গল্প : তৃষ্ণা : আলী ইদ্রিস

গল্প

তৃষ্ণা

আলী ইদ্রিস

জেলা শহরের উপকণ্ঠে সদ্য অবমুক্ত একটি কমিউনিটি সেন্টার। হাজারো অতিথির সমাবেশে দুপুরে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। সেখানে রাজধানী থেকেও কিছু মেহমান উপস্থিত হয়েছেন, হয়তো অনুষ্ঠান শেষে সেদিনই ফিরে যাবেন। ঢাকার অন্যতম মেহমান জামাল ও তার পরিবারের স্থানীয় সদস্যরা একটি টেবিলজুড়ে বসে গল্প করছিল। শুধু একজন মহিলা পরিবারের বাইরের সদস্য। গল্পের চেয়ে টেবিলের খাবারের দিকেই তাদের নজর ছিল বেশি। হঠাৎ সেই মহিলা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় জামালসহ কেউই নির্বিকার থাকতে পারল না। কান্নারত মহিলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আলাপচারিতা থামিয়ে দিল। একটু নিবিড়ভাবে তাকিয়ে জামাল আনোয়ারাকে চিনতে পারল, কিন্তু সেই বাল্যকালের মতো ‘আন্নরারে কাঁদছিস কেন’ বলে প্রশ্ন করতে পারল না। ভাগ্যিস তার হয়ে পাশে বসা দুলাভাই প্রশ্নটা ছুড়ে মারল- উনি কাঁদছেন কেন? আনোয়ারার আশপাশে সবাই নিরুত্তর। তখন জামালের বড় বোন হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল- অনেক বছর পর  জামালের সাথে দেখা হলো তো, সেই ছেলেবেলার ঘটনা হয়তো মনে পড়ে গেছে, একসাথে খেলাধুলা করা, একসাথে স্কুলে যাওয়া, ঝগড়া করা, নালিশ করা, সবই ওরা করত। বড় বোন আরও অনেক ঘটনা বর্ণনা করতে যাচ্ছিলেন, জামাল তাঁকে থামিয়ে দিল- বুবু, তুই থাম তো, আন্নরাকে চিনতে আমি ভুল করিনি।

আনোয়ারাকে গ্রামের কথ্যভাষায় জামাল আন্নরা বলে ডাকত। জামাল যে বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে, আনোয়ারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল। দু-বছর পর জামাল ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হলো, আনোয়ারা তখন গ্রামে। তবে জামাল ছুটিতে গ্রামে এলে দু’জনের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কিন্তু বাল্যকালের সরল মেলামেশা জমতো না, দু’জনের কেউই সহজ হতে পারত না। অথচ ছোটবেলায় এক সাথে দু’জন স্কুলে যেত, ঝড়ের পর একসাথে আম কুড়াতে সারা গ্রাম চষে বেড়াত, আনোয়ারা বললে যত উঁচু গাছই হোক জামাল তরতর করে উঠে বড়ই, আমড়া, জাম পেড়ে দিত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোয়াই নদীর শীতল স্রোত ধারায় গোসল করত, সাঁতার দিয়ে এপার-ওপার করত, স্কুলে একজন শিক্ষকের হাতে মার খেলে অন্যজন বাড়িতে এসে জানিয়ে দিত। সেজন্য দু’জনের মধ্যে ঝগড়াও হতো। বাইরের লোকজন ধরে নিয়েছিল ওরা ভাইবোন, যেন মানিকজোড়।

জামালের ঢাকায় লেখাপড়া করাটা আনোয়ারা মেনে নিতে পারেনি। সে জানতো হবিগঞ্জে একটি নামকরা কলেজ আছে। কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে, এমনকি জামালকেও কোনোদিন বলতে পারেনি। বছরের পর বছর ক্ষোভের আগুনে দগ্ধ হয়েছে। যেদিন জামাল ঢাকা চলে যায়, আনোয়ারা সবার অগোচরে সারা রাত না ঘুমিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিল। সে ঘটনা কেউ জানতে পারেনি, জামালও না। তবে জামালের মা ও বড়বোন মাঝে মাঝে বলে ফেলতÑ আনোয়ারার মতো মেয়ে হয় না। জামালের বউ করে মেয়েটাকে ঘরে আনতে পারলে মন্দ হতো না। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হয় মানিকজোড়। জামাল মা-বোনের আলাপচারিতা শুনে কল্পনায় একটি ছোট সুন্দর স্বর্গীয় সংসারের ছবি এঁকে নিরুত্তর থাকত। জামাল ঢাকা যাওয়ার পরই পাশের গ্রামের এক বয়স্ক গেরস্থের সাথে আনোয়ারার বিয়ে হয়ে যায়। জামাল সে খবরটিও অনেক পরে পেয়েছিল। সেই গেরস্থ মারা গেলে আনোয়ারা অনেক স¤পত্তির মালিক হয়ে যায়। আজ তিন যুগ পরে ওদের হঠাৎ দেখা। তাই আনোয়ারার অশ্রুপাত জামালকে নাড়া দিল। প্রেমের হোক, বিরহের হোক পুরোনো স্মৃতি নাকি অধিক যন্ত্রণাদায়ক।

গুমট বাঁধা পরিবেশটা হালকা করল জামালের দুলাভাই, সে সবার জন্য মসলা পান আনাল, সবাই পান মুখে দিয়ে প্রসঙ্গ বদলাল। বিরাট হলঘরটা ভরে গেছে অতিথিতে। সবাই হাসিখুশি ও আলাপচারিতায় মগ্ন, কেউ কেউ হৈচৈ, চিল্লাচিল্লিতে ব্যস্ত, এ ব্যস্ততার কোনো বিশেষ কারণ নেই। বিনা কারণে পায়চারি, দৌড়াদৌড়ি, আপ্যায়ন। মেয়র সাহেবকে ফোন করা হচ্ছে বারবার। তিনি জানিয়েছেন কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছবেন। দুপুর থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত কয়েকশ’ অতিথি পর্যায়ক্রমে খাওয়া শেষ করেছেন। টার্গেট ছিল এক হাজার অতিথি, সে অনুসারেই খাবার তৈরি করা হয়েছে।

কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এসব বিয়েতে অতিথিরা এসেই শূন্য টেবিল খোঁজে। এরপর খাওয়াদাওয়া সেরে বিদায় নেয়। প্রস্থানের পূর্বে সেজেগুজে বসে থাকা বর-কনেকে একনজর দেখে যায়। নিকট আত্মীয় হলে বর-কনের পাশে বসে বা দাঁড়িয়ে একসাথে ছবি ওঠায়। আজকাল মানুষ নিজেকে, নিজের পেশা, ব্যবসা, পরিবার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, জেলা শহরের মতো এলাকায়ও বিয়ে-শাদি বা শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা-সাক্ষাৎ কদাচিৎ হয়। তাই দেখা হলে কথা যেন ফুরাতে চায় না। তবু জামালদের আলাপচারিতায় ইতি টানতে হলো, কারণ অপেক্ষারত অতিথিদের বসতে দিতে হবে। জামালরা উঠে দাঁড়াল। আনোয়ারাও উঠে দাঁড়াল। সে মুর্হূতে  কান্নারত হঠাৎ একটি বয়স্ক মহিলা হাতে পলিথিনের ব্যাগ হাতে হেঁটে যাওয়ার সময় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। বিয়ের খাবার ভরা পলিথিনের ব্যাগটি তখনও হাতে আঁকড়ে ধরা। সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ারা আবার কেঁদে উঠল এবং মাকে উঠাতে এগোল। অন্য এক মহিলা সাহায্য করতে এসে বললেন, উনি তো বাথরুমে বমি করছিলেন। শুনে আনোয়ারার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলছিল। সে বলতে লাগলÑ কতবার বুড়িকে বলেছি পেটের আন্দাজমতো খেয়ো, খাওন দেখলে হুঁশ থাকে না। খেয়েছে ইচ্ছামতো, আবার ব্যাগে ভরেছে। বয়সের সাথে সাথে বুড়ির লজ্জাশরম মরে গেছে। আনোয়ারাকে থামিয়ে আরও দু’জন মহিলা আনোয়ারার মাকে উঠিয়ে বিয়ের আসর ত্যাগ করতে উদ্যত হলো। এরপর কি আনোয়ারার এ আসরে বসার মতো মুখ থাকে? উৎকণ্ঠায় ভরা মলিন, কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে বেচারি বিয়ের আসর ত্যাগ করল।

আনোয়ারাদের পরিবার কিছুদিন আগেও এ গ্রামে সবচাইতে সচ্ছল ছিল। এক ছেলে, এক মেয়ে আর কয়েক একর পৈতৃক স¤পত্তি নিয়ে আনোয়ারার বাবা বছরে কয়েকশ’ মণ ধান ও অন্যান্য ফসল ফলাতেন। তাতে পরিবারটি সচ্ছলভাবে দিন কাটাচ্ছিল। একদিন ফজরের আজানের সময় আনোয়ারার বাবা খোয়াই নদীতে গোসল সেরে মসজিদে যাচ্ছিলেন নামাজ পড়তে। তখনও আবছা অন্ধকার কাটেনি। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন রাস্তার বামে কলাগাছের ঝোপটি বাতাসে একপাশে নুইয়ে পড়ল, আবার উঠে দাঁড়িয়ে অন্য পাশে নুইয়ে পড়ল। এটুকু বাতাসে এমনটা হওয়ার কথা নয়, কলাগাছের মাথায় কোনো বিড়াল বা বানর দেখা গেল না, গ্রামে সাহসী বলে খ্যাত লোকটি ভয় পেলেন। তার শরীর কাঁপতে লাগল। তিনি বাড়িতে ফিরে বিছানা নিলেন, প্রচণ্ড জ্বরে তার সংজ্ঞা লুপ্ত হলো, সেই সংজ্ঞা আর ফেরেনি। এরপরই শুরু হলো খোয়াইর পাড়ে বড় আকারের ভাঙন। সেই ভাঙনে আনোয়ারাদের অধিকাংশ জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেল।

বাবার মৃত্যুর পর গেরস্থির হাল ধরার কথা আনোয়ারার একমাত্র ভাই রমজানের। কিন্তু রমজান সেই ধরনের ছেলেই নয়। বাবা জীবিত থাকতে স্কুল পালিয়ে সারাদিন বাউণ্ডেলে ছেলেদের সাথে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত, লুকিয়ে সিগারেট পান করত, গ্রামের মানুষের আম, কাঁঠাল, ডাব পেড়ে বন্ধুদের নিয়ে খেত, রাত হলে বাড়ি ফিরত। বাবার মৃত্যুর পরও রমজান এতটুকু বদলাল না। নিরূপায় মা অনেক চেষ্টা করেও বাউন্ডেলে ছেলেকে শোধরাতে পারলেন না। উল্টো ছেলে বায়না ধরল মামাতো বোন রত্নাকে বিয়ে করবে। স্কুল-পড়ুয়া রত্না সুন্দরী হলেও বিয়ের বয়স হয়নি। মামা-মামি এ বয়সে বিয়ে দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু বাউন্ডেলে ভাগ্নেকে ঘরমুখো করতে বোনের অনুরোধ আর কান্নাকাটিতে বিয়েতে রাজি হতে হলো। ঘর আলো করে রত্না রমজানের বউ হয়ে এলো। নতুন বউ পেয়ে কিছুদিন রমজান ঘরমুখো ছিল, কিন্তু গেরস্থির দায়িত্ব নিল না। মায়ের কান্নাকাটি, বউয়ের মিনতি কিছুই তোয়াক্কা না করে রমজান পুনরায় বাউণ্ডেলে জীবনে প্রবেশ করল।

এবার শোনা গেল রমজানের দলটি সন্ধ্যার পর বাবুদের বাড়ির পুকুর পাড়ে পরিত্যক্ত মন্দিরে বসে গাঁজা ভাং, চরস দিয়ে নেশা করে। বিকেল থেকে ওদের আড্ডা শুরু হয়, রাত দুটো পর্যন্ত চলে পানাহার, মাতলামি, গান-বাজনা ইত্যাদি। রাত দুটোয় যখন রমজান বাড়িতে ফেরে, তখন ঘুমন্ত বউ, মা ও বোনকে জাগিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটায়। একই ঘটনা দিনের পর দিন ঘটে। মা ছেলেকে বারণ করার সাহসই রাখেন না। পাছে অপমানিত হবেন, সে ভয়ে মামা তথা শ্বশুরও জামাইকে উপদেশ দিতে আসেন না। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে মামা-মামি মেয়েকে অমানুষ জামাইর কবল থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। ততদিনে রত্নার পেটে বাচ্চা এসে গেছে। ষোড়শী, সুন্দরী, ঘরোয়া বউটি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে শ^শুরবাড়ি থেকে বিদায় নিল।

বউ চলে যাওয়ার পর রমজানের অত্যাচার, জ্বালাতন আরও বেড়ে গেল। এখন সে ঘরের ধান-চাল, ক্ষেতের ফসল অগ্রিম বিক্রি করে খরিদ্দার থেকে টাকা নিয়ে গাঁজা, মদ ও মেয়েমানুষের খরচ জোগাতে লাগল। কখনও গভীর রাতে বাড়ি ফিরত, কখনও একেবারেই ফিরত না। কখনও সপ্তাহ, মাস চলে যেত, রমজানের চেহারা কেউ দেখত না। কিন্তু হাতের টাকা ফুরালেই সে বাড়ি ফিরত। গেরস্থির দিকে ভুলেও তাকাত না। মা-মেয়ের ভোগান্তি দেখে মাঝে মাঝে সাহায্য করত জামাল। স্কুলপড়ুয়া জামাল ফাঁক পেলেই গেরস্থির কাজে হাত লাগাত। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করা, ফসল তোলা, মাঝরাত পর্যন্ত জেগে ধান মাড়াই করাÑ এসব কাজে জামাল ছিল কামলার চেয়েও দক্ষ। একদিন জামালও ঢাকা চলে গেল কলেজে পড়তে।

জামালের ঢাকা যাওয়ার দু’বছর পর আনোয়ারার বিয়ে হয়ে যায়। রমজানের মা একাকী গেরস্থি আর সংসারের বোঝা টানতে থাকেন। কিন্তু রমজানের আচরণের কোনো উন্নতি হলো না। বরং দিনকে দিন সে আরও স্বেচ্ছাচারী, আরও ছন্নছাড়া হয়ে উঠল। ফলে সামলাতে না পেরে মা সমস্ত কৃষি জমি বর্গা দিলেন, হালের গরু বেচলেন, কিন্তু একটি টাকাও রমজানের থাবা থেকে বাঁচাতে পারলেন না। এদিকে হঠাৎ রমজান কুমিল্লা থেকে একটি ফুটফুটে মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এলো। উচ্ছন্নে যাওয়া বন্ধুরা বললÑ বেটা নতুন বউ এনেছিস, একটু খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কর। রমজান মাকে বললÑ গরু জবাই করে সবাইকে ভোজ দিতে হবে। এদিকে সংসার খরচের টাকা নেই, ভোজ দেবেন কী করে। মায়ের ওপর রমজানের অত্যাচার শুরু হলো। এ মোক্ষম সুযোগটি নিল কয়েকজন বর্গাদার। তারা তাদের দখলে থাকা জমি অর্ধেক দামে রমজানের কাছ থেকে ক্রয় করে নিল। এ টাকা দিয়ে রমজান গরু জবাই করে বন্ধুবান্ধব ও গ্রামবাসীকে খাওয়াল, বউকে শাড়ি-গয়না কিনে দিল।

পাড়া-পড়শিরা ভাবলো ফুটফুটে কচি বউ পেয়ে রমজান এবার বুঝি ঘর নেবে। মা বললেনÑ বাবা, যা হবার হয়েছে, বর্গাদারদের কাছ থেকে এবার গেরস্থিটা নিজের হাতে তুলে নে। কিন্তু রমজান ঘর নেওয়ার লোক নয়। নতুন বউয়ের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমায় দু’দিন কাটল। এর পরই সে আগের জীবনে ফিরে গেল। আবার মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে লাগল, কখনও দু-তিন দিন তার খোঁজই পাওয়া যায় না। রমজান বর্গাদারদের কাছে আরও জমি বিক্রি করল। বাবার জমিতে মা ও বোনের হিস্যা থাকে বলে তাদের দস্তখত ছাড়া বিক্রি রেজিস্ট্রি হবে না। রমজান মা ও বোনের ওপর অত্যাচার করতে লাগল। নির্যাতনের এক পর্যায়ে মায়ের গায়ে হাত তুলল, বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বোনকে গালিগালাজ করল। এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রমজান নিজের স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে চলল। এদিকে জমির খরিদ্দারদের কাছ থেকে যে অগ্রিম টাকা নিয়েছিল, তা কিছুদিনের মধ্যে ফুরিয়ে গেলে খরিদ্দাররা বাকি মূল্য বুঝে নিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল। গ্রামবাসী সবাই বিষয়টি জেনে গেলে চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। অবশেষে রমজানের মা ও বোন নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। এভাবে ভূমিপুত্র একদিন পৈতৃক ভূমির এক ইঞ্চি অংশেরও মালিক রইল না। পৈতৃক ভিটা ও ঘরবাড়ি হারিয়ে রমজান সরকারি বাঁধের ওপর একটি ঝুপড়ি তৈরি করে দিন কাটাতে লাগল। অসহায় মা এ ঝুপড়িতে ঠাঁই পেলেন না। নিরুপায় হয়ে ভাইয়ের সংসারে আশ্রয় নিলেন, কিন্তু কুপুত্রের অপকাণ্ডের শোকে কিছুদিনের মধ্যেই দেহত্যাগ করলেন।

রমজানের কুমিল্লার বউ ছিল মাটির মানুষ, কিংবা একটি নারী পুতুল। তুচ্ছ কারণে রমজান মেয়েটিকে মেরে রক্তাক্ত করত, কিন্তু কেউ তার কান্নার আওয়াজ শুনত না। ঝুপড়িতে গিয়েও বউয়ের মুখে কোনো প্রতিবাদের শব্দ বেরোল না। ঝড়-বৃষ্টিতে একদিন ঝুপড়ি উড়িয়ে নিল। রমজান তখনও নির্বিকার, অবলীলায় ভিক্ষুকদের সাথে রেল স্টেশনের বারান্দায় আশ্রয় নিল। বউটি তখনও রমজানকে ত্যাগ করেনি। এরপর শুরু হলো অর্থকষ্ট, খাদ্যাভাব। রমজান বউকে বলল বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝিয়ের কাজ করতে, নিজে বাস কন্ডাক্টারের একটি অস্থায়ী চাকরি পেল। একদিন চলন্ত বাস থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে গেল, রমজানের ঠাঁই হলো সরকারি হাসপাতালে।

সহকর্মী বাসচালক ইমরান হাসপাতালে এসে রমজানের ষোড়শী বউকে তার শয্যাপাশে দেখে মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গিয়েছিল একটা হ্যাজাক বাতিকে কাগজ দিয়ে ঢাকলেও যেমন আলোর বিচ্ছুরণ ঠেকানো যায় না, তেমিন দারিদ্র্য, উপোস, রমজানের অত্যাচার সব মিলেও বউটির রূপের লাবণ্যকে লুকাতে পারেনি। রমজানের দুর্দশা দেখে পরদিন ইমরান কিছু টাকা রমজানের হাতে দিল। কিন্তু রমজান সে টাকা থেকে সামান্য অংশ বউয়ের হাতে দিয়ে বাকি টাকা লুকিয়ে ফেলল। ক’দিন পর ইমরান এসে দেখলো বউটির চেহারা আরও মলিন, আরও শুকিয়ে গেছে কিন্তু হ্যাজাকের আলো নেভেনি। ইমরান তাকে বারান্দায় ডেকে সরাসরি বিয়ের অফার দিল। দ্বিধা-সংকোচে বউটি নিজ পরিবারের দারিদ্র্য, রোগশোক, আরও অনেক কিছুর ওজর দেখিয়ে ইমরানকে থামাতে চাচ্ছিল, কিন্তু ইমরান দমল না, রমজানকে হাসপাতালে ফেলে রেখে তার বউকে নিয়ে ঘর বাঁধল। প্রথম বউকে রমজান তালাক দিয়েছিল, দ্বিতীয় বউ রমজানকে তালাক দিল। এ অপমানে রমজান ক্ষোভে, দুঃখে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হলো।

দীর্ঘ পাঁচ বছর রমজান নিরুদ্দেশ ছিল, কেউ বলে সে সিলেটে রিকশা চালায়, কেউ বলে সে চুরির মামলায় জেলে আছে। সব বলাবলিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে রমজান পাঁচ বছর পর নোয়াখালি থেকে তৃতীয় বউসহ বাড়ি ফিরল। ততদিনে তার ঝুপড়িটিও বেদখল হয়ে গেছে। এবার রমজান বোনের বাড়িতে আশ্রয় চাইল। কিন্তু যে কুলাঙ্গার ভাইয়ের স্বেচ্ছাচারিতা ও বাউন্ডেলেপনার জন্য মা অকালে দেহত্যাগ করলেন, পুরো পরিবার নিঃস্ব ভিখারিতে পরিণত হলো, সেই ভাইকে আনোয়ারা ঝাঁটা হাতে দরজা থেকে বিদায় করল। হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর, স্বেচ্ছাচারী, ভবঘুরে ভাই সে চায়নি। আনোয়ারার হৃদয়ে একটি সুন্দর, পবিত্র মনের পুরুষের গভীর ভালোবাসার তৃষ্ণা ছিল। জামালকে তাই নিজের মনের মতো করেই ভালোবেসেছিল। আনোয়ারা মনের অনেক কথাই শুধু জামালকে কেন, কাউকেই বলেনি। সেই অব্যক্ত কথাগুলো বলার প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে আজও আনোয়ারা বেঁচে আছে।

আলী ইদ্রিস : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares