গল্প : নগরীতে বনের তোতাপাখি : মঈনুস সুলতান

গল্প

নগরীতে বনের তোতাপাখি

মঈনুস সুলতান

রোদ তখনও ওঠেনি। পুরান ঢাকার গলিঘুঁজিতে মানুষজন কেবলমাত্র তৎপর হয়ে উঠছে। আর্মানিটোলার তারা মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ের পর সৈয়দ আখলাকুর নবি রিকশা চেপেছেন। নবি সাহেব প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়াগাঁয়ের মানুষ। ঢাকা নগরীতে কাজা-ক্বচিৎ যে দু-চারবার এসেছেন, তখনও নগরীটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। পুরান ঢাকায় চল ছিল ঘোড়ার গাড়ির। মফস্সল থেকে আসা ট্রেনগুলো থামতো ফুলবাড়িয়া ইশটিশানে। বয়সে তখন নবি ছিলেন কিশোর, ঢাকায় আসলে তাঁর প্রয়াত পিতার মুরিদানরা দরাজভাবে মেহমানদারি করত। পুত্র হিসেবে পিতা নারকেলবাড়ির পিরে-কামিলের খিলাফত তিনি দাবি করেন না। বাতেনি মারেফতের বিষয়-আশয় নিয়ে আলোচনায়ও তিনি অপারগ। তবে এখনও পিতার মুরিদানরা তাঁকে পিরভাই হিসেবে ইজ্জত করেন। মানসিকভাবে বেজায় বেপানাহ হয়ে তিনি এবার ঢাকায় এসেছেন। মুরিদানরা তাঁর হেফাজতের কোনো কমতি করছেন না। অনেক দিন ধরে টাইলসে ঝলমলে নক্ষত্রখচিত তারা মসজিদটি ভোরের আলোয় চাক্ষুষ করার তাঁর ইচ্ছা। বিষয়টি জানতে পেরে একজন বিত্তবান মুরিদ গাড়ি করে তাঁকে সুবে সাদিকের আগে ওখানে পাঠিয়েছেন। তিনি একা একটু পুরান ঢাকাটা ঘুরেফিরে দেখতে চান, তাই ড্রাইভারকে বিদায় দিয়ে রিকশা ধরেছেন।

চৌবাচ্চায় ওজু করে ধলপহরের মোলায়েম আলোয় তিনি ধুন ধরে তাকিয়ে ছিলেন, মনে হচ্ছিল, মসজিদটি যেন নীলিমা থেকে জাদুবলে নক্ষত্রের ঐশ^র্য নিয়ে নেমে এসেছে জমিনে। তাঁর ধ্যানমগ্নতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, পশমিনা চাদরে ঢাকা প্রয়াত পিতার মুখ ভেসে উঠেছিল মানসপটে। সাথে সাথে অবচেতনের তন্দ্রা ভেঙে জাগ্রত হয়েছিল কিছু সওয়াল। মুরিদানদের কেউ কেউ পিতার গায়েবি অদৃশ্যলোক সম্পর্কে জ্ঞান এবং তাঁর ভবিষ্যাদ্বাণী করার বিরল ক্ষমতা নিয়ে হামেশা স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর পরলোকপ্রাপ্তি ঘটেছিল অকস্মাৎ, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, কিছু মুরিদান ‘মৌত’ শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তুলেছিলেন, তাদের বিশ্বাস চিশতিয়া তরিকার রেওয়াজ মোতাবেক তাদের পিরে-কামিল পর্দা নিয়েছেন। তাদের সাথে বাহাসে লিপ্ত হননি নবি। তবে কিছু সওয়াল তাঁর মনে বার বার ফিরে এসেছে, অনেক তর্পণ করেও জবাব খুঁজে পাননি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়,  অন্তিম যে সন্নিকটাবর্তীÑ এ বাবদে তাঁর পিতা সচেতন ছিলেন না। মৃত্যুর মাসখানেক আগে হজের টিকিট কেটেছিলেন। জায়গা-জমির এক ব্যাপক অংশ ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান তথা শিন্নি-সালাত ও ওরসের জন্য ওয়াক্্ফ করার কথা বলতেন, কিন্তু আইনিভাবে কিছু বন্দোবস্ত করে যাননি। একমাত্র পুত্র নবিকে তাঁর খেলাফত বা আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারও দিয়ে যাননি। এতে সন্তান হিসেবে তিনি অসন্তুষ্ট নন। বালক বয়সে পিতা তাঁকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন হক্কানি এলেম হাসিল করতে। কিন্তু নবি সাহেব পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি। ভারি দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন, পিতার অবাধ্য হয়ে হাইস্কুলে ট্রান্সফার নিয়েছিলেন, ঝুঁকে ছিলেন ক্রিকেট খেলায়, আউট বই তথা নভেল-নাটক পাঠের নেশাও হয়েছিল এক সময়। পিতা ওজর-আপত্তি তুলেছেন, কিন্তু জোরালোভাবে বাঁধা দেননি। তবে চাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের তিন নভোচর পা রাখলে, ঘটনাটি বিশ্বাস করে ছেলে পিতার বিরাগভাজন হয়েছিলেন। তিনি এ আচরণে ইমান কমজোর হওয়ার আশঙ্কার কথা স্মরণ করিয়ে তাঁকে তওবা করিয়েছিলেন। পিতা তাঁর হাইস্কুলে যাওয়ার ব্যাপারটি মেনে নিয়েছিলেন বটে, তবে সাথে সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহাল করেছিলেনÑ সন্তানের দ্বীনি এলেমের প্রক্রিয়া। বাদ-ফজর তিনি স্বয়ং তাঁকে শেখাতেন জরুরি মাসলা-মোসায়েল, তওবা ও ইশতেষারার দোয়া-দরুদ প্রভৃতি। নবির স্মৃতিশক্তি কমজোর, তিনি কিছু মাসলা বা কোনো সুরার খানিকটা বিস্মৃত হলে পিতা তাড়া দিতেন, ‘বার বার জপো, জপতে জপতে একদম তোতাপড়া করো, যাতে কালাম জিন্দেগির মতো জবানি হয়ে যায়।’ রুটিন করে পরীক্ষা নিতেন, কোরান মজিদের দীর্ঘ পারাগুলো জবানি বলতে না পারলে চড়-চাপড় মেরে বলতেন, ‘শিখাইলে বনের তোতাপাখিও আল্লার কালাম ইয়াদ রাখতে পারে, পির খান্দানের আওলাদ তুমি, ইয়াদ রাখতে পারবে না কেন?’ তবে কী এক পর্যায়ে তিনি আন্দাজ করেছিলেন, কানে ট্রানজিস্টার লাগিয়ে ক্রিকেটের রানিং কমেন্ট্রি শোনা ছেলে পিরাকি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠেননি। এতে অবশ্য বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা শোনা পত্রিকা-পড়ুয়া ছেলে নবি অসন্তুষ্ট হননি। তবে তাঁর মনপীড়ার প্রধান কারণ অন্য একটি সম্ভাবনা। তবে কি পিতাÑ জন্মসূত্রে সঠিক খানদানের না হওয়ার কারণে, তাঁকে খিলাফতির উপযুক্ত বিবেচনা করেননি, স্থান দেননি আধ্যাত্মিক সিলসিলার ধারাবাহিকতায়?

রিকশা সদরঘাটে এসে থামে, নবি সাহেব ভাড়া দিয়ে দেয়ালে শ্যাওলা লেগে ঝুরঝুরে হয়ে আসা আহসান মঞ্জিলের দিকে তাকান। কিন্তু বিশেষ একটা আগ্রহ বোধ করেন না। টার্মিনালে ঢুকে কিছুক্ষণ লঞ্চে ভোরবিহানের প্যাসেঞ্জারদের ওঠানামা দেখেন। চালু হওয়া লঞ্চের জল কাটার মতো তাঁর মনে একটি ভাবনা ঘূর্ণিত হয়। আজ থেকে প্রায় মাস দুয়েক আগে প্রয়াত হয়েছেন তাঁর জননী। চাইলে তিনি তো তাঁকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত জানাতে পারতেন? তাঁর মৃত্যুর পর চাহরমের শিন্নির সময় পরিবারের অনেক দিনের পুরোনো ঝি-বেটি বেকরার হয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে পুরো ঘটনাটি জানায়। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে, দোয়া-তাবিজ করেও তাঁর জননী সন্তান ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পিতার এক মুরিদ বিলাতি কোম্পানির চা-বাগানে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি দোহাতি এক শ্রমিক দুহিতাকে গোপনে বিয়ে করে রাখনি হিসেবে রেখেছিলেন। ছেলেসন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে নারীটির মৃত্যু হয়। পরের মাসে সদ্য পিতা হওয়া ম্যানেজারের প্রশিক্ষণ জাতীয় উচ্চশিক্ষার জন্য দুই বছরের মেয়াদে এডিনবরায় যাওয়ার কথা। তার পরিবার তথাকথিত কুলি নারীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। ম্যানেজার তার পির সাহেবের দ্বারস্থ হন। অতঃপর পির সাহেব ও তাঁর স্ত্রী বাচ্চাটিকে দত্তক নিয়ে আকিকা করে নামকরণ করেছিলেন সৈয়দ আখলাকুন নবি। এ কাহিনি নবি সাহেব বাড়ির বুড়ি ঝি-বেটির কাছ থেকে শোনা অব্দি ভারি অশান্তিতে আছেন। জননীর কাছ থেকে ঘটনাটি শুনলে হয়তো এতটা আঘাত পেতেন না।

ঢিলে বিক্ষত হওয়া বোলতার চাকের মতো একধরনের অস্থিরতা নিয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন টার্মিনাল থেকে। ফুটপাত থেকে দৈনিক বাংলা পত্রিকাটি কিনে হেঁটে হেঁটে চলে আসেন বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে। খানিক খিদে পেয়েছে, দিল্লি  রেস্টুরেন্টে ঢুকে অতঃপর উদ্যোগ নেন নাশতা সারার। পাওয়া যায় গরুর পায়ার তেহারি। কিন্তু নবি সাহেব সকালবেলা ভারী কিছু খেতে চাচ্ছেন না। ওয়েটার বাখরখানি টেবিলে রেখে জানতে চায়Ñ চা করবে কি-না? সকালবেলা বেলের শরবত খেতে পছন্দ করেন নবি। ওয়েটার তাঁকে আশ্বস্ত করে পরিবেশন করে জাফরান মেশানো শীতল এক পেয়ালা বাদামের শরবত। বাখরখানি টুকরা করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে তিনি পত্রিকায় হেডলাইনে চোখ বুলান। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন সেরে দেশে ফিরে আসবেন আগামীকাল। পত্রিকায় তাঁর কূটনৈতিক সফলতা নিয়ে এডিটোরিয়াল ছেপেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায়। পয়লা পৃষ্ঠায় শেখ সাহেবের সাথে আলাপরত ফিদেল কাস্ত্রোর চমৎকার ছবিও ছেপেছে।

দিল্লি রেস্টুরেন্টের টেবিলে সুচারুভাবে সাজিয়ে রাখা খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে কাকতালীয়ভাবে মনে পড়ে যায় তাঁর প্রথমা স্ত্রীর কথা। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে গর্ভস্থ শিশুসহ জেবিনের মৃত্যু হয় প্রায় আট বছর আগে। হামেশা নিত্যনতুন নাশতার আয়োজন করত সে। পরোটার সাথে ভুনা কলিজি বা মসলাদার গরুর মগজ। মিষ্টি কিছুও থাকত সব সময়, গাজরের হালুয়া বা পাটিসাপটা তৈরিতে তার জুড়ি মেলা ছিল ভার। খাওয়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকত তালের পাখাটি হাতে। ডেলিভারিতে সমস্যা দেখা দিলেও মা-বাবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে দেননি তাঁকে। পিতা জাফরান দিয়ে তস্তরিতে আহাদনামা লিখে তা ধুয়ে পানি খাওয়াতে হুকুম করেছিলেন। জানাজা তিনি নিজে পড়িয়েছিলেন। দাফনের পর ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এই বলে যেÑ জন্মলগ্নে মৃত মাসুম শিশুটি হাশরের দিন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করবে, যাতে পিতার জান্নাত লাভের নসিব হয়। ওয়েটারের হাতে দু-টাকার একখানা নোট বকশিশ দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন নবি সাহেব।

রিকশা ধরে নবাবপুর রোডের হোটেল মারজুতে আসার সময় দেখেন, মুড়ির টিনের মতো দেখতে একটি বাস প্যাসেঞ্জার বোঝাই দিয়ে চলছে রামপুরার দিকে। বন্দুকের দোকানের ‘গান স্মিথ’ লেখা সাইনবোর্ডটির নিচে বেঁধে গেছে কোন্দাল, চলছে রীতিমতো হাতাহাতি। মারজু হোটেলের দোরগোড়ায় দারোয়ান তাঁকে লম্বা সালাম টুকে। হোটেলের মালিক তাঁর পিতার প্রিয় মুরিদানদের একজন। তিনি পিরভাই হিসেবে নবি সাহেবের দিন কতক বসবাসের জন্য চমৎকার বন্দোবস্ত করেছেন। তাঁকে তিনতলায় একটি বড়সড় কামরা দেওয়া হয়েছে। মুরিদানরা দেখা করতে আসলে, বসার সুবিধার জন্য কামরায় টেনে আনা হয়েছে ভারী সোফাসেট, মেঝেতে পাতা হয়েছে কার্পেট। ভোরবিহানে ছোটাছুটিতে বিস্তর ধকল গেছে। তো পাঙ্খা ছেড়ে দিয়ে নবি সাহেব একটু আয়েশ করে বসেন। তখনই চোখ পড়ে টেবিলে রাখা ঝকঝকে ফিলিপস রেডিওটির ওপর।

তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী পরীবাগ বানু বিবাহের জেহেজ হিসেবে ঝকঝকে একটি ফিলিপস রেডিও নিয়ে নারকেলবাড়ির সংসারে এসেছিল। কলেজে পড়া মেয়ে পরিবাগ শ্বশুর-শাশুড়ির সান্নিধ্যে মোকসেদুল মোমিনিন কিংবা বেহেস্তি জেওর পড়ার ভান করলেও আবডালে নীহার রঞ্জন গুপ্তের উপন্যাস পড়তে ভালোবাসতো। তিনি অনেক দিন ধরে ট্রাঙ্কের তলায় লুকিয়ে রাখা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের বইগুলো তাকে উপহার দিয়েছিলেন। এতে সে কলকাতার উপন্যাসের নায়িকাটির মতো নিশিরাতে সঙ্গোপনে কপালে টিপ পরে খোলাচুলে অন্তরঙ্গ হয়েছিল। তারই প্ররোচনায় পিতামাতার সাথে দোতলা দালানে না থেকে, ভেতর মহলের বিরাট উঠানের কোনার দিকে পড়ে থাকা টিনের ছোট্ট ঘরটিতে উঠে এসেছিলেন। ওখানে রাতের দিকে তারা একত্রে শুনতেন, রেডিও সিলোন থেকে ভেসে আসা মোহাম্মদ রফি বা নুরজাহানের সঙ্গীত।

জননীর চারমের দিনে ঝি-বুড়ি হঠাৎ করে ভারি ইমোশনাল হয়ে কেঁদেকেটে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত তাঁকে বলেছিল। এতে নবি সাহেব অত্যন্ত আপসেট হয়েছিলেন, দেহ-মনে ভীষণ বেচইন লাগছিল, কী করবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। পরিবাগ তাঁকে আবডালে ডেকে নিয়ে বলেছিল, মাস তিনেক আগে বেহুঁশ হয়ে বিছানায় পড়েছিল বুড়ি পুরো এক সপ্তাহ। তারপর রিকভার করলেও তার স্মৃতি সম্পূর্ণ ফিরে আসেনি। মাঝে-মধ্যে আবোল-তাবোল কথাবার্তাও বলছে। সে যে উল্টাপাল্টা বানোয়াট কিছু বলছে না, তারই-বা প্রমাণ কী? পুরোনো দিনের মানুষ বলতে তাঁর মায়ের বড়ভাই মামা, তিনি পক্ষাঘাতে পঙ্গু, তাঁর বাকশক্তিও হ্রাস পেয়েছে, অস্পষ্টভাবে একটি বা দুটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন। ঝি-বুড়ির বাচনিকে শোনা তাঁর জন্মকাহিনী কতটা সত্য- তা জানতে নবি সাহেব ছুটে গিয়েছিলেন মামার কাছে। তাঁর প্রশ্ন শুনে মামা কিছুক্ষণ তব্দিল হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। কোনো কথা তিনি বলেননি, তাঁর চোখ থেকে শুধু গড়িয়ে নামছিল অশ্রুধারা।

মামার বাসা থেকে বেশ রাতে ফিরেছিলেন নারকেলবাড়িতে। বালুচরি শাড়ি পরে রাজ্যের জেওরাত গায়ে লণ্ঠনটি দাবিয়ে চুপচাপ বসেছিল পরীবাগ। তাঁকে কিছু বলার সুযোগ সে দেয়নি। নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে তাজ্জব করে দিয়েছিল! ওই রাতে তিনি জেনেছিলেন সন্তান সম্ভাবনার কথা। মায়ের মৃত্যুজনিত অনুপস্থিতিতে পরিবাগ খোলামেলাভাবে অন্তরঙ্গ হতে শুরু করেছিল। চন্দ্রকলার মতো তার একহারা দেহটি দ্রুত ভরে উঠেছিল লাবণ্যের পূর্ণিমায়। কিন্তু যার ইশারায় হ্রদ শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়, শিলাপাহাড় ফুঁড়ে নীলিমায় উৎক্ষিপ্ত হয় অগ্নি, তিনি কেন তাদের অন্তরঙ্গতাকে আরও কিছুদিন বহাল রাখতে বিরত হলেনÑ এ মক্কর বোঝা আসলেই ভার! মায়ের চেহলামের দিন সন্ধ্যাবেলা গোসলখানায় সম্বিত হারিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় পরিবাগের। দেরি করে আসা ডাক্তার নিথর দেহটি পরীক্ষা করে বলেন, অকস্মাৎ মৃত্যুর কারণ ‘সিজার’। পরিবাগের দাঁতকপাটি লেগে খিঁচুনি দিয়ে সম্বিত হারানোর ধাত ছিল। পিতা পিরে-কামিল বৃষ্টির জলে তাবিজ গুলিয়ে তাকে গোসল করালে ব্যামোটি সেরে যায়। ‘সিজার’ শব্দটির মর্মার্থ কী তিনি আজও ভালো করে বুঝতে পারেননি, হোটেল মারজুর ডিলাক্স কামরায় বসে তিন ব্যান্ডের ফিলিপ্স রেডিওটির নব ঘোরাতে ঘোরাতে নবি সাহেব ভাবেন, তবে কী তাঁর শোণিতে আছে কোনো অশুভ আছর, কোনো অভিশাপ, যা তাঁর সান্নিধ্যে আসা নারীদের পাঠাবে মৃত্যুর দুয়ারে এবং পিতা হওয়ার পথে তৈরি করবে প্রতিবন্ধক?

বেলা এগারোটার দিকে তাঁকে সেক্রেটারিয়েটে নিয়ে যেতে হোটেলে আসেন পিতার মুরিদ মুহিবুব রেজা। ইনি হরেক রকমের ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত আছেন। কিছুদিন আগে সাইকেলের টায়ার আমদানির পারমিট থেকে অর্জন করেছেন প্রচুর পয়সাপাতি। পর পর একাধিক মৃত্যুতে নবি সাহেবের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতার। পির-মুরিদি তাঁর ধাতে নেই, নিজেকে নিয়ে কী করবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। তিনি ঢাকাতে এসেছেন নগরীটা ঘুরে দেখার জন্য, সাথে সাথে কোনো ধরনের ব্যবসায় যুক্ত হওয়া যায় কি-না, তার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে চান। মূলধনের কোনো সমস্যা নেই। তবে ব্যবসায়ে নিজেকে কমিট করার আগে এর ঘোরপ্যাঁচ সম্পর্কে খানিক ধারণা পেতে চান। রেজা তাঁকে কথা দিয়েছেন এ বাবদে সহায়তা করার।

সড়কে বেরিয়ে রেজা সাহেব প্রথমে পানের দোকান থেকে কেনেন একাধিক খিলি। একটি মুখে দিয়ে বাকিগুলো কৌটায় পুরে তার পিরভাই নবিকে নিয়ে রিকশা চাপেন। সাফারি স্যুট পরা রেজার হাতে ধরা চামড়ার পেটমোটা একটি ব্যাগ। তার শরীর থেকে বেরোচ্ছে- তিনশ’ বিশ জর্দার সাথে কিমামের মিশেল দেওয়া গন্ধ। রিকশাটির চেন পড়ে গেলে তা থামে নওয়াবপুর রোড়ের গাঁজা-আফিমের দোকানের সামনে। তার জানালার শিকলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে লাঠি হাতে একজন খোঁড়া লোক। তার হাতলে বসে শিকল পরা একটি তোতাপাখি। সফেদ কোর্তা-পায়জামা ও সদরিয়ায় ধোপদুরস্ত নবি সাহেবকে দেখতে পেয়ে খোঁড়া মানুষটি ভিখ মাগে। তিনি কী যেন ভেবে তার হাতে তুলে দেন একটি সিকি। তোতাপাখিটি চকচকে মুদ্রায় ঠোকর দিয়ে বলে ওঠে, ‘বনের পাখি আল্লা কও।’ এতে চমকে ওঠেন নবি সাহেব!

সেক্রিটারিয়েটে ঢুকতে একটু ঝকমারি হয়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সেকশন অফিসার নবি সাহেবের পরিচয় জানতে পেরে পিওনকে চা দিতে অর্ডার করেন। তাঁর প্রয়াত শ^শুর-শাশুড়ি ছিলেন পিরে-কামিল সাহেবের পাক্কা মুরিদ। অফিসারকে মিটিংয়ের জন্য উঠে পড়তে হয়। তিনি রেজা সাহেবের হাতে কতকগুলো ফর্ম তুলে দিয়ে তা ফিলআপ করে নিয়ে আসার কথা বলে নবি সাহেবের সঙ্গে হাত মেলান। রেজা পেটমোটা ব্যাগটি থেকে ধুছুমুছ করে সিল করা এনভেলাপ ও একটি প্যাকেট বের করে টেবিলে রাখেন। অফিসার নীরবে তা ড্রয়ারে তুলে তালা দিয়ে ‘খোদা হাফিজ’ বলে বেরিয়ে যান।

বায়তুল মোকাররমে জোহরের নামাজ আদায় করে তারা গুলিস্তানের রেক্স রেস্তোরাঁয় নিরিবিলিতে স্যুপ, স্যান্ডুইচ ও চিকেন কাটলেট দিয়ে লাঞ্চ সারেন। তারপর চা খেতে খেতে নাকের ডগায় রিডিং গ্লাস ঝুলিয়ে রেজা টিপ কলমে ফরম ফিলআপ করতে শুরু করেন। নবি সাহেব জানতে পারেন যে, রেজা টেক্সটাইল মিলস্ থেকে নাজমা সালু নামে বাজারে বর্তমানে দুর্লভ সালু কাপড়ের পারমিট বের করার তদবির করছেন। প্রতিমন্ত্রী পঞ্চাশ বেলের অনুমোদন দিলে হাতে হাতে তা ইসলামপুরের কোনো কাপড়ের ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে অর্জন করা যাবে যথেষ্ট মুনাফা। তবে বড় মাপের মুনাফার জন্য প্রয়োজন পাইকারি কাপড়ের দোকান খোলা। এতে মূলধনের ব্যাপার আছে। নবি সাহেব মূলধনের অংকটি কপাল কুঁচকে শোনেন, কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কেতার রেস্তোরাঁটির পরিবেশ তাঁর ভালো লাগে। ওয়েটার এগিয়ে এসে টি-পট থেকে আরেক পেয়ালা চা ঢেলে দেয়। তা পান করতে করতে তিনি আলগোছে সদরিয়ার জেব থেকে বের করেন চান্দিতে আজমির শরিফের দরগা এনগ্রেভ করা মোহরের কৌটা। কৌটাটি তাঁর পরিবারের হেফাজতে আছে শতাধিক বছরেরও ওপর। সচরাচর মুরিদানদের সামনে তা খোলার কোনো রেওয়াজ নেই। এর ভেতরে আছে অত্যন্ত বারিক হরফে লেখা একখানা মিনিয়েচার কোরান শরিফ। তার চারপাশে ছোট্ট ছোট্ট গর্তে কাচের টুকরার তলায় রাখা আছে চিশতিয়া তরিকার সাতজন মশহুর ওলির মাজারের ধূলিমাটির কণা। তিনি ফরমের ওপর মোহরের কৌটা রেখে চোখ বন্ধ করে বাণিজ্যিক উদ্যোগটির কামিয়াবির জন্য মনে মনে মোনাজাত করেন। তারপর তা সিনায় ঠেকিয়ে বোসা দিয়ে সদরিয়ার জেবে ঢোকান।

হোটেলে ফেরার পথে নবি সাহেব গুলিস্তানের মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মির জুমলার কামানটি দেখে নেন। তখন চোখ পড়ে, ‘আলোর মিছিল’ নামে একটি সিনেমার বিরাট বিলবোর্ডে। দু-চার বার লুকিয়ে-চুরিয়ে তিনি নারকেলবাড়ি থেকে বেশ দূরে ছোট্ট একটি মফস্বল শহরের সিনেমা হলে উর্দু সিনেমা দেখেছেন। আলো ঝলমল রুপালি পর্দায় লাহোরের ‘চকোরি’, ‘চান্দা’ কিংবা ‘দারা’ সিনেমার নাচে-গানে ভরপুর আবহ এখনও তাঁর স্মৃতিতে অম্লান। রিকশায় ওঠার সময় পাশ দিয়ে চলে যায় মাইক লাগানো একটি ঘোড়ার গাড়ি। তা থেকে স্বদেশকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর জনসভায় দলে দলে যোগদানের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বেশ রাত করে তাঁর সঙ্গে হোটেলে দেখা করতে আসেন পিতার আরেক মুরিদ মুরাদ উদ্দিন মৃধা। টাই পরা ব্রিফকেস হাতে চৌকস চেহারার মুরাদ সাহেব পির ভাইয়ের জন্য বিচিত্র এক প্যাকেট সিগ্রেট নিয়ে এসেছেন। চেইন স্মোকার নন নবি, তবে দিন কাটানোর জন্য প্যাকেট-দেড় প্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগারেট হলেই তাঁর চলে। মুরাদ সাহেব রথম্যান কিং সাইজের প্যাকেটটি খুলে একশলা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গ্যাসলাইটার জ্বালেন, ধরাতে গিয়ে নবি খেয়াল করেন, সিগ্রেটটির ফিল্টারের গোড়া সোনালি ফিতা দিয়ে বাঁধানো। মুরাদ সাহেবও বড় মাপের ব্যবসার উদ্যোগ নিচ্ছেন। মূলধন হিসেবে ব্যাংক লোনের ধান্দায় আছেন। তিনি মোহরের খোঁজ করেন না। তবে সিগ্রেটে সুখটান দিয়ে জানান, মিটিংয়ে যেদিন লোন স্যাঙ্কশন হবে, ঠিক ওই দিন তার কর্মচারীরা নারকেলবাড়িতে পৌঁছে দেবে পিরে-কামিলের মাঝারে শিন্নির জন্য জোড়া গরু, বারিক চাল ও গাওয়া ঘি।

ভারী ব্রিফকেস খুলে মুরাদ সাহেব বের করেন রেশমের কারুকাজ করা জোড়া পাঞ্জাবি। একটি উপহার হিসেবে পিরভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে অন্যটি নিয়ে তিনি ঢোকেন বাথরুমে। একটু পর হাত-মুখ ধুয়ে বাটনডাউন শার্ট ও টাই বদলিয়ে পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে আসেন। অতঃপর পির ভাইকে নিয়ে রওনা হন পুরান ঢাকায় কাওয়ালির মাহফিলে।

নতুন মডেলের ডাটসান গাড়িটি নিজে ড্রাইভ করে মুরাদ সাহেব নানা গলিঘুঁজি দিয়ে তার পির ভাইকে নিয়ে আসেন নাজিমুদ্দীন রোডের পুরোনো ধাচে তৈরি দোতলা বাড়িতে। উপরতলায় চারদিকের ছোট ছোট কামরার ঠিক মধ্যিখানে খোলা উঠানে শতরঞ্জি বিছিয়ে বসেছে কাওয়ালির মাহফিল। পিতার বিশেষ মুরিদ গৃহকর্তা সম্মান করে পির ভাইয়ের হাতে তুলে দেন গোলাপপাশ। তাঁকে সালাম দিয়ে কাওয়ালি গান ধরেন। সঙ্গীতের ভাষা বাংলা, তবে মাঝে মাঝে হারমোনিয়াম চালু রেখে কাওয়াল কুট্টি জবানে বয়ান করছেন চিশতিয়া তরিকার মাহাত্য। কখনও সুরধ্বনি মৃদু হলে গৃহকর্তাও আওয়াজ দিচ্ছেন, ‘খাজা পরস্তে কিয়া মেলে?’ শ্রোতাদের কাছ থেকে জওয়াব আসছে, ‘আল্লাহ মেলে, সুবহানাল্লা।’ তখন নবি সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন গোলাপজল। সঙ্গীতের জোশ যখন সৈকতে জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ছে শ্রোতাদের দেহ-মনে, তখন বিরতি হয়, পরিবেশন করা হয় পুরি-হালুয়া ও গরম চা।

মাহফিলে বসে থেকে হাতে-পায়ে খিল ধরে গেছে। তাই নবি সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসনে ফুটপাতে। বেশ রাত হয়েছে, সড়কে গাড়িঘোড়া তেমন নেই। তিনি একশলা রথম্যান ধরিয়ে একটু পায়চারি করেন। আশপাশ কোথা থেকে ‘বনের পাখি আল্লাহ কও’ আওয়াজ ভেসে এলে ভারি তাজ্জব হয়ে এদিক ওদিকে তাকান! ল্যাম্পপোস্ট থেকে খানিক দূরে একটি ঠেলাগাড়িতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে ঝিমাচ্ছে, সকালে গাঁজা-আফিমের দোকানের সামনে দেখা তোতাপাখিওয়ালা ভিখারি। ভাবেন, তার হাতে তুলে দেবেন ভাংতি পয়সা। এগিয়ে যান, ভিখারি মানুষটি চোখ খুলে স্বপ্নের ঘোরে তাঁর দিকে তাকায়। কিন্তু তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে পয়সা তুলে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখায় না। পাখিটি ফের আল্লাহর নাম ফুঁকারে। তাঁর মনে একটি ভাবনা খেলে যায়, তিনিও তোতার মতো পিতার শেখানো কালাম  তসবি টিপে টিপে অভ্যাসবশত প্রায়শ জপেন। তবে মর্মার্থ ঠিক অনুধাবন করতে পারেন না। তাঁর কৌতূহল হয়- বনের পাখিটিও কী তাঁর মতো স্রষ্টার দিদার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নয়? এ ধরনের আওয়ারা ভাবনা সমীচীন মনে হয় না, তাই নবি সাহেব মনে মনে এক মর্তবা তওবা আসতাগফির পড়ে, পোড়া সিগ্রেটের শেষাংশ ছুড়ে ফেলে ফিরে আসেন কাওয়ালির মাহফিলে।

মঈনুস সুলতান : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares