শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী : রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা : বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের শৈল্পিক বিনির্মাণ : আহমেদ মাওলা

শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী :

রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা :

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের শৈল্পিক বিনির্মাণ

আহমেদ মাওলা

রিজিয়া রহমানের (১৯৩৯-২০১৯) সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তাঁর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। আসলে আমাদের এখানে সাহিত্যশিল্প এবং জীবনচর্চায় আধুনিকতার ধারণাটি অনুকরণের মোড়কে ঠাসা। ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে ভারতবর্ষের আধুনিকতার কোনো মিল নেই। আমাদের এখানে আধুনিকতার নামে যে আদল তৈরি হয়েছে তা আসলে বিকৃতি। রিজিয়া রহমান মানসিকতার দিক থেকে ছিলেন প্রাগ্রসর। বিশেষত তাঁর সমকালীন অন্য নারীদের সঙ্গে তুলনা করলে রিজিয়া রহমানের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল একটি সংগ্রামমুখর। মাধ্যমিক পাস করার পর স্বামীর সঙ্গে পাকিস্তান চলে যাওয়া, নানা জটিলতায় সেখানে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে না পারা, পরে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়ালেখা, লেখালেখি, সংসার, একধরনের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল প্রাগ্রসর এবং লক্ষ্য ছিল স্থির। তিনি অগ্রসর হয়েছেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এবং নিজস্ব পথে। তাঁর জন্ম যদিও কলকাতার ভবানীপুরে; কিন্তু দেশভাগের পর তাঁরা চলে আসেন বাংলাদেশে এবং এই অঞ্চলের ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি, মানুষের জীবনধারাকে তিনি অবলোকন করেছেন, বিষয় করেছেন তাঁর সাহিত্যকর্মের। (শব্দঘর পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা।) সমকালীন সাহিত্যিক মহলে যদিও তাঁর নাম অনুল্লেখ্য, অনুচ্চারিতই ছিল এবং সভা-সমাবেশ, সাহিত্য-মঞ্চেও তাঁর উপস্থিতি ছিল না। অনেকটা নিভৃতচারী হয়ে তিনি এই ঢাকা শহরে বসবাস করছিলেন। ষাটের কালপর্বে আমরা একঝাঁক প্রতিভাবান কথাশিল্পীকে পেয়েছিলাম- শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, রাবেয়া খাতুন, রিজিয়া রহমান, রাজিয়া খান, সেলিনা হোসেন প্রমুখ। যারা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের স্বতন্ত্র একটি মানচিত্র রচনা করেছিলেন। বাঙালির জাতীয়তাবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি- এসব চেতনাকে শানিত তলোয়ারের মতোই সাতচল্লিশ পরবর্তী কথাসাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছিলেন। তারপর প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে গেছে, অনেক বড় ঘটনা ঘটেছে- মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির পিতার হত্যা, ক্যু, অভ্যুত্থান, আন্দোলন; কিন্তু বাঙালির স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা রূপায়ণের মতো শক্তিমান কথাশিল্পীর আগমন আমাদের আর চোখে পড়ে না। শহীদুল জহির পাঠকদের মনে একটা আশার সঞ্চার করেছিল কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে সেই প্রত্যশার মাঠটি মরুভূমিতে পরিণত হলো। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য দুটি ধারা লক্ষ করা যায়। পপুলার বা জনপ্রিয় ধারা এবং সিরিয়াস বা মূলধারা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের সাহিত্যিক অভিযাত্রায় যে দীঘল ঐতিহ্যের শৈল্পিক উত্তরাধিকার অনিবার্য ছিল, উত্তরকালের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রকরণ পরিচর্যা বিষয় ও ভাষার অভিনবত্ব উদ্ভাবনের চেষ্টা খুব কমই দেখা গেছে। রিজিয়া রহমান বাংলাদেশের সিরিয়াস বা মূলধারার কথা শিল্পী ছিলেন। তাঁর উপন্যাসের বিষয় ভাষা অনুসন্ধিৎসা ছিল স্বতন্ত্র, অন্যদের থেকে আলাদা। তাঁর লেখা বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), রক্তের অক্ষর (১৯৭৮), অলিখিত উপাখ্যান (১৯৮০), সূর্য সবুজ রক্ত (১৯৮১), ধবল জ্যোৎস্না (১৯৮১), একটি ফুলের জন্য (১৯৮৬) ইত্যাদি উপন্যাস ভিন্ন ভিন্ন উপলখণ্ডের মতো সাহিত্যের ইতিহাসে দীপ্তি ছড়াবে। রিজিয়া রহমানের কাজের তুলনা করা যায় মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিনির্মাণ ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানমূলক মহাকাব্যিক উপন্যাস বং থেকে বাংলা। নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসের অন্তঃশীল ধারার সঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বং থেকে বাংলা উপন্যাসের এপিক-আয়তন। ‘ভূমিকায়’ তিনি লিখেছেন- ‘বাংলাদেশের জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে বং থেকে বাংলা উপন্যাসের সৃষ্টি। তবে এর মূলকথা অন্য। আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু করে উনিশ শ’ একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়কালে পর্যন্ত দীর্ঘ পরিব্যাপ্তির মধ্যে এ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন যুগ থেকে বিভিন্ন ঘটনা গ্রহণ করা হলেও একটি মূলকথায় এসে এর সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে। উপন্যাসটিতে বিভিন্ন সময়ের ঘটনা গ্রহণ করা হলেও এর মূল সুর  আগাগোড়া একটি বক্তব্য ব্যক্ত করেছে বলেই ঘটনার বিচ্ছিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এটিকে আমি উপন্যাসই আখ্যা দিয়েছি।’ (পৃ ২২-২৩, ভূমিকা)

রিজিয়া রহমান ইতিহাসের বস্তুসত্যের চেয়ে ভাবসত্যকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, এটি তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। তাঁর অনুসন্ধিৎসা এবং পরিচর্যার জায়গাটি হচ্ছে বাঙালি জাতির আইডেনটিটি বা আত্মপরিচয় নির্মাণ। বঙ্গভূমির আদি গঠন সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের বর্ণনা :

সমুদ্রমেখলা স্রোতস্বিনীর ধারাস্পর্শী নীল বনাচ্ছন্ন এক ভূমি। কবে সেই সৃষ্টির আদিতে যখন তৃতীয় হিমবাহের যুগ অতীত হয়ে পৃথিবীর বুকে নেমেছে সোনালি বসন্ত। কিন্তু তখনও জন্মলগ্নের আলোড়ন হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব সীমানায়, সেই জন্মলগ্নের বেদনা-আনন্দের মধ্য দিয়ে নীল জলধির বুক চিরে দেবী ভেনাসের মতো জেগে উঠেছিল এক ভূখণ্ড। পাষাণ পর্বতের অন্তঃস্তল থেকে যে পয়ধর সদৃশ্য স্নিগ্ধধারা কিশোরী চঞ্চলতার নৃত্যছন্দে স্বচ্ছ শরীরে ঘর ছেড়েছিল, সেই ক্ষীণাঙ্গী ধারাই পূর্ণ যৌবনা হয়ে জন্ম দিল এক সুবর্ণ পলিখণ্ড- সমতট। উত্তরে সমৃদ্ধিশালী দ্রাবিড়ভূমিতে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র আর মণিম্ক্তুার লোভে হানা ছিল স্বর্ণকেশী গৌরবর্ণ দীর্ঘকায় অশ্বারোহী যাযাবর আর্যরা। তাদের বর্বর অস্ত্রের আঘাতে শান্তিপ্রিয় নিরীহ দ্রাবিড়রা হলো ছিন্নভিন্ন। কিন্তু আর্যদের বিক্রম কেবল স্থলভূমিতে, জলবিচরণে তারা অপটু। দ্রাবিড় দুর্গগুলোর পতন ঘটল একে একে। তীরন্দাজ দ্রাবিড় যোদ্ধারা তীর নিক্ষেপ করতে করতে পিছু হটে অবশেষে ঘাঁটি তৈরি করল পর্বতবন্ধুর দক্ষিণভূমিতে। এদেরই একদল সমুদ্রচারী হলো।’ (তৃতীয় অধ্যায়, ১ম পরিচ্ছেদ)

মোট দশটি অধ্যায়ে ঔপন্যাসিক- কথাসাহিত্যিক বিন্যাস করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের প্রধান চরিত্র বং, এলা এবং পাইক্কী। দ্রাবিড়দের ওপর আর্য আক্রমণের ঘটনার বিবরণ দিয়ে কাহিনির শুরু হয়। বং আর এলা নামের দুই তরুণ-তরুণীর অস্তিত্ব সংগ্রামে সমতটের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। তারপর কাহিনি ব্যক্তিসত্তা, সমাজসত্তা থেকে এসে জাতিসত্তার দিকে অগ্রসর হয়। রাজশক্তি, ধর্মশক্তি, অস্ত্রশক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সময় পরম্পরায় ধর্মশক্তি, অস্ত্রশক্তির কাছে মাথা নত করেছে। দেখা যায়, পাইক্কীর জনগোষ্ঠীর বাইদ্যা রমণীর দ্বারা বং ও এলা বন্দি হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু হয় বংগআলদের আল ঘেরা বসতিতে কিরাত বণিকদের আগমনের মধ্য দিয়ে। ভুলু বংগআল এবং তার পুত্র কালু বংগআল এখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ভুলু বংগআলের তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী বুইনি বাইদ্যা জলচর, ঘুরে বেড়ানোই তার নেশা। বংআলদের স্থির জীবনে তার মন বসে না। কিরাত নমসিন কালু বংগআলকে উন্মত্ত করে তোলে। ভুলুর মৃত্যু হলে গোত্রপতি নির্বাচনের প্রথাকে অস্বীকার করে কালু নিজেকেই গোত্রপতি ঘোষণা করে। তৃতীয় অধ্যায়ে আর্য ক্ষত্রিয় ভীম ও তার সেনাদের বং আক্রমণ এবং তাণ্ডব বীভৎসতা বর্ণিত হয়। ঝড়ে নীলাক্ষের নৌকা ভেসে যায়। ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে প্রাণরক্ষার জন্য কাষ্ঠখণ্ড ধরে সমতটের বংগআলের কাটাআল প্রধানের কন্যা বিনিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও প্রণয় এখানে রোমাঞ্চ রসের সঞ্চার করে। নীলাক্ষ আর্য ক্ষত্রিয় হয়েও বংগআল দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়। বিনিকাকে নিয়ে বগাই ও নীলাক্ষের সংঘাত, বগাইকে হত্যার মধ্য দিয়ে বংগআল দেশে আর্যশক্তিরই বিজয় হয়। চতুর্থ অধ্যায়ে কাহিনি পৌরাণিক আবরণ ছেড়ে ইতিহাসে প্রবেশ করে। বহির্শক্তির আগ্রসন প্রতিহত করে মৌর্য সাম্রাজ্য মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বৈদিক ধর্মীয় প্রভাব ছেড়ে সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলে সমাজে নতুন পরিবর্তন শুরু হয়। এই অংশে রিজিয়া রহমান ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসের থেকে বংগআল-সমতটকে পৃথক করে দেখিয়েছেন। সমতটের বণিক নীলেন্দ্র স্পষ্ট ঘোষণা দেয়, সে ভারতীয় নয়, বংগআল।

 পঞ্চম অধ্যায়ে গোপাল চাঁদ বা পঞ্চুর মাধ্যমে গুপ্ত যুগ, পাল যুগ এবং মাৎস্যন্যায়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। এখানে পঞ্চু ও চম্পার প্রেম ভিন্ন এক রসের সঞ্চার করেছে। বর্ণপ্রথায় সমাজে নানা বিভক্তি, ব্রাহ্মণদের নগর বাহিরে গিয়ে ডোম-চণ্ডাল রমণীর দেহভোগ, চর্যাপদে বর্ণিত দুঃখ-দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট সমাজকে রিজিয়া রহমান দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে ঔপন্যাসিক ইতিহাসের সড়ক ধরেই অগ্রসর হয়েছেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে লক্ষণাবতী ধ্বংস, ইসলামের শান্তিবার্তা নিয়ে ফকির আউলিয়াদের বঙ্গ আগমনে ধীরে ধীরে সমাজ পরিবর্তিত হয়। ব্রাহ্মণ্য শাসনের নিষ্ঠুরতা কিন্তু সহজে দূর হয়নি। দেবভাষণ, বেদ উপনিষদের ধর্ম, পৌরাণিক দেবদেবীতে বিশ্বাসের পাশাপাশি লোকদেবী মনসা, চণ্ডী কালিকা, শীতলা মঙ্গলের পালা রচিত হতে থাকে। ভজহরি বামুনের ছেলে কমলাকান্তের সঙ্গে কৈবর্ত মেয়ে মঙ্গলার প্রেমের অপরাধ কৈবর্তপাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া ঔপন্যাসিকের নবনির্মাণ বলা যায়। বাংলা পর্তুগিজদের আগমন আবিসিনিয়া থেকে আসা নৃশংস অত্যাচারী হাবসিদের কৌশলে দমন করে, আলাউদ্দিন হোসেন শাহর সিংহাসনে আরোহণ। হায়াত মামুদ ও বাইদ্যা কন্যা রূপসীর প্রণয় হয়তো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই তবু ঘটনা পরম্পরা রোমান্স তৈরি করে। অন্যদিকে নদীয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব বাংলার ধর্ম আর প্রেমকে নতুন মাত্রা দান করেছে। বল্লাল সেনের জাত-পাত বা বর্ণ বিভাজন সনাতন হিন্দু সমাজের অবস্থা করুণ হয়ে উঠলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা নিরাকার একেশ্বরবাদী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। বাংলার তাঁতিদের বোনা মুসলিন কাপড়, দারুচিনি, লবঙ্গ, আরব বণিকদের হাতে ইউরোপে পৌঁছে যায়। নানা সম্পদে ভরা বাংলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে বিদেশি বণিকরা ছুটে আসতে শুরু করে। আরব বণিকদের পিছু ধাওয়া করে সমতট বাংলায় হানা দেয় পর্তুগিজ হার্মাদ, আরাকান মগদস্যু, আসে ফরাসি, ইংরেজ, মারাঠা- লুণ্ঠন, অত্যাচার- নির্যাতন আর অধীনতা শুরু হয় বাংলায়। অষ্টম ও নবম অধ্যায়জুড়ে রিজিয়া রহমান সেই বর্ণনাই তুলে ধরেন। ভারতে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন, পলাশির যুদ্ধ, বাংলার রেনেসাঁ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি অতিক্রম করে দশম অধ্যায়ে ঔপন্যাসিক সরাসরি দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিবরণের মধ্যে চলে যাওয়ার মধ্যে যে চেতনা কাজ করেছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যেই কাজ করেছে। বং থেকে বাংলা উপন্যাসের তাৎপর্য ও সার্থকতা এখানেই নিহিত।

উপন্যাসের বয়ানে প্রাচীন বাংলার সমূহ অবস্থা উঠে আসে রামচরণ ও পুরুষোত্তমের কথোপকথনে। বল্লালি আভিজাত্য ও অপশাসনে বিধ্বস্ত হিন্দুসমাজ তুর্কি আক্রমণের মুখে আরও সংকটে পড়েÑ ‘চিরকাল এদেশের সম্পদ যেমন বিদেশিকে লোলুপ করেছে, তেমনি লুব্ধ হয়ে তারাও ছুটে এসেছে।’

তারা ধর্ম নিয়ে আসেনি, এসেছে রাজ্য জয় করতে, ধনসম্পদ কুক্ষিগত করতে। আর তার কী ফল হয়েছে জানেন? যে রাজন্যবর্গ ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্যের রক্ষক ছিল, তারা আজ সিংহাসন বজায় রাখতে ব্যস্ত। আর আমাদের মতো ব্রাহ্মণরা রক্ষকহারা হয়ে ছোটো জাতের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। আমাদের দেবদেবী তাদের দেবদেবী হয়ে যাচ্ছে। শুনেছি ওদিকে ভাটি অঞ্চলে আর চাটি গ্রামে বহুলোক এসব সাধুর দীক্ষা নিয়ে (ওলি-দরবেশ) একেশ্বরবাদী যবন ধর্ম গ্রহণ করছে (ষষ্ঠ অধ্যায়, এক) সেন রাজাদের শোষণ নির্যাতনের স্বরূপ উন্মোচিত হয় ঈশান মল্লই দ্রোহে। ‘সেন রাজাদের ভয় ঈশান মল্লই পায় না। আমরা স্বাধীন। আজ থেকে আমরা কারও অধীন নই। এই বংগাল আমাদের।’ (ষষ্ঠ অধ্যায়, পাঁচ)

ঘটনাবিন্যাস, চরিত্র সৃষ্টি ও অনুভব -ক্রিয়াশীলতায় ঔপন্যাসিক ঐতিহাসিক কালকে গতিশীল কাহিনিতে রূপদান করেছেন। সেখানে ঔপন্যাসিকের ভাবাবেগ ও উদ্দেশ্যচালিত দৃষ্টিভঙ্গি বং থেকে বাংলা উপন্যাসের শিল্পসার্থকতায় কিছুটা অসঙ্গতি হয়তো আছে। তবু বাঙালি জাতির ইতিহাস অনুসন্ধানে ইতিবাচক দৃষ্টি, কাব্যিক গদ্যরীতির গতিময় বিন্যাস বং থেকে বাংলা উপন্যাসের ছোটোখাটো ত্রুটিকে অতিক্রম করে উজ্জ্বল শিল্পকর্মে উত্তীর্ণ করেছে। প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্ব থেকে উনিশ শ’ একাত্তর পর্যন্ত ইতিহাসকে একটি কাহিনির কাঠামোয় বিনির্মাণ করতে গিয়ে ‘সময়’ হয়ে উঠেছে বং থেকে বাংলা উপন্যাসের অন্যতম নায়ক। ‘বং আর ‘এলা’ গোত্র থেকে বং ‘আল’ ‘বঙ্গ’ ‘বঙ্গাল’ ‘বাংলা’ ‘বাঙালি’ দ্রাবিড়, অস্ট্রীয়-মঙ্গোলয়েড, আরব, পর্তুগিজ, পাঠান, মোগল, ইংরেজের সংমিশ্রণ- সংকরায়ণ সৃষ্টি বাঙালি জাতি আজ নিজস্ব আত্মপরিচয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম। বং থেকে বাংলা উপন্যাস বাঙালির সেই আত্মপরিচয়ের শৈল্পিক বিনির্মাণ।

আহমেদ মাওলা : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares