শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী : ও জোনাকী, কি সুখে/ ওই ডানা দুটি মেলেছ : মালেকা বেগম

শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী

জোনাকী, কি সুখে

ওই ডানা দুটি মেলেছ

মালেকা বেগম

যেদিন জানলাম রিজিয়া রহমানের ডাকনাম ‘জোনাকি’; সেদিন হাতে ছিল তাঁর আত্মজীবনীর খণ্ডকাহিনি নদী নিরবধি (২০১১)। আজ ২০১৯ সালে আবারও বইটি হাতে নিয়ে পড়েই চলেছি বারবার। রবীন্দ্রগীতির একটি সিডি বাজিয়ে বইটি পড়ছি। কানে শুনছি গানটি :

‘ও জোনাকী, কি সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ

আঁধার সাঁঝে বনের মাঝে উল্লাসে প্রাণ ঢেলেছ।।

তুমি নও তো সূর্য নও তো চন্দ্র

তোমার তাই বলে কি কম আনন্দ

তুমি আপন জীবন পূর্ণ করে আপন আলো জ্বেলেছ।।

তোমার যা আছে তা তোমার আছে

তুমি নও গো ঋণী কারো কাছে

তোমার অন্তরে যে শক্তি আছে

তারি আদেশ পেয়েছ।।

তুমি আঁধার- বাঁধন ছড়িয়ে ওঠ

তুমি ছোট হয়ে নও গো ছোট

জগতে যেথায় যত আলো সবই

আপন করে ফেলেছ।।

ও জোনাকী কি সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ।।’

রিজিয়া আপা ইহজগৎ ছেড়ে গিয়েছেন গত ১৬ আগস্ট, ২০১৯। তাঁর স্মরণে লিখছি আজ ৩১ আগস্ট। নদী নিরবধি তাঁর দার্শনিক চিত্তকে পুরোপুরি মেলে ধরেছে। তাঁর শেষযাত্রার সময়েও তিনি কি ভাবছিলেন ‘জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথটিতে মানুষ এক অভিযাত্রী ছাড়া আর কিছুই বোধহয় নয়, জীবন হচ্ছে আসলে বারবার অভিবাসন গড়ে তোলা।’

রিজিয়া রহমানকে আপা ডেকেছি সেই শৈশব থেকে। ফরিদপুর শহরের সুন্দর এক পাড়ায় বিস্তৃত এক গাছগাছালি ভরা মাঠের এক পাশে ছিল আমাদের বাড়ি। অন্যদিকে ছিল রিজিয়া আপাদের বাড়ি। তাঁর সাথে আমার বয়সের দূরত্ব পাঁচ বছরের। তিনি তখন ১১ বছরের কিশোরী, আমি ছিলাম ৬ বছরের বালিকা। তাঁরা কলকাতা থেকে বাবার চাকরি সূত্রে দেশভাগের পরপর পূর্ববাংলার ফরিদপুরে বসতি গড়েছিলেন। আমরা তখন ১১ ভাইবোনের কলকাকলিতে নানা খেলাধুলায় (পরে ঢাকায় আরেকটি ভাই হয়েছিল) বাড়ি-মাঠ সরগরম রাখতাম। রিজিয়া আপাদেরও ১১ ভাইবোন। আমাদের পারিবারিকমণ্ডলে একে অপরের  সহপাঠী-বন্ধু হয়েছিলাম।

রিজিয়া আপাকে শেষ যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম উত্তরায় তাঁর বাসায়, সেদিন ছিল ২০ জুলাই। তিনি তাঁর Letter of Blood (রক্তের অক্ষর বইয়ের অনুবাদ) বইটিতে ইংরেজি স্বাক্ষরে ইংরেজিতে লিখে দিয়েছিলেন ‘To my dear Maleka with  best wishes and love. Rizia Rahman, 20.7.1919.   সেদিন আমাদের ১১-১২ ভাইবোনের নানা স্মৃতিমধুর গল্পে মুখরিত ছিলাম আমরা। তিনি তাঁর জীবনে মায়ের প্রভাবের কথা বলেছেন, আমি বলেছি আমার মায়ের কথা। বলেছি বাবার কথা পরস্পরের স্মৃতির ঝুড়ি খুলে।

মায়ের কথা যেমন লিখেছেন, তেমনি বলেছেন গর্বের সাথে। পদ্মাপাড়ের অভিজাত রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে মরিয়ম বেগম ফরিদপুর গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলে  পড়েছেনÑ সেই স্কুলেই পড়েছেন মেয়ে রিজিয়া আপা। মায়ের বইয়ের আলমারি মেয়ের পড়ার তৃষ্ণা মিটিয়েছিল কৈশোরে। গানের ভক্ত মায়ের সূত্রেই শুনতেন সায়গল, জগন্ময় মিত্র ও কাননবালার গান।

কত কথাই না হলো সেদিন। বাবা ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ সিদ্দিকের মৃত্যুতে (১৯৫২) মাত্র ১৩ বছর বয়সে অনেকটাই অসহায় হলেন তিনি। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে না দিতেই বিয়ে হয়ে যায় স্বপ্রতিষ্ঠিত রহমান সাহেবের সঙ্গে। কলেজে পড়েছেন। দেশে ফিরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েছেন ‘অর্থনীতি’তে। লিখেছেন দু’হাত ভরে। পড়েছেন প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্তে নানা বই। শিখেছেন সমাজের নানা পরিক্রমায়, নানা ঘটনায়। ইতিহাসের কাছে ফিরেছেন বারবার।

শেষ দেখার দিনে বলেছেন তাঁর প্রিয় বন্ধু সুসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। পরস্পর তাঁরা আলোচনায় বন্ধুত্বে পরিপূর্ণ  ছিলেন।

আমাদের প্রিয় এই লেখক ‘নারীবাদী’ পরিচয়ে সিক্ত হতে চাননি। বলেছেন মানুষ তিনি। মানবজীবনের, সমাজের কথাই জানিয়েছেন আমাদের।

রিজিয়া রহমানের বইয়ের সংখ্যা ৪০টি। সম্ভাবত আরও বেশি। উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, আত্মজীবনী, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ- সকল ক্ষেত্রেই তিনি ইতিহাসসমৃদ্ধ চেতনার বিস্তার ঘটিয়েছেন।

তাঁকে কাছ থেকে খুব বেশি সময় নিয়ে জানতে পারিনিÑ দুঃখ সেটাই। তিনি থাকবেন আমাদের হৃদয়জুড়ে, পাঠকের চিন্তাজুড়ে। শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ধাবিত হোক নিয়তই তাঁর দিকে।

মালেকা বেগম : লেখক, শিক্ষাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares