শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী : সবুজ পালকে রক্তের অক্ষর : উৎপল দত্ত

শ্রদ্ধাঞ্জলি : রিজিয়া রহমান- রক্তের অক্ষরের জননী

সবুজ পালকে রক্তের অক্ষর

উৎপল দত্ত

প্রেক্ষাপট যৌনপল্লী। যৌনকর্মীদের জীবনের দোলাচল। অথবা হেলদোল। ক্রমাগত সংঘাত, দ্বন্দ্ব আর দ্বৈরথে আপাত সরল ন্যারেটিভ (Narrative) এগিয়ে যায়। তরতর করেই এগিয়ে যায়।

রক্তের অক্ষর।

রিজিয়া রহমানের উপন্যাস যে-বয়সে আমি পড়ি, সে-বয়স ওই উপন্যাসের কাহিনি, বুনোট, বিষয়-আশয় এর কোনোটির সাথেই যায় না। তবু পড়ে ফেলি। সহজ ও প্রচলিত কথায় যাকে বলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা।

খুব বেশি বই পড়ার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠেনি তখন। বিশ্লেষণী চোখ দিয়ে পড়েছি, তাও নয়। যে জেলা শহরে আমি থাকতাম, একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল সেখানে। দুপুর গড়ালে গ্রন্থাগারটি খুলত। ঘড়িতে বিকেল তিনটে, আমাকে টানত।

বেশির ভাগ বই পুরনো। তার প্রচ্ছদ নেই। কাপড়-কাগজে স্থানীয় কৌশলে বাঁধাই করা। তার দুই মলাটের মধ্যে ছিল মোপাঁসা, তলস্তয় বা অ্যাডগার অ্যালেন পো।

আশির দশকের প্রথম হতে পারে। লাইব্রেরিতে কিছু নতুন বই এলো। ঝকঝকে তকতকে প্রচ্ছদ। স্পষ্ট মনে পড়ে বইগুলো মুক্তধারা প্রকাশনার। আমলোকীর মৌ, বং থেকে বাংলা, ধবল জ্যোৎস্না আর মুখ দেখাল, রক্তের অক্ষর।

ওপার বাংলার সুনীলের গল্পগ্রন্থের তিন খণ্ড হাজির। জহির রায়হানের সাতটি উপন্যাস এক মোড়কে বন্দি হয়ে এলো সন্ধানী প্রকাশনী থেকে সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক। কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ মুগ্ধ করল। বইয়ের প্রচ্ছদ এত সুন্দর হতে পারে! প্রচ্ছদ আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, আমি বাজার থেকে জলরঙ কিনে তার অনুকৃতি বা রেপ্লিকা তৈরি করতে শুরু করি।

আমি তখন কলেজমুখী। মানে কলেজে যাবো যাবো করছি। এসএসসি পরীক্ষার পর সাময়িক বিরতি। দুপুর গড়ালেই মনও গড়িয়ে যেত ওই লাইব্রেরির পথে। বাঁধাই করা বইগুলোর মধ্যে জাদু ছিল। ধীরে বহে ডন, মিখাইল শলোখভ। কশাকস, লেভ তলস্তয়। ইস্পাত, নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি। ডন কিহোতে, সার্ভেন্তিস। সমুদ্রের স্বাদ, (দি সি উলফ), জ্যাক লন্ডন। মাহমুদুল হকের যেখানে খঞ্জনা পাখি (অনুর পাঠশালা)।

কাম্যু-কাফকা-আহমেদ ছফা।

জাদু তো থাকবেই, সে কথা অনেক পরে জেনেছি। বুঝি আর না বুঝি, পড়ার  নেশা ময়াল সাপের মতো ততদিনে প্যাঁচ কষে ধরেছে আমাকে।

আমার মনে হয়, সাহিত্যের একটি নিজস্ব ভাষা আছে, যা বুঝে ওঠার আগেই ছুঁয়ে যায়। সে ভাষা অক্ষর বা বাক্যের পরম্পরা নয়। ভাষাটি যদি সত্যি হয়, তবে তার আবেদন চিরায়ত। শ্রেণি-সমাজ-বয়স নির্বিশেষে চিন্তা ও মননে তা অভিঘাত করে, তরঙ্গ তোলে আর টেনে নিয়ে যায়। না হলে ওই বয়সে আমার পাঠের তালিকায় ওই গ্রন্থগুলোর সংযুক্তি আশা করা যায় না।

ঘোর ও আচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে দিন কাটত এসব লেখকের কথা কিছুই জানতাম না। জানার চেষ্টাও করিনি। যখন জেনেছি, তখন হাতে তুলতেই বুকে দুরুদুরু।

দুই.

রিজিয়া রহমানের বইটিও এই ধারাবাহিকতায় পড়ে ওঠা। পরে আবার পড়ি। এর মধ্যে কলেজ চুকেবুকে গেছে। বইয়ের ন্যারেটিভ আবার আমাকে চমকে দেয়। কাহিনিসূত্র যে অবকাঠামোয় নির্মাণ করা তা বহুবার ঘুরে না এলে চরিত্র, সংলাপ সৃষ্টি আর গাঁথুনি সম্ভব নয়। বিষয়বস্তুর সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রকাশের প্রয়োজনে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে অতটা বিচরণ সম্ভব নয় বলেই আমার মনে হয়। ধন্ধ লাগে। এই ধন্ধ আরও বেড়ে যায় যখন ‘ধবল জ্যোছনা’ পড়ি। কাহিনির বৈপরীত্য (Contrast) চমকে দেয়। চরিত্র, ডিটেইলস ও ন্যারেটিভ, তেমনি সাবলীল।

বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তার অবিরাম যাত্রাকে অভিযাত্রা বলেই মনে হয়। কাহিনিসূত্রে মেরুর ব্যবধান, অথচ তার চরিত্রের চালচলন, অবয়ব মূর্ত। পরিপার্শ্ব অচেনা হলেও চেনা মনে হয়। শব্দের অব্যর্থ বা লাগসই প্রয়োগ তার গদ্যকে এমনই বিশিষ্ট করে তোলে যে, তাকে আর বিশিষ্ট বলেই মনে হয় না- এটাই স্বাভাবিক, এই পরিণতিতে পাঠককে পৌঁছে দিয়ে যায়। কাহিনি বিস্তারের ক্ষেত্রেও তার শৈলী অনন্য।

আপাত সরল বাক্য আসলে মেদহীন। ঝরঝরে। সেখানেও বৈচিত্র্য আছে যা খুঁজে নিতে হয়, না হলে ধরা দেয় না। হঠাৎ একটি বাক্যে একটি অপ্রচলিত অথচ চেনা শব্দের ব্যবহার বাক্যটিকে রূপকধর্মিতায় উন্নীত করে। একটি অনুচ্ছেদ দীর্ঘ হলেও ‘ডিটেইলস’-এর অনুপুঙ্খ ব্যবহারের কারণে তা ক্লান্ত করে না। পরস্পরবিরুদ্ধ বিষয়-আশয় নিয়ে এত ডিটেইলসে যাওয়া কী করে সম্ভব! তা হলে কি ‘দ্য পাওয়ার অব ইমাজিনেশন’ কাজ করে গেল! অথবা এস. টি. কোলরিজ যেমন বলেছেন সাসপেনশন অব ডিজবিলিফ (Suspension of Disbilief, Lyrical Ballads, Samuel Tailor Coleridge, 1798)- তাই ঘটে গেল!

কোলরিজ পাওয়ার অব ইমাজিনেশনের কথাও বলেছেন (Biographia Literaria)। পরবর্তীকালে ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিকশনের সাথেও পরিচিত হই। অপর্যাপ্ত ফ্যাক্টসকে কাহিনি বিস্তারের ক্ষেত্রে ইমাজিনেশনের সুতীব্র ও স্বচ্ছ ব্যবহার তার উপন্যাসকে সুগঠিত ও অনিবার্য সম্পূর্র্ণতা দিয়ে যায়! এসব এখনও আমাকে ভাবায়। রক্তের অক্ষর পড়ার সময় আমি এরকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছি। তার কাহিনি বিস্তারের ক্ষমতা আমাকে একই সাথে আচ্ছন্ন ও সচকিত করেছে।

চলমান সময়, সমাজ-কাঠামো ও সংস্কৃতি- অন্তত এই তিনটি উপাদানকে রিজিয়া রহমান তার কথাসাহিত্যে কখনও এলিয়ে পড়তে দেননি। চরিত্রের আদল-অবয়ব নিয়ে তাই কোন সংশয়ই জাগে না।

তার পরও আমার কাছে মনে হয় না, কাজগুলো শ্রমসাধ্য বা যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল। উল্টো কথাটিই মনে বেশি উঁকি দেয়, আপাত শ্রমসাধ্য কাজগুলো তিনি অনায়াসে করেছেন। পাথর-নুড়িতে ঠোক্কর না খেয়ে তার গদ্যের অনর্গল প্রবহমানতা সে কথাই বলে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ত কখনও কখনও। ফ্রয়েড-লিবিডো তত্ত্ব, সুররিয়্যলিজম, স্বপ্নঘোর, মার্কসীয় দর্শন বাদ দিলে সমাজ-অন্তর্গত মানুষকে উপস্থাপনার প্রশ্নে তিনি নির্মোহ থেকেছেন। কাহিনি বিস্তারে অনর্গলতার ক্ষেত্রেও একই কথা আসে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মনে পড়ে যায়। ভাষাকে আরেকটি ভাষায় রূপান্তর করা যা প্রমিত অলঙ্কারসমৃদ্ধ হয়ে পাঠককে মুঠোয় ধরে রাখে আর তাকে প্রকৃত সংবাদ দিয়ে যায়।

দ্বন্দ্ব, দ্বৈরথ জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ, তাই অস্তিত্ববাদের অনুষঙ্গও থাকে কিন্তু সঙ্গীত ছাপিয়ে বাদ্যযন্ত্র উচ্চকিত হয়ে ওঠে না।

রক্তের অক্ষরের নারীচরিত্র প্রতিদিন রক্তের দাগ ধুয়ে এগোয়। বেঁচে থাকে। বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। হয়তো তাই ওই বয়সেও আহত হইনি। শিহরিত হয়েছি। সমাজ-আশ্রিত বৈরী বাস্তবতায় সমাজ-পরিত্যক্ত নারী-চরিত্রের ক্রমিক অগ্রযাত্রা সাহসী করে তোলে। নিশীথে পাখির ডাকের মতো অলিখিত ভোরের সংকেত দিয়ে যায়। ভোর হবে একদিন। আমার কাছে আজও রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর সেই সবুজ তুলির ক্যালিগ্রাফি।

রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর ও পরবর্তীকালে অন্যান্য রচনা  মনে যে রশ্মির সম্পাত করেছিল, তাকে ব্যাখ্যা করা যায় অতীতের স্মৃতি ও পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতার মিশ্রণে। নির্মিতির প্রশ্নে তার স্বাতন্ত্র্য উপস্থাপনায় বিশিষ্ট করণকৌশল যেভাবে ধরা দেয় :

(ক)  গল্পের পরিপ্রেক্ষিত নির্বাচন

(খ)  কাহিনির বিস্তার ও ডিটেইলসের নিরলস ব্যবহার

(গ) ডিকশন বা শব্দচয়ন যা একান্তই তার

(ঘ) সরল টানটান মেদহীন বাক্য

(ঙ) বাক্যগঠনে চেনা শব্দের অচেনা প্রয়োগকৌশল

(চ) ইঙ্গিতময় বাক্য যা রূপকধর্মিতায় উত্তীর্ণ

(ছ) বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে আসা যাওয়া

(জ) সমকালীন বাস্তবতা, সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিতি

রিজিয়া রহমানের কাহিনিতে আমাদের জনপদের মানুষের মিছিল আছে যা সংবাদ দেয়, স্লোগানধর্মী হয়ে ওঠে না।

সত্তর বা আশির দশকের সমাজবাস্তবতার অনেক উপাদান আজ ঝরে গেছে, পরিবর্তিত হয়েছে বা প্রত্নপ্রতিম হয়ে আছে। আবার জেগে উঠবে বলে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বাজার অর্থনীতির প্রভাব, প্রযুক্তির দ্রুত ও আগ্রাসী অগ্রসরণ নব্বই দশক থেকেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই শতাব্দীর শুরু থেকেই সমাজ-মানসে ও জীবনশৈলীতে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। এর প্রভাব শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য ও মানুষের পাঠাভ্যাসের মধ্যেও দেখা যায়। এই পরিবর্তনকে উপেক্ষা করা যায় না।

আমার মনে হয়, একটি যুগসন্ধিকালের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। তরঙ্গ থিতিয়ে এলে সমুদ্রের আসল রঙ দেখা দেবে। আমরা শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এসেছি। রেনেসাঁ অতিক্রম করেছি। কিন্তু জীবনবোধ ও বাস্তবতার প্রশ্নে সামাজিক পরিবর্তন জীবনের মৌল সুরকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি।

জীবনের সাথে যা যায়, তা রয়েছে।

যা যায় না, তা হারিয়ে গেছে।

রিজিয়া রহমানের ক্ষেত্রে এই অনুষঙ্গ আরও প্রবলভাবে কাজ করে বলে আমার বিশ্বাস। তার শিল্পসৃষ্টির মধ্যে যে জীবনমুখী ইতিবাচক উপাদানের সুনির্দিষ্ট সমাহার তা আবার উঠে আসার অপেক্ষায় আছে। উঠে আসার অপেক্ষা বললে মনে হতে পারে, তাহলে কি তা তলিয়ে গেছে!

হয়তো যায়নি, কিন্তু তেমন সরবও তো হয়নি, যতটা কিঙিক্ষত ছিল!

একটু আলো-আঁধারীতেই বিচরণ করে চলে গেলেন তিনি। একটু অলক্ষ্যে রয়ে গেলেন ‘রক্তের অক্ষরের জননী’। রক্তের অক্ষর দিয়ে আমি তার কথাসাহিত্যকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি। আমি তাকে যেভাবে পড়েছি বা আমার সংবেদে তার সাহিত্যকর্ম যেভাবে ধরা পড়েছে, আমি তার কথা বলতে চাইছি।

মতান্তরের সুযোগ খুব একটা থাকার কথা নয়, কিন্তু সংযুক্তির সুযোগ আছে।

সে কাজটি গবেষকদের।

উৎপল দত্ত : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares