প্রবন্ধ : যেন স্বপ্ন বুনি আষাঢ়-শ্রাবণে : শামস্ আল্দীন

প্রবন্ধ

যেন স্বপ্ন বুনি আষাঢ়-শ্রাবণে

শামস্ আল্দীন

কবিতার ছন্দে ভর করে চলাটা যেন আমাদের সংস্কৃতির নিয়ম। অনেক কাল আগে থেকেই আকাশ বৃষ্টি দৃষ্টি দিয়েছে আমাদের সাহিত্য। ভাবালুতা যেন আমাদের নিত্যদিনের জীবনবোধ। সন্ধ্যা পারের ঝুম বৃষ্টি আজও ছেদ চিহ্নে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। কত প্রতীক্ষা ও তৃষ্ণার অবসান ঘটে এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়া আহ্লাদ। নতুন রূপে প্রাণ পায় ফিরে যৌবনে জাগ্রত হয় শস্য-শ্যামল প্রকৃতি। বর্ষার কথা বলছি। সমস্ত জীবনবোধের কোষগুলো ফিরে আসে বারংবার তোমার আগমনে। আজকাল বড্ড রকমের আনমনে আচমকা অপ্রস্তুত হয়ে যায়, যেন কেউ এসে জাগিয়ে দেয়। স্বপ্নকারিগর হয়ে ওঠা বর্ষা তেমন করেই আমাদের সুস্থ বাসনাকে নাড়িয়ে দেয়। বাঁচার রসদ হয়ে ফিরে আসে। দিনের শেষান্তে যেন অবিরাম বাঁচার জন্য লড়াই করে। গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টিফোঁটা সোনা রঙে আবির মাখায় সোনালি সকালে। নতুন প্রেমের সম্ভাবনা দুয়ার খোলে একপলকে। আমরা সম্ভাবনায় বাঁচি প্রতিদিন। বৃষ্টি ছড়ানো পিচ্ছিল পথে আলতো করে পা ফেলি। রোদ ঝলকে চমকে উঠি। ভালোবাসায় প্রাণ ফিরে পায়। বর্ষাকালে আমরা বাঁচি নানা প্রত্যাশায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিন্নপত্রের আট নম্বর চিঠিতে বর্ষাকে ঘিরে বলেছেন, ‘আজকাল এখানে বর্ষা পড়েছে। ঘন মেঘ ও অবিরাম বৃষ্টি। এই সময়ই তো বন্ধু সংগমের সময়। এই সময়টা ইচ্ছা করছে, তাকিয়ে আশ্রয় করে পড়ে পড়ে যা-তা বকাবকি করি। বাইরে কেবল ঝুপ্ ঝুপ্ বৃষ্টি, ঝন্ ঝন্ বজ্র, হু হু বাতাস….।’ চমৎকার বর্ণনা। এমন ভাবেই আমাদের পাল্টে দেয় বর্ষা। অসংখ্য ক্লেশ থেকে আমাদের মুক্তি মেলে। হঠাৎ করেই হারিয়ে যেতে নেই কোনো মানা। প্রকৃতি দেবী যেন ফিরে পায় তার চেহারা। নতুন করে রঙ ছড়ায় প্রতি শাখে। শহরের অট্টালিকাসম প্রাসাদের বারান্দা বাগানের গাছ-ফুলে যেন তারার মেলা দেখা যায়। ঘনায়মান আকাশ জোছনা সাত রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। পথ চলতি মানুষগুলোর চোখে উদ্বিগ্নতার লেশমাত্র দেখা যায় না। চঞ্চলতা ও স্নিগ্ধতা যেন তার নিত্যসঙ্গী। এমনই নিয়ত ও অবিরত আষাঢ় ভেলায় আমাদের ভেসে চলা। যেন ‘বেলা যে পড়ে এল জল কে চল।’ আমাদের জীবন পরিবর্তনে অনেকগুলো স্বপ্ন ও প্রত্যাশা বাঁচতে শেখায়। ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বসন্তকে ঋতুর রাজা বলা হলেও প্রাণোচ্ছ্বল উন্মাদনা বর্ষাতেই পরিলক্ষিত হয়। যেন মন ভেজে বাঁচার আকুতিতে।

বর্ষা আসার অপেক্ষায় থাকা কৃষক নতুন করে স্বপ্ন বোনে অন্তরে। মাঠে-ঘাটে ভেজাজীবনে যেন প্রাণ ফেরে। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় উছলে ওঠে বর্ষার আগমনে। মাছের আনন্দ-লাফ জীবন বৈচিত্র্যের আরেক সৌন্দর্য-স্বপ্ন। আমাদের কৃষক সমাজ ফসলের মাঠে ফিরে পায় নিজেকে। শরীর পায় শান্তির পেলবতা। পাটের আঁশ ছাড়ানোর সে কী মনোহর দৃশ্য। কৃষকের মাঠে লাঙল চালানো গরুর জোয়ালে ভর করে ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ গানের মাঝে হারিয়ে যাওয়া। আমরা যেন স্বপ্ন বুনি আষাঢ় শ্রাবণে। বন্ধুর আত্মা যেন বন্ধুকে খুঁজে ফেরে বারবার। এ সবই বর্ষাতেই সম্ভব। শক্তিহীন প্রাণ যেন শক্তি ফিরে পায় অন্তরে। অব্যক্ত কথামালা প্রিয়জনে ঠাঁই খোঁজে। নতুন সংসারে বন্ধু যেন লালপেড়ে শাড়িতে উচ্ছ্বাস ফিরে পায়। গ্রাম্য মেঠোপথের কিনারে পানিভর্তি বিস্তীর্ণ মাঠ ভাসায় পাশের গ্রাম-পাড়া-মহল্লা। তবুও যেন কোনো এক অদৃশ্য তৃপ্তি ঘিরে থাকে অন্তরে। সমাজ সংস্কৃতির নিয়ম যায় পাল্টে। উচ্ছল মুখের চাহনিই বলে দেয় নিত্যদিনের চলার পথ। এসবই বর্ষাকে ঘিরে আবর্তিত। পুকুর ধারে গ্রাম্যশিশুর উপদ্রব আর কলাগাছের ভেলায় ভেসে চলা প্রাপ্তিই যেন বর্ষা।

সাহিত্যের প্রতিটি শাখাতেই বর্ষার গান, কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটোগল্প ও নাটক রচিত হয়েছে। আমরা বর্ষাবরণ উৎসব ও বিভিন্নভাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যাপন করে থাকি। এ আয়োজনে শুধু মানসিক খোরাক না আত্মিক টানও অনুভব বটে। জীবনের জলছবিতে কত না চিত্রই অঙ্কিত হয়, খেয়ালে-বেখেয়ালে আয়েশি চিত্তে আমরা তা লালন করে থাকি। বাঙালি চিরকালই উৎসব ও আনন্দ প্রিয়। যে কোনো কিছুতেই আয়োজন ও আনন্দের মাধ্যম খোঁজে। শিল্প ও সংস্কৃতির আয়োজনে ছয় ঋতুই সমান গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। এই মানসিক উন্নয়ন ও চিন্তা আমাদের দিয়েছে বৈচিত্র্য।

জীবনের জটিল আবরণ মুক্ত ভালোবাসা ও মুগ্ধতা অন্তর্গত স্বপ্ন আমাদের সবাইকে বাঁচতে শেখায় ও ভালোবাসতে শেখায়। সেই স্বপ্নের এক ফোঁটা ছোঁয়া কখনও বৃষ্টি, কখনও আকাশপ্রদীপ আবার কখনও-বা বর্ষার মতো এক ফোঁটা বৃষ্টি। ভালোবাসতে চোখের জল লাগে, লাগে আত্মিক তৃষ্ণা। আরও লাগে জীবনানন্দের-‘পৃথিবীরে ক্লান্ত বেদনারে ঢেকে আছে; দেখিয়াছি বাসমতী, কাশবন, আকাক্সক্ষার রক্ত, অপরাধ মুছায়ে দিতেছে যেন বারবার- কোন্ এক রহস্যের কুয়াশার থেকে যেখানে জন্মে না কেউ, যেখানে মরে না কেউ, সেই কুহকের থেকে এসে রাঙা রোদ, শালিধান ঘাস, কাশ, মরালেরা বারবার রাখিতেছে ঢেকে আমাদের রুক্ষ প্রশ্ন, ক্লান্ত ক্ষুধা, স্ফুট মৃত্যু…।’ এমনিভাবেই আমাদের জীবন ঢেউ  তোলে, আবার কখনও-বা আছড়ে পড়ে বেঁচে থাকার নিরন্তর সম্ভাবনার দুয়ার খুঁজে ফেরা।

আকাশমুগ্ধ বৃষ্টি যখন বর্ষার আলো-আঁধারিতে আমাদের মন রাঙিয়ে তোলে, মন ক্ষুধা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয়। ছোটো আঙিনায় ফুলের গাছগুলো বর্ষায় যৌবনপ্রাপ্ত কিশোরীর মতো আকাশপানে যখন মুখ করে থাকে, তখনই আনমনে জেগে ওঠে কবি-মন। সম্ভাবনার দুয়ার যায় খুলে। প্রেয়সী কাছে আসে, বিবর্ণ শাড়িটাও তখন যেন রঙিন হয়ে ওঠে মনছায়ায় ও ছোঁয়ায়। হয়ে ওঠে একটি বিখ্যাত কবিতা। ঝুম বৃষ্টির শব্দ নিয়ে মন আকাশে অশ্রু ঝরে ভালোবাসার রঙধনুতে। ফিরতে থাকি মন আবেশে। জীবনের সন্ধ্যা আজও মেলে হিসাবের রাজধানীতে। হারিয়ে বসি অনেক কিছুই অজানাতে। ভাবতে থাকি। এমনই জীবন বাস্তবতার রঙিন চশমা আমরা সবাই পরতে চাই। প্রতিনিয়ত ভালো থাকার ভান থেকে মুক্তি খোঁজে আমাদের কর্দমাক্ত মন। এমনই মুক্তির দিশারি হিসেবে বর্ষা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বর্ষাকালে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ নাম না-জানা সব নদীতেই পানি বাড়ে। যেন নতুন করে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। ইলিশ থেকে শুরু করে অসংখ্য মাছ বাজারে আসতে থাকে। মাছ ব্যবসায়ীরা আর্থিক সচ্ছলতা লাভ করে। ভরা বর্ষায় নদীতে, খালবিলে ও হাওড়ে ছোট ছোট নৌকা ও ডিঙার পাশাপাশি লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজের শোভা বৃদ্ধি পায়। আমরা অনুভব করি জীবনের প্রাণস্পন্দন। সে কী মনোহর দৃশ্য, দুই অঞ্চলের বা দুই গ্রামের সংযোগ সেতু যখন নৌকা হয়, চোখে দেখার পর মন জুড়িয়ে যায়। ঢেউ কখনও আছড়ে পড়ছে আর নৌকা শূন্যে উঠে যাচ্ছে, আবার কখনও-বা মৃদু পানির আছড়ে পড়াতে নৌকাযাত্রীরা ভিজে যাচ্ছে। এসবই বর্ষাকালেই সম্ভব। ইঞ্জিনচালিত ছোটো ছোটো নৌকাবোঝাই ইলিশ তীরে এসে ভিড়ছে, খালাসিরা খালাস করছে ইলিশ। বর্ষারোদের তাপ কম। তারপরও হালকা রোদে ইলিশের শরীর সাদা ডায়মন্ডের মতো চিক চিক করছে। এ রকম অসংখ্য বিষয় ও দৃশ্য আমাদের জীবনকে নান্দনিক ও শৈল্পিক জীবনবোধ বিশ্বাসী করে তোলে। নদী-তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষগুলোও ভাঙনের মধ্যে যেন সুখ পায়। অতল জলরাশি আর আকাশচুম্বী ঢেউ পাড়-সংলগ্ন সেই মানুষগুলোকে যেন প্রাণ ফিরিয়ে দেয় এমন দৃশ্যে। এর প্রভাব ও সৌন্দর্য ‘ছিন্নপত্রে’ প্রতিফলিত হয়েছে, জানা-অজানার দ্বন্দ্বে কবি মন ব্যাকুল। তবুও তাতেই আনন্দ। এই আনন্দকেই জীবনের সঙ্গী করে কোমল ভাষার সৌন্দর্যে; পদ্মার সৌন্দর্যের উপর আলাদা মাত্রা যোগ করেছেন। ছিন্নপত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্র-পক্ষকে তিনি এতই ভালোবেসেছেন যে, তা তিনি সহজ ভাষায় পরিষ্কার বলেও দিয়েছেন- ‘বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড়ো ভালোবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত আমার তেমনি পদ্মা যথার্থ বাহন।’ (ছিন্নপত্র-৭৯)। এমনভাবেই আমরা আমাদের ব্যক্তিজীবনের নানান সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ঘিরে বেঁচে থাকি বর্ষার আগমনে।

সর্বোপরি জীবনপথের সমস্ত উপাদানে যদি আমরা আলোর সন্ধান করি, অবশ্যই সফল হবো। এমনই বিষয়ের তাৎপর্যে বর্ষা আমাদের অনুভূতির আরেক স্পর্শ, যা চিরন্তন ও নতুনত্বে আলোকোজ্জ্বল।

শামস্ আল্দীন : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares