প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা সৈয়দ মুজতবা আলী ‘ঘাড়ে তো একটাই মাথা’ (অগ্রন্থিত-অপ্রকাশিত আঠারোটি চিঠি) সংকলন ও ভূমিকা : মুহিত হাসান

প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা

সৈয়দ মুজতবা আলী

ঘাড়ে তো একটাই মাথা’

(অগ্রন্থিত-অপ্রকাশিত আঠারোটি চিঠি)

সংকলন ভূমিকা : মুহিত হাসান

[ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে সৈয়দ মুজতবা আলীর (১৯০৪-১৯৭৪) যেমন কোনো ক্লান্তি ছিল না, তেমনি পরিচিত বন্ধু-সুহৃদ থেকে আরম্ভ করে শ্রদ্ধেয় অগ্রজ কি অচেনা পাঠকদের চিঠি লিখবার বেলাতেও তিনি ছিলেন সদা তৎপর। তাঁর সত্তর বছরের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পত্রলেখার যজ্ঞে ছেদ পড়েনি। তবে আফসোসের বিষয়, মুজতবা আলীর লিখিত পত্রসম্ভার আজ অবধি পূর্ণরূপে সংকলিত কিংবা প্রকাশিত হয়নি। তাঁর জন্মশতবর্ষ (২০০৪) উপলক্ষে ঢাকার স্টুডেন্ট ওয়েজ থেকে প্রকাশিত আট খণ্ডের রচনাবলির সপ্তম খণ্ডে সংকলিত হয়েছে নানাজনকে লেখা মাত্র ৬৩টি চিঠি। এর আগেই অবশ্যি অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরীর সম্পাদনায় বাল্যবন্ধু সয়ফুল আলম খানকে লেখা মুজতবা আলীর ৩৬টি চিঠি সৈয়দ মুজতবা আলীর পত্রগুচ্ছ নামক গ্রন্থে প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে, বাংলা একাডেমি থেকে। আর সম্প্রতি (২০১৯) প্রণতি মুখোপাধ্যায় ও অভীককুমার দে’র সম্পাদনায় প্রাণতোষ ঘটককে লেখা মুজতবার ৮৪টি ছোট-বড় চিঠির সংকলন প্রিয়বরেষু ছাপা হয়েছে কলকাতার দীপ প্রকাশন থেকে।

এই ত্রয়ীগুচ্ছের বাইরে মুজতবা আলীর লেখা আরও চিঠি যে আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রয়ে গেছে, তা হলফ করেই বলা চলে। কিছু চিঠি এখন অব্দি অপ্রকাশিত। আবার কিছু প্রাপকদের স্মৃতিকথা বা অন্যান্য গ্রন্থে ও নানা পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্পষ্টভাষী মুজতবা আলীর মানসজগৎ ও সাহিত্য-সমাজচিন্তা সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য এই চিঠিগুলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হতে পারে। তা সত্ত্বেও মুজতবা আলীর একটি পূর্ণাঙ্গ পত্র-সংকলন কেন আজ অব্দি প্রকাশ পেল না, সেটি স্পষ্ট নয়।

এখানে সৈয়দ মুজতবা আলীর মোট আঠারোটি অগ্রন্থিত-অপ্রকাশিত চিঠি সংকলিত হলো। এর মধ্যে একটি অপ্রকাশিত, বাকিগুলো অগ্রন্থিত। তবে অগ্রন্থিত হলেও এগুলো পূর্বোক্ত মুজতবা-রচনাবলী বা মুজতবা আলীর লেখা অন্য কোনো বইতে সংকলিত হয়নি। মূলত কয়েকটি সাময়িকপত্র ও প্রাপকের গ্রন্থ থেকে আমরা এগুলো এখানে একত্রিত করার প্রয়াস নিয়েছি। বলে রাখা ভালো, ছাপানোর সময় মুজতবা আলীর নিজস্ব বানান-ভঙ্গিমা পুরোটাই বজায় রাখা হয়েছে। পত্রভেদে একই শব্দ বা নামপদের বানান তিনি একেক রকম লিখেছেন, এমনটিও ঘটেছে। বানানে সমতাবিধানের চেষ্টা না করে যে চিঠিতে যেমন বানান ছিল সেটিই অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। পাঠক এতে আশা করি বিভ্রান্ত হবেন না। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের হাতে থাকা মুজতবা আলীর সমস্ত অগ্রন্থিত পত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার বাসনা রাখি।

সংকলিত পত্রগুচ্ছের প্রথমেই রয়েছে ছোটো বোন সৈয়দা জেবুন্নেসা খাতুনকে লেখা মুজতবা আলীর একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি। অদ্যাবধি অপ্রকাশিত এই চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৫১ সালে, মুজতবা তখন দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব কালচারাল রিলেশন্স’ বা আইসিসিআর-এ কর্মরত। ছোটবোনকে নিজের লেখা পড়ানোর আকুলতা থেকে দেশ পত্রিকা পাঠানোর আয়োজনের প্রসঙ্গ ছাড়াও এই চিঠিতে নিজের দাম্পত্যজীবন নিয়ে মুজতবার সরস মন্তব্য নজর কাড়ে। এই চিঠিটি পাওয়া গেছে সৈয়দা জেবুন্নেসার কন্যা নুর রুখসার চৌধুরীর সৌজন্যে প্রাপ্ত।

রাজনীতিবিদ-কূটনীতিক কামরুদ্দীন আহমদকে লেখা চিঠিটির প্রতিলিপি প্রথম প্রকাশ তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী-তে(ঢাকা; ১৯৭৯)।  তবে আশ্চর্যের বিষয়, চিঠিটি ওই বইতে মুদ্রিত হলেও সেখানে মুজতবা আলীর কোনো উল্লেখ নজরে আসে না।

কবি কালিদাস রায়কে লেখা মুজতবার দুটি চিঠি প্রথম প্রকাশ পায় কোরক সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ চিঠিপত্র সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৪)। উল্লেখ্য, কালিদাস রায় কবিতা লেখার পাশাপাশি স্কুল-পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সংকলনের কাজও করতেন, তাই দেশে বিদেশে-র কোনো অংশ পাঠ্য হবার উপযুক্ত কিনা সেই প্রসঙ্গও চিঠিতে উঠে এসেছে ।

মুজতবা আলীর আজীবনের সখা প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা দুটি চিঠি দেশ পত্রিকার ৮২ বর্ষ ২৩ সংখ্যায় (১৫ আশ্বিন ১৪২২) প্রথম মুদ্রিত, আইয়ুবের পুত্র-কন্যা চম্পাকলি ও পূষণ আইয়ুবের সৌজন্যে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে লেখা বলেই মনে হয় এখানে সমসাময়িক প্রসঙ্গে ও অনেক সাহিত্যিকের সম্বন্ধে মুজতবার মন্তব্য রীতিমতো চাঁছাছোলা ও দুঃসাহসী। উল্লেখ্য, আইয়ুব-পত্নী গৌরী আইয়ুবকে লিখিত চিঠিটিও একইসঙ্গে ছাপা হয়।

সাহিত্যিক-সাংবাদিক পরিমল গোস্বামী ছিলেন মুজতবা আলীর শুভাকাক্সক্ষী ও সুহৃদ। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত পত্র-মারফত যোগাযোগ থাকলেও তার অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কেবলমাত্র হাতেগোনা কিছু চিঠি পরিমল গোস্বামী তাঁর পত্রস্মৃতি গ্রন্থে (নবগ্রন্থনা, কলকাতা; ১৯৭১) ছাপিয়েছিলেন। সেসবের কিছু আবার পুরো চিঠিও নয়, চিঠির অংশবিশেষমাত্র। কাজেই ওই গ্রন্থ থেকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এমন তিনটি চিঠি- যেগুলোর পূর্ণরূপ লভ্য।

গত শতকের ষাটের দশকের তখনকার তরুণ লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুজতবা আলীর পরিচয় খানিকটা আকস্মিকভাবেই। সাহিত্যকেন্দ্রিক একটি বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে ভয়ানক তর্কাতর্কি বাধে। পত্রিকান্তরে উতপ্ত পত্র-বিনিময়ও হয়। অতঃপর সুনীলের লেখা পড়ে মুজতবা মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে এক পরম স্নেহের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এখানে সুনীলকে লেখা তাঁর তিনটি চিঠি নেওয়া হয়েছে। উল্লিখিত পত্রত্রয়েও সুনীলের প্রতি তাঁর মমতা মাখানো স্নেহের পরিচয় মিলবে। চিঠিগুলো ছাপা হয়েছিল সুনীলকে লেখা চিঠি (তালপাতা, কলকাতা; ২০১২) শীর্ষক অধুনা দুর্লভ পত্রসংকলনে।

১৯৬৯ সালের গোড়ায় আসামের শিলচর কলেজের তৎকালীন উপাধ্যক্ষ দেবব্রত দত্ত মুজতবাকে চিঠি লিখেছিলেন কলেজের বার্ষিক মিলাদ মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়ে। এখানে সংকলিত দেবব্রত দত্তকে লেখা তিনটি চিঠির প্রথম দুটি মূলত ওই অনুষ্ঠান ও শিলচরে যাতায়াতের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ ঘিরেই আবর্তিত। তৃতীয় চিঠিটি লেখা এর এক বছর পর, ১৯৭০ সালে; প্রসঙ্গের দিক থেকেও খানিকটা ভিন্ন। সেখানে মুজতবা আসামের এক ধরনের বিশেষ বেতের পাটি কী করে কলকাতা থেকে সংগ্রহ করা যায়- তারই তালাশ করছেন। প্রাপকপত্নী রমলা দত্তের সৌজন্যে এই চিঠিগুলো ছাপা হয় ছোটকাগজ দীপন-এর ৭ম বর্ষ ১ম-২য় সংখ্যায়(সেপ্টেম্বর ২০০৪-মার্চ ২০০৫) ।

মুজতবা আলীর ব্যক্তিত্বের প্রতি মুগ্ধ হয়ে কলকাতার মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের তরুণ চাকরিজীবী সোমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী-শুভানুধ্যায়ীতে পরিণত হয়েছিলেন। মুজতবার বিপদ-আপদে তিনি শর্তহীনভাবে পাশে থাকতেন। তাঁকে লেখা চিঠিতে এক শুভাকাক্সক্ষী-অনুরাগিনী পাঠিকাকে চিঠি পাঠানোর জন্য মুজতবার আন্তরিক-হৃদয়স্পর্শী আকুলতা নজরে আসে। সোমেন্দ্রনাথের পুত্র রাজেন চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহ থেকে চিঠিটি কলকাতার রোববার সাপ্তাহিকের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় ছাপা হয়। সেখান থেকেই এটি নেওয়া হলো।

বন্ধু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ফরাসি পত্নী আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্কে লেখা মুজতবা আলীর চিঠিটি আলাদাভাবে নয়, বরং কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের ‘আড্ডাপ্রিয় সৈয়দ মুজতবা আলী’(মজলিশী মুজতবা, তাপস ভৌমিক সম্পাদিত; কলকাতা, ১৩৯৫) শীর্ষক একটি স্মৃতিগদ্যের পরিশিষ্ট হিসেবে পাওয়া গেছে। নানাদিক থেকে চিঠিটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লেখা এই চিঠিতে কলকাতা-নিবাসী মুজতবা ঢাকায় আটকাপড়া তাঁর স্ত্রী-পুত্রের জন্য দুশ্চিন্তার কথা স্বাভাবিকভাবেই লিখেছেন, আবার পাকিস্তানি জান্তা যে নানান কূটকৌশল করেও মুক্তিকামী বাঙালিদের আটকে রাখতে পারবে নাÑ ইঙ্গিতে দিয়েছেন তার আভাসও। পরিশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার জন্য ফরাসি সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভোলেননি মুজতবা।]

সৈয়দা জেবুন্নেসা খাতুনকে লেখা

নিউদিল্লী

১১/৯/৫১

স্নেহের মামম্বুয়াই,

আজ রেজিস্ট্রি বুক-পোস্টে তোমাকে কিছু সংখ্যা দেশ পাঠাইলাম। এইরূপে ক্রমে ক্রমে সব বান্ডিল পাঠাইব। প্রাপ্তিসংবাদ সঙ্গে সঙ্গেই জানাইয়ো।

অন্যান্য কথা পরের চিঠিতে লিখিব। যে যে সংখ্যা নাই তাহাতে আমার লেখা ছিল না। ‘দাম্পত্যজীবন’ লেখাটা কলিকাতায় বসিয়া লিখি- তোমার ভাবী তখন পাশের ঘরে। তিনি ঢাকা চলিয়া যাওয়ার পর লেখাটা ছাপাই। ঘাড়ে তো একটাই মাথা। 

পেয়ারা সিতু১

১. সৈয়দ মুজতবা আলীর ডাকনাম।

কামরুদ্দীন আহমদকে লেখা

শান্তিনিকেতন

২৩/৫/৫৮

জনাব,

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫৯তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আমাকে আপনাদের১ সহৃদয় আমন্ত্রণ জানাতে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ অনুভব করছি। দূরত্ব বশত উৎসবে যোগদানের অক্ষমতা নিজগুণে মার্জনা করতঃ সরফরাজ করবেন।

সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করি, কবি নিরাময় হয়ে দীর্ঘজীবন যাপন করুন এবং আপনাদের উৎসব সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে জনগণমনহরণ করুক।

খাকসার

সৈয়দ মুজতবা আলী

১. ১৯৫৯ সালে কামরুদ্দীন আহমদ কলকাতায় পাকিস্তানের উপ-হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নজরুলের জন্মবার্ষিকী উদ্্যাপনের কর্মসূচি সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছিল।

কালিদাস রায়কে লেখা

কটক

৩০/৩/৫৪

পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আপনার অকুণ্ঠ প্রশংসা আমি মাথা পেতে নিলুম। আশীর্ব্বাদ করুন, আমার যেটুকু শক্তি আছে তাই দিয়ে যেন বঙ্গ ভারতীর সেবা করতে পারি। আমি লিখি সাধারণ জনের জন্য। তাই গুণীদের প্রশংসা আমাকে বিস্মিত করে। সাধারণের প্রশংসা আমাকে শ্রম সার্থকতার আনন্দ দেয়।

আমি আপনার সঙ্গে একমত- ‘দেশে বিদেশে’ থেকে কোনো বিশেষ অংশ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন। করতে গেলে বিস্তর রদ-বদল করতে হয়। অথচ পাকিস্তানে মেট্রিক এবং ইন্টারের পাঠ্যপুস্তকে গুলবাগের বর্ণনাটি নেওয়া হয়েছে। এঁদের বিচারের ভুল, না আমাদের সে রায়-দৃঢ় কণ্ঠে জাহির করি কি প্রকারে?

আপনি যদি আমার লেখার প্রশংসা না করতে তবে আমি আপনার কাব্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতুম। এলিয়ট১ স্কুল-জাত ‘আধুনিক’ কবিতা  পড়ে আমি আনন্দ পাইনে। আপনার কবিতা আমাকে আনন্দ দেয়।

আমি আপনার কনিষ্ঠ। তবু শ্রীভগবানের কাছে আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

শতং জীব, সহস্রং জীব!

খাকসার

মুজতবা

১. মার্কিন কবি ও সাহিত্য সমালোচক টি এস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫)।

AIR, কটক

৯/৭/৫৪

পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আশীর্ব্বাদ কামনা করিয়া নিবেদন;

আপনার উপদেশ অনুযায়ী ছোটদের জন্য একটি ভ্রমণ কাহিনী ‘বসুমতী’তে প্রকাশিত হইতেছে। নাম ‘জলে ডাঙ্গায়’ এবং বৈশাখ হইতে আরম্ভ হইয়াছে।

আপনি যে সন্তুষ্ট হইবেন তাহা মনে হয় না। কারণ আমি যে সব শব্দ ব্যবহার করি, সেগুলি কোনো কোনো সময় ঈষৎ গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট। এই বিষয়ে আমি দেবর্ষি পূজ্যপাদ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করি। ১৯২৫ সালে তিনি আমায় বলিয়াছিলেন, ‘বাঙলা এত দুর্বল ভাষা যে এখনো ‘গুরু-চণ্ডালী’ হইতে মুক্ত হইবার সময় তাহার হয় নাই। এখনো Precise ও Clear in thought  হওয়ার জন্য যেখানে যে শব্দ পাওয়া যায় তাহাই ব্যবহার করিতে হইবে। ভাষার শুচিতা পরে হইবে। উপস্থিত Precision – বাঙলায় যাহার বড়ই অভাব।’ লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন, তিনি লেখার সময়ও এই নীতি মানিয়া চলিয়াছেন। দৃষ্টান্ত স্থলে বলি, ‘অধুনা একটি রব উঠিয়াছে ধর্ম গেল, ধর্ম গেল।’ আমি এই স্থলে লিখিব, অধুনা একটি ‘জিগির’…ইত্যাদি। কারণ, ‘জিগির’ এখানে slogan -এর মতো। এমন কি sloganও যথেষ্ট জোরদার নয়। জিগির (আরবী) শব্দের অর্থ,-অর্থহীন পুনরাবৃত্তি করা-শব্দ বা বাক্যের তাৎপর্যের প্রতি দৃষ্টি না রাখিয়া(সুনীতিবাবুর১ ধারণা মুসলমানদের এই ‘ইয়া আল্লা’, ‘ইয়া আল্লা’ ঘন ঘন আবৃত্তি করা [জিক্র্=‘জিগির’] দেখিয়া শ্রীশ্রী চৈতন্য আপন ধর্মে ‘জপ’ প্রবর্ত্তন করেন। ‘দশা’ও তাহা হইতে হয়। আরবী  ‘হাল’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘দশা’-নতুবা প্রাচীন সংস্কৃতে ‘দশা’র অর্থ অন্য। সুনীতিবাবুর ধারণা।)।

বিশ্ববিদ্যালয় আমার এই ভাষা পছন্দ করিবেন না।

এই সব আপনার জানা, তবু নিবেদন করিলাম। আল্লাতালার কাছে আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

প্রণামান্তে

মুজতবা আলী

১. ভাষাতাত্ত্বিক অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭)।

আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা

4, Mangles Road

Patna

১২/৮/৫৫

বৎস,

তুমিই একবার বলেছিলে, ‘কোনো প্রশ্ন করার সময় সে প্রশ্নের উত্তর কোন্ দিকে পাওয়া যেতে পারে, কি ভাবে পাওয়া যেতে পারে, এবং/কিম্বা কি উত্তর আদৌ কি হতে পারে, সে সম্বন্ধে তোমার যদি কণামাত্র ধারণা না থাকে তবে সে প্রশ্নের উত্তর কি করে প্রত্যাশা করো?’ অথবা ঐ জাতীয় কি যেনÑ বহুকাল পূর্বে বলেছিলে, ঠিকঠিক মনে নেই।

তাই ভাবি, তুমি যে শুধালে, আমার কোনো অসুবিধা হবে কি না, তার উত্তর কোন্ দিকে তার কি কোনো সন্ধান নিয়েছ!

আমার ষাঁড়ের মতো স্বাস্থ্য (তোমার-ই ভাষাতে), বাড়িতে চারখানা ঘর, তিনটে বাথরুম, ফ্লশ আছে (কটকে ছিল না),-যদিও স্বীকার করি এ বাড়ির লনটা কটকের তুলনায় নস্যি- তুমি  এলে, আমার কি অসুবিধে হতে পারে, বৎস? বরখত তোমার সেই বাবুর্চিই আছে যে তোমাকে Tobasco sauce 1 দিয়ে কটক থেকে তাড়িয়েছিল, তাকে নূতন করে কাটলিস গুলহটি বানানো শেখাতে হবে না, আমার বইয়ের সংখ্যা কিঞ্চিৎ বেড়েছে, এখানে কটকের তুলনায় অনেক বেশি গুণীজন, তাদের থেকে বেছে নিয়ে দু’দণ্ড রসালাপ তত্ত্বালাপ করতে পারবে, আমার একটি চেলা সস্তায় ওষুধ কিনে দেয়, মুর্গী এখানে আক্রা নয়, এইসব যাবতীয় ব্যবস্থা কটকের তুলনায় খারাপ নয়। তোমার ভালো লাগবেই। তবে যদি কিঞ্চিৎ গরম পড়ে তবে আমাকে দোষো না।

বস্তুত, তোমাকে আমিই লিখতে যাচ্ছিলুম। আমি নিছক তোমারই উপকারার্থে একটি ধারধৎু বানিয়েছি। উচ্চতায় আমার মস্তক পরিমাণ, দৈর্ঘ্যপ্রস্থ তদ্নুয়ায়ী। তাতে গোটা বিশেক ছোট্ট ছোট্ট চার ইঞ্চি মুনিয়া পাখী aviary করছে। অসুবিধা এই যে, বস্তুটি পিছনের বারান্দায়। অবশ্য সেখানে বসবার জায়গা প্রচুর আছে। আমি তোমাকে নিজেই লিখতে যাচ্ছিলুম এই বস্তুটিকে কি প্রকারে সর্বাঙ্গসুন্দর করা যায়। অবিনাশকে ডেকে যদি বলে দাও, কি প্রকারের পাখী এবং কি দামে সচরাচর টেরেটি বাজারে পাওয়া যায় তবে সে সেগুলো আমাকে পাঠিয়ে দেবে। দামটা important নয়। আমার ভয় ছোট পাখি, বড় পাখিতে পাছে ঝগড়া হয়ে খুনোখুনি না হয় ইত্যাদি। বাদবাকি অবিনাশ করবে।

আমি এ মাসের শেষের দিকে দিল্লী যাচ্ছি confarance  করতে। ৩০/৩১ নাগাদ ফিরে আসব। বাড়ি থেকে সবশুদ্ধ পাঁচ দিন বাইরে। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। কাজেই এই মুহূর্তেই চলে আসতে পারো। আসার পূর্বে খবর দেবে বিবেচনা করি। গাড়ি তা হলে ইস্টিশান যাবে।

এখন পূর্ব ও উত্তর বিহারে বান জেগে প্রাকৃতিক দৃশ্যের অপূর্ব খোলতাই হয়েছে। তাই দিনের ট্রেনে এসো। এখানে রাত আটটা নাগাদ পৌঁছে যাবে। দেরী করে এলে তদ্দিনে জল কেটে যাবে। এখানেও মা-গঙ্গা রুদ্র মূর্তি ধরে আছে। তবে এ অঞ্চল এ যাবৎ কখনো জলমগ্ন হয়নি।

কি মনস্থির করলে জানিয়ো।

মুজতবা

১. উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় উদ্ভাবিত এক ধরনের তীব্র ঝাল সস।

শান্তিনিকেতন

২০/৬/৫৭

ভ্রাতঃ,  

একটি প্রশ্ন কিছুদিন ধরে আমাকে চিন্তান্বিত করছে।

সমসাময়িক সাহিত্য সমালোচনার সময় গুণীরা কি ভাবে সেটা করেছেন অর্থাৎ আজকাল যে-সব সাহিত্য সমালোচনা বেরয় তাতে এত এলোপাথাড়ি জিনিস বলা হয় যে ঐ বিষয়ে Traditionটা কি? এখনো ভালো করে প্রশ্নটা শুধাতে পারলুম না। যেমন মনে করো একটা সরহড়ৎ দিক আছে- প্রাচীন মৃত বিখ্যাত লেখকদের ভুল-ত্রুটি দেখাতে আমরা সঙ্কোচ বোধ করিনে, কিন্তু জীবিত স্বল্প-পরিচিত লেখকদের সম্বন্ধে কোনো অপ্রিয় কথা বলতে আমাদের বাধো বাধো ঠেকে। এস্থানে আরেকটা কথা বলতে পারি,- কোনো বই ভালো লাগলে আমি গায়ে পড়ে তার সমালোচনা, বরঞ্চ বলি appreciation লিখি কিন্তু জীবিত কোনো লেখকের বই খারাপ হলে সেটার দোষ দেখিয়ে দিতে রাজী হইনে। এটা তো খুব বাঞ্ছনীয় attitude নয়। যদিও ভদ্র attitude, এ বিষয়ে আমার মনে আরো নানা প্রশ্নের উদয় হয়েছে- তথাকথিত সমালোচনা পড়ার সময়, কিন্তু সেগুলো এখন মনে পড়ছে না।*

এ-সম্বন্ধে শান্তিনিকেতন লাইব্রেরিতে কোনো বই থাকলে নাম জানিয়ো। তোমার কাছে কোনো বই থাকলে ধার দিয়ো। অবিনাশ এই ধরো ২৬/২৭ তারিখ নাগাদ তোমার কাছে যাবেÑ সে এখানে ১৯ নাগাদ আসবে।

তুমি যা ভাবছো, বা ভেবেছো, তার দু’একটি পইন্ট গৌরীকে বললে সে যদি লিখে জানায় তবে অতি উত্তম ব্যবস্থা হয়।

এসব আমার জন্য নয়। সমালোচকরা আমার সম্বন্ধে কি বলেন না বলেন, সে-বিষয়ে আমার অত্যধিক চিন্তিত হবার কারণ নেই, যতক্ষণ আমার বই বাজারে কাটছে। তবে ‘সাহিত্য সংখ্যা’(এখানে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিজ্ঞাপন সংখ্যা’) ‘দেশের’ যদি থাকে তবে ভবতোষ দত্তের (প্রবোধ সেনের জামাই) লেখাটি পড়ে দেখতে পারো। আমার নাম না করে আমাকে রাবিশ রম্য রচনার জন্য দায়ী করে আমাকে এক হাত নিয়েছেন, এবং সার্থক রম্য রচনা লেখক বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্র এবং- par excellence(of all persons!) অন্নদাশঙ্কর। আসলে বোধ হয় এটা চাকরীর দরখাস্ত। প্রবোধ সেনের আসনে তাঁর যাওয়ার পর বসতে চান। তাই প্রমথ চৌধুরীর প্রশংসা (ইন্দিরা দেবী তাহলে খুশী হবেন) ও অন্নদাশঙ্করকে আসমানে চড়ানো। এঁরা দু’জনেই সত্যেনবাবুকে এসব ব্যাপারে উপদেশ দেন। যদিও আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়, সত্যেনবাবুর রসবোধ ও বিচারের মাপকাঠি এঁদের চেয়ে বহু বহু গুণে শ্রেষ্ঠ।

আমি কিন্তু তা ভাবছিনে। আমার ভাবনা,-নাতিপরিচিত মাঝারি লেখককে যখন এই সম্প্রদায়ের লোক (স্বরাজের পূর্বে বাঙলার অধ্যাপককে কেউ বড় হিসেবে নিত না, এখন এদের সংখ্যা হুশহুশ করে বেড়ে যাচ্ছে, প্রতিপত্তিও, এবং এরা self-imposed care takers of Bengali lit. হয়ে উঠছেন) খামখা এক হাত নেয় তখন তাকে defend করতে ইচ্ছে হয়। কোথায় না উৎসাহ দিয়ে, দোষত্রুটি ভদ্রতার আবরণে মৃদুস্বরে শুনিয়ে দিয়ে তাকে ভালো লেখক বানাতে চেষ্টা করবে, তা নয়, লাগাও ব্যাটাকে মার। তারাশঙ্করকে না। তা হলে মুশকিল। লোকটার বহু contract রয়েছে। শেষটায় হয়তো চাকরি নিয়ে টানাটানি লেগে যাবে। 

আমি তাই তৈরী হয়ে থাকতে চাই। ভবিষ্যতে যখন কোনো গোবেচারা লেখকের গায়ে এঁরা হাত তুলবেন তখন ও I will come down like nine tons of bricks.

এখানে অতুলনীয় গরম গেল। এখনো নিত্যি নিত্যি ৩ক্ক/৪ক্ক হয়, গুমোটও বটে, রাত্রিও সব দিন ঠাণ্ডা হয় না। কিন্তু আমি ভালো আছি। প্রচুর পড়ি, প্রচুরতর চিন্তা করি- এবং অতি অল্প লিখি। দেখাশোনা কমিয়ে কমিয়ে প্রায় ০-তে নিয়ে এসেছি। রোজই আসন্ন মৃত্যুর চিন্তা করি এবং চেঁচিয়ে উঠি লাব্বয়কা, ইয়া রব্বী-লাব্বায়কা!

এসব উটকো ব্যামো তোমার হয় না-তুমি পাইকারী ব্যবসায়ী। তাই ভষঁ হয়েছিল কি না, শুধালুম না। তবে বাবাজীকে সাবধানে রেখো। এখানে যারা কলকাতার ভষঁ নিয়ে এসেছে তারা বারো ঘণ্টার ভিতর সেরে উঠেছে-এবং what is more important-ছড়ায়নি। এখন আশ্রম খুললে দেখা যাক কি হয়।

সেদিন সঙ্গীত সম্মেলনে রাজেশ্বরী খাসা গাইলে। ‘দেশে’ (ওই পোড়া সাহিত্য সংখ্যায়) সুধীনবাবু রাবিশতর লিখেছেন। তবে ভদ্রলোক সুস্থ- অন্নদাশঙ্করের** মতো potty নন।

মুজতবা

*যেমন মনে করো, ‘কোনো লেখকের লেখকজীবন (কিম্বা মৃত্যু) না হওয়া পর্যন্ত কি তাকে নিয়ে সঠিক সমালোচনা করা যায়!’ এবং ‘কোনো লেখকের একখানা বই কি isolatedভাবে সমালোচনা করা যায়।’ তুমি ছোটগল্প লেখ না; কিন্তু মনে করো খাসা একটা plot মাথায় খেলল। গল্পটা অত্যুৎকৃষ্ট হল। তাই বলে কি তোমাকে ভালো ছোটগল্প লেখক বলা চলে। কিম্বা ১০০টা রাবিশ লেখার পর একটা ওৎরানো- কচি যেরকম রসিকতা করে (with apologies)।

**অন্নদাশঙ্কর যে বাঙালীকে ‘প্রেমের ভাষা’ দেবেন বলেছিলেন তার উদাহরণ ছেড়েছেন। দীর্ঘ দুই ভলুমের পর প্রেমিক প্রেমিকাতে যখন প্রথম দেখা হ’ল তখন একে অন্যকে তুই বলে সম্বোধন করলেন। এটা হীরেনবাবুর আবিষ্কার।

গৌরী আইয়ুবকে লেখা

“Indian Lisener”

Curzon Road,

New Delhi-1, 16.6.56

গৌরী (ছোট বউ),

আমার বন্ধুকে তুমি বিয়ে১ করাতে আমি ভারী-ভারী, খুশী হয়েছি। এত খুশী হয়েছি যে আর কিছুই ভাবতে পারছিনে। ভরা-ডুবি২ করলে কোথায়? দমকা বাতাসের জোর ধাক্কায় চড়ায়-আটকা নৌকার পালে প্রাণসঞ্চার করলে। এখন তরতর করে এগিয়ে যাবে ঐ ঐ কত দূরে! আর-সবাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। ওঃ, কী আনন্দ।

অন্তরের অন্তরতম আশীর্বাদ জেনো।

মুজতবা

১. গৌরী আইয়ুব (বিবাহপূর্ব পদবি দত্ত) ও আবু সয়ীদ আইয়ুব ১৯৫৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গৌরী বিশ্বভারতীতে আইয়ুবের ছাত্রী ছিলেন।

২. একে আন্তঃধর্ম বিবাহ, তায় পাত্র-পাত্রীর বয়সের ব্যবধান অধিক হওয়াতে তখন এই বিয়ে নিয়ে তুমুল ও নেতিবাচক বিতর্ক উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গের সারস্বত সমাজে। সম্ভবত, মুজতবা তারই উল্লেখ করেছিলেন।

পরিমল গোস্বামীকে লেখা

শান্তিনিকেতন

২৮/৭/৫৭

বন্ধুবরেষু,

আপনি ঠিকই বলেছেন, আমাতে স্যাটায়ার নেই। কিন্তু এইবারে তার চাষ করবো। কতকগুলো বাঙলার অধ্যাপক নিজেদের যেভাবে বাঙলার রাখাল ভেবে সমালোচনার নামে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছে- তাও অতিশয় রদ্দী বাঙলায়- তার বিরুদ্ধে হয়তো একদিন ঐ হাতিয়ার ‘এস্তেমাল’ করতে হবে। ‘পোলেমিক’-এ স্যাটায়ার বড়ই বাজে লাগে। এ যাবৎ আমি মাত্র একটি পোলেমিক লিখেছি-‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। পড়েছেন কি চতুরঙ্গ ১৯৪৮-এ বেরিয়েছিল। তাতে কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ মস্করা ছিল।

আপনার রবিবারের লেখাও পড়ি। কেরামতিকে শিরোপা দিতে হয়।

মুজতবা আলী

শান্তিনিকেতন

৩১/৭/৫৭

প্রিয় গোঁসাইজী

আপনার ২/৬ তারিখের পত্র কাল হাতে এল। আমি দিন দুই পূর্বে আপনাকে একখানা পত্র লিখি। বিবেচনা করি ‘পথিমধ্যে’ কাটাকাটি হয়েছে। পাছে সেটা না পেয়ে থাকেন, তাই এটা ছাড়ছি।

লেখালেখি বাবদে আমি কোন্্কালে ভাল ছেলে ছিলুম বলুনতো? আমার দাদারা, বোনেরা, বাপঠাকুদ্দা কেউই লিখতে চাইতেন না, এই আমার পাক্কা খবর। আমি যখনই ভালো হই তখনই জানবেন সেটা পারিবারিক ঐতিহ্যকে পীড়িত করে। আপনিও তো লেখেন অনিচ্ছায়, হাতের লেখা দেখেই তো বোঝা যায়। আমাদের এই সদ্দৃষ্টান্ত যদি বাঙালী লেখক অনুকরণ করত।

গুণমুগ্ধ মুজতবা আলী

শান্তিনিকেতন

২০/১১/৬৪

গোঁসাই,

তোমাকে মারবে। এদেশে গোডসের অভাব নেই। তবে প্রশ্ন, তোমাকে কি আর martyr হওয়ার luxury টা enjoy করতে দেবে?

গুরুদেবকে বিচক্ষণরা যখন সাবধান করলেন-তাঁর ‘সভ্যতার সঙ্কট’ বেরোনর পর- ইংরেজ জেলে পুরে দেবে, তখন তিনি বললেন, প্রিন্স দ্বারকানাথের নাতি, বিশ্বকবি, সবই হয়েছি, এখন শুধু বাকী শহীদ হয়ে মরার সম্মান। ইংরেজ কি সে luxury টা আমায় জেলে মরে ভোগ করতে দেবে রে!

তোমার কার্ড পেয়েছি। পরে সবিস্তারে লিখব। খাসা লিখেছ। আর শেষ কথাটাই আসল।

ইতি

তোমার ‘দেবশর্মা’১

১. ১৯৬৪ সালে বেতার জগৎ পত্রিকায় মুদ্রিত সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে একশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি তাঁকে অশালীন ভাষায় যুগান্তর দৈনিকে আক্রমণ করেছিল। তখন সেখানে মুজতবা আলীর পক্ষে সওয়াল করে একটি চিঠি লেখেন পরিমল গোস্বামী। বক্ষ্যমাণ পত্রটি সেই নিয়েই। উক্ত প্রতিবাদলিপির শেষ লাইনটি ছিল এমন, ‘আলোচ্য প্রবন্ধের লেখকের নাম আলী না হয়ে কোনো দেবশর্মা হলে কোনো প্রশ্নই উঠত না’। ওই মোক্ষম লাইনটি স্মরণ করেই পত্রান্তে মুজতবা নিজের নামের বদলে ‘দেবশর্মা’ বসিয়ে দিয়েছিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা

অ,

আপনিই সুনীল গাঙ্গুলী! ত্রিস্তানের১ লেখক? দাঁড়ান, দেখাচ্ছি। কিন্তু বিপদ কি জানেন, আপনার বইয়ের অত্যধিক মাত্রাধিক প্রশংসা করলে (যা আমি করতে চাই) সাধারণ পাঠক অনেক স্থলে ঈষৎ disappointed হয়। অতএব আমাকে কিঞ্চিৎ পিয়ানিসিস্মো পেডাল চালাতে হবে। আপনি গুণীজন misunderstand করবেন না।

বশংবদ মুজতবা আলী

১. মধ্যযুগের ইউরোপে বহুল প্রচলিত ত্রিস্তান ও ইসোল্টের প্রেমের কিংবদন্তীগাথা অবলম্বনে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস সোনালী দুঃখ-এর কথা বলা হয়েছে।

P.O. Bolpur

———————

(Birbhum)

৪.১১.৬৫

স্নেহের গাঙ্গুলী,

আমি রোগশয্যায়। সে কারণে আসছে সপ্তাহ থেকে ‘পঞ্চতন্ত্র’ও১ বন্ধ থাকবে। আজ তোমার চিঠি পৌঁছল। সত্যি, আমি স্বীকার করছি, বৃদ্ধ বয়সে, র‌্যাঁবো নিয়ে আমার এ-রকম উষ্মা প্রকাশ করা অনুচিত হয়েছে২। বোধ হয় অন্যদের উপর যে-রাগ সেটা জমে জমে তোমার ঘাড়ে পড়েছে। সেরে উঠেÑ যদি উঠি ত তোমাকে সব বুঝিয়ে বলবো। ইতিমধ্যে আমাকে মাফ করে দিয়ো।

আশীর্বাদক সৈ.মু.আলী

১. ওই সময় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সৈয়দ মুজতবা আলীর নিয়মিত কলামের শিরোনাম।

২. ফরাসি কবি জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবোর নামের খাঁটি উচ্চারণ ঠিক কেমন হবে-তা নিয়ে মুজতবা আলী ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তর্কাতর্কি হয়েছিল দেশ-এর চিঠিপত্র বিভাগে। এর সবিস্তার বিবরণ সুনীলের আত্মজীবনী অর্ধেক জীবন-এ লভ্য।

ডি নসীরুদ্দীন রোড, পার্ক সার্কাস

১০/৭/৬৯

মেহেরবান!

দয়া করে আমার অপরাধ নেবেন না। আমার বয়স ৬৫। বার্ধক্যে জরাজীর্ণ। সবিস্তর লেখবার ক্ষমতা আর নেই। হয়তো লক্ষ্য করেছেন, ‘পঞ্চতন্ত্র’ প্রায়ই সরংং যায়। বরফজলের মতো গানের কথা ছেড়ে এখন শহর-ইয়ারের সুরটুকু ধরে রেখেছি। তাই সবিস্তর না-লেখার অপরাধ দয়া করে নেবেন না-অন্তত উপস্থিত।

আপনি আমার ভাইসাহেবের১ (আমার চেয়ে মাত্র দু’বছরে বড়; বাঙাল ভাষায় যাকে বলে ‘পিঠুয়া ভাই’। দেশে যতদিন একই স্কুলে পড়তুম, তখন লেখাপড়ার কোনো ব্যাপারে সাহায্য চাইলে, দাদা খানিকটা বুঝিয়ে যখন দেখত, আমি বুঝতে পারিনি, তখন বলতো, তোর মতো, slowwitted গর্দভ আমি কখনো দেখিনি। অথচ চিন্তা করুন, পাঠক মশাই, আমি ক্লাসে বেশীরভাগ সময়েই ফার্স্ট হয়েছি! অবশ্য সবিনয় স্বীকার করছি, দাদার মন্তব্যই মোক্ষম হক কথা। দাদা ছিল, এখনো আছে, আমাদের তিন ভাই, পাঁচ বোনের ভিতর sharpest, quickest, এবং অবিশ্বাস্য reactive to new ideas. অবশ্য আমাদের বয়স হওয়ার পর দাদা আমাকে আর dunderhead, idiot, imbecile এ-সব বলেনি; যদ্যপি আমার ক্ষীণ সন্দ আছে, দাদা এখনো তার মত পরিবর্তন করেনি। আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমি হলপ করে বলছি, তার সঙ্গে আপনার পরিচয় হলে আপনি সত্যই আনন্দ লাভ করবেন।) বইয়ের২ যে আলোচনা করেছেন, তার সম্বন্ধে আমি কি প্রকারে কৃতজ্ঞতা জানাই?

আমি শুধু বলি, আপনি আমাকে ‘কিনে নিয়েছেন।’

দেখা হলে যাবতীয় অন্যান্য আলাপ হবে।

[ভবদীয় গুণমুগ্ধ]

আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বড়, বড়, বড় আনন্দ দিয়েছে, ‘দেশের’ ১২৩২ পৃ’র শেষ ছত্র: “আমাদের মুজতবা আলী”। শতং জীব, সহস্রং জীব!

১. লেখক সৈয়দ মুর্তাজা আলী (১৯০২-১৯৮১),  মুজতবার মেজ ভাই ।

২. সৈয়দ মুর্তাজা আলীর আত্মকথা আমাদের কালের কথা (১৯৬৮)।

দেবব্রত দত্তকে লেখা

Personal

C/O Ayyub

5 Pearl Road, Cal-17

২৪/১/৬৯

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

‘দ্যাশের’ নিমন্ত্রণ১ পাইলে কোন মানুষ নিজেকে গৌরাবান্বিত মনে করে না। ইহা সবিস্তর বর্ণাইবার প্রয়োজন নাই। আপনারা আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিবেন।

কিন্তু তৃণাদপি শোলোকেতে ঘটালো পরমাদ-

আমার শরীর সুস্থ নয়। আমার পক্ষে মুসাফিরি করা ইদানীং কঠিন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কবিরাজ আমাকে কড়া শাসনে রাখেন। বস্তুতঃ আত্মজনের সাহচর্যে তিনি যে ষড়যন্ত্র করেন তাহারই ফলে ‘পঞ্চতন্ত্র’ মাঝে মধ্যে miss যায়।

‘দেশের’ শ্রীমান সাগর২ সুলেহ করিয়া রায় দিলেন, আমি যেন ভাতিজা ঘন্টু বাগচীকে৩ এসকরট্ রূপে সঙ্গে লইয়া শিলচর যাই। কিন্তু আমি জানি, আমি প্রিনসিপল হইলে এই ডবল খরচার প্রস্তাবে অপ্রসন্ন হইতাম। চিত্তবৃত্তি নিরোধ করতঃ যে মীমাংসায় পৌঁছাইবেন তাহা জানাইবেন।

পত্রোত্তর  পাইলে অবশিষ্ট জানাইব। তবে আমার দিক হইতে অন্য কোনো অসুবিধা নাই। শ্রীমান ঘন্টু কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকে। পরবটী কোনো এক রবিবারে করিলে তাহার পক্ষে সুবিধা।

শঙ্কর আপনাদিগকে জয়যুক্ত করুন।

খাকসার

মুজতবা আলী

১. আসাম ও নিজের জন্মএলাকা সিলেটের সংলগ্নতা স্মরণ করে মুজতবার এমত শব্দচয়ন। 

২. দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ।

৩. ঘন্টু বাগচী ছিলেন দেশ পত্রিকার একজন অফিস সহকারী। অবসর সময় তাঁকে মুজতবা আলীর দেখাশোনা ও ঘরের টুকটাক কাজকর্ম করে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন সাগরময় ঘোষ।

১১ ডি নাসিরুদ্দীন রোড

কলি-১৭

১২/২/৬৯

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আপনার টেলিগ্রাম কাল পেয়েছি, কিন্তু যে ‘letter follows’ সেটা এখনো পাইনি  এবং আমার ভাতিজা ঘন্টু বলছে যে ওই চিঠিটা দেখে যেন টেলিগ্রাম করি।

ইতিমধ্যে নিবেদন, আপনাদের দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আমি ১৬ই ফেব্রুয়ারীর জন্য একটা suit করে রেখেছিলুম। সেটা দুর্ভাগ্যক্রমে বাতিল করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

অতএব ২৪শে ফেব্রুয়ারী যদি রাখেন তবে পরবে যোগ দিতে আমার বা ভাতিজার কোন অসুবিধে হবে না।

আজ বিকেলের ডাক দেখে ২৩ তারিখ আমাকে suit করছে, এই মর্মে ‘তার’ পাঠাব।

আমার চিঠি-পত্র-টেলিগ্রাম যা পাঠাবেন সেটা 11 D. Nasriuddin Road, Calcutta-17 এই ঠিকানায়। ফোন নেই। কিন্তু আইয়ুব সাহেবের১ আছে। তিনি আমাকে Message পাঠাতে পারবেন, কিন্তু দু’বাড়ীতে ৫/৭ মিনিটের তফাৎ বলে সাক্ষাৎ টেলিফোনে আপনাতে আমাতে যোগসূত্র স্থাপনা করা কঠিন। তবে শুনেছি, Particular person call করলে সেটা নাকি হয়

২৩ তারিখ যদি আপনাদের মনঃপূত হয় তবে সেই মর্মে একটি ordinary telegram পাঠাবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একখানা Express চিঠি।

বাসস্থান, আহারাদি সম্বন্ধে আমার কোন বায়নাক্কা নেই, তবে আমার প্রাচীন দিনের সখা আর্থ্রাইটিস মাঝে মাঝে আর্তরব ছাড়েন বলে যদিস্যাৎ একপ্রস্থ ডানলোপিলো কিংবা/এবং হাসপাতালের স্প্রীং খাট যোগাড় করতে পারেন তবে ভাল হয়। না করতে পারলে আপত্তি নেই। ভাতিজা ঘন্টু কোন পাপিষ্ঠের কাছে শুনেছে, শিলচরে উত্তম কই মাছ পাওয়া যায়। পাষণ্ড সেইটে খেতে চায়। আম্মো খাই।

যদিস্যাৎ শিলচরে আমার হয় তবে দু’জায়গায় আমায় যেতে হবে। চন্দ পরিবার তথা শিশির দত্তের বাড়ী। সেলাম জানাবার জন্য।

উপস্থিত আর কিছু মনে পড়ছে না।

আশা করি আপনারা কুশলে আছেন।

আপনাদের সাফল্য কামনা করি।

খাকসার

সৈয়দ মু.আলী

১. প্রাবন্ধিক আবু সয়ীদ আইয়ুব। তিনি তখন মুজতবা আলীর বাসগৃহের সন্নিকটেই থাকতেন।

5 Pearl Road,

Calcutta-17

25/7/70

ভদ্র,

আপনার ২৩/৭/৭০-এর খাম পেয়েছি-smart look considering the general incompitent- পাটি উপস্থিত দরকার নেই। তবে কাটিখালের১ সেই Masstro (ওস্তাদ)-র চোখ যদি হীনজ্যোতি না হয়ে থাকে তবে তাঁকে কি মেহেরবানী করে শুধোবেন, একখানা উত্তম পাটি, যাতে দাবা আর দশ পঁচিশের দান(ছক) রঙিন বেতে বোনা থাকবে, এবং তিনি যদি চান এবং composition মিলিয়ে করতে পারেন তবে লুডো ইত্যাদি অন্যান্য খেলার (যেমন মোগল পাঠান) আমি এক খেলার সিলেটি নাম* ভুলে গিয়েছি তবে ছকটা মোটামুটি এই ধরনের- তবে ভুল হতে পারে। বেত অতিশয় মিহিন না হলেও চলবে। আমি ২৬ বছর আগে যে পাটি কিনেছিলুম তার প্রতিটি বেত কাঁথার ছুঁচের ফুটো দিয়ে অক্লেশে আনাগোনা করত। সে ওস্তাদ আমাকে জানান, বিভিন্ন ছকের design (খেলার ছক e.g. chess board etc.) দিয়ে তিনি আমাকে আরেকখানা পাটি বানিয়ে দেবেন, কিন্তু আফসোস তারপরই তিনি গত হন। এখন যে পাটি চাইছি তাতে বেতের সুক্ষ্মতা অপেক্ষা ছকগুলোই প্রধান। তিনি কত টাকা দক্ষিণা চান?

নমস্কারান্তে

  সৈ. মু. আ.

*এখন মনে হচ্ছে বোধ হয় মঙ্গলকাটাকাটি।

১. আসামের কাটিখাল অঞ্চলে তৈরি হওয়া বেতে বোনা পাটিসহ বেতের বিভিন্ন কারুপণ্যের বেশ চাহিদা ও সুখ্যাতি ছিল তখন।

সোমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা

শান্তিনিকেতন

১৭/৫/৬১

স্নেহের সোমেন,

কাল তোমাকে একখানা চিঠি লিখেছি। উত্তর পাওয়ার পূর্বেই ধরে নিচ্ছি- আমি যে খবর চাই, তার উত্তর, ‘ঠীক হৈ’। অতএব পত্রপাঠ সঙ্গের চিঠিটা নিয়ে তুমি ২৮/১এ (28/1A) গড়িয়াহাট রোডে যাবে। সেখানে

এক বিরাট চত্বরে ঢুকে দেখবে, ঐ ঠিকানায় ৩/৪খানা ঢাউস ঢাউস বাড়ি। সব ক’টা ২৮/১এ। তার মধ্যে এক পাশে একটার নাম Sarada Sangha Mahila Nivas. কিন্তু sorry তুমি তো বোধহয় একবার ওখানে গিয়েছ। সেখানে ডাঃ শ্রীলা ঘোষের১ দর্শন চাইবে। ওঁর দেখা পেলে তবে ওঁঁর হাতে চিঠিটি দেবে। না হলে ফেরৎ নিয়ে আসবে। কারণ আমার একাধিক চিঠি দারোয়ানদের গাফিলতী বা শয়তানীতে গায়েব হয়েছে। ডাক্তারের রঙটি কালো পাথরের মত সুন্দর- কোঁদাই যেন কালো পাথরের। আবার বলছি, ওখানে অনেক মেয়েছেলে আছে বলে কি যে হচ্ছে বুঝতে পারছিনে-চিঠির বাবদে। ডক্টরের আপন হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত কোনো বিশ্বাস নেই। যদি বলে স্লিপে নাম লিখে দিন-তাই করবে, ইংরিজিতে। এবং From Santiniketan জুড়ে দেবে। যদি বলে ভিজিটিং রুমে গিয়ে বসুন, তবে তাই করবে। কিন্তু চিঠিপত্র আছে কি না, শুধোলে অতি বিনয়নম্রকণ্ঠে নিরুত্তর থাকবে-কিংবা যা খুশী কিন্তু চিঠি অন্য কারো হাতে দেবে না।

ডাক্তারের office hour 9 to 2. অতএব আটটায় সকালেই তিনি বেরিয়ে যান। এবং দুটোর পরও সিনেমা-টিনেমা হয়তো করেন। অতএব ভোর সাতটায় পৌঁছলেই মঙ্গল। আর কি বলবো! তুমি ‘বেলিফ্’ ছিলে। মানুষ পাকড়ানো তোমার ব্যবসা। তোমাকে আমি কি উপদেশ দেব। সেখানে তুমি আমার গুরুদেব। সন্ধ্যায় গিয়েও ধর্ণা দিতে পারো। কিন্তু সেও তুমি জানো ভালো।

পত্রোত্তরে ফলাফল জানিয়ো। বড় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছি, বৎস।

এ কাজটা please, ঠিকমতো করো।

তোমার ঋকদেব

১. কলকাতা নিবাসী ডাক্তার শ্রীলা ঘোষ ছিলেন মুজতবা আলীর লেখার ভক্ত ও অনুরাগিনী। মুজতবা তাঁকে ১৩৭০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত টুনি মেম বইটি উৎসর্গ করেছিলেন ।

আন মারি ওয়ালীউল্লাহ্কে লেখা

5 Pearl Road, Calcutta-17

—————————————-

P.O. Circus Avenue

6/6/71

My dearest Anne Marie,

I have nothing better than this post card, which please forgive. At long last I got news from a professor who walked all the way from Dacca. But this is 3 weeks old. Meanwhile the military regime is doing everything in its power to crush the freedom movement in East Bengal. The mother1, inspectress of schools at Dacca is being pestered to open all school she has. But if girls refuse to attend what can she do? And the boys2. If they want to go out and join the freedom fighters how can she stop them?  Do please write to me as often as you can, all though I may not be able to reply. With the very best wishes.

Yours Syed

P.S. Your govt. has given us (for freedom fighters) some money for which our heart has no words. 

১. মুজতবা আলীর স্ত্রী রাবেয়া আলী।

২. মুজতবা-রাবেয় দম্পতির দুই পুত্র সৈয়দ মুশাররফ আলী ও  সৈয়দ জগলুল আলী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares