ভ্রমণ : ভেনিস আমার স্বপ্নের ভেনিস : মাহজাবীন জুন

ভ্রমণ

ভেনিস আমার স্বপ্নের ভেনিস

মাহজাবীন জুন

ইউরোপের মধ্যযুগের সেই ঘোর অন্ধকার থেকে পুনরায় আলোয় ফিরে আসা ভেনিস যেখানে আরও কিছু শহরের সাথে রেনেসাঁর উন্মেষ ঘটেছিল। বিখ্যাত সব শিল্পীর আঁকা ছবির শহর আমার স্বপ্নের ভেনিস, কাল দেখতে যাব ভাবতেই উত্তেজনায় আমার সারারাত ঘুম আসেনি! অফিস তো আর আমার মতো ভ্রমণপিয়াসী নয় তাই মাত্র দিন পনেরোর ছুটি জুটল আর তাই নিয়ে ছুটে এসেছি ইতালি দেখতে। তারই অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু হলো ভেনিসের পথে। রোমের সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন টারমিনি থেকে সকাল ৭টায় ইতালির সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন ইউরোস্টার ছাড়ল ভেনিসের উদ্দেশ্যে, চার ঘণ্টার মধ্যে আমাদের সে পৌঁছে দেবে গন্তব্যে। জানালা দিয়ে দেখছি প্রকৃতির কী বৈচিত্র্যময় রূপ! ভোরের সূর্য আর হলুদ সূর্যমুখীর রঙে মাখানো আদিগন্ত মাঠ। সবুজ জলপাই বন, বিশাল এলাকা জুড়ে দ্রাক্ষাকুঞ্জ যা থেকে তৈরি হয় ইতালির বিখ্যাত ওয়াইন। পানিতে টলটল ছোট-বড় নদীর ওপর লোহার ব্রিজগুলো পেরিয়ে যাচ্ছি এক লহমায়। কাচের জানালা ভেদ করে কোনো আওয়াজ আসছে না তবে নিশ্চয় ভীষণ গম গম আওয়াজ হচ্ছে যেমনটি হয় আমাদের ভৈরব বাজারের সেতুতে। শেক্সপিয়ারের সাহিত্যে উল্লেখিত ছোটো ছোটো কত ঐতিহাসিক শহর, কত লোকালয় যেমন ফ্লোরেন্স, বোলোনা পার হয়ে যাচ্ছি এক ঝটকায়। ইতালিকে দু ভাগ করে রাখা সুউচ্চ আপেনাইন পর্বতশ্রেণি যা উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত সেটা আমাদের ডান দিক দিয়ে আমাদের সাথে সাথেই যেন চলছে। পাহাড়ের ওপাশে ভেনিস, আর আমাদের ট্রেন এপাশে। এবার সময় হলো ওপাশে যাবার আর তার জন্য একটার পর একটা টানেল অতিক্রম করতে লাগলাম, সেই পাহাড়ভেদি টানেলগুলোর কোনোটা ছোটো, কোনোটা বিশাল লম্বা এবং এতই লম্বা যে, এই দ্রুতগামী ট্রেনও যেন অল্প সময়ে বের হতে পারছে না পাহাড়ের পেটের ভেতর থেকে। একটু আলোতে এসেই আবার নিকষ কালো অন্ধকারের গভীরে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। কেমন যেন ভয় করছিল, মনে হচ্ছিল এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটলে আমি আর বের হতে পারব না এই অন্ধকার ঠেলে! যাক পাহাড় পেরিয়ে স্থায়ীভাবে আবার আলোয় এলাম। অনেক সকালে উঠেছি, মাথা ব্যথা করছে, ঘুম ঘুম পাচ্ছে, ঝিমুনি আসছে। এ সময় ওরা খুব ছোট্ট কাপে করে সবাইকে এক্সপ্রেসো কফি সার্ভ করল। ঘন কালো, দুধ-চিনি ছাড়া বিষের মতো তেতো কফিটা খাবার সাথে সাথেই ফ্রেশ হয়ে গেলাম, ঝিমুনি ভাবটা এক মুহূর্তে কোথায় যেন পালিয়ে গেল। এর আগে কী সব খাবার দিয়েছিল, জানালায় চোখ রেখে ওটা বের করে খাচ্ছি। আমার প্রিয় যানবাহন ট্রেন আর এত সুন্দর প্রকৃতির মাঝে থেকেও মনের ভেতর টেনশন কুরে কুরে খাচ্ছে, কোনো হোটেল বুকিং দেওয়া নেই। রোম থেকে চেষ্টা করেছিলাম, পাইনি সব বুকড্ জানিয়ে ছিল। হতেই পারে জুন মাস ট্যুরিস্ট সিজন। মেইনল্যান্ডে মেস্ট্রে শহরের স্টেশনটা পেরিয়ে উঠে পড়লাম ব্রিজে যা সংযুক্ত করেছে ভেনিসকে চার কিলোমিটার দূরত্বের প্রধান ভূখণ্ডের সাথে। সমুদ্রের মাঝে পিলারের উপর ব্রিজ, চারিদিকে খোলা কোনো রেলিং নেই। আর এই দ্বীপের দুই কিলোমিটার দূরত্বে খোলা সমুদ্র অড্রিয়াটিক সাগর। কাচের জানালার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে নীল পানি, তাতে কত রকম নৌযান। ছোটো-বড়ো জাহাজ, আবার তীব্রগতির স্পিডবোট তার সাথে কেউ কেউ স্কি করছে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে পানির উপর দিয়ে ঢেউ খেলিয়ে। মনে হচ্ছিল জানালাটা খুলে দেই, সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাক আমাকে। যদিও এসিতে বসে আছি, তার পরও সবসময় বাইরের প্রকৃতির ওপর দিয়ে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাসের ¯পর্শের আবেদন আমার কাছে অনেক বেশি। আমি নির্নিমেষ চেয়ে আছি সেই ফেনিল জলরাশিতে ভেসে থাকা অপরূপ সৌন্দর্যের দিকে, যে হাতছানিতে আমাকে টেনে নিচ্ছে নিশিতে পাওয়া লোকের মতো। দেখতে দেখতে ট্রেন থামল আমার স্বপ্নপুরী যার স্টেশনের নাম ভেনিজিয়া সান্টা লুসিয়া। স্টেশনেই দাঁড়ানো ছিল বিভিন্ন হোটেলের এজেন্ট। এক বুড়োমতো সদয় চেহারার লোকের সাথে আলাপ হলো। স্টেশনের খুব কাছেই মধ্যম মানের হোটেল যদিও ভাড়াটা একটু বেশি কিস্তু সুবিধার কথা চিন্তা করে ওটাই নিলাম। ডাবল বেডের রুম সাথে সকালের নাস্তা। বুড়ো ভদ্রলোকটির সাথে স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতেই পা থেমে গেল আমার। চোখের সামনে ভেসে উঠল ভেনিসের বিখ্যাত সেই গ্র্যান্ড ক্যানেল যার নাম কত লেখায় পড়েছি, কত ছবিতে দেখেছি, কত ছায়াছবিতে। সত্যি অপূর্ব সেই জলরাশি। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রস্থে বিভিন্ন স্থানে ৩০ থেকে ৭০ মিটার পর্যন্ত চওড়া গ্র্যান্ড ক্যানেল পুরো শহরটিকে দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছে। তবে তিনটি সেতুবন্ধনে এরা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত। রেলস্টেশন থেকে বেরোলেই যে সেতু তার নাম bridge of scalzi,, এরপর আকাডেমিয়া এবং সবশেষে বিখ্যাত রিয়াল্টো। scalzi সেতু পেরিয়ে মিনিট দুয়েক হেঁটে এলাম চিকন একটি খালের পাশ দিয়ে সিমেন্ট বাঁধানো পথ ধরে। লাল রঙের তিনতলা বাড়িটাই আমাদের হোটেল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রুমে ঢুকে ব্যাগ ব্যাগেজ রেখে বের হলাম খাবারের সন্ধানে। স্টেশনের কাছেই দেখেছিলাম পিজারিয়া যেখানে অর্ডার দেওয়ার সাথে সাথেই পিৎজা বানিয়ে দেয়। তাদের থেকে দুটো পিৎজা কিনে খেতে খেতে চারিদিকে চোখ বুলাচ্ছি। বহু পুরনো পুরনো সব গথিক ডিজাইনের সৌধ। কোনো কোনোটির কিছু অংশ পানিতে ডুবে আছে। মনে পড়ল ভেনিসের ইতিহাস। চারদিক থেকে জলবেষ্টিত ছোটো ছোটো দ্বীপের সমন্বয়ে সৃষ্ট অপরূপা ভেনিস, জালের মতো ছোট ছোট খাল দিয়ে তারা একে অপরের সাথে বিচ্ছিন্ন। আবার ৩৬৫টি ছোট ছোট সেতুবন্ধনে তারা একে অপরের সাথে আবদ্ধ। বর্বররা অর্থাৎ বার্বারিয়ান যোদ্ধারা যখন ইতালির উত্তর ভাগে আক্রমণ চালায় তখন স্পাইনা, আদ্রিয়া, আলতিনো প্রভৃতি বিভিন্ন নগরী থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নেয় এই ক্ষুদ্র দ্বীপগুলোতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভেনিস পরিণত হয় বিশ্বের এক বিস্ময় নগরীতে যা পত্তন করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছে অনেক খালের। আর বেঁচে আছে যারা তাদের মধ্যে দীর্ঘতম হলো গ্র্যান্ড ক্যানেল। এর থেকে বেরিয়েছে ৪৫টি ছোট ছোট শাখা ভেনিসবাসীরা বলে রি (rii), যাতে শুধু স্পিডবোট আর গন্ডোলা চলে। হঠাৎ নজরে এলো ছোট একটি সাইন বোর্ড লেখা ফেরোভিয়া- অর্থ স্টেশন। ওখান থেকে যে একতালা নৌযানগুলো ছেড়ে যাচ্ছে, তাকে বলে ভেপোরেট্টো অর্থ বাস, যাতে অনেক লোক চড়তে পারে, আর স্পিডবোটকে ওরা বলে গাড়ি। ওগুলো রেন্টে কারের মতো ভাড়া পাওয়া যায়। আর যারা ধনী ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত স্পিডবোটগুলোকে বলছে প্রাইভেটকার, কী আশ্চর্য! ভাবলাম বাসে করে পুরো ক্যানেলটা একটা চক্কর দিয়ে আসি তারপর ধীরে-সুস্থে সব দেখা যাবে। আমি অত্যন্ত চঞ্চল আর আমার স্বামী তেমনি ধীর-স্থির। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই টিকিট কেটে বাসে উঠে বসলাম। কিন্ত যে পথ দিয়ে বাস অর্থাৎ ভেপোরেট্টো যাচ্ছে তা গ্র্যান্ড ক্যানেল দিয়ে যাবার বিপরীত পথে, লিডো আর ভেনিসের প্রধান দ্বীপের মাঝখান দিয়ে। কিন্ত আমি চেয়েছিলাম গ্র্যান্ড ক্যানেল দিয়ে যেতে।

দূরে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। দেশ-বিদেশের বিশাল বিশাল ওশেন লাইনারগুলো এখান দিয়ে চলাচল করছে। মনে হচ্ছে এটা ভেনিসের একটি সমুদ্রবন্দর। এখানে কিন্তু বেশ বড় বড় ঢেউ, আমার ভীষণ ভয় করছিল। কারণ সাঁতার আমি জানি না। যেতে যেতে দূর থেকেই চোখে পড়ল ভেনিসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু প্লাজা সান মার্কো। আমাদের কথা ছিল বাসে করে একটা চক্কর দিয়ে হোটেলে ফিরে যাবো, কিন্ত সেই প্লাজা স্টেশনে বাস থামতেই আমি ওকে বললাম চল এখানেই নামি এটাই তো সেই বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র যা আমি ছবি ও সিনেমাতে অনেক দেখেছি আর ভ্রমণ কাহিনিতেও অনেক পড়েছি। ও আর কী বলবে, নামলাম। পাথর দিয়ে বাঁধানো চত্বর দিয়ে প্রবেশ করলাম বিশ্বখ্যাত প্লাজা সান মার্কোয়। দু’দিকে দুটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের মাঝে অপরূপ কারুকার্যমণ্ডিত সান মার্কো গির্জা যার একটি দিক সুদূর সমুদ্রের পানে চেয়ে আছে। ওই চত্বরেই অবস্থান করছে ইতালীয় তথা ভেনিজীয় স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শনসমূহ যেমনÑ ভেনিসের শাসক ডজের প্রাসাদ, সান মার্কোর গির্জার সুউচ্চ ঘণ্টাঘর (বেল ফ্রাই) এবং ঘড়ির মিনার। আমি অপূর্ব বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছি সেগুলোর দিকে। গির্জার প্রধান প্রবেশপথে ঢুকতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুদূর থেকে দৃশ্যমান ভেনিসের প্রতীকচিহ্ন সেই ঘণ্টা ঘর বা মিনার যা একশ’ মিটার উঁচু। নবম শতাব্দীতে প্রথম তৈরি হলেও বিভিন্ন কারণে বিধ্বস্ত হওয়া এই মিনার শেষ বারের মতো তৈরি হয় ১৯১২ সালে। এই বেলফ্রাইটি আরেকটি কারণে বিখ্যাত, তা হলো এই ঘর থেকেই গ্যালিলিওর চোখের সামনে তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল পুরো ভেনিস নগরী, এমনকি সুদূর আল্পস পর্বতমালা পর্যন্ত। ভেনিসের অন্যতম চিত্রাঙ্কিত মনুমেন্ট হলো ঘড়ির মিনার। আপাতদৃষ্টিতে একটি ভবনের মতো হলেও এর মাঝখানে রয়েছে লম্বা মতো একটি টাওয়ার, যাতে রয়েছে এক বিশাল ঘড়ি যা পনেরো শ’ শতাব্দীতে তৈরি। এই ঘড়ির ডায়ালে রয়েছে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রাশির ওপর চাঁদ ও সূর্যের পরিক্রমণ। এক ঘণ্টা পরপর ছাদের ওপর ব্রোঞ্জের তৈরি দুজন মুর দুদিক থেকে বিশাল এক ব্রোঞ্জের ঘণ্টায় আঘাত করে সময় ঘোষণা করছে। ঘণ্টা বাজানোর দৃশ্যটি দেখার জন্য বহু ট্যুরিস্ট অপেক্ষায় থাকে। অনেকের মতো আমরাও শুনলাম সেই ঘণ্টার ধ্বনি। তারপর সেই চত্বরের প্রধান আকর্ষণ সান মার্কো গির্জার প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা দু’জন। এই অপূর্ব কারুকার্য খচিত বিখ্যাত গির্জাটি ভেনিসের রাষ্ট্রীয় মঠই শুধু নয়, এটা ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতারও একটি নিদর্শন। সামনের দিকে পাঁচটি প্রবেশপথ পাঁচটি গম্বুজের সাথে মিলিয়ে তৈরি। প্রধান প্রবেশপথের ওপর লিবিরিও সালান্দ্রির অপূর্ব মোজাইকের চিত্রকর্ম। এখানে ঢোকার জন্য ড্রেস কোড আছে। ছেলে মেয়ে উভয়েরই হাতাকাটা গেঞ্জি এবং হাফপ্যান্ট পরে ঢোকা নিষেধ। আমরা ঢুকলাম বিনা বাধায়, আর অনেক ট্যুরিস্ট কারও কাছ থেকে চাদর নিয়ে হাত-পা ঢেকে প্রবেশ করছে! ভেতরে ঢুকলাম বিশাল আর অন্যান্য গির্জার মতোই। মোমবাতি জ্বলছে, বেশ অন্ধকার অন্ধকার। ছাদে সোনালি কারুকাজ এবং ঐ রঙেই ভেনিসের বিখ্যাত সব শিল্পীর আঁকা অসাধারণ ছবির সমাহার। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত-ক্ষুধার্ত, ওখানেই ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকলাম বসার জায়গা নেই, মানুষ গিজগিজ করছে। খাবার নিয়ে বাইরে বারান্দায় মাটিতে বসে পা ছড়িয়ে খাচ্ছি আরও পর্যটকদের মতনই, এমন সময় ১৮-২০ বছরের একটা ছেলে কেমন নেশাখোরের মতন চেহারা, ছোঁ মেরে আমার সামনে রাখা কোকের ক্যানটা নিয়ে চলে গেল। আমি কেমন হতবাক হয়ে গেলাম। তাকিয়ে দেখলাম আরও কয়েকজনের খাবারও এভাবে ছিনতাই হলো। খাওয়া শেষে ওখানকার স্যুভেনির শপগুলোতে ঢুকতেই দেখলাম মুরদের তৈরি বিখ্যাত মুরানো কাচের চোখ ঝলসে যাওয়া এক একটা সামগ্রী। দাম আকাশছোঁয়া। তার মাঝখান থেকেই ছোটো খাটো দু-একটা জিনিস টোকেন হিসেবে কেনার সৌভাগ্য হলো। সন্ধ্যা হয়ে গেল। জলবাস ধরে হোটেলে ফিরেই হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। রেল স্টেশনের পেছনেই শান বাঁধানো চত্বর, যেখান থেকে সিঁড়িগুলো ধাপে ধাপে নেমে গেছে গ্র্যান্ড ক্যানেলের ঠান্ডা পানিতে, তাতে হেঁটে হেঁটে ফুলে ওঠা পা দুটো ডুবিয়ে বসে রইলাম অনেক রাত পর্যন্ত। আমাদের সাথে আরও শত শত পর্যটক বসে আছে, ঢেউ এসে বাড়ি দিয়ে যাচ্ছে পায়ের পাতায়, আর সারাদিন গরমে ঘোরা ক্লান্ত শরীর। পানির ওপর দিয়ে ভেসে আসা শিরশিরে ঠান্ডা বাতাসে যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ি। কাল যাবো ডজেস প্যালেস, আকাডেমিয়ায় যেখানে রয়েছে ভেনিসের বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি আর ভেনিসের অন্যতম নিদর্শন রিয়াল্টো ব্রিজ দেখতে। রুমে ফিরেই সোজা ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম দুজন। বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট সুতরাং নাশটা হোটেলেই হলো। রুটি যে কতরকম হতে পারে তা দেখলাম। আমার প্রিয় রুটি croissants  তো ছিলই, দু’দিন পর খেয়ে একটু তৃপ্তি পেলাম। মাখন, জেলি, পনির আর ডিমের স্বাদে তো কোনো পরিবর্তন নেই। সাথে দু-তিন রকমের জুস আর ফল। দুই কাপ ক্যাপুচিনো দিয়ে নাশতা পর্ব শেষ করে দুজন বের হোলাম ফেরোভিয়া থেকে জলবাসে সান মার্কো প্লাজা যাবো। এবার আর ভুল করিনি, গ্র্যান্ড ক্যানেল দিয়ে হাজির হলাম প্লাজায় যার ওপর সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ডজেস প্যালেস। এই প্যালেস এখন মিউজিয়াম, প্রবেশের টিকিট বেশ দামি। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি ইতস্তত করছি, আমার স্বামীকে বললাম, বাদ দাও, না দেখলে কী আর এমন হবে! ইতালির আসল যেটা সিস্টিন চ্যাপেল যেখানে আছে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর বিখ্যাত সব চিত্র তাও দেখা শেষ। ও বলল, ঠিক আছে তুমি দেখে আসো আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। যখন ও দেখল আমি একা যাচ্ছি না, তখন দুটো টিকিটই কিনে আনল। দেখে আসার পরে মনে হলো সত্যিই না দেখলে মিস করতাম। গথিক ডিজাইনের ডজেস প্যালেস অনেকটা দুর্গের আদলে তৈরি যা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থা যুক্ত। লেগুনের দিকে মুখ করে থাকা সামনের অংশ দিয়ে ভেতরে যাওয়ার দুটো প্রধান দরজা। তার একটি হলো প্রবেশপথ সেই স্বর্ণালি অপূর্ব কারুকার্য মণ্ডিত প্রাসাদে ঢোকার। নবম শতাব্দীতে শুরু হওয়া এই প্যালেস বর্তমান রূপ লাভ করে ১৪২৪ সালে ফিলিপ্পো ক্যালেনডারিওর ডিজাইনে। ডজেসদের বাসভবন ছাড়াও প্রাসাদটি ব্যবহার করা হতো প্রজাতান্ত্রিক ভেনিসের প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর জন্য কাঠের বাক্স রাখা যে কক্ষটি ছিল তার নাম হলো যধষষ ড়ভ ঃযব নঁংংড়ষধ. প্রত্যেকটি রুম সোনালি রঙের গিল্টি করা ভারী কারুকাজ, ছাদ থেকে চারদিকের দেয়াল পর্যন্ত। একেকটি হলরুমের একেকটি নাম, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সালা ডেল সিনাটো, সালা ডেল অ্যান্টি কলেজিও, সালা ডেল ম্যাগিওর কনসিলিও ইত্যাদি। অবাক বিস্ময়ে আমি শুধু দেখেই যাচ্ছি তাদের দম বন্ধ করা প্রাচুর্য আর শান শওকত। আর হল ঘরের পর হল ঘর পার হয়ে যাচ্ছি। যেতে যেতে একটি দরজা পার হয়ে ছোট্ট একটা সেতুর ওপর এলাম, যার অপর পারে বন্দিশালা। এই সেতুটির নাম " Bridge of sighs " যার বাংলা করলে দাঁড়ায় দীর্ঘশ্বাসের সেতু! চারদিক দেয়াল ঘেরা সেতুটির ওপরের দিকে জাফরি কাটা ছোট্ট দুটো ঘুলঘুলি, যার মধ্যে চোখ রেখে ডজেস প্রাসাদের বিচারালয় থেকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা শেষবারের মতন পৃথিবীর আলো-বাতাসটুকু দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেত! তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর কোনোদিনও পৃথিবীর আলো দেখেনি! এই বন্দিশালা দেখে আমারতো দম আটকে যাচ্ছিল, ছোটো ছোটো এক একটা কক্ষ যেখানে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয় দরজা দিয়ে। দেখলাম নিরেট অন্ধকার ঘরে শুধু কাঠ আর পাথরে তৈরি একটি ছোট বেঞ্চ! বাতাস তো দূরের কথা, এতটুকু আলো আসার কোনো পথ নেই, শুধু ওই ছোট্ট দরজার কঠিন গরাদের ফাঁক দিয়ে সামান্য আলোর আভা! ভাবলাম এখানেই শেষ হয়ে গেছে কত অপরাধী আর নিরপরাধীর জীবন! এখানে মিউজিয়ামগুলোতে পিছু ফেরার কোনো উপায় নেই। দম বন্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমার স্বামীর হাত আঁকড়ে, সরু গলি পথ ধরে। আর ভাবছি সেই সব হতভাগ্যদের জীবনের করুণ উপাখ্যান। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে বের হয়ে এলাম উন্মুক্ত একটি প্রাঙ্গণে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। পাশেই একটা কফি শপ দু’জন দুটো ক্যাপুচিনো নিলাম। মন থেকে ভারটা কিছুতেই নামাতে পারছিলাম না। ছোট্ট একটু পানিপথ দিয়ে বিচ্ছিন্ন পাশাপাশি দুটো স্থাপনা যা কিনা যুক্ত দীর্ঘশ্বাসের সেতুর মাধ্যমে, কিন্তু কি আকাশ পাতাল পার্থক্য তাদের সর্বাঙ্গে! আবার জলবাসে আরোহণ এবারের গন্তব্য গ্র্যান্ড ক্যানেলের অপর তীরে বিখ্যাত আর্ট গ্যালারি আকাডেমিয়ায়। সেখানে ক্রমানুসারে প্রদর্শিত আছে আঠারোশ’ সালের আগে আঁকা বিখ্যাত সব শিল্পীর ছবি। যেমন : জেন্টিলি, বেল্লিনি, লরেঞ্জো লোট্টো, টিশিয়ান, জর্জিনো এবং ভিঞ্চির সব মাস্টার পিস। এই শিল্পের মহাসাগরে আমার মতো একজন সাঁতার না জানা লোক কার কথা বলবে! তবুও এর মধ্যে জর্জিনোর দ্য টে¤েপস্ট, বেল্লিনির ম্যাডোনা অ্যান্ড দ্য চাইল্ড আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। এ ছাড়াও এখানে আছে ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত ছবি Qwe & quot; Vitruvian Man & quot; ছবিটা। সব ঘুরেফিরে দেখতে অনেক সময় লাগল। কেমন আচ্ছন্নের মতো লাগছিল আমার! বার বার মনে পড়ছে আমি কি হাজার বার ছবিতে দেখা আর বইয়ে পড়া এসব বিখ্যাত শিল্পীর ছবি নিজের চোখে দেখছি! বের হতে হতে দুপুর গড়িয়ে এলো, ফিরে এলাম হোটেলে। বিকেলে হোটেল থেকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি বিখ্যাত রিয়াল্টো ব্রিজ দেখতে। পথে পড়ল ছোটো ছোটো ঘরে বসে এক একজন নাম না জানা শিল্পী যারা (মুর থেকে আসা কাচ শিল্প) কাচ দিয়ে এক একটি অপূর্ব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। ওখানে বিক্রিও হয়। অনেক ট্যুরিস্ট কিনছে। একজন বানাচ্ছেন গুবরে পোকা, মাছি, ছোট ছোট মলা মাছ, তার শরীরটও আবার আঁশে চিকচিক করছে। কী যে অপূর্ব দেখতে, তবে অসম্ভব দাম। আমরা একটি কারখানা থেকে আমাদের সামনেই হাতে বানানো মুড়ানো কাচের ছোট্ট চারটি হাতি আর দুটো পেঁচা কিনলাম। ছোটো ছোটো হাতির মূর্তি কালেকশন করা আমার স্বামীর হবি।

পৃথিবীর নানা দেশের নানান ধাতু আর জিনিসে তৈরি এই হাতির শখ পূরণে কোনো কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারে না। এবার আস্তে আস্তে বিখ্যাত রিয়াল্টো ব্রিজে এসে হাজির হলাম। সেখানে বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসে আছে ভ্রাম্যমাণ দোকানদাররা। অনেক কিছুর সাথে বিক্রি হচ্ছে অপরূপ সুন্দর এক একটি মুখোশ যা ভেনিসের বিখ্যাত কার্নিভালে ব্যবহার করে থাকেন অংশগ্রহণকারীরা। একটা মুখোশ কিনলাম টোকেন হিসেবে। মুখোশ আমার হাতে, আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি গ্র্যান্ড ক্যানেলের দিকে চেয়ে। ১১৮১ সালে শুরু হয়ে বিভিন্ন ভাঙাগড়ার পর ১৫৯১ সালে শেষ হয় এই ব্রিজ। এর দু’দিকের দেয়ালের মাঝখানে বড় একটা খিলান আর দু’পাশে ছয়টা ছয়টা মোট বারোটা খিলান। পাথরের তৈরি ২৮ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি পানির ওপর মাত্র ৭.৫ মিটার লম্বা, যেখানে গ্র্যান্ড ক্যানেলটি সর্বাপেক্ষা ক্ষীণকায়। সন্ধ্যা নেমে আসছে, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি পানির দিকে তাকিয়ে, বরফ দেওয়া কোকের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছি। চারদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকের ভিড়। সারাদিনের প্রচণ্ড গরম কমে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে আসা বাতাস উপভোগ করছি। ভাবছি রিয়াল্টো আর কোনোদিন তোমার সাথে দেখা হবে কি-না জানি না! ক্যানেলে অনেক কিছুর সাথে গন্ডোলাও ভেসে যাচ্ছে তবে আমাদের চড়া হয়নি, কারণ ভাড়া আকাশচুম্বী! তবে ছবি রইল।

ধুলাহীন সেই নগরীর পাথর বাঁধানো সরু সরু গলিপথ দিয়ে ফিরে আসছি, হঠাৎ অবাক হয়ে দেখি ঘাসে ছাওয়া

একটু ছোট্ট খোলা জায়গা যা ভেনিসে অকল্পনীয়। ক্যানেলের দিকে চেয়ে থাকা সেই একটুকরো জমিতে দু-একটা গাছ আর দুটো বেঞ্চ পাতা। বসলাম ক্লান্ত পা দুটোকে জিরিয়ে নিতে। দেশে রেখে আসা আমার ছেলের কথা মনে করে ভীষণ খারাপ লাগছে। কী করছে কে জানে!

ক্যানেলের ওপাশে রেলস্টেশন দেখা যাচ্ছে, কাল যেখান থেকে ট্রেনে চড়বো ফ্লোরেন্সের উদ্দেশে। চেয়ে দেখছি পানিতে ভেসে যাচ্ছে বিভিন্ন নৌযান, হঠাৎ চমকে উঠে দেখি ভয়ঙ্কর গতিতে ছুটে যাচ্ছে পলিজিয়া লেখা পুলিশের স্পিডবোট, যার তীব্র গতিতে সৃষ্ট বিশাল ঢেউ ক্যানেলের ধারে বেঁধে রাখা নৌকাগুলোকে প্রচণ্ড শব্দে তীরের সাথে আছড়ে ফেলছে। তাড়াতাড়ি উঠে দেখলাম পুলিশগুলো বিখ্যাত স্কালজি ব্রিজের ওপরে, যেখানে দু’দিন ধরে দেখছি কিছু বাংলাদেশি ছেলে আর আফ্রিকানরা ছোটোখাটো খুবই সামান্য জিনিস বিক্রি করে।

আমরা আস্তে আস্তে হোটেলে ফিরছি, রির ওপর ছোট্ট সেতু পার হবো, দেখি আমাদের দেশের সেই ছেলেগুলো। মলিন চেহারা। আমরা গিয়ে আলাপ করলাম। ছল ছল চোখে বলল তাদের দুঃখের গল্প, পুলিশ কেড়ে নিয়ে গেছে তাদের সব মালপত্র। দালালকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়Ñ কী ব্যবসা করবে আর কোথায় বসবে তার জন্য। মেস্ট্রে থেকে প্রতিদিন এখানে আসে তারা, কারণ ভেনিস ভীষণ এক্সপেনসিভ থাকার জন্য। চেহারা দেখে মনে হলো ভালোমতো পেটপুরে বোধহয় খাওয়াও হয় না তাদের। দু-একজন বলছিল বাড়িতে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খাইনি আর এখানে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। বাড়িতে কিছু জানাতেও পারে না। বাবা-মা চিন্তা করবে!

অনেক টাকা খরচ করে আসা মোহে বা বেকারত্ব সইতে না পারা হতভাগ্য ছেলেগুলো। তাদের মধ্যে দু-একজন বিএ, এমএ পাসও ছিল। অসহায়ভাবে শুনলাম এই অসহায় ছেলেগুলোর কাহিনি, মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ফিরে এলাম হোটেলে মন ভার করা এক অনুভূতি নিয়ে।

কাল বারোটায় চেক আউট, তবুও ব্যাগগুলো গুছিয়ে রাখছি কারণ সকালে উদ্দেশ্যহীনভাবে যদি ঘুরতে বেরিয়ে যাই, তখন যেন ওগুলো হোটেলের কাউন্টারে রেখে যাওয়া যায়। আর সেই সাথে গুছিয়ে রাখছি আমার স্মরণীয় ভেনিস ভ্রমণের স্মৃতির পাতাগুলো।

মাহজাবীন জুন : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares