শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী : রিজিয়া রহমানের পটভূমি : ইমতিয়ার শামীম

শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী

রিজিয়া রহমানের পটভূমি

ইমতিয়ার শামীম

রিজিয়া রহমান আত্মপরিচয় খুঁজেছেন, পরিচয় খুঁজেছেন রাষ্ট্র ও সমাজের। কারণ জীবনের শুরুতেই তিনি নিজের স্বরূপ নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়েছেন; দ্বিধার পাহাড় ভেঙে তাঁকে উঠতে হয়েছে আত্মসত্তার চূড়াতে, দ্বিধার মৃত্তিকা চষে তাঁকে পৌঁছতে হয়েছে হৃদয়ের গহিন মূলে, সাঁতরাতে হয়েছে দ্বিধার নদী, সাঁতরে সাঁতরে তিনি উঠেছেন নিজের আবাসভূমে। আর এই পথ পরিক্রমাই ফুটে উঠেছে তার লেখালেখিতে। এই পরিভ্রমণই ধরে রেখেছে তাঁর লেখালেখি। তাতে তিনি কখনও আবির্ভূত হয়েছেন রাষ্ট্র-সমাজ-জাতিসত্ত্বা হয়ে, কখনও এসেছেন ব্যক্তি হয়ে, কখনও নারী হয়ে, কখনও-বা অভিবাসী কিংবা নিপীড়িত শ্রেণি হয়ে, কখনও ব্যক্তিরও অধিক মনন হয়ে। খনন-পুনর্খননের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে আবিষ্কার ও পুনরাবিষ্কার করতে চেয়েছেন;  জানতে চেয়েছেন কেন রাষ্ট্র-সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা পল্লবিত হয়, আবার মানুষের আকাক্সিক্ষত সেই রাষ্ট্র-সমাজই কেন দানব হয়ে মানুষের টুঁটি চেপে ধরে। মানুষ কেন ব্যক্তি হয়ে যায়, ব্যক্তি কেন নারী হয়ে যায় কিংবা হয়ে ওঠে নিপীড়ক কিংবা নিপীড়িতের প্রতীক, সে কেন স্থানান্তরে যায়- কোন মোহে, কোন মুক্তির তাড়নায়- এসবই রিজিয়ার অনুধ্যানের বিষয়। যার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতার্থে তিনি স্বরূপ খুঁজেছেন, পরিচয় খুঁজেছেন। তিনি তাঁর এই আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করেছেন সাহিত্যের মধ্য দিয়ে, সাহিত্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে। এভাবে নিজের কথাসাহিত্যের আদলকেও সুস্পষ্ট করেছেন তিনি। আমরা একটু গভীর চোখে তাকালেই ধরতে পারি তার কথাসাহিত্যের মুখাবয়ব, বর্ণ-রেখা- বড় বেশি স্বতন্ত্র যা সমসময়ের সবার থেকে।

এই যে অনুসন্ধানের কৌতূহল, কৌতূহল পেরিয়ে যা শেষাবধি অদম্য লক্ষ্য- তা রিজিয়া রহমানের মধ্যে রোপণ করেছে তাঁর সময়। একদিনে গড়ে ওঠেননি তিনি। গড়ে উঠেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশিকতা থেকে ভারত ভাগ হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সঙ্গত কারণেই ষাটের দশকে আবির্ভূত কথাসাহিত্যিক বলে চিহ্নিত করা হলেও তাঁর মৌলিক উত্থান বোধকরি মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে আর কথাসাহিত্যের বিষয়আশয়কে বিবেচনায় নিলে তিনি একবিংশ শতাব্দীর শূন্য দশক ও প্রথম দশকেরও লেখক বটে। বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকাশের প্রাথমিক পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনিÑ যাকে অনেকে বলেন এক স্বর্ণালি পর্ব; কেননা তখনও এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি শিক্ষিত হয়ে দুধেভাতে জীবনযাপন করাকেই পরম পরিতৃপ্তির বিষয় বলে মনে করত, তখনও শ্রেণিবৃত্ত পেরিয়ে লুটেরা উচ্চবিত্ত হয়ে ওঠার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা আক্রান্ত করেনি মধ্যবিত্তকে, কী ব্যক্তি হিসেবে, কী শ্রেণিগতভাবে। রিজিয়া রহমানকেও দেখি সেই সাংস্কৃতিক আবহে জ্বলজ্বল করতে। বাবা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসের ডাক্তার, বাস করেন কলকাতাতে; আর মা বাংলাদেশের পদ্মাপাড়ের অভিজাত এক রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হলেও মুক্ত মনের মানুষÑ সেই চল্লিশের দশকেই বই পড়া আর গান শোনার নেশায় বিভোর ছিলেন তিনি। কলকাতায় চলাফেরা করতেন ট্রামে-বাসে চড়ে, কেনাকাটা করতেন দোকান থেকে একা-একাই। বাড়িতে ডাকযোগে পত্রিকা আসত। তার পাঠক-পাঠিকা ছিলেন পরিবারের সবাই। বাবা যে রোগী আর হাসপাতাল নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন, তার পরও প্রতিদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু পড়াশুনা করতেন, বেহালা বাজাতেন। বিত্তের আকাক্সক্ষায় নয়- সৃজনশীলতার ঘোরে জ্বলতে শিখেছিলেন তিনি তাই খুব কম বয়সেই।

হয়তো মধ্যবিত্তের এই বিভোরতাই তার শৈশবকে রক্ষা করতে পেরেছিল ভারতবিভক্তির মতো মহাকালের মহাবিপর্যয়ের ধাক্কা থেকে। কেমন ছিল তাঁর সেই শৈশব? সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে নিজেই বলেছেন তিনি, হঠাৎ করে মাত্র আট বছর বয়সেই ১০ লাইনের একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই শুরু, তার পর আর থামেননি। প্রাথমিক স্কুলে থাকার সময়েই তার প্রথম কবিতা বের হয় দৈনিক ‘সত্যযুগ’ পত্রিকার ছোটোদের পাতায়- যেটি তখন সম্পাদনা করতেন গৌরকিশোর ঘোষ। ১৯৩৯ সালে জন্ম হয়েছিলÑ সে হিসেবে তার সেই ১০ লাইনের কবিতা লেখার সময়কাল ১৯৪৭ সাল। দাঙ্গা আর সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ তখন এসে দাঁড়িয়েছে ভাঙনের প্রান্তে, দেশভাগের প্রান্তে। কিন্তু বোঝা যায়, দেশভাগ ওই সময়ে তেমন আলোড়িত করেনি তাঁকে। তাঁর সৌভাগ্য, দেশভাগের নৃশংসতাও স্পর্শ করেনি তাঁকে কিংবা তাঁর পরিবারকে। শৈশব কেটেছে কলকাতায়। অতএব এরকমও নয় যে, বাবার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার গ্রামটি তার মনে থির হয়ে গেঁথে আছে। বদলির চাকরির সূত্রে ১৯৪৭-এর আগেই তাঁর বাবা পূর্ব বাংলার ফরিদপুরে বদলি হয়ে আসেন। ভারত বিভক্তির পর তিনি সরকারি চাকরি হিসেবে ‘অপশনে’ পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নেন। এসব ঘটনাপ্রবাহ বলে দেয়, দেশভাগের ক্রন্দনকে রিজিয়া রহমান প্রাত্যহিকতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেননিÑ করেছেন সচেতন হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তিনি সেই উপলব্ধির পথে এগিয়েছেন, কারণ তাঁর আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হয়েছিল। শুধু তাঁর কেন, ভারতবিভক্তির পর পূর্ব বাংলার সকলের মধ্যেই এই সংকট দেখা দিয়েছে। কেউ সে সংকটের আঁচ অনুভব করেছেন, কেউ আবার এতই অবোধ কিংবা চোখের পর্দা কাটা মানুষ যে আদৌ তা তাদের চোখে পড়েনি। কেউ রক্ষণশীলতার মধ্যে ডুবে গিয়ে এই সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ আবার সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে সেই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন।

রিজিয়া রহমান সেরকমই একজন। আর সে কারণেই তাঁর কথাসাহিত্য যেমন ইতিহাস ও সাম্প্রতিকতার আস্বাদ দেয়, তেমনি তৈরি করে আখ্যানের ঘোর ও উত্তেজনা। এ যেন নান্দনিক জ্ঞানচর্চা, যেখানে কোনো প্রথাগত সূত্র নেই, গতানুগতিক কাঠামো নেই। সাহিত্য তাঁর কাছে কমিটমেন্ট- শক্তিশালী কমিটমেন্ট। ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের মুক্তির নিবিড় তপস্যা। অনুমান করি, একদিকে রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যচর্চার মধ্যে দিয়ে, রুশ ও ফরাসি সাহিত্য পাঠের মধ্যে দিয়ে তারুণ্যেই তাঁর ভিন্ন মেজাজের পাঠকরুচি দাঁড়িয়ে যায়। প্রথম যে উপন্যাস লিখলেন- ঘর ভাঙা ঘর- এমএ শেষ বর্ষে পড়ার সময়; ততদিনে তাঁর প্রথম গল্পের বইও বেরিয়ে গেছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিকতার দাপটই বোধকরি তাঁর লেখাকে স্বতন্ত্র হিসেবে দেখার সুযোগ করে দেয়নি। তখনও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা হাসান আজিজুল হক উপন্যাস লেখার কথা চিন্তা করেননি। মাহমুদুল হক অবশ্যি ‘যেখানে খঞ্জনা পাখি’ লিখেছেন, লিখেছেন ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ও; কিন্তু গ্রন্থাকারে (এমনকি পত্রিকাতেও) তখনও সে দুটো প্রকাশিত হয়নি। অবশ্যি রিজিয়া রহমানের চেয়ে বছর তিনেক বড় শওকত আলীর উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত পিঙ্গল আকাশে’র বিপরীতে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত রিজিয়া রহমানের ঘর ভাঙা ঘর’কে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণই বলতে হবে; বিশেষত বিষয়বস্তুকে বিবেচনায় নিলে। শওকত আলীর পিঙ্গল আকাশে উড়তে দেখি তেমন মধ্যবিত্তকে, যাদের নৈতিকতাবোধ ভেঙে পড়ছে, যারা বিত্তের সন্ধানে বেরিয়েছে, কিন্তু বিত্ত মিলুক বা না মিলুক, স্থূল রুচির ফাঁদে আটকেই মনে করছে, লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। কিন্তু রিজিয়া রহমানের চোখ সরাসরি নিম্নবিত্ত মানুষের দিকে, বস্তিবাসীর দিকে। যারা ঢাকা শহরে এসেছে গ্রাম থেকে সব কিছু হারিয়ে। তিনি যখন এই উপন্যাস লিখছেন, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব খান তখন উন্নয়নের এক দশক উদ্যাপনের ঘোরে আছেন, ঢাকায় নগরায়ণ ঘটছে আর সেই উন্নয়ন ও নগরায়ণ প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বস্তিও গড়ে উঠছে যেখানে সেখানে। ছিন্নমূল মানুষ আসছে গ্রাম থেকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে, আসছে নদীভাঙনের শিকার হয়ে। শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বাচ্ছন্দ্যের জোগান দিচ্ছে তারাই। ঘর ভাঙা ঘর উপন্যাস রিজিয়ার এমনই সব মানুষকে ঘিরে। আর এসব মানুষের শ্রেণিপ্রকরণও খুব স্পষ্ট তাঁর দুই চোখে। একরকমের মানুষ,- যারা গুলশান, বনানী আর ধানমন্ডির মতো এলাকায় রেডিওগ্রামে বিদেশি পপগান শোনে আর মিসিসিপি রাইনের স্বপ্নে ভাসে; আরেক রকমের মানুষ,- যারা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, গোমতীর ছোবলে নীল হয়ে এই শহরে এসে কোনোমতো বস্তিতে ঠাঁই নিলেও প্রতিনিয়ত নদীরই স্বপ্ন দেখে; আবার, আরও এক রকমের মানুষ,- যারা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ঢাকা শহরে এলেও ফিরে যাওয়ার আর স্বপ্ন দেখছে না; মালীবাগ, শাহজাহানপুর আর বাসাবোর নিম্নমধ্যবিত্ত পাড়ায় চাকরিজীবী হিসেবে থাকতে থাকতে হাফিয়ে উঠলে তারা হয়তো বড় জোর নদীর ধারের ক্ষয়িঞ্চু গ্রামে সপ্তাহের ছুটিটা কাটিয়ে আসে; কিন্তু সময় করে সাভার, মাতোয়াইল অথবা শহরতলি এলাকায় কম দামে কাঠাকয়েক জমি কেনার জন্য ঘুর ঘুর করে দালালের কাছে। রিজিয়া যে বস্তিবাসীদের ছবি আঁকেন, নিঃসন্দেহে তার সঙ্গে আজকের ঢাকা শহরের বস্তির যোজন যোজন তফাৎ। তাঁর বস্তিবাসীরা জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার জন্য শহরে এলেও শ্যামল-সবুজ ছায়াচ্ছন্ন গ্রামে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত, গ্রামে আবারও ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখত; যদিও শেষ পর্যন্ত পারত না ফিরে যেতে। কিন্তু এখনকার বস্তিবাসীরা জড়িয়ে গেছে নগর-সন্ত্রাসের এমন এক চক্রে, যা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্বপ্ন দেখতেও তারা অক্ষম ও ভীত।

তা হলে দেখা যাচ্ছে, ষাটের দশকে বাংলা ভাষার অন্য লেখকরা যখন প্রধানত নতুন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ঘিরেই আন্দোলিত হচ্ছেন কিংবা পিছুটান অনুভব করছেন শস্য-শ্যামলা গ্রামজীবনের, রিজিয়া রহমান তখন তার উপন্যাসের বিষয়আশয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন নগর-মহানগরের অবকাঠামো গড়ে তোলার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য উদ্বৃত্ত সময় সৃষ্টি করার মূল নিয়ামক বস্তিবাসীদের। তাঁর ভাষা তখন কতটা শক্তিশালী, সেটা ভিন্ন ব্যাপার; এই ক্ষেত্রে দ্রষ্টব্য তাঁর বিষয়আশয় বেছে নেওয়ার দুর্দান্ত সক্ষমতা। বড় একটি ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি এবং তাতে উতরেও গিয়েছেন। এই ঝুঁকি পেরুতে তাঁকে সাহায্য করেছে বোধকরি ছোটগল্প। অগ্নিস্বাক্ষরা নামের গল্পের বইটি বেরোনোর আগে-পরে অনেক গল্প লিখেছেন তিনি- যদিও বই আকারে সংকলিত হতে খুব কমই দেখা গেছে। গ্রন্থাকারে প্রকাশনায় উপন্যাসই এগিয়ে আছে তাঁর।

মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক পূর্বাণীর ঈদসংখ্যাগুলোয় পর পর কয়েকটি উপন্যাস লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন রিজিয়া রহমান। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিলায় শিলায় আগুন, রক্তের অক্ষর, সূর্য সবুজ রক্ত, অলিখিত উপাখ্যান ইত্যাদি। এগুলোর কোনটি আগে, কোনটি পরে ছাপা হয়েছে, গ্রন্থাকারেই বা কখন কোনটি বেরিয়েছে, তা আর এখন বলতে পারছি না। তবে এক কথায়, প্রতিটি উপন্যাসই নাড়া দেয় পড়ুয়া সবাইকে। যতদূর জানি, প্রায় একই সময় বোধকরি সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকাতে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছিল তাঁর বং থেকে বাংলা। এসব লেখার প্রস্তুতিপর্ব রীতিমতো দ্রষ্টব্য। রক্তের অক্ষরে’র কথা ধরা যাক। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি প্রচ্ছদ কাহিনি হয়েছিল যৌনকর্মীদের নিয়ে- সাধারণভাবে যারা তখন, এমনকি এখনও পতিতা বা বেশ্যা হিসেবে পরিচিত। বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীকে এই প্রচ্ছদ কাহিনিটি ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন। কথায় কথায় শাহাদাত চৌধুরীও বলেছিলেন, আপনি তো এদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে পারেন। বলে তিনি আরও যেসব তথ্য, সাক্ষাৎকার, ঘটনা ইত্যাদি নানা কারণে প্রচ্ছদ কাহিনিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো দিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু কেবল এটুকুই তো নয় প্রস্তুতিপর্ব, রিজিয়া রহমান চেষ্টা করেছেন সরাসরি যৌনকর্মীদের জীবনের কাহিনি শুনতে, চেষ্টা করেছেন জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত হতে। যদিও শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে মুখোমুখি হতে পারেননি তাদের। চন্দন আনোয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি, ‘‘যেখানে ‘বেশ্যা’ শব্দটি উচ্চারণ করা বা ‘বেশ্যা’ গালি দেওয়া একটি নিষিদ্ধ ঘৃণ্য ব্যাপার মনে করা হতো, সেখানে তাদের নিয়ে উপন্যাস লেখাটা বৈধ ভেবে নেওয়াটা তখন কঠিনই ছিল, আর বেশ্যাপল্লিতে গিয়ে তাদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করাও ছিল দুরূহ। অনেক চেষ্টা করেও একজন ‘ভদ্রঘরের’ মেয়ে হিসেবে বেশ্যাপাড়ায় যেতে পারি নি আমি।’’ কিন্তু প্রত্যক্ষ পরিভ্রমণ না থাক, উপন্যাস হিসেবে রক্তের অক্ষর মহীয়ানতা পেয়েছে; যৌনকর্মীদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে রিজিয়া যে অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তাকে তিনি সক্ষম হয়েছেন অভিজ্ঞানে পরিণত করতে। বোধকরি পাঠকও তাঁকে সবচেয়ে বেশি চেনেন এই উপন্যাসটির জন্য। কতটুকু সত্যি জানি না আর রিজিয়া রহমানের কাছেও কখনও শোনা হয়নি, তবে কেউ কেউ বলেন, এই উপন্যাসটি নাকি ছাপা হওয়ার পর বেশ্যাপল্লির এক পড়াশোনা জানা মেয়েকে পড়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল। আর সেটি পড়ে মেয়েটি বলেছিল, ‘যে এটা লিখেছে, সে কোন বেশ্যাপাড়ায় থাকে?’

কিন্তু রক্তের অক্ষর তো কেবল যৌনকর্মীদের জীবনসংগ্রামেরই আখ্যান নয়Ñ স্বাধীন দেশের সমাজ ও পরিবারে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত নারীদেরও আখ্যান। যাদের অধিকার দিতে মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় পরে মানুষ এখন উচ্চকিত হচ্ছে, কথা বলছে, রাষ্ট্রও স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছে, তাদেরই একজনের জীবনকে ঘিরে সেই ১৯৭৭ সালে- যখন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, যখন সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় আদর্শের দিকে হাঁটছেন- এ উপন্যাস লেখেন তিনি। মানুষের অনুভূতির জগতে এই অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলেন যে, পাল্টায়নি, কিছুই পাল্টায়নি। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ইয়াসমিন, বীরাঙ্গনা ইয়াসমিন- যে চায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে, সমাজ-সংসারেরই একজন হয়ে বসবাস করতে। কিন্তু দেশের মানচিত্র পালটালে কী হবে, শাসক পালটালে কী হবে, অন্য কিছুই তো পাল্টায়নি। পাল্টায়নি বলেই ১৬ ডিসেম্বরের পর তার নিকটাত্মীয় স্বজনও চায়, তাকে যেন জীবিত না পাওয়া যায়। পালটায়নি বলেই সবখানে অপদস্থ ইয়াসমিনকে তিক্ত কণ্ঠে বলতে হয়, ‘সরকার বোধহয় বারাঙ্গনা বলতে ভুলে বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়ে ফেলেছে’; বলতে হয়, পাকিস্তানি সৈন্যরা তার দেহের ক্ষতি করেছে, কিন্তু মনের ক্ষতি করেছে স্বাধীন দেশের মানুষরাই। তাই একজন শিক্ষিত নারী হিসেবে ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে গিয়েও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তাকে। তাও সেইসব কর্মকর্তাদের সামনে, যাদের অনেকেও যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের শাসনত্রাশন মেনেই চাকরি করেছে এবং দেশ স্বাধীন হতে না হতেই দিব্যি পদোন্নতি বাগিয়ে বসেছে। এমন ইয়াসমিনের চাকরি হয় না, ঠাঁই হয় বেশ্যাপল্লিতে। কিন্তু যে মেয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তর হেঁটে এসেছে, কী করে সে পদানত হয়ে থাকবে? কী করে বাঁচবে প্রতিবাদ না করে? অতএব মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই মুক্ত হতে হয় তাকে।

রক্তের অক্ষর লিখে রিজিয়া রহমান বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যকে শোধন করেছেন, নারীর মুক্তির নতুন এক বয়ান নির্মাণ করেছেন। আমরা দেখেছি, সমাজের বিভিন্ন শোষিত-নিপীড়িত গোষ্ঠীর মতো নারীর মুক্তির সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের পরও শেষ হয়নি। বরং তা নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এই রাষ্ট্রে অনেক কাজি সাহেব জুটেছে, যারা অসংখ্য নারীকে দিয়ে যৌনব্যবসা করাচ্ছে, কিন্তু নিজের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের জন্য দই কিনে বাড়ি ফিরছে। এই উপন্যাস কেবল একটি যৌনপল্লির গল্প নয়Ñ তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকশূন্যতারও গল্প, মুক্তিযুদ্ধের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা লুট হয়ে যাওয়ার গল্প। রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষরে’র প্রায় একই সময়ে সৈয়দ শামসুল হককে আমরা নিষিদ্ধ লোবান লিখতে দেখি। এখন দুটোকে পাশাপাশি রেখে দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, এ বোধকরি একই নারীর ধারাবাহিকতা- সৈয়দ হক যার প্রথম পর্ব লিখেছেন, রিজিয়া রহমান লিখেছেন সেই নারীরই দ্বিতীয় পর্ব। ঘর ভাঙা ঘর থেকে রক্তের অক্ষর পর্যন্ত রিজিয়া রহমান যে পথপরিক্রমায় থাকেন, তা থেকে দেখতে পাই, তিনি প্রায়-ঔপনিবেশিক নগর সমাজ থেকে যাত্রা করেছেন বিকৃত জাতীয় মুক্তিবোধের দিকে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রিজিয়ার অবশ্য কাছেই সাগর নামের উপন্যাসটি ছাড়া বড় কোনো কাজ নেই। একজন স্বল্পশিক্ষিত কেরানির স্ত্রীকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে লেখা তাঁর এই উপন্যাসে প্রকারান্তরে তিনি এ ইঙ্গিতই দেন, প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে, সামর্থ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধকে নির্মাণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্থপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। যে মেয়ের স্বপ্ন ছিল, সে তার ভীরু ভীরু চোখে দেখে গণআন্দোলন, দেখে আসাদদের আত্মত্যাগ, দেখে আগরতলা মামলার প্রতিবাদে উত্তাল মানুষদের; সেও স্বপ্ন দেখে মুক্তি পাক শেখ মুজিবুর রহমান। আর উনসত্তরের সেই গণঅভ্যুত্থানের সোপান বেয়ে মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে সে সুঁই-সুতোয় কাঁথায় মূর্ত করে তোলে প্রতিটি মুহূর্ত আর নিজের আকাক্সক্ষা। কাঁথার মাঝখানে সূর্য এঁকে বাংলাদেশ লেখা তার শেষ হলো মার্চের ২৫ তারিখে। আর সেই কালরাত্রিতেই শহিদ হতে হলো তাকে, সাগরেই পৌঁছল বটে সে, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গীকৃত রক্তসাগরে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের না হলেও তাঁর লেখা উৎসে ফের’ও তো এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধেরই গল্প; কেননা এ উপন্যাস পল্লবিত হয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারের প্রেক্ষাপটে।

মুক্তির যুদ্ধকে রিজিয়া রহমান দেখেছেন কেবল বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর প্রতিটি নিপীড়িত জাতি ও শ্রেণির প্রেক্ষাপট থেকে, পরিপ্রেক্ষিত থেকে। তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে শিলায় শিলায় আগুনে’র মতো একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস লেখা। রক্তের অক্ষরে যতটুকু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লেখার ইচ্ছে ছিল, ততটুকু না থাকার হতাশা যেন তিনি মিটিয়ে নিয়েছেন এ উপন্যাসে। দীর্ঘ পাঁচ বছর বেলুচিস্তানে অবস্থানের এবং সাধারণ মুক্তিকামী মানুষদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার নির্যাস থেকে গলিত লাভার মতো বেরিয়ে এসেছে তাঁর এ উপন্যাস। বিয়ের পর পরই বেলুচিস্তানে যেতে হয় তাঁকে স্বামীর চাকরির সুবাদে। বেলুচ ভাষা পর্যন্ত শিখে ফেলেছিলেন তিনি আর তাই সহজেই একাত্ম হওয়ার পথ তৈরি করতে পেরেছিলেন সেখানকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে। রিজিয়ার এ উপন্যাসেরও প্রধান চরিত্র নিম্নবর্গের এক মানুষ, হতদরিদ্র এক ভিশতি লালু। যার মধ্যে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন একটি জাতিসত্তার দেশাত্মবোধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। একাত্তর তাঁর হৃদয়ের মধ্যে জেগেছিল বলেই তিনি বেলুচদের এই আঁকুতিকে অনুভব করতে পেরেছিলেন একাত্ম হয়ে গভীরতা দিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে একবার রিজিয়া রহমান এ নিয়ে লিখেছিলেন যে, ‘বাস্তবে চেনা কিছুটা বোকা যুবকটির ছিল পাকিস্তানিদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বেলুচিস্তানের ‘ক্র্যাক ডাউনের’ পরে সে প্রচণ্ড ঘৃণায় বলেছিল- ‘লাথ্ মারি পাকিস্তানি হুকুমাতকে।’ বলেছিল- ‘হাম জরুর বদলা লেঙ্গে।’ আধপেটা খাওয়া, ছেঁড়া মলিন জামা-জুতো পরা লালুর এই যুদ্ধ-ঘোষণাই আমাকে শিলায় শিলায় আগুন লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে বসেই লিখেছিলাম- বাংলাদেশের মতোই আর একটি স্বাধীনতাকামী জাতির সংগ্রামের ঘটনা।’ লেখার অপেক্ষা রাখে না, এ উপন্যাসের সৃজন তাঁকে মুক্ত করেছে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিশ্বের প্রতিটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হতে। ভিন্ন কাহিনিতে, ভিন্ন আদলে, কিন্তু এই ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ও তার ধারাবাহিকতাকেই তিনি ক্রিটিক্যালি উপস্থাপন করেন তাঁর আরও কয়েকটি উপন্যাস- উত্তর পুরুষ, সূর্য সবুজ রক্ত, অলিখিত উপাখ্যান ও একাল চিরকালের মধ্য দিয়ে। অনেক- অনেক কথাই বলা সম্ভব এসব উপন্যাস নিয়ে। যেমন ধরা যাক, একাল চিরকালের কথা। রিজিয়া রহমানের স্বামী ছিলেন মাইন জিওলজিস্ট, কাজ করতেন পেট্রোবাংলায়, যুক্ত ছিলেন বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কাজেও। সেখানে রিজিয়াও গিয়েছিলেন। একজন সাঁওতাল নারী যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, তোমাদের এই খনি থেকে কী উঠবে? ভাত উঠবে? এই সরল প্রশ্ন তাকে নিয়ে যায় গভীর থেকে গভীরতর আরও অনেক প্রশ্নের কাছে। জন্ম নেয় একটি উপন্যাসের।

রিজিয়া রহমানের বহুল আলোচিত আরও একটি উপন্যাস- বং থেকে বাংলা। বোধকরি রিজিয়া রহমান নিজেও সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন এই উপন্যাসকেই, চেয়েছেন তার বইয়ের পাঠক-পাঠিকারা যেন এটিকেই সবচেয়ে ভালো মনে করেন। বাংলাদেশের জাতি গঠন ও এর ভাষার বিবর্তনকে ভিত্তি করে এ উপন্যাস লিখেছেন তিনি। আর এ জন্য তাঁর চিন্তার ডানাকে বিস্তৃত করেছেন আড়াই হাজার বছর আগেকার বাংলার দিকে- যখন বং নামের একটি গোত্র বসবাস করত এখানে। সেই আড়াই হাজার বছর আগে থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এসে পরিসমাপ্তি ঘটেছে এ উপন্যাসের। সন্দেহ নেই, এটি তাঁর একটি বহুল আলোচিত উপন্যাসও বটে। আড়াই হাজার বছরের প্রেক্ষাপটকে নিয়ে একটি উপন্যাসের চিন্তা করাই নিঃসন্দেহে সাহসী ব্যাপার। বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লেখক অতীতাশ্রয়ী অনেক উপন্যাসই লিখেছেন; কিন্তু এত দীর্ঘ সময়ের ব্যাপ্তি কারও উপন্যাসে আছে কি না জানা নেই। তবে এ উপন্যাসকে ঐতিহাসিক বলার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের আপত্তি রয়েছে। কথাসাহিত্যিক মহীবুল আজিজকেও বলতে দেখি, “রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, ইতিহাসসম্মত উপন্যাস। যদিও তাঁর জীবদ্দশাতেই এটিকে তাঁর ‘ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক উপন্যাস’ শীর্ষক সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হতে দেখা গেছে। একে ঐতিহাসিক বলার ক্ষেত্রে নিজের আপত্তির কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন-

এটাকে অনেকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে থাকেন। কিন্তু আমি বলি, মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতার উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ একটি দেশ বা জাতির জন্য মাত্র নয় মাস সময়ে গড়ে ওঠে না। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই শুনে এসেছি ছোটোবেলা থেকেই, আড়াইশ বছর ধরে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। মানে সিরাজউদ্দৌলার পরে লর্ড যেটা দখল করেছিল সেটা আর কি। তো আড়াইশ’ বছরে একটি জাতি তৈরি হয় না, এটার জন্য হাজার বছর লাগে। ফলে আমি পড়াশোনা শুরু করলাম, তখন বাংলায় বইও ছিল না তেমন। এই বোধ থেকে আমি বং থেকে বাংলা লিখেছি।”

এ উপন্যাস সম্পর্কে রিজিয়া রহমানের নিজের আরও একটি ভাষ্য এমন : ‘দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন যুগ থেকে বিভিন্ন ঘটনা গ্রহণ করে বিধৃত করা হলেও একটি মূল কথায় এসে এর সমাপ্তি ঘটান হয়েছে। বাংলার সিংহাসন চিরকাল বিদেশি ক্ষমতালিপ্সু ও সম্পদলোভীর দ্বারা শাসিত হয়েছে। জনগণ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন ছিল।’

কিন্তু একটি দীর্ঘ ব্যাপ্ত সময় ও কাহিনিকে নিয়ে এগোতে যে নিবিড় ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়, কোনো পর্বকে ফেলে চলে যেতে চাইলেও যে সুসামঞ্জস্যতাকে অবলম্বন করতে হয়, কল্পিত চরিত্রগুলোকে ধাবমান সময়ের মধ্যে স্থাপন করতে যে সামগ্রিকতা দিতে হয়, বং থেকে বাংলা’য় বোধকরি সেসব ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে। তা ছাড়া লেখক হিসেবে ব্যক্তিগত দর্শন, ধারণা, অবস্থান ও আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে যে সংযম থাকতে হয়, সেই সংযমের প্রতিও তিনি বোধকরি মাঝেমধ্যে অবিচার করেছেন এ গ্রন্থে। প্রসঙ্গত আমরা মনে করতে পারি, মার্কেসের ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’র কথা। বুয়েন্দিয়াÑ এই একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে সাতটি পুরুষ ধরে এ উপন্যাসের কাহিনি যেভাবে ব্যাপ্ত হয়, যেভাবে তা নিñিদ্র এক বুনোট তৈরি করে তা নিঃসন্দেহে যে কাউকে চমৎকৃত করে। আরেকজন কথাসাহিত্যিকও যে এরকমভাবেই এগোবেন, তা নিশ্চয়ই নয়। তবে আমার মনে হয়, তাত্ত্বিক একটি কাঠামো মাথার মধ্যে নিয়ে এগিয়েছেন বলেই হয়তো রিজিয়া রহমানের এ উপন্যাস স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বইটি প্রকাশের সময় ছিল প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ। যে কারণে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার অনুরোধে বইটির বেশ কয়েকটি পর্ব তাঁকে ফেলে দিতে হয়েছিল। পরে অনুকুল রাজনৈতিক পরিবেশ কখনও এসেছিল কি না বা এসেছে কি না, অথবা সেসব পর্বই কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেছে কি না- সেসব আর স্পষ্ট করে বলেননি তিনি। তবে এ উপন্যাসের আগাগোড়া ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তিনি; ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার মানে অবশ্য নিজের ধারণাগত ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। তা যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তিনি সেটি কতটুকু থাকতে পেরেছেন, তাও একটি বড় প্রশ্নের ব্যাপার। যেমন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও কেন বিদেশি ক্ষমতালিপ্সুরা হাজার বছর ধরে বাংলাকে শাসন করতে সক্ষম হয়েছে, তা যেন এ উপন্যাসে খুব সরলীকৃত ব্যাখ্যাতেই উপস্থাপিত হয় আমাদের সামনে। যেমন, রিজিয়া রহমানের এ উপন্যাসে আর্যরা রীতিমতো বহিরাগত এবং বাঙালি সমাজের সঙ্গে তাদের অভিযোজন ঘটিয়েছেন তিনি শক্তিশালী চরিত্র নীলাক্ষের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তার কারণ কি? নীলাক্ষের নিজস্ব বয়ানে যেমন করে বলা হয়, তাতে মনে হতে পারে, প্রকৃতি আর নারীই এর মৌলিক কারণ। অনার্য বংগাল গোত্রের নারী বিনিকার প্রেমে পড়ে নীলাক্ষ আর্যাবর্তে ফিরে না গিয়ে বংগালেই বসতি স্থাপন করে আর বংগাল গোত্রের কাটাআলের জনপদের নেতা নির্বাচিত করা হয় তাকে। নীলাক্ষকে বলতে শুনি, ‘আজ থেকে আমি আর্য নই। ক্ষত্রিয় নই। আমার দেশাচার নেই। আমি আপনাদের মতোই বংগআল। এই মাটির সন্তান।’

রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা’র বিশেষ করে এই পর্বটি একটি ঐতিহাসিক ভুল পটভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তাই ভবিষ্যতের পড়ুয়াদের কাছে এই উপন্যাস বর্তমানের মতো সমাদৃত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ই থেকে যায়। বিশেষত ১৯৭৪ সাল থেকে ২০০০ সাল অবধি পাকিস্তানের বালুচিস্তানের মেহেরগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসবিদরা যে সব সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, তাতে সুনিশ্চিত যে, এখন থেকে সাড়ে নয় হাজার বছর আগে নব্যপ্রস্তর যুগে যাযাবর জীবন বাদ দিয়ে কৃষি সভ্যতার চর্চা শুরু করার পর সাড়ে ছয় হাজার বছর ধরে সেখানে যে গ্রামীণ কৃষি সমাজ বিকশিত হয় উপমহাদেশের অন্তত উত্তর- পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে। শারীরিক নৃতত্ত্ব বিদ্যা তখন এটিও নিশ্চিত করে যে, প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দকাল থেকে, অর্থাৎ সেই তাম্রযুগ শুরুর সময় থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঐতিহাসিক কাল শুরুর কিছু সময় আগে পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে এ অঞ্চলে কোনো বহিরাগত আসেনি।  রিজিয়া রহমানের এসব বিষয় জানা ছিল না, এমন মনে করার কোনো কারণ দেখি না। সে ক্ষেত্রে কি ধরে নিতে হবে, তিনিও ঔপনিবেশিক শক্তির দেওয়া তত্ত্বটিকেই সঠিক বলে মেনেছেন?

তাই, রিজিয়া রহমান যেমনটি বলেছেন, বং থেকে বাংলা’কে তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে দেখতে চান- সেভাবে বিবেচনা করলে বরং অনেক নির্বিঘ্নে পাঠ করা সম্ভব। যদিও সচেতন পাঠক হয়তো খেয়াল করবেন, এ উপন্যাস নিয়ে তিনি হয়তো এত বেশি স্পর্শকাতর ছিলেন যে, নিজেও মাঝেমধ্যে যেন চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু যা তিনি এই উপন্যাস ও অন্য সব উপন্যাসগুলোর মধ্যে দিয়ে আমাদের দিয়ে গেছেন, তা হলো অন্ত্যজ বাঙালির সংস্কৃতি। এই কথাটি এখন পর্যন্ত কাউকে লিখতে দেখিনি বা বলতে শুনিনি- বিষয়বস্তু, সময়কাল, ভূগোল কিংবা অন্য কোনো কিছুতে যত বৈচিত্র্যই থাকুক না কেন, যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত রিজিয়া রহমানের উপন্যাস আসলে আমাদের পরিচিত করায় অন্ত্যজ বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে, জীবনচর্চার সঙ্গে। সে হয়তো সেই বং পর্বের, হয়তো ইংরেজ শাসনামল পর্বের, হয়তো মুক্তিযুদ্ধকালের- কিন্তু সে অন্ত্যজ বাঙালি। আর শিলায় শিলায় আগুনে’র বেলুচিস্তানের সেই মুক্তিকামী লালু কিংবা একাল চিরকালের সাঁওতালরা- তারাও তো অন্ত্যজ; তাই রিজিয়া রহমানের একই মালায় গ্রন্থিত হয়েছেন তারাও। নিপীড়িতের সংস্কৃতি কিংবা জীবনচর্চায় কি আর তেমন তফাৎ থাকে? তারা দাঁড়িয়ে থাকে একই সমতলে। শুরুতেই বলেছিলাম, রিজিয়া রহমান আত্মপরিচয় খুঁজেছেন; তিনি তাঁর সেই পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন অন্ত্যজ বাঙালির মধ্যে, অন্ত্যজ বাঙালির সঙ্গে একাকার পৃথিবীর যাবতীয় অন্ত্যজের মধ্যে।

ইমতিয়ার শামীম  : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares