প্রবন্ধ : একানব্বইতম জন্মদিনে : আহমদ রফিক : নাজনীন বেগম

প্রবন্ধ

একানব্বইতম জন্মদিনে

আহমদ রফিক

নাজনীন বেগম

আহমদ রফিক। এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব তার ৯১তম জন্মবার্ষিকীর স্বর্ণদ্বারে। বৃহৎ জীবনের হরেক রকম কর্মদ্যোতনায় সিদ্ধ এই লড়াকু মানুষটি দেশপ্রেম আর আধুনিক ও আদর্শিক চেতনায় পরিপুষ্ট এক গুণীজন।  ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্ম । একজন চিকিৎসক হয়েও মানবসেবামূলক এই আঙিনাকে পাশ কাটালেও সাধারণ মানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উজাড় করে দিতে দ্বিধাহীন ছিলেন। সঙ্গত কারণে অর্থবিত্তের মোহ কখনও সেভাবে জীবন ও জীবিকায় প্রভাবিত করতে পারেনি। চৈতন্যের এমন দৃঢ় শক্তি লালন করাই শুধু নয় বৈষয়িক বৈভব থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা এই আলোকিত মানুষটি নিঃসঙ্কোচে, নির্দ্বিধায় জীবনের কঠিনতম পর্বগুলো পার করেছেন কোন গড্ডলিকার স্রোতে গা না ভাসিয়ে। নিজের মতো করে মাতৃভাষা এবং স্বদেশ প্রেমের যে ব্যঞ্জনা জীবন ও সাহিত্যে তা সত্যিই এক অনন্য ব্যক্তিক শৌর্য।

কুমিল্লা শাহ্বাজপুর গ্রামে জন্ম নিলেও উপমহাদেশীয় উত্তাল স্রোতে লেখাপড়ার পর্বটি শেষ করতে হয় দুই বাংলার বিভিন্ন জায়গায়। শিক্ষার্থী পর্যায়ের নিজের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে এমন বরেণ্য মানুষ স্মৃতিচারণে স্মরণ করতে চান পরাধীন ভারতের হরেক রকম বিপর্যয়। সেই বেসামাল অস্থির পরিবেশে শৈশব-কৈশোর পার করতে গিয়ে স্বাধীনচেতা মনোবৃত্তিতে স্বদেশ প্রেমের অনমনীয় বোধ ভেতর থেকে উদ্দীপ্ত হতে থাকে। ফলে ছাত্র জীবনে সাহিত্য ও রাজনৈতিক সচেতনতাকে লালন-ধারণ করেছেন।

তীক্ষè মেধাবী এই চিকিৎসক তার শিক্ষাজীবনের পালাক্রমেও যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী কিংবা সরাসরি অংশীদার হয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অবিভক্ত ভারত কর্তনকে এই উদীয়মান তরুণ কখনও মানতে পারেননি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর এমন বীভৎস আক্রমণ আহমদ রফিক আজও আন্তরিকভাবে তাকে অযৌক্তিক বলেই মনে করেন। এই অযাচিত বিভাগের সামান্যতম অপরিহার্যটা ছিল না বলে তৎকালীন সময়ে যা ভাবতেন এখনও সেখান থেকে সামান্যতম চ্যুত হননি। শুধু তাই নয় এমন অভাবনীয় দুর্যোগকে দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ ট্র্যাজেডি হিসেবেও মনে করেন। স্মৃতিতে আজও ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে দেশ বিভাগের আগ মুহূর্তে ১৯৪৬ সালের সেই ভয়াবহ উগ্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ধর্মীয় বিভাজন কিংবা বিদ্বেষ সর্বসাধারণের মঙ্গল সাধনে আসলে কোনো কল্যাণকর নির্দেশনা দিতে পারে না। বিজ্ঞ এই সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন আজও আমরা সেই দ্বিধাবিভক্ত উগ্র মৌলবাদের নিঃশর্ত বলি। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ যখন মিলনের সুস্থ স্বাভাবিক পথকে ব্যাহত করে তেমন অশনিসংকেত দীর্ঘকাল সাধারণ জনগণকে বয়ে বেড়াতে হয়। উচ্চাসনে বসা রাষ্ট্রীয় কর্ণধার কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের চারপাশও নিরাপদ এবং নিশ্চিত পরিবেশ দৃশ্যমান হয় না। যে কলঙ্কের বোঝা আজও আমাদের ব্যক্তি আর রাষ্ট্রীয় জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে।

১৯৪৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইএসসি পাস করে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়নের সুযোগ পেলে সেই পালাক্রমও নির্বিঘ্ন হয়নি। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ্্ কর্তৃক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে উর্দু ঘোষণা দেওয়ার অযৌক্তিক দাবিতে অন্য অনেকের মতো তরুণ আহমদ রফিক ও মাতৃভাষার সম্ভ্রম রক্ষার্থে দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেন। সেদিনের সেই  উত্তাল পাকিস্তানের এক তরফা শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তিনিও প্রতিবাদে সোচ্চার হন। দেশ বিভাগের পর পরই এমন অনিবার্য সামাজিক অস্থিরতায় সময়মতো চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ সমাপ্ত করতে পারেননি। ১৯৫৮ সালে চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করলেও কর্মজীবন চলে ভিন্ন ধারার সাহিত্য, সংস্কৃতি আর শিল্প চর্চায়।

ইতোমধ্যে  ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এই ভাষাসৈনিকের সরাসরি সম্পৃক্ততা দীর্ঘ জীবনের এক ঘটনাবহুল অধ্যায়। দেশ বিভাগের আগে এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক, প্রগতিশীল মানুষটি বাম রাজনীতির আদর্শে  নিজের গন্তব্য নির্ধারণ করেন। ফলে ছাত্ররাজনীতিতেও তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা তৎকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপরম্পরা। ভাষা আন্দোলনের একেবারে গোড়া থেকেই লড়াই সংগ্রামে সরাসরি অংশ নিয়ে ভাষাসৈনিক হিসেবে ইতিহাসের অংশীদার হয়ে আছেন। তেমন গৌরবময় ঐতিহাসিক কালপর্ব আজও স্মৃতির মিনারে জ্বলজ্বল করে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের শুরু থেকে এই তরুণ প্রজন্মের বলিষ্ঠ কর্মযোগ তাকে মহান মাতৃভাষা সুরক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে অধিষ্ঠিত করায়। যা যে কোনো লড়াকু মানুষের জীবনে অভাবনীয় প্রাপ্তি। সংগঠনের পক্ষ থেকে আহমদ রফিক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র নেতৃত্বের ভূমিকায় নেমে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের দায়দায়িত্ব পালন করতে অকুণ্ঠিত ছিলেন। ঐতিহ্যিক এই আন্দোলনে তাঁর সরাসরি অংশ নেওয়া তৎকালীন গৌরবময় পর্ব আজও ভেতরের সমস্ত শুভবুদ্ধি দিয়ে লালন করেন। এই সংগ্রামী ভাষাসৈনিক মনে করেন ভাষা নিজস্ব সম্পদই শুধু নয়, ঐতিহাসিক পটভূমিকায় এর সাংস্কৃতিক দ্যোতনাও অতুলনীয়। মায়ের ভাষা, মুখের প্রকাশ শক্তি তার সঙ্গে আবহমানকালের যে দৃঢ়বন্ধন সেটাই যে কোনো দেশের নির্ণায়ক বৈভব। তাঁর মতে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করেছে মাতৃভাষাকে সম্বল করেই প্রতিনিয়ত চর্চার মাধ্যমে। এমনকি বিজ্ঞানের আবিষ্কারসমৃদ্ধ আলোকিত জগতও মাতৃভাষার অনুষঙ্গ হতে না পারলে সার্বজনীন অর্জন সম্পূর্ণ হয় না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এমন বিশ্বাসে তাঁর জনকল্যাণমূলক সর্ববিধ কর্মে প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের পরের সংগ্রামী ধারাগুলোতেও এই রাজনৈতিক সচেতন প্রাজ্ঞজনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই সব লড়াকু অভিযাত্রায় নিজেকে শামিল করতে গিয়ে আটক হওয়ার মতো পরিস্থিতিও সামলাতে হয়। ফলে সম্মুখ লড়াই থেকে নিজেকে আড়াল করলেও গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল বহু আন্দোলনের সহযোদ্ধা হয়েছেন। পাশাপাশি সাহিত্য আঙিনায় নিজের অংশীদারিত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীতে বিশেষ ভূমিকাও রাখেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে যে সাংস্কৃতিক জোটবদ্ধ সংগঠন বিভিন্ন কর্ম সম্পাদনে উদ্যোগী হয় সেখানে এই রবীন্দ্রভক্ত, অনুরাগীও নিজেকে একান্তভাবে সংযুক্ত করেছিলেন। এই সব আন্দোলন- সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর চিকিৎসক হওয়ার শিক্ষাজীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৫৮ সালে। এ ছাড়া ’৬০-এর দশকের হরেক রকম যৌক্তিক রাজনৈতিক সংগ্রামের ব্যাপারে ছিল নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন। আর যুক্তিনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় প্রবন্ধের সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়তে থাকে যেখানে আজও তিনি স্বচ্ছন্দ এবং নিরন্তর। শুধু যে অবাধ ও মুক্ত মনে লেখনী শক্তিকে অবারিত করেছেন তা কিন্তু নয় প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত  রেখে উদীয়মান তরুণ লেখকদের লেখা ছাপানোর দায়িত্ব নেওয়া সে সময়ের এক অবিস্মরণীয় কর্মযোগ। ষাটের দশকে নাগরিক সাহিত্য পত্রিকা বের করা, বিজ্ঞান বিষয়ক কাগজ ও পরিভাষার ওপরে সংকলন বের করাও তৎকালীন পর্বের উল্লেখযোগ্য কাজ। স্বাধীনতার বছরে প্রতি মাসে সুজনেষু নামে এক ছোট্ট সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। মাতৃভাষার পরিশীলিত চর্চার সঙ্গে ক্রমান্বয়ে মিলেমিশে একাকার হয়েছে এই সুলেখকের সৃজন ও মনন দ্যোতনা। পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি, বৈষয়িক বৈভবের হাতছানিকে দুঃসাহসিক মনোবলে পাশ কাটিয়েছেন।  তার পরেও কোনো ধরনের অপূর্ণতায় চিত্ত বিচলিত হয়নি। প্রতিদিনের সহজ, সরল যাপিত জীবনের  আকাক্সিক্ষত জগৎ ছিল খুবই ছোট। যেটুকু প্রয়োজন  তার বাইরে কখনই পা রাখেননি। নির্বিঘ্ন আর নিরুপদ্রব জীবনের দীর্ঘ ধারায় সমাজ সংস্কারের নানা অসঙ্গতিতেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন, হতাশায় নিজের মনন ও মেধাকে তীক্ষè করেছেন  দেশে ও মানুষের প্রতি সচেতন দায়বদ্ধতায় এই কলমযোদ্ধা আজও নিয়তই শানিত হচ্ছেন। নিজেকে নিয়ে তেমন ভাবনার বিষয় মাথাচাড়া দেয়নি বরং দেশমাতৃকার ওপর যে অন্যায়-অবিচার হরহামেশাই ঘটে যাচ্ছে যার নিঃশর্ত বলি হচ্ছে অসহায়, নিরীহ মানুষ সে কষ্টে সব সময় তাড়িত হয়েছেন। বিশেষ করে যে সাম্প্রদায়িক দাবদাহে ’৪৭-এর অবিভক্ত ভারত কর্তন যা কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি তারই আরও উন্মত্ত উত্থানে সরল জীবনবোধ মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় প্রতিনিয়তই। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে কতখানি নিরাপদ আর নিশ্চিত করেছে তেমন প্রশ্নের সদুত্তর আজও খুঁজতে হয় এই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট, মার্কসীয় অর্থনীতিতে আস্থাভাজন এমন মানবিক মানুষটিকে। আলাপকালে বলতে দ্বিধা করেননি মানুষের ওপরে অন্য কোনো কিছুর স্থান অন্যায় শুধু নয় মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ও। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষের অসৎ ও দুষ্ট রাজনীতি পুরো সমাজ এবং সিংহভাগ গোষ্ঠীর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে সময় লাগেনি। যা পুরো উপমহাদেশের জন্য এক মহাসংকট, অশনিসংকেত। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা অনেক দেশেই আজ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতি তৈরিতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। বঙ্গবন্ধু যে আদর্শিক চেতনায় মুক্তবুদ্ধি আর সর্বমানুষের মিলন সুর ধ্বনিত করেছেন তা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত, মারাত্মকভাবে বিপন্ন। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র আজ  দিশেহারা, পথভ্রষ্ট। আকাক্সিক্ষত স্বপ্নের দুয়ারে যেতে আরও কতকাল অপেক্ষমাণ থাকতে হবে তা ভাবতেও তিনি শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ভাবেন কীভাবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তৈরির অপার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো তা মনোজগতে আলোড়ন জাগায়। শুধু তাই নয় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার কূটকৌশলকেও কখনও মানতে পারেনি। ধর্ম ব্যক্তিক, আত্মিক আর বিশ্বাসের ব্যাপার যা কোনো মানুষের একান্ত নিভৃতবোধ। যাকে অন্তরের মধ্যে লালন করেও সর্বমানুষের মিলন শক্তিকে জোরদার করা যায়। বিশ্বব্যাপী ছড়ানো এই ধর্মীয় মৌলবাদ বিশ্ব শান্তিরও মূল প্রতিবন্ধক। যাকে কঠোরভাবে প্রতিহত করতে না পারলে সামনে আরও ভয়ঙ্কর বিপদ মোকাবেলা করা বিচিত্র কিছু নয়। দুনিয়া তোলপাড় করা এই জঙ্গি আগ্রাসনকে মনুষ্যত্বের মাপকাঠিতে বিচার-বিশ্লেষণের বিবেচনায় এনে তাকে প্রতিরোধ করা সময়ের দাবি। ’৪৭-এর অনাকাক্সিক্ষত দেশ বিভাগের মূল স্রোতে বহমান সাম্প্রদায়িক বিভাজন উপনিবেশবাদের এক সুদূরপ্রসারী কূটকৌশল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভারতবর্ষ ছাড়ার আগে যে ভেদবুদ্ধি বিভাজন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর সহিংস প্রভাব বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে যায় তেমন দুষ্টচক্র থেকে আজও আমরা মুক্ত হতে পারলাম না। ব্রিটিশ রাজশক্তি পরাধীন ভারতে নিজেদের স্থায়ীকরণেই শুধু নয় দ্বিধাবিভক্ত এই সম্প্রদায়কে আরও বিপর্যস্ত করতে তাদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র এখানে চাপিয়ে দিয়ে যায়। যার রেশ আজও টেনে যেতে হচ্ছে। এই অভিজ্ঞ সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন নিজেদের মধ্যে সচেতন বোধ, মুক্ত সংস্কার তৈরি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের এমন সর্বনাশা দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেক সময়ক্ষেপণ হবে। স্বাধীন বাংলাদেশও তার প্রত্যাশিত আকাক্সক্ষাও স্বপ্নে যেতে পারল না কেন তারও একটি ঐতিহাসিক বিবর্ণ অধ্যায় আছে।

মার্কসীয় শ্রেণিহীন সমতাভিত্তি অর্থনীতি নিয়মিত চর্চা করা আহমদ রফিক মনে করেন শ্রেণিবিভক্ত সমাজের কর্তৃত্ব ও আধিপত্যকারী শ্রেণির মতাদর্শ প্রাধান্য পায়। শুধু তাই নয় সমাজে সংস্কারেও এর প্রভাব দারুণভাবে স্পষ্ট, প্রতিভাত। বৈষম্যহীন আর্থ-সামজিক ব্যবস্থার সুচিন্তিত অভিব্যক্তি ধারণ করতে গিয়ে তিনি মনে করেন শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের অধিকারকে সার্বজনীন করতে গেলে সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র্র রূপায়ণের বিকল্প অন্য কিছু নয়। মার্কসবাদী চর্চায় ঋদ্ধ এই গুণী ব্যক্তিত্ব নিজের যাপিত জীবনের আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে বস্তুবাদী সমাজ নিরীক্ষক কাল মার্কসের আদর্শকে এখন অবধি লালন-ধারণ করে যাচ্ছেন। সেভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনও কর্মপ্রবাহ কল্যাণ আর মঙ্গলময় হয়ে উঠবে বলে দৃঢ় মত পোষণ করেন।

এই শৈল্পিক দ্যোতকের সৃষ্টিশীল জগৎ বহুমাত্রিক বিষয় সম্ভারে সিদ্ধ। অনেক সমৃদ্ধও যৌক্তিক গ্রন্থের রূপকার হিসেবে তার পরিচিতও বিস্তৃত। ভাষা সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত সত্তা ভাষা আন্দোলনের ওপরও তার বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তৈরি হয়েছে বুদ্ধি, যুক্তি, মেধা ও মননের এক অপরিহার্য সৃজনসৌধ। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি এবং গ্রহণযোগ্যতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতেই তার এই সচেতন প্রয়াস। রবীন্দ্রনাথের সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাহিত্যে নারীদের প্রতি কবির দায়বদ্ধতা, প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাত্রা, গ্রামবাংলার অবহেলিত পশ্চাৎপদ কৃষিও হতদরিদ্র চাষা নিয়ে কবির বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক চেতনাও এই বিদগ্ধ রবীন্দ্র গবেষক ও বিশ্লেষকের সমৃদ্ধ রচনায় সাধারণ পাঠক রবীন্দ্র অনুভবে পরিপুষ্ট হয়েছে, মুগ্ধতার আবেশে কবিকে যথার্থভাবে চেনাতে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করেছে। নান্দনিক সুষমায় আপন শিল্পীসত্তা বিকাশ করাই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে ভরিয়ে দেওয়া ছাড়া পাঠকপ্রিয়তায় রচনা সম্ভার মানুষের কাছে চলে আসা তাও এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। ভাবতে অবাক লাগে রবীন্দ্রনাথের মহাপরিকল্পনা গোরার মাধ্যমেই কবির সৃজনযজ্ঞের জগতে অনুপ্রবেশ। সত্যিই দুঃসাহসিক মনোবিকাশের সুস্থির অনুভবে ললিতার মতো প্রথাভাঙা নারী চরিত্রের প্রতি আকর্ষণ বোধ সেও যেন মার্কসবাদ চর্চার পরিশীলিত অভিব্যক্তি ও চৈতন্যের দৃঢ়তা। এর পরে আর অন্য কিছু ভাবার অবকাশই হয়নি। প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রচর্চা পাঠ, রবীন্দ্র অনুভবের গভীরে নিজের মনন ও মেধাশক্তিকে পর্যায়ক্রমিক ধারায় বিকশিত করা বৃহৎ জীবনের এক সমৃদ্ধ পর্ব। ’৯১-এর কোঠায় পা দেওয়া এমন ঐশ্বর্যিক জীবন ও কর্মপ্রবাহের নিরন্তর মহিমায় পরিপুষ্ট হওয়া এই বিজ্ঞজনকে জন্মোৎসবে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও অন্তনিঃসৃত শুভ কামনা। তার লেখক সত্তা আরও বহুদিন আমাদের মানসিক জগৎকে প্রতিনিয়তই শানিত করবে- এমন শক্তি ও ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার প্রতি পাঠকদের সবিশেষ প্রার্থনা।

তাঁর একানব্বইতম জন্মদিনে আমাদের অভিনন্দন।

নাজনীন বেগম : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares