গল্প : কাসিদ : জয়দীপ দে

গল্প

কাসিদ

জয়দীপ দে

বজরার গবাক্ষ দিয়ে ভেসে আসা একটুকরো হিমেল বাতাস সারাটা শরীর শিহরিত করে গেল। একটা উষ্ণ বস্ত্রের অভাব অনুভব করল লুমিংটন। দুই হাঁটুর ভাঁজে হাত দুটো সেঁধিয়ে দিয়ে আধবোজা চোখে গবাক্ষের দিকে তাকাল। কাঠের নকশাতোলা গবাক্ষটিকে ফোর্টফ্রেমের মতো লাগছে। তাতে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক মোহময় দৃশ্য। পূর্বাকাশ রক্তাভ হয়ে উঠছে। আকাশে রঙের খেলা। সেই চিত্রপটকে পিছে ফেলে একঝাঁক সারস উড়ে গেল উত্তর থেকে দক্ষিণে। এঁকে দিয়ে গেল এক কাল্পনিক রেখা। 

রাতের মলিন কাপড়টি গা থেকে সরিয়ে নিয়ে একটু একটু করে যেন প্রস্ফুটিত হচ্ছে বাংলার জনপদ। নদীর তীর ধরে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। সোনালি ধানের শিষগুলো যেন আলোর স্নোবল নিয়ে লোফালুফি করছে। তাতে ঝিলমিল করে উঠছে পুরোটা মাঠ। দিকচক্রবালজুড়ে বৃক্ষের সারি। সুপারি আম বট পাকুড় আরও কত কী বৃক্ষ। এখানে মাটি উর্বরা। প্রকৃতি উদার। প্রতিটি গ্রাম সমৃদ্ধ। একেক পাড়ায় একেকটি পণ্য উৎপাদিত হয়। প্রতিটি গ্রামেই কিছু না কিছু পণ্য উদ্বৃত্ত থাকে। এখানকার মানুষের উচ্চাভিলাষ নেই। তারা নিস্তরঙ্গ জীবনেই আনন্দ পায়। তাই তাদের বহিঃবাণিজ্যে কোনো আগ্রহ নেই। আওরঙ্গজেব তাই একে বলেছিলেন জিন্নাতুল বিলাদ। প্যারাডাইস অব প্রভিনসেস। জাতির স্বর্গ। 

লুমিংটনের বিদ্যার দৌড় বেশি নয়। ম্যাঞ্চেস্টারের এক অনাথ কিশোর ভাগ্যান্বেষণে উঠে পড়েছিল ভারতগামী জাহাজে। এর আগে অবশ্যি এক মহাত্মা ব্যক্তির অনুগ্রহে কিছুদিন সুযোগ হয়েছিল বিদ্যালয়ে যাওয়ার। সেখানে গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি শুনেছিল মাস্টার সাহেবের মুখ থেকে। সেসব কাহিনিতে স্বর্গ, মর্ত্য আর দেবতাদের গল্পের ছড়াছড়ি। মাস্টার সাহেব বলতেন, এসব কেবল গল্প নয়, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির রূপায়ণ। স্বর্গকে যতটা মহিমাময় মনে হতো, গল্প শুনে লুমিংটনের মনে হয়েছিল আদতে তা বিপরীত। স্বর্গ মানে ঐশ্বর্যের থোকায় থোকায় লুকিয়ে থাকা শঠতা কপটতা পরশ্রীকারতা আর ষড়যন্ত্রের বিষকাঁটা। যে সরল বিশ্বাসে হাত দিতে যাবে সেই রক্তাক্ত হয়ে ফিরবে। জাতির স্বর্গ বলে খ্যাত এই বাঙলামুলুকও গ্রিক স্বর্গ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। ঐশ্বর্যময় আপাত স্নিগ্ধ শান্ত এই জনপদ বিষকাঁটায় আকীর্ণ। সযত্নে সেই কাঁটা বেছে রত্ন কুড়ানোর অভিযানে এসেছে লুমিংটন।

ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা ধীরে ধীরে উদিত হচ্ছে। ধর্মমতি মানুষেরা পুণ্যার্জনে ব্যস্ত। নদীর তীরে এসে ক্ষীণবস্ত্রে স্নানাদি সেরে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে সূর্য প্রণাম করছে। এ দেশে প্রতিটি গ্রামে একটা করে খাল আছে। এ খাল অবশ্যি ইংল্যান্ডের নদীগুলোর মতো বড়। প্রতিটি পরগনায় একটা করে নদী। আর সব নদীকে সলিলা করে রাখতে আছে মাতৃস্বরূপা গঙ্গা। এরা নদীকে মা রূপে কল্পনা করে। মা যেমন বুকের দুধ দিয়ে বাচ্চা বড়ো করে, তেমনি গঙ্গা জলপ্রবাহ দিয়ে পুষ্ট করে রেখেছে পুরো জনপদকে। এদের জীবনের অপরিহার্য অংশ এ গঙ্গা নদী। এই নদীর জল দিয়ে এরা কৃষিকাজ করে। এই নদী তাদের পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। এই নদীর তীরে তীরে গড়ে উঠেছে নগর জনপদ। এই নদীর জল পান করে তারা জীবন ধারণ করে। তাই তারা এই নদীকে এত পবিত্র জ্ঞান করে। আবার এই নদীকেই তারা পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। সেই পুরীষমিশ্রিত জল মাথায় তুলে তারা তাদের ঠাকুর দেবতাদের নাম নেয়। সেই জল শরীরে ঢেলে নিজেদের শুচিশুদ্ধ ভাবে। এমন স্ববিরোধিতা বোধকরি বঙ্গবাসীর পক্ষেই সম্ভব। এরা ইউরোপীয়দের বিদেশি ভেবে কোণঠাসা করাতে ব্যস্ত। কিন্তু এদের দেশ যারা চালায়, কেউই এ দেশের মানুষ নয়। এমনকি এরা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথাও বলতে পারে না।

যাই হোক, এই গঙ্গা পূজা থেকে অন্তত একটা জিনিস শিখেছে লুমিংটন। তা হলো গঙ্গার জলে গঙ্গার পূজা করা। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ইঙ্গিত। কত কম বিনিয়োগ করে কত বেশি লাভ তুলে আনা যায়, আবার সেই লাভের টাকায় ব্যবসা করে লাভ আনা- এই নীতিতেই লুমিংটন এগোচ্ছে। তার নৌকায় আছে কয়েক গাট্টি ব্রড ক্লথ কাপড় আর তামার ঘর সাজানোর তৈজসপত্র। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আসতে শুরু করে ইংল্যান্ড থেকে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজগুলো। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে আবার ফিরতে থাকে ইংল্যান্ডের দিকে। মধ্যের সময়গুলোতে বণিকরা ব্যস্ত থাকে পণ্য বিক্রি ও সংগ্রহে। এ সময়গুলো ব্যবসার সময়। হাড়ভাঙা খাটুনির সময়। কোনো প্রকারে ইংল্যান্ডগামী জাহাজে চাহিদামতো পণ্য তুলে দিতে পারলেই শান্তি। বাকিটা সময় অখণ্ড অবসর।

সূর্যের তাপ ধীরে ধীরে চড়া হচ্ছে। গত সাত দিন ধরে সে বজরায় ভাসমান। নদীর অসহ্য ভ্যাপসা গরমে লুমিংটন বিপর্যস্ত। এর মধ্যে শুরু হয়েছে পেটের গণ্ডগোল। কতদিন এভাবে সে ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেড়াতে পারবে গড নোজ। কিন্তু হাল ছাড়লে হবে না। জীবনে সুযোগ বারবার আসে না। পনেরো বিশ বছর কোনো প্রকারে মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে বিশাল অংকের একটা পুঁজি নিয়ে সে বাড়ি ফিরতে পারবে। বাকিটা সময় সে নাইট ডিউকদের মতো পায়ের ওপর পা তুলে কাটাতে পারবে। একটা আরামপ্রদ ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে একটু চাপ নিতেই হয়। লুমিংটন নিজেকে প্রবোধ দেয়।

মাঝিরা ঘাটে নামাজ পড়ে নিয়ে নৌকায় উঠছে। এদের সকলেই মুসলিম। দূরযাত্রায় সহচর হিসেবে লুমিংটন মুসলিম শ্রমিকদের বেছে নেয়। এদের চালানো সহজ। এদের মধ্যে আনুগত্যের সমস্যা থাকলেও সততা ও নিষ্ঠার অভাব নেই। এ অঞ্চলে জনসংখ্যার দিক থেকে হিন্দুরা এগিয়ে। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের কারণে এদের সাথে চলা দুষ্কর। এদের সমাজে ক্লোজড ডোর সিস্টেম চালু। এরা নিজেদের বাইরে সকল জাতিকে অস্পৃশ্য ও হীন ভাবে। আবার নিজেদের মধ্যে অনেক ধারা। এরা মূলত চার বর্ণে বিভক্ত। বাংলায় চার বর্ণের মধ্যে দুই বর্ণের মানুষ পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ ও শূদ্র। মানে একেবারে উপরের আর নিচের জাতের মানুষ। এই দুই বর্ণের মানুষ আবার ৩৬টি জাতিতে বিভক্ত। এদের মধ্যে বিভক্তি এতই প্রবল যে, এক জাতের মানুষের হাতে আরেকজাতের মানুষ জল পর্যন্ত খাবে না। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আশি শতাংশই শূদ্র। মানে নিচু জাতের লোক। কিন্তু এই শূদ্ররাই আরেক শূদ্রকে অচ্ছুৎ ভাবে। নিজেরাই কিছু উপবর্ণ তৈরি করে নিয়েছে। যেমন কায়স্থ বৈদ্য। এরা নিজেদের ব্রাহ্মণসমতুল ভাবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এদের দাপট প্রবল। এর প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। এরা ব্যবসা ও চাকরি করে প্রচুর অর্থ-বিত্তের অধিকারী হয়েছে। অধিকাংশ জমির ইজারাদার নবসৃষ্ট উপবর্ণের লোক। তারা নিজেদের রাজপুরুষ ভাবে। নিজের অতীত বর্ণের মানুষদের পশুজ্ঞান করে। এই ভেদাভেদির কারণে ভারতবর্ষের হিন্দুরা কেবল সংখ্যা হয়ে আছে, শক্তিতে রূপ পায়নি।

মুসলমানদের মধ্যে এ সমস্যা এতটা প্রবল না হলেও আছে। মুসলিমরা বাংলায় তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এরা হলো আশরাফ, আতরাফ আর আরজল। আরজল শ্রেণিটি হলো মুসলিমদের মধ্যে পতিত ও অচ্ছুৎ। আরব বংশোদ্ভূতরা সমাজে আশরাফ বলে পরিচিত। এদের মধ্যে সৈয়দ পদবিযুক্তরা বিশেষ সম্মানের অধিকারী। মুসলিম সমাজে এদের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া হয়। এরাই রাজক্ষমতায় যায়। এরা ষড়যন্ত্র করে নবাব বদলায়। মূল মুসলিম সমাজের সাথে এদের কোনো সংযোগ নেই। প্রান্তিক মুসলিমরা অনেক সময় তাদের জাতভাই ভাবতেও ভয় পায়। এদের বেশির ভাগ শিয়া মতালম্বী আর বাংলার সাধারণ মুসলিমরা সুন্নি। এমনকি অভিজাতরা বাংলাতে কথাও বলে না। তাই অভিজাত আর সাধারণ মুসলিম কখনও এক কাতারে এসে দাঁড়াতে পারে না। নিজেদের একটা জাতি ভাবতে পারে না কখনও। আশরাফরা যুগের পর যুগে এখানে থেকেও নিজেদের এ মাটির সন্তান ভাবে না। মূল জনগোষ্ঠীর সাথে একাত্ম হতে নারাজ।

মাঝিরা প্রাতরাশে বসেছে। এরা দিনে চার বেলা ভাত খায়। প্রতিবেলার মেন্যু ফিক্সড। এক থালা ভাত। সাথে সামান্য কোনো ভর্তা ভাজি কিংবা পোড়ামরিচ হলেই হলো। বড়ো লহমায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে খাবার শেষ করে ফেলবে। মাঝিদের মধ্যে একজন স্বপ্রণোদিত হয়ে কুকের কাজ করে। সে গতকালের উদ্বৃত্ত অন্ন পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল। তা বের করে পরিবেশন করছে। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে আবার যাত্রা শুরু হবে।

ধীর গতিতে আবার নৌকা চলতে শুরু করল। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। নদী স্থির। মাঝিরা বৈঠা মারছে। একটা অদ্ভুত শব্দ তৈরি হচ্ছে। রোদ এখনও তেতে ওঠেনি। তাই বৈঠার শব্দ বাদে সবই উপভোগ্য লাগছে লুমিংটনের। নদীজুড়ে বিচিত্র গড়নের নৌকার সমারোহ। বাংলা সুবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এটি। বহিঃবাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বন্দর হুগলি ও কলকাতার সাথে এই নদী দ¦ারাই যুক্ত হয়েছে রাজধানী। আবার আরও উজানে গেলে তা ভগবানগোলা সুতী হয়ে পাটনা মুঙ্গের পর্যন্ত গেছে। সেখান থেকে সোরা ভর্তি নৌকা কলকাতায় আসে। সোরা আর কিছু নয় সল্টপিটার। বিজ্ঞানীরা যাকে বলে পটাশিয়াম নাইট্রেট। যা গন্ধক বা সালফারের সাথে মিশালে প্রবল শক্তির বিস্ফোরক তৈরি হয়। এই দুই বস্তু যে জাতির কাছে যত বেশি থাকবে, সেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্তা হবে। পৃথিবীজুড়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে চলছে সাম্রাজ্য বিস্তারের ঠাণ্ডা লড়াই। এই লড়াই একসময় অবগুণ্ঠন ফেলে প্রকাশিত হবে। সে সময়ের জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। তাই ইংরেজরা তাদের দেশ থেকে সব স্বর্ণ রৌপ্য নিয়ে এসে যুদ্ধের মাল-মসলা বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। এ ভারতবর্ষে ইউরোপীয়রা প্রথম এসেছিল খাবারের মসলার সন্ধানে। এখন তারা যুদ্ধের মসলার জন্য মরিয়া। লুমিংটন সোরাভর্তি নৌকা দেখে মনে মনে হাসে, ভারতবাসীর মাথায় যদি সামান্য বিজ্ঞানচিন্তা থাকত, তাহলে এমন জিনিস অন্য কোনো জাতির হাতে তুলে দিত না। ঈশ্বর জানে, হয়তো একদিন এই সোরা তাদের মারতেই ব্যবহার করবে ইউরোপীয়রা।

সে তার টিনের বাক্স থেকে নথিপত্র বের করল। রবার্টের একটা চিঠি এসেছে। সেও ভারতে আসতে চায়। কোম্পানিতে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সে একজন স্বাধীন ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ শুরু করতে চায়। এ ক্ষেত্রে সে লুমিংটনের পরামর্শ চায়।

লুমিংটন গতরাতেও চিঠির উত্তর লিখতে বসেছিল। মাঝপথে এসে আলস্যে আর এগোয়নি। আবার সে কাগজ-কলম নিয়ে বসল। নিজেই নিজের হস্তাক্ষর দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। সুন্দরী নারী যখন বোঝে সাজলে তাকে সুন্দর দেখায়, তখন সে সাজসজ্জার প্রতি আরও অনুরক্ত হয়ে পড়ে। লুমিংটনেরও হয়েছে সেই দশা। সে আরও মনোযোগী হয়ে পড়ে লেখার ব্যাপারে। সযত্নে দোয়াতে কলম চুবিয়ে হাতটা সামান্য বাঁকিয়ে কার্সিভ স্টাইলে লিখতে শুরু করে।

রবার্ট, তুমি এ অঞ্চলে কী ব্যবসা করা যায় সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছ। আমার মনে হয় কি, তুমি আসো, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও। তবে আমি কিছু তথ্য দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি। এ অঞ্চলের মাটি খুব উর্বর। কী পরিমাণ ফসল হয় তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না। এক ফারদিং জমিতে দুই পাউন্ডের মতো ধান হয়। ধান কিন্তু কম উর্বর ভূমিতে হয় না। ধান উৎপাদনের জন্য অত্যধিক পানির প্রয়োজন। আমরা যারা গমের চাষাবাদ করি তাদের সে সম্পর্কে ধারণা নেই বললেই চলে। ধান ছাড়াও এ অঞ্চলে প্রচুর আখ হয়। আখ থেকে খুব জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এরা চিনি উৎপাদন করে। এছাড়া সুপারি, আদা, লম্বা লংকা, হলুদ, মধু, আম প্রভৃতি প্রচুর উৎপাদিত হয়। শ্রীহট্টের বন থেকে প্রচুর কাঠ মধু লাক্ষা মোম ও হাতির দাঁত আসে। রংপুর ও বিহারের পুর্ণিয়ায় গম ও আফিমের চাষ হয়। যশোর অঞ্চলে প্রচুর ডাল হয়। তবে সবার আগে যা বলা উচিত ছিল তা হলো এ অঞ্চলের বস্ত্র শিল্পের কথা। ঢাকা অঞ্চলে খুব উন্নতমানের তুলা উৎপাদিত হয়। সেই তুলা দিয়ে নদী অববাহিকায় আর্দ্র আবহাওয়ায় খুবই উন্নত মানের বস্ত্র উৎপাদিত হয়। এ বস্ত্রটির নাম মসলিন। নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। আমাদের দেশের রাজপুরুষরা তা ব্যবহার করে। এছাড়া মালদা, হরিয়াল, শেরপুর, বালিকুশি ও কাগমারিতে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের কাপড় উৎপাদিত হয়। কাপড়গুলো খাসা, এলাচি, হামাম, চৌতা, উতালি, সুসিজ, শিরসুজি ইত্যাদি নামে পরিচিত। এসব কাপড় সারা দুনিয়ায় যায়। বসরা, মোখা, জেদ্দা, পেগু, অচিন, মালক্কা এসব কাপড়ের বড়ো ক্রেতা। এসব কাপড়ের কাছে আমাদের দেশে উৎপাদিত কাপড় নিতান্তই শিশু।

এ অঞ্চলে প্রচুর রেশমের চাষ হয়। বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২২ হাজার বেল। তবে এরা উন্নত রেশম উৎপাদনের পদ্ধতি জানে না। তাই এদের রেশমে তৈরি সুতো কর্কশ ও অসমান হয়। সহজেই ছিঁড়ে যায়। তাই একবার রেশমের ব্যবসা করতে গিয়ে আমি ভীষণ বিপাকে পড়েছিলাম।

তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো তাহলে কিসের বিনিময়ে ব্যবসা করা যায়। সত্যি বলতে কি, আমাদের দেশে এমন কোনো পণ্য উৎপাদিত হয় না, যা ভারতবাসীকে আকৃষ্ট করতে পারে। তাই ইংরেজরা ইউরোপ থেকে বিপুল পরিমাণে সোনা আর রুপা নিয়ে আসে। রুপার ভীষণ চাহিদা এখানে। রুপা দিয়ে স্থানীয় মুদ্রা তৈরি করা হয়। কিন্তু এখানে রুপার খনি নেই। রুপার বিনিময়ে ব্যবসা করে তারা। তবে আমি বলব তারও দরকার নেই। এ অঞ্চলের হিন্দুরা গঙ্গার জল দিয়ে গঙ্গার পূজা করে। বিনাপুঁজিতে কেবল বুদ্ধির জোরে অনেক ব্যবসা করা যায়। আগে এখানে আসো, নিজের বুঝে নিজেই করে ফেলতে পারবে।

 হৈ-হল্লাতে লেখার মগ্নতা কেটে গেল। তার বজরার পাশে বিশাল এক নৌকা এসে থেমেছে। এক ইউরোপীয় ভদ্রলোক গবাক্ষ দিয়ে চেঁচিয়ে লুমিংটনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। লুমিংটন সচকিত হয়ে তাকাল।

মহাশয়, নৌকো আর অগ্রসর না করাই উত্তম। সামনে পরিস্থিতি ভালো না। গিরিয়ায় যুদ্ধের আয়োজন চলছে। মুর্শিদাবাদের অবস্থা থমথমে।

কী হয়েছে সেখানে।

বিহারের সুবেদার মির্জা মহম্মদ আলি রাজধানীর দিকে কুচ করেছেন মসনদ দখলের জন্য। নবাব তার সৈন্যদল নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। এতক্ষণে হয়ত তারা মুখোমুখি হয়ে গেছেন।

কী বলেন! এ তো সাংঘাতিক ঘটনা।

সে আর বলতে-

আরে, আপনাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি, কি অসভ্যতাই না হয়ে গেল। আসুন, ভেতরে আসুন।

ভদ্রলোক ওয়েলসের মানুষ। লুমিংটনের মতোই এসেছেন ভাগ্যান্বেষায়। তিনি অবশ্য কোম্পানির চাকরি করেন না। তাই লুমিংটনের সাথে আগে পরিচয় হয়ে ওঠেনি। নিজে পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করেন। নিয়মমতে কোম্পানির লাইসেন্স নিয়ে প্রতিটি ব্রিটিশ নাগরিকের ব্যবসা করার কথা। কিন্তু অনেকেই তা করে না। উপরন্তু কোম্পানির জাল দস্তক দেখিয়ে বিনা শুল্কে ব্যবসা করে। এতে যেমন কোম্পানির ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রায়ই নবাবের লোকজন বলে মাত্র বছরে তিন হাজার টাকা খাজনা দিয়ে তোমরা দেখি গুষ্টিসুদ্ধ ব্যবসায় নেমে পড়েছ। এ ধরনের লাইসেন্সহীন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের ইন্টারলুপার বলা হয়। ভদ্রলোক এমনই একজন ইন্টারলুপার। তিনি লবণের ব্যবসা করেন। ইউরোপীয়দের জন্য লবণের ব্যবসা নিষিদ্ধ। নবাব পরিবার আর্মেনীয় বণিকদের দিয়ে করিয়ে থাকে। কিন্তু ভদ্রলোক নবাবের আমিন চৌকিয়তকে (শুল্ক চৌকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সৈনিক) বখশিস দিয়ে নির্বিঘ্নে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যবসায় দারুণ লাভ। ইউরোপ থেকে যখন জাহাজগুলো আসে, তখন প্রায় ফাঁকাই থাকে। সাগরে একটু বাতাস দিলে ফাঁকা জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ব্রিটিশরা জাহাজের পাটাতন ভর্তি লবণ নিয়ে আসে। অল্পদামে সেই লবণ কিনে নিয়ে ভদ্রলোক পাটনা কিংবা রাজমহল কিংবা ভগবানগোলায় চড়া দামে বিক্রি করে দেন।

লুমিংটন সযত্নে নিজের পরিচয় গোপন রেখে ভদ্রলোকের সাথে আলাপ চালিয়ে গেলেন। সে ভাবল লুমিংটন হয়তো তার মতোই একজন সাধারণ ব্যবসায়ী।

এত তাজা চিজ আপনি পেলেন কীভাবে। খেতে খেতে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।

লুমিংটন মৃদু হেসে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেল।

মির্জার হঠাৎ খেপে যাওয়ার কারণ কী বলতে পারেন?

কী আবার ক্ষমতার লোভ। এই ভবঘুরে তুর্কিগুলো ভীষণ ভয়ানক। আজিম-উশ-শানের মৃত্যুর পর প্রাণ বাঁচাতে মির্জা পরিবার বাংলায় এসেছিল। মুর্শিদ কুলী বিচক্ষণ লোক ছিলেন। তিনি এদের আশ্রয় দেননি। আশ্রয় দিলেন তার জামাতা উড়িষ্যার সুবেদার সুজা। এর পেছনে অবশ্য পারিবারিক পূর্ব সম্পর্ক কাজ করেছিল। সুজাই মির্জা মহম্মদ আলিকে সামান্য সৈনিক থেকে রাজমহলের ফৌজদার করেন। কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে উপাধি দিয়েছিলেন আলিবর্দী। পরে মুর্শিদ কুলীর বেগমের আশীর্বাদে তিনি হন বিহারের সুবেদার। একসময় যারা আশ্রয় পেলেই কৃতার্থ ছিল, সেই পরিবার আজ আশ্রয়দাতার সন্তানকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসার জন্য উদগ্রীব। কত বড়ো বেইমান খেয়াল করেন।

কিন্তু সামান্য এক সুবেদার এত সাহস পেল কেন?

হায়না হয়তো এক কিছুই নয়, দল বাঁধলে ভয়ংকর। বনের সিংহও তার শিকার হয়ে ওঠে। সুজার আমলে দেশ চালাত যে তিন মন্ত্রী তারা হলেন- দেওয়ান আলমচাঁদ, জগৎশেঠ ফতেচাঁদ আর হাজি আহম্মদ। এই ত্রয়ীর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন সরফরাজ। বিলাসপ্রবণ সরফরাজ ক্ষমতায় এসে অধিক অর্থের জন্য দেওয়ান আলমচাঁদকে চাপ দিতে শুরু করেন। ক্ষেত্রবিশেষে অপমান। আলমচাঁদ ভেতরে ভেতরে তেঁতে ওঠেন। এদিকে মুর্শিদকুলীর সাত কোটি টাকা গচ্ছিত আছে ফতেচাঁদের গদিতে। সরফরাজ সেই টাকার জন্য ফতেচাঁদকে চাপ দিতে লাগেন। এতে ফতেচাঁদও বিগড়ে যায়। ছোট্ট করে বলে রাখি এদের মধ্যে একটা নারীঘটিত ব্যাপার আছে, কথটা অথেনটিক বলতে পারছি না, তাই সাইট করলাম না। আর হাজি আহম্মদ এই দু’জনের ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে তাদের পারিবারিক উন্নতির পথ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

কীভাবে?

সুজার সময় বাংলার সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার। আলমচাঁদের পরামর্শে কৃচ্ছ্রসাধনের নামে সরফরাজ তা কমিয়ে তিন হাজারে নামিয়ে আনেন। আর বরখাস্ত হওয়া সৈনিকদের আলমচাঁদ আর হাজি মিলে বিহারে মির্জা মহম্মদ আলির কাছে পাঠাতে লাগলেন। এদের খোরপোশের টাকা দিতে লাগল মির্জা আর ফতেচাঁদ। নারী আর মদে মত্ত সরফরাজের এসব দিকে তাকানোর সময় ছিল না। আলিবর্দী যখন আক্রমণের হুংকার দিলেন, তখনই নবাব বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তখন আর তার কিছুই করার ছিল না।

দিল্লির বাদশাহ মুহম্মদ শাহ কার দিকে ঝুঁকেছেন বলে মনে হয়।

কার আবার টাকার। তবে তিনি ভেতরে সরফরাজের ওপর বিরক্ত। নাদির শাহ আক্রমণের সময় সরফরাজ অত্যুৎসাহ দেখিয়ে শাহের নামে মুদ্রা চালু করেছিলেন। এতে বাদশাহ আহত হয়েছেন। তবে এটাও ব্যাপার নয়। তিনি আলিবর্দী থেকে বিপুল নজরানা প্রাপ্তির অঙ্গীকার পেয়েছেন। নিঃস্ব সর্বহারা নবাব এখন শক্ত মাটি খোঁজেন। তার কাছে ব্যক্তিমানুষ বিষয় না। তিনি তার ময়ূর সিংহাসন বাঁচাতে পারেননি। নিয়ে গেছেন নাদির শাহ। বিশাল সাম্রাজ্য। সেটা নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে মারাঠা শক্তি। তাই তিনি শক্ত মাটি খুঁজছেন তার শেষ যষ্টিটা গাঁথার জন্য।

কথা শুনতে শুনতে লুমিংটন তাকাল নদীর দিকে। উত্তরমুখী সব নৌকা ফিরে যাচ্ছে ভাটির দিকে। তার নৌকার মাঝিরা তীরে নেমে গুন টানছে। আপাতত এখানেই নৌকা ভিড়বে। অবস্থা বিবেচনা করে স্থির করবে কোন দিকে যাত্রা শুরু করা যায়। এ সময় লক্ষ্য করল বাদশাহি সড়ক ধরে দুটো কালো ঘোড়া দুরন্ত বেগে ছুটে গেল। আরোহীর গায়ে লাল সরকারি উর্দি। এরা কাসিদ। নবাবের বার্তাবাহক। দূরদূরান্তে যুদ্ধের সংবাদ পৌঁছে দিতে ছুটছে এরা। হয়ত যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন সেই সংবাদ ফৌজদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা ছুটছে। নৌকা ভিড়ল ঘাটে। সেই যেন উদগ্রীব কাসিদের ঝোলার সংবাদটা পেতে। একটা সংবাদ আবার পালে বাতাস লাগাবে। সেই সংবাদের অপেক্ষায় লুমিংটন শান্ত ভগীরথীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঢেউ এসে ধাক্কা খায় নৌকার খোলে। দারুণ একটা ছন্দবদ্ধ শব্দ তৈরি হয়। লবণ ব্যবসায়ী ভদ্রলোক কথা বলে যাচ্ছেন। লুমিংটন তন্দ্রায় ডুবে যায়।

জয়দীপ দে : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares