গল্প : গল্পের ফেরিওয়ালা : বিনয় দত্ত

গল্প

গল্পের ফেরিওয়ালা

বিনয় দত্ত

নেওয়াজ আলি খান একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক। যার চলচ্চিত্র সমাজের সবশ্রেণির মানুষকে বিনোদিত করে। তিনি সবসময় বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও এইবার হঠাৎ ভিন্নধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। ভিন্নধারার চলচ্চিত্রের জন্যে তাঁর গল্পের সংকট দেখা দিল। গল্পের জোগান দেয়ার জন্যে তিনি একাধিক মাধ্যমে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে শেষমেষ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দিলেন।

পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষজন তার অফিসে ভিড় জমাতে থাকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নেওয়াজ আলি, তাঁর সহকারী ইকরাম তালুকদার, চিত্রগ্রাহক মোবারক হোসেন এবং চিত্রনাট্যকার শাকির আবদুল্লাহ মিলে খুব মনযোগ দিয়ে সবার সব ধরনের গল্প শোনা শুরু করলেন। একই রকম গল্প সবাই নিজেদের মতো করে নিজের গল্প বলে বলা শুরু করে। ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষের গল্প শুনে নেওয়াজ আলি বেশ বিরক্তই হয়ে পড়লেন।

বিরক্তি কাটানোর জন্যে এবং নিজেকে কিছুটা হালকা করার উদ্দেশ্যে নেওয়াজ আলি তাঁর পছন্দের নায়িকা আলিফা সুলতানার ফ্ল্যাটে গেলেন। আলিফার ফ্ল্যাটে তিনি প্রায়শই যাওয়া আসা করেন। এই যাওয়া আসার মধ্যে তিনি ফুরফুরা হয়ে উঠেন এবং কাজের একাগ্রতা খুঁজে পান।

অবশ্য নেওয়াজ আলি খান আলিফাকে কথা দিয়েছেন এই ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্রে তাকেই প্রধান চরিত্র দেয়া হবে। আলিফাও তাতে অনেক বেশি মাত্রায় উচ্ছ্বসিত। সবসময় একই রকম চরিত্র করতে করতে আলিফা খানিকটা বিরক্ত। নেওয়াজ আলির নতুন চলচ্চিত্রের জন্যে আলিফা সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

নেওয়াজ আলি ইকরামকে জানিয়ে দেয় আগামী দুইদিন গল্প শোনার কাজ বন্ধ থাকবে। দুইদিন পর আবার নতুন উদ্যমে সবার গল্প শোনা হবে। এই দুইদিন বাকি সব কাজের দায়িত্ব ইকরামের উপর দিয়েই নেওয়াজ আলি আলিফার ফ্ল্যাটে হাজির হলেন।

আলিফা ফ্ল্যাটেই ছিল। ফ্ল্যাটটা এইবারই কিনেছে। আগের বাসায় সমস্যা হচ্ছিল দেখে নিজের কাজের সুবিধার জন্য ফ্ল্যাট কেনা। নেওয়াজ আলিকে দেখে তার অনভিপ্রেত খুশির রেশ চোখেমুখে ধরা পড়ে।

নেওয়াজ আলি আলিফার সাথে সুন্দর মুহূর্ত পার করেন, নিজের চিত্ত বিনোদিত করেন, মনকে প্রফুল্লিত করে আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নেওয়াজ আলি এবং তাঁর টিম মিলে আবার সকল শ্রেণিপেশার মানুষের গল্প শোনা শুরু করলেন।

কবি, সাংবাদিক, লেখক, গৃহিণী, ছাত্র, পুলিশ, আমলা, নেতা, তরুণী, ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, বয়স্ক মহিলা, উদীয়মান চলচ্চিত্র নির্মাতা, ব্যবসায়ী, উকিল, নার্স, মাস্তান, চোর, সাধারণ মানুষসহ সবাই নেওয়াজ আলিকে বিভিন্ন রকম গল্প শুনিয়েছেন। এই গল্প শুনতে শুনতে একরকম বিরক্ত হয়ে একদিন সন্ধ্যার আগেই বিরতি নিলেন। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষজনের সাথে কথা বলতে বলতে তিনি এবং তাঁর টিম কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

একঘেয়েমি গল্প তিনি আর নিতে পারছেন না। সবাই নিজের জীবনের গল্প শোনানোর ব্যাপারে অতি বেশি মাত্রায় আগ্রহী। তিনি তো কারও ব্যক্তিগত জীবনের গল্প শুনতে চাননি বরং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে একটি ভিন্নধর্মী সিনেমার গল্প শুনতে চেয়েছেন।

বিরক্তির মাত্রা যখন তুঙ্গে তখন তিনি আগামী দিনের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। ভাবলেন, নিজেই গল্প ভাববেন এমনটা মনস্থির করলেন, সাথে সাথে ইকরামকে জানিয়ে দিলেন কোনো কিছুতেই যেন তাকে বিরক্ত করা না হয়। ইকরাম কিছুটা চাপমুক্ত হল। অন্তত দুই একদিন কাজের চাপসহ পরিচালকের চাপ থেকে মুক্তি পেল। এইরকম আগেও হয়েছে। এইটা নতুন নয়। এই সময়টাতে সবাইকে শুধু একটি কথায় বলতে হয়, স্যার এখন কারও সাথে কথা বলবেন না। খুব জরুরি হলে স্যার নিজে যোগাযোগ করবেন।

নেওয়াজ আলি নিজের রুমে প্রবেশ করে গল্প ভাবতে শুরু করেন। বেশকিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তার মধ্যদিয়ে সময় নষ্ট করে তিনি আশা ছেড়ে দেন। বুঝতে পারলেন এইধরনের গল্প ভাবা তাঁর কাজ নয়, এ অন্য কারও কাজ।

রাত ঠিক নয়টার সময় একজন লোক তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। নেওয়াজ আলির বাসা এবং অফিস একই বিল্ডিংএ। ইকরাম ভদ্রলোককে বাড়ির গেইট থেকে বিদায় নিতে বলেছে। নাছোড়বান্দা এই বয়স্ক লোক কিছুতেই নেওয়াজ আলির সাথে দেখা না করে যাবেন না। ইকরাম ভয়ে ভয়ে নেওয়াজ আলিকে ঘটনা জানানোর পর প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে বাসার বারান্দা থেকে ভদ্রলোকের সাথে দেখা করেন। বিরক্তি নিয়ে তাকে পরেরদিন সকালে আসতেও বলেন।

দফরাইল নামের এই লোক বহুদূর থেকে নেওয়াজ আলি খানের সাথে দেখা করতে এসেছে। এই শহরে তার আর কোনো কাজ নেই। সে একজন গল্পের ফেরিওয়ালা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার বিলপুর গ্রামে তার বাড়ি। ঢাকা শহরে তার থাকার কোনো জায়গাও নেই। নেওয়াজ আলি খানের সাথে দেখা করে গল্প শোনাবে বলে এতদূর থেকে ছুটে আসা।

উপায়ন্তর না দেখে নেওয়াজ আলি, দফরাইল নামের বয়স্ক ভদ্রলোককে উপরে আসার আহবান জানান। এত রাতে বাড়িতে বাইরের লোক ঢোকানোর রেওয়াজ নেই। নেওয়াজ আলির স্ত্রী মনসুরা বেগম তাঁর এই ধরনের আক্কেলহীন কাজে ভয়ানক রাগান্বিত এবং বিরক্ত হলেন। বাইরের লোক আসছে শুনে মনসুরা বেগম তাঁর বয়সের বিভ্রমের দোষ দিলেন।

বয়সের কারণে মনসুরা বেগম এখন যেকোনো ছোটখাট বিষয়েই প্রচণ্ড রেগে যান। মনসুরার এত রাগ দেখে নেওয়াজ আলি ভয়ানক রকম বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারলেন না। নেওয়াজ আলি কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে শান্ত ও স্থির করে রাখলেন। মনসুরা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে উটকো লোকটাকে ঘর থেকে বিদায় করার জন্যে শাসিয়ে আবার নিজের রুমে চলে গেলেন। নিজের কাজের স্বার্থে নেওয়াজ আলি এই নিয়ম ভঙ্গ করলেন। মনসুরা যাওয়ার পর পরই ইকরাম দফরাইলকে নিয়ে উপরে আসেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দফরাইলকে রাতের খাবার খাওয়ার অনুরোধ করলে দফরাইল খাওয়াদাওয়া না করে গল্প শুনিয়ে চলে যাওয়ার কথা জানিয়ে দেয়। এই কথা শুনে নেওয়াজ আলি মনে মনে বেশ খুশিই হলেন।

উদ্ভট বেশভূষাধারী একজন বয়স্ক লোক এত দূর থেকে এসে নেওয়াজ আলি খানের মতো বড় মাপের চলচ্চিত্র পরিচালককে গল্প শুনিয়ে যাবেন আর তিনি তা সাদরে গ্রহণ করবেন তা কি হয়? এইরকম দাম্ভিক অভিব্যক্তি নিয়ে তিনি দফরাইলের গল্প শুনতে বসলেন। দফরাইল শান্ত চোখে নেওয়াজ আলিকে গল্প বলা শুরু করে।

শুরু হল দফরাইলের গল্প। নেওয়াজ আলির ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে আর দফরাইলের গল্প চলছে। এ এক অদ্ভুত গল্প। রেশহীনভাবে দফরাইল গল্প বলে যাচ্ছে আর নেওয়াজ আলি তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছেন। গল্প শোনায় কোনো বিরতি নেই, নেই কোনো জড়তা।

একের পর এক সিগারেট জ্বলছে আর গল্পের গতি নেওয়াজ আলিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে। সময় যে কখন ফুরিয়ে গিয়েছে তা তিনি টেরই পেলেন না। দফরাইলের গল্পের সাথে সাথে পুরো সময়টা পাল্লা দিয়ে ছুটে বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

ভোরের আযান যখন অন্য আরেকটি দিনের কথা জানায় তখন দফরাইলের গল্প বলা শেষ হয়। গল্প শেষ করে দফরাইল নেওয়াজ আলিকে কুর্নিশ করে বেরিয়ে পড়ে। দফরাইল চলে যাওয়ার সাথে সাথে নেওয়াজ আলি দেরি না করে দৌঁড়ে নিজের রুমে প্রবেশ করেন। কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসে পড়েন। ইকরামকে জানিয়ে দিলেন মানুষ খুন হয়ে গেলেও তাকে ডাকা না হয়। নেওয়াজ আলি দ্রুত পুরো গল্পটা মাথায় নিয়ে খস খস করে লিখে যাচ্ছেন।

পাতার পরে পাতা লিখে যাচ্ছেন আর সিগারেটের ফিল্টার একটার পর একটা অ্যাস্ট্রেতে জমা হচ্ছে। এইভাবে বিশাল একটা সময় পার হয়ে যায় গোটা গল্প লিখে শেষ করতে। গল্প দাঁড় করার তিন চার দিনের মধ্যেই পুরো চিত্রনাট্য তৈরি করে তিনি মূল শুটিং শুরু করেন। এত দ্রুত এত বড় আয়োজন দেখে সবাই একটু হতবাক। সবারই বেশ কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারছিল না। কারণ এটি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক নেওয়াজ আলি খানের কাজ।

দুই.

আলিফাকে প্রধান চরিত্র রেখে নেওয়াজ আলি অসাধারণ একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি সমালোচক, দর্শক সব মহলেই সমান জনপ্রিয়তা পায়। কিছু দর্শক অবশ্যি সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও সমালোচক মহল এই চলচ্চিত্র দেখে খুব প্রশংসা করেন নেওয়াজ আলি খানের। বিশেষ করে সবাই এইরকম চমৎকার একটি কাহিনির জন্যে আলাদাভাবে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করলেন। নেওয়াজ আলি সবাইকে নিজের মধ্যে অসাধারণ গল্প ধারণ করার বড় বড় বুলি আওড়াতে থাকেন।

সেই বছর নেওয়াজ আলি খান সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকের পুরষ্কার, সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরষ্কার এবং সেরা কাহিনিকারের পুরষ্কার পেলেন। পুরষ্কারে সবাই বেশ খুশি, খুশি নেওয়াজ আলির প্রিয় নায়িকা আলিফাও। মনসুরাও খুব খুশি, খুশির পাশাপাশি মনসুরা শকুন চোখে আলিফার সাথে নেওয়াজ আলির অন্য কোনো স¤পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। আর কিছুক্ষণ পর পর ইকরামকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করতে থাকেন। ইকরাম বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়ে নেওয়াজ আলিকে মহান পুরুষ আখ্যায়িত করেন। এতে মনসুরার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আসলেও মনের অস্বস্তি দূর হয়নি।

পুরষ্কার নিয়ে রাতে নিজের গাড়িতে করে একা বাসায় ফেরার পথে নেওয়াজ আলি সড়ক দুর্ঘটনার স্বীকার হন। প্রচণ্ড বাজেভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে নেওয়াজ আলিকে হাসপাতালের বিশেষ চিকিৎসা বলয়ে রাখা হয়। নেওয়াজ আলির পুরো পরিবার হাসপাতালে দিন কাটাতে থাকেন। দেশের বড় বড় ডাক্তাররা নেওয়াজ আলিকে বাঁচানোর জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

টানা দুই দিন দুই রাত কোমায় থাকার পর নেওয়াজ আলি তৃতীয় দিন সকালে মারা যান। নেওয়াজ আলির মৃত্যুতে চারদিকে শোকের মাতম নেমে আসে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম কর্মী, চলচ্চিত্রের সমস্ত কলাকুশলী সহ সবাই শোকে কাতর হয়ে পড়েন। সমস্ত শ্রেণিপেশার মানুষজন নেওয়াজ আলির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।

মৃত্যুর পরের ঘটনা। একটি কালো আলো আঁধারি কক্ষে অদ্ভুত ও উদ্ভট বেশভূষা পড়ে বেশকিছু লোকজন বসে আছে। নেওয়াজ আলি দেখল বিশেষ একটি বড় পর্দাতে সবাই কিছু একটা দেখছে। নেওয়াজ আলি অবাক হয়ে যায়, বিশেষ ওই বড় পর্দাতে তার পুরস্কার গ্রহণ করার অনুষ্ঠানটি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু কি ব্যাপার এটা তো নেওয়াজ আলি নয়, এটা কে? এ তো অন্য কেউ। নেওয়াজ আলি চিৎকার করতে লাগল যে, তার পুরষ্কার অন্য একজন নিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে কোনো মহল শত্রুতা করছে। এটা অন্যায়। এটা হতে দেয়া উচিত নয়। বেশকিছুক্ষণ ধরে চিৎকার করতে করতে নেওয়াজ আলি ক্লান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর তাকে ডেকে তোলা হল। বেশ অদ্ভুত ও উদ্ভট বেশভূষাধারী লোকজন এসে তাকে ভিন্ন একটা কক্ষে নিয়ে গেল। কক্ষে আরও কিছু চলচ্চিত্র পরিচালক ও নাট্যনির্দেশকের সাথে নেওয়াজ আলিকে রাখা হল। কক্ষের কাউকেই নেওয়াজ আলি চিনতে পারছে না কিন্তু তাকে সবাই চিনতে পেরেছে। এরা কম বেশি সবাই তাকে এক নামে চেনে এবং জানে। নিজের দাম্ভিকতা নিয়ে নেওয়াজ আলি কারও সাথে কোনো কথা বলছে না। চুপচাপ আশেপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি দেখছে। গৌরব কৈরী, আনোয়ার হোসেন, ফয়সাল রাজীবসহ আরও অনেকে তার এইখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করে কোনো সদুত্তর পেল না। দুই একজন তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথাও বলতে এসেছে কিন্তু নেওয়াজ আলি তার দাম্ভিক আচরণের কারণে কারও সাথে তেমন কথা বলল না। ব্যাপারটা এমন, আমি কেন এদের সাথে কথা বলব। আমি অনেক বড় মাপের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক। আমি কেন চিনি জানি না এমন লোকের সাথে কথা বলব।

কেন এদের এইখানে রাখা হয়েছে? কেনবা এরা এইখানে? কেনইবা নেওয়াজ আলিকে এইখানে সবার সাথে রাখা হয়েছে? তা কেউই বলতে পারছিল না। নেওয়াজ আলি কোনো কথা না বলে দেয়ালে কিছু লেখা আছে তা পড়তে লাগল।

‘কেউ যদি করে কাহিনি চুরি

তার সৃষ্টির নেই বাহাদুরি’

‘কাহিনি কুম্ভিলক প্রচার করে স্বনামে

ভ্রূণ হত্যার সম অপরাধী ভ্রমে’

‘কাহিনি তস্করকারী

সম লেখক হত্যাকারী’

‘শাস্তি কাহিনি তস্করের

সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের’

এইসব লেখা পড়ে নেওয়াজ আলি সহ অন্যান্য সবাই এমন তাচ্ছিল্যের হাসি দিল যে, এইসব মনগড়া কথাবার্তা লেখাটাই একধরনের অপরাধের সামিল মনে হল। কিছুক্ষণ পরে অদ্ভুত ও উদ্ভট বেশভূষাধারী কিছু লোকজন এসে নেওয়াজ আলিকে ধরে নিয়ে গেল। বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই ব্যাপারে তারা কোনো কথায় বলছিল না। আলো আঁধারি বিচিত্র লেখা সাদৃশ্য দেয়ালের সামনে দিয়ে তাকে নিয়ে একটা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

চারপাশে বিচিত্র সব লোকজনের সমাবেশ। অপ্রচলিত সব পোশাকআষাকের সন্নিবেশে ভরপুর গোটা জায়গা। নেওয়াজ আলি এইসব হাস্যকর কর্মকাণ্ডের কারণ জানার জন্যে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লোককে জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পেল না। অবাক হয়ে কিছুটা জোরে শব্দ করে আবার একই কথা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

কিছুটা বিরক্তি নিয়ে চিৎকার করে একই কথা আবার জিজ্ঞেস করল ঠিকই, কিন্তু কোনো উত্তর আসলো না। একটু পরে নেওয়াজ আলি লক্ষ্য করল, তাকে একটি অতীব স্বচ্ছ কাঁচের ঘরে আটকানো হয়েছে, যা সহজে বোঝা যাচ্ছিল না। ক্ষুদ্র গণ্ডির আশপাশ ঘুরে সবকিছু দেখছিল নেওয়াজ আলি আর ভাবছিল কি বিচিত্র কার্যকলাপই না এদের!

হঠাৎই পাশ ফিরে লক্ষ্য করল বিচারকের আসনে অদ্ভুত ও উদ্ভট বেশভূষাধারী একটি লোক বসা। এই লোকটিকে তার খুব পরিচিত মনে হতে থাকে। কিন্তু কোথায় দেখেছে তা মনে করতে পারছিল না। অনেকক্ষণ পরে তার মনে পড়ল এই লোক হচ্ছে সেই লোক, যিনি ওই রাতে তাকে গল্প শুনিয়েছেন।

কি যেন নাম লোকটার? নেওয়াজ আলি অনেক চেষ্টা করেও তাঁর নাম মনে করতে পারছে না। শুধু মনে পড়ছে গল্পের ফেরিওয়ালা। তিনি নিজেকে গল্পের ফেরিওয়ালা হিসেবে ওই রাতে পরিচয় দিয়েছিল। পরক্ষণেই ভাবল এই লোক এইখানে কি করছেন? ফেরিওয়ালা থাকবে রাস্তায় রাস্তায়, এইখানে তো ফেরিওয়ালার থাকার জায়গা না।

নেওয়াজ আলি ক্রমশই তাকে ডেকে চলেছে কিন্তু তিনি কোনো আহবানই লক্ষ্য করছেন না। নেওয়াজ আলি একটু পরে দেখল তার প্রেয়সী, নায়িকা আলিফা সুলতানা সম্মুখমঞ্চে দাঁড়িয়ে। আলিফা তার বিরুদ্ধে কাহিনি চুরির সাক্ষ্য দিচ্ছে। আলিফার সব কথা নেওয়াজ আলি শুনতে পাচ্ছে কিন্তু তার কোনো কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না।

আলিফার বক্তব্য শুনে নেওয়াজ আলি প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে। আগুন গরম নেওয়াজ আলি আলিফাকে ডেকে চলেছে কিন্তু আলিফা তখনও পর্যন্ত কোনো কথাই শুনছিল না বরং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ দিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে চলছে। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে নেওয়াজ আলি অকথ্য ভাষায় আলিফাকে গালিগালাজ করা শুরু করে। তার গালিগালাজের কিছুই আলিফা শুনতে পাচ্ছিল না, বরং আলিফা তার কাহিনি চুরির সকল ঘটনা দিন ধরে ধরে অভিনয়ের মাধ্যমে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আলিফার সকল বক্তব্য শেষে এইবার সম্মুখমঞ্চে এসে দাঁড়ায় তার সহকারী ইকরাম তালুকদার। ইকরাম কোনো দিকে লক্ষ্য না করে বিচারকের নিকট ওই রাতের পুরো ঘটনা বর্ণনা শুরু করল। এইসব শুনে নেওয়াজ আলি ক্ষোভে হতাশ হয়ে কান্না শুরু করে দিল। ইকরাম সংলাপ সহকারে ওইরাতের পুরো ঘটনা বিচারকের নিকট জানাল। এই গোটা সময়ে নেওয়াজ আলির দিকে কেউই লক্ষ্য করছিল না। সমস্ত বয়ান শেষে ইকরাম সম্মুখমঞ্চ থেকে নেমে পড়ল।

নেওয়াজ আলি ইকরামকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করলেও ইকরাম কেন কেউই তা শুনতে পাচ্ছিল না। বরং সবাই বিচারকের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিচারক সমস্ত বয়ানাদি শুনে চলচ্চিত্র পরিচালক নেওয়াজ আলি খানকে কাহিনি চৌর্যবৃত্তি এবং তা নিজের নামে প্রচার ও প্রসার করার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রায় দেন। রায় শুনেই তার পাগলপ্রায় অবস্থা। রাগে, ক্ষোভে এই বিচারককেও গালিগালাজ শুরু করল। বিচারকের নির্দেশে পাশের অদ্ভুত ও উদ্ভট বেশভূষাধারী লোকজন নেওয়াজ আলিকে জোর করে ধরে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গিয়ে দড়িতে ঝুলিয়ে দিল। নেওয়াজ আলির মৃত্যু হয়ে গেল।

নেওয়াজ আলির ছেলে তৌফিক আদনান তার বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তোলার চেষ্টা করছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। কিন্তু তিনি অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। তৌফিক জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে পারে অবশেষে। ঘুম থেকে উঠেই তিনি ভয়ানক ভয় পাওয়া আতঙ্কিত চোখে নিজেকে দেখে নেন, মুখে ঠাস ঠাস করে চড় দিয়ে দেখেন, গলায় হাত বুলিয়ে দেখেন, জোরে চিমটি কেটে দেখেন সব ঠিক আছে কিনা। তাঁর এইরূপ আচরণ দেখে তৌফিক অবাক হয়ে তার বাবার দিকে চেয়ে রইল। বাবার কিছু হয়েছে কিনা তৌফিক তা বোঝার চেষ্টা করছে।

নেওয়াজ আলি সব দেখে বুঝতে পারলেন তিনি জীবিত আছেন। নিজেকে জীবিত ফিরে পেয়েই তিনি বড় বড় করে দম নিলেন। কিছুটা সময় যাওয়ার পরে তিনি বুঝতে পারলেন তিনি আসলে স্বপ্ন দেখেছিলেন। তৌফিকও বুঝতে পারল তার বাবা ভয়ানক কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছিল যার জন্যে এইরূপ আচরণ করছে। বাবার সঠিক অবস্থা দেখে তৌফিক জানায়, দফরাইল নামের একজন বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন। নেওয়াজ আলি ছেলের দিকে তাকানোর পরে তৌফিক তাঁকে আবার জানায় যে, দফরাইল নামের একজন বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন। এই নাম শোনার সাথে সাথে নেওয়াজ আলি বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠে হুড়মুড় করে পড়তে পড়তে দৌঁড় দিলেন।

বিনয় দত্ত : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares