গল্প : দেমাগিরির পাহাড়ে : সিরাজুল ইসলাম মুনির

গল্প

দেমাগিরির পাহাড়ে

সিরাজুল ইসলাম মুনির

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই মুজিব বাহিনীর যোদ্ধাদের দেমাগিরি অভিমুখে মুভমেন্ট শুরু হলো। দেশের ভেতর থেকে ডেকে আনা আর সম্প্রতি দেরাদুন ও হাফলং থেকে আসা যোদ্ধারা আগরতলায় সমবেত হয়েছে। তেপানিয়া ও নিমবাগের গ্লাস ফ্যাক্টরির ক্যাম্পে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তাদের যুদ্ধপ্রস্তুতির ওয়ার্মআপ চলছে। উচ্চশিক্ষিত, সাহসী, মেধাবী আর মুজিব আদর্শে অনুপ্রাণিত এ যোদ্ধাদের প্রত্যেকে নিজেরাই এক একটা বারুদে ভরা বুলেটের মতো। তারা ৩৬ এইচ-ই গ্রেনেড, পিস্তল, রিভলবার, এলএমজি, এসএমজি, ২ ইঞ্চি-৩ ইঞ্চি মর্টার, এসএলআর, এস কে এস রাইফেলের মতো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধ, বিশেষ করে গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহার্য অস্ত্রচালনায় দক্ষতা অর্জন করেছে। অনেকেই আবার হয়েছে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। এসব সমরাস্ত্র উন্নতমানের, আধুনিক। এসকেএস (SKS–Self Loading Carbine Simon System)-এর মতো অটোমেটিক রাইফেল চালনা শিখেছে, যা নিয়মিত বাহিনীর সৈন্যরা দেখেনি পর্যন্ত।

বিএলএফ-এর এসব অস্ত্রের উৎস হচ্ছে সিআইএ। পঞ্চাশের দশকে তিব্বত থেকে ভারতে চলে আসা কয়েক হাজার তিব্বতি যুবককে তিব্বত পুনরুদ্ধারের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতেই মঞ্চে প্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশে অবশ্যি নানা সমীকরণ কাজ করে। তারা চায়নি  এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলও চীনের কমিউনিজম প্রভাবিত হয়ে উঠুক। তাছাড়া তিব্বতিরা তিব্বত পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হলে এই অঞ্চলে একটা অশান্ত অবস্থা বিরাজ করবে, তিব্বত পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও এই অস্ত্র-প্রশিক্ষিতরা চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে, তাদের রূপরেখা মতো চীন হয়ে উঠবে একটা অশান্ত চীন।

তিব্বতি যুবকরা চীনের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাত বা তিব্বতের স্বাধীনতায় ভূমিকা রাখতে পারল না। কিন্তু চীনাদের মদদপুষ্ট মাওবাদী গেরিলারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবাংলা, বিহারসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে  আর তাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা করছিল চীন ও পাকিস্তান।

জেনারেল উবান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ২২ মাউন্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন। সিআইএ কতৃর্ক প্রশিক্ষিত তিব্বতি যুবকদের বাহিনীর নাম ছিল এসএফএফ অর্থাৎ স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। জেনারেল উবানকে এই এসএফএফ-এর আইজি (ইন্সপেক্টর জেনারেল) নিয়োগ করা হয়েছিল। আইজির ঊর্ধ্বতন পদ হচ্ছে ডিজি (ডিরেক্টর জেনারেল)  আবার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান।

জেনারেল উবানের এসএফএফ গেরিলা বাহিনীতে ৮টি ব্যাটালিয়ন ও ৬৪টি কোম্পানি ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিশাল এই বাহিনী তাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখার দুঃসাহস তো করেইনি বরং সিআইএ-র পরিকল্পনামতো চীনের অভ্যন্তরে কোনো অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ফলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে অপরীক্ষিত শক্তি হিসেবে থেকে যায়। একইসঙ্গে তারা ভারতের জন্যও একটি বোঝা হয়ে থাকে। তারা এখন ‘না ঘরকা না ঘাটকা’র জীবনযাপন করছে।

তিব্বতি যুবকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল দেরাদুনের চাকরাতা নামক পাহাড়ি ক্যান্টনমেন্টে। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য এবং ব্যবহারের জন্য আনা অস্ত্রই শেষ পর্যন্ত বিএলএফের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার হয় এবং সেই সব বিপুল অস্ত্রের মজুত থেকেই বিএলএফ অর্থাৎ মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা অস্ত্র গ্রহণ করেছে। এমনকি যে বিমানে করে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সীমান্ত শহর থেকে দেরাদুন গিয়েছিল অথবা ফিরে এসেছিল সেগুলোও ছিল এসএফএফের অধীনস্থ এআরসির (এভিয়েশন রিসোর্স সেন্টার) বিমান।

জেনারেল উবান যেভাবে এসএফএফের পরিচালনা প্রধান ছিলেন একই রকমভাবে তিনি এখন বিএলএফের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল।

বিএলএফের পূর্বাঞ্চলীয় সুপ্র্রিম কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনিও তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকেন। জেনারেল উবান এবং ‘র’ প্রধানের সঙ্গেও তিনি তার পরিকল্পনা নিয়ে কয়েক দফা কথা বলেন।

শেখ মনির পরিকল্পনায় রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের একটা মুক্তাঞ্চল তৈরি করা। এই মুক্তাঞ্চল থেকেই প্রবাসী সরকার তাদের যুদ্ধ পরিচালনা করবে। চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দরের ব্যবহার করতে না পারলে পাকিস্তানের অস্ত্র ও রসদের সাপ্লাইচেন বন্ধ হয়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের পরাজয় তখন সময়ের ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লি প্রশাসনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার নানামুখী তৎপরতার একটি হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযানকেও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। কিন্তু এই অভিযানের বিপরীত পিঠে ‘র’ মিজোরাম ও নাগা বিদ্রোহীদের নির্মূলের ভাবনা নিয়েও এগোতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যে বিদ্রোহী বিশেষ করে মিজো বিদ্রোহীদের আবাসস্থল। পাকিস্তানের ৯০ ইনডিপেনডেন্ট ব্রিগেড ও ২ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এইসব মিজো ও নাগা বিদ্রোহীদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকর্তাদের কৌশল ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করে।

জেনারেল উবানের নেতৃত্বে ‘র’ পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করে। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘মাউন্ট ঈগল’। মাউন্ট ঈগল ব্যাটালিয়নের এই বিশেষ বাহিনীতে অপরীক্ষিত তিব্বতি গেরিলাদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামমুক্ত তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহযোদ্ধা হিসেবে থাকতে তিব্বতি যোদ্ধাদের কমান্ডাররা রাজি হয় না। তাদের বক্তব্যও খুব স্পষ্ট থাকে। তারা বললেন, এসএফএফ ভারতের নিয়মিত বাহিনীর অংশ নয়। তা ছাড়া এসএফএফ তিব্বতের স্বার্থের জন্য, ভারতের স্বার্থের জন্য সৃষ্টি হয়নি।

এই অবস্থা নিরসনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী তিব্বতিদের দেশত্যাগী ধর্মগুরু দালাই লামার সঙ্গে কথা বলেন। ‘র’ প্রধান আরএন কাও হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় গিয়ে প্রবাসী তিব্বতি সরকারকে চাপ প্রয়োগ করেন। প্রবাসী সরকারের সম্মতিক্রমে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তিন হাজার তিব্বতি গেরিলা জেনারেল উবানের মাউন্ট ব্যাটালিয়ন-মাউন্ট ঈগলের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়ে দেমাগিরি পৌঁছে।

আগের দিন ক্যাম্পগুলোতে শেখ মণি নিজে এলেন। সঙ্গে এলেন শ্রমিক লীগের আবদুল মান্নান। তিনি তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে কাজ করছেন। রিক্রুটমেন্টের দায়িত্বে থাকা আ স ম রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখনও এলেন।

শেখ মণি তার ব্রিফিংয়ে বললেন, আমরা মুজিবের আদর্শের সৈনিক। আমাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা। স্বাধীনতার সংগ্রাম চলছে। বিএলএফ-ও নানামুখী পরিকল্পনা করছে। আমাদের ছেলেরা দেশের ভেতরে লড়াই করছে। মুজিব বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে জেলা কমান্ড, থানা কমান্ড এবং এসব কমান্ডের অধীনে বিভিন্ন দল, ব্যান্ড যুদ্ধ করছে। আমাদের বর্তমান পরিকল্পনা যা তোমরা ইতোমধ্যেই জেনেছ, আমরা দেশের পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলে অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম অঞ্চলকে মুক্ত করতে চাই। তোমরা হবে সেই দুঃসাহসী বাহিনী, যারা সেই কঠিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছ। তোমাদের নাম হবে বঙ্গবন্ধু মুজিবের নামে, মুজিব বাহিনী মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন। আমাদের যুদ্ধ ক্যাম্প হবে দেমাগিরি, সেখান থেকে আমাদের যোদ্ধারা কয়েকটি কলামে ভাগ হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে। দেমাগিরিতে আমি তোমাদের এই বিষয়ে নির্দেশনা দেব।

আমাদের অভিযানের সঙ্গী হবেন তোমাদের সবার প্রিয় জেনারেল সুজন সিং উবান এবং তার এসএফএফ বাহিনী। আর তোমাদের সঙ্গে থাকবেন কর্নেল পুরকায়স্থ, মেজর মালহোত্রা এবং তোমাদের পূর্বপরিচিত সামরিক অফিসাররা।

শেখ মনি বললেন, আমাদের কাজ হবে মাউন্টেন ব্যাটালিয়নকে পথ দেখানো অর্থাৎ আমাদের কাজ পথপ্রদর্শকের। আর যেহেতু দেশটি আমাদের, আমাদের পক্ষেই এই পাহাড় ও জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নেওয়া সম্ভব। এ কারণে এই বাহিনীতে আমি সর্বাধিক সংখ্যক চট্টগ্রামের ছেলেকে যুক্ত করেছি।

আগামীকাল সন্ধ্যায় মুভমেন্ট শুরু হবে। আগরতলা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রাক ছাড়বে। দেমাগিরি পর্যন্ত পথটি দীর্ঘ। বনজঙ্গল, পাহাড়, পর্বত, নদী পার হয়ে তোমাদের যেতে হবে, অবশ্যই কষ্টকর এই পথচলা। আমি জানি তোমাদের অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু যেদিন তোমরা বিজয় অর্জন করবে, সেই আনন্দের কাছে এই কষ্টকে তখন আর কষ্টই মনে হবে না।

শেখ মনি তার ব্রিফিং শেষ করলেন।

শেখ মনি জানেন, তার দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনেকেই এই পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান নিয়ে খুশি নয়। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত হচ্ছে আত্মঘাতী। অগ্রবর্তী দল হিসেবে মুজিব বাহিনীর ছেলেরা প্রথমেই পাকিস্তানি আক্রমণের শিকার হবে, তারা হবে বলির পাঁঠা।

শেখ মনি যে এসব কথা জানেন না বা বোঝেন না, তা নয়। তিনি নিজেও জানেন, মিজো বা নাগারা তার শত্রু নয়। মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চায়। মুজিব বাহিনীকে সাহায্যের নামে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের মিজো এবং নাগাদের ঘাঁটিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। করুক। মিজো আর নাগাদের সাহায্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা আসবেই। সেই যুদ্ধে মাউন্টেন ব্যাটালিয়নের হাতে পাকিস্তানি সৈন্য মরলে তার ক্ষতি কী! মুজিব বাহিনী কিছুতেই সেই যুদ্ধের অংশ হবে না, বরং এই যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মুজিব বাহিনীর বিভিন্ন দল, ইউনিট, ব্যান্ড পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের কোণে কোণে পৌঁছে যাবে।

এসব বিষয় নিয়ে জেনারেল উবানের সঙ্গে তার বিস্তারিত কথা হয়েছে। আর জেনারেল উবানের কাছেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেমন এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের চিহ্নিত শত্রু বিনাশেরও এটাই মোক্ষম সময়।

আগরতলা বিমানবন্দরে সাতটা সামরিক হেভি লরি এসে দাঁড়িয়েছে। মুজিব বাহিনীর দুইশ’ পঞ্চাশজনের প্রথম ব্যাচ যাচ্ছে দেমাগিরি। যোদ্ধারা সবাই এসে গেছে। সবাই ফল ইন করে দাঁড়িয়েছে। তাদের বিদায় দিতে এসেছেন বিএলএফের ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনি, উপ-অধিনায়ক আ স ম আবদুর রব, শ্রমিক লীগের আবদুল মান্নান, আবদুল কুদ্দুস মাখন, স্বপন চৌধুরীসহ বিএলএফের নেতৃবৃন্দ।

আগের দিনের ঘোষিত ইউনিট, দল হিসেবেই মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা দাঁড়িয়েছে। দারা দাঁড়িয়েছে নাজমুলের পাশে। শেখ ফজলুল হক মনি এবং নেতৃবৃন্দ হেঁটে হেঁটে সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন, মাঝে মধ্যে কারও কারও সঙ্গে কথাও বলছেন।

নাজমুলের সামনে এসে স্বপন চৌধুরী বললেন, রব ভাই, দ্যাখেন পাখীকে চে গুয়েভারার মতো লাগছে।

রবভাই পাখীর দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ভালোই তো লাগছে।

দারার সামনে এসে বলল, তুমি সুযোগটা হারালে, তোমার অপশন ছিল, ঢাকায় চলে যেতে।

দারা স্বপনকে বলল, দোস্ত ভাগ্যে বিশ্বাস কর? যেমন ধর, শুনেছি রব ভাই তোমাকে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু মনি ভাই শুনলেন না। তিনি একটা লজিক ঠিক করেছেন, চট্টগ্রামের সবাইকে বাধ্যতামূলক যেতে হবে।

স্বপন বলল, ঠিক আছে দোস্ত। যাও। আমিও আসছি পরের কোনো ব্যাচে। দেমাগিরিতে দেখা হবে।

ট্রাকে ওঠার আগে শেখ মনি মুজিব বাহিনীর উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেনÑ যুদ্ধ এক অনিশ্চিত জীবনের নাম। তবু আমরা বিশ্বাস করি, আমরা সবাই বিজয়ী হয়ে ফিরব।

বলতে বলতে শেখ মনির কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যার পরপরই সাতটি লরি লাইন বেঁধে চলতে শুরু করেছে। ব্যক্তিগত অস্ত্রগুলো, যে যার সঙ্গে নিয়েছে। ভারী অস্ত্র আলাদাভাবে দেমাগিরিতে পাঠানো হয়েছে। লরির ভেতরে বড় বড় গানি ব্যাগে ভরা আছে খাবার পানি। দীর্ঘ যাত্রাপথে পানির সমস্যা বড় সমস্যা। সেটার সমাধান হলো। যোদ্ধাদের জন্য প্রথম রাতের খাবার সঙ্গে আনা হয়েছে। ট্রাক চলছে কৈলাশটিলার পথ ধরে। কেন? এই রাস্তা কী দেমাগিরির পথ? তখন সেনাবাহিনীর গাইড জানাল, নিরাপত্তাজনিত কারণেই ট্রাক যাবে দার্জিলিং, আসাম, মেঘালয় হয়ে।

দুই রাত দুই দিন চলল ট্রাক। বনজঙ্গল, পাহাড়, পর্বত- যেভাবে বলেছিলেন মনি ভাই, সে রকমই পাহাড়ি উপত্যকা, জঙ্গলের গহিন অন্ধকার, পাগলা হাতির উন্মত্ততাভরা অরণ্য, বিচিত্র সব পাখি আর বনপশুদের আবাসস্থল মাড়িয়ে ট্রাকগুলো এসে থামল আইজলে। আইজল মিজোরামের রাজধানী। ছোট পাহাড়ি শহর। টিন-বাঁশের তৈরি ঘরবাড়ি। পাকা বাড়ি আছে, কিন্তু সংখ্যায় কম। দারাদের ট্রাকগুলো যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে দূরের পাহাড় সারি দেখা যায়, ভারী কুয়াশার স্তরে ঢাকা পাহাড়ের নিচের অংশ আর উপরে নীল রং পাহাড়। দেখতে ভারি সুন্দর। আইজলের পাহাড়গুলোর কোল পূর্ণ হয়ে আছে একতলা-দোতলা রঙিন রঙিন বাড়িঘর। পাহাড়ের মৌনতার সঙ্গে এখানে জীবনের এক আশ্চর্য সম্পর্ক যেন। শহরের রাস্তা ধরে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। তাদের পরনে স্কুলড্রেস। দারা এবং নাজমুল দু’জনই এই দৃশ্যটা দেখে খুব অবিশ্বাস্য চোখে। এই দূর প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে জীবনের এই ভিন্নরকম গতিপ্রবাহে তারা অবাক হয়। শহরের প্রবেশপথের কয়েকটি স্থানে এই সকালেই দলবেঁধে রাস্তার মোড়ে মোড়ে হাওয়াইন গিটার বাজাতে দেখেছে তরুণদের। হতে পারে, এটাই এখন এখানকার তরুণদের ফ্যাশন হয়ে উঠেছে।

নাজমুলকে দারা বলল, ওদের দেখে মনে হয় না, আধুনিক নগর সভ্যতা থেকে ওরা অনেক দূরে জঙ্গল দেশে বসবাস করে।

নাজমুল বলল, দারা ভাই আমিও অনেকক্ষণ ধরে এটাই ভাবছিলাম।

ট্রাকগুলো থেমে আছে অনেকক্ষণ। নাস্তা জোগাড় করতে গেছে সৈন্যরা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তাদের নামতে নিষেধ করা হয়েছে।

দারা শরীরটাকে এদিক-ওদিক মোচড় দিয়ে বলল, আর তো পারি না। হাত-পাগুলো যেন জোড়ায় জোড়ায় খুলে যাচ্ছে। খাবারের ঠিক নেই, পেশাব-পায়খানার ঠিক নেই, ইচ্ছে করছে হাত-পা মেলে ঘণ্টাখানেক শুয়ে থাকি।

নাজমুল আশ্বাসের বাণী শোনায়। এটা মিজোরামের রাজধানী। দেমাগিরি বাংলাদেশের সীমান্তে। আমার ধারণা আমরা দেমাগিরির কাছেই আছি।

দারা হেসে বলল, আমার মনে হয়, তোমার মাইন্ড সেট হয়ে আছে এরকম, এটা আগরতলা-আখাউড়ার দূরত্বের মতো কোনো জায়গা। সেটা না-ও হতে পারে। এটা হলো পাহাড়ি এলাকা, পাহাড়ের দূরত্ব আর সমতলের দূরত্ব এক নয়।

নাস্তা সরবরাহ করা হয়েছে। রুটি আর সবজি ভাজি। স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে রাস্তাজুড়েই খাবারের সময় খাবার সরবরাহ করা হয়েছে তাদের। তবে সম্ভবত আগেভাগেই ওয়্যারলেসে ব্যবস্থা করে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

মাঝে মধ্যে পাশ কেটে চলে যায় সামরিক জিপ, সামরিক ট্রাক, লরি। সাধারণ যাত্রী নিয়েও চলাচল করছে ছোট ছোট জিপগাড়ি।

দারা রাস্তার পাশে হেঁটে যাওয়া একজনকে জিজ্ঞেস করল, দেমাগিরি কতদূর? জিজ্ঞেস করল হিন্দিতে।

ভদ্রলোক হাসলেন। কিছুই বললেন না।

নাজমুল বলল, বুঝে নাই। বাংলায় জিজ্ঞেস করেন।

দারা বাংলায় জিজ্ঞেস করে।

বাংলাও বোঝে না।

দারা তখন দেমাগিরি, দেমাগিরি হাউ ফার, দেমাগিরি-ডিসট্যান্স এসব শব্দমালা উচ্চারণ করে।

ভদ্রলোক হাসলেন, বললেন, দেমাগিরি ওয়ান হানড্রেড টোয়েন্টি মাইলস।

দারা কেবল ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, ওয়ান হানড্রেড টোয়েন্টি মাইলস!

মগভর্তি চা এলো। চা খাওয়ার পরই তেষ্টা পেল সিগারেটের। দারা বলল, দেখলে নাজমুল, একটা যুদ্ধ কীভাবে মানুষের স্বভাব পর্যন্ত পাল্টে দেয়।

কেন, কী হয়েছে?

আমি আমার সারা জীবনে একটা সিগারেটও খাইনি। অথচ এই যুদ্ধের যাত্রী যখন হলাম, তখন থেকে সিগারেটও ধরলাম।

নাজমুল হেসে বলে, না, সিগারেটে আপনাকে ধরেছে। এখন কি সিগারেট আনতে নামবেন?

হ্যাঁ, কিছু কিনে রাখি। পরে যদি না পাই।

পাবেন, পাবেন। সিগারেট না পেলেও পাতার বিড়ি পাবেন।

এতক্ষণ কেউ না নামলেও এখন অনেকেই টপাটপ নেমে পড়েছে। সবাই বিশেষ প্রয়োজনের অনুমতি নিয়েই নেমেছে। চা খাওয়ার পর ধূমপায়ীদের সিগারেটের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, নেমে পড়া সে কারণে। দারাও নামল।

সিগারেট পাওয়া গেল। কিন্তু সেগুলো ভারতীয় নয়। বার্মিজ এবং চাইনিজ। সাদা পাতা দিয়ে মুড়ে মুড়ে বানানো কতকগুলো সিগারেট পাওয়া গেল। এগুলো চুরুট। বার্মা থেকে এসেছে। পাতার বিড়িও আছে।

দারা চাইনিজ সিগারেট কিনল এক প্যাকেট। এরই মধ্যে বাঁশি বাজল। সবাই উঠে এলো ট্রাকে।

আবার চলতে শুরু করে লরিগুলো। নাজমুল বলল, একটা বিষয় খেয়াল করেছেন দারা ভাই, এই যে আমাদের এতগুলো লরি এসে এখানে দাঁড়াল, আমরা এতগুলো মানুষ, খেয়াল করেছেন স্থানীয় লোকজনের কোনো কৌতূহল নেই।

ঠিকই তো বলেছ। হ্যাঁ, হতে পারে এটা হয়তো এদের প্রায়-দেখা দৃশ্য। সীমান্ত এলাকা তাছাড়া একটা যুদ্ধাবস্থা চলছে, এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

শহর ছাড়লেই আবার পাহাড়ের উপর দিকে এঁকেবেঁকে রাস্তা। পাহাড়ের অনেক নিচে গিরিখাত। এরকম অনেক গিরিখাত, পাহাড়ি নদীর পাশ কেটে তারা এসেছে। একবার যদি কোনো কারণে চালকের হিসাবে গণ্ডগোল হয়, তাহলে চলে যেতে হবে গভীর কোনো খাদে। গভীর পাহাড়ি খাদগুলো যখন পার হয়ে আসে তারা, তখন মৃত্যু ও জীবনের মাঝামাঝি একটা শূন্যদড়ির উপর নিজেকে দাঁড়ানো দেখতে পায়। ভয়ে তখন তারা দৃষ্টিকে আকাশের দিকে মেলে ধরে। আকাশে কিছুক্ষণ পরপরই উড়ে যায় হেলিকপ্টার। সামরিক হেলিকপ্টার এগুলো। হতে পারে এগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য উড়ছে আবার এও হতে পারে যুদ্ধাবস্থাকালীন সময়ে সামরিক তৎপরতায় নিয়োজিত রয়েছে।

অবশেষে দেমাগিরির পাহাড় শীর্ষে পৌঁছল দারাদের লরিবহর। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে বিশাল এলাকাজুড়ে করা হয়েছে অস্থায়ী সৈন্য ব্যারাক। আইজল থেকে যে দূরের সবুজ পাহাড় দেখা যায়, সেসব পাহাড়ি বাঁশবন। এখানেও ঘন বাঁশভূমি। যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। সবুজের  বিস্তৃতির মধ্যেই কোথাও সীমান্ত পিলারে আলাদা করে ফেলেছে তাদের নিজের দেশকে। তবুও কেউ কেউ বিশেষ করে চট্টগ্রামের যুদ্ধসঙ্গীরা হাত তুলে দেখায়, ওই হলো বাংলাদেশ। আর ওই যে ঘন নীল পাহাড় ওটা হলো লুসাই পাহাড়, লুসাই থেকে নেমেছে কর্ণফুলী নদী।

কোথায় নদীটা? কেউ কেউ দেখতে চায়, পাহাড়ের সবুজে উঁকি দিয়ে। দেখা যায় না। সবুজ আড়াল করে রেখেছে নদীর পথচলা।

আজও তাদের স্বাগত জানালেন এসএফএফের সামরিক কর্মকর্তারা। তারা খুব অবাক হলো কর্নেল পুরকায়স্থকে দেখে। তাদের মনের জোর ফিরে আসে। পুরকায়স্থ বললেন, এক সপ্তাহ কাজ নেই আপনাদের। আমি জানি আপনাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। এখন কেবল রেস্ট। সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশ দেখবেন। পাহাড়ি ঝরনার জলে স্নান করবেন। এক সপ্তাহের ছুটি।

সবুজ পাহাড়, নীল আকাশ আর পাহাড়ি ঝরনার জীবন। পাথুরে পাহাড় থেকে জল ঝরে পাহাড়ের গা বেয়ে। কিন্তু তাতে গোসলের শান্তি কোথায়! ঝরনার গায়ে বাঁশের চুঙি গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তাতে জল লাফিয়ে পড়ে দূরে, শীতল জলে স্নান।

এসএফএফ বাহিনীর সৈন্যরা, তিব্বতের মুক্তিযোদ্ধারা আগেই চলে এসেছে। তাদের ব্যারাক আলাদা। যদিও প্রতিটি বাহিনী আপাত আলাদা, কিন্তু সমগ্র দেমাগিরির বিস্তীর্ণ-বিশাল পাহাড়ি অঞ্চল হাজার হাজার সৈন্যের পদভারে মুখর। পাহাড়ের মৌনতার সঙ্গে সেই মুখরতা যুক্ত হয়েছে। আকাশে উড়ে বেড়ায় হেলিকপ্টার, দেখেই মনে হয়, একটা বিশাল যুদ্ধের আয়োজন চলছে।

দারাদের ক্যামেরাও প্রতিদিন হেলিকপ্টার আসে আইজল থেকে। সামরিক অফিসাররা আসেন, খাবারের সাপ্লাই আসে।

একদিন দারা আর নাজমুল হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করে এক প্রস্তরফলক। তাতে লেখা আছে, ১৮৬৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার ক্যাপ্টেন টিএস লেভিন দেমাগিরি আসেন। তার মানে কি একদিন দেমাগিরি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধীন ছিল?

একদিন পরিচয় হলো এক পাহাড়ি যুবক হেনরি সানগুইয়ার সাথে। হেনরি খ্রিস্টান। আইজল কলেজে থেকে ইন্টার পাস করেছে এবার। দেমাগিরির পাহাড়েই তার বাড়ি। হাত তুলে দেখাল পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কয়েকটা বাড়ি। এর মধ্যে সুন্দর সাদা বাড়িটা তাদের। হেনরি তাদের সঙ্গে ইংরেজিতেই কথা বলছিল। তার পরনে ছিল ট্রাউজার আর গায়ে তাদের ঐতিহ্যের বিশেষ পোশাক। তাকে বেশ অভিজাতই মনে হচ্ছিল।

হেনরিকে দারা টিএস লেভিনের নামফলকের কথা জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করে, দেমাগিরি কি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধীন ছিল?

হেনরি বলল, না না। তিনি সেখান থেকে এসেছিলেন। তিনি হলেন আমাদের থাংলিয়ানা।

থাংলিয়ানা অর্থ কী?

সকলের চেয়ে বিখ্যাত অর্থাৎ গ্রেটলি ফেমাস। তিনি আমাদের সঙ্গে দশ বছর বসবাস করেন। এই পাহাড়, পাহাড়ি নদী, পাহাড়ঘেরা গভীর হ্রদ, এই পাহাড়ি উপত্যকার সবুজ আর এই পাহাড়ের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। আমাদের এই পাহাড়ি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে অনেক কাজ করেন। এখানকার পাহাড়িরা লেখাপড়া শিখেছে। অনেক উন্নত হয়েছে।

হেনরির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব হলো।

হেনরিকে জিজ্ঞেস করল, এখানে কাছাকাছি হাটবাজার নেই?

আছে তো। এই তো এক মাইল হাঁটলেই তো দেমাগিরি বাজার।

যাবে? হেনরি জানতে চাইল।

হ্যাঁ, যেতে চাই। আমরা দেখতে চাই।

দেখতে চাওয়ার পেছনে একটা কারণ তো অবশ্যই ‘ব্যারাক-বন্দি’ জীবন থেকে একটুখানি স্বাধীনতা আর অন্য কারণটা হচ্ছে সিগারেট খাওয়ার বদ নেশাটা চালু রাখা। সৈনিকের জীবনে এই তামাকপাতা সম্ভবত অপরিহার্য সামগ্রী।

হেনরি তাদের পাহাড়ের খাঁজ কেটে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে নিয়ে চলল। পথের বাঁকে দাঁড়ালে দূরের শৈলশিখর চোখ কেড়ে নেয়। আবার ঘুরে দাঁড়ালেই অনন্ত প্রসারী সবুজ অরণ্য, নীল আকাশে মিশে গেছে একাকার হয়ে।

দারা বলল, ইচ্ছে করছে কবি হয়ে যাই।

হেনরি বলল, জায়গাটা আপনার ভালো লাগছে?

দারা বলল, আমরা দেরাদুনের পর্বতশিখরে ট্রেনিং নিয়েছি। সেই পর্বতের পাদদেশেও মানুষ বসবাস করে। ভাবতাম এত কষ্ট করে মানুষ থাকে! কিন্তু তোমাদের পাহাড়ের মানুষ কেন পাহাড়ে থাকতে ভালোবাসে, তা এখন বুঝলাম।

তোমাদের একদিন নদী দেখাতে নিয়ে যাব। অবশ্য একটু দূর আছে। নদী এসে মিশেছে নীল জলাশয়ে, পাহাড়ের রং মেখে নীল হয়েছে।

যদি অনেকদিন থাকতে হয়, তাহলে ছুটি নিয়ে যাব।

হেনরি হঠাৎ বলল, মাহবুবকে চেন?

কোন্ মাহবুব?

মাহবুব আজাদ। তোমাদের সাতকানিয়া আছে না, ওখান থেকে এসেছে।

আমাদের সঙ্গে আছে?

না না। মাহবুব এসেছিল মে মাসে। এই দেমাগিরিতে তাদের একশজনের ট্রেনিং হয়েছিল। বিএসএফ ট্রেনিং দিয়েছে। তারপর ওই নদীর ওদিকে বর্ডারে যুদ্ধ করতে যায় তারা। তারা এক মাস যুদ্ধ করেছে। মাহবুব বলেছে, এই যুদ্ধটা ঠিক যুদ্ধ ছিল না। নদীর এই পারে তারা, ওই পারে পাকিস্তানি আর্মি আর মিজো বাহিনী। মিজোরা এই পাড়ে এসে তাদের আক্রমণ করত। তখন তারা নদীপথে পালাতে চেষ্টা করত। তখন নদীর এক পার থেকে মিজো সৈন্য আর অপর পার থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করত। মুক্তিযোদ্ধারা পানিতে ডুবত, ভাসত। তখন তাদের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করত। মাহবুব বলেছে, এক মাসের যুদ্ধে তাদের ত্রিশজনের লাশ নদীতে ভেসে গেছে।

তারপর? দারা এবং পাখীÑ দু’জনেই সতর্কতার সঙ্গে এই যুদ্ধকাহিনি শোনে।

তারপর মাহবুবরা বিদ্রোহ করে। তারা সেখান থেকে চলে আসে এবং আর যুদ্ধ করবে না বলে জানায়। তারা বলেছে, এটা আত্মঘাতী যুদ্ধ।

তারপর?

তারপর এখানে পড়ে থাকল এক মাস। তারপর শুনেছি তাদের ট্রাকে ভরে শিলচর পাঠানো হয়েছে।

তোমার সঙ্গে তার পরিচয় হলো কোথায়?

এখানে। তোমাদের সঙ্গে হলো না, এই রকম। মাহবুব আমার বন্ধু হয়েছে, গুড ছেলে।

হেনরি বলল, এখানেও অনেক রিফিউজি আছে। তোমাদের দেশ থেকে এসেছে। ততক্ষণে তারা বাজারের উপকণ্ঠে চলে এসেছে।

পাহাড়ের উপরে সমতল আর উপতল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে দেমাগিরি বাজার। কোথায় যে এর শুরু আর কোথায় যে শেষ বুঝতে পারছে না। দোকানঘরগুলো একটানা নয়। আলাদা আলাদা। হাঁটতে হাঁটতেই দেখল, অধিকাংশ দোকানে বসে আছে সুন্দর সুন্দর মেয়ে; তারাই দোকান চালাচ্ছে।

বাজারে অনেক মানুষ। পুরুষও আছে নারীও আছে। কিন্তু গ্রাম্যবাজারের মতো জটলা করে তারা চলছে না।

হাঁটতে হাঁটতে নাজমুল জিজ্ঞেস করল, তুমি যে একটু আগে শরণার্থীর কথা বললে, তারা কোথায়? কতজন এসেছে?

হেনরি বলল, অনেক। চার-পাঁচ হাজার। অনেক ক্যাম্প আছে। পাহাড়ের উপত্যকায়।

হেনরি তাদের টেনে নিয়ে যায় একটা জায়গায়। তারপর হাত তুলে দূরের কতকগুলো ব্যারাকের মতো ঘর দেখায়। বলল, ওটা একটা ক্যাম্প।

দারা বলল, এরা কি ট্রাইবাল? এদেরকেও আসতে হয়েছে?

হেনরি বলল, না না, কেবল ট্রাইবাল না, সমতলের অনেক লোকও আছে।

ওদের কোথায় দেখা পাব?

ওদের সঙ্গে কথা বলতে চান? এখানেই অনেক আছে। এই বাজারে এখন যে এত মানুষ দেখছেন, তার মধ্যে অনেক শরণার্থী আছে। বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে আসা সৈন্যরাও থাকতে পারে।

শরণার্থীদের চিনব কী করে?

নিজে নিজেই চিনতে পারবেন। মিজোদের তাদের পোশাক দেখেই চেনা যায়।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দাঁড়ায় হেনরি।

বলল, ওই যে দুজন লোক আসছে, ওরা আপনাদের লোক। কথা বলবেন?

দারা এবং নাজমুল একসঙ্গেই বলল, অবশ্যই বলব।

তারা একসঙ্গেই দ’ুজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দারা, নাজমুল নিজেদের পরিচয় দিল। বলল, দেশের ভেতরে যাব। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে আমাদের ধারণা নাই। একটু কথা বলব।

দু’জন একসঙ্গেই বলল, বলেন, বলেন।

নাজমুল হেনরিকে বলল, কোনো একটা হোটেলে গিয়ে বসি। ওনাদের সঙ্গে কথা বলব।

হেনরির সঙ্গে তারা হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের উপরতলের একটা ছোট হোটেলে এলো। এটা আপাতত কাস্টমারশূন্য।

দোকানে কাচের আলমারিতে কয়েক পদের মিষ্টি আছে। রসগোল্লা আছে, গোলাপজাম আছে। কচুরিও আছে।

মিষ্টি দেখে দারার চোখ চকচক করে ওঠে।

বলল, নাজমুল, মনেই পড়ে না কবে মিষ্টি খেয়েছি।

ক্যাশে বসা লোকটা উঠে এলো। বলল, স্যাররা কি জয় বাংলার?

বাংলা কথা শুনে দারা-পাখী চমকাল।

দারা বলল, ভাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে এতদূর এলেন এই ব্যবসা করতে?

ক্যাশে বসা লোকটাই মালিক। তার নাম সুবিমল ঘোষ।

সুবিমল বলল, না না আমি কলকাতার না। আমি জয় বাংলার।

জয় বাংলার কোথায়?

লাকসাম।

এটা শুনে তাদের আরও অবাক হবার পালা। বিশেষ করে নাজমুলের। লাকসামতো নাজমুলের কুমিল্লাতেই।

নাজমুল ভাবল, লোকটার সঙ্গে কথা বলার সময় পাওয়া যাবে। শরণার্থীদের ডেকে এনেছে, আগে তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

নাজমুল বলল, দারা ভাই কী কী খাবেন? অর্ডার দেন।

দারা বলল, দুইটা করে রসগোল্লা, একটা কালোজাম আর একটা করে কচুরি দেন।

শরণার্থীদের দু’জনই চাকমা। তারা দুই ভাই।

সুরেশ চাকমা, বীরেশ চাকমা। সুরেশ বড়, বীরেশ ছোট। তারা এসেছে রাঙামাটি থেকে।

দারা বলল, আগরতলা, মেঘালয়, কলকাতা, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ সবখানে শরণার্থী ক্যাম্প আছে। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে গেছি যখন শুনলাম এখানেও শরণার্থী এসেছে। একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, আপনাদের বাড়িঘর সব পাহাড়ের উপর, গাছগাছালিপূর্ণ জঙ্গলের ভেতর। আপনারা কীভাবে এই বিপদের মধ্যে পড়লেন?

সুরেশ-বীরেশ দুই ভাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। দারার এই আজব ধরনের প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবে ভাবে। পরে দু’জন একসঙ্গেই প্রশ্ন করে, আপনি কখনও হিল ট্র্যাক্টে গেছেন? ধরেন রাঙামাটি, মহালছড়ি, বান্দরবান।

না যাইনি।

বীরেশ বলল, সেজন্যই আপনার প্রশ্নটার উত্তর আপনি পাচ্ছেন না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জায়গা তো আর জঙ্গল না, পাহাড় না। এখানেও বিশাল কাপ্তাই লেক আছে, সমতল জায়গা আছে। টাউন আছে। টাউনে মানুষ থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক ট্রাইব আছে। তারা আলাদা আলাদা পাড়ায় বসবাস করে। অনেক বাঙালিও আছে। তারাও বাড়িঘর করেছে। আমাদের ভাগ্য খারাপ। আমাদের মধ্যে যারা আগে থেকে পুলিশ বা ইপিআরে ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেও পারি নাই। আমাদের মুক্তিরাও মেরেছে, পাকিস্তানি সৈন্যরাও মেরেছে। পালানো ছাড়া আমাদের আর উপায় ছিল না।

দারা এবং নাজমুল দু’জনই তাদের কথা শুনে বোকা বনে যায়।

নাজমুল মনে মনে পস্তায়, কী দরকার ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখানোর। এখন তো মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্নামের কথাও শুনতে হচ্ছে।

কিন্তু দারা চুপ থাকে না। বলল, ভাই দুঃখ পেলাম। মুক্তিরা কেন আপনাদের মারতে গেল?

বীরেশ সত্যিই উত্তেজিত হলো। বলল, জানেন, আজ তো আমারও আপনার সঙ্গে থাকার কথা। কিন্তু আমরা যখন এলাম, তখন আমাদের নিল না। বাঙালিদের নিল। তখন তো অত বুঝি নাই। পরে শুনেছি। আমাদের রাজা ত্রিদিব রায়। তিনি পাকিস্তানিদের সাপোর্ট করেছেন। তার অনুসারী কয়েকজন রাজাকার হয়েছে। কিন্তু সবাইতো আর তার অনুসারী না। বাঙালিদের মধ্যে সবাই কি মুক্তিযুদ্ধ চায়? সেখানেও রাজাকার আছে।

আর ত্রিদিব রায়, তিনি কী ইচ্ছা করে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছেন? অনেক ঘটনা আছে। আমরা তো রাঙামাটি শহরের লোক, অনেক কিছুর সাক্ষী। প্রথম যখন জিয়াউর রহমান আসে তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে অথবা এরপরও যারা আসে তারা অথবা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের যত অফিসার, টিচার বা বড় বড় নেতা এলো, তাদের কে তত্ত্বতালাশ করেছে। শত শত সৈন্যের খাবারদাবার কারা দিয়েছে- আমরা দিয়েছি। তারপর তারা মহালছড়ি যায়, সেখান থেকে খাগড়াছড়ি, তারপর রামগড় পর্যন্ত- পুরো রাস্তায় কারা তাদের খাবার দিয়েছে, যত্ন করেছে। নৌকা দিয়ে নদী পার করেছে। কাঁধে করে মালামাল টেনেছে- সব আমাদের পাহাড়ের মানুষ। অথচ মুক্তিরা আমাদের মেরে দিল?

আবারও একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হলো। দারা কিছু বলে না।

বীরেশ একটু শান্ত হলো।

ততক্ষণে তাদের সামনে মিষ্টি দেওয়া হয়েছে।

দোকানটার পেছন দিকে আরেকটা অংশ আছে। সেখানে কিচেন আছে। দোকানের দু’জন কর্মচারী, পেছনেই ছিল। সুবিমল ডাক ছাড়ে, বলাই, রসিক। বলাই আর রসিক নামের দুই কিশোর দৌড়ে আসে। তারপর তারাই যত্ন-আত্তি করে টেবিল মুছে দিয়ে মিষ্টির প্লেট সাজিয়ে দেয়।

দারা বলল, দাদা মিষ্টি খান।

বীরেশ বলল, না কথাটা শেষ করে নিই। কী হলো শোনেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজান পর্যন্ত এসে গেছে। ওদিক দিয়ে কাপ্তাইতেও পৌঁছে গেছে তারা। কাপ্তাইতে এর আগে বিহারি অফিসার ও কর্মচারীদের বাঙালিরা মেরেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা আসার পর বাঙালি অফিসারদের মেরে আর মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানিরা প্রতিশোধ নেয়। রাউজানেও মানুষকে হত্যা করে। এসব খবর রাঙামাটিতে এসে পৌঁছায়। একটা আতঙ্ক শুরু হয়। তখন জিয়াউর রহমান তার সৈন্যবাহিনী এবং অনন্য অফিসাররা রাঙামাটি ছেড়ে চলে গেছে।

কিন্তু এসডিও আবদুল আলির নেতৃত্বে ছাত্র যুবক ও ইপিআর নিয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধারা রয়ে যায়। এ রকম একটা দুঃসময়ে রাঙামাটির মানুষের পাগল হবার অবস্থা। সে সময় রাঙামাটির ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম স্যার আর হজরত আলি আর কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতা রাজবাড়িতে গিয়ে রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। ত্রিদিব রায় আওয়ামী লীগের এমএনএ না। তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তো উনারা গিয়ে রাজাকে বললেন, আপনি পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন রাজা, একজন জনপ্রতিনিধিও। আপনি সব মানুষের নেতা। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাঙামাটি আক্রমণ করবে- আমরা খবর পেয়েছি। মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে। তারা আতঙ্কগ্রস্ত। তাদের বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার। কিন্তু তারা আক্রমণ করার আগেই যদি আপনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে হয়তো তারা শান্তিমতো রাঙামাটিতে আসবে। রাঙামাটির মানুষ বেঁচে যাবে।

রাজা তার ভাইসহ রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি বাজারে মানুষের মতামত শোনেন। তারাও তাকে একই কথা বলে।

রাজা তখন রাঙামাটি আর পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে বাঁচাতে রাউজান আর্মি ক্যাম্প, চট্টগ্রাম আর্মি হেডকোয়ার্টারে যান। তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরদিন পাকিস্তানিরা রাঙামাটি আসে এবং শান্তি বজায় থাকে।

এইটাই হলো আমাদের অপরাধ। মুক্তিবাহিনী মনে করল আমরা পাহাড়িরা বিশেষ করে চাকমারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে তারা যেখানেই চাকমাদের পেয়েছে, মেরেছে। আর পাকিস্তানিরা রাঙামাটি আসার পর তথ্য পায়, আমরা প্রথম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছি। তখন আমরা তাদেরও টার্গেট হই। বহু পাহাড়ি পরিবারের মেয়েরা তাদের নির্যাতনের শিকার হয়। ফলে পালিয়ে আসা ছাড়া আমাদের আর উপায় থাকে না।

কেবল চাকমারাই পালিয়ে এসেছে?

তা কেন, মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, কুকি, মুরং সবাই পালিয়েছে।

জানেন আমরাও মহালছড়ি, মানিকছড়ি, রামগড়- এই পথে ত্রিপুরা যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে মহালছড়ি রামগড় দখল করেছে পাকিস্তানিরা। মানিকছড়ির মং রাজা হলেন মং প্রু সাইন। তিনি চট্টগ্রাম থেকে সাবরুমের পথে যাওয়া হাজার হাজার শরণার্থীর জন্য তার রাজভাণ্ডার উজাড় করে দেন। পাকিস্তানিরা রামগড় দখল করার পর মানিকছড়ির রাজবাড়িকে গোলা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়। তাদের মন্দির ধ্বংস করে। তাদের সম্পদ লুটপাট করে। মানুষজন হত্যা করে। অবশ্য মং রাজা আগেই তার অনুগতদের নিয়ে ভারতে চলে যান। তিনিও এখন সেখানে যুদ্ধ করছেন। তো আমরা ওই পথে যাই নাই। আমরা খবর পাই, মহালছড়িতে জিয়াউর রহমান এবং অন্যান্য বাহিনীকে সাহায্য করার অপরাধে সেখানকার বহু চাকমা আর উপজাতিকে হত্যা করা হচ্ছে। অনেকে আবার এদিকে পালিয়েও আসে। পরে আমরা বরকল হয়ে সীমান্তের এই পারে আসি। নুনসুরি, দেমাগিরি, আইজলে এখন অনেক শরণার্থী।

বীরেশের মিষ্টি খাওয়া হয়নি।

কথা শেষ করে বীরেশ কারও মুখের দিকে তাকায় না। গপাগপ মিষ্টিগুলো খায়।

ততক্ষণে চা এসে গেছে।

দারা গলা ছেড়ে ডাক দেয়, বাবা বলাই, বাবা রসিক।

একজন দৌড়ে আসে, বলাই অথবা রসিক।

দারা বলল, তোমার নাম কী?

বলাই।

সিগারেট পাওয়া যায়?

হেঁ। কী সিগারেট?

কী সিগারেট পাওয়া যায় জানি না তো।

ভালো ব্র্যান্ড দিতে বলবা।

বলাই বার্মিজ সিগারেট নিয়ে এলো।

দারা প্যাকেটটা খুলে সামনে রাখল। বলল, যাদের অভ্যাস আছে খান।

সুরেশ বীরেশ দুই ভাই সিগারেট টেনে নিল।

দারা আয়েশ করে সিগারেট টানে আর নাজমুল সুবিমল ঘোষকে নিয়ে পড়ল।

সুবিমল বাবু। এটা কী আপনার দোকান?

হ্যাঁ।

কত বছর ধরে এখানে আছেন?

বারো বছর।

সংসার, ছেলেমেয়ে?

আছে। দুই মেয়ে, মিশনারি স্কুলে পড়ে।

ভালো তো।

এখানে সবাই এই স্কুলে পড়ে। খ্রিস্টান স্কুল। আল্লাহ-খোদা-ভগবানের আগে যিশুর নাম শেখে।

খুব ভালো।

এখানকার লোকজন সব শিক্ষিত। বেশির ভাগ লোকই খ্রিস্টান। আমার মেয়েরাও ভবিষ্যতে খ্রিস্টান হয়ে যাবে।

কিছু একটা মনে পড়তেই মৃদু হাসল নাজমুল। বলল, সুবিমল বাবু, আপনার বাড়িটা লাকসাম না হলে ভালো হতো।

কেন স্যার?

তা’হলে একটা গল্প শোনেন। দুই বছর আগে চাঁদে মানুষ গিয়েছে শুনেছেন?

শুনেছি।

তো তখন যে রকেট চাঁদে গিয়েছিল, তার পাইলট চাঁদে নেমে দেখে একজন লোক বসে বসে হুঁক্কা খাচ্ছে। কী ব্যাপার, সারা দুনিয়া জানছে, তারা প্রথম নেমেছে চাঁদে। তা হলে এই লোক কে?

পাইলট বলল, এ ভাই আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন?

হুক্কাঅলা বলল, দেখতেছেন না আমি মানুষ। নোয়াখালিরতুন আইছি।

নাজমুল হাসতে হাসতে বলল, সুবিমল বাবু, আপনি যদি নোয়াখালি থেকে আসতেন, আমি মনে করতাম ঠিক আছে, আসতেই পারেন। কিন্তু আপনি কীভাবে আসলেনরে ভাই?

সুবিমল হাসতে হাসতে বলল, স্যার আমার উনি কিন্তু আমার আগে এসেছেন।

মানে আপনার বেগম?

হ্যাঁ, আর শোনেন উনির বাড়ি নোয়াখালি।

বলেন কী?

গল্পের মধ্যে ক্লাইমেক্স আছে। দারাও কান খাড়া করে।

সুবিমল বলল, আমি চট্টগ্রাম এসেছিলাম। সেখান থেকে চন্দ্রঘোনা। তারপর বাঁশের কারবারিদের সঙ্গে বরকল। তারপর এইখানে। এইখানে এসে দেখা হইল উনির বড়দার সঙ্গে। তারও দোকান আছে এইখানে।

তারা কীভাবে এলো?

তারা আসে দাঙ্গার সময়। নোয়াখালির লক্ষ্মীপুরে তাদের বাড়ি। এখানে অনেক নোয়াখালির লোক আছে। সবাই ওই সময়ে এসেছে।

তখন আপনার উনির বয়স কত?

উনি তখন ছোট। আমার মেয়ের সমান।

তারপর প্রেম হলো কীভাবে?

বললাম না উনির বড়দার কথা। উনার দোকানে কাজ করতাম। আর উনির সঙ্গে মন-ভালোবাসা হলো। তারপর দাদা বললেন, বিয়া কর। খুশিমনে করলাম।

সুবিমলের প্রেমের গল্পটা সরল, সোজাসাপটা। দারা ক্লাইমেক্সের কথা ভেবেছিল। ক্লাইমেক্সও নেই, ট্র্যাজেডিও নেই। তবু দারার ভালো লাগে। একটু অন্যরকমের। আজ অনেকদিন পর আবার দীপার মুখটা মনে পড়ল। এরকম একটা ট্র্যাজেডির জীবন কেন হলো দীপার আর সেই ট্র্যাজেডির দুঃখগাথা নিয়েই তাকে বাঁচতে হবে!

কিছুতেই সুবিমলকে টাকা দেওয়া গেল না।

সুবিমল বলল, আপনারা যুদ্ধ করতে দেশে যাইতেছেন। দেশ স্বাধীন হলে একবার যাবো।

দোকান থেকে বেরোতে বেরোতে বীরেশকে বলল দারা, বীরেশ, যুদ্ধ এরকমই ভাই। মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, সম্পর্ক কেড়ে নেয়, ভিটামাটি কেড়ে নেয়। স্বজনহারা, উদ্বাস্তু করে দেয়। ওই যে বললেন না, আপনাদের কেউ কেউ রাজাকার হয়েছে, কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে একজন আরেকজনকে মারবে। এটাই যুদ্ধ। আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন, যেন দেশটা উদ্ধার করতে পারি, আপনারা নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরতে পারেন।

বীরেশরা চলে গেলে হেনরি বলল, তাহলে আমিও যাই।

তুমি না তোমার বাড়ি ওই দিকে দেখালে।

হেনরি হেসে বলল, ওইদিকটাই এইদিক। পাহাড় হলো রহস্যের গোলকধাঁধা। পাহাড়ে যারা পথ হারায়, তারা আর ফিরতে পারে না। আপনারাও সাবধানে যাবেন।

দারা বলল, পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। তুমি কাল এসো। তোমার কাছে মিজোদের স্বাধীনতা চাওয়ার কথা শুনতে চাই।

হেনরি বলল, ওটার বিষয়ে শোনার এমন কিছু নেই। একটা দল চায় স্বাধীনতা। তাদের যুক্তি হলো, বার্মা, চীনÑ এই বেল্টের সঙ্গে তাদের সম্পর্কযুক্ত থাকা। বার্মায় অনেক মিজো বসবাস করে। যারা স্বাধীনতা চায় তাদেরকে হেল্প করছে পাকিস্তান। তবে আমার কাছে মনে হয় না এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।

হেনরি চলে যায়।

দারা এবং নাজমুল ফেরার পথে সত্যি সত্যিই গোলকধাঁধায় পড়ে। তবু তারা ফিরতে পারে।

সিরাজুল ইসলাম মুনির : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares