চিত্রকলা : হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি ৪ : নাজিব তারেক

চিত্রকলা

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি

নাজিব তারেক

আমিনুল ইসলাম, ঢাকা চারুকলার প্রতিষ্ঠাতা ছাত্র, তিনি জানতে চাইলেন- ‘তোমার ছবিতে বাংলাদেশ কই?’ উত্তরে জানতে চেয়েছিলাম- যে শিশুর সকাল শুরু হয় ইংরেজি ভাষার হলিউড/ডিজনি অ্যানিমেশন দেখে, সে শিশুর ছবিতে আপনি কোন বাংলাদেশ খুঁজছেন?

যাদের জন্ম ১৯৬৫-১৯৭৫, তারা বেড়ে উঠেছে সোভিয়েত বই ও পত্রিকা হাতে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিন্তু সে মিত্রতার হাত ধরে সেখানে পড়তে গেছে কতজন? আইজেনস্টাইন-পুদোভকিনের গড়া ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ও ম্যালভিচ-ক্যানদেনিস্কি- সাগালের দেশে কোনো চলচ্চিত্র-ছাত্র কিংবা চারুকলার ছাত্র যায়নি কেন? শাহাবুদ্দিনের চিত্রকর্মও সাক্ষ্য দিচ্ছে পূর্ব ইউরোপ আমাদের মনোজগতের সাথে অধিক নিকট, পশ্চিম ইউরোপের চেয়ে। তবুও আমরা কেন বা কীসের আশায় পশ্চিম ইউরোপেই গেলাম, এমনকি জাপানেও গেছি! কিন্তু আধুনিক শিল্পের অন্যতম উৎসকেন্দ্র সোভিয়েত দেশে যাইনি। কেবলা পশ্চিমে নাকি পশ্চিমই কেবলা?

এ আলোচনা নিশ্চয়ই এক রাজনৈতিক আলোচনা। আমরা এখানে এ আলোচনা করব না। তবু কিছু কথা থাকে, যখন উত্তর আধুনিক শিল্প মানে ‘কবিতার অলঙ্করণ’ বা রাজনৈতিক ভাবনার চিত্ররূপ সন্ধান। আমরা উত্তর আধুনিকতা বুঝতে প্রাচীন মিসর, ভারত, ইত্যাদি চিত্রকলা নিয়ে আলোচনা করব নিশ্চয়ই, আমরা ইউরোপের বসচ (Hieronymus Bosch)-এর চিত্রকর্ম নিয়ে কথা বলব অবশ্যই। কিন্তু আপাতত আমি আমার দেখা কিছু ছবির কথা বলতে চাই শৈশব ও কৈশোরে যেসব ছবি আমার স্বপ্নের ভিতর চলচ্চিত্র হয়ে ধরা দিত, যেমন করে হলিউড পরিচালকদের শট বা ফ্রেম ভাবনায় ইউরোপীয় মিউজিয়ামে প্রদর্শিত লক্ষ লক্ষ চিত্রকর্ম অনুপ্রেরণার কাজ করে। সেই সব ছবি, যার অধিকাংশই ছাপা হয়েছিল উদয়ন, সোভিয়েত নারী, প্রগতি ইত্যাদি পত্রিকার পাতায়।

আমরা তো সোভিয়েত বা রুশ চিত্র-চোখকে অনুসরণ/অনুকরণ করি না। আমাদের বাজার ১৯৫৫-১৯৭৫ এর পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন রুচিতে বাস করছে গত সত্তর বছর ধরেই। আমি বললে আপনি মানতে চাইবেন না জানি তাই বলছি- মিশেল ফুকো আমাদের জানাচ্ছেন উপনিবেশের কাল থেকে ‘মহারানী ভিক্টোরিয়া’ বিরাজ করছেন আমাদের চোখের রুচিতে। সেটাই বাড়তে বাড়তে এমন হয়েছে যে, কোনো চিত্রকর নগ্নিকা এঁকে ফেললে তার চরিত্র নিয়ে টানাটানি না করলেও তার আশপাশের নারীদের চরিত্র নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলবোই। নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই জানি কবি নারীর শরীর নিয়ে কবিতা লিখলেও তার অলঙ্করণ হিসেব নগ্নিকা আঁকলে প্রথমে সম্পাদক আপত্তি তুলবেন, তো সম্পাদক ছাড়পত্র দিলেও প্রগতিশীল কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল উভয় বলয়ের কবি অভিযোগ আনবেন আঁকিয়ে কবিতা বোঝে না!

এমন কালে কেন আমি রুশ চিত্রকলা নিয়ে পড়লাম? নিজেকে জানো, এটাই তো সক্রেটিসের কথা। মানুষের নিজেকে জানা মানে তার শৈশবকে জানা। এটা স্মৃতি, এটা ইতিহাস। যে যত গভীরে যাবে, সে যত বিস্তারে ছড়াবে। আর চিত্রকলা বা রূপকলা মানে দেখবার ও দেখাবার আনন্দ। এ সেলফিকালে আমরা নিজেদের দেখাতে ব্যস্ত অতি, সেটা উত্তর আধুনিক চিত্রকলা বটে। আমাদের চারপাশের যে রূপ, ভাষা আবিষ্কারের পর রূপের কাঁধে সিন্দবাদের ভূতের মতো কবিতা (গল্প, ভাবনা ইত্যাদি) চেপে বসে কিংবা রূপের কাঁধে কবিতার চেপে বসার প্রয়োজনে ভাষা আবিষ্কার হয়। ভাষা বা সভ্যতার এত এত বছর পর কবিতাবিহীন ভাষা-পূর্ব সে রূপকে কে ধারণ করবে, কোন চিত্রকলা? প্রি-রাফায়লাইট চিত্রকলায় কবিতার অলংকরণের যে ভার, তা থেকে প্রতিচ্ছায়াবাদীরা চিত্রকলাকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হলেও নিছক রূপের আনন্দে জীবনকে মিশিয়ে দেওয়ার কাজটিতে রুশ চিত্রকরেরা অধিক সফল।

বাংলার কালীঘাটের পট কোন এক কবিতার অলংকরণ, কিন্তু মূল নকশাকারের মস্তিষ্কে গল্পটি থাকলেও যে চিত্রকর নকশাটিকে ফুটিয়ে তুলছেন পটে শত শত বার, তার কাছে রূপটিই সব। কালীঘাটের পট তাই চিত্রকরের সামাজিক দারিদ্র্যকে ছাপিয়ে হয়ে ওঠে এক জীবনের গান। রুশ চিত্রকলা সেই জীবনে গান।

রাজহাঁস, মেঘ ও নীল

পালতোলা জাহাজটি না থাকলে এ এক আদিম পৃথিবীর ছবি। আকাশ, পাথুরে দ্বীপ, গভীর সমুদ্র আর পরিযায়ী রাজহাঁস। আকাশ যতখানি খোলা ও বিস্তৃত, সমুদ্র ততই গভীর। জলের গভীরতার নীল আকাশে ছড়িয়েছে না আকাশের বিশালতার নীল জলের গভীরে ঘনীভূত হয়েছে? মেঘ যত ভাসমান, রাজহাঁস ততটাই নিজ শরীরের ভার বয়ে উড়ে চলা প্রাণ।

ছবিটা যখন প্রথম দেখি তখন শুধুই রাজহাঁসই ছিল দেখবার আকর্ষণ।  তখন বয়স ৮/৯, এ ছবি নির্জনতার যে অনুভূতি দিয়েছিল ছোট মনে, আজ এত বছর পর নির্জনতার সেই অনুভবেই ফিরিয়ে নিল। নীলের এমন বিষন্নতা শুধু ইস্রাফিলের বাঁশিতেই সম্ভব।

কি কবিতা এসে গেল? হ্যাঁ ভাষা আবিষ্কারের আগের মানুষের মূক দশাটি থেকে আজকের বিবিধ কথার কোলাহলে পরিপূর্ণ পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পালতোলা জাহাজ, কিন্তু পৃথিবী ও পৃথিবীর রূপ এতই আদিম যে, সে আদিমতাই টেনে নেয় এ নির্জনতায়। বিশাল পৃথিবীতে একা, একা আমি। আমি মিশে আছি জলে, পাহাড়ে, মেঘে। আমিই রাজহাঁস হয়ে ভেসে বেড়াই উত্তর দক্ষিণে। জাহাজ আমায় ভাসিয়ে নেয় পূর্ব পশ্চিমে। পাথুরে পাহাড় তার সাক্ষী। আর আকাশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহাকাশে।

ছবির ঊর্ধ্বাংশ দেখুন, দেখুন নিম্নাংশ, আলাদা আলাদা করে। দুই বিপরীত নীল, দুই বিপরীত দহন। পানিও হাত পোড়ায়। পানিই মন পোড়ায়। নাবিকের সমুদ্র নেশা, ঘর ছাড়ার নেশা, ঘরে ফেরার আকুতি। দুটোই নীল।

প্রতিটি রাজহাঁস এক একটি গল্প, জাহাজ স্বয়ং এক ঝুড়ি গল্প। বরফাচ্ছাদিত পাহাড় সে গল্পের সাক্ষী,  সমুদ্র সেই লক্ষ বছরের গল্পকে মূক বানিয়ে বলছে দেখো, দেখতেই থাকো। জলের গভীরে যে গল্পেরা, তারা ছোটো ছোটো ধ্বনিতে ঢেউ হয়ে বাতাসের সাথে মিশে মেঘ হয়, পুনরায় নেমে আসে জলে। গভীর নীল জল। যে মেঘ রেখা ছবিকে উপর নিচে ভাগ করে। সে মেঘরেখাই দুই ছবিকে এক ছবি করে নেয়। এ এক অনন্য কৌশল। বিচ্ছেদের ও মিলনের। পরিযায়ী পাখি, অভিযাত্রী নাবিক কোন এক মিলনের অপেক্ষায় ভেসে যেতে থাকে, ভেসে যেতে থাকে। রেলভ যখন এ ছবি আঁকছেন সে সময়টি অক্টোবর বিপ্লবের পরপরই, স্তব্ধ এক সময়। জড়ের পরের ঝকঝকে নির্জনতার।

গুনগুন গান গায় ফুলকুমারী

১৮৯০ থেকে ১৯১৭ (১৯১৮), বিপ্লব আর বিদ্রোহে রাশিয়া উত্তাল, শিল্প বিপ্লব থেকে সোভিয়েত বিপ্লব, রাজতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্র। ইউক্রেনের মেয়ে জিনাইদার নানা ছিলেন বিখ্যাত স্থপতি, মামারাও তাই। বেনোইস (Benois) পরিবার। বাবা ভাস্কর, মা অংকন দক্ষ। চিত্র শিক্ষা ইলিয়া রিপিন ও ওসিপ বার্জের অধীনে।

২৫ বছরের জিয়ানদা সেরেব্রিয়াকোভা এ ছবিতে নিজেকেই এঁকেছেন ১৯০৯ সালে। নিজ ও তার নিজস্ব জগৎ।

নারীর প্রসাধন নিয়ে অজস্র চিত্রকর্ম আছে পশ্চিমে কি প্রাচ্যে, আঁকা হচ্ছে আঁকা হবে আরও অজস্র। পুরুষ আঁকবে, নারীও আঁকবে। এ ছবি অনন্য। পুরুষ নারীর শরীরের বাঁক ও ভঙ্গি নিয়ে মুগ্ধ হয়েছে, নারী তার নিজস্ব সংগ্রামকেই ফুটিয়ে তুলেছে। কিন্তু জিনাইদা আঁকলেন হাসি। ইউনিয়ন অব রুশিয়ান আর্টিস্টের সপ্তম প্রদর্শনীতে এ ছবি দেখে আলেকজান্ডার বেনোইস লিখেছিলেনÑ রুশ রিপাবলিকের জনগণের জন্য এ এক বিশেষ উপহার, আকর্ণ বিস্তৃত হাসি। রাজনৈতিক উথাল-পাথালের বিপরীতে চিরন্তন নারীর হাসি। দুঃসহ বিপর্যয়কে জয় করবার হাসি। নারী শক্তি।

ক্ষমতা ও রাজনীতির দ্বন্দ্বমুখর কালো মেঘ ছেয়ে আছে চারপাশ, ঘরে বাইরে বরফে আচ্ছাদিত চারপাশ। ঘরের ভিতর উষ্ণতায় ভরে আছে মন, নারীর মন। যা পুরুষের ব্যর্থতার ক্লান্তিকে পরাজিত করে বারবার। পুরুষ পুনরায় জেগে ওঠে ধ্বংস ও সৃজনে। নারী না হয় পুরুষের পুনরুত্থান। কিন্তু নারীর পুনরুত্থান কী? তার প্রসাধন। না এ শুধু নিজেকে পুরুষের জন্য সাজানো নয়।  নিজেকেই আবিষ্কার। নিজের পুনরায়ন। কিছু রঙে, কিছু সৌরভে।

স্নানঘরে চিৎকার করে গান একা হওয়ার ভয় তাড়ায়। চলতে-ফিরতে গুনগুনে গান কী করে? নিজেকে ভাবায়। প্রেম ও স্বপ্নের যে শক্তি সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে মানুষকে বিজয়ী রাখে তা মন থেকে মস্তিষ্কে জমা হয় গুনগুন গানে।

সাদা পটভূমিতে হাতাকাটা সাদা পোশাক। হাতে অলংকার, টিকলো নাক, ঝলমলে ত্বক, বাঁকানো গ্রীবা ও কাঁধ, বাদামি চোখের চাহনি, বিস্তৃত ঠোঁটে চাপা হাসি। সমুখপটে প্রসাধনের এটা সেটা ও দুই মোমবাতি। চারপাশ আয়নার ফ্রেমে আঁটা, প্রতিবিম্বের কারণে বাম হাত হয়েছে ডান হাত। ডান হাতে চুল এমন করে ধরা যে, কনুইয়ের আড়াল নারী শরীরের বাঁক রহস্যকে করেছে আরও রহস্যময়। বাম হাতের চিরুনিতে চুলের ডগা। সাদা ব্যতীত আর কোনো রঙ উচ্চকিত নয়। চুল, মেঝে ও আয়নার ফ্রেমের বাদামি পুরো ছবির বিবিধ উপাদানকে বেঁধে রাখে দৃষ্টিসীমায়। দর্শক চোখ এক স্নিগ্ধ আনন্দে ভরে ওঠে। সমুখপটের  কিছু গোলাপি, কিছু নীল, কিছু সবুজ-সাদার ভেতরে লুকিয়ে থাকা রংধনুকেই ছড়িয়ে দেয় দর্শক মননে। দর্শক কান যেন শুনতে পায় জিনাইদার গুনগুন গান।

দশ বছর বয়সে সোভিয়েত নারীতে মুদ্রিত এ ছবি যখন দেখি তখন আমি শৈশব ছাড়িয়ে কৈশোরের দিকে ধাবমান। নারী ও পুরুষকে আলাদা করতে শিখছি মাত্র। চারদিক বিবিধ শরীরী কোলাহলে পরিপূর্ণ, খেলার সাথিরা বদলে যাচ্ছে, নিজেও বদলে যাচ্ছি। সিঁড়ির নিচে, প্রাইভেট পড়ে ফিরবার পথে কিংবা বরই পাড়তে ঝোপের ভিতরে পাশের বাড়ির কিংবা সহপাঠী মেয়েটি হঠাৎ বদলে যায়।  এমন এক গোধূলি সময়ে বারবার এ ছবি দেখি আর অবাক হই। আমি শান্ত হই। বই ও নেট ঘেঁটে যত ছবি দেখা হয়েছে, নারীর প্রসাধন নিয়ে এ ছবি অনন্য তার ‘ভাব’-এ। আর কোনো ছবিই যে নারীর গুনগুন গান শোনায় না।

অক্টোবর বিপ্লব শুধু নতুন সম্ভাবনাই আনেনি, তছনছ করেছে অনেক জীবনও, তাই বিপ্লবের পর জিনাইদা এমন গুনগুন গান আর কোনোদিন গেয়েছেন কিনা আমাদের জানা নেই।

লাল ঘোড়া লাল বিপ্লব

১৯১২ অক্টোবর, বিপ্লব তখনও অনেক দূরে। সম্রাট অপসারিত, রিপাবলিকরা ক্ষমতায়। শিল্পীরা খুঁজছেন নতুন ভাষা। এমন পরিস্থিতে স্মৃতি ও স্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে সৃষ্টির উৎস ভাণ্ডার, কিন্তু তখনও যে পরাবাস্তববাদীরা আবির্ভূত হননি! তাতে কী আসে যায়, সময়ের সীমা ছাড়িয়ে অগ্রবর্তী সেনানীর ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পারাও শিল্পেরই ইতিহাস। পেত্রভের লাল ঘোড়া যে লাল বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠবে তা ইতিহাসের নিয়তি।

বাংলার নদী বা জলাশয়ে গরু ও মহিষের গোসল যেমন সাধারণ এক চিত্র, তেমনি ভলগার জলে ঘোড়া।

অশ্বারোহী তরুণটি রুশ তারুণ্যের প্রতীক। যারা অক্টোবর বিপ্লব। সোনালি শরীর কিংবা সোনালি সময়। যার হাতে বিপ্লবের লাগাম।

পটের পুরোটাজুড়েই লাল ঘোড়া, যে একই সাথে তাকিয়ে আছে দর্শক ও অশ্বারোহীর দিকে। পা ও কাঁধের ভঙ্গি, স্ফীত নাসারন্ধ্র ক্ষিপ্রতা ও সতর্কতার অর্থবহ। যেন আরোহীর নির্দেশ পেলেই ছুটে যাবে, আবার দর্শক বা জগতের দিকেও তার চোখ, তারা কী করে তা বুঝতে। নীল জল বা স্বপ্নেরা জীবনের লাল তট ছুঁয়ে যেখানে কিছু সবুজ। জলে বা স্বপ্নে আলোড়ন। সাদা ঘোড়া ও তার আরোহীর জলে নেমে পড়া কি ১৮৯২ শিল্প বিপ্লবের ব্যর্থতা, দর্শকের দিকে পিঠ ফিরে থাকা অশ্বারোহী কি ১৯০৫ এর গণবিপ্লবের লক্ষ্যহীনতা! নিশ্চিত করে তা না বলা গেলেও লাল ঘোড়া ও তার অশ্বারোহী নতুন এক দিনের স্বপ্ন বুনে দেয়। যা শৈশব স্মৃতি থেকে উৎসারিত। ১৯২০ সালের পর পশ্চিম ইউরোপে বসে আঁকা হলে পরাবাস্তব চিত্র হিসেবে দেখা যেতে পারত এ ছবিকে, তা না হলেও ফভ (Fauvism) কিংবা নীল অশ্বারোহী (Blaue Reiter) আন্দোলনের অন্যতম চিত্র হতে পারত এ ছবি। তাই কি?

না এসব কোন ধারার চিত্র নয় এটি, এটি রুশ ‘আভা গার্দ’ চিত্র হয়ে থাকে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে। পরাবাস্তব যে বিকৃতি ও গল্পের দাবি করে তা এ ছবিতে নেই। ফভ কিংবা নীল অশ্বারোহী যে তুলি চালনা দাবি করে তা এ ছবিতে নেই। রুশ ক্লাসিক্যালের দৃষ্টির অনুগত থাকার যে চর্চা, যা এক দেখবার আনন্দ তা এ ছবিতেও খুব সুস্পষ্টভাবেই আছে। কারুময়তার বাগাড়ম্বহীন, কিন্তু কারু দক্ষতায় স্নিগ্ধ। ছবির আনত নয়ন তরুণের মতোই, যে নিমগ্ন নিজের দায়বদ্ধতায়।

নাজিব তারেক : চিত্রকর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares