লিটল ম্যাগ : জীবনানন্দ : একটি জীবনবোধের কাগজ : আনোয়ার কামাল

লিটল ম্যাগ

জীবনানন্দ : একটি জীবনবোধের কাগজ

আনোয়ার কামাল

সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো নাকো তুমি,

বোলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে;

ফিরে এসো সুরঞ্জনা :

নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;

নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে কি সুরঞ্জনা ফিরে এসেছিল? কেনই-বা তাকে ওই যুবকের সাথে কথা বলতে বারণ করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। জীবন বাবু কি গভীর বেদনা পুষে রাখতেন নির্জনতার ধূসর পাণ্ডুলিপিতে! অদ্ভুত আঁধার নিয়ে তাঁর যে শঙ্কা ছিল তা থেকে কি আমরা ভালো আছি? কবি তো বলেই গেছেন হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই, পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। কবি ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে’ বলে সকল অন্যায়, অবিচার, প্রতিকারহীন সংস্কৃতির কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। পাশাপাশি আজ তারাই বড় বেশি শক্তিশালী যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, হৃদয়ে করুণার আলোড়ন সৃষ্টি করে না। আর যারা মহৎ, সৎ ও গভীর আস্থা রাখে মানুষের প্রতি, তাদের হৃদয় শকুন ও শেয়ালের খাদ্য। কী অদ্ভুত ব্যঞ্জনাময় আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপমায় ও চিত্রকল্পে কবি সময়কে ধারণ করেছিলেন। আমরা এখন প্রতিনিয়ত এরই ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছি।

জীবনানন্দ- জীবনানন্দ-চর্চার একটি স্বতন্ত্র পত্রিকা। এটি দ্বিতীয় সংখ্যা হিসেবে জুলাই ২০১৯-এ বেরিয়েছে। গল্পকার মাসউদ আহমাদ সম্পাদক হিসেবে অতি চমৎকার একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। আসলে ‘জীবনানন্দ-চর্চার পত্রিকা’ বললে আমরা সহজেই বুঝে নিই পত্রিকাটি স্রেফ কবি জীবনানন্দকে নিয়েই লেখালেখির একটি সম্পূর্ণ কাগজ। মলাট উল্টালেই জীবনানন্দ-ভক্তরা দারুণ এক আমোদে বিমোহিত হবেন, পাতার পর পাতায় দুইশ’ আটচল্লিশ পৃষ্ঠার পত্রিকা জুড়ে কেবলই জীবনবাবুকে নিয়ে গুণকীর্তন আর জীবনভেদী অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তাঁকে পাঠ করবার এক নির্মল অভিব্যক্তির ডালি সাজানো।

এ সংখ্যায় জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বিশেষ রচনা লিখেছেন গৌতম মিত্র ‘লক্ষ শব্দে গড়া মুদ্রাদোষ’ শিরোনামে। তিনি লিখেছেন, জীবনানন্দ দাশের ৫৫ বছরের জীবনের মুদ্রিত অক্ষরের বয়স ৩৫ আর পাণ্ডুলিপির বয়স ৪৩। পাণ্ডুলিপির প্রথম কবিতা ২ মে ১৯১১ সালে লেখা ‘নদী’। আর মুদ্রিত অক্ষরে লেখা প্রথম কবিতা ‘বর্ষ আবাহন’। ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় ১৯১৯-এ প্রকাশিত। এখন অবধি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জীবনানন্দ দাশের রচনাসমগ্রের চেহারা এরকম : উপন্যাস ১৯টি, গল্প ১২৭টি, প্রবন্ধ-নিবন্ধ- আলোচনা- ব্যক্তিগত রচনা ৭৯টি, চিঠিপত্র ও চিঠিপত্রের খসড়া ১৫০টি, ৫৬টি খাতা ভর্তি ৪০০২ পৃষ্ঠার ডায়েরি এবং ৩০০০ কবিতা। পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি ও মুদ্রিত রচনা মিলিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ শব্দ তিনি লিখেছেন। তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি জীবনানন্দ সম্বন্ধে জানতে আগ্রহীদের জন্য বড় পাওনা। গোছালো অনিন্দ্যসুন্দর আলোচনার জন্য গৌতম দাকে অশেষ ধন্যবাদ না জানালে কার্পণ্য করা হবে।

দেবাশিস ঘড়াই- ‘সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী, আসেন না জীবনানন্দ’ শিরোনামে লিখেছেন। তিনি তাঁর আলোচনায় জীবনানন্দকে দেখিয়েছেন, বাংলা কবিতার নির্জনতম, নিভৃত জগতে-জন্ম নিয়েছিল জীবনানন্দ-ভুবন। বাংলা ভাষার অলৌকিক-অপার্থিব শব্দসম্ভার, নির্জনতম শব্দেরা ব্যক্তিগত জীবনে চূড়ান্ত অসুখী, জীবনভর আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগা, একের পর এক চাকরি ছাড়া, লোকের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে না পারা, সমালোচকদের আক্রমণে বিধ্বস্ত এক মানুষকে মাধ্যম করে পেয়েছিল নিজেদের বিস্তার! অত্যন্ত সুখপাঠ্য একটি আলোচনা করেছেন। ভালো লাগল তার জীবনবাবুকে নিয়ে ভালোলাগার বিষয়াদি তুলে ধরার জন্য।

‘জীবনানন্দ : খড়গপুরের চিঠি’ শিরোনামে আমীন আল রশীদ লিখেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ খড়গপুর কলেজে অধ্যাপনা করেছেন ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৫ মাস ১২ দিন। কলেজে যোগদানের আগে তিনি সচক্ষে সেখানকার পরিবেশ দেখার জন্য সেখানে গিয়ে চারপাশের লাল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রুক্ষ সবুজ বনানী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে গবেষক কামরুজ্জামানের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন। কবির এখানে যোগদানের পর ঘন ঘন ছুটির আবেদন, কলেজের অর্থনৈতিক সংকট এবং শর্তসাপেক্ষে ইস্তফার বিষয়ে কবির চিঠি নিয়ে আলোচনা শেষে তাঁর দীর্ঘ ছুটির আবেদনটি অগ্রাহ্য করা হয় এবং ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় পদটি বিলুপ্ত করা হয়। কবি চাকরিচ্যুতির পর এপ্রিল মাসে কোনো এক সময়ে শেষবারের মতো খড়গপুরে গিয়ে তার বিছানাপত্র ও বইপত্র নিয়ে নিঃশব্দে বেকার জীবন নিয়ে চলে আসেন।

জীবনানন্দ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন- অমিতানন্দ দাশ, ‘সাহিত্য- চর্চার বাইরে জীবনানন্দ বাস্তবের মানুষ ছিলেন না’ শিরোনামে। সম্পাদক মাসউদ আহমাদ এ সংখ্যার জন্য কলকাতায় গিয়ে তিনজন জীবনানন্দ ভক্তের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁরা হলেন, অমিতানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাস ও সুরঞ্জন প্রামাণিক। তিনটি সাক্ষাৎকার পাঠ করলে জীবনানন্দের নানান বিষয় পাঠকের কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হবে।

অমিতানন্দ দাশের জন্ম ২৬ আগস্ট ১৯৪৭ সালে, কলকাতায়। তাঁর বাবা অশোকানন্দ দাশ ছিলেন জীবনানন্দ দাশের ছোটোভাই; এবং মা নলিনী দাশ। বর্তমানে ৭২ বছর বয়সী অমিতানন্দ দাশ জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর সময় ৬ বছর বয়সী ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ মারা গেলে তাঁর লাশ তাদের এই ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়িতেই রাখা হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে কাকা জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে তিনি জানান, কাকার যে পোর্ট্রটেটা পাওয়া যায়, সেটাতে যে টাচ-আপটা করে পাঞ্জাবি করে দিয়েছে। সব জায়গায় দেখবেন পাঞ্জাবি পরা ছবিটাই আছে। কিন্তু তিনি কখনো পাঞ্জাবি পরতেন না, শার্ট পরতেন। জীবনানন্দের এক ছেলে এক মেয়ে, মঞ্জু আর রঞ্জু। তাদের সম্পর্কে অমিতানন্দ দাশ জানান, মঞ্জুদি বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রেম করে রূপেনদার সাথে পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন। পরে তাদের সন্তান না হওয়ায় ডিভোর্স হয়ে যায়। মঞ্জুদি আর বিয়ে করেননি। সবশেষে তিনি সরকারি চাকরি করতেন। ১৯৯৫ সালে মঞ্জুদি ডায়াবেটিসের ভুল ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় মারা যান। রঞ্জুদা কাকা বেঁচে থাকাবস্থায় ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরে কাকা মারা যাওয়ার পর যাদবপুর পলিটেকনিকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন, তবে মানসিক সমস্যা হওয়ায় আর পড়ালেখা চালাতে পারেননি। রঞ্জুদা বিয়ে-থা করেননি। তিনি স্ট্রোক করে ১৯২২ সালে মারা যান।

কাকী লাবণ্য দাশ সম্বন্ধে তিনি বলেন, তিনি শিক্ষিত, সুন্দরী, এমএ পাস। ভালো গান করেন। অনেকটা সহ্য করে গেছেন। তাঁর একটা ক্ষোভ ছিল, জীবনে তিনি কিছু পেলেন না। সত্যি বলতে কি আজকালকার মেয়ে হলে ডিভোর্স হয়ে যেত। কারণ, দুজনের মধ্যে এত অমিল কিন্তু আত্মীয়-স্বজনদের ‘মিটমাট করে চলো’ বলার কারণে বিয়েটা টিকে গেছে আর কি। তিনি ১৯৭৪ সালে মারা যান।

প্রভাতকুমার দাস লিখেছেন- ‘তাঁর কোনো চিঠিই অযত্ন লিখিত নয়’ শিরোনামে লেখা। জীবনানন্দ-গবেষণায় তন্নিষ্ঠ এই গবেষকের নিরন্তর শ্রম জীবনীগ্রন্থ ‘জীবনানন্দ দাশ’ আকরগ্রন্থ। এ ছাড়াও জীবনানন্দের চিঠিপত্রের সংকলন ‘পত্রালাপ : জীবনানন্দ দাশ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। তিনি সম্পাদক মাসউদ আহমাদকে সাক্ষাৎকারে জানান, কলকাতার সিটি কলেজে ইংরেজির টিউটর পদে ১৯২২ সালে জীবনানন্দ দাশ চাকরি পান। ১৯২৮ সালে তাঁর চাকরিটা চলে যায়। এরপর, প্রায় বাকি জীবনটা তিনি আর ভালো চাকরি পাননি। তাঁর বন্ধু এবং উপকার করতে পারেন এমন প্রভাবশালী কাছের মানুষের অবহেলা ও অবজ্ঞা পেয়েছেন প্রচুর। স্ত্রী-ছেলে- মেয়েদের নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্য নানা কাজ করেছেন, খরচ বাঁচাতে ঘর সাবলেট দিয়েছেন, পরে বিড়ম্বনায়ও পড়েছেন। তিনি তেমন কারও ভালো সহযোগিতা পাননি। বেঁচে থাকতে তাঁর ১৬৬টি কবিতা গ্রন্থভুক্ত হয়েছে; এর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়েছে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়। জীবনানন্দ লক্ষণীয়ভাবে প্রধান পরিসর পেয়েছিলেন প্রগতি পত্রিকায়, পরে কবিতায়। বিখ্যাত অনেক কবিতা বুদ্ধদেব বসুর আনুকূল্যে ওই দুটি পত্রিকায় স্থান পেয়েছিল। কিন্তু একটা সময় তিনিও ১৯৪০-পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দের নতুন ধরনের সমাজ সচেতন কবিতাকে অভ্যর্থনা জানাতে দ্বিধা করেছিলেন। সেই পর্বে যারা প্রগতিপন্থি তাঁরা নির্জনতার কবি বলে তারা পূর্বতন পরিচয়কে অসম্মানজনক সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার সেই দুঃসময়ে সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

‘উপন্যাস লেখার সময় মনে হয়েছিল আমিই জীবনানন্দ’ শিরোনামে ঔপন্যাসিক সুরঞ্জন প্রামাণিক সম্পাদক মাসউদ আহমাদকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক সুরঞ্জন প্রামাণিক কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস সোনালি ডানার চিল তাঁর অন্যতম শিল্পপ্রয়াস। জীবনানন্দকে বিষয় করে বেশ কয়েকটি উপন্যাস লেখা হয়েছে- কল্যাণ কুমার বসুর বিকালের নক্ষত্রের কাছে, প্রদীপ দাশশর্মার নীল হাওয়ার সমুদ্রে, আনিসুল হকের এতদিন কোথায় ছিলেন, শাহাদুজ্জামানের একজন কমলালেবু; এর মধ্যে সুরঞ্জন প্রামাণিকের সোনালি ডানার চিল উপন্যাসটিকে উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রসঙ্গে কীভাবে উপন্যাসটি হয়ে উঠল? সাক্ষাৎকারে তিনি সবিস্তারে বলেছেন, ‘তাঁর কবিতা নিয়ে আমার এমন ভাবনা মনে হতে হতে জীবনানন্দ দাশের জন্মশতবর্ষ যখন আসছিল, তখন নানা জায়গায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই সময় নকশাল আন্দোলনের নেতা আজিজুল হক জেল থেকে ছাড়া পেলেন। তাঁর সঙ্গে কফি হাউজে আমার দেখা, কিন্তু কথা খুব একটা হয়নি। আলাপ করার সুযোগ ছিল, তবে হয়নি। তখন মনে হলো, এই লোকটিকে নিয়ে উপন্যাস লিখলে কেমন হয়? একজন ব্যর্থ মানুষ তো। ১৯৯৯ বা ২০০০ সালের দিকের কথা। ২০০১ সালে একটা চূড়ান্ত অবস্থা তৈরি হয় এই সমস্ত বিষয় নিয়ে। তখন আমি আমার এ সহকর্মী বন্ধু যিনি তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন, তাঁকে বলি- আমি একটি জীবনীমূলক উপন্যাস লিখতে চাই। আমি দুজন মানুষকে বেছেছি। একজন হচ্ছেন আজিজুল হক এবং অন্যজন জীবনানন্দ দাশ। এভাবেই তার বিখ্যাত উপন্যাস জীবনানন্দকে নিয়ে জীবনীভিত্তিক উপন্যাস সোনালি ডানার চিল। সুখপাঠ্য এ সাক্ষাৎকারটি পাঠককে মুগ্ধ করবে।

খোলা চিঠি শিরোনামে হাসান অরিন্দম লিখেছেন- ‘মহাকাল যেন আপনার হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে যুগান্তরের লোকের উপর’। হাসান অরিন্দমের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশকে লেখা চিঠি হিসেবে লেখাটি পাঠ করলে যে কোনো জীবনানন্দ ভক্ত তার ভালোলাগার পরশ পেয়ে যাবেন। যেমন তাঁর পত্রে লিখেছেন, ‘আপনি হুমায়ুন কবিরকে লিখেছিলেন, ‘আমি বিশিষ্ট বাঙালির মধ্যে পড়ি না; আমার বিশ্বাস জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি।’ ‘শিক্ষকতা আপনার ভালো লাগত না। আপনি চেয়েওছিলেন অন্য পেশায় যেতে। হুমায়ুন কবিরকে একটা চাকরি দেয়ার অনুরোধ করে বলেছিলেন, প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপকের কাজ ক্ষুদ্র কাজ : অধিকন্তু, অন্যান্য নানা কারণেও ওই কাজ আমি আর করতে চাই না।’ ‘আপনাকে জন্মভূমি- সবুজ প্রকৃতির কোল ছেড়ে নগর কলকাতায় আশ্রয় নিতে হলো। সেখানেই এক অপয়া ট্রাম আপনার জীবননাশের কারণ হয়, একে কেউ কেউ স্বেচ্ছামৃত্যুও বলে থাকেন। তাহলে দেশভাগ মানে আমাদের সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিও কি আপনার অকাল মৃত্যুর জন্য দূরপ্রসারী বা পরোক্ষ কারণ নয়? এতকাল পর এজন্য আমরা নিজেদের গঞ্জনা দেওয়া ছাড়া আর কী করতে পারি?’ এভাবেই তিনি চিঠি লেখার ঢঙে জীবনানন্দকে মূর্ত করে তুলেছেন। ভালো লেগেছে তাঁর এ ধরনের ব্যতিক্রমী লেখাটি।

জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন- সুমিতা চক্রবর্তী, ‘উপন্যাসের নায়ক যখন জীবনানন্দ’ শিরোনামে। মো. মেহেদী হাসান বিশ্লেষণ করেছেন- ‘জলপাইহাটির কবি’ শিরোনামে। সিরাজ সালেকীন লিখেছেন- “জীবনানন্দের ‘ছায়ানট’ গল্পের শৈলী প্রসঙ্গ” শিরোনামে। ‘আর্টের শরীর ও মন’ শিরোনামে লিখেছেন- হানযালা হান।

আমার জীবনানন্দ এই বিভাগে লিখেছেন- সুবোধ সরকার। শিরোনাম দিয়েছেন, ‘জীবনানন্দকে নিয়ে আমার বেদনার জায়গা আছে’। তিনি তাঁর লেখায় বলেছেন, ‘আমার কাছে জীবনানন্দ হচ্ছেন সেই বিগ্রহ, যিনি বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথের পর আমূল পাল্টে দিয়েছেন। ‘জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমার একটা খুব বেদনার জায়গা আছে। সেটা এই যে, বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশ এত জনপ্রিয়, নজরুলের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় কবির নামÑ জীবনানন্দ দাশ। অন্যরকম একটা মায়াময় ব্যাপার আছে, জীবনানন্দকে নিয়ে। তা সে রূপসী বাংলাই হোক, ধূসর পাণ্ডুলিপিই হোক। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে পড়তে আমার পশ্চিমবঙ্গকে খুব মনে পড়ে। তাঁর কবিতা যখন পড়ি, আমার বাংলাদেশকে মনে পড়ে।’ সুবোধ সরকারের অনিন্দ্য সুন্দর গোছানো লেখাটি পাঠক হিসেবে আমার মনে বেশ ধরেছে। অনেক অনেক ধন্যবাদ সুবোধদাকে এ ধরনের তাৎপর্যময় লেখা লিখবার জন্য।

হামীম কামরুল হক ‘জীবনানন্দের সুবাস প্রগাঢ়ভাবে টের পাই’ শিরোনামে লিখেছেন, ‘আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোল ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনার রদ্দি প্রবণতার বিপরীতে জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাস আরেকটি মাত্রা তৈরি করে দেয়। যে মাত্রা দস্তয়েভস্কি, টমাস মান কি ফ্রানৎস কাফকা থেকে বোর্হেসের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের নিজেদের ঘুরে আসতে প্রেরণা জাগায় কমলকুমার মজুমদারের জগৎ থেকে। কে যেন বাংলায় এমন একটি ত্রিভুজের চিন্তা করেছেন- মানিক, জীবনানন্দ ও কমলকুমার হলো সেই ত্রিভূজের তিন বাহু। আজ অনেকদিন পর মনে হচ্ছে জীবনানন্দ হচ্ছেন এর তৃতীয় বাহু। অন্য দুজনের চেয়ে আরেকটু বেশি তির্যক। তবে কবি ও কথাশিল্পী হিসেবে তিনি এগিয়ে থাকেন মানিক ও কমলকুমারের চেয়ে। বাঙালি পাঠকের কাছে তিনি অন্য দুজনের চেয়ে অনেক বেশি করে মিশে আছেন চেতনায়।’ হামীম কামরুল হক যথার্থই বলেছেন, জীবনানন্দ বাঙালির চেতনাগত মজ্জায় মিশে আছেন।

‘জীবন-আনন্দ’ শিরোনামে লিখেছেন, সাদাত হোসাইন তার ব্যক্তিগত জীবনে জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে শিক্ষকের কাছে হাতের আঙুলের ফাঁকে চকের ডলা খাওয়ায় তার কাছে জীবনানন্দ নিরানন্দই হয়ে থাকে। পরে যৌবনে তার কাছে জীবনানন্দ দাশ পরিপূর্ণ এক ‘জীবন-আনন্দ’ হয়ে উঠতে লাগলো।’ ব্যক্তিগত জীবনের আলোকচ্ছটা দিয়ে সাদাত হোসাইন একটি ব্যতিক্রমী লেখা পাঠককে উপহার দেওয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।

জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে লিখেছেন চারজন। তারা হলেন, ১. মুহম্মদ মহসিন শিরোনাম দিয়েছেন- ‘রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ এবং প্রভাবের যন্ত্রণা’; ২. শামীম রেজা লিখেছেন, ‘বনলতা সেন : বিশ্ব কবিতার আলোকে তুলনামূলক পাঠ’; ৩. সৈয়দ তৌফিক জুহরী লিখেছেন, ‘জীবনানন্দের অতীন্দ্রিয়বোধ দৃশ্য অদৃশ্যের উপলব্ধি’ শিরোনামে। ৪. ‘জীবন শুয়ে আছে লাশকাটা ঘরে’ শিরোনামে লিখেছেন  মিরাজুল আলম। প্রতিটি আলোচনায় তথ্যসমৃদ্ধ। নানান বোধের মিশ্রণ পাওয়া যাবে আলোচনাগুলোর পরতে পরতে।

জয় গোস্বামীÑ ‘যেভাবে লেখা হলো শ্রীচরণকমলেষু’। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘তখন জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন ছিল। প্রতি বছরের মতো সে বছরও তাঁর জন্মদিন এসেছিল। কিন্তু সেই জন্মদিনটা ছিল একটু আলাদা। সে বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ ছিল। সেটা মনে পড়ার পর, তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে ‘শ্রীচরণকমলেষু’ কবিতাগুচ্ছের প্রথম অংশটুকু লেখা হলো। এরপর, স্রোতের মতো বাকি কবিতাগুলো আসতে আরম্ভ করলোÑ একের পর এক। এভাবে কবিতাগুলো লিখে গেলাম। মনে আছে, দিন দুয়েক লেগেছিল লিখতে। প্রথমে তো একটানা লিখে যাই। পরে আর একবার কাটাছেঁড়া করি। কিন্তু কবিতাগুলো লিখতে দুদিনের বেশি সময় লাগেনি। কোথায় ছাপা হবে, এই চিন্তা মাথায় ছিল না। একটা ঘোরের মধ্যে লিখেছি।… এখন আপাতত এটুকুই আমার মনে পড়ছে। এরপর তার ‘শ্রীচরণকমলেষু’ গ্রন্থের কিছু কবিতাও এখানে স্থান পেয়েছে। যা থেকে পাঠক উপকৃত হবে, জানতে পারবে কি লেখা হয়েছিল ‘শ্রীচরণকমলেষু’ কবিতাগ্রন্থে।

জাহিদ আকবর, ‘৮ নম্বর বাস সঙ্গী বনলতা সেন’ শিরোনামে লিখেছেন। বাসযাত্রী এক মেয়েকে নিয়ে তার সাথে কল্পনায় মিশে আছে বনলতা সেন। মেয়েটি তার ভাবনায় বনলতা হয়ে ধরা দেয়। সুখপাঠ্য রচনাটি ছোট হলেও ভালো লাগল।

‘যেভাবে লেখা হলো আবার আসুন জীবনানন্দ’ শিরোনামে কিং সউদ লিখেছেন। কবি কিং সউদ কলকাতার মেয়ে সঙ্গীত শিল্পী সুতপা চৌধুরীর সাথে তার সখ্যকে ঘিরে জীবনানন্দকে নিয়ে তার গান রচনা করেছেন। কলকাতার পথে দুইটি পাত পড়ে আছে/ ট্রামগুলো সবই বন্ধ/ আবার আসুন জীবনানন্দ ॥ ৩১ মার্চ ২০১৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে প্রথমে কিং সউদ গানটি পাঠ করে এবং সুতপা মাউথঅর্গান বাজিয়ে গায়। পরে এটি সিডি আকারে বেরিয়েছে। 

এ সংখ্যায় গল্প লিখেছেন, শাহাদুজ্জামান- ‘১৮৯৯’ শিরোনামে। শাহাবুদ্দীন নাগরী- ‘কবি এসেছিলেন শিরোনামে’। মাসউদ আহমাদ- ‘জীবনানন্দের নার্স’ শিরোনামে। সোহেল নওরোজ লিখেছেন- ‘বনলতার সঙ্গে একবেলা’ শিরোনামে। গুচ্ছগল্প লিখেছেন মনি হায়দার। তার গল্পের শিরোনাম ‘ধানমণ্ডি থানায় বনলতা সেন’ ও ‘রক্তমাখামাখি’। মনি হায়দার তাঁর গল্পে সাক্ষাৎ জীবনানন্দকে উপস্থাপন করেছেন বনলতা সেনের বয়ানে। পাঠক গল্পপাঠে রসাস্বাদন অনুভব করবেন।

সবশেষে নিবেদিত কবিতা লিখেছেন উনিশ জন কবি। তাঁরা হলেন কবি আসাদ চৌধুরী, শিমুল মাহমুদ, সন্তোষ ঢালী, ফেরদৌস মাহমুদ, পিয়াস মজিদ, আউয়াল আনোয়ার, শেলী সেনগুপ্তা, আদিত্য নজরুল, লিপি নাসরিন, নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, আনোয়ার কামাল, ইউনুস কানন, সানোয়ার রাসেল, পূর্ণপ্রভা ঘোষ, লুৎফা নিরু, মফিজুল হক, মাহফুজ রিপন, বিপুল অধিকারী ও দীপংকর মারডুক।

জীবনানন্দ সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকৃত অর্থেই জীবনানন্দ-চর্চার একটি পূর্ণাঙ্গ কাগজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মাত্র দুটি সংখ্যা প্রকাশ করেই চৌকস সম্পাদক মাসউদ আহমাদ সাহিত্যে জীবনানন্দ পিপাসুদের খানিক হলেও পিপাসা নিবারণের সুযোগ করে দিতে পেরেছেন। পাশাপাশি জানান দিতে পেরেছেন জীবনানন্দচর্চার একটি নির্মল পরিচ্ছন্ন কাগজের। এতে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর সম্পাদক তুলতেই পারে। অনুজ এ করিৎকর্মা সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই এ ধরনের একটি অনিন্দ্যসুন্দর কাজ করবার জন্য। জীবনানন্দচর্চার কাগজটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিক। নতুন নতুন অনাবিষ্কৃত জীবনবাবুর লেখার ডালি নিয়ে বেশি বেশি আলোকপাত হোক এ আকাক্সক্ষা রইল। পত্রিকাটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করছি।

আনোয়ার কামাল : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares