গল্প : জুয়াড়ি ক্যাফে : সুফি বাংলার পান্থ

গল্প

জুয়াড়ি ক্যাফে

সুফি বাংলার পান্থ

এপ্রিল ১৪। ১৯১২ সাল। নর্থ আটলান্টিক ওশান। প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে। চারিদিকে সারি সারি বরফের পাহাড়, বিশাল পালতোলা নৌকা ছুটছে। নৌকার গতি বাড়ছে। আশ্চর্য! যাত্রীদের কেউ পাল নামানোর কথা বলছে না। এত যাত্রী নিয়ে নৌকা যেকোনো সময় বরফের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যাবে। অথচ এক শফিক ছাড়া বাকি ২২০০ যাত্রীর কোনো বিকার নেই। এ কী করে সম্ভব! সবাই পাগল হয়ে গেল না তো? হলে হবে। কবি-সরদার শফিক উদ্দিন মজুমদার এমন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাতঘড়ি দেখল। সময় রাত ১১:৪০!

নৌকা ইতোমধ্যে বরফে ধাক্কা খেয়েছে। নৌকার তলা যথারীতি ফুটো হয়ে গেল। গলগল করে ভিতরে পানি ঢুকছে। প্রচণ্ড বাতাসে নৌকার পাল ডান দিকে বেঁকে গেল। ছেঁড়া পালের এক কোনা আটলান্টিকের পানি ছুঁই ছুঁই করছে। যাত্রীরা ঝাঁপাতে শুরু করেছে। অন্ধকার রাতে কুপি বা হ্যাজাকের আলোয় পোকামাকড় যেভাবে ঝাঁপায় ঠিক সেরকম। অন্য পোকামাকড়ের মতো শফিক নিজেও সাগরে ঝাঁপ দিল। সে সাঁতার জানে। বেশ ভালোভাবেই জানে। আন্তঃজেলা হাইস্কুল ডুবসাঁতারে সে সেকেন্ড হয়েছিল। যদিও তার ধারণা সে সবার আগেই তীরে পৌঁছেছিল। তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে সেকেন্ড বানানো হয়েছে। যেহেতু তাকে পরিকল্পিতভাবে সেকেন্ড পজিশনে নামানো হয়েছে তাই আন্তঃজেলা হাইস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতার ভুয়া পুরস্কার নেওয়ার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু এত ভালো সাঁতারু হওয়ার পরও আজ সে ডুবে যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে গহিন সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে। শফিক এখন ভালোভাবে নিঃশ্বাস নিতেও পারছে না। তার সাথে এসব হচ্ছেটা কী! সে এক্ষুনি মরে যাবে নাকি?

আটলান্টিক মহাসাগরের পানি লবণাক্ত হওয়ার কথা; কিন্তু পানি কেমন যেন পানসে লাগছে। বুড়িগঙ্গার পানির মতো। মুখের ভিতর কাঁড়ি কাঁড়ি বালিও ঢুকছে! ভয়ঙ্কর কিংবা মহাভয়ঙ্কর এই সময়ে শফিকের ঘুম ভেঙে গেল। সে প্রচণ্ড ঘেমে অনেকটা গোসলের মতো অবস্থায় চলে গেছে। তার মশারির দুটো মাথা খুলে একপাশে ঝুলে আছে। চাদর এলোমেলো। সবকিছু কেমন যেন মিলে যাচ্ছে! কিন্তু মুখের পানসে ভাব আর মুখভর্তি বালুর ব্যাপারটা মেলানো যাচ্ছে না। সে এখন বিছানার উল্টোদিকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। যেদিকে সে সাধারণত পা রেখে ঘুমায়! নোংরা পায়ের সবগুলো বালি বিছানার চাদরে জড়ো হয়েছিল। কবি শফিক মজুমদার সে চকচকে শুকনো বালি ঘুমের ঘোরে চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে।

বাহ্! রহস্যের সমাধান খুব দ্রুত হচ্ছে। প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার পরও শফিকের হঠাৎ ভালো লাগছে।

ঠিক এই মুহূর্তে তার ভালো লাগা দ্বিগুণ হলো। কারণ সে এইমাত্র ভয়াবহ সে স্বপ্ন দেখার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে পেরেছে। কবি শফিক মজুমদার সর্বভুক। সব বিষয়ের বই সে গোগ্রাসে গেলে! শফিক ভালো করেই জানে কিছু বই এমন যা পড়ে সাথে সাথে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলতে হয়। শুধু ছিঁড়ে ফেললেই হয় না! তারপর অ্যান্টিসেপ্টিক সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলার নিয়ম।

গতকাল রাতে শফিক অজ্ঞাত এক লেখকের ‘লঞ্চডুবি’ নামক একটি বই পড়তে পড়তে ঘুমাতে গিয়েছিল। মাথায় সেটা ঘুরপাক খেয়েছে এবং সময়মতো নৌকার পাল পানিতে ডোবার সাথে সাথে শফিকের রুমের মশারিও ডুবেছে। পার্থক্য শুধু শফিকের আটলান্টিকের লবণ খাওয়ার পরিবর্তে কিছু শুকনো বালি খেতে হলো! তাকে বালি খাওয়ার ব্যাপারটাতে তেমন বিচলিত মনে হলো না। সে ঘড়িতে সময় দেখল। রাত ৩টা ১০। সে পরপর দুই গ্লাস পানি খেলো। তারপর শফিক তার লালমিয়া Unsolved  খাতা হাতে নিলো।

সে তার স্বপ্নের কথা খুব সংক্ষিপ্তভাবে লিখল। হেডিং দিলো। বেশ চমৎকার হেডিং।

১৪ এপ্রিল ১৯১২। রবিবার। রাত ১১:৪০ (আনুমানিক)

সে লেখাটা শেষ করে বিস্মিত হলো। স্বপ্নে সাধারণত তারিখ ও ডিটেইল থাকে না। এখানে আছে। এবং স্বপ্নে রবিবারের কথা উল্লেখ ছিল না! সে লেখার সময় লিখেছে। লেখক হিসেবে হয়তো বানিয়ে লিখেছে। রবিবারের ব্যাপারটা মিলে গেলে তো ভয়াবহ ব্যাপার হবে! না মিললেও ক্ষতি নেই। রাত ১১:৪০ মি. হতে আড়াই ঘণ্টার বিভীষিকায় প্রায় ১৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। সে ঘটনার সাথে ১০৮ বছর পর তার লঞ্চডুবির কী সম্পর্ক থাকতে পারে? সে রবিবার রাতেই কেন দুঃস্বপ্নটা দেখবে? তার বন্ধু স্বপ্ন বিশারদ পৃথ্বী শংকর বিশ্বাসের কাছে রবিবারের লঞ্চডুবির ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু গুরু শংকর বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ হয় না প্রায় আট বছর। আজ জরুরি প্রয়োজনে পত্রিকায় একটা ‘শংকর বাবুর নিখোঁজ বিজ্ঞাপন’ দেওয়া যেতে পারে।

সে খুব সকালেই শংকর বাবুর নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ‘নিশান বাংলা’ পত্রিকার অফিসে দিয়ে আসবে। প্রয়োজনে সে পরপর চার শুক্রবার হারানো বিজ্ঞপ্তি ছাপবে। টাকা-পয়সা তেমন জরুরি না। এ মুহূর্তে জরুরি হলো রবিবারের লঞ্চডুবির ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়া। সে তার জীবনের বাকি রবিবারগুলোতে আর মুখভর্তি বালি খাবে না। কোনোদিন না।

পরপর চার সপ্তাহ শংকর বাবুর হারানো বিজ্ঞপ্তি ‘নিশান বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। এখনো পৃথ্বী শংকর বিশ্বাসের টিকির দেখা মেলেনি।

শফিকের খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ শনিবার। সে বাইরে বের হলো। অনেকদিন খুব সকালে বাইরে বের হওয়া হয় না। নিশাচর হয়ে কবি-সরদার শফিক মজুমদার পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। সকালের আলো ফুটলেই মেসে ফিরে লম্বা ঘুম। মানুষের সকাল বেলার কর্মকাণ্ডের সাথে সে তাই অনেকদিন যাবত পরিচিত নয়।

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। ঢাকাতে শীত পড়তে শুরু করেছে। নগরীর সকাল আবারও রহস্যময় হতে শুরু করেছে। শফিক এক চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল। রহস্যময় সকাল রহস্যময় ঘটনা দিয়ে শুরু হলো। দুই যুবক এইমাত্র চায়ের অর্ডার করলো। তারা দুধ চা খাবে না। লাল চা খাবে। সঙ্গে দুটো সিগারেট চাইলো। বেনসন ইদানীং আর ভালো লাগছে না। বাংলা ফাইভ কালেভদ্রে পাওয়া যায়। যুবকদ্বয় মালবোরো সিগারেট চাইল দুটো। এ সমস্ত ঘটনা তারা ইশারায় ঘটাল। এবং চা-সিগারেট নিয়ে একজন উঁচু টুলে হেলান দিয়ে বসে পড়ল আর অন্যজন দাঁড়িয়ে লম্বা সময় গলা চালিয়ে গেল। অবশ্যই ইশারায়। এদের একজনকে শফিক চেনে। বেশ ভালোভাবেই চেনে। জহির। কবিতা লেখে। সবসময় তার বুকপকেটে মিনিমাম তিনখানা গরম কবিতা মজুদ থাকে। তার নাম জহির হলেও সে অ্যালবার্ট জহির নামে কবিতা লেখে। কবি হিসেবে শুধু জহির নামে নাকি জোর কম! জোর বাড়ানোর অংশ হিসেবে অ্যালবার্ট নাম যোগ করা। কবি অ্যালবার্ট জহির। মহামান্য!

কবি পকেটে সদ্য লেখা অপ্রকাশিত কবিতা নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালেও অন্য কবিদের মতো জোর করে ধরে নিয়ে নিজের কবিতা শুনিয়ে দেয় না। এক্ষেত্রে জহির বেশ লাজুক। জহির ‘বারজন মাতাল যুবক’ শীর্ষক কবিতার আড্ডায় প্রায়ই আসে। এসে পিছনে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কোনো কথা বলে না। অনেক জোরাজুরি করলে বুক পকেট থেকে কবিতা বের করে লাজুক কবির মতো মাথা নিচু করে কবিতা পাঠ করে। তারপর মাস ছয়ের জন্য উধাও হয়ে যায়। হঠাৎ এক কার্টন নতুন কবিতা নিয়ে হাজির! কবিতা লেখার জন্য লাপাত্তা হওয়া মহান বিষয়। সে হিসেবে আমাদের কবি অ্যালবার্ট জহিরও মহান কবি!

জহির তার বন্ধুর সাথে প্রায় লম্বা সময় ইশারায় কথা চালিয়ে যাচ্ছে। দুটো সিগারেট শেষ করে ইশারায় তিন নম্বরটা এইমাত্র চাইল। আমি দূর থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে তা দেখছি। আশপাশের লোকজনের মধ্যে তেমন কৌতূহল ও বিস্ময় দেখছি না। পরে শুনতে পারি মহান কবি অ্যালবার্ট জহির নাকি গত তিন মাস যাবত ইশারায় কথা বলছেন। গত তিন মাসে কেউ তাকে একটা শব্দও বলতে শোনেনি! এ ধরনের কথাবার্তা বলার শুরুতে মাঝে মাঝে বড় ধরনের ঘাপলা হতো। মানুষজন ইশারা না বুঝতে পেরে চিৎকার চেঁচামেচি করতো। সে সময়ও কবি মাথা ঠান্ডা রেখেছে। মুচকি হাসি দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকেছে। বেশি বিপদে পড়লে ভ্রু কুঁচকে কাগজ-কলম নিয়ে খচখচ করে দু’লাইন লিখে বুঝিয়ে দিত। এখন তেমন কিছু করতে হয় না। তার সাংকেতিক ভাষা প্রয়োগের অভাবনীয় উন্নতি হয়ে থাকতে পারে। কিংবা তার চারপাশের মানুষজন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো চায়ের দোকানদার মকবুল মামাও হাতের আঙুল দেখিয়ে পাগলা কবির সাথে ইশারায় কথা বলছে। তার চোখ-মুখ খুশি খুশি! সবকিছুর পরও পৃথিবী আনন্দময়। সরদার শফিক মজুমদার কবিদের মতো করে না ভাবলে বিষয়টা কখনো জানত না!

বুধবার রাত। শফিক মেসে একাকী বসে আছে। সে আজ পুরোনো চিঠি নিয়ে বসেছে। ইন্টারনেটের এই যুগে শফিককে এখনও অনেকে হাতে লেখা চিঠি পোস্ট করে। শফিকের ভীষণ ভালো লাগে। ভুল কোনো শব্দ লিখে প্রেরক তা কেটে ফেলে। সেই কাটাকুটিও শিল্পের পর্যায়ে চলে যায়! চিঠি পড়তে গিয়ে শফিক প্রায়ই সেই কাটা শব্দের পাঠোদ্ধার করণের চেষ্টা চালায়। প্রাণপণ চেষ্টা! কাটাকুটি যত দুর্বোধ্য চিঠির মজা তত বেশি। সব শব্দ যে উদ্ধার করতে হবে এমনও না।

শফিক আজ আবার সরদার মামার পুরনো সেই চিঠি নিয়ে বসেছে। হঠাৎ করেই তার আজ সরদার রহমত উল্লাহ চিশতি মামার কথা ভীষণ মনে পড়ছে। তার পাঠানো শেষ দীর্ঘ চিঠি সে আবারও হাতে নিল। এ চিঠিটা সে যতবার পড়ে ততবার তার মন শীতল হয়। চোখের কোণে জল জমা হয়। পুরুষ মানুষের চোখের জল নাকি ভালো না! সে অদ্ভুত কারণে কান্না থামাতে পারে না। শায়লা শারমিন নামে মমতাময়ী মেয়েটির জন্য তার বুক হু হু করে ওঠে। মেয়েটির সাথে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর পর শফিক হারবাল ওষুধ কোম্পানির মার্কেটিং রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি ছেড়ে দেয়। সে আবারও চিরচেনা বেকার জীবনে ফিরে আসে। কবির জীবন দুর্বিষহ  থেকে দুর্বিষহ হতে থাকে। সরদার মামার চিঠি পড়ার পর তার চাকরিবাকরি করে থিতু হতে মন চায়। শায়লা শারমিন নামের প্রবল মমতাময়ীর সাথে বাকি জীবনপথ চলতে ইচ্ছে হয়। ভীষণ ইচ্ছে হয়!

আশ্চর্য ব্যাপার হলো চিঠি পাওয়ার পর সরদার রহমতউল্লাহ চিশতি মামার সাথে শফিকের আর যোগাযোগ হয়নি। আসলে শফিক যোগাযোগের চেষ্টা করেছে পারেনি। ‘ঘটক সরদার মামু এজেন্সি’ রেখে হয়তো সে গভীর জঙ্গলে ডুব মেরেছে। কবি সরদার শফিক মজুমদার ইদানীং মেয়েটির কথা ভেবে ভেবে নতুন কিছু করার তীব্র আকাক্সক্ষা অনুভব করছেন। মেয়ে দেখতে যাওয়ার সময় রূপকথা নামে যে ছোট্ট মেয়েটি ভয় পেয়ে ছুটে এসে শায়লাকে জাপটে ধরেছিল, সেই রূপকথাকেও শফিক মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখে। তারপর বেশ কয়েক মাস পার হলো। পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে প্রায়ই চাকরির ইন্টারভিউ দিতে বড় বড় অফিসে যায়। বড়কর্তারা ভাইভার সময় গল্পগুজব করে। মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টাও চলে। কেউ কেউ অ্যাডাল্ট জোকস্ করে। একবার ভাইভা বোর্ডে এক প্রশ্নকর্তা শফিককে, ‘সাগরকলা সর্বোচ্চ কত ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে’ প্রশ্নটি গুরুগম্ভীরভাবে করলেন!

 শফিক চুপচাপ। জবাব দিচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রশ্নকর্তা প্রচণ্ড শব্দ করে হেসে উঠলেন। ততক্ষণে বাকি বোর্ড সদস্যরাও বুনো উচ্ছ্বাসে শরিক হলেন। শফিক ভেবে পেল না ‘সাগরকলা কত ইঞ্চি লম্বা’ প্রশ্নটি না পারার সাথে এত হাসাহাসির কী সম্পর্ক?

বোর্ডের একজন বলে বসল, শফিক সাহেব কিছু মনে করবেন না আপনি কি বাসার জন্য সাগর কলা কেনেন?

এই প্রশ্নের পর পরই আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। এখন কেউ আর আমার উত্তরের অপেক্ষা করছে না। শফিক সাহেব প্রশ্নটির উত্তর সঠিক দিতে পারলে আপনার চাকরি হয়ে যেত। উই আর এক্সট্রিমলি সরি!

হা হা হা। সরি, আশা করি কিছু মনে করবেন না।

সরদার শফিক মজুমদার কিছু মনে করেছিলেন কিনা কে জানে!

তিনি বললেন, স্যার আমি প্রতিদিন সাগর কলা কিনি।

শফিক কথাটা বলে কিছুটা থেমে সময় নেয়।

প্রতিদিন বিভিন্ন সাইজের সাগর কলা কিনে বাড়ি বাড়ি সাপ্লাই দিই। চিকন মোটা সব সাইজের কলা আমার কাছে থাকে। স্যার প্লিজ কিছু মনে করবেন না, বাসায় ম্যাডামের সাথে কথা বলে সাইজ জানালে আমি হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করব। হোম ডেলিভারির ঢাকা শহরের মধ্যে মাত্র ৩০ টাকা।

ওহ! স্যার আমরা কলার সাথে খাটি জোকের তেলও সাপ্লাই দিয়ে থাকি।

গেট লস্ট।

বোর্ডে সুনসান নীরবতা। কেউ কথা বলছেন না। তারা ইন্টারভিউ দিতে আসা প্রার্থীর কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত উত্তর কিংবা প্রস্তাব কল্পনাতেও আশা করেনি।

এ ঘটনার পর শফিক চাকুরি খোঁজা ছেড়ে দিল। মাস দুই আবারও ঝিম ধরে বসে থাকল। তারপর একদিন নিজেই কিছু করার তাড়ণা অনুভব করল। সে চা-কফির দোকান শুরু করার পরিকল্পনা করল। কফিশপ খোলার আগে বইপত্র সংগ্রহ করা শুরু করল। নিউমার্কেট থেকে বের হয়ে কিছু দেশি-বিদেশি বইও কিনে ফেলল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ বইটি শফিক পরপর তিনবার পড়ে ফেলল। তারপর সে নতুন উদ্যমে কফিশপ খুলে ফেলল। সে প্ল্যান করেছে কফিশপে সাদা ভাত, ভর্তা-ভাজি, ডালও সেল করবে। তবে তা খুব গোপনে। সে শহরের নির্দিষ্ট কিছু কাস্টমার খুঁজে বের করবে। যারা প্রতিদিন পেটপুরে ভাত খাওয়ার পর চা-কফি খাবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা জমাবে। দোকানের নাম ইতোমধ্যে ফাইনাল হয়ে গেছে। এলইডি সাইনবোর্ড বানাতে দেওয়া হয়েছে। শফিকের দোকানের নাম ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’!

কবি সরদার শফিক উদ্দিন মজুমদার সাথে সাথে একটা প্রতিজ্ঞাও করেছে। যতদিন তার বানানো ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ থাকবে ততদিন সে ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ নামের অতি দীর্ঘ কবিতাটি লিখে যাবে।

কবি শফিক মজুমদার ভাবে যদি ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ কোনোভাবে বছর দশেক টিকে যায়, তবে কবি হিসেবে তার অমরত্ব মোটামুটি নিশ্চিত হয়! দুঃখিত মহাকবি হিসেবে!

দশ বছরের প্রতিদিন যদি শফিক একটি কবিতাই লিখে যায় তাহলে কবিতা হবে মহাকাব্য। আর মহাকাব্যের স্রষ্টা কবি সরদার শফিক উদ্দিন মজুমদার হবে মহাকবি!

এ বিষয়গুলো রাতের বেলা মেসে বসে বসে ভাবতে শফিকের ভালো লাগে। তার কবি জন্ম সার্থক হয়।

জুয়াড়ি ক্যাফের অগ্রগতি পাঠকদের ধাপে ধাপে জানানো হবে। জুয়াড়ি ক্যাফে শুরু করার আগে শফিক একদিন সন্ধ্যায় বৌদ্ধ মন্দিরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আজ বৃহস্পতিবার। শফিক তার বন্ধু সুকান্ত, ইব্রাহিম, বিশান্ত পোখরেল কাউকে খুঁজে পেল না। সুুব্রত গোমেজ, রিচার্ড ও মহাদেব জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে। শফিক দুপুরের পর থেকে খুঁজে খুঁজে কুদরতকে জোগাড় করেছে। শফিক ও কুদরত দুই বন্ধু ফুটপাত ধরে হাঁটছে। গন্তব্য ধর্মানন্দ দাস বড়ুয়া। মহামান্য ধর্মানন্দ দা বৌদ্ধ মন্দিরের ভিতরে থাকেন।

সন্ধ্যার পর পর আমি আর কুদরত অতীশ দীপঙ্কর সড়কে পৌঁছলাম। আমরা দু’জন বৌদ্ধ মন্দিরের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। গেটের সামনে বিশাল জলাশয়। জলাশয়ভর্তি পানি। পানি পাড়ে ছলছল করছে। হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ডান পাশের রাস্তা ধরে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। বাম পাশের ফাঁকা জমিতে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। সুরকি-বালির সাথে সিমেন্ট মেশানো হচ্ছে। বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। কুদরতকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ধর্মানন্দ দা নির্মানাধীন ভবনের পরের ভবনের তিন তলায় থাকেন। তার জন্য আলাদা একটি রুম বরাদ্দ দেওয়া আছে। দাদার রুমের ঠিকানা ভুলে গেছি। পাশের কাউকে জিজ্ঞেস করলে এক্ষুনি বলে দেবে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। তিনতলায় টানা বারান্দা। হোটেল রুমের মতো গোটা বিশেক রুমতো হবেই। কিছুক্ষণ হেঁটে ভয়ে ভয়ে একটা বন্ধ রুমে কড়া নাড়লাম। বেশ আগে এসেছিলাম। ভুল দরজায় কড়া নেড়েছি কিনা কে জানে!

কিছুক্ষণ পর মহামান্য গোত্র পিতা ধর্মানন্দ দাস বড়ুয়া বেরিয়ে এলেন। অসম্ভব সুন্দর করে হাসি দিলেন। আরে পান্থজনের সখা, পথ ভুল করে নাকি!

নাহ্ দাদা; কী যে বলেন?

আপনাকে দেখতে এসেছি। দাদা, আমি কবি সরদার শফিক মজুমদার! আর ও হলো আমার কবিবন্ধু বর্তমানে কুদরত। আমরা দাদা প্রতি বুধবার রাতে যৌথভাবে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। দাদা আমাদের যৌথ কবিদের বাকিরা ঢাকার বাইরে আছে। সাদা হাফহাতা গেঞ্জি ও সাদা পায়জামা পরা ধর্মানন্দদা আমাদের ভিতরে বসতে দিলেন। গোত্রপিতার বয়স আশি পার হয়েছে তাও বছর দুই হবে। ঘাড়ের পিছনে লম্বা সাদা চুল। শফিক প্রায়ই ভাবে এবং আশ্চর্য হয় এই জীবনে ধর্মানন্দ দাস বড়ুয়ার মতো কিংবদন্তির সাথে তার দেখা হয়েছিল। পরিচয় হয়েছিল। একসাথে বসে বহুদিন খাওয়াদাওয়া আড্ডা হলো। কিছু মানুষের প্রতি মোহ ভাঙে না। কখনও ভাঙে না। মহামান্য গোত্র পিতা হলেন এমন একজন মহামানব।

তিনি আমাদের জন্য বিশেষ কিছু আনতে ভিতরে চলে গেলেন। এই ফাঁকে পাঠকদের তার রুমের বর্ণনা খুব সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়া যেতে পারে। তিনি ফিরে এসে কথাবার্তা শুরু করলে এ সুযোগ আর ফিরে পাওয়া যাবে না। রুমের মাঝে বিশাল পুরনো কাঠের বুক শেলফ দিয়ে আংশিক পার্টিশন করা। প্রথম অংশটুকু মিনি ড্রইংরুম। বসার জন্য চারটি সোফা। সামনে টেবিল। শেলফ ভর্তি হাজারে হাজারে পুরনো বই। একবার চোখ বুলালেই মনে প্রশান্তি লাগে। সাথে সাথে হাহাকার শুরু হয়। মনে হয় বইগুলো যদি ধার নিয়ে যাওয়া যেত। কিংবা চুরি! একটা বইয়ে চোখ আটকে গেল। ‘প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র’। বইটার মিনিমাম বিশটা খণ্ড দেখা গেল। ঢাউস সাইজের বই। প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে দাদার জানাশোনার পরিধির সীমা-পরিসীমা নেই।

দেয়ালে পাহাড়ি কিছু পুরনো শুকনো ফল ঝুলানো। কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো আকারে চার-পাঁচ হাতের মতো একটি ফলও ঝুলছে। হাতের বামপাশে কাঠের আলমারির উপর বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধমূর্তি। তার উপরের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ লাগানো। ওয়াশরুমের দরজাতেও একটি বড় প্রাচীন মুখোশ লাগানো। পিছনের অংশে তার শোবার বিছানা। লেখার জন্য চেয়ার-টেবিল। টেবিলটা সাইজে বেশ বড়। পুরো টেবিলজুড়ে শুধু বই আর বই। সামনের অংশে টানা লম্বা টেবিল। টেবিলজুড়ে বিভিন্ন ধরনের প্রায় শ’খানেক বোতল। বেশির ভাগ বিদেশি। টেবিলের নিচে ধুলো পড়া বড় বড় দশ-বারোটা স্যুটকেস! ধর্মানন্দদা তিনটা কাপ নিয়ে ঢুকলেন। সামনে টেবিলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন এগুলো কিসের তৈরি বলতে পারো?

আমরা সাইজে ছোট অসম্ভব সুন্দর কাপগুলো নেড়েচেড়ে দেখি। কুদরত চোখ বড় বড় করে তাকায়।

দাদা জবাব দিলেন এগুলো হলো চিনামাটির পাত্র। জাপান থেকে আমার বান্ধবী এগুলো পাঠিয়েছে। দাদার চেহারায় অদ্ভুত সুন্দর এক ভালো লাগার ঝলকানি দেখা গেল। কুদরত ও আমি তা মন ভরে দেখছি। এই মানুষটা তার চারপাশের মানুষদের কথা বলে মুগ্ধ করে  রাখে তা ভুল। তার চারপাশের মানুষজন তিনি কথা বলা শুরু করার অনেক আগেই মুগ্ধ হয়ে বসে থাকে। তিনি ছোট্ট গোলগাল একটি বোতল নিয়ে এলেন। টেবিলের উপর রাখলেন। আবারও প্রশ্ন করলেন, একে চিনতে পারো?

আমরা চোখ বড় বড় করে দেখলাম, বোতলের গায়ে এক বয়স্ক মানুষের ছবি আঁকা। মাথায় চুল নেই।

আমরা চুপচাপ দেখছি। কিছু বলছি না। এই ভদ্রলোক হলো ওল্ড মন্ক (Old Monk)! তোমাদের জন্য এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে বহুদিন রেখে দিয়েছিলাম। তোমরা আসি আসি করে আসোনি! অবশেষে একটু একটু করে নিজেই গিলে ফেলেছি! টেবিলের উপর চোখের সামনে ভালো জিনিস খুব বেশি দিন ফেলে রাখা যায় না।

বোতলে যতটুকু আছে তা তোমরা দুজনে ভাগ করে খেয়ে ফেলো।

আমরা আবারও এই মহামানবের ভালোবাসায় সিক্ত হলাম।

তিনি পরম মমতায় চিনামাটির পাত্রে জিনিস ঢেলে দিলেন।

আমরা আবারও বিগলিত হলাম।

তিনি হঠাৎ কিছু না বলে ভিতরে চলে গেলেন। আমরা চিনামাটির পাত্র হাতে তার ফেরার অপেক্ষায়। তিনি লিলিপুট সাইজের একটা অতি কারুকার্যময় ডায়েরি নিয়ে ফিরলেন। তার ডায়েরিটা আমাদের ধরে দেখতে দিলেন।

ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে আমরা মুগ্ধতার চরম সীমায় পৌঁছালাম। গুঁটি গুঁটি ইংরেজি হরফে লেখা। প্রথম পৃষ্ঠায় খুব সুন্দর করে লেখকের নাম লেখা। কিছু ফুলের ছবি আঁকা। উপরে ক্যাপিটাল লেটারে মহামান্য ধর্মনানন্দ দাস বড়ুয়ার নাম লেখা! দাদার বিদেশি গার্লফ্রেন্ডের তোহ্ফা। তিনি আমাদের পাশে বসে কাপে চুমুক দিলেন। তিনি ধীরে ধীরে সিক্ত হলেন। আমরাও চিনামাটির পাত্রে চুমুক দিলাম। আমরাও দাদার মতো সিক্ত হলাম।

বহুদিন হলো তাকে খুঁজে পাই না। কোনো যোগাযোগ নেই। সব কনট্রাক্ট নাম্বার হারিয়ে ফেলেছি। তোমরা দেখো তো চেষ্টা করে। ইন্টারনেটের যুগে তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারো কিনা?

আমরা চুপচাপ কিছুক্ষণ পরপর চিনামাটিতে চুমুক দেই। আমরা দাদার কথা শুনছি। আমাদের চোখ ভিজে যাচ্ছে। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তার যৌবনের প্রেমিকার গল্প বলে চলেছেন। তার হাহাকার পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ যখন তার ব্যক্তিগত দুঃখকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন, তখন তা আর ব্যক্তিগত দুঃখ থাকে না। তখন তা সবার নিজস্ব দুঃখ হয়ে যায়। এখন আমরা সেই অচেনা বিদেশিনীর জন্য একসাথে বিলাপ করছি!

কুদরত খুব মনোযোগ দিয়ে দাদার প্রেমিকার হাতে বানানো ডায়েরিটা উল্টেপাল্টে দেখছে। কুদরতকে খুব আবেগপ্রবণ লাগছে।

কুদরত সেই ডায়েরির প্রথম পাতা পড়ে অঝোরে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। আমরা শুধু কুদরতের আহাজারি দেখছি। কোনো কথা বলছি না।

দাদার প্রেমিকার ডায়েরির পাতায় যা লেখা ছিল তা পাঠকদের জানাতে ইচ্ছে করছে।

To

Mr. Dharmananda Das Barua

Hope you recover your health soon and with warmest regards.

So happy meeting you in Kolkata on 5 February 2006.

TAEKO KUROKAWA!

কথাবার্তার একপর্যায়ে শফিক ও কুদরত একমত হলো এখন থেকে তাদের জীবনের একমাত্র চাওয়া দাদার প্রেমিকা তিয়েকো কুরকাওয়া (TAEKO KUROKAWA)-কে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করা। প্রয়োজনে তারা ওসাকা, টোকিও, ইয়োকোহামা, কোবেসহ সব বড় বড় শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজবে।

কুদরতকে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে! সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে রাজি না। কাজে নেমে পড়তে হবে।

কুদরত দাদাকে প্রশ্ন করল-

আচ্ছা দাদা; আপনি এত দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করলেন! আমিও আপনার মতো অনেকদিন বাঁচতে চাই। আপনার বেঁচে থাকার গুপ্ত রহস্য কী, দাদা?

শোন কুদরত আমি প্রতিদিন চিনামাটির পাত্রে দেশি-বিদেশি জিনিস ঢালছি।

হুম্ দাদা।

এগুলো ভালো জিনিস। তুইও খা। বেশি দিন বাঁচবি!

কুদরত চুপ হয়ে গেল। সে কথা বাড়ালো না। গুরুজনের সাথে তর্ক করা বেয়াদবি। তাছাড়া সে এখন থেকে নতুন কাজে নেমে পড়বে। প্রয়োজনে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেবে। তার আগে জাপানি ভাষায় একটা শর্ট কোর্স করার চিন্তা বেশ ভালোভাবেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সে দৌড়ে গিয়ে দাদাকে বার দুয়েক কদমবুসি করে নিল।

গল্প করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেছে। কুদরত আমাকে চোখে চোখে ইশারা করল। আমাদের দ্রুত উঠতে হবে। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা দাদার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তিনি নিচে নেমে গেট পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিলেন।

‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ নামক দীর্ঘ কবিতার গল্প দাদাকে বলা হলো না। নতুন কফি শপের ব্যাপারটাও জানানো গেল না। বিভিন্ন দেশে দেশে এখন ‘মারিজুয়ানা বার’ চালু হয়েছে। মানুষজন লাইনে দাঁড়িয়ে সেখানে ঢুকছে।

শফিক ভাবছে দেশে বৃদ্ধ সন্ন্যাসীদের জন্য ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ চালু করবে কিনা। বিভিন্ন দেশি বিদেশি তরল চিনামাটির পাত্রে পরিবেশন করা হবে। শিবাজি ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত ‘শিবাজি বার’ এর কনসেপ্ট ভেঙে জনগণের বার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাছাড়া ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’তে ‘মিস তিয়েকো কুরকুওয়া’কে নিয়েও দলবেঁধে ভাবা যেত। তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালানো যেত! এ সপ্তাহে দাদাকে জুয়াড়ি ক্যাফের ব্যাপারে কিছুই জানানো হলো না। এর কোনো মানে হয়! সামনে সপ্তাহে অবশ্যই তাকে জানাতে হবে। বারের মেন্যু ঠিক করতে হবে।

দাদা আমাদের এগিয়ে দিতে এসে একেবারে মন্দিরের গেটের বাইরে চলে এসেছে।

দাদা আমাদের দু’জনকে কাছে ডাকলেন। তিনি ইশারায় ডাকলেন। তার চোখ ছলছল করছে।

শোন, তিয়েকো কুরাকুওয়া মানে হলো কালো নদী!

এই কথা বলে তিনি মন্দিরের ভিতরের রাস্তায় চলে গেলেন। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তিনি জলাশয়ের পাশের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছেন। আমরা দুজন তাকিয়ে আছি। রাত গভীর হয়েছে। আমাদের দু’জনের কাছে মন্দিরের জলাশয়টাকে এখন কালো নদী মনে হলো। চারদিকে শো শো বাতাস বইছে। আজ কালো নদীতে আবারও প্রবল ঢেউ উঠেছে! কবি সরদার শফিক উদ্দিন মজুমদারের ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ চালু হয়েছে। চালু হওয়ার পর থেকে জুয়াড়ি ক্যাফেতে বিচিত্র ধরনের মানুষজন আসতে শুরু করেছে। শফিক নিজেও ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ নামক দীর্ঘ কবিতা লেখা শুরু করেছে। সে প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখছে। কবিতাটি তার আরও দশ বছর লেখার ইচ্ছা!

গত সপ্তাহে ক্যাফেতে বিচিত্র এক আর্টিস্টের আগমন ঘটেছে। শিল্পীর নাম অমল সূত্রধর। সে প্রতিদিন সকালে জুয়াড়ি ক্যাফেতে বোর্ড, রংতুলি নিয়ে হাজির হয়। তারপর এক কোনার দিকে ফ্লোরে গভীর রাত পর্যন্ত এ শিল্পী ছবি আঁকে। সে শুধু বাচ্চা মেয়ের ছবি আঁকে।

নতুন একটি মেয়ের ছবি আঁকা শেষে তাঁর সাথে আপন মনে কথা শুরু করে। সে জুয়াড়ি ক্যাফের কোনো কাস্টমার, কর্মচারীকে বিরক্ত করে না। কখনও ক্ষুধায় খাবারও চায় না। এখানকার কাস্টমার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তার ছবি আঁকা দেখে। মুগ্ধ হয়ে দেখে। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে যখন লাল ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটির ছবি আঁকা শেষ হয় তখন পুরো জুয়াড়ি ক্যাফেতে এক প্রবল ঘোরের সৃষ্টি হয়।

সন্ধ্যা মিলাবার পর থেকেই আর্টিস্ট তার ছবির মেয়ের সাথে কথা বলা শুরু করে। ক্যাফের পরিবেশ তখন থমথমে হয়ে যায়। তখন কেউ কোনো কথা বলে না। ছোট্ট কন্যার প্রতি এক বাবার তীব্র আহাজারিতে পুরো ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ দুলতে থাকে। প্রতিটি মানুষের সুপ্ত দুঃখবোধ জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে তা গভীর হয়। এক অতৃপ্ত পিতা তার কন্যার জন্য তার সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে পুরো পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।

গভীর রাত পর্যন্ত অমল সূত্রধর তার কন্যা প্রীতিলতার সাথে গল্প করে। পিতা ও কন্যার অভিমান পর্বও চলে।

হয়তো প্রীতিলতা অভিযোগ করে বসলো, পিতাজি, আজ আমার জন্যে লাল কালারের চুলের ফিতা আনার কথা ছিল। আপনি গতকালের মতো আজও ভুলে গেছেন। এত ভুলো মন হলে চলবে কীভাবে?

আপনার একমাত্র মেয়ের প্রতিটি কথা আপনাকে শুনতে হবে!

তার পরের দৃশ্য দেখার মতো। হৃদয় টনটন করে ওঠে। শিল্পী অমল সূত্রধর হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে ক্ষমা চায়। প্রীতিলতার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করে। তার সাথে মান-অভিমানের খেলা এগিয়ে চলে। যখন প্রীতিলতার কোনোভাবেই মন ভালো হয় না, তখন একজন বাবা অমল সূত্রধর রংতুলি হাতে তুলে নেয়। মেয়ের চুলের দু’পাশে দুটি বেণী করে দেয়। বেণীর ভিতর টুকটুকে লাল দুটি ফিতা গুঁজে দেয়। আঁকা শেষ হলে অপলক নয়নে ছোট্ট প্রীতিলতার দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাজকন্যা প্রীতিলতার মন ভালো হয়ে যায়। সে ফোকলা দাঁতে খিল খিল করে হাসতে শুরু করে। প্রীতিলতার হাসি বাবা অমল সূত্রধর খুব কাছ থেকে শুনতে পায়। হঠাৎ অমলের দু’চোখে গড়িয়ে জল নামে। ছোট্ট প্রীতিলতা ভেবে পায় না আজ এই খুশির দিনে তার অনেক প্রিয় বাবা কাঁদছে কেন? সে প্রাণপণে বাবার চোখের জল মুছে দিতে চেষ্টা করে। প্রীতিলতা প্রায়ই ভাবে তার বাবা অমল সূত্রধর পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাবা। কিন্তু বাবা শিল্পী হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পী এখনও হতে পারেনি! তবে একদিন নিশ্চয়ই তা পারবে।

বাবা রোজ আমার ছবি আঁকে। সুন্দর করে আমার হাত এঁকে দেয়। একেক দিন একেক জামা পরিয়ে দেয়। কোনোদিন সে চুল খোলা রাখে। কোনোদিন দুই বেণি করে লাল ফিতা বেঁধে দেয়। কিন্তু আমি ছবি থেকে বেরিয়ে কখনও বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না। তার চোখের জল মুছে দিতে পারি না! কিন্তু আমি জানি বাবা একদিন আমার এমন ছবি আঁকবে; সেদিন আমি তার ছবি থেকে বেরিয়ে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব। তার চোখের জল নিজের হাতে মুছে দিতে পারব। শুধু শুধু কথা বলে শেষ করব না।

আমার প্রিয় বাবা, সেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পী হবে। আমি অপেক্ষায় থাকি। আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করি, বাবা!

শিল্পী অমল সূত্রধরের কান্নার শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। রাত আরও গভীর হলে ছোট্ট প্রীতিলতা ঘুমিয়ে পড়ে। জুয়াড়ি ক্যাফের সব কাস্টমার বাড়ি ফিরে যায়। অমলেরও চোখের জল শুকিয়ে যায়। সে নিজেও বাড়ি ফিরে যায়। আগামীকাল খুব সকালে আবারও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পী হওয়ায় পরীক্ষায় তাকে বসতে হবে। প্রীতিলতার জন্য নতুন একটা জামা কিনে দিতে হবে। নভেম্বরে শীত শীত ভাব চলে এসেছে। মেয়েটার জন্য একটা চেক সোয়েটারের ব্যবস্থা কাল করতে হবে!

যে কোনো সময় সর্দি-কাশি লাগাতে পারে। পায়ে একটা গরম জুতাও পরিয়ে দিতে হবে। প্রীতিলতার খালি পায়ে হাঁটতে অনেক কষ্ট হবে!

কবি সরদার শফিক মজুমদারের ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ কবিতাও এগিয়ে চলছে। সে প্রতিদিন জুয়াড়ি ক্যাফেতে বসে মানুষের কাজকর্ম দেখে। ইচ্ছে হলে কবিতার কিছু লাইন লিখে রাখে।

‘জুয়াড়ি ক্যাফে’র বিভিন্ন টেবিলে বিচিত্র সব বিষয় দিয়ে আলোচনা হয়। কিছু বিষয় পাঠকদের জানানো যায়।

বটবৃক্ষের বংশবৃদ্ধি!

বটবৃক্ষের বংশবৃদ্ধি নিযে আজ লম্বা সময় গুরুগম্ভীর আলোচনা হলো। নতুন বটশিশুর জন্ম বটপাতা থেকে কিংবা বিচি মাটিতে পুঁতে দিলেই হয় না। কিংবা বটগাছের পাশ থেকে বাঁশগাছের মতো শিকড় গজিয়ে নতুন বটশিশু বের হয় না! বটবৃক্ষের বংশবিস্তার পদ্ধতি বেশ মজার। পাখি বট ফল খাবে। তারপর পাখিরা ফল খেয়ে বীজ চারিদিকে ছড়িয়ে দেবে। পাখিবাহিত এই বীজ দালানের কার্নিশ, পুরনো দালানের ফাটল কিংবা অন্য কোনো গাছের কোটরে খুব সহজেই অঙ্কুরিত হতে পারে। পৃথিবী রহস্যময়। আমাদের জানার কখনও শেষ থাকে না। এই গ্রুপটি আগামীকাল কাঁকরোলের বংশবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করবে বলে, একসময় চলে যায়!

সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি!

একদল লোক জুয়াড়ি ক্যাফেতে ঢুকে সুইস ব্যাংকে কীভাবে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। অ্যাকাউন্ট খুলতে কী কী কাগজপত্র লাগে তা নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা এগিয়ে চলে।

মাতৃগর্ভে নিজেকে দেখা!

কিছুদিন হলো একদল যুবক জুয়াড়ি ক্যাফেতে এসে ঝিম ধরে বসে থাকে। আর্টিস্টের আঁকাআঁকি দেখে। তারা খুব বেশি কথা বলে না। এমনকি গ্রুপের একে অপরের সাথেও খুব বেশি কনভারসেসন হয় না। এই যুবকের দলটি অন্যদের বিরক্ত করে না। খুব ভোরে জুয়াড়ি ক্যাফেতে ঢুকে পড়ে। গভীর রাতে বের হয়ে যায়। প্রায় ১২ ঘণ্টার মতো প্রতিদিন এখানে থাকে।

মাঝে মাঝে এদের চোখ বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে মুচকি হাসে। মাঝে মাঝে খুব বিরক্তি নিয়ে বাসায় ফিরে যায়। যুবকের এই দলটি নাকি অতীত ও ভবিষ্যৎ ভ্রমণে থাকে! কিছুদিন পর তারা মাউথ অর্গান ও গিটার নিয়ে আসতে শুরু করল। তারা খুব ধীরলয়ের গান গায়। তাদের প্রতিটি গান কবিতার মতো লাগে! এমনও দিন গেছে একই গান বার বার গাইছে। ভোরবেলা থেকে গভীর রাত।

যুবকের এই দলটি সর্বদা আনন্দ ভ্রমণে থাকে। তারা কাউকে বিরক্ত করতে চায় না শুধু নিজেদের একটু ভালোভাবে চিনতে চায়!

কবি সরদার শফিক মজুমদারকে অচিন যুবকের এই দলটা খুব টানে। তাদের অতি আপন মনে হয়। একসময় শফিকদের ‘বার মাতাল যুবক’ গ্রুপের সবাই এই দলে যোগ দেয়।

সবার সাথে ‘বার মাতাল যুবক’ মিশে যায়। জুয়াড়ি ক্যাফের বাইরে অনেকে বলা শুরু করেছে এই ক্যাফেতে একদল জুয়াড়ি যুবক নাকি LSD নিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকে। কবিতা লেখে। গান গায়। LSD হল হ্যালুসিনেটিং ড্রাগ। এটা নিলে (Lysergic acid diethylamide) নাকি জীবনের নতুন এক জানালা খুলে যায়! ১২ ঘণ্টার এ জার্নি নাকি জীবনের অনেক রহস্যের সমাধান করে দেয়।

LSD বানানোর প্রক্রিয়াও বেশ দুর্বোধ্য। কে কোথা হতে LSD নিয়ে আসবে কে জানে। ‘বার মাতাল যুবক’ LSD না নিয়েও নতুন জার্নি শুরু করে। জার্নি শুরু হয় ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ নামক এক মায়াবী স্টেশন হতে।

আজ বুধবার সন্ধ্যা। আশ্চর্য সন্ধ্যা। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। জুয়াড়ি ক্যাফে ফাঁকা। একদল অচিন যুবকের ছায়াপথে ‘বার মাতাল যুবক’ বিচরণ করছে। তারা ফিরে গেল ১৯৬৭ সালের এক সন্ধ্যায়! বুধ সন্ধ্যা। তারা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে একদল যুবক গাইছে-

Lucy in the Sky with Diamonds

কী আশ্চর্য! এখানেও LSD! একদল পথহারা যুবকদের জার্নি আনন্দময় হোক। তারা সবাই জানুক পৃথিবীতে ‘জুয়াড়ি ক্যাফে’ নামে কোনোকিছু নেই। ছিল না কোনোদিন!

সুফি বাংলার পান্থ : কবি ও সাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares