আবারও পড়ি : রাষ্ট্রভাষা : সৈয়দ মুজতবা আলী

আবারও পড়ি

রাষ্ট্রভাষা

সৈয়দ মুজতবা আলী

[এ প্রবন্ধ আমি বহু বৎসর পূর্বে, ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে লিখি, কিন্তু তখনও রাষ্ট্রভাষা সমস্যা তার রুদ্রতম রূপ ধারণ করেনি বলে- আমি জানতুম একদিন নেবেই নেবে, তাই আগেভাগেই সাবধানবাণী শোনাতে চেয়েছিলুম- (দক্ষিণ ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে যে-সংগ্রাম প্রয়োজনাতীত তাণ্ডব রূপ ধারণ করে- সে তো তার বহু পরের ঘটনা!) আমর প্রিয় পাঠকবর্গ সমস্যাটির গুরুত্ব অনুভব করতে পারেননি। ফলে, উৎসাহাভাবে, আমি প্রবন্ধটিকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারিনি]

ভারতবর্ষের সবাই যদি এক ভাষায় কথা বলত তা হলে সবদিক দিয়ে আমাদের যে কত সুবিধে হতো সেকথা ফলিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। শুধু যে কাজ-কারবারের মেলা বখেড়ার ফৈসালা হয়ে যেত তাই নয়, একই ভাষার ভিত্তিতে আমরা অনায়াসে নবীন ভারতীয় সংস্কৃতি-বৈদগ্ধ্যের ইমরত গড়ে তুলতে পারতুম। মালমসলা আমাদের বিস্তর রয়েছে, তাই সেই ইমারত বাইরের পাঁচটি দেশের শাবাসিও পেত।

এ তত্ত্বটা নতুন নয়। কিন্তু একই ভাষার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক ইমারত পড়ে তুলতে গেলেই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে করজোড়ে স্বীকার করছি আমার জীবনে আমি যত দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছি তার মধ্যে এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কাবু করেছে- এ দ্বন্দ্বের সমাধান আমি কিছুতেই করে উঠতে পারিনি। বিচক্ষণ পাঠক যদি দয়া করে এ অধমকে সাহায্য করেন।

 বৈদিক সভ্যতাসংস্কৃতি একটিমাত্র ভাষার ওপরই খাড়া ছিল সেকথা আমরা জানি তার কারণ সে যুগে আর্যরা ভারতবর্ষে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়েননি এবং দ্বিতীয়তর অনার্যদের সঙ্গে তাঁদের ব্যাপক যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি বলে সে ভাষাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন অতি অল্পই হয়েছিল।

প্রভু বুদ্ধের যুগ আসতে না আসতেই দেখি, সে ভাষা আর আপামর জনসাধারণ বুঝতে পারছে না। যতদূর জানা  আছে, প্রভু বুদ্ধ তাঁর নবীন ধর্ম প্রচারের বৈদিক ভাষা কিংবা সে ভাষার তৎকালীন প্রচলিত রূপের শরণ নেননি। তিনি তৎকালীন সর্বজনবোধ্য ভাষার শরণ নিয়েছিলেন- সে ভাষাকে প্রাকৃত বলা যেতে পারে। ব্রাহ্মণ্যধর্ম কিংবা ব্রাহ্মণ্য ভাষার প্রতি অশ্রদ্ধাবশত তিনি যে বিহারে প্রচলিত তৎকালীন সর্বজনবোধ্য ভাষার শরণ নিয়েছিলেন তা নয়, কারণ সকলেই জানেন বুদ্ধদেব ‘ব্রাহ্মণ-শ্রমণ’ এই সমাস বার বার ব্যবহার করেছেন, উভয়কে সমান সম্মান দেখবার জন্য। জনপদ-ভাষা যে তিনি ব্যবহার করেছিলেন তার একমাত্র কারণ বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষের অন্যতম সর্বপ্রথম গণ-আন্দোলন এবং গণ-ভাষার প্রয়োগ ব্যতীত গণ-আন্দোলন সফল হতে পারে না।

এস্থলে লক্ষ করবার বিষয় বিহারের আঞ্চলিক উপভাষা ব্যবহার করতে বুদ্ধদেব সর্বভারতের পণ্ডিতজনবোধ্য ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তিনি তাতে বিচলিত হননি।

ঠিক একই কারণে মহাবীর জিনও আঞ্চলিক উপভাষার শরণ নিয়ে অর্ধ-মাগধীতে আপন বাণী প্রচার করেন। শাস্ত্রীয় মতবাদ এবং জীবহত্যা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ মতানৈক্য বাদ দিলে বৌদ্ধ ও জৈন গণ-আন্দোলন একই রূপ একই গতি ধারণ করেছিল।

অশোকস্তম্ভে উৎকীর্ণ ভাষাও সংস্কৃত নয়।

তার পরের বড় আন্দোলন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব আনয়ন করেন। তিনিও প্রধানত সর্বজনবোধ্য বাঙলার শরণ নিয়েছিলেন- যদিও তাঁর সংস্কৃতজ্ঞান সে যুগের কোনও পণ্ডিতের চেয়ে কম ছিল না। পশ্চিম ও উত্তর ভারতেও তুকারাম মারাঠি ব্যবহার করেন। কবীর-দাদু প্রভৃতি সাধকেরা হিন্দি ব্যবহার করেন। কবীর বললেন, ‘সংস্কৃত কূপজল,’ সে জল কুয়ো থেকে বের করে আনতে হলে ব্যাকরণ-অলঙ্কারের লম্বা দড়ির প্রয়োজন কিন্তু ‘ভাষা’ (অর্থাৎ সর্বজনবোধ্য প্রচলিত ভাষা) ‘বহতা নীর’- সে জল বয়ে যাচ্ছে, যখন-তখন ঝাঁপ দিয়ে শরীর শান্ত করা যায়। আর তুকারাম বললেন, ‘সংস্কৃত যদি দেবভাষা হয় তবে মারাঠি কি চোরের ভাষা?’

তার পরের গণ-আন্দোলন মহাত্মা গান্ধী আরম্ভ করেন। তিনি যদিও জনগণের ভাষা হিন্দির শরণ নিয়েছিলেন তবু লক্ষ করার বিষয় যে, অসহযোগ আন্দোলন বাঙলা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, কেরালায় হিন্দি কিংবা ইংরেজির মাধ্যমে আপামর জনসাধরণে প্রসারলাভ করেনি; জনগণ যে সাড়া দিল সে বাঙলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালাম ভাষার মাধ্যমে- অসহযোগ আন্দোলন প্রচার করার ফলে। বারদলই সত্যাগ্রহের প্রধান বক্তা ছিলেন বল্লভভাই পটেল। তিনি যে অদ্ভুত তেজস্বিনী গুজরাতি ভাষার বক্তৃতা দিয়েছিলেন সে ভাষা অনায়াসে সাহিত্যের পর্যায়ে ওঠে। বল্লভভাইয়ের গুজরাতির সঙ্গে তাঁর হিন্দির  কোনও তুলনাই হয় না।

এতক্ষণ ধরে যে ঐতিহ্যের বর্ণনা দিলুম সে শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রভু খ্রিস্ট সাধু এবং পণ্ডিতি ভাষা হিব্রুতে তাঁর ধর্ম প্রচার করেননি। তাঁর প্রথম ও প্রধান শিষ্যদের বেশিরভাগই ছিলেন অতি সাধারণ জেলে। তাঁর প্রচারকার্য এঁদের নিয়ে আরম্ভ হয় বলে তিনি তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন গ্যালিলি-নাজারেৎ অঞ্চলবোধ্য আরামেইক উপভাষায়। মহাপুরুষ মুহম্মদও যখন আরবির মাধ্যমে আল্লার আদেশ প্রচার করলেন তখন আরবি ভাষা ছিল পৌত্তলিকদের ‘না-পাক’ ভাষা, এবং সে ভাষায় ধর্মপ্রচারের কোনও ঐতিহ্য ছিল না। ইসলামের ইতিহাসে লেখা আছে মহাপুরুষ মুহম্মদের ঈষৎ পূর্বে এবং তাঁর সমবর্তীকালে মক্কাবাসীদের যাঁরা সত্য পথের অনুসন্ধান করতেন তাঁরা হিব্রু শিখে সে ভাষায় ধর্মগ্রন্থ পড়তেন। তাই যখন মহাপুরুষ হিব্রুর শরণাপন্ন না হয়ে আরবির মাধ্যমে ধর্মপ্রচার করলেন তখন সবাই তাজ্জব মেনে গেল। তার উত্তরে আল্লা-ই কুরান শরিফে বলেছেন, তাঁর প্রেরিত পুরুষ যদি আরব হয় তবে প্রচারের ভাষা আরবি হবে না তো কী হবে? আর আরবি না হলে সবাই বলত, ‘আমরা তো এসব বুঝতে পারছিনে।’

লুথারও পোপের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন জর্মনের পক্ষ নিয়ে- পণ্ডিতি লাতিন তিনি এই বলেই অস্বীকার করেছিলেন যে, সে ভাষার সঙ্গে আপামর জনসাধারণের কোনও যোগসূত্র ছিল না।

 মোদ্দা কথা এই, এ পৃথিবীতে যতসব বিরাট আন্দোলন হয়ে গিয়েছে- তা সে নিছক ধর্মান্দোলনই হোক আর ধর্মের মুখোশ পরে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আন্দোলনই হোক- তার সব ক’টাই গণ-আন্দোলন এবং গণ-আন্দোলন সর্বদাই আঞ্চলিক গণভাষার মাধ্যমেই আত্মপ্রকাশ করেছে।

রাষ্ট্রভাষার যে প্রয়োজন আছে সে সত্য তর্কাতীত, কিন্তু প্রশ্ন সে ভাষা গণ-আন্দোলন উদ্বুদ্ধ করতে পারবে কি না? যাঁরা মনে করেন, স্বরাজ লাভ হয়ে গিয়েছে এখন আর গণ-আন্দোলনের কোনও প্রয়োজন নেই, তাঁরা হয় মারাত্মক ভুল করেছেন, নয় ভাবছেন দেশের জনগণ তাঁদের জন্য পায়ের ঘাম মাথায় ফেলে খাটবে আর তাঁরা শহরে শহরে দিব্য খাবেন-দাবেন আর কেউ কোনওপ্রকারের তেরিমেরি করলে ডাণ্ডা উঁচিয়ে ভয় দেখাবেন এবং তাইতেই সবকিছু বিলকুল ঠাণ্ডা হয়ে থাকবে।

 সেটি হচ্ছে না, সেটি হবার জো নেই। যে জনসাধারণকে একদা স্বাধীনতা সম্বন্ধে সচেতন করে স্বরাজের জন্য লড়ানো হল, তাদের এখন ডেকে আনতে হবে রাষ্ট্রনির্মাণ কর্মে। তারা যদি ভারতীয় রাষ্ট্রকে আপন রাষ্ট্র বলে চিনতে না পারে, সে রাষ্ট্রের প্রতি যদি তাদের আত্মীয়তাবোধ না জন্মে তবে নানাপ্রকারের বিপদের সম্মুখীন হতে হবে- তার ফিরিস্তি দেবার প্রয়োজন নেই। পাড়ার কম্যুনিস্টকে ডেকে জিগ্যেস করুন- সে সব বাৎলে দেবে।

এখন প্রশ্ন, কোন ভাষার মাধ্যমে আমরা জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত হব? বেশিরভাগ লোকই স্বীকার করে নিয়েছেন পাঠশালাতে মাত্র একটি ভাষা শেখানো হবে- অর্থাৎ হিন্দি যেসব অঞ্চলের আপন ভাষা সেগুলো বাদ দিয়ে আর সর্বত্র মাত্র প্রাদেশিক ভাষাটিই শেখানো হবে। অর্থাৎ বাঙলা, উড়িষ্যা, অন্ধ্র অঞ্চলের পাঠশালাগুলোতে ছেলেমেয়েরা সুদ্ধ আপন আপন মাতৃভাষা শিখবে। ভারতবর্ষ থেকে নিরক্ষরতা কবে দূর হবে জানিনে, তবে আশা করি সকলেই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, নিরক্ষরতা দূর হওয়ার বহু বৎসর পর পর্যন্ত এদেশের শতকরা ৭০টি ছেলেমেয়ে পাঠশালাতেই লেখাপড়া শেষ করবেÑ এবং শিখবে শুধু মাতৃভাষা।

বাদবাকিরা হিন্দি শিখবেন- সে হিন্দি জ্ঞান কতটা হবে তার আলোচনা পরে হবেÑ এবং ক্রমে ক্রমে অতি অল্পসংখ্যক লোকই ইংরেজি শিখবেন, আজকের দিনে চীন কিংবা মিশরের লোক যে অনুপাতে ইংরেজি শেখে।

রাষ্ট্রভাষা সর্বভারতে চালু করনেওয়ালারা বলেন, আজ ইংরেজি ভাষা যেরকম ব্যবহৃত হচ্ছে একদিন হিন্দি তার আসনটি নিয়ে নেবে অর্থাৎ যাবতীয় রাজকার্য, মামলা-মোকদ্দমার তর্কাতর্কি, রায়, আপিল বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, পার্লিমেন্টে বক্তৃতা ঝাড়া ইত্যাদি তাবৎ কর্ম হিন্দিতে হবে। কলকাতা তথা অন্ধ্র, তামিলনাড়ু বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দির মাধ্যমে জ্ঞানদান হবে কি না সে সম্বন্ধে অনেকেরই মনে ধোঁকা রয়ে গিয়েছে, তবে কট্টর রাষ্ট্রভাষীদের বাসনা যে তাই সে সম্বন্ধে খুব বেশি সন্দেহ নেই।

তা হলে অনায়াসে ধরে নিতে পারি ইংরেজ আমলে যেরকম আমাদের বেশিরভাগ ভালো লেখকেরা সভ্যতা সংস্কৃতি সম্বন্ধে ইংরেজিতে বই লিখতেন (রাধাকৃষ্ণনের ইন্ডিয়ান ফিলসফি থেকে পণ্ডিতজির ডিস্কভারি অব্ ইন্ডিয়া ইস্তেক) ঠিক তেমন আমাদের ভবিষ্যতের শক্তিশালী লেখকেরা তাঁদের প্রচেষ্টা নিয়োগ করবেন হিন্দির মাধ্যমে এবং যে সৎসাহিত্য- গল্প উপন্যাস কবিতাই সাহিত্যের একমাত্র কিংবা প্রধান সৃষ্টি নয়Ñ হিন্দিতে গড়ে উঠবে সেটা, বাঙলা, তামিল, গুজরাতি সাহিত্য-সৃষ্টিপ্রচেষ্টার খেসারতি দিয়ে। এতদিন যে ভারতীয় ভাষাগুলোতে নানামুখী সৃষ্টিকার্য প্রসার এবং  প্রচার লাভ করতে পারছিল না তার জন্য আমরা প্রাণভরে ইংরেজির জগদ্দল পাথরকে গালমন্দ করেছি এখন হিন্দির চাপে সেই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, কিন্তু হয়তো গালমন্দ করার অধিকার থাকবে না। পূর্ববঙ্গে যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে চালু করবার চেষ্টা হয়েছিল তখন আমি অন্যান্য যুক্তির ভিতর এইটিও পেশ করে তীব্রকণ্ঠে আপত্তি জানিয়েছিলুম এবং বহু পূর্ববঙ্গবাসী আমার যুক্তিতে সায় দিয়েছিলেন।

আমাদের প্রাদেশিক সাহিত্যের যে ক্ষতি হবে সেকথা এখন থাক। উপস্থিত মোদ্দকথা হচ্ছে এই, ভারতীয় নবীন রাষ্ট্রনির্মাণ সম্বন্ধে গবেষণা, আলোচনা, তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ যেসব গ্রামভারি কেতাব, ব্লু বুক, দলিল-দস্তাবেজ, উৎসাহোদ্দীপক ওজস্বিনী এবং গম্ভীর পুস্তক রচিত হবে সেগুলো হবে হিন্দিতে এবং দেশের শতকরা সত্তরজন লোক গ্রামে বসে সেগুলো পড়তে পারবে না।

একদা এই সত্তরজন লোকের প্রয়োজন হয়েছিল ইংরেজকে তাড়াবার জন্য। আমার দৃঢ় বিশ^াস, ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র এই সত্তরজনকে বাদ দিয়ে নির্মাণ করা যাবে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাবৎ কেতাব বাঙলাতে লিখলেই কি এরা সেগুলো পড়ে বুঝতে পারবে? সে সম্বন্ধে আমার কিঞ্চিৎ নিবেদন আছে। আমার বিশ্বাসস, দেশ সম্বন্ধে জ্ঞান সঞ্চয় সবসময় বিশ^বিদ্যালয়ের দেওয়া ছাপের ওপর নির্ভর করবে না। এমন সব ইংরেজি-অনভিজ্ঞ, অর্থাৎ সুদ্ধ বাঙলা-ভাষী পাঠশালার পণ্ডিত আছেন, যাঁরা দেশের অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন আছেন বলে এবং বাংলা দৈনিকের মারফতে অতি অল্প যে রাষ্ট্রসংবাদ পান তারই জোরে গ্র্যাজুয়েটকে তর্কে ঘায়েল করতে পারেন। অনেক এম. এ. পাস লোক বই জমায় না- জমালে জমায় চেক বুক- আর অনেক পাঠশালার পণ্ডিত গোগ্রাসে যে কেতাব পান তাই গেলেন। পুনরায় নিবেদন করি, জ্ঞানতৃষা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাধির ওপর নির্ভর করে না।

তাই দেখতে হবে আমদের রাষ্ট্রনির্মাণ প্রচেষ্টার সর্বসংবাদ যেন এমন ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যে ভাষা মানুষের মাতৃভাষা। ইংরেজ আমলে ইংরেজি জাননেওয়ালা ও না-জাননেওয়ালার মধ্যে যে ন্যক্কারজনক কৌলীন্যের পার্থক্য ছিল সেটা যেন আমরা জেনেশুনে আবার প্রবর্তন না করি।

সুশীল পাঠক, মাঝে মাঝে ধোঁকা লাগে, রাষ্ট্রভাষা, রাষ্ট্রভাষা নিয়ে এই যে আমি হপ্তার পর হপ্তা দাপাদাপি করছি তাতে তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠছ না তো? আমি তো হয়ে গিয়েছি কিন্তু বিষয়টি বড্ডই গুরুত্বব্যঞ্জক এবং আমার বিশ্বাস, ভারতবর্ষের শুধু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এর ওপর নির্ভর করছে না, আমাদের অতীত ঐতিহ্য, আমাদের ভবিষ্যৎ বৈদগ্ধ্য সংস্কৃতি সবকিছুই এর ওপর নির্ভর করছে। একবার যদি ভুল রাস্তা ধরি তবে আমড়াতলার মোড়ে ফিরে আসতেই আমাদের লেগে যাবে বহু যুগ এবং তখন আবার নতুন করে সবকিছু ঢেলে সাজতে গিয়ে প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। আজকের দিনে পৃথিবীতে কেউ বসে নেই- তখন দেখতে পাবেন, আর সবাই এগিয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ রাজনীতিতে আপনি অমুক দেশের ধামাধরা হয়ে আছেন, অর্থনীতিতে আপনি আর এক মুল্লুকের কাছে সর্বস্ব বিকেয়ে দিয়েছে এবং কৃষ্টি সংস্কৃতিতে নিরেট হটেন্টট বনে গিয়েছেন।

         কেন্দ্রের ভাষা যে হিন্দি হবে সে বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু কেন্দ্রীয় পরিষদের ভাষা হবে কী? অর্থাৎ প্রশ্ন, পার্লিমেন্টে সদস্যেরা বক্তৃতা দেবেন কোন ভাষায়?

হিন্দিওয়ালা হিন্দিতে দেবেন- বাঙলা কথা। কিন্তু তামিল-ভাষীরা দেবেন কোন ভাষায়?

এতদিন একদিকে দিয়ে আমাদের কোনও বিশেষ হাঙ্গামা ছিল না। সব প্রদেশের সদস্যরা ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন- অথচ কারওরই মাতৃভাষা ইংরেজি ছিল না বলে অহেতেুক সুবিধা কেউই পেত না। এবং যে সুবিধাটা পেত ইংরেজ রাজসম্প্রদায় এবং তারা যে সে সুযোগটা ন-সিকে কাজে লাগাত সেকথাও সবাই জানেন।

এখন অবস্থাটা হবে কী? কেঁদে-ককিয়ে যেটুকু হিন্দি শিখব তার জোরে কি পার্লিমেন্টে বক্তৃতা ঝাড়া যায়? পূর্বেই নিবেদন করেছি, হিন্দিকে যদি তিরু অনন্তপুরম (ত্রিভান্দরম) কিংবা বিশাখাপট্টনম (ভাইজাগ্) বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম করা হয় (কলকাতা কিছুতেই মানবে না, সে আপনি-আমি বিলক্ষণ জানি) তাবে তাদের আখেরটি ঝরঝরে হয়ে যাবে। অতএব অন্ধ্র, তামিলনাড়ু, কেরালার লোক দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে যেটুকু হিন্দি শিখবে- (সবাই শিখবে তা-ও নয়, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না-ও শিখতে পারে)- তা দিয়ে কি সে হিন্দি-ভাষীদের সঙ্গে বাক্যুদ্ধ চালাতে পারবে?

দু দণ্ড রসালাপ সব ভাষাতেই করা যায়। ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’, ‘জ্য ত্যেম্’, ‘ইস লিবে ডিস’- আহা এসব কথা দেখতে না দেখতেই শিখে ফেলা যায়। মদন যেস্থলে গুরু, সখা কন্দর্পও হয়তো মজুত, কালটি মধুমাস, উর্বশী দু-চক্কর নাচভি দেখিয়ে দিচ্ছেন, তার মধ্যিখানে সবাই এক লহমায় হরিনাথ দে হয়ে যান। কিংবা বলতে পারেন, সেখানে ভাষার দরকারই-বা কী- কোন প্রয়োজন মধুর ভাষণের?

কিন্তু পার্লিমেন্টে তো মানুষ রসালাপ করতে যায় না। সেখানে লাগে স্বার্থে স্বার্থে সংঘাত, চিন্তাধারা-চিন্তাধারায় টক্কর লেগে ‘উঠে ঢেউ গিরিচূড়া জিনি’, বাজেটকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতে হয় যেখানে- সেখানে ‘করেঙ্গা, খায়েঙ্গা’ হিন্দি দিয়ে কাজ চলে না। আমাদের বাঙাল দেশে বলে ‘ছাগল দিয়ে হাল চালাবার চেষ্টা কর না।’

বিচক্ষণ পাঠক, তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, ঘড়েল প্যাসেঞ্জার কক্খনও, অর্থাৎ ‘কাইট্যা ফালাইলে’ও বেহারি মুটের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্ক করার সময় হিন্দি বলে না। কারণ সে একখানা বলতে না বলতে মুটে ঝেড়ে দেবে পাঁচখানা পুরো পাঁচালী এবং লক্ষ করছে, মুটেও ততোধিক ঘড়েল- দিব্য বাঙলা জানে, কিন্তু মেশিনগান চালাচ্ছে তার বিহারি হিন্দি ‘করত, খাওত’, আর ‘ভজলু কি বহিনিয়া ভগলু কি বেটিয়া’র ভাষা দিয়ে।

অর্থাৎ দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শেখা ভাষা দিয়ে কোনও মরণ-বাঁচনের ব্যাপারে তর্কাতর্কি করা যায় না। সে ভাষা দিয়ে  বই পড়ে জ্ঞান আহরণ করা যায়- ব্যস্।

আরেকটা উদাহরণ দিই। ইংলন্ড যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি পৌন্ড খরচা করেছে ইংরেজ ছোকরাদের ফরাসি শেখাবার জন্যÑ দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে। অথচ দশ হাজার ইংরেজ যদি প্যারিস বেড়াতে আসে তবে দশটা ইংরেজও ফরাসি বলতে পারে না।

সে এক হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। বাপ, মা ম্যাট্রিক-পাস ব্যাটা নাবলেন ক্যালে বন্দরে। ইস্টিমারে ইংরেজি চলে, কোনও অসুবিধা হয়নি। ক্যালেতেও হবে না, বাপ-মায়ের দৃঢ় বিশ^াস, কারণ ছেলে ম্যাট্রিকে ফরাসিতে গোল্ড মেডেল পেয়েছে। বাপ প্রতাপ রায়ের মতো ছেলে বরজলালকে হেসে বললেন, ‘জিগ্যেস কর তো বাবাজি, পোর্টারটাকে- প্যারিসের ট্রেন কটায় ছাড়বে?’

 ছেলে প্রমাদ গুনছে। বরজলালেরই মতো আপন ফরাসি ভাষায় গুরুকে স্মরণ করে ক্ষীণ কণ্ঠে যখন পোর্টারকে বিদঘুটে উচ্চারণে জিগ্যেস করল, ‘আকেল আর পার লা অ্যাঁ পুর পারি?’ তখন পোর্টার মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে হাঁ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে, তার পর মিনিট তিনেক ঘাড় চুলকে চুলকে ভেবে নিল। হঠাৎ মুখে হাসি ফুটল। চিৎকার করে আরেকটা পোর্টারকে ডাক দিয়ে বলল, ‘এ, জ্যাঁ ভিয়ানিসি, ওয়ালা আঁ মসিয়ো কী পার্ল লাংলে।’ ‘এ জন, এদিকে আয়, এক ভদ্রলোক ইংরেজি বলছেন। বুঝতে নারনু।’

হায়, কিন্তু বেচারা ফাঁকি দিয়ে গোল্ড মেডেল মারেনি। ফরাসি ব্যাকরণ তার কণ্ঠস্থ, পাস্ট কন্ডিশনাল, ফ্যুচার সবজনকটিভ তার নাখাগ্রদর্পর্ণে- কিন্তু ফরাসি জাতটাই নচ্ছার, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বিদেশির মুখে ভুল উচ্চারণে আপনার ভাষার শব্দরূপ ধাতুরূপ শুনতে কিছুতেই রাজি হয় না!

কিন্তু পাঠক নিরাশ হবেন না। পার্লিমেন্টে বক্তৃতার ভাষা-সমস্যা সমাধান করা যায়। পরে নিবেদন করব।

ভারতের ভবিষ্যৎ বৈদগ্ধ্য সংস্কৃতি কী রূপ নেবে, সে সম্বন্ধে আলোচনা আরম্ভ হলেই দেখতে পাই অনেকেই মনে মনে আশা পোষণ করছেন, সে বৈদগ্ধ্য যেন ঐক্যসূত্রে তাবৎ প্রদেশগুলোকে সম্মিলিত করে নব নব বিকাশের দিকে ধাবিত হয়।  এ অতি উত্তম প্রস্তাব এবং এতে কারও কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। যখন ভাবি, এই ভারতবর্ষেই একদা একই সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে কাবুল থেকে কামরূপ, হরিদ্বার থেকে কন্যাকুমারী সর্ব কলাপ্রচেষ্টা সর্ব জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে, তখনই ঐক্যাভিলাষী হৃদয় উল্লসিত হয়ে ওঠে, আর তার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায়।

সংস্কৃতকে ব্যাপকভাবে পুনরায় সেরকম ধারায় চালু করার আশা আর কেউ করেন না। এখন প্রশ্ন, হিন্দির মাধ্যমে সেটা সম্ভবপর কি না?

এই মনে করুন ‘রামের সুমতি’ কিংবা ‘বিন্দুর ছেলে’। ধরে নিন অতি উত্তম অনুবাদক বই দু-খানা হিন্দিতে অনুবাদ করলেন। আপনি উত্তম না হোক মধ্যম ধরনের হিন্দি জানেন, অর্থাৎ হিন্দি পুস্তকমাত্রই দিব্য গড়গড় করে পড়ে যেতে পারেন। এখন প্রশ্ন, আপনি কি সে সুখটা পাবেন যে সুখ ওই দু-খানা বাঙলা বই বাঙলাতে পড়ে পান? (‘গোরা’র ইংরেজি তর্জমা পড়েছেন? তাতে তো কোনও সুখই পাওয়া যায় না- কারণ ইংরেজি অতি-দূরের ভাষা) কেন পান না? তার প্রধান কারণ বিন্দু কী ভাষায়, কী ভঙ্গিতে কথা বলে, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনে আপনার পরিচয় আছে; যখন দেখবেন তার সঙ্গে কিছুই মিলছে না, সবই কৃত্রিম বোধ হচ্ছে, তখন আপনার কাব্যরসাস্বাদনের সব বাসনা চিরতরে না হোক, তখনকার মতো লোপ পাবে। সংস্কৃতে যাঁরা নাটক লিখে গিয়েছেন, তাঁরা এ তত্ত্বটি বিলক্ষণ জানতেন, তাই অন্তত মেয়েদের দিয়ে সংস্কৃত বলাননি, বলিয়েছেন প্রাকৃত। নৃপ ব্রাহ্মণ সংস্কৃত বলেছেন, কারণ তাঁরা সংস্কৃত বলতে পারতেন, কিন্তু গোরা, বিনয়, অমিট রে কেউই দৈনন্দিন জীবনে হিন্দি বলেন না, কখনও বলবেন বলে মনে হয় না। কাজেই হিন্দি দিয়ে এদের চরিত্র বিকাশ করে বাঙালিকে সুখ দেওয়া যাবে না। যাঁদের মাতৃভাষা বাঙলা নয়, তাঁদের কথা আলাদা- তাঁরা অবশ্য অনেকখানি রস পাবেনÑ যদিও স্বামী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছেন, অনুবাদ সাহিত্যমাত্রই কাশ্মীরি শালের উল্টে দিকের মতো, মূল নকশাটি বোঝা যায় মাত্র, আর সব রসের কোনও সন্ধান পাওয়া যায় না।

উপরিস্থ তত্ত্বকথাটি সকলের কাছে এতই সুপরিচিত যে, আমার পুনরাবৃত্তিতে আনেকেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠবেন, কিন্তু এইটির ওপর নির্ভর করে আমি যে বক্তব্য পেশ করব, সেটা যদি সকলে গ্রহণ করেন কিংবা অন্ততপক্ষে সেটি বিবেচনাধীন করেন, তবে আমি শ্রম সফল বলে মানব।

শুধু ভাষা এবং সাহিত্য নয়, অন্যান্য প্রচেষ্টাও স্বভাবতই প্রাদেশিক রঙ নেয়। অজন্তা ও মোগল-শৈলীর নবজীবন লাভ হয় বাঙলা দেশে, তাই সে সম্বন্ধে যত আলোচনা-গবেষণা হয়েছে তার অধিকাংশই বাঙলাতে। অর্থাৎ প্রাদেশিক ভাষাকে একবার সার্বভৌম অধিকার দিলে যে বৈদগ্ধ্য গড়ে ওঠে, সেটা প্রাদেশিক।

এইখানে লেগে গেল দ্বন্দ্ব। আমার এ প্রবন্ধ প্রারম্ভ করেছি প্রতিজ্ঞা নিয়ে, ভারতীয় বৈদগ্ধ্য যেন ঐক্যসূত্রে তাবৎ প্রদেশগুলোকে সম্মিলিত করে নব নব বিকাশের দিকে ধাবিত হয়। তা হলে মুক্তি কোন পন্থায়- প্রাদেশিক ভাষাকে সংস্কৃতি জগতের চক্রবর্তীরূপে স্বীকার করে প্রাদেশিক সংস্কৃতি গড়ব, না বাঙলা বর্জন করে হিন্দির মাধ্যমে ভারতীয় ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতির সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করব?

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ প্রাদেশিক ভাষাকে বর্জন করে নয়, তার সম্যক উন্নতি সাধন করে, এবং আমার আরও বিশ্বাস, প্রাদেশিক সংস্কৃতি নির্মাণ করলে বৃহত্তর ভারতীয়  ঐক্য ক্ষুণ্ন হবে না।

কারণ ভারতীয় ঐক্য (ইউনিটি) ও ভারতীয় সমতা (ইউনির্ফমিটি) এক বস্তু নয়। আজ যদি পাঞ্জাব থেকে আসাম অবধি সবাই ভাত খেতে আরম্ভ করে, তবে বিদেশ থেকে শস্য কেনার সময় আমাদের বহুৎ বখেড়া আসান হয়ে যাবে, আজ যদি তাবৎ ভারতীয়ের উচ্চতা ৫ফুট ৭ ইঞ্চি হয়ে যায়, তবে সৈন্যদের ইউনিফর্ম বানাবার কত না সুবিধা! তবু কেউ বলবেন না, সবইকে জোর করে ভাত খাওয়াও, কিংবা ঢ্যাঙাদের শরীর থেকে দু ইঞ্চি কেটে ফেল। এ ইউনিটি নয়, ইউনির্ফমিটি।

যাঁরা মেরে-পিটে ভারতীয় সমতা চাইছেন, তাঁরা যে জেনে-শুনে ভুল করেছেন তা না-ও হতে পারে। আমার বিশ^াস, তাঁরা ইউনিটি চাইছেন সত্য, কিন্তু ইউনিটি এবং ইউনির্ফমিটিতে গোল পাকিয়ে ফেলেছেন। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, প্রত্যেক ভারতীয় প্রদেশ যদি আপন প্রাদেশিক সংস্কৃতি সভ্যতা আপন শক্তি ও প্রতিভা দিয়ে গড়ে তোলে, তবে সেই সম্মিলিত সংস্কৃতিই হবে সত্যকার ভারতীয় সংস্কৃতি।

গুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে নিবেদন করি, তিনি বলেছিলেন, একতারা বাজানো সহজ, বীণা বাজানো কঠিন; কিন্তু সেটা বাজাতে পারলে তার থেকে যে harmony বা বহুধ্বনি আপন আপন বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ঐক্যের যে সঙ্গীত নির্মাণ করে তোলে, তার সঙ্গে একতারার ইউনির্ফমিটির কোনও তুলনা হয় না।

বহু প্রদেশের নানাবিধ সঙ্গীত জেগে উঠে যে harmony-র সৃষ্টি হবে, সে-ই সত্যকার ভারতীয় ঐক্য-সঙ্গীত। তবেই ‘জনগণ ঐক্যবিধায়ক’ বলা সফল হবে।

হিন্দির প্রসার এবং প্রচার অতীব প্রয়োজনীয়, সেকথা আমরা সকলেই স্বীকার করি- কিন্তু সে প্রসার যেন প্রাদেশিক এবং আঞ্চলিক ভাষা এবং সাহিত্যকে গলা টিপে না মেরে ফেলে। হুশিয়ার হয়ে সে প্রসারকর্মে  সমাধান করলে কারওরই কোনও আপত্তি থাকবে না। কী প্রকারে সেটা করা যেতে পারে, সে নিবেদন করার পূর্বে হিন্দির বিরুদ্ধে যে কয়টি আপত্তি বাঙলা দেশের কাগজে ইদানীং উঠেছে, তারই দু-একটি নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়োজন।

হিন্দির বিরুদ্ধে প্রধান এবং প্রথম আপত্তি হিন্দির লিঙ্গ বিভাগটা বড্ডই বদখদ। বাঙালি ভাবে, ‘ছেলেটা যাচ্ছে’, ‘মেয়েটা যাচ্ছে’, বললে যখন দিব্য অর্থ বুঝতে পারি তখন ‘লড়কা জাতা হৈ’, ‘লাড়কি জাতি হৈ’ বলে মানুষকে বিরক্ত করা ছাড়া অন্য কোন লাভ হয় না। এস্থলে বক্তব্য, ‘অর্থ বুঝতে পারার’ মান নিয়েই ভাষা সৃষ্টি হয় না। তাই যদি হত তবে বাঙলায় বলি না কেন, ‘আমি গেলুম’ ‘তুমি গেলুম’, ‘সে গেলুম’। ইংরেজি তো খাসা এক ‘ওয়েন্ট’ দিয়েই বলে যায়’ ‘আই ওয়েন্ট’, ‘ইউ ওয়েন্ট’, ‘হি ওয়েন্ট’- অর্থ জলের মতো পরিষ্কার বুঝতে কোনও অসুবিধে হয় না।

অর্থাৎ প্রত্যেক ভাষারই আপন আপন বৈশিষ্ট্য থাকে এবং তা নিয়ে গোসা করলে চলে না। এখন প্রশ্ন, হিন্দি যে লিঙ্গভেদ করে সেটা কি নিছক তারই ‘পাগলামি’ না অন্যান্য ভাষাও করে? বাঙলা এককালে কিছুটা করত, সেকথা সকলেই জানেন, এবং এখনও কিছুটা করে। ‘সুন্দর রমণী’ বলতে এখনও বাধো বাধো ঠেকে, এবং কোনও রমণীকে যদি বলি, ‘ওগো সুন্দর, গঙ্গাস্নানে চললে নাকি’- তবে এখনও সেটা ভুল, ‘সুন্দরী’ বলতে হয়।

সংস্কৃতে যে লিঙ্গভেদ আছে এবং সে লিঙ্গভেদ যে সরল নয়, সেকথাও সকলেই জানেন। প্রাণহীন বস্তুমাত্রই যে ক্লীব হয় তা-ও তো নয়। বহু নদনদী এ জীবনে দেখেছি কিন্তু কোনটারই নাম পুংলিঙ্গ আর কোনটারই-বা স্ত্রীলিঙ্গ- ক্লীবের তো কথাই উঠে না- সে তত্ত্বটি জলধারা দেখে ঠাহর করতে পারিনি। দিক্সুন্দরীর (ডিক্শনারির) শরণাপন্ন হলে পর তিনি দিশেহারাকে দিক বাতলে দেন।

উত্তরে হয়তো বলবেন, সংস্কৃতের উদাহরণ এখন আর চলবে না। চালু ভাষা থেকে নজির পেশ কর।

এই মুশকিলে পড়ে গেলেন। ফরাসি, জর্মন, রুশ, ইতালি, ওলন্দাজ, আরবি, গুজরাতি, মারাঠি, এ সব ভাষাতেই লিঙ্গভেদ আছেÑ এবং আরও বহু ভাষায় আছে বলে শুনেছি-, সত্য বলতে কি, লিঙ্গভেদ নেই এরকম ভাষাই বিরল। আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞান বলে, বড় ভাষার ভিতরে তিনটিমাত্র ভাষাতে লিঙ্গবিচার নেইÑ ইংরেজি, ফারসি এবং বাঙলা। এ তিনটি ভাষা যতখানি ছাত্রত্রাস ব্যাকরণ বর্জন করতে পেরেছে অন্য ভাষাগুলো সেরকম পারেনি।

জর্মনের লিঙ্গ সবচেয়ে বেতালা বেহিসাব। ‘ছুরি’ ‘কাঁটা’ এবং ‘চামচ’ তিনটি শব্দ আমাদের কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী ক্লীব হওয়া উচিত অথচ জর্মন ভাষাতে ‘ছুরি’ ক্লীব, ‘কাঁটা’ স্ত্রীলিঙ্গ এবং ‘চামচ’ পুলিঙ্গ। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘সূর্য’ স্ত্রীলিঙ্গ, শুভ্র জ্যোৎস্না-পুলকিত যামিনীর ‘চন্দ্রমা’ পুংলিঙ্গ এবং ‘নারী’ (‘ডাস ভাইব’, ‘ভাইব’- ‘ওয়াইফ’) ক্লীব লিঙ্গ! শুধু তাই নয়, সূর্যের চেয়েও দোর্দাণ্ডপ্রতাপ জর্মন পুলিশ বাহিনী (‘ডি পোলিৎসাই’) স্ত্রীলিঙ্গ!

পুনরপি পশ্য, পশ্য, ফরাসি এবং হিন্দিতে ‘দাড়ি’ স্ত্রীলিঙ্গ।

তবে কি দাড়ির জৌলুসের মালিক এককালে রমণীরা ছিলেন, পুরুষেরা পরবর্তী যুগে জোর করে কেড়ে নিয়েছেন? কিন্তু ভুলবেন না, গোঁফ হামেশাই দাড়ির উপরে!

তবে বলুন তো, ভদ্র হিন্দিকে দোষ দিয়ে লাভ কী? বরঞ্চ হিন্দি জর্মনের তুলনায় ভদ্রতর। জর্মনে তিনটি লিঙ্গ; ‘লাগলে তাগ, না নাগলে তুক্কা’ করে যদি লিঙ্গবিচার করেন তবে শুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র শতকরা ৩৩.৩ ভাগ; হিন্দিতে ৫০ ভাগ, কারণ হিন্দিতে মাত্র দুটি লিঙ্গ।

যাঁরা হিন্দি জানেন তাঁরা হিন্দির বিরুদ্ধে আর একটি আপিত্তি উত্থাপন করেছেন। হিন্দিতে বলি ‘মৈঁ রোটি খাতা হুঁ’- ‘আমি রুটি খাই’, কিন্তু অতীতকাল নিয়ে বলতে হয় ‘মৈঁ নে রোটি খাই’- আমি রুটি খেয়েছি’। অর্থাৎ অতীতকালে ‘আমি’ আর কর্তা থাকলুম না, কর্তা হয়ে গেলেন ‘রুটি’ এবং সেই অনুযায়ী ক্রিয়াপদ স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে গেল, কারণ ‘রোটি’ হিন্দিতে স্ত্রীলিঙ্গ (‘পানি,’ ‘ঘি’, ‘দহি’, ‘মোতি’র মতো মাত্র কয়েকটি ই-কারান্ত শব্দ স্ত্রীলিঙ্গ; তাই পুংভূষণ ‘দাড়ি’ বেচারি স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে গিয়েছে)। তার মনে ‘আমা-দ্বারা রুটি খাওয়া হল’ বললে অনেকটা হিন্দির ওজনে বলা হল। কিংবা ‘পাগলে কি না বলে!’ সংস্কৃতে এরকম জিনিস আছে এ কথা সকলেই জানেন।

কিন্তু এসব সমস্যা অপেক্ষাকৃত সরল। একবার কোন শব্দ কোন লিঙ্গ জানা হয়ে গেলে বাদবাকি জট তিন লহমায় ছাড়িয়ে নেওয়া যায়।

লিঙ্গ নিয়ে আপিত্তি উত্থাপন করে কোনও লাভ নেই। আমরা যদি হিন্দিভাষীকে বলি লিঙ্গ তুলে ‘লড়কা জাতা’ ‘লড়কি জাতা’ বলা আরম্ভ করে দাও, তবে ইংরেজ বাঙালিকে বলবে, ‘আমি গেলুম, ‘তুমি গেলুম’, ‘সে গেলুম’, বলতে আরম্ভ কর। তাই ইংরেজ ফরাসি লেখার সময় ফরাসির লিঙ্গবিচার নিয়ে আপত্তি তোলে না। চাঁদপানা মুখ করে, মুখস্থ করে ‘শব্দের অন্তে বি, সি, ডি, জি এল, পি, কিউ, জেড থাকলে শব্দ পুংলিঙ্গ হয়’ অবশ্য বিস্তর ব্যত্যয় আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফরাসিতে হিন্দির মতো মাত্র দুটি লিঙ্গÑ কিন্তু আমার মনে হয়, ফরাসিতে লিঙ্গবিচার হিন্দির চেয়ে শক্ত।

এটা অবশ্য অসম্ভব নয় যে, হিন্দি বহু বহু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাদেশিক অজ্ঞতাবশত লিঙ্গে ভুল হতে আরম্ভ হবে এবং তারই ফলে হয়তো একদিন হিন্দি থেকে লিঙ্গ লোপ পেয়ে যাবে। তবে তার ফললাভ আমরা করতে পারব না সেকথা সুনিশ্চিত।

হিন্দি-বিরোধী সম্প্রদায় বলেন, হিন্দিতে এমন কি  সাহিত্য আছে, বাপু মাথার ঘাম পয়ে ফেলে হিন্দি শিখতে যাব? উত্তরে হিন্দির দল বলেন, তাবৎ ভারত যদি হিন্দি গ্রহণ করে সে ভাষাতে সাহিত্যসৃষ্টি আরম্ভ করে তবে দেখতে না দেখতেই হিন্দি ইংরেজি-ফরাসির সঙ্গে পাল্লা দিতে আরম্ভ করবে।

এ উত্তরটা ইতিহাসের ধোপে টেকে না। সকলেই জানেন, এককালে লাতিন সর্বইউরোপের ‘রাষ্ট্রভাষা’ ছিল কিন্তু তৎসত্ত্বেও লাতিন ভাষা গ্রিক কিংবা সংস্কৃতের মতো উচ্চাঙ্গ সাহিত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। তার পর ফরাসি ভাষা লাতিনের আসনটি কেড়ে নিল। কিন্তু ফরাসি সাহিত্য যে বিত্তবান হল সেটা ইংরেজ, জর্মন, ইতালীয়দের ফরাসী সাহিত্য-চর্চা করার ফলে নয়- ফরাসির ব্যাপক সাহিত্য গড়ে উঠেছে ফরাসি যাঁদের মাতৃভাষা একমাত্র তাঁদেরই প্রচেষ্টার ফলে। ঠিক সেই কারণেই প্রশ্ন, কটা বিদেশি ইংরেজিতে লিখে নাম করতে পেরেছে কিংবা কজন ইংরেজ ফরাসি-জর্মনে লিখে সার্থক সাহিত্য সৃষ্টি করতে পেরেছে? ইংরেজিতে ফিরে যাই; ফরাসির পর এই যে ইংরেজি ভুবনজুড়ে রাজত্ব করল সে ভাষাতেই-বা কটি বিদেশি নাম করতে পেরেছেন? এমনকি, কজন অস্ট্রেলিয়া কিংবা কানাডাবাসী ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চাঙ্গের রচনা  লিখতে সক্ষম হয়েছে? এ জিনিসটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তবে কি ভাষাকে টবে পুঁতে বিদেশে পাঠলে সেখানে সে বেঁচে থাকতে সক্ষম হলেও ফল দিতে পারে না? আমেরিকার মতো বিরাট দেশে তা আরও বেশি লেখকের জন্ম নেবার কথা ছিল- একদম পয়লা নম্বরের লেখক সে মহাদেশে জন্মেছেন কজন? অস্ট্রেলিয়া,কানাডা, আমেরিকাবাসীর মাতৃভাষা ইংরেজি- তারাই যদি এ বাবদে কাহিল তবে যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তাঁরাই-বা কোন গন্ধমাদন উত্তোলন করতে পারবেন?

অথচ দেখুন, লাতিন-ফরাসির একচ্ছত্রাধিপত্য যেমন যেমন লোপ পেল সঙ্গে সঙ্গে জর্মন, ইংরেজি, ইতালি, রুশ, সুইডিশ, ওলন্দাজ সাহিত্য কী অল্প সময়ে কত না কত অদ্ভুত উন্নতি সাধন করতে পেরেছে। তাই আজ আধমরা লাতিনের জায়গায় জেগে উঠেছে বহুতর ভাষা গরুড়ের ক্ষুধা নিয়ে। তাই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি বহু ভাষার শিখরতোরণ, মিনার-গম্বুজ দিয়ে গড়া ‘ইউরোপীয় সাহিত্য’ নামক এক গগনচুম্বী তাজমহল!

ইংরেজ ফরাসি ভাষায় লেখে না, ফরাসি জর্মনে লেখে না, রুশ দিনেমার ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করতে যায় না, তথাপি এদের ভিতর আন্তরিক সহযোগিতার অন্ত নেই। আজ ফরাসি দেশে যে গঁকুর পুরস্কার পায় কালই তার বই ইংরেজিতে তর্জমা হয়ে যায়- অধিকাংশ স্থলে প্রাইজ পাওয়ার বহু পূর্বেই তর্জমা হয়ে গিয়েছে। আর নোবল পেলে তো কথাই নেই- হুস হুস করে ডজনখানেক ভাষায় খান বিয়াল্লিশ তর্জমা বাজার গরম করে তোলে।

ইংরেজ গেছে, আপদ গেছে। এখন আমি স্বপ্ন দেখি- সুশীল পাঠক তুমিও যোগ দাও- ভারতবর্ষের নানা ভাষায় যেন উত্তম উত্তম সাহিত্য সৃষ্টি হয় এবং এক সাহিত্যের ভালো লেখা যেন অন্য সব সাহিত্যে অনুবাদ করা হয়। ইংরেজির মতলব ছিল প্রদেশে প্রদেশে যেন ভাবের আদান-প্রদান না হয়। তাৎসত্ত্বেও আমরা ইংরেজির মাধ্যমে একে অন্যকে কিছুটা চিনতে পেরেছি কিন্তু বহুস্থানেই অনেকখানি ভুল চেনাশোনা হয়েছে। এবার সৎসাহিত্যের ভিতর দিয়ে আসল সদালাপ আরম্ভ হবে- আমরা এই স্বপ্ন দেখি।

বাঙলা বই হিন্দিতে অনুবাদ হবে, তার পর হিন্দি থেকে তামিলে- এ ব্যবস্থ্য আমার মনঃপূত হয় না। জ্যামিতি নাকি সপ্রমাণ করতে পারে, ত্রিভুজের যে কোনও এক বাহু যে কোনও দুই বাহুর চেয়ে হ্রস্বতর।

 সোজাসুজি পরিচয় সবচেয়ে ভালো পরিচয়। একটি সামান্য উদাহরণ দিই। একখানি পুস্তকের প্রতি আমার ভক্তিশ্রদ্ধার অন্ত নেই- এ সম্বন্ধে পূর্বেও ইঙ্গিত করেছি- বইখানি স্বগীয় লোকমান্য বালগঙ্গাধর টিলকের ‘গীতারহস্য’।

লোকমান্য গীতার এই নবীন ভাষ্য মারাঠিতে লিখেছিলেন এবং তার এক অতি জঘন্য ইংরেজি অনুবাদ আছে-

একদম অখাদ্য অপাঠ্য। কিন্তু বৃদ্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যৌবনে-শেখা, মরচে- ধরা, জাম-পড়া তাঁর মারাঠিজ্ঞানকে ঝালিয়ে নিয়ে বাঙলায় যে অনুবাদখানি করেছেন তার প্রশংসা করতে গিয়ে আমার অক্ষম লেখনী বার বার তার দুর্বলতা নিয়ে লজ্জিত হয়। এ তো অনুবাদ নয়, এ যেন বাঙালি টিলক বাঙলায় লিখেছেন। মারাঠির সঙ্গে মিলেয়ে এ অধম সে পুস্তক বহুবার অধ্যায়ন করেছে, প্রতিবার মনে মনে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে, বন্ধুবান্ধবকে সে কেতাব-ই-কুৎব্-মিনার পড়তে অনুরোধ করেছে, এবং ‘সত্যপীর’ ছদ্মনামে সে গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণের জন্য ‘আনন্দবাজারে’ বিস্তর কান্নাকাটি করেছে।

এই বই পড়লে ‘গীতা’ নতুন করে চেনা যায় সেকথা অতি সত্য; কিন্তু উপস্থিত আমার নিবেদন, এ গ্রন্থ পড়লে মহারাষ্ট্র দেশকেও চেনা যায়। সংস্কৃত আজ সর্বত্রই মুমূর্ষু, কিন্তু কতখানি সংস্কৃত-চর্চা থাকলে পর এরকম গ্রন্থ বেরুতে পারে সেটা এ বই পড়লে মহারাষ্ট্রের সেই ক্ষুদ্র পল্লি চোখের সামনে ভেসে ওঠে যেখানে বালক বালগঙ্গাধর সংস্কৃত-চর্চার মাঝখানে মানুষ হলেন। আমার গর্ব, আমি সে গ্রামে গিয়েছি, সে তীর্থ দেখেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares