটা গতদিনের জন্য, আর গতদিন যে বখশিস দিয়েছি, সেটা আজকের জন্য!

নিজের জীবনে অভাবের অন্ত ছিল না। কিন্তু তারপরও মুজতবা আলী পরিচিতজনদের সম্ভব হলে সাহায্য করতে চাইতেন, তাঁদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। একদিন সুস্মিতা ইসলামের শিশুপুত্র প্রদীপের খুব জ্বর, তাঁর স্বামীও তখন পাশে ছিলেন না, কর্মসূত্রে বাইরে যেতে হয়েছিল। মুজতবা আলী অসুস্থতার সংবাদ শুনে তৎক্ষণাৎ এসে দেখলেন অবস্থা বেগতিক। তারপর নিজে গিয়ে এক বড় ডাক্তারকে ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি প্রদীপের জ্বর না কমা পর্যন্ত সারা রাত তাঁর মাথার কাছে বসে ছিলেন। আক্ষরিক অর্থেই তিনি সেদিন একটি শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অভিনব। তাঁর পড়ানোর বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্নতর, ছাত্রবান্ধব। বরোদায় তিনি কীভাবে পড়াতেন সে সম্পর্কে একটি বর্ণনা তিনি শেষ বয়সের সাগরেদ গোলাম মোস্তাকীমকে দিয়েছিলেন। তিনি তখন নাকি ক্লাসে ঢুকেই বলতেন, ‘আমাদের ইংরেজিতে পড়তে হবে। আমি কঠিন কঠিন শব্দগুলো লিখব। যারা জানো না, তারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে।’ এতে করে নাকি তাঁর ‘লেকচার’ অনুসরণ করতে ছাত্রদের তেমন বেগ পেতে হতো না। এ ছাড়া ছাত্রদের তিনি এমন নির্দেশও দিতেন, ‘তোমরা কোনো প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে চাইলে প্রথমে তোমার মাতৃভাষায় লিখবে। তারপর সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করবে। এর দুটো সুফল ফলবে। প্রথমত, তুমি দুটো ভাষা শিখবে। দ্বিতীয়ত, উত্তরটা তোমার নিজের হবে।’ সেখানে পড়াতে গিয়ে আরেকটি বিচিত্র অভিজ্ঞতা মুজতবার হয়েছিল, একবার ছাত্ররা ধর্মঘটে গিয়ে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিল। এমন অবস্থায় পরীক্ষা না হবারই কথা। কিন্তু কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপাল পরীক্ষা না নিয়ে কাউকে প্রমোশন দিতে রাজি হননি। অতএব পরীক্ষা হলো। সেই পরীক্ষার খাতা হাতে পেয়ে মুজতবা মুগ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর ভাষায় : ‘আমি ঐরকম ভালো খাতা আর জীবনে পাইনি। কারণ মাস্টাররা ছাত্রদের মিসলিড করার সুযোগ পায়নি। নিজেরা মিলেমিশে চেষ্টাচরিত্র করে যা বুঝেছে তাই লিখেছে। মাস্টারদের নোট লেখেনি।’ ‘শিক্ষকদের কারণেই ছাত্ররা পরীক্ষার বেড়া পার হতে পারে’ এই তত্ত্বে মুজতবা মোটেও আস্থাশীল ছিলেন না।

তাঁর কাছে মাঝেমধ্যেই উদ্ভট সব চিঠি আসতো। ভাতিজা মহবুব আলীকে বলেছিলেন, তাঁর কাছে আসা চিঠিগুলোকে মোট চারভাগে ভাগ করা যায়। বিভাগগুলো নিম্নরূপ : ১. নানা গভীর দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা চিঠি। ২. দেশোদ্ধারের রাজনৈতিক সমস্যাসমূহের সমাধানের দাওয়াই বাতলানোর অনুরোধ। ৩. বিভিন্ন সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথি হবার আমন্ত্রণ। এবং ৪. আর্থিক সাহায্যের অনুরোধ জানিয়ে লেখা চিঠি। তো মুজতবা পত্রের আধিক্যে বিরক্ত হয়ে এই চার ধরনের চিঠির উত্তর দেবার জন্য চারটি ‘ড্রাফট লেটার’ই বানিয়ে ফেলেছিলেন :

১. আপনি যেসব প্রশ্ন উপস্থাপন করিয়াছেন সেইগুলির উত্তর দেবার মতো শক্তি ও সামর্থ্য আমার আমার নাই। অতএব অনুরোধ, আমার প্রতি কৃপাপরবশ হইয়া অধমের অক্ষমতা মার্জনা করিয়া দিবেন। একাধিক উত্তম গ্রন্থে এইসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই পাইবেন।

২. দৈনন্দিন রাজনীতি সম্বন্ধে এ অধম সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অতএব আপনি যেসব প্রশ্ন তুলিয়াছেন সে সম্বন্ধে অধমের বলিবার বা করিবার কোন অধিকার বিধি আমাকে দেন নাই। অতএব সবিনয় অনুরোধ অধমকে নিজগুণে ক্ষমা করিবেন।

৩. নানা কারণেÑ বিশেষত বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুবর্লতাবশত-সভা-সমিতিতে যোগদান করা অধমের পক্ষে আর সম্ভবপর হইয়া উঠিতেছে না। অতএব সকাতর অনুরোধ অধীনের অপরাধ মার্জনা করিবেন। দীর্ঘতর না লিখিতে পারার জন্য ক্ষমাভিক্ষা করিতেছি।

৪. পাওনাদারদের অতিশয় নায্য ‘অত্যাচারে’ বাধ্য হইয়া অসংখ্য সম্পাদক ও প্রকাশকের নিকট হইতে বিস্তর দাদন লইয়া হাঁড়ি চড়াইতেছি। সেই দাদনের শোধ আশু কেন, সুদূর ভবিষ্যতেও হইবে কিনা সন্দেহ। তৎপূর্বে আপনার আদেশ পালন করি কী প্রকারে? পরকাল তো আছে। অতএব নিজগুণে অধীনকে মার্জনা করিবেন।

মুজতবা আলী আড্ডা দিতে, গল্প করতে ভালোবাসতেন, এ কথা অনেকেই জানেন। একবার সাহিত্যিক শংকর চাকরিসূত্রে দিল্লি গিয়েছিলেন, মুজতবা আলী তখন ওখানেই ছিলেন। শংকর তাঁর উপস্থিতির কথা জেনে যখন দেখা করতে যান, তখন মুজতবা সরস ভঙ্গিতে বলেছিলেন : ‘বুঝলে ব্রাদার, সাহিত্যিক ‘দেখবার’ জিনিস নয়। বই পড়া ছাড়া সাহিত্যিকের সঙ্গে আর যা করা যায় তা হলো গপ্পো। আজকে আমরা দুজনে গপ্পো করব।’  আড্ডা ছাড়া আরেকটি বিষয়ে তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না, তা হলো বই পড়া। নিজের সংগ্রহ ছাড়াও, কোথায় কোন দুষ্প্রাপ্য বইটি আছে সে সম্পর্কে তিনি টনটনে জ্ঞান রাখতেন। সকালবেলায় সাধারণত লিখতে বসতেন, তারপর দুপুর থেকে বিকেল অব্দি টানা বই পড়তেন। আর সন্ধ্যাবেলায় বসতেন আড্ডা দিতে। আড্ডাধারীরা বিদায় নিলে তারপর আবার বই পড়া শুরু। পাঠ চলতো রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত।

তিনি যখন আড্ডায় বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন, তখন শুধু বাংলাতেই কথা বলে যেতেন। একটিও ইংরেজি শব্দ মেশাতেন না। আবার যখন সিলেটি ভাষায় কথা বলতেন, তখন অনর্গল কেবল সেই খাস বুলিতেই বাক্যালাপ চালিয়ে যেতেন। আর ইংরেজি বলার সময় হয়ে যেতেন রীতিমতো পাকা সাহেব। আর  তাঁর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া মানেই ছিল বিচিত্র সব বিষয় ও ঘটনার মধ্য দিয়ে যাত্রা করা। আড্ডায় হঠাৎ কোনো গাড়ির কথা উঠলে সেই গাড়ির নামকরণের নেপথ্যে কী রয়েছে তাও সবিস্তারে বর্ণনা করতেন। কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত লিখেছেন, একবার এক আড্ডায় বৃষ্টি নিয়ে কথা উঠেছিল। তখন বর্ষাকাল চলছিল। তো বর্ষার কথা থেকে মুজতবা আলী কালীদাসের মেঘদূত হয়ে সোজা চলে এলেন রবীন্দ্রনাথের বর্ষা-বন্দনার প্রসঙ্গে। তারপর ইলিশ নিয়ে অনর্গল বলতে থাকলেনÑ ইলিশ কয় প্রকার, স্থানভেদে তার স্বাদ কীভাবে পাল্টায়, কোন দেশে ইলিশের কী নাম ইত্যাদি।

মুজতবা-চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল, তিনি কখনও কথার বরখেলাপ করতেন না। নিজের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত থেকে পরে কোনোদিন সরেও আসতেন না। এমনও বলতেন, ‘মুখের কথার দাম আমার কাছে দলিলের সইয়ের থেকে কম নয়।’ আর বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন যেসব প্রকাশক তাঁকে ঠকিয়েছে তাঁদের প্রতি। কথা প্রসঙ্গে একবার জানিয়েছিলেন, ‘আমি ভাবছি, আমার উইলে লিখে যাব যে আমার মৃত্যুর পর আমার লেখার রোজগারের টাকায় একটা ট্রাস্ট তৈরি হবে। সেই ট্রাস্টের একমাত্র কাজ হবে অসাধু প্রকাশকদের বিরুদ্ধে তরুণ অসহায় লেখকের পক্ষে মামলা করা।’ কারও কঠোর সমালোচনা করতে তিনি যেমন বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না, তেমনি কারো কোনো ব্যাপার পছন্দ হলে তার সুখ্যাতি করতেও পিছপা হতেন না। বিশেষত নিজের থেকে বয়সে নবীন যেসব লেখকের লেখা তাঁর ভালো লাগতো, তাঁদের প্রশংসা তিনি জনে জনে করতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে একবার জা আর্তুর র‌্যাঁবোকে নিয়ে এক মজার তর্ক হলেও পরে তাঁর গদ্যের প্রশংসা তিনি সরবেই করতেন। তবে নিজে একসময় খুব বেশি আর লিখতে চাইতেন না। মন থেকে লেখার বদলে পেটের দায়ে লেখা তাঁর খুব পছন্দের কর্ম ছিল না। পরে সখেদে লিখেছেন : ‘হাঁড়িতে ভাত থাকলে সাঁওতাল কাজে যায় না। আর আমার ড্রয়ারে টাকা থাকলে আমি লিখি না।’

তাঁর স্মৃতিশক্তির ব্যাপারেও পরিচিতজনদের মধ্যে বিশেষ সুখ্যাতি ছিল। রবীন্দ্রনাথ মুজতবার স্মরণশক্তির পরিচয় পেয়ে (একবার আস্ত একটা প্রবন্ধ টানা মুখস্থ বলে গিয়েছিলেন) বিস্মিত হয়েছিলেন। একবার আনন্দবাজার পত্রিকার অন্যতম কর্ণধার প্রফুল্লকুমার সরকারের শ্রাদ্ধে গীতা পাঠের জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আশপাশে গীতার কোনো কপিও ছিল না। সেখানে মুজতবা উপস্থিত ছিলেন, পরিস্থিতি এমন দেখে তিনি বসে পড়ে গীতা থেকে টানা পাঠ করতে শুরু করে দিলেন। অথচ তাঁর সামনে কোনো বই ছিল না! সবটাই মন থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন।

মুহিত হাসান : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares