প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা : সৈয়দ মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প : আবদুশ শাকুর*

প্রচ্ছদ রচনা : সৈয়দ মুজতবা আলী- বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় রসরচনার স্রষ্টা

সৈয়দ মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প

আবদুশ শাকুর*

প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, এ যুগে গল্প পড়বার :

“এপিডেমিক থেকে মুক্ত শুধু নিরক্ষর লোক- যেমন বেরি-বেরি থেকে মুক্ত শুধু নিরন্ন লোক।

কিন্তু একটু চোখ চেয়ে দেখলেই দেখা যায় যে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি সকল যুগেই মানুষের সর্বপ্রধান মানসিক আহার হচ্ছে গল্প। পৃথিবীর অন্যান্য ভূ-ভাগের কথা ছেড়ে গিয়ে একমাত্র ভারতবর্ষের অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই, দেখা যায়, সে অতীত গল্পপ্রাণ। এ দেশে পুরাকালে যত গল্প বলা হয়েছে ও লেখা হয়েছে, অন্য কুত্রাপি তার তুলনা নেই। আমরা ধর্মপ্রাণ জাতি বলে বিশে^ পরিচিত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের ধর্মের বাহন হয়েছে, মুখ্যত গল্প। রামায়ণ, মহাভারত বাদ দিলে হিন্দুধর্মের পনোরা আনা বাদ পড়ে যায়, আর জাতক বাদ দিলে বৌদ্ধধর্ম দর্শনের কচকচি মাত্র হয়ে ওঠে। রামায়ণ, মহাভারত, জাতক ছাড়াও এ দেশে অসংখ্য গল্প আছে, যা সেকালে সাহিত্য বলেই গণ্য হত। এ দেশের যত কাব্যনাটকের মূলে আছে গল্প। তাছাড়া আখ্যায়িকা ও কথা নামে দুটি বিপুল সাহিত্য সেকালে ছিল, এবং একালেও তার কতক অংশের সাক্ষাৎ মেলে। আখ্যায়িকাই বল আর কথাই বল, ও দুই হচ্ছে একই বস্তু… শুধু নাম আলাদা। ইংরেজি লজিকের ভাষায় যাকে বলে genus এক species আলাদা।…

এর থেকে স্পষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ভারতবর্ষের লৌকিক অলৌকিক সকল সাহিত্যের প্রাণ হচ্ছে কথা-সাহিত্য।

কথা-সাহিত্য এ দেশে বিলেত থেকে আমদানি করা নতুন সাহিত্য নয়। বরং সত্য কথা এই যে, পুরাকালেও সাহিত্য ভারতবর্ষে রচিত হয়ে, তারপর দেশদেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এককালে পঞ্চতন্ত্র ও জাতকের প্রচলন ইউরোপের লোকসমাজে যে অতি বিস্তৃত ছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। উপরন্তু বহু পণ্ডিতের মতে আরব্য উপন্যাসের জন্মভূমিও হচ্ছে ভারতবর্ষ।

আজ যে আমরা সকলেই গল্প শুনতে চাই, তার কারণ এ প্রবৃত্তি আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি।”

(সবুজপত্র, দশম বর্ষ, চতুর্থ সংখা ॥ পৌষ, ১৩৩৩)

আসলে মানুষের ইতিহাস যেদিন থেকে শুরু হয়েছে, তার গল্পও আরম্ভ হয়েছে সেদিন থেকে। শ্রমপর্বের অভিজ্ঞতা বর্ণনার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে অভিজ্ঞ করে তোলা এবং বিশ্রামপর্বে আনন্দ পরিবেশন করার দ্বৈত প্রেরণা থেকেই মনুষ্যজীবনে গল্পের আবির্ভাব ঘটছে। (স্মরণ করুন : মানবজীবনের আদিতে দিনভর অ্যাডামের মাটি কোপানো এবং ইভের কাপড় বানানোর শেষে সন্ধ্যার অবসরে সন্তানদের কাছে তাঁদের গল্প করার কথা)। পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং আনন্দলাভের প্রয়োজনে সব দেশের মানুষই মোটামুটি অভিন্ন ধরায় গল্প কল্পনা করতে অভ্যস্ত হয়েছে। প্রধান দুটি ধারা- নীতিশিক্ষা আর রূপকথার উপকরণও প্রায় একই রকম। সম্ভবত সকল গল্পে প্রথম নায়কও ছিল অভিন্ন- সূর্য। কারণ প্রাচীন মানুষকে সূর্য আলো দিয়ে নিরাপদ করত, রোদ দিয়ে তার ফসল ফলাত, তেজ দিয়ে ফল পাকাত, বরফ গলাত, মাছ ভাসাত এবং আরও অনেক উপকার করত।

গল্প-সাহিত্যের ভাগ মোটামুটি তিনটি: Fable অথবা কথা, Anecdote  বা আকর্ষণীয় ঘটনা এবং Tale কিংবা আখ্যায়িকা। প্রথমটাতে ছোটগল্পের সংকেত, দ্বিতীয়টাতে গল্পে আমেজ আর তৃতীয়টাতে উপন্যাসের আভাস। Fable কথা বহু পূর্বেই বিলুপ্ত। বিষ্ণুশর্মা বা ঈশপের মতো প্রাণী-নির্ভর কিংবা মানব-আশ্রয়ী নীতিধর্মী ছোট ছোট গল্পের রেওয়াজ আজ আর নেই। সে বস্তু বলতে গেলে উনিশ শতকের রুশসাহিত্যের কথার জাদুকর ইভান ক্রাইলভের (Ivan Krilov) সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু টেল্ বা আখ্যায়িকা বা কাহিনি এবং অ্যানিক্ডোট বা কিস্সা কিংবা কোনও বিশেষ ঘটনার বৃত্তান্ত ছোটগল্পের ছদ্মবেশে এখনও বিদ্যামান। তাই এ দুটি প্রকরণ সম্বন্ধে ধারণাটা স্পষ্ট রাখা দরকার।

‘আখ্যায়িকা’ অতি পুরাতন কথাসাহিত্য এবং তা একাই জমিয়ে রেখেছে জাতক, পঞ্চতন্ত্র, কথাসরিৎ-সাগর, দশকুমার- রচিত, শুকসপ্ততি, আরব্য উপন্যাস (আল্ফ লায়লা), তার নবতর সংস্করণ পারস্য উপন্যাসে (হাজার আফসানে), দেকামেরন এবং উপদেশাত্মক গল্পমালার বৃহত্তম ইয়োরোপীয় সংস্করণ গেস্তা রোমানোরাম (রোমানদের কার্যকলাপ) বা সংক্ষেপে গেস্তা, ক্যান্টারবেরি টেল্স, গায়গাঁতুয়া, পাঁতাগ্রুয়েল। সংকলিত এসব আখ্যান গল্পরসে টইটম্বুর এবং বৈচিত্র্যে জমজমাট। কিন্তু খণ্ডতার মধ্যে অখণ্ডের হদিস এরা দেয় না। মানুষের সহজাত গল্প বলার প্রেরণা থেকেই এদের উদ্ভব। তাই সাধারণত কোনও ব্যঞ্জনা নিহিত থাকে না এদের বুনটে, পাওয়া যায় না ইঙ্গিতধর্মী একমুখিতা বা অনন্য কোনও মহামুহূর্তে। পাওয়া যায় বরং ঘটনাবহুল, এমনকি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময়, শিথিল-পৃথুল উপন্যাসেরই জৌলুস। বর্ণিত নেতিধর্মী এবং ইতিধর্মী, এইসব চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই আখ্যায়িকা ছোট হলেও ছোটগল্প হয়ে ওঠে না; ভেজাল হিসেবে ছোটগল্পের দলে ভিড়ে গেলেও সহজেই ধরা পড়ে যায়।

কিন্তু তেমন সহজে ধরা পড়ে না ‘অ্যানিকডোট’-নামক ছদ্মবেশী ছোটগল্প। কারণ সে জন্মগতভাবে ছোটগল্পেরই সহোদর। দুই ভাইয়ের মধ্যে ‘শর্ট স্টোরি’ যেন কবি-স্বভাবের দার্শনিক আর ‘অ্যানিকডোট’ যেন ব্যবহারিক স্বভাবের সাংসারিক। ‘ছোটগল্প’ গৃহী-সন্ন্যাসীও হতে পারে, কিন্তু ‘বৃত্তান্ত’ নিতান্তই গৃহী। এই গৃহীটিকে চেনার প্রথম উপায়টি হল তার দ্ব্যর্থহীনি অন্তিম যতি। ওটি এমনই পূর্ণতা-সূচক যে এর পরে যেমন তার নিজের কোনও কথা থাকে না, তেমনি পাঠকের কোনও কথা জন্মায় না। কারণ ওটা এমন একটা ‘ঘটিত’ ঘটনাÑ যা পড়বার পরে একান্তভাবেই শেষ হয়ে যায়- “শেষ হয়ে হইল না শেষ”Ñ বলে মনে হয় না পাঠকের। ফলে ‘শেষ’ করার আকুলিবিকুলিতে তার মনে নিজস্ব কোনও সৃষ্টি-প্রক্রিয়াও আনাগোনা করে না। কারণ অ্যানিকডোট একটা ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট’, প্রতিপক্ষ ছোটগল্প যেন ‘আন্ফিনিশ্ড’।

অ্যানিকডোট সমার্থক যুৎসই কোনও বাংলা প্রতিশব্দ আমি পাচ্ছি না। এর পরিভাষা হিসেবে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘সাহিত্যের ছোটগল্প’-শিরোনামক গ্রন্থের ‘রূপতত্ত্ব’-অনুশিরোনামক দ্বিতীয় খণ্ডে ব্যবহার করেছেন ‘বৃত্তান্ত’। আমার মতে শব্দটিতে অ্যানিকডোটের অর্থের অপরিহার্য কিছু দিক বাদ পড়ে যায়। দেশি-বিদেশি সকল প্রামাণ্য শব্দকোষ  একমত যে অ্যানিকডোটকে হতে হবে ‘ছোট’, ‘মজাদার’ বা ‘আকর্ষণীয়’, ‘প্রকৃত কোনও ব্যক্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনা সম্পর্কিত’। এসবের একটিকেও আবশ্যিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না ‘বৃত্তান্ত’-শব্দটি। যেমন ‘এব্রাহাম লিংকন সম্বন্ধে অনেক অ্যানিকডোট আছে’, ‘ওয়ার-হেরো আলোক দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক অ্যানিকডোট জানে’। এই বাক্য-দুটি অ্যানিকডোট- শব্দটি দিয়ে যা বোঝাচ্ছে, ‘বৃত্তান্ত-শব্দটি দিয়ে তা বোঝানো যাবে না; উল্টো বাক্যগুলোর ভাবার্থে বিভ্রান্তিও ছড়াবে। বিভ্রান্তি না-ছড়িয়ে অনেকটাই বোঝানো যাবে বরং ‘গল্প-শব্দটি দিয়ে। যেমন লিংকন সম্বন্ধে অনেক ‘গল্প’ আছে, আলেক মহাযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক ‘গল্প’ জানে। এজন্যেই গণসম্প্রচার সংস্থা- যথা ভয়েস অব অ্যামেরিকা- ‘মেজর “স্টোরিজ” অব দ্য ডে’ প্রচার করে। নিউজ কিংবা রিপোর্ট নয়, ‘স্টোরি’ তথা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমি বলতে চাই, ইঙ্গিতপূর্ণ এবং ব্যঞ্জনাময় ‘শর্ট স্টোরি’কে আমরা যখন ‘ছোটগল্প’ বলছি, তখন ইঙ্গিতবিহীন-ব্যঞ্জনাহীন ‘অ্যানিকডোট’কে তো ‘স্টোরি’বা ‘গল্প’ই বলতে পারি। ‘বৃত্তান্ত’ তো ঠিক কাহিনিও নয়- সংবাদ বা বিবরণ কিংবা প্রতিবেদন। অ্যানিকডোট কিন্তু সংবাদ নয়, গল্পই। অতএব আমরা পরিভাষায় ‘টেল হল ‘কাহিনি’, ‘ফেবল’ বা কথার জায়গায় চলুক ‘ছোটগল্প’ আর ‘অ্যানিকডোট’কে বলা হোক ‘গল্প’। এই গল্প হল ‘শেষ হয়ে হইল’ যে ‘শেষ’।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে গল্প হলেই ছোটগল্প হল না। গল্পটি একটা কৌতূহলোদ্দীপক আরম্ভ থাকতে পারে, থাকতে পারে একটা চমকপ্রদ অন্তও। কিন্তু গল্পের ভেতরে অন্তর্বয়ান, কিংবা বিভিন্ন তাৎপর্যের বিবিধ স্তর, অথবা মানবপ্রকৃতির প্রতি কৌণিক দৃষ্টি না-থাকলে, বা অভিনব কোনও অভিমুখ কিংবা জগজ্জীবনের মানবের স্থিতি বিষয়ে বিচিত্র কিছু আলোকপাত না থাকলে- সেটা গল্পই থেকে যাবে, ছোটগল্পের পরিভাষাটি পাবে না। এ কারণে মহৎ ছোটগল্পকারও বিশেষ কোনও আবেগের কিংবা মোহের বশে তাঁর হয়ে-ওঠা ছোটগল্পটিরও সীমা অতিক্রম করে চলে যান বিস্তৃত একটি গল্পের দেশে। দুজন exclusive class বা স্বতন্ত্র শ্রেণির ছোটগল্পকারের দুটি উদাহরণই স্মরণ করুন- রবীন্দ্রনাথের ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ এবং মোপাসাঁ’র সেমিয়াঁৎ (Semiante) । পরিভাষা হিসেবে ছোটগল্প যা বোঝায় তা এরা নয়। এরা হয়ে গিয়েছে নেহাতই গল্প।

এর মানে ছোটগল্পে ‘ঘটনা থাকবে না’ তা কিন্তু নয়। ঘটনা অবশ্যই থাকতে পারে, তবে ওটা নিছক কাহিনিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপরপক্ষে ঘটনা পরিহার করেও যদি একটি বিশেষ ভাব বা মুডের মধ্যেই একটি মহামুহূর্তের উদ্ভব কোনও লেখক তাঁর গল্পে ঘটাতে পারেন এবং মানবচরিত্র বা তার জীবনরহস্যের কোনও গভীরতা বা বিশালতার দিকদর্শন করাতে পারেনÑ তবে সেটাও সার্থক ছোটগল্প হতে পারে বইকি। এমনি একটি মহৎ ছোটগল্পের উদাহরণ মার্কিন গল্পকার জেরোম ওয়াইডম্যানের ‘মাই ফাদার সিট্স ইন দ্য ডার্ক’-নামক  শ্রেষ্ঠগল্প- গন্থের নামগল্পটি।

অ্যানিকডোট নিয়ে এই তুলকালামের কারণ : আমার উপস্থিত উপজীব্য সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পে ও ছোটগল্পে তাঁর সমধিক কৃতিত্ব প্রত্যক্ষদৃষ্ট চরিত্রাবলির বা ঘটনাবলির সম্যক চিত্রণে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ প্রতীতির গল্পকথনে। তাঁর দেখা বা শোনা এইসব বাস্তবভিত্তিক চরিত্রাবলি এবং ঘটনাবলি অ্যানিকডোটধর্মী। [অ্যানিকডোটের সংজ্ঞা : short, usually amusing, story adout some real person or event (Oxford Advanced Learner’s Dictionary)] । তবে কথাশিল্পী মুজতবা আলীর কুশলী রূপায়ণে অনেক অ্যানিকডোটই যে-কোনও সমালোচকের বিবেচনায় সার্থক ছোটগল্পে উত্তীর্ণ। প্রমথ চৌধুরীর নিরিখে তো বটেই। তিনি বলেছেন :

“মাসিক সাহিত্যের প্রধান সম্বল হচ্ছে ছোটোগল্প। এই ছোটোগল্প কীভাবে লেখা উচিত সে বিষয়েও আজকাল আলোচনা শুরু হয়েছে। এও আর একটি প্রমাণ যে, লেখবার বিষয়ের অভাববশতই লেখবার পদ্ধতি বিচারই আমাদের দায়ে পড়ে করতে হয়।

এ সম্বন্ধে আমার দুটি কথা বলবার আছে। আমার মতে ছোটোগল্প প্রথমে গল্প হওয়া চাই তার পরে ছোটো হওয়া চাই; এছাড়া আর-কিছুই হওয়া চাই নে।

যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে ‘গল্প, কাকে বলে’, তার উত্তর ‘লোকে যা শুনতে ভালোবাসে’। আর যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন ‘ছোটো কাকে বলে’, তার উত্তর ‘যা বড়ো নয়’।

এর উত্তরে পাঠক আপত্তি করতে পারেন যে ডেফিনিশনটি তেমন পরিষ্কার হল না। এ স্থলে আমি ছোটোগল্পের তত্ত্ব নির্ণয় করবার চেষ্টা করছি। আর আশা করি সকলে মনে রাখবেন যে তত্ত্বকথা এর চাইতে আর পরিষ্কার হয় না। এর জন্য দুঃখ করবারও কোনও কারণ নেই; কেননা, সাহিত্যের তত্ত্বজ্ঞানের সাহায্যে সাহিত্য রচনা করা যায় না। আগে আসে বস্তু, তার পরে তার তত্ত্ব। শেষটি না থাকলেও চলে, কিন্তু প্রথমটি না থাকলে সাহিত্যজগৎ শূন্য হয়ে যায়।”

(পৃ. ১৫৮, টীকা ও টিপ্পনী, বীরবলের হালখাতা)।

ছোটগল্প বিষয়ক আলোচনায় প্রথম চৌধুরী অনত্র আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন : “ট্র্যাজি-কমেডিই হচ্ছে ছোটোগল্পের প্রাণ।” (ছোটগল্প, সবুজপত্র, পঞ্চম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)। চৌধুরীমশায়ের এ মন্তব্য সৈয়দ সায়েবকে মহান ছোটগল্পকারের মর্যাদায় আসীন করে। কেননা মুজতবা আলীর ছোটগল্প যুগপৎ হাস্যরস ও করুণারসে মণ্ডিত।

প্রমথ চৌধুরীর বীরবলীয় সংজ্ঞাটিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পাশ করে ফেলার পরে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অধ্যাপকীয় সংজ্ঞামতেও ছোটগল্পকার মুজতবা আলী সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে যান বলে আমার আত্মবিশ^াসী ধারণা। শ্রীগঙ্গোপাধ্যায়ের সংজ্ঞাটি নিম্নরূপ :

“ছোটগল্প হচ্ছে প্রতীতি (Impression) জাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্য-কাহিনী যার একতম বক্তব্য কোনও ঘটনা বা কোনও পরিবেশ বা কোনও মানসিকতাকে অবলম্বন করে ঐক-সংকটের মধ্যে দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।”

(সাহিত্যে ছোটগল্প/ দ্বিতীয় খণ্ড, রূপতত্ত্ব, পৃ ৫০৫, না. গ. র. দ্বাদশ খণ্ড, মিত্র ও ঘোষ)।

সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পগুলোকে পাঠক প্রথমে পেয়েছিলেন মূলত তিনটি গ্রন্থে : চাচাকাহিনী, দ্বন্দ্বমধুর (‘রঞ্জন’-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে) এবং তাঁর শেষ্ঠগল্পে। এছাড়া তাঁরা কিছু গল্প সঙ্কলিত হয়েছে হাস্য-মধুর, দু-হারা, চতুরঙ্গ, পঞ্চতন্ত্র, টুনিমেম, বহুবিচিত্র, ধূপছায়া, পছন্দসই ইত্যাদি গ্রন্থে। মোট চল্লিশ-বিয়াল্লিশটি আখ্যানের মধ্যে ত্রিশ-বত্রিশটিকে নির্ভেজাল গল্প বলা চলে। বাকি দশ-বারোটিকে গল্প, কথিকা ও রম্যরচনার ককটেলও ভাবা যায়- তবে তাঁর সকল রচনার মতোই সুস্বাদু। মুজতবা আলীর নিখাদ গল্পগুলোকেও রম্যগল্পই বলতে ইচ্ছে করবে অনেকের। কিন্তু সেই শ্রেণিতে বর্গীকরণ সমীচীন হবে না। কেননা রম্যগল্পে এত কান্না থাকে না। মুজতবার গল্পে অর্ধেক হাসি থাকলে অর্ধেক থাকে কান্না। এ যেন ‘বনফুলে’র কথাগুলোর গল্পরূপ : পরম আত্মীয় দোঁহে- বসি পাশাপাশি-/ গলাগলি করি আছে অশ্রু আর হাসি। অনেক গল্পেরই বাইরে হাস্যের কোলাহল তো ভেতরে কান্নার কলরোল। বুকভরা কান্না থাকলে মুখভরা হাসিও কি রম্য রাখতে পারে গল্পকে? তাঁর হাস্যরসাত্মক গল্পও যে করুণরসাত্মক হয়ে উঠতে চায়! সৈয়দ মুজতবা আলীর অনেক রম্যগল্পই বড় বেশি বেদনাঘন। তাই তাঁর খান-তিরিশেক লেখাকে গল্প বলাই ভালো, যদিও ওর মধ্যে অনেকগুলোই সংজ্ঞাসম্মত ছোটগল্পÑ যেমন ‘পাদটীকা’, ‘নেড়ে’, ‘আধুনিকা’, ‘দ্বিজ’, ‘নটরাজনের ‘একলব্যত্ব’, ‘সিনিয়র অ্যাপ্রেন্টিস’, ‘মণি’, ‘চাচাকাহিনী’ ইত্যাদি। এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে গল্পকথক মুজতবা আলী রাজশেখর বসুর (১৮৮০-১৯৬০) মতো বাংলাসাহিত্যের প্রথম গল্পবলিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪৭- ১৯১৯) আত্মীয়। তবে এঁরা এত বেশি স্বকীয় যে এঁদের আত্মীয়তা পাঠক কেবল আবিষ্কারই করতে পারেন, প্রমাণ করতে পারেন কেবল গবেষক।

বর্ণিত পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যায়ে মুজতবা আলী নির্বাচিত কয়েকটি গল্প সম্পর্কে কিছু বলে আমার বর্তমান আলোচনা শেষ করব। আগেই বলেছি, বিশুদ্ধ কল্পনাজাত রচনার চেয়ে অ্যানিকডোট জাতীয় রচনা অর্থাৎ রিয়েল লাইফে দেখা ব্যক্তি কিংবা শোনা ঘটনাসঞ্জাত রচনাতেই তাঁর খোলতাই হয় বেশি। এর একটি কারণ তো এই যে এ-জাতীয় রচনাতেই তাঁর বিশেষ ভাষা-ভঙ্গি সঠিক পরিবেশটি পায়। তাই প্রথমে নিচ্ছি অধিক-খ্যাত ‘চাচা-কাহিনী’র কটি গল্প। তারও শুরুতে দিচ্ছি চাচা-ভাতিজার একটু পরিচয়।

কাবুলের জার্মান রাজদূতের দূতিয়ালিতে জার্মান সরকারের বৃত্তি পেয়ে মুজতবা আলী বার্লিন বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। গিয়েই আড্ডাবাজ আলী পেয়ে গেলেন ‘হিন্দুস্থান হাউস’ রেস্তোরাঁর প্রবাসী বাঙালির আড্ডাটা। ভোজনকেন্দ্রিক সেই আড্ডাখানার মালিক ও ম্যানেজার ছিলেন ‘চাচা-কাহিনী’র চাচা। সপার্ষদ এই চাচা এবং তাঁর হাউস যে কাল্পনিক নয়, তার সমর্থন রয়েছে মুজতবা’র ‘মুসাফির’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘একদিকে থেকে দেখতে গেলে হিন্দুস্থান হৌস নাৎসি আন্দোলনের চেয়েও প্রাচীন কারণ ১৯২৯-এ হৌসের যখন পত্তন হয় তখনও হিটলার বার্লিনে কল্কে পাননি!’ ‘চাচা-কাহিনী’ গল্পটির শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘বার্লিন শহরের উলান্ড-স্ট্রিটের উপর ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুস্থান হৌস নামে একটি রেস্তোরাঁ জন্ম নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে, বাঙালির যা স্বভাব, রেস্তোরাঁর এক কোণে একটি আড্ডা বসে যায়। আড্ডার গোঁসাই ছিলেন চাচা, বরিশালের খাজা বাঙাল মুসলমান, আর চেলারাÑ গোঁসাই, মুখুজ্যে, সরকার, রায়, চ্যাংড়া গোলাম মৌলা ইত্যাদি।’ সম্ভবত চ্যাংড়া গোলাম মৌলাই ভাতিজা সৈয়দ মুজতবা আলী, যিনি নিশ্চিতই আড্ডাটির ইয়ার-বক্শিদের একজন ছিলেন।

প্রথমেই মনে পড়ছে ‘চাচা-কাহিনী’ গ্রন্থবহির্ভূত (‘দ্বন্দ্বমধুর’ গ্রন্থভুক্ত) ‘চাচাকাহিনী’-শীর্ষক গল্পটি। এটি গল্পকার মুজতবার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, শ্রেষ্ঠতমও হয়তো। বহির্কাঠামোর অনাবিল হাস্যরস ছাপিয়েও উপচে পড়তে পড়তে চায় অন্তর্কাঠামোর করুণরস। শিল্পগুণে অতিশয় সমৃদ্ধ এ-গল্পটিতে আছে বিরল ব্যঞ্জনা। চাচার কথা, ‘মদকে ইংরেজিতে বলে স্পিরিট, আর স্পিরিট মানে ভূত। অর্থাৎ মদে রয়েছে ভূত। সে ভূত কখন কার ঘাড়ে চাপে তার কি কিছু ঠিক-ঠিকানা আছে?’ এ-ভূতের পাল্লায় চাচাও পড়েছিলেন একবার। তারই লিখিত হাসি আর অলিখিত কান্নায় ভরা এ সার্থক গল্পটি। বান্ধবী ক্লারা ফন্ ব্রাখেলের জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ আমন্ত্রণে চাচাকে যেতে হয়েছিল তাদের কান্ট্রিসাইডের পাহাড়চুড়োর বনেদি কাস্লে। চচার জন্য নির্দিষ্ট হয়েছিল ক্লারার বড়ভাইয়ের ঘর। বাঙাল চাচার ডিনার-জ্যাকেট না-থাকায় ক্লারা তার দাদার কাবার্ড দেখিয়ে দিলে তাঁরই এক সেট ইভিনিং-ড্রেস পরে নিলেন বোনের অপ্রস্তুত মেহমানটি। সেই ড্রেসে ডাইনিং-রুমে এলে পিতা-পুত্রী চাচাকে ‘প্রথম দর্শনেই দুজনেই কেমন যেন চক্চকিয়ে গেলেন। বাপের হাত থেকে তো ন্যাপকিনের আংটিটা ঠং করে টেবিলের উপর পড়ে গেল।’ এর পরে চাচার নিজের আচরণও হয়ে গিয়েছিল অদ্ভুতুড়ে। খেতে থাকলেন কেবলই বিয়ার, বলতে লাগলেন উল্টাপাল্টা কথা। তার পরে প্রথমে ক্লারার বাবার সঙ্গে বিলিয়ার্ড খেলার সময় কটুকাটব্য বা ঝগড়া করা এবং পরে-আসা তার জ্যাঠার সঙ্গে তাস খেলার সময়ও মাতলামোর চূড়ান্ত করে ক্লারার সাহায্য শয়নকক্ষে ফেরা। অতঃপর ডিনারস্যুটটি ছাড়ামাত্রই চাচার স্বস্থ হওয়া এবং স্বধিক্কৃত বোধ করা- অস্বাভাবিক এবং অহেতুক মাতলামো করার জন্য। অবশেষ ভোরের আলো না-ফুটতেই সকলের অজ্ঞাতে লজ্জিত চাচার বার্লিনে ফিরে আসা। এ-পর্যন্ত চাচা-কাহিনীটি ছিল সুপরিচিত মাতলামির নির্মল হাসির গল্প।

এর পরেই গল্পটি ভিন্ন স্তরে চলে যায়। সেদিনই সন্ধেবেলায় ক্লারা বার্লিনে ফিরে চাচার আস্তানায় গেলে চাচা ক্লারার কাছে নিজের ‘মাতলামোর জন্য মাফ’ চাইলেন। “ক্লারা বললে, ‘অত লজ্জা পাচ্ছ কেন? ও তো মাতলামো না, পাগলামো। কিংবা অন্য কিছু, তুমি সবকিছু বুঝতে পারনি, আমরাও যে পেরেছি তা নয়।”

এই ‘কিংবা অন্য কিছু’-র সঙ্গে বনেদি ব্রাখেল পরিবারের একটি অলিখিত করুণ আলেখ্য জড়িত। সে-রাতটির চাচার সঙ্গে ক্লারার অকালপ্রয়াত অগ্রজের অনেক কিছুর সাদৃশ্য এবং আচার-আচরণের অভিন্নতা দেখে গোটা পরিবারটির হৃদয়বেদনা গাঢ়তর হয়ে উঠেছিল- ‘বিশেষ করে ব্যাকব্রাশ করা চুল আর একটুখানি ট্যারচা করে বাঁধা বো দেখে। তার পর তুমি জোর গলায় চাইলে বিয়ার, দাদাও বিয়ার ভিন্ন অন্য কোনও মদ খেত না; তুমি আরম্ভ করলে দাদারই মতো বকতে,… শুধু তাই নয়। দাদাও ডিনারের পার বাবার সঙ্গে বিলিয়ার্ড খেলতে এবং শেষটায় দুজনাতে ঝগড়া হত। জ্যাঠামশাই তখন নেমে এসে ওদের সঙ্গে তাস খেলা আরম্ভ করতেন এবং আবার হত ঝগড়া। অথচ তিনজনাতে ভালোবাসা ছিল অগাধ।’

উল্লেখ্য যে ক্লারার ভাইয়ের ড্রেস চাচা পরলে সেটা মাটিতে গড়াবে ভেবে প্রথমে তা পরতেই চাননি তিনি। শেষে পরেছিলেন ক্লারার একটা মন্তব্য শুনে, ‘সবাই কি আমার মতো দিক-ধেড়েঙ্গে!’ এখানে চাচাকে একটু শোনা যাক : ‘মানিকপীরের মেহেরবানি বলতে হবে, জুতোটি পর্যন্ত ফিট করে গেল দস্তানার মতো। তারপর চুল ব্রাশ করতে গিয়ে আমার কেমন যেন মনে হল, এ বেশের সঙ্গে মাথার মধ্যিখানে সিঁথি জুতসই হবে না, ব্যাকব্রাশ করলেই মানবে ভালো। আর আশ্চর্য, বিশ বছরের দু ফাঁক করা চুল বিলকুল বেয়াড়ামি না করে এক লম্ফে তালুর উপর দিয়ে পিছনে ঘাড়ের উপর চেপে বসল,  যেন মায়ের গর্ভ থেকে ওই ঢঙের চুল নিলেই জন্মেছি।’ শুধু এ-ই নয়, অতঃপর চাচা শিস দিতে দিতে ব্যাংকুয়েট হলে ঢুকলেন- যদিও তিনি শিস দিতে জানতেন না। ঢুকেই অষ্টপদী ব্যাংকুয়েটে শেরি, পোর্ট, ভেরমুট, হুইস্কি ঠেলে দিয়ে বিয়ার চেয়ে বসলেন এবং পেয়েই আধ মগ গলায় ঢেলে দিলেন- যদিও তিনি মদ খেতেন না। আসলে কিছুই চাচা নিজে করেননি- করেছি, তাঁরই ভাষ্যমতে, ক্লারার দাদার ‘বকাটে স্যুটটা’। সেজেন্যই ক্লারাও বলল :

‘…যে কারণে তোমার কাছে এলুম, তুমি মনে কষ্ট পেয়ো না; বাবা-জ্যাঠামশাই আমাকে বলতে পাঠিয়েছেন, তাঁরা তোমার ব্যবহারে কিছুমাত্র আশ্চর্য কিংবা দুঃখিত হননি। তোমাকে আর সব বলার দরকার নেই; তুমি যে ঘরে উঠেছিলে ওই ঘরেই একদিন দাদা আত্মহত্যা করে।’

ক্লারার দাদার আত্মহত্যার কারণ অকথিত, তার অনুপস্থিত মা-ও হয়তো মৃত। এ-সমস্ত অনুল্লিখিত প্রসঙ্গ এবং গল্পটিতে লিখিত আভাস-ইঙ্গিত পরিবারটির চাপা দিয়ে রাখা শোকের কষ্টকে যেন বেশি পষ্ট করেই তুলে ধরে। সারকথাÑ চাচার এই কাহিনীতে বাচ্যের অতিরিক্ত একটি ভাব পাঠকের চেতনাকে নাড়া দেয়। গল্পটিকে একটি সার্থক ছোটগল্প বলেই মনে হয় আমার।

মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের সব কটি গল্পই বেদনাঘন। এ তথ্যটির অন্তর্গত তত্ত্বটিকে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় সহজ করে বলেছেন সঙ্গীতের পরিভাষায়- তাঁর:

“গল্প তখনই সুন্দর হতে পেরেছে যখনই করুণকে তিনি ব্যবহার করেছেন স্থায়ী রস হিসেবে, এবং সঞ্চারীতে রেখেছেন কখনও শৃঙ্গারকে, কখনও হাস্যকে”।

 (পুস্তক সমালোচনা, সৈয়দ মুজতবা আলীর শেষ্ঠ গল্প, চতুরঙ্গ, মাঘ, ১৩৬৮)।

মন্তব্যটার একটা উদারহণ হতে পারে উপরে আলোচিত গল্পটিও। এখানে প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করব অবিমিশ্র করুণ রসের ‘চাচাকাহিনী’র শ্রেষ্ঠগল্প বলে স্বীকৃত’ ‘কর্নেল, যার বিষয়বস্তু একটিমাত্র চরিত্র  (দেখুন : অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ভূমিকা, পৃ.ট, সৈ.মু.আ.র, খ.১১, মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানির অবস্থা হয়েছিল, চাচার ভাষায়, ‘জর্মনির সর্বনাশ, বিদেশির পৌষ মাস’। ইনফ্লেশনের কারণে কেনা যেত পাঁচ টাকায় ‘ফার’ কোট আর এক টাকায় গ্যোটের কম্প্লিট ওয়ার্কস। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছিল বিদেশি পেয়িং-গেস্ট। ‘যে-সব জর্মন পরিবারে বিদেশিরা পেয়িং-গেস্ট হয়ে বসবাস করছিল তাদের প্রায় সকলেই খেয়ে পরে জান বাঁচাতে পেরেছিল’। তাই চাচার বুড়ি ল্যান্ডলেডি হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গেলে চাচাকে লুফে নেবার জন্য কাড়াকাড়ি পরে গেল পাড়ায়। এমন সময় তাঁর শ্রদ্ধেয়া ফ্রলাইন ক্লারা ফন ব্রাখেল ছুটে এলেন চাচাকে দখল করার জন্য- ক্লারার বন্ধু প্রাশান কর্নেল ডুটেনহফারের পেয়িং -গেস্ট হিসেবে। এককালের বড়লোক এই কর্নেল এখন প্রতিদিনই বিধাতার কাছে সেই দিনটির অন্নপ্রার্থী। তবু পেয়িং-গেস্টের পরামর্শ দিতেই সে ক্লারাকে ‘কোট মার্শাল করতে চায়!’ শেষে কর্নেল মোলায়েম হয়েছে এই কথা বলাতে যে গেস্টটি সুদূর হিন্দুস্থান থেকে বার্লিনে এসেছে শুধু প্রাশান কোনও যোগ্য লোকের কাছ থেকে উচ্চাঙ্গের জর্মন শেখার জন্য।

চাচা গিয়ে দেখলেন বিশাল রাজপ্রাসাদটিতে থাকেন কেবল র্হে এবং ফ্রাউ ডুটেন্হফার, ‘যেখানে অন্তত শ’খানেক লোকের থাকার কথা।’ চাচার মন্তব্য, ‘শূন্য শ্মশান ভয়ঙ্কর, কিন্তু কঙ্কালের ব্যঞ্জনা বীভৎস’। প্রথম যাঁকে দেখলেন, তাঁকে কেমন মনে হল? ধমনীর বহতা রক্ত দেখা যাওয়ার মতো রঙের গৃহকর্ত্রী ‘যেন সকাল বেলাকার শিশির দিয়ে গড়া’…। তাঁর ‘চুল যেন রেশমের সুতো, ঠোঁট দুখানি যেন প্রজাপতির পাখা, ভুরু যেন উড়ে-যাওয়া পাখিÑ সবসুদ্ধ মিলিয়ে মনে সন্দেহ হয় উনি দাঁড়িয়ে আছেন না হাওয়ায় ভাসছেন’। আর প্রথম দর্শনে গৃহকর্তাকে কেমন মনে হল? সেটা শুনতে হয় চাচার মুখেই :

“ভেবেছিলুম বাড়ির কর্তাকে দেখতে পাব শুয়ারের মতো হোঁৎকা, টামাটোর মতো লাল, অসুরের মতো চেহারা, দুশমনের মতো এই-মারি-কি-তেই-মারি অর্থাৎ সবসুদ্ধ জড়িয়ে মাড়িয়ে প্রাশান বিভীষিকা, কিন্তু যা দেখলুম তার সঙ্গে তুলনা হয় তেমন কিছু ইউরোপে নেই।

এ যেন নর্মদা-পাড়ের সন্ন্যাসী বিলিতি কাপড় পরে পদ্মাসনে না বসে চেয়ারে বসেছেন। দেহের উত্তমার্ধ কিন্তু যোগাসনে- শিরদাঁড়া খাড়া, চেয়ারে হেলান দেননি।

শীর্ণ দীর্ঘ দেহ, শুষ্কমুখ, আর সেই শুকনো মুখ আরও পাংশু করে দিয়েছে দু’খানি বেগুনি ঠোঁট।… কিন্তু কী চোখ! আমার মনে হল উঁচু পাহাড় থেকে তাকিয়ে দেখছি নিচে, চতুর্দিকে পাথরে ঘেরা, নীল সরোবর। কী গভীর, কী তরল। সে চোখে যেন এতটুকু লুকোনো জিনিস নেই। যত বড় অবিশ^াস্য কথাই এ লোকটা বলুক না কেন, এর চোখের দিকে তাকিয়ে সে কথা অবিশ^াস করার জো নেই।”

চাচা পূর্ণ একটি বৎসর এই গুণী লোকটির সাহচর্য পেয়েছেন, কিন্তু লোকটি তাঁর নিজের জীবন কিংবা তাঁর পরিবার সম্বন্ধে কখনও একটি কথাও বলেননি। কেন তিনি মিলিটারি ছাড়লেন, কেন তিনি পেনশন ত্যাগ করে পরিবারের ঐতিহ্যবাহী তৈলাঙ্কন তৈজসপত্র বিক্রি করে পেট চালাচ্ছেন- এসবের ধারেকাছেও যাননি কখনও। মদ-সিগারেট-কফি কিছুই না-খাওয়া সংযমী মানুষটির ব্যক্তিত্ব চাচাকে অভিভূত করে ফেলেছিল।

চাচা শুধু একটি বিষয়েই কর্নেলের অনড় ‘চিত্তগতি’ ধরতে পেরেছিলেন- সে তাঁর জাতিভেদে বিশ^াস। তিনি কর্ণসাঙ্কার্য বিরোধী। এতখানি যে তাঁর পাণ্ডিত্য জাতিভেদ বিরোধী চাচার ওপরও প্রভাব বিস্তার করল। চাচা বললেন : “আমাদের আলাপের দ্বিতীয় দিনে জিনিয়স সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে জাতিভেদের কথা ওঠে। আমি মুসলমান, তার ওপর ছেলেবেলায় দু’হাত তফাতে দাঁড়িয়ে বামুন পণ্ডিতকে স্লেট দেখিয়েছি, কৈশোরে হিন্দুহস্টেলে বেড়াতে গিয়ে ঢুকতে পাইনি, জাতিভেদ সম্বন্ধে আমার অত্যধিক উৎফুল্ল হওয়ার কথা নয়। তারই প্রকাশ দিতে হের ওবের্স্ট (কর্নেল) জাতিভেদের ইতিহাস, তার বিশ্লেষণ, বর্তমান পরিস্থিতি, ভিন্ন ভিন্ন দেশে তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ সম্বন্ধে এমনি তথ্য এবং তত্ত্বে ঠাসা কতকগুলো কথা বললেন যে আমার উষ্মার চোদ্দ আনা তখনি উবে গেল।”

কর্নেল “বিনয়ের সঙ্গে দিনের পর দিন এই কথাটি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন- প্রাশান কৌলীন্য যেন প্রসূত না হয়। প্রাশান কৌলীন্য জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ আসন দাবি করে না, তার দাবি শুধু এইটুকু যে তার বিশেষত্ব আছে, সে বিশেষত্বটুকুও যদি পৃথিবী স্বীকার না করে তাতেও আপত্তি নেই কিন্তু অন্ততপক্ষে পার্থক্যটুকু যেন স্বীকার করে নেয়। হের ওবের্স্ট (কর্নেল) তাতেই সন্তুষ্ট। তিনি সেইটুকুই বাঁচিয়ে রাখতে চান। তাঁর দৃঢ় বিশ^াস সে পার্থক্যের জন্য ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ রয়েছে। এবং সেই পার্থক্যটুকু বাঁচিয়ে রাখবার জন্য দেখতে হবে রক্তসংমিশ্রণ যেন না হয়।

নিটশের সুপারম্যান?

না, না। শুধু বড় হওয়ার জন্য বড় হওয়া নয়, শুধু ‘সুপার’ হওয়ার জন্য ‘সুপার’ হওয়া নয়। প্রাশান আদর্শ হবে ত্যাগের মধ্য দিয়ে, আত্মজয়ের ভিতর দিয়ে ইয়োরোপীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সেবক হওয়ার। এবং যদি দরকার হয়, তার জন্য সংগ্রাম পর্যন্ত করা। সেবা করার জন্য যদি দরকার হয় তবে যে-সব অজ্ঞ, মূর্খ, অন্ধ তার অন্তরায় হয় তাদের বিনাশ করা।”

কর্নেলের এই ‘মৌলবাদী অবস্থান’ চাচার কছে অবশ্য ‘বড় আশ্চর্য ঠেকল’। কিন্তু বিষয়টি কর্নেলের জীবনের কত বিরাট অংশ দখল করে বসে আছে সেটা চাচা জানতে পেলেন যখন মিস্টার ডুটেনহফার একদিন রাত দুটোর সময় চাচার ঘরে এসে বললেন- “এত রাতে এলুম, কিছু মনে করবেন না; আমাদের আলোচনার সময় একটি কথা আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলুম, সেটি হচ্ছে, সুখদুঃখ, জয়পরাজয়, লাভক্ষতি যিনি সমদৃষ্টিতে দেখতে পারেন, একমাত্র তাঁর অধিকার সেবার ভার গ্রহণ করার, সেবার জন্য সংগ্রাম করার”।

কর্নেল ডুটেনহফার সেই ‘সুখদুঃখ’ ‘লাভক্ষতি’ সমদৃষ্টিতে দেখতে অর্থাৎ ত্যাগস্বীকার করতে পারেন বলেই প্রাশান জাতির সেবার অধিকার পেয়েছেন এবং সেই সেবার খাতিরেই তাঁর, একমাত্র কন্যাসন্তানটিকেও ত্যাগ করতে পেরেছেন। এবং বেবির পেরেমবুলেটরের হ্যান্ডেল-হাতে রোরুদ্যমানা কন্যাটিকে তাড়িয়ে না দিতে মিসেসকে বলার কারণে কর্ণেল নিজের জীবনের শেষ সঙ্গীটিকেও, মানে চাচাকেও ত্যাগ করতে পেরেছেন। এ ত্যাগটির কারণেই হয়তো, একমাত্র আয়ের উৎসটি হারিয়ে তাঁকে অর্ধ-অনশনে অনতিবিলম্বে মরতে হল।

মেয়েটির অপরাধ কী ছিল সেটা চাচা জানতে পেরেছিলেন বছরখানেক পর কর্নেলকে গোর দিতে গিয়ে। মেয়েটি বিশ^বিদ্যালয়ের  এক অধ্যাপককে বিয়ে করেছিলেন, যিনি জাতে ফরাসি।

এই ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশনটুকুও ছোটগল্পের সুপরিচিত সাসপেন্সের মতো শেষ মুহূর্তেই দিলেন গল্পকার। একইসঙ্গে হয়তো এই ইঙ্গিতটুকুও দিলেন যে নীতিতে চিরদুর্মর মানুষটিরও, জীবনে অমর মাত্র অল্পকটি দিন। কিন্তু গল্পটির এমন পরিণতির পরও লেখাটির ইতি আড্ডার ইয়ার্কি দিয়েই। কি গল্প, কি প্রবন্ধ, কি রচনা- মুজতবা আলীর যাবতীয় লেখারই শুরু এবং শেষ এমনি আড্ডার বাচালতা দিয়ে। লেখকের ভাবটা যেন, লেখার শ্রেণি-প্রকরণ খুঁজে বার করা এবং যুৎসই লেবেল মারা পাঠকের কাজ। মুজতবার একমাত্র কাজ আড্ডা মারা। কারণ- গল্পও নয়, প্রবন্ধও নয়- আড্ডাই তাঁর পরম আরাধ্য। তাঁর আড্ডাবাজির সাতকাহন থেকে কেউ যদি নিজের মনে ওসবের কিছু সাজিয়ে নিতে পারেন, ভালো। তিনি নিজে সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখবেন না কিছুই। আমি মনে করি পাঠকের সৌভাগ্য যে সৈয়দ মুজতবা আলী নিজের মন যেমন চেয়েছে, তেমনই লিখে গিয়েছেন। সে যাক।

আপাতত প্রশ্ন হল : জাতিভেদবাদের মতো অসমর্থনযোগ্য একটা আদর্শের প্রতিমূর্তি গড়লেন কেন লেখক। আমার উত্তর হল : অসাধারণ রচনাটাই তার পর্যাপ্ত জবাব। কারণ রচনাটা স্বয়ংসিদ্ধ। নিজেতেই নিজের সিদ্ধি লাভ করা সৃষ্টি তার সার্থকতার জন্য কোনও যুক্তিতর্কের মুখাপেক্ষী নয়। কথার নিটোল বুনটে নিখুঁত একটি মানবচরিত্র সৃষ্টি এমনিতেই একটি সফল গল্প। ইয়াগোর মতো ‘পিওর সিনার’, শাইলকের মতো নির্মম চরিত্র কেন সৃষ্টি করেছেন শেক্সপিয়ার? ওরকম মানবচরিত্র থাকে বলে। মুজতবা আলীও ‘কর্নেল ডুটেন্হফার’-চরিত্রটি অঙ্কন করেছেন ওরকম মনুষ্যচরিত্র আছে বলে। তবু লেখকের আরও নির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য অনুমান করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যসমালোচক অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী :

‘যে-কৌলীন্য ও জাত্যাভিমান শুধু পরের অবমাননা ও পরপীড়ন মাত্র করে না, যার শতকরা আশি ভাগই হল আত্মনিগ্রহ ও কৃচ্ছ্রসাধন, তার মধ্যে একধরনের heroism বা বীরত্ব আছে- কর্নেলের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে লেখক এই কথাটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ঠ)।

দ্বন্দ্বমধুর গ্রন্থভুক্ত ‘নোনামিঠা’ একটি অনবদ্য ছোটগল্প। গল্পটি নায়ক-নায়িকা, সিলেটের খালাসি করীম মুহম্মদ আর মার্সেলেসের নার্স সুজান, মুজতবা গল্পসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় জুটি। হৃদয়ের ঐশ^র্যে এবং ভালোবাসার প্রাচুর্যে দুজনের কেউ কারও চেয়ে কম নয়। করীমের সন্তান সারা-রোমাঁর মাতার হৃদয় আর তার নিজের মাতার হৃদয় অভিন্ন বোধে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে সুজানও বাৎসল্যরসের আকুতি কী, তা পুরোপুরি। “রোমাঁর মা আমার মনের সব কথা জানে… মাঝে মাঝে ভোরের ঘুম ভেঙে গেল দেখি সেও জেগে আছে। তখন আমার কপালে হাত দিয়ে বলে, ‘তোমার দেশে যদি যেতে ইচ্ছা করে, তবে যাও। আমি একাই বাচ্চা দুটোকে সামলাতে পারব।’ এ-সব আরম্ভ হল, নিজে মা হওয়ার পরের থেকে।’

বলল বটে, তবে সুজান জানে- কী ভয়ঙ্কর কথাই-না সে বলল। কারণ করীমের মতো সে-ও জানে যে তার স্বামীর ফিরে যাওয়া সহজ, কিন্তু ফিরে আসা অসম্ভব। তারা প্যারিস থেকে পাকা খবর আনিয়েছে যে ফরাসি পুলিস তাকে গ্রেফতার করবে। এবং ইন্ডিয়ায় চালান দেবে। সেটা গল্পের ভাষ্যকারও জানেন। মহল্লার জনৈক মুরুব্বি হিসেবে স্থানীয় থানায় পুলিসের সঙ্গে করীমের ভাবসাব থাকাতে তারা তাকে দেশে যাওয়া-আসার বিষয়ে বেশি নাড়াচাড়া করতে মানা করেছে। কেননা সে বিনা পাসপোর্টে এদেশে আছে সেকথা জেনে গেলে কর্তৃপক্ষ তাকে এমনিতেই তাড়িয়ে দেবে। (সতেরো বছর বয়সে আর পাঁচজন খালাসির সঙ্গে বন্দর দেখতে নেমেছিল সে মার্সেলেসে। পথ হারিয়ে, অসুখে পড়ে এবং আরও নানা কারণে অবৈধভাবেই থেকে যেতে হয়েছে তাকে। সেজন্য তার নামে হুলিয়া জারি করা হয়েছে)। হৃদয়বতী নার্স সুজান তাকে রোগ থেকে বাঁচিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, বিয়ে করেছে এবং উপার্জনের জন্য স্বামীকে তাঁত কিনে দিয়েছে। স্বামীও ব্যবসা করে টাকা কামিয়ে স্ত্রীকে চাকরি থেকে মুক্তি দিয়েছে। একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে নিয়ে দুজনে সুখে আছে মার্সেলেসে। তাহলে করীমের সিলেটে ফিরে যাওয়ার কথা ওঠেই-বা কেন। ওঠে ঢেউপাশা গ্রামে তার পথ চেয়ে বসে থাকা বুড়ো মায়ের জন্য। দু-পয়সা হতেই সুজানের পরামর্শে ব্যাংকের মাধ্যমে মাসে মাসে বুড়িকে মেলা টাকাই পাঠনো হয়েছে। খেয়ে-পরে উদ্বৃত টাকা মা গাঁয়ের জন্যে জুম্মা-ঘরও বানিয়ে দিয়েছে।

“কিন্তু হুজুর, টাকা দিয়ে চোখের পানি বন্ধ করা যায় না। একথা আমি খুব ভালো করেই জানি। বুড়িও বলে পাঠিয়েছে, টাকার তার দরকার নেই, আমি যেন দেশে ফিরে যাই।”

এ-কারণে কঠিন এক দ্বন্দ্বে পড়েছে সর্বসুখে সুখী দম্পতিটি। মায়ের সন্তান মায়ের কাছে ফিরে গেল, স্ত্রীর সন্তান কিভাবে থাকবে। মাতা তাদের রাখতে পারলেও পিতা তো তার স্ত্রী-সন্তানহারা হয়ে যাবে। তারা এখন কী করবে- সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিদ্ধান্তের জন্য তাই করীমকে গল্পকারের কাছে তাঁর হোটেলে পাঠিয়েছে সুজানই। লেখকও জানেন- মাতার জন্য, মাতৃভূমির জন্য, করীমের মন কতখানি আকুল। সে তাঁর পায়ের ধুলো নিতে চাইলে ‘থাক্ থাক্’ বললেও লেখক বুঝতে পেরেছেন, “সে তাঁর পায়ের ধুলো নিতে যাচ্ছে না, সে পায়ের ধুলো নিচ্ছে তার দেশের মুরুব্বিদের… তার মাথায় ঠেকাচ্ছে দেশের মাটির ধুলো, তার মায়ের পায়ের ধুলো। আমি তখন বারণ করবার কে? আমার কী দম্ভ! সে কি আমার পায়ের ধুলো নিচ্ছে।”

‘এইবার আপনি হুকুম দিন হুজুর।’ গল্পের গার্জিয়ান-এঞ্জেল বললেন, ‘তুমি আমায় মাপ কর।’ কিন্তু মাপ করে না কিংকর্তব্যবিমূঢ় করীম। “সে আমার পায়ে ধরে বললে, আপনার বাপ-দাদা আমার বাপ-দাদাকে বিপদে-আপদে সলা দিয়ে হুকুম করে বাঁচিয়েছেন, আজ আপনি আমায় হুকুম দিন।” আবারও মাপ চাইলেন লেখক। সে অনেক কান্নাকাটি করলেও তিনি নীরব থাকেন। গল্পটির অন্তিম দুটি পঙ্ক্তি বড়ই মর্মস্পশী :

‘শেষ রাত্রে সে আমার পায়ে চুমো খেল, আমি বাধা দিলুম না। বিদায় নিয়ে বেরোবার সময় দোরের গোড়ায়  তার বুক থেকে বেরুল, “ইয়া আল্লা”!’

 ছোটগল্পটিতে মানবজীবনের একটি বিরাট অধ্যায়ই উঠে এল।

প্রকাশভঙ্গি, বাগ্বিধি এবং সহৃদয়তা ইত্যাদির দিক থেকে ‘পাদটীকা’ মুজতবা আলীর একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গল্প। মুজতবা-গবেষক অধ্যাপক নূরুর রহমান খান লিখেছেন :

“উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রচনার শিল্পমূল্য ক্ষেত্রবিশেষে যেমন অপেক্ষাকৃত গৌণ, তেমনি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীন রচনাও মূল্যহীন। বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক রচনার শিল্পগুণান্বিত প্রকাশ সৃজনশীল প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব। এবং এ-শ্রেণির কিছু লেখায় মুজতবা আলীর রচনাসম্ভার পরিপুষ্ট। তার মধ্যে সর্বোগ্রেই নাম করতে হয় ‘পাদটীকা’র- বাঙলা ছোটগল্পের সূচীতে একটি উল্লেখ্য সংযোজন।”

পৃ. ১৯৩ মুজতবা-সাহিত্যের রূপবৈচিত্র ও রচনাশৈলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা)।

এদেশের টোল-মক্তব-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা বদলে যায় দখলদার ইংরেজের আগমনে, বিশেষভাবে ভেঙে পড়ে গরিব পাড়াগাঁয়ের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এবং চরম উপেক্ষা ও দুর্দশার শিকার হন পণ্ডিত-মৌলভিগণ। প্রখ্যাত সমালোচনা -সাহিত্যিক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন :

“বিদেশি শাসনের ধাক্কায় ভেডে পড়া প্রাচীন সংস্কৃত বিদ্যা সম্বন্ধে বহু বক্তৃতা অপেক্ষা এই একটি গল্প যথেষ্ট লক্ষ্যভেদী। পণ্ডিত মশাইয়ের পাণ্ডিত্যের বোঝা এবং ব্যর্থতা দুই-ই সকরুণ শ্রদ্ধায় রূপায়িত… (পাদটীকা) গল্পটিতে।”

[পুস্তক সমালোচনা, সৈয়দ, মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প, চতুরঙ্গ, মাঘ ১৩৬৮]।

পণ্ডিতমশাইয়ের চরিত্রচিত্রণের একটু নমুনা :

“বাঙলা ভাষার প্রতি পণ্ডিতমশাইয়ের ছিল অবিচল, অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা- ঘৃণা বললেও হয়তো বাড়িয়ে বলা হয় না। বাঙলাতে যেটুকু খাঁটি সংস্কৃত বস্তু আছে তিনি মাত্র সেইটুকু পড়াতে রাজি হতেন- অর্থাৎ কৃৎ, তদ্ধিত, সন্ধি এবং সমাস। তা-ও বাঙলা সমাস না।… কিন্তু পণ্ডিতমশাই যত না পড়াতেন, তার চেয়ে বকতেন ঢের বেশি, এবং টেবিলের উপর পা দু’খানা তুলে দিয়ে ঘুমুতেন সব চেয়ে বেশি।”

কিন্তু লেখক যেহেতু মুজতবা আলী, কথাটি এখানেই থামে না :

‘শুনেছি ঋগে¦দে আছে, যমপত্নী যমী যখন যমের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাতুরা হয়ে পড়েন তখন দেবতারা তাঁকে কোনও প্রকারে সান্ত্বনা না দিতে পেরে শেষটায় তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই আমার বিশ^াস, পণ্ডিতমশাইয়ের টোল কেড়ে নিয়ে দেবতারা তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জন্য অহরহ ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কারণ এরকম দিনযামিনী সায়ংপ্রাত ঃ শিশিরবসন্তে বেঞ্চি-চৌকিতে যত্রতত্র অকাতরে ঘুমিয়ে পড়তে পরাটা দেবতার দানÑ একথা অস্বীকার করার জো নেই।”

নাঙ্গা ভুখা জনতার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক দারিদ্র্যের শিকার এক মনুষ্য-নির্মাতার মর্মস্পর্শী জীবনালেখ্য এই গল্পটি। এর নায়ক গ্রামীণ স্কুলের সংস্কৃতের পণ্ডিতমশাই- তিনি, তাঁর ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসীসহ একুনে আটজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য- মাসোহারা পান পঁচিশ টাকা মাত্র। তিনি চিফ কমিশনারের আরদালির কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, তার সাহেবের ‘তিন ঠেঙী’ কুকুরের পেছনে মাসে খরচ হয় পঁচাত্তর টাকা। চিফের স্কুল পরিদর্শন উপলক্ষে দেয়া তিন দিন ছুটির পরে স্কুল খুললে পণ্ডিতমশাই ক্লাসে এসে জিগ্যেস করলেন : “এখন বল্ তো দেখি, তবে বুঝি তোর পেটে কত বিদ্যে, এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সায়েবের কুকুরের কটা ঠ্যাঙর সমান?’

আমি হতবাক্।

‘বল্ না।’

আমি মাথা নিচু করে বসে রইলুম। শুধু আমি না, সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ।

পণ্ডিতমশাই হুঙ্কার দিয়ে বললেন,

‘উত্তর দেÑ।’

মূর্খের মতো একবার পণ্ডিতমশায়ের মুখের দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়েছিলুম। দেখি সে মুখ লজ্জা, তিক্ততা, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছে।

ক্লাসের সব ছেলে বুঝতে পেরেছে- কেউ বাদ যায়নি- পণ্ডিতমশাই আত্ম-অবমাননার কী নির্মম পরিহাস সর্বাঙ্গে মাখছেন, আমাদের সাক্ষী রেখে।

পণ্ডিতমশাই যেন উত্তরের প্রতীক্ষায় বসেই আছেন।”

তিনি কিন্তু সমস্ত দেশবাসীর সম্মুখে তাঁর প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়ে জবাবের দাবিতে আজ অবধি অপেক্ষমাণ। গল্পটির পাঠকবর্গও আজও পর্যন্ত সেই ক্লাসটির মতোই নিস্তব্ধ। এই তো সেই শেষ না-হওয়ার রেশ, সার্থক ছোটগল্পের।

মুজতবা আলীর, সন্ধানপ্রাপ্ত, প্রথম রচনা ‘নেড়ে’ বিশ^ভারতীর দেয়াল- পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯২৩-২৪ সালে এবং সংকলিত হয় অনেক পরে ১৯৬৭ সালে পছন্দসই-শীর্ষক গ্রন্থে। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা অনায়াসেই সম্ভব, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া অনায়াসে সম্ভব নয় বরং সাধনাসাপেক্ষ। এ সত্যটার কার্যকর গল্পরূপ ‘নেড়ে’ এবং সেজন্যই গল্পকার মুজতবার প্রথম গল্পটিকেই সার্থক বলতে হয়। খুবই দ্রুতগতির ছোট্ট শরীরের গল্পটির আখ্যানভাগ অল্পই।

গল্পের ‘আমি’টি ছাত্র, পুজোর ছুটির পর কলকাতা ফিরছিলেন। চাঁদপুরে ঠেলাঠেলি করে জাহাজে উঠে সিঁড়ির পাশের একমাত্র খালি জায়গাটা দখল করে রেলিঙে মাথা ঠেকিয়ে বাকি তিনপাশে বাক্স, বালিশ আর জুতা দিয়ে ব্যূহ রচনা করে বসলেন। বসেই দেখলেন, এক হিন্দু-দম্পতির খালি শরীরই উঠেছে সিঁড়ি দিয়ে, মালপত্র ওঠেনি; মানে গয়নার বাক্সসহ সামান নিয়ে “কুলি চম্পট”। দুর্ঘটনার বিবরণ শুনে ছাত্রটি ছুটে নেমে গিয়ে ‘এগারো নম্বর’ কুলিটিকে পেলেন বটে, তবে সে বাবুর মাল নদীর ধারে দেখিয়ে দিয়ে আরেক সায়েবের মাল-মাথায় চলে গেল। বাধ্য হয়ে ছাত্রটি বাবুর বিছানা-ট্রাঙ্ক ঘাড়ে আর গয়নার বাক্স হাতে নিয়ে অতিকষ্টে সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলেন।

ইতোমধ্যে তাঁর সুরক্ষিত ‘সাম্রাজ্য’টি জুড়ে বসা পরিবারটির বাবু ছাত্রটিকে ক্ষুদ্র একটুকু কোণ ছেড়ে দিয়ে বললেন যে বেশি কষ্ট হবে না- তাঁর পরের স্টেশন তারপাশাতেই নেমে যাবেন। ফ্যাসাদে পড়ে-যাওয়া ছাত্রটি টকেটিভ লোকটিকে এড়ানোর জন্য ফেরিওয়ালা পেয়ে “আনন্দবাজার” কিনে পড়তে চাইলেন। তা-ও চেয়ে নিয়ে ভদ্রলোক চেঁচিয়ে হেডলাইন পড়লেন : “জগৎগুরু মহাত্মা গান্ধীর কারাবাস- আজ ২২৫দিন। তাঁহার বিদায়বাণী, খদ্দর পরিধান- ছুঁৎমার্গ পরিহার।” অতঃপর লোকটি বক্তৃতা জুড়ে দিলেন- মাত্র দুটি নির্দেশ দিয়েছেন মহাত্মা, তা-ও পোড়া দেশে কেউ শুনবে না। তিনি খদ্দর পরেন না, কারণ বস্ দেখলে চটে; তবে ছোঁয়াছুঁয়ি মানেন না (“কেনই বা মানব? কেন মুচি মুসলমান কি মানুষ নয়? ওদের সঙ্গে ব’সে কেন খাব না? খুব খাব- আলবৎ খাব।”) ‘খাব’ বলতেই খাওয়ার কথা মনে পড়াতে স্ত্রীর কাছ থেকে জলখাবার চেয়ে নিলেন গাঁধিবাদীটি। খাওয়ার আয়োজন হচ্ছে দেখেই ছাত্রটি উঠে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে একরকম জোর করেই বসিয়ে দিলেন বাবু এবং আরও জোর করে একটা রসগোল্লা খাইয়ে দিলেন। জোরাজুরিটা সম্ভবত উপকারের প্রতিদানস্বরূপ। অতিশয় কৃতজ্ঞ বাবুটি ঘণ্টাখানেক পর তারপাশায় সৌজন্য সহকারে বিদায় নিলেন।

বিদায়পর্বটি হুবহু উদ্ধার করতে হয়, কারণ ওটিই গল্পটির, যাকে বলে, শাঁস :

‘বাবুটি পারে নাবতে যাবেন এমন সময় ফিরে বললেন :

“চিঠিপত্র লিখ্বেন- আপনার ঠিকানা?- তাই তো নামই জানা হল না। আপনার নাম?”

“আব্দুল রসুল।”

থমকে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলেন :

“কী?”

“আব্দুল রসুল।”

“তুমি মুসলমান?”

আমি বললুম,

‘হ্যাঁ, কেন?”

ভদ্রলোক মুখ খিঁচিয়ে বললেন,

“কেন?- কেন জাতটা মারলে? খাবার সময় বললে না কেন তুমি মুসলমান? উল্লুক!”

আমি অবাক হয়ে বললুম,

আপনি যে বললেন, জাত মানেন না!”

তিনি তেড়ে এসে আমার নাকের কাছে হাত নেড়ে বললেন,

“মানি নে, খুব মানি। আলবৎ মানি। সাত পুরুষ মেনে এসেছে আর আমি মানি নে! আবার প্রাচ্চিত্তির ফেরে ফেললে! হতভাগাÑ নেড়ে!”

মুজতবা আলীর উনিশ-বিশ বছর বয়সের এই লেখাটি- আঙ্গিক, শৈলী, ভাষা- যে-কেনও বিচারে উত্তীর্ণ একটি উজ্জ্বল ছোটগল্প। অথচ গল্পটির পরে লেখক একেবারেই নিশ্চুপ। ছ-বছর ন-বছরে মাত্র দু-একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘নেড়ে’র পরের গল্পটি লিখেছেন তিনি সুদীর্ঘ বিশ-বাইশ বৎসর পর- ‘কাফে দ্যে জেনি’, যেটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫২ সনের ভাদ্র মাসে।

ইতিমধ্যেই অপরিমিত হয়ে ওঠা লেখাটির ইতি এবার টানতেই হয়, শেষ কথাটি বলে। কথাটা হল- মুজতবা আলীর যে-কোনও লেখাই যেন একটি আকর্ষণীয় গল্প অথবা ছোটগল্প।

১৫ নভেম্বর ২০০৫

* বিশিষ্ট কথাশিল্পী আবদুশ শাকুর (২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ – ১৫ জানুয়ারি ২০১৩) ‘বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র’ কর্তৃক প্রকাশিত সৈয়দ মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ গল্প গ্রন্থের  ‘ভূমিকা’ লিখেছেন। উক্ত গ্রন্থের সপ্তম সংস্করণ অষ্টাদশ মুদ্রণ থেকে ‘ভূমিকা’টি উপরোল্লিখিত শিরোনামে শব্দঘর-এ মুদ্রিত হলো।

-সম্পাদক

আবদুশ শাকুর : (২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ – ১৫ জানুয়ারি ২০১৩) বিশিষ্ট কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares