গল্প : খোঁড়ল : লিটন মহন্ত

গল্প

খোঁড়ল

লিটন মহন্ত

আশ্বিন মাস এলেই রমিজ মণ্ডলের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়; বেদনায় ছ্যাঁক করে ওঠে বুকের দৃশ্যমান পাঁজরগুলো। রমিজ মণ্ডল হাঁটে আলপথ দিয়ে বাড়ি অভিমুখে, আবছা অন্ধকারে মেঘহীন আকাশের দিকে তাকায়, হুহু করে ওঠে শূন্যতার মেঘগুলো, দিশাহীন গন্তব্যে ছুটে চলে দিনের রৌদ্রস্নান শেষে বিষণ্ন ক্লান্ত পায়ে অজানার উদ্দেশ্যে। সাঁঝ উতরে গিয়ে অন্ধকার সবেমাত্র বরফের মতো ঘন হতে শুরু করেছে। বোধহয় রাতের অন্ধকারে বোবা ভাষা ফুটে ওঠা শুরু হলো। অনেক পরিচিত এই পথ, তাই অন্ধকারেও পদস্খলন ঘটে না তার। বিড়িতে শেষ টান দেবার সময় তার তোবড়ানো গালে দ্বিগুণ গর্ত সৃষ্টি হয়। আগুনসহ বিড়ির অবশিষ্ট অংশ ছুড়ে ফেলল পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতের বুকে। ঝিঁঝিঁ ডাকছে বহুমাত্রিক ছন্দে, মনের মধ্যে তা এক অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরি করে রমিজ মণ্ডলের। সারাদিন পরিশ্রম শেষে গামছায় দুই কেজি চাল আর এক কেজি আলু, রমিজ মণ্ডল পায়ের গতি এবার দ্বিগুণ করে। খিদেটাকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না, অসহ্য হয়ে উঠছে ক্রমশ। সাতসকালে আধপেটা পান্তা লবণ আর কাঁচামরিচ ডলে খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিল, ঘোষপাড়ার মোল্লাবাড়িতে সে প্রায় প্রায়ই কামলা দেয়। রমিজ মণ্ডল দুপুরে যা খেয়েছিল, তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল অতি নগণ্য। তিনখানা রুটি আর এক চিমটি গুড়। মোল্লার মতো হাড়কিপটে এই গ্রামে আর দ্বিতীয়জন নেই, সেও কামলাদের সাথে বসে ক্ষেতের মধ্যে রুটি আর গুড় খেয়েছে। মোল্লা সব সময় কামলাদের পিছনে লেগে থাকে, যাতে কেউ কাজে ফাঁকি দিয়ে আলের মধ্যে বসে বিড়িতে ফুঁক না দেয়। রমিজ মণ্ডলের একা উপার্জনে সংসারে নিয়মিত দু’বেলা উনুন জ¦লে না। শুধু ডাল-ভাত পেলেই বেঁচে যাওয়া এই মানুষগুলো কখনও তিন বেলা ভাতের স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত নয়। তিন বেলা সফেদ ভাতের স্বপ্ন তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন, পেটের ক্ষুধার জ¦ালা সব স্বপ্নে জল ঢেলে দেয়, হায়! প্যাট। এই প্যাট আর চ্যাটের জ¦ালায় দুনিয়া অস্থির। মনে মনে ভাবতে থাকে রমিজ মণ্ডল, দুনিয়াত কত ভাত, কত ভাত, এই ভাতের জন্য মাগিরা ভাতার ধরে, দুনিয়াত ভাতের উপর আর কোনো সত্যি নাই। জান্তব অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাবার সময়, হঠাৎ তার চিন্তায় ছেদ পড়ল, যখন তার চোখেমুখে পাঁচ ব্যাটারির টর্চের আলোকচ্ছটা বিপর্যস্ত করে তার দৃষ্টিশক্তি।

কায় বাহে এদন করি নাইট ধরছেন।

টর্চের পিছন থেকে অজ্ঞাত পথিক বলে ওঠে- হামাক চিনবার নন, অন্যগ্রাম থাকি আসছি, ঘোষপাড়াটা কোনদিক বাহে, কবার পান।

সামনত গেইলে বড় রাস্তা পাইবেন, সেই রাস্তা ধরি সামনত গেইলে একটা বড় পাইকর গাছ পাইবেন, ওই গাছের পাছপাকত হইল ঘোষপাড়া।

রমিজ মণ্ডল অন্ধকারের পর্দা খুঁটে অপরিচিত পথিককে একনজর দেখার চেষ্টা করে। এ জনমে দেখেছে বলে মনে হয় না। অস্পষ্ট মুখ দুটো বেশ ক্ষিপ্ত ভঙিতে পাশ কাটিয়ে পিছনে চলে গেল। রমিজ মণ্ডলের বুকে অচেনা এক দুশ্চিন্তার ত্রিশূল হঠাৎ খচ্খচ্ করছে। এই রাস্তা দিয়া কার বাড়িত গেছিল মানুষগুলা। নিজেকেই প্রশ্নবাণ ছুড়ে মারে রমিজ মণ্ডল ভেতর থেকে কোনো সদুত্তর পায় না। অদূরেই তার বাড়িতে নুয়েপড়া বেড়ার ফোকর দিয়ে কেরোসিন কুপির আলো গলিয়ে পড়ছে। সেই আলোয় প্রভাদীপ্ত হয়ে ওঠে বাড়ির পার্শ^বর্তী সবজিক্ষেতের কচি চারাগুলো। ভাতের হাঁড়িতে সবেমাত্র বুঁদবুঁদ ফুটছে, রান্নাঘরের বাতাসে ফ্যানভাতের একটা কাঁচা গন্ধ রমিজ মণ্ডলের ক্ষুধাটাকে একটু উসকে দেয়। টেপি বাড়ির বড় মেয়ে, ছোট বোন বুচির সাথে তার বয়সের পার্থক্য মাত্র দুই বছর। রমিজ মণ্ডলের শেষ সন্তান তার একমাত্র ছেলে দুবের। দুবেরের বয়স সবেমাত্র ছয়-সাত বছর, সে টেপির অন্ধভক্ত। টেপি আর দুবের কাঁথা মুড়ে দক্ষিণ ঘরের শক্ত মাচানের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে গল্প গিলছে। রমিজ মণ্ডলের বৃদ্ধ মা নুরি বেগম জীর্ণ-শীর্ণ দেহরথ নিয়ে এখন বহাল তবিয়তে পৃথিবীতে বর্তমান আছে। দোষ তার একটাইÑ খিদে পেলে অসম্ভব বিক্ষিপ্ত লাগামহীন কথা বলে। এই নিয়ে প্রায়শই ছেলের বউ মরিয়মের সাথে নুরি বেগমের কুরুক্ষেত্র চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বউ-শাশুড়ির এই যুদ্ধ রমিজ মণ্ডলের একদম ভালো লাগে না। এই বাগ্যুদ্ধ তো শুধু আবার সেই ভাতের জন্য। একটা বয়সে মেয়েমানুষের ভাতের সাথে ভাতার লাগে। বয়স পেরিয়ে গেলে তখন ভাতটাই যেন জীবনের মুখ্য চাওয়া-পাওয়া হয়। নুরি বেগমের তিন বেলায় ভাত চাই, বেশি ভাত খায় না, খোরাকি তার কমে গেছে বিভিন্ন অসুখের কারণে। রাত হলেই নুরি বেগমের কাজ হলো মাচানের বিছানায় বসে পান-সুপারি চিবানো আর নাতি-নাতনিদের গল্প বলা। সে গল্প বলছে, গল্প বলতে বলতে খক্ খক্ করে কেশে ওঠে। তার বুকের ভেতর ঘর ঘর শব্দ হতে থাকে, কেউ যেন কাঁসর ঘণ্টা বাজাচ্ছে। মনে হয় মুখ দিয়ে একদলা রক্ত বেরিয়ে এলো, কিন্তু কিছুই আসে না, এমনকি সামান্য কফ পর্যন্ত না। হয়তো যা আসে বুড়ি পানের পিকের সাথে থপ করে গিলে খায় পেটের ক্ষুধায়। টেপির কোল থেকে দুবের মাথা তুলে বলে উঠলÑ

দাদি তুই ওদ্যান করি কাঁশিশ ক্যা, তোর কি যক্ষ্মা হইছে? 

আরে যক্ষ্মা হইলে তো বাঁচি গেনুহয়। আল্লাক এত কং মোক তুই দুনিয়াত থাকি তুলিনে। এদোন কপাল নিয়া মুই বাঁচি থাকপার না চাং।

নুরি বেগম কথাগুলো বলতে বলতে আবার কাশির তোড়ে নুইয়ে পড়ে। বাঁশের মাচান বিছানার উপর সে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। শুকনো বুকখানা শুধু দ্রুত ওঠা-নামা করছে। টেপি একটু হকচকিয়ে যায়। সে কাঁথার কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে দাদির বুকে হাত দিয়ে মালিশ করতে থাকে। দুবের দাদির মাথার কাছে মুখ এনে বলল-

দাদি আইজ আর গল্প করা নাগবার নয়।

টেঁপি মোক একনা পানি আনি দে মুকখান শুকি গেইছে।

পানি আনার জন্য টেপি রান্নাঘরে ছুটে গেল। রাতে টেপি আর বুচি দাদির সাথে একই বিছানায় শোয়। টেপি দাদির শরীরের সাথে লেপ্টে গিয়ে একটু ওম পেতে চায়। তার দু’চোখে ঘুম জেঁকে বসছে না। কার্তিকের রাতের সুচফোঁড় বাতাস স্বচ্ছন্দে ধারার বেড়ার ফোকর দিয়ে আস্ফালন করে। এবার বোধহয় শীত একটু আগেই চলে আসবে, টেপি পাশ ফিরে দাদির শরীরে হাত রাখে, গভীর ঘুমে নুরী বেগম ঘুমের ভেতর হু করে উঠল। কার্তিকের রাতে ক্রমশ ঘনায়মান কুয়াশায় প্রকৃতির নির্জনতা নিঃসঙ্গ পথিককে যেন আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে। অনেক গেরস্ত কার্তিকের শেষেই ধান কাটা শুরু করে দিয়েছে, কলাপাকা ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত। ইদানীং জমি থেকে ধান চুরি হয়ে যায়, চোরেরা ধানের শিষ কেটে নিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। গেরস্তদের চোখে ঘুম নেই, জমির পাশে ছাউনি তুলে পাহারা দেয় ধানি জমি। মাঝে মাঝে দোলার নিচু জমিতে আগুন জ¦লে ওঠে। ভূতের আগুন। রাতজাগা গেরস্ত খড়ের ভুতিতে আগুন জিইয়ে রাখে বিড়ি খাওয়ার জন্য, এ ছাড়াও খানিকটা সাহসকে জিইয়ে রাখতে চায়। মাঝে মধ্যে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ধর ধর শব্দ শোনা যায়, তারপর নির্জনতা আবার ক্রমশ গাঢ় হয়। মনে হয় নিঃসঙ্গ এই অন্ধকার রাতে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে বুকের ভেতর। কার্তিকের রাতের আকাশে সামান্যতম চঞ্চলতা নেই, জলছাপ মেঘগুলো যেন প্রচ্ছদ হয়ে ফুটে আছে আকাশের গায়। এলাকায় মঙ্গা দেখা দিলেই ছিচকে চোরের উপদ্রব বেড়ে যায়, ধরা পড়লে গ্রাম্য সালিশ বসে। অধিকাংশ চোর নিরন্ন উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষ। এক মুঠো ভাতের জন্য এখানে মানুষে মানুষে অন্তহীন ব্যবধান। ভাতের জন্য মানুষ মনের সমস্ত আড় ভেঙে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে ছুটে চলে শহর অভিমুখে। বেঁচে থাকার নিরন্তর অভিলাষ মানুষের অন্তরাত্মাকে অসহিষ্ণু করে তোলে এক থাল ভাতের জন্য। অথচ মানুষ বাঁচে স্বপ্ন দেখে, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার আশায়। শুধুমাত্র এই পেটের জন্য পৃথিবীর কাছে, জীবনের কাছে, সমাজের কাছে, নিঃশর্ত এই দায়বন্ধন মেনে চলা। এই দায়বন্ধন কিছু কিছু মানুষকে অসম্ভব সংবেদন-রিক্ত মানুষে পরিণত করে। ফজরের নামাজের সময় নুরি বেগমের ঘুম ভাঙল; আচ্ছন্নতার ঘোরে সে পাশ ফিরে টেপি আর বুচিকে দেখে। এক অলৌকিক মায়া যেন খুঁজে পেলেন এই কিশোরী দুটির মুখে, মায়া-মমতা নারীর যে চিরন্তন অভিব্যক্তি তা ফুটে উঠল নুরি বেগমের অবয়বে। মেয়ে দুটি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কলাগাছের মতো বেড়ে উঠছে। চোখ রগড়াতে রগড়াতে অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করলÑ আল্লা। অন্ধকার ক্রমশ অনাবৃত হতে থাকে, আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত যূথবদ্ধতায় নুরি বেগমের ঋজু শরীরখানা সংক্ষুব্ধ স্লোগান তুলে মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে দেয়। অজু করে নুরি বেগম চটের জায়নামাজে নামাজ পড়তে বসে। সবেমাত্র ঘুম ভাঙে টেপির, সে একবার কাঁথার ফাঁক দিয়ে দাদির দিকে একনজর তাকায়। দিনের প্রথম আলো ফুটছে একটু একটু করে। পাশের ঘরে দরজা খোলার শব্দ, কিছুক্ষণ পর দুবের দুই ঘরের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। মাঝেমধ্যে শুকনো পাতার মধ্যে পেচ্ছাব পড়লে থর থর শব্দ হয়। টেপি বিছানা থেকে নামে।

দুই.

টেপি আর দুবের একটা চটের থলে হাতে উঠানের কোণে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে, তাদেরকে দেখে নুরি বেগম গলা নিংড়ে বলল-

এই সাত সকালত ব্যাগ হাতত কোন্টে যান রে।

টেপি চটের থলেটা ছেঁড়া চাদরের তলায় লুকিয়ে বললÑ

নোয়ায় দাদি কোন্টে আবার যামো।

আর একনা পরে চড়াই গুলাক ছাড়ি দে।

টেপির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে নুরি বেগম ঘরের ভেতর গেল।

চল বু তাড়াতাড়ি যাই নাইলে সবাই চলি আসপে।

 টেপি একবার আড়চোখে দাদির ঘরের দিকে তাকিয়ে দুবেরের হাত ধরে হাঁটা দেয়। শীতল ক্রূর হাওয়া টেপি আর দুবেরকে বিদ্ধ করছিল, কিন্তু তবুও তাদের উদ্যমে কোনো কমতি নেই। ভোরের স্বর্ণালি আলোকচ্ছটা কুয়াশা ঢাকা মাঠের উপর একটা দিগন্তরেখা টেনে দিয়েছে। পা শিশিরে ধুয়ে ভিজে যাচ্ছে, ঘন ঘন নিঃশ^াস টানে টেপি আর দুবের। খানিকটা দৌড়ে এসেছে তারা। দুই ভাইবোন একটা ধানের জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে, যে জমির ধান গতকাল সন্ধ্যায় গেরস্ত কামলা দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে। অন্তহীন বিস্ময়ে দুবের টেপিকে বললো-

বু এলাও দ্যাখ কেউ আইসে নাই।

নে তাড়াতাড়ি ধান কুড়াও, বেলা হইলে সবাই চলি আসপে।

এখনও অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি। দুবের কয়েকটা ধানের শিষ কুড়িয়ে পেল। টেপি জমির ভেজা মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে ধান তুলে ব্যাগে ভরছে। একটা ইঁদুর দুবেরকে দেখে মাটির গর্তে লুকাল।

বু এই দ্যাখ এন্দুরের খাইল, এই খাইলত বু অনেকগুলা ধান আছে, চল খুঁড়ি অনেক ধান পামো। টেপি কাঁধ ফিরিয়ে দেখে, তারপর দুবেরের দিকে তাকিয়ে বললÑ

এক কাম কর, বাড়িত থাকি কোদাল নিয়া আয়।

মুহূর্তে দুবেরের মুখ ম্লান হয়ে যায়।

    মোক একলায় যাইতে ভয় নাগে। 

   আরে ভয় নাই, যা তাড়াতাড়ি যা।

দুবের অধোবদনে একবার টেপির দিকে চেয়ে বাড়ির আলপথে হাঁটা ধরে। দুবের একটু দূরত্বে চলে গেলে এক অদ্ভুত আতঙ্ক টেপিকেও গ্রাস করল। টেপি পিছন ফিরে একবার দুবেরকে দেখল। আয়ত চোখ দুটি বিস্ফারিত করে জমির এক কোণে অবস্থিত খড়ের ঘরের দিকে তাকায়। টেপি বিড়বিড় করে। দুবেরকে এখন আর দেখা যায় না। সে আলো-আঁধারির কুয়াশা ঢাকা মেঠোপথে হারিয়ে গেছে। টেপি কয়েক মুঠো ধান জমি থেকে তুলে ব্যাগে রাখল। প্রকৃতির এমন ব্যাপ্ত নির্জনতায় নিঃসঙ্গ টেপি ক্রমশ নিজের ভেতর আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গর্তের মুখে ইঁদুরটা মুখ বের করে টেঁপিকে দেখে ছোঁক ছোঁক করছে, আবার সটকে যায় ভিতরে। পিছনে কিছু একটা শব্দ হলো বোধহয়। টেপি পিছন ফিরতেই দেখতে পেল দু’জন মানুষ। হকচকিয়ে যায় টেপি, তার হৃৎপিণ্ডে ধুকপুকানি চলছে। হাত থেকে ধানের ব্যাগটা পড়ে গেল। মুখে কথা ফুটছে না।

ধান নিবু।

একজন টেপির দিকে ভ্রুকুটি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে টেঁপি, কোন প্রত্যুত্তর করে না। কিছুক্ষণ পর টেপির হাত থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে বললÑ

কত ধান নিবু, শ্যালোঘরত চল। ধানও পাবু মজাও পাবু।

টেপি তার কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারে না, কিন্তু তার চোখের পরিভাষা বেশ সরল, স্পষ্ট। টেপিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা শ্যালোঘরের দিকে। টেঁপির আর্তচিৎকার শুনে গর্ত থেকে ইঁদুর বেরিয়ে এলো, সে অপলক দৃষ্টিতে পৃথিবীর মানুষ দেখছে।

  লিটন মহন্ত : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares