বইকথা : নেলসন ম্যান্ডেলার কারাজীবনের চিঠিপত্র : আদনান সৈয়দ

বইকথা

নেলসন ম্যান্ডেলার কারাজীবনের চিঠিপত্র

আদনান সৈয়দ

নেলসন ম্যান্ডেলার (১৮ জুলাই ১৯১৮ – ৫ ডিসেম্বর ২০১৩) হাজতকালীন সময়ে লিখিত চিঠিপত্র ২০১৮ সালে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির নাম দি প্রিজন লেটার্স অব নেলসন ম্যান্ডেলা। প্রকাশ করেছে লাইভরাইট পাবলিশিং করপোরেশেন, উত্তর আমেরিকা।  গ্রন্থটির সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন সাম ভেনটার এবং তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন জেমাসওয়াজি, লামিনি ম্যান্ডেলা (নেলসন ম্যান্ডেলার নাতনি)।

ব্যাক্তিগত চিঠিপত্রের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির ব্যক্তি মানস, জীবন সম্পর্কে ভাবনা, জীবন দর্শন ইত্যাদি বিষয়তো বটেই সেই সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল, কূটনীতি, সমরনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতির চড়াই- উতরাই পথের চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ জেলে বসে বা নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে ভিনদেশি আলো-হাওয়ায় চিঠিপত্র লিখেছিলেন যা পরবর্তীকালে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলাও তাঁর কারাবাস জীবনে প্রচুর চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠি কখনও ছিল ব্যক্তিগত, কখনও রাজনৈতিক, আবার কখনও তা তৎকালীন সময়ের স্বৈরাচারী শাসক বর্গকে উদ্দেশ করে। এই চিঠিপত্রগুলোর মাধ্যমে নেলসন ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক জীবন তো বটেই সেই সাথে তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েন, জীবন দর্শন, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর সেই সাথে পারিবারিক বন্ধনের নানা রকম ছবি ফুটে উঠেছে।

৪৪ বছর বয়সে ম্যান্ডেলাকে জেলে যেত হয় এবং ম্যান্ডেলা অনুমানও করতে পারেননি যে, তাকে দীর্ঘ ২৭ বছর বন্দিজীবন কাটাতে হবে। দীর্ঘ এই হাজতবাস অর্থাৎ দশ হাজার বায়ান্ন দিনে আফ্রিকার এই বর্ণবাদবিরোধী নেতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলে সময় কাটান এবং জেলে থাকাকালে তিনি তাঁর  স্ত্রী  উইনি ম্যান্ডেলা, পাঁচ সন্তান, অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, তাঁর ব্যক্তিগত উকিল, সরকারি কর্মচারী, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিপত্র লেখেন। দীর্ঘ কারা জীবনে এই চিঠিপত্রের সংখ্যা ছিল ২৫৫টি। এসব চিঠির বেশক’টি চিঠি আগেই প্রকাশিত হয়েছে তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অপ্রকাশিত চিঠিপত্রগুলো এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। দি প্রিজন লেটার্স অব নেলসন ম্যান্ডেলা গ্রন্থটিতে নেলসন ম্যান্ডেলার কারাজীবনের সময়কে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তাঁর প্রথম হাজতবাস শুরু হয় প্রিটোরিয়া জেলে ১৯৬২ সালে, তারপর তাকে স্থানান্তরিত করা হয় রোবেন আইল্যান্ড জেলখানায়। সেটি ছিল ১৯৬৪ সাল। রোবেন আইল্যান্ডে আট বছর থাকার পর ম্যান্ডেলাকে স্থানান্তরিত করা হয় পোলসমোর জেলখানায় ১৯৭২ সালে এবং চূড়ান্তভাবে ম্যান্ডেলাকে স্থানান্তরিত করা হয় ভিক্টর ভার্সা জেলখানায় ১৯৮৮ সালে। ম্যান্ডেলা এই জেলখানাতেই তাঁর মুক্তি (ফেব্রুয়ারি ১১, ১৯৯০ সাল) পর্যন্ত ছিলেন। গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত চিঠিপত্রগুলোর ওপর চোখ বুলালে সময়ের এই ধারাবাহিকতাকে স্পষ্টই দৃষ্টিগোচর হয় ।

নভেম্বর ৭, ১৯৬২ সালে ৪৪ বছর বয়সে নেলসন ম্যান্ডেলাকে প্রথম দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তৎকালীন আফ্রিকার শে^তাঙ্গ সরকারের দৃষ্টিতে নেলসন ম্যান্ডেলার অপরাধ ছিল গুরুতর। তিনি শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত ধর্মঘট ডাকতে ইন্ধন জোগান, শুধু তা নয় সেই সাথে তিনি শ্রমিকদের নানা বিষয়ে প্রতিনিয়ত উস্কে দেন এবং সাদা প্রভুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের লেলিয়ে দিতে বিভিন্ন রকম কৌশল অবলম্বন করেন। এই অপরাধে ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রথম তাঁর পাঁচ বছর জেল হয়। ১৯৬২ সালের ৭ নভেম্বর তাকে প্রিটোরিয়া স্থানীয় জেলে বন্দি করা হয়। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা পাঁচ বছর পর জেল থেকে বের হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আবার ঝাঁপিয়ে পড়বেনÑ সেই শঙ্কা থেকে তাকে আবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। সেটি ছিল ১৯৬৪ সালের ১২ জুন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর তাকে প্রিটোরিয়া জেল থেকে রোবেন আইল্যান্ড জেলখানায় স্থানান্তিরত করা হয়। শুরু হয় নেলসন ম্যান্ডেলার এক কঠিন জীবন। রোবেন আইল্যান্ড কয়েদখানায় ঢোকার সময় ম্যান্ডেলার পায়ে ছিল বেড়ি, হাত ছিল শিকল দিয়ে বাঁধা। তাদের গরুর মতো হাঁকিয়ে জেলে ঢোকানো হচ্ছিল। ম্যান্ডেলার ভাষায়, ‘আমরা যখন জেলের গেট দিয়ে ঢুকছিলাম, তখন কেউ কেউ বলছিল ‘দ্যাখো, আমরা তোমাদের এখানে হত্যা করব। তোমাদের পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, তোমাদের জনগণ তা কখনও জানতেও পারবে না। কিন্তু আমরা দমে যাইনি। আমি এবং আমার বন্ধু স্টিভ টেফু দুজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, প্রতিবাদ করতে হবে প্রথম দিন থেকেই। যদি প্রথমেই আমরা মাথা নত করে ফেলি, তাহলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। আমরা মাথা উঁচু করে সামনের সারিতে এসে দাঁড়ালাম।’ জেলের প্রথম দিন থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবতাবাদী সংগঠন নেলসন ম্যান্ডেলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু আইনগত সহয়তা নয় সেই সাথে নৈতিকভাবেও এই মজলুম নেতার পাশে অনেকে দাঁড়িয়েছিলেন। লন্ডন অ্যামনেস্টির সচিবকে লেখা চিঠি এরই স্বাক্ষর বহন করে। ‘আমার বিচার কার্যক্রমে উপস্থিত থাকার জন্য আপনার প্রতিনিধি মি. এল কুপারকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, এর জন্য আমরা আপনার সংগঠনের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। বিচারের সময়ে তাঁর উপস্থিতি এবং সহযোগিতা আমাদের জন্য বাড়তি উৎসাহ এবং উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করেছিল।’  দক্ষিণ আফ্রিকার ডাচ অ্যাম্বাসাডর মিস্টার স্টর্ক ম্যান্ডেলার হাজতবাসের শুরু থেকেই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে স্টর্ক ছিলেন ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারীও। স্টর্ককে লেখা চিঠিটিতে সে আভাস খুঁজে পাই।’ আমাদের বিচারকার্যে আপনি যে অসাধারণ সহযোগিতা আমাদের করেছেন তার জন্য আমি এবং আমার সহকর্মীরা আপনার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ। আপনাকে আমরা জানাতে চাই যে, আপনি আমাদের প্রকৃত বন্ধু এবং আপনাকে নিশ্চিত করতে চাই যে, আমাদের এই বন্ধুত্ব আমাদের বর্ণবাদী যে বৈষম্য রয়েছে সেই যুদ্ধে জয়লাভ না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে।

ম্যান্ডেলাকে কখনই তার পারিবারিক খবর সরবরাহ করা হতো না। এর জন্য ম্যান্ডেলা সব সময় উৎকণ্ঠায় সময় কাটাতেন। নিচের টেলিগ্রামটি এর উদাহরণ। দীর্ঘদিন স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলার কোনো খোঁজ না পেয়ে নেলসন এই টেলিগ্রামটি করেছিলেন। 

জেলে যাওয়ার ছয় মাস পর স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলাকে একটি টেলিগ্রাম লেখার সুযোগ পান। তার পরও সেই টেলিগ্রাম পাঠানোর জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন স্তর থেকে তাকে অনুমতি নিতে হয়। ১৯৬৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রিটোরিয়া জেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তিনি লেখেন অনুমতির জন্য। তিনি লেখেন- ‘এ মাসের ২৬ তারিখ  আমার স্ত্রীর জন্মদিন। তার এই জন্মদিন উপলক্ষে আমার লেখা নিচের টেলিগ্রামটি তাঁর কাছে পাঠাতে বিনীত অনুরোধ করছি।’

 ম্যান্ডেলার টেলিগ্রামটি নিচে তুলে ধরছি :

‘নোবানদলা ম্যান্ডেলা, ৮১১৫ অরল্যান্ডো ওয়েস্ট

জোহান্সবার্গ

জন্মদিনে তোমাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। তোমার প্রতি উজাড় করে দেওয়া ভালোবাসা আর অগণিত চুমু জমা রইল প্রিয়

ডালিবুঙ্গা।’

নেলসন ম্যান্ডেলা

প্রিটোরিয়া জেল

কয়েদী নাম্বার ১১৬৫৭/৬৩

অপরাধের গুরুতর মাত্রা বিবেচনা করে জেলখানার কয়েদিদের শ্রেণিবিভাগ করা হতো। যেমন ধর্ষণ, চুরি ইত্যাদি অপরাধের জন্য অপরাধীরা পেতেন সি গ্রেড সুবিধা। কখনও কখনও তাদের বি গ্রেডেও উন্নীত করা হতো। কিন্তু রাজনৈতিক বন্দিদের গ্রেড ছিল সবচেয়ে নিচের স্তরে। তাদের গ্রেড ছিল ডি। প্রতি ছয় মাসে তাদের শুধু একবার তাদের আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে দেওয়া হতো। এবং ৫০০ শব্দে লিখিত একটি চিঠি তারা প্রতি ছয় মাসে লিখতে পারতেন। নেলসন ম্যান্ডেলার যখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়, তখন তিনি হাজতে বাস করে এই অসঙ্গতিগুলো লক্ষ্য করেন এবং জেলে বসেই এর প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ম্যান্ডেলা যখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন তিনি বুঝতে পারলেন বর্ণবাদের ভয়াবহ কঠিন থাবায় তিনি নিমজ্জিত। ম্যান্ডেলার নিজের ভাষায়, ‘এটি ছিল খুব ঠান্ডা মাথার একটি সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তের কারণে আমি যাতে সম্পূর্ণভাবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং আমি আমার কাজকর্মে ধীরে ধীরে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ি।’

জেলে থাকাকালে ম্যান্ডেলা প্রতিবারই চিঠিকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। প্রায় সময়ই তাঁর চিঠিতে জেলখানার অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে  বেআইনি, তারপরও কোনো ভয়ভীতি ম্যান্ডেলাকে তার চিঠি লেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। সে জন্য ম্যান্ডেলাকেও তার চিঠির ভাষার প্রতিটা শব্দে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হতো। ম্যান্ডেলা জানতেন যে তাঁর লেখা প্রতিটি চিঠি জেলের উচ্চ নির্বাহীদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়। ম্যান্ডেলা তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখছেন, ‘তারা চাইত না চিঠিতে পারিবারিক আলাপচারিতার বাইরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হোক। রাজনৈতিক বিষয়টিকেই এখানে বিশেষ ইঙ্গিত দেওয়া হতো।’

দীর্ঘ পনেরো বছর ম্যান্ডেলা রোবেন আইল্যান্ড কারাগারে ছিলেন। রোবেন আইল্যান্ডের এই দীর্ঘ কারাবাস ম্যান্ডেলার জীবনের জন্য একটি দুঃসময়ের স্মৃতি। তবে ১৯৬৭ সালের পর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি লাভ করতে থাকে। আফ্রিকার বিরোধী দলের এক এমপি যিনি ম্যান্ডেলাকে ‘দেশের প্রধান দুষ্কৃতকারী’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনিই একসময় ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুণগান শুরু করে দেন। তার সহযোগিতা এবং একই বছর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ও বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংগঠনের চাপের মুখে কারাগারে থাকা কয়েদিদের চিঠিপত্র লেখার ওপর বিধিনিষেধ ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করা হয় এবং আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎও ছয় মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়।

কারাগারের আরেকটি শর্ত ছিল একজন কয়েদির টানা ছয় বছর হাজতবাস হলে তিনি ডি গ্রেড থেকে এ গ্রেডে উন্নীত হবেন। কিন্তু ম্যান্ডেলার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এর জন্য ম্যান্ডেলাকে দীর্ঘ দশ বছর অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৭৩ সালে ম্যান্ডেলা গ্রেড এ-তে উন্নীত হন এবং এই প্রথম প্রতি মাসে চিঠি লেখার অনুমতি পান। কিন্তু সমস্যা থেকেই যায়। নেলসন ম্যান্ডেলার চিঠি কারাগার কর্তৃপক্ষ এতই নজরে রাখতেন যে, ম্যান্ডেলা প্রাণ খুলে দেশের কোনো রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক বিষয় লিখতে পারতেন না। তার শরীর ছিল কারাগারে বন্দি আর কলম ছিল কারাগার কর্তৃপক্ষের কঠিন নজরে বন্দি। নেলসন ম্যান্ডেলার অনেক চিঠি কারা কর্তৃপক্ষ পাঠাননি। পাঠালেও সে চিঠি পৌঁছেছে অনেক দেরিতে। কিন্তু ম্যান্ডেলা তাতে কোনোভাবেই দমে যাননি। তিনি নিরলসভাবেই তাঁর চিঠিপত্র চালিয়ে যেতে থাকেন। উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন যে সেই কঠিন দুঃখের সময় তিনি সবসময় তাঁর স্ত্রীকেই বেশি চিঠি লিখতেন। ১৯৬৯ সালের জুন মাসের ২৩ তারিখ স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলাকে লেখা চিঠিটি লক্ষ্য করুন :

‘এই জেলখানায় আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তোমার একটি চিঠি, যে চিঠিটি তুমি আমাকে লিখেছিলে। আমি যখন অভিযুক্ত হয়ে জেলখানায় ঢুকি তার পরপরই ডিসেম্বর ২০, ১৯৬২ সালে। গত সাড়ে ছয় বছরে আমি এই চিঠিটি বার বার পড়েছি এবং এর নির্যাস ঠিক এখনও আগের মতোই সোনালি এবং সজীব হয়ে আমার কাছে ধরা দেয়। যে দৃঢ়তা এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে তুমি বর্তমান কঠিন এই যুদ্ধের সময়ে লালন করছ, আমার সব সময় মনে হয়েছিল যে, তুমি আজ হোক কাল হোক একদিন সরকারের কুনজরে পড়বে এবং গ্রেফতার হবেই।’

বিভিন্ন সময়ে ম্যান্ডেলা কারাগারে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। কখনও তার চিকিৎসা হয়েছে, কখনও হয়নি। সবচেয়ে বেশি তিনি ভুগছিলেন চোখের সমস্যায়। চশমা ছাড়া তিনি ভালো করে দেখতে পেতেন না। আবার দৃষ্টিশক্তিও তার ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল। চোখের ডাক্তার দেখানোর জন্য জেলের ডাক্তারই ছিল শেষ ভরসা। তার পরও ম্যান্ডেলা চেষ্টা করতেন যদি অন্য কোনো উপায়ে এর আশু সমাধান হয়।  ডাচ অ্যাম্বাসাডর কয়েন স্টর্ককে (ঈড়বহ ঝঃড়ৎশ) লেখা এই চিঠিটিতে এরই ছাপ দেখতে পাই।

‘প্রিয় স্টর্ক

আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকব যদি আপনি অনুগ্রহ করে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ দিয়ে আমার চোখের একটি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেন।

আমি ১৯৪৫ সাল থেকে চোখে চশমা ব্যবহার করে আসছি এবং বর্তমানে আমার সাথে থাকা চশমাটি ভেঙে গেছে। আমার চোখের অবস্থা খুবই খারাপ। গত তিন সপ্তাহ আগে কারাগারের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সুপারিশ থাকা সত্বেও আমার চোখের কোনো সুচিকিৎসা হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমার চোখ দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাবে।

যিনি আমার চোখ আগে দেখেছেন তিনি জোহান্সবার্গের ডাক্তার, নাম ডা. হেনডেলসম্যান। আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকব যদি আপনি সেই একই ডাক্তার দিয়ে আমার চোখটি পরীক্ষা করার একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

আমি আমার নিজের জমানো অর্থেই এই চিকিৎসাটি করতে সক্ষম হবো। আমি আপনাকে আরও জানাতে চাই যে, কারাগারের ডাক্তারের বিশেষ সুপারিশেই আমি আপনাকে এই আবেদনটি করছি।

আপনারই

নেলসন ম্যান্ডেলা

কারাবন্দি নাম্বার ১১৬৫৭

ম্যান্ডেলা প্রিটোরিয়া জেলে থাকাকালে হঠাৎ করেই নির্দেশ এলো কয়েদিদের যখন হাসপাতাল বা কোর্টে নেওয়া হবে, তখন তাদের পায়ে শিকল এবং হাতে বেড়ি পরানো হবে। এই নিয়মের বিরুদ্ধে ম্যান্ডেলা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং প্রিটোরিয়া জেলের কমিশনারকে একটি পত্র লেখেন। ‘স্থানীয় প্রশাসনের কল্যাণে আমরা জানতে পেলাম যে, প্রিজন হেডকোয়ার্টার থেকে এই মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে- সব কয়েদিকে ডাক্তার, হাসপাতাল, কোর্ট ইত্যাদি জায়গায় নেওয়ার সময় তাদের হ্যান্ডকাফ এবং পায়ে শিকলের বেড়ি পরানো হবে। আমাদের বলা হলো যে, এই নিয়ম এখন থেকে সব কয়েদির জন্য প্রযোজ্য হবে। আমরা চাই আপনি আপনার এই সিদ্ধান্তের ওপর সুবিবেচনা করবেন এবং সব কিছু এখন যে নিয়মে চলছে তাই বহাল রাখবেন। গত কুড়ি বছর যাবত আমরা জেলহাজতে আছি এবং বিভিন্ন সময়ে আমাদের অসংখ্যবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। আগে আমাদের যখন রোবেন আইল্যান্ড থেকে কেপটাউনে আনা হতো, তখন আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হতো; কিন্তু কয়েক বছর হলো এই নিয়ম আর পালন করা হয় না।

২.৪ মিটার বাই ২.১ মিটার ছোট এক অন্ধকার কয়েদখানায় বসে নেলসন ম্যান্ডেলা গোটা পৃথিবীটাকেই যেন দেখতে পেতেন। কখনও কখনও পৃথিবীর রঙিন ঝলমলে আলোর স্বাদ পেতেন, আবার কখনও কখনও হতাশায় কুঁকড়ে যেতেন। কিন্তু স্বপ্ন ছিল বলেই দীর্ঘ ২৭ বছর ম্যান্ডেলা জেলখানাকে নিজের জীবনের সঙ্গী করে নিতে পেরেছিলেন। ম্যান্ডেলা যখন জেলে যান, তখন তার কন্যা জিনজির (তরহফুর) বয়স মাত্র আঠারো মাস। তার বয়স যখন আট হয় তখন ম্যান্ডেলা তার মেয়েকে একটি পত্র লেখেন।  ‘আমি জানি না, আমি আবার কবে ঘরে ফিরে আসব। হয়তো আমাকে ঘরে ফিরতে অনেক সময় লাগবে, আবার হয়তো তা নাও লাগতে পারে। তবে আমি নিশ্চিত যে, আমি একদিন ঘরে ফিরে আসব এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সাথেই থাকব। আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি সুখী, সুস্থ এবং অনেক আশাবাদী এক মানুষ।’ দি প্রিজন লেটার অব নেলসন ম্যান্ডেলা শুধুমাত্র জেল জীবনের চিঠিপত্র সংকলন নয় বরং গ্রন্থটি যেন গোটা মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানবতাবাদী মানুষদের চলমান এক দলিল। ম্যান্ডেলা জেলে থাকাকালেই তাঁর মা মারা যান।  ছেলে গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড শোকের মাঝেও ম্যান্ডেলা তার দ্বিতীয় পুত্র গাথোকে (Kgatho) লেখা এক পত্রে লেখেন- ‘পড়াশোনায় কঠিনভাবে মন দাও। কোনো প্রতিবন্ধকতাকেই আমল দেবে না। কখনও হাল ছেড়ে দেবে না, এমনকি জীবনে গভীরতর অন্ধকার যদি নেমে আসে তাও না।’

নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর কারাবাসের সময়ে দীর্ঘদিন যাবত তাঁর সন্তানদের দেখতে পাননি। তার সন্তানরা যখন ষোলো বছর বয়স তখন তিনি প্রথম তাদের দেখতে পান। ম্যান্ডেলা তার স্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে  আক্ষেপ করে লিখছেন, ‘আমার মাঝে মাঝে মনে হয় বিজ্ঞান যদি দৈবভাবে এমন কিছু আবিস্কার করতে পারতো যাতে আমার কন্যা তার সব না পাওয়া জন্মদিনের কার্ডগুলো পেয়ে যেত। এবং জানতে পারত যে তার পা (বাবা) তাকে কত ভালোবাসে। মেয়েকে কাছে পাওয়ার জন্য এবং তার জন্য যা কিছু করার তা করতে তার বাবা কতই না কাতর হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।’

জীবনযুদ্ধের খেলায় ম্যান্ডেলা গভীরতর অন্ধকারে নিমজ্জিত হলেও তিনি তার নিজের প্রতি বিশ্বাস থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। কারণ ম্যান্ডেলা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন, ‘কখনও হাল ছেড়ে দেবে না। জয় আমাদের হবেই।’

আদনান সৈয়দ :  লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares