লিটল ম্যাগ : চিহ্ন ৩৭ : কাগজে ‘ননফিকশন’ চর্চার প্রথম প্রয়াস : নাজমুল হাসান পলক

লিটল ম্যাগ

চিহ্ন ৩৭ : কাগজে ‘ননফিকশন’ চর্চার প্রথম প্রয়াস

নাজমুল হাসান পলক

প্রায় ষাট বছর পূর্বে এক নাতিদীর্ঘ গদ্য, ‘শব্দের পবিত্র শিখা’য় লিখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ- ‘তাঁর প্রিয়ার বর্ণনা হবে কেমন করে? তাই কিটস চেয়েছিলেন উজ্জ্বলের চেয়ে উজ্জ্বলতর এক শব্দ, সুন্দরের চেয়ে সুন্দরতর এক শব্দ। শুদ্ধ আবেগ সত্য আবেগকে প্রকাশ করবার মতো শুদ্ধ সত্য শব্দ কোথায় এত মিলবে?’ এই প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর শঙ্খ ঘোষ করেননি; বরং, কিটসের মনের অনুগামী শব্দান্বেষণ সম্পর্কে করেছিলেন আবেগস্নাত উচ্চারণ- ‘তাই শব্দের সঙ্গে কীটসের ওই সংগ্রাম আসলে কবিমাত্রেরই সংগ্রাম, গোপন কিংবা প্রকাশ্য এই সংগ্রামেই একজন কবির জীবনেতিহাস।’ আমাদের নিকটেও চিহ্ন সম্পর্কে রয়েছে কতকগুলো শুদ্ধ শব্দ, একটি সত্য কথা, গোপন কিংবা প্রকাশ্য সংগ্রামের ব্যক্ত রূপ; যেটি বহুচ্চারিত, কিন্তু, বয়সের বলিরেখাবর্জিত; মৌলিক এবং অনিবার্য- ‘প্রথম থেকে তেরো সংখ্যা অবধি চিহ্ন বেরিয়েছিল ছোটোকাগজের মেজাজে। এরপর থেকে সাহিত্যের কাগজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। পঁচিশ সংখ্যায় এসে আমরা আরেকটি বদলের সাক্ষী হয়েছিলাম; নিয়মিত বিভাগের পাশাপাশি চিহ্ন বের করতে শুরু করল বিশেষ বিষয়ভিত্তিক ক্রোড়পত্র।’ এটি অবশ্য স্বীকার্য যে, কালের সমান্তরালে ছোটকাগজের সংজ্ঞান্তর ঘটেছে; গ্রহীষ্ণুতা, সম্প্রসারণ প্রবণতা, আপসকামিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই চরিত্র বিকাশের মাত্রা আলোচনা সাপেক্ষ এবং বিতর্কিত; যে ভার বইবার সুযোগ সম্ভবত এখানে অনুপস্থিত। বর্তমানে বাংলা সাহিত্য পত্রিকাগুলোর একটি পরিচিত প্রবণতা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ; কিছুকাল গত হলে এটি সম্ভবত কিংবা খানিকটা মান্য ঐতিহ্যে পরিণত হবে। কিন্তু, দৃষ্টি দেয়ার বিষয় হলো- স্রোতের মধ্যে বাস করে, কাল যাপন করেও কেউ কেউ গড্ডলে পরিণত হয় না; চিহ্নর বিগত আটটি ক্রোড়পত্রের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় থাকলে, আমরা এমন সিদ্ধান্তে অনায়াসেই পৌঁছুতে পারি। এ মোটেই অতিরঞ্জিত বক্তব্য নয়। চারপাশে এখন চলছে ব্যক্তিকে নিয়ে সংখ্যা প্রকাশের কাল; কিঞ্চিৎ সাহস পুঁজি করে উচ্চারণ করলে- গলিত শবের নির্জ্ঞান, মেধারিক্ত, অশৈল্পিক স্তুতি। এমন বিনষ্টির কালেও চিহ্ন সাহিত্যের কাগজরূপে তার দায়টি সন্তর্পণে পালন করে চলেছে, ধরে রেখেছে কাগজের চরিত্র। ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’, ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’, ‘কবি ও কবিতার বিশেষ চিহ্ন’, ‘ঢাকাচন্দ্রিকা’, ‘বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন’, ‘এ সময়ের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য’, ‘সাহিত্যের দর্শন দর্শনে সাহিত্য’, ‘মহাভারত’, ‘উপন্যাস নিয়ে’ এবং ‘পোস্টমডার্ন’ সংখ্যার পর চিহ্ন ৩৭ প্রকাশিত হলো ‘ননফিকশন’ ক্রোড়পত্র নিয়ে; সঙ্গে নিয়মিত বিভাগের সকল আয়োজন। অর্ধ-সহস্রেরও অধিক পৃষ্ঠা সংবলিত এই সংখ্যাটিকে চিহ্ন ননফিকশন সংখ্যারূপেও অবহিতকরণের সুযোগ রয়েছে; ধারণা করা চলে আগামীতে পরিচয়টি এমনই দাঁড়াবে। ‘ননফিকশন’ শব্দটির একটি গ্রহণযোগ্য, মোক্ষম বাংলা প্রতিশব্দ এখনও আমাদের ভাষাবিদ- পণ্ডিতেরা তৈরি করতে পারেননি, এটি যেন সান্ধ্যশব্দ; ভাষার দরিদ্রতা নয় এর পশ্চাতে ক্রিয়াশীল রয়েছে আমাদের ভাষিক চর্চায় পরিচ্ছন্নতার অভাব। আদতে ‘ননফিকশিন’ কী? রচনার কোন প্রকরণগুলো এর সীমানার অধীন? এটি নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে; চিহ্নর এই সংখ্যায় সম্পাদকও বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন একটি অতি সংক্ষিপ্ত বাক্যেÑ ‘নন-ফিকশন ব্যাপারটা মাঝেমধ্যেই ঘোঁট পাকায়।’ ক্রোড়পত্র অংশে দুটি বিভাগ রয়েছে, প্রথমটি পরিকল্পিত হয়েছে নতুন রচনার সন্নিবেশে; যেখানে খ্যাত-অখ্যাত কুড়িজন লেখক রয়েছেন। বিভাগটির পাঠোৎঘাটন ঘটে নাসিমুজ্জামান সরকারের এক নাতিদীর্ঘ গদ্যে- ‘প্রসঙ্গ : ননফিকশনাল গদ্য’। এটি ক্রোড়পত্রের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রচনার অন্যতম; কারণ এর বিষয়, লেখক এখানে প্রয়াসী হয়েছেন ‘ননফিকশন’ কথাটির চরিত্র বুঝতে; এনেছেন বাংলা ভাষায় ননফিকশনচর্চার এক আপাত ক্ষুদ্র রূপরেখা। তাঁর বক্তব্য- ‘পক্ষান্তরে বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে কথাসাহিত্য-বহির্ভূত সকল গদ্যই ননফিকশন, যদিও সাহিত্যে এই প্রসঙ্গটির ভিন্ন উপযোগিতা রয়েছে।’ তিনি স্মৃতিকথা, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, প্রাযুক্তিক এবং অর্থনৈতিক রচনাকে ননফিকশনরূপে গ্রহণের পক্ষাবলম্বী; এর সমান্তরালে ননফিকশনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখেছেন জার্নাল, ফটোগ্রাফ, পাঠ্যপুস্তক, ভ্রমণ বইসহ অ-কাল্পনিক রচনাগুলোকে। নাসিমুজ্জামান সরকারের এই বক্তব্যের মান্যতা কতটুকু, তা পাঠক-পণ্ডিতগণ নিশ্চয় বিবেচনা করবেন; তবে পাঠের প্রথমেই লেখাটি চিন্তার উপাদান যোগান দেয়। বিভাগের পরের লেখাগুলো মৌলত চিন্তাপ্রবণ গদ্য; যা আমাদের নিকটে ননফিকশনের ব্যবহারিক চেহারা উন্মোচিত করে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি প্রদান করা যেতে পারে দেবেশ রায়ের রচনাটিতে; যা ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’য় তাঁর পঠিত বক্তৃতার লিপিবদ্ধ রূপ। ঔপনিবেশিক চশমা পরিত্যাগ করে বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে দেখা ও বিচার করা দেবেশ রায়ের পরিচিত প্রবণতা- ‘ছোটপত্রিকা ও সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্ব’ লেখাটিতেও তিনি অভিন্ন। উপনিবেশের কৃত্রিম ইতিহাস বাতিলের সমান্তরালে এখানে তিনি প্রকাশ করেছেন গদ্য বিকাশের কাল থেকে বর্তমান অবধি সাহিত্যের কাগজের গুরুত্বকে। দেবেশ রায় এটি স্মরণ করাতেও বিস্মৃত হননি যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও কাগজের আশ্রয় নিতে হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে অভিনব প্রকরণ জন্ম দেওয়ার অভিপ্রায়ে। ক্রোড়পত্রের প্রথমভাগে সন্নিবেশিত প্রদীপ বসুর ‘উত্তর-উপনিবেশতত্ত্বের প্রাথমিক চিন্তাভাবনা’তেও প্রকাশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে উপনিবেশের প্রভাব; সঙ্গে উত্তর ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের ভাবনাবিশে^র সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। মহীবুল আজিজ ‘ঘৃণার ব্যাকরণ’ শিরোনামে তাঁর রচনায় প্রসঙ্গ করেছেন জাতিবিদ্বেষকে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস প্রিয়তমেষু নিয়ে মোহাম্মদ আজমের বিশ্লেষণ ভারি আগ্রহ জাগানিয়া; তিনি উপন্যাসের পাঠকে কাটাছেঁড়া করেছেন ধর্ষণ, নারী মূলকথা এবং আইনের সীমানা ধরে। চিহ্নর এবারের ননফিকশন আয়োজনে বইকে কেন্দ্র করে স্বাদু গদ্যের আস্বাদ, সাক্ষাৎ বিরল নয়Ñ এ পথেই আমাদের নিকটে গুরুত্ব দাবি করে আবু হেনা মোস্তফা এনাম ও মাহবুব বোরহানের রচনা দুটি। মাহবুব বোরহান বিষয় করেছেন হুমায়ুন আজাদের আমার অবিশ্শবাস ^াস গ্রন্থটিকে; যেখানে আজাদের দার্শনিক প্রত্যয় অন্বেষণে প্রয়াসী তিনি। আবার, এর সমান্তরালে কবিতাকে আশ্রয় করেও নিজেদের ‘ননফিকশন’ গদ্যজাল বুনন করেছেন লেখকগণের অনেকে; এঁদের মধ্যে রয়েছেন- শোয়েব শাহরিয়ার, তরুণ মুখোপাধ্যায়, অমলেন্দু বিশ^াস, তারেক রেজা এবং সরকার মাসুদ। তরুণ মুখোপাধ্যায় তাঁর সংক্ষিপ্ত রচনায় বাংলা কবিতার বাইরে এক ভিন্ন স্বাদ এনছেন মীর ও গালিবকে সংযুক্তির মাধ্যমে। এবার প্রবেশ করা যেতে পারে ‘ননফিকশন’ ক্রোড়পত্রের দ্বিতীয় বিভাগে; এখানে ক্রমপাওয়া জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, সলিমুল্লাহ খান এবং জুলফিকার মতিনের সাতটি রচনা আদতে পুনর্মুদ্রণ। এঁদের রচনার গুণ, মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিদ্যে বা হার্দিক বল, কোনোটাই আমার নেই; এটুকু বলতে পারি- পাঠে প্রতিটি রচনার প্রাসঙ্গিকতা এবং উপযোগিতা আসন্ন পদক্ষেপে অনুভব করেছি, তার বস্তুসার জারণ করেছি মস্তিষ্কে। এখানে ব্যক্ত করা উত্তম, পণ্ডিতপ্রবর শশীভূষণ দাশগুপ্ত বহুকাল পূর্বে ‘রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ-লক্ষণ’ শিরোনামে ‘ননফিকশন’ বিষয়টিকে বোঝাপড়া এবং বিশ্লেষণের প্রয়াস দেখিয়েছিলেন; তাঁর বক্তব্য- ‘মোটের উপরে গল্প, উপন্যাস এবং নাটক ব্যতীত গদ্যরীতিতে আর যাহা কিছু লিখিত হয় তাহাই ‘রচনা-সাহিত্য’ নামে অভিহিত।’ তাঁর পর্যবেক্ষণ সবিশেষ মূল্যবান, এ বিষয়ে প্রতর্কের অবতারণা বৃথা; তবে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হলেও ‘ননফিকশন’ শব্দটির বাংলা প্রতিরূপ হিসেবে ‘রচনা-সাহিত্য’ শব্দটি কেন প্রচলিত হলো না- এটিও চিন্তার প্রসঙ্গ হতে পারে। প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ রয়েছে- পত্রিকার প্রায় একশো পৃষ্ঠাজুড়ে পুরনো রচনা প্রকাশের উপযোগিতা কতটুকু? এর আংশিক উত্তর পূর্বে ব্যক্ত হয়েছে রচনাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা প্রসঙ্গে। আরও খানিকটা অনুসন্ধিৎসু হলে আবিষ্কার করা যাবে, আমাদের লেখক সমাজের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা; ভব্যতার মেকি বেশ পরিত্যাগ করে বললে- আমাদের লেখকরা তাদের মেধাগত সীমাবদ্ধতা এবং চর্চার অভাবেই পত্রিকাগুলোর ’কাক্সিক্ষত রচনা চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না; এর ফলে সম্পাদকদের অধিকাংশ সময় আশ্রয় নিতে হয় পুরনো লেখার। এটি বর্তমান লেখক-সমাজের ব্যর্থতা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়; বরং, সম্পাদকই এখানে খানিকটা দায়মুক্তির সুযোগ অর্জন করতে পারেন।

বর্তমান সংখ্যার নিয়মিত বিভাগ আরম্ভ হয়েছে প্রয়াত বিশিষ্ট অভিনেতা ও অ্যাক্টিভিস্ট গিরিশ কারনাডের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি তর্পণের মাধ্যমে। এরপর কবিতার সন্নিবেশ, অর্বাক আদিত্য এখানে নতুন মুখ; সঙ্গে রয়েছেন- বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, আহ্মেদ নীল, মাসুদার রহমান, আহমেদ স্বপন মাহমুদ, জুয়েল মুস্তাফিজ এবং সৈয়দ তৌফিক জুহরী। গল্প রয়েছে-অনিন্দ্য প্রভাত ও কবীর রানার। নিয়মিত বিভাগের কবিতা ও গল্পের আয়োজনগুলোর একটা দৃষ্টিসহ্য ব্যাপার রয়েছে, সকলেই যেন চোখ বুলিয়ে যান; ফলত, পাঠের সুযোগ অনেকক্ষেত্রে ঘটে না। এই পরিচিত প্রবণতা শুধুমাত্র চিহ্ন নয় দেশ কিংবা কালি ও কলমের তুল্য বাজারপ্রয়াসী, বিপণনযোগ্য পত্রিকাগুলোর জন্যও ধ্রুব। চিহ্ন ৩৭ পাঠে সংকুচিত বোধে হলেও এটুকু ব্যক্ত করার অবকাশ রয়েছে যে- এখানে সন্নিবেশিত গল্প ও কবিতা নব-আস্বাদসন্ধানী পাঠকগণকে প্রসন্ন করবে; অবিশ্যি পাঠকের মানসিক অবস্থারূপে ‘প্রসন্ন’ শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়েছে, সেটি মেনেই শব্দটি প্রয়োগ করছি। বর্তমান সংখ্যায় অনুবাদ বিভাগে রয়েছেন চিহ্ন পাঠকদের এক পরিচিত মুখ, মাহবুব অনিন্দ্য; তিনি পরিচিতিমূলক ক্ষুদ্র অবতরণিকাসহ অনুবাদ করেছেন- জোসেফ ব্রডস্কি, মেরি অলিভার, জিওভান্নি বিয়াঙ্কোনি এবং ফারজানে খোজান্দির চারটি কবিতা। এবারের সাক্ষাৎকার আয়োজন সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ; লেখক-চিন্তক বদরুদ্দীন উমর এবং কবি প্রাণজি বসাকের সঙ্গে আলাপ যেখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বদরুদ্দীন উমর তাঁর আলাপে ব্যক্তিজীবন, সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বর্তমান বাংলাদেশসহ বিবিধ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। প্রসঙ্গসমূহ আদতে পরিচিত হলেও তাঁর আলাপের বিশেষত্ব মৌলত অভিনব তথ্য এবং ক্ষুরধার বিশ্লেষণে; যা আমাদের তুল্য অর্বাচীনদের প্রতি পদক্ষেপে চিন্তার রসদ জোগান দেয়, দেখতে ও ভাবতে বাধ্য করে নতুন পথে। অপর প্রান্তে, প্রাণজি বসাকের সঙ্গে মোস্তাক আহমদের যে বৈঠকি আলাপ, সেখানে মুখ্যতা পেয়েছে শ্রীমান বসাকের সাহিত্যিক জীবন; যা তাঁর সাহিত্যিক সত্তা সম্পর্কে তথ্য ও দর্শনে আমাদের ঋদ্ধ করে বহুমাত্রায়। ‘বিজ্ঞানের সহজপাঠ’ বিভাগে ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান : দোঁহে অভেদ’ শিরোনামের রচনাটি প্রফেসর বিধানচন্দ্র দাসের; বাংলা সাহিত্যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্পর্কে মূল্যবান বক্তব্য তিনি এখানে উপস্থাপন করেছেন। সাহিত্য ও বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর উচ্ছ্বসিত বক্তব্য- ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞানের লক্ষ্য আর গন্তব্য অভেদ। সত্য ও সুন্দর। পার্থক্য শুধু প্রকাশ মাধ্যম।’ গভীরে দৃষ্টি দিলে- আদতেই এ সত্য পর্যবেক্ষণ। পরবর্তী, ‘কি লিখি, কেন লিখি’ বিভাগের রচনাটি পুনর্মুদ্রিত; যেখানে ‘কেন লিখি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে শিবনারায়ণ রায়ের লেখক সত্তার মূল্যবান দর্শন। বয়সের একটা পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেও আধুনিকতার বাহক, র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট এই বাঙালি মনীষী উচ্চারণ করেছেন- ‘মোদ্দা আমি জানিয়ে যেতে চাই যে আটাত্তর বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও আমি এখনও পুরোপুরি নাস্তিক, যুক্তিবাদী, এবং ত্রুটিশীল এই মনুষ্যপ্রজাতির অপরিসীম সৃজন সম্ভাবনায় বিশ^াসী।’ তাঁর এই অনিঃশেষ জাগতিক বক্তব্য আমাদের হৃদয়েও সঞ্চারিত করে এই ভঙ্গুর পৃথিবীকে পরিবর্তন এবং মানুষের বাসযোগ্য করবার অমিত বাসনা। ধারাবাহিকে রয়েছে লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেনের আত্মকথা ‘ধুলায় ধূসরে’র পঞ্চম পর্ব; স্মৃতিকথা রচনায় ইতিহাসের যে নিষ্ঠচর্চা তিনি বহন করে চলেছেন, তার পরিচয় এই পর্বেও বিদ্যমান, খানিকটা বিকশিত। চিহ্নর ‘শেষ পাতার আহ্বান’ ক্রমাগত নবীনদের গদ্য নিয়ে স্বাধীন-সৃষ্টিশীল চর্চাও মূল্যবান স্থান হয়ে উঠছে, চলতি সংখ্যায় ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ শিরোনামেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শেষপাতার চৌদ্দটি পেলব গদ্য নবীনতা, কল্পনা, স্মৃতিমেদুরতা এবং পুষ্পঘ্রাণে পরিপূর্ণ; পাঠে আনে খানিক কবিতার আস্বাদ। চিহ্ন ৩৭-এ একটি অতিরিক্ত বিভাগ সংযোজিত হয়েছে ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯’ নামে; এটি গত মার্চের ১১ ও ১২ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবন চত্বরে অনুষ্ঠিত ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯’ নিয়ে বিশেষ আয়োজন। আয়োজনটি পূর্ণতা লাভ করেছে মেলায় অংশগ্রহণকারী লেখক-সম্পাদকদের একটি ক্ষুদ্র ও নির্বাচিত অংশের সাক্ষাৎকার দিয়ে; এই তালিকাতে রয়েছেন ইমানুল হক, রাখাল রাহা, রহমান কারিগর, সুস্মিতা বসু সিং, প্রণব চক্রবর্তী এবং শান্তনু সরকার। সাহিত্য, সমাজচর্চা, রাষ্ট্র, রাজনীতি নিয়ে অভিজ্ঞতার জারণ তাঁদের বক্তব্যকে সপ্রতিভ করে তুলেছে বিচিত্র দিকে। সঙ্গে, পত্রিকার ফ্ল্যাপে ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’ নিয়ে দেবেশ রায়ের এক মনস্পর্শী গদ্য মুদ্রিত হয়েছে; যার কয়েকটি বাক্য অবিকৃত রেখে ব্যক্ত করলে সবুজ আমবাগানে আয়োজিত মেলার মহাকাব্যিক আস্বাদ পাঠকমনেও সংবেদ তুলবে- ‘রবীন্দ্রনাথের সব কবিতাই তো আমার, সব বাঙালির মাতৃভাষা। গাছেরাও তো সেই কবিতার ভাষায় কথা বলে। রাজশাহিতে গিয়েছিলাম, কবি হয়ে ফিরলাম।’ শেষে একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করা যেতে পারে- কাগজচর্চায় পরিশুদ্ধতা। কাগজচর্চায় পরিশুদ্ধতার কিছু বিষয় সম্পর্কে আমরা অবহিত- অর্থাৎ বানান, অলংকরণ, প্রচ্ছদ হতে আরম্ভ করে একটি কাগজের প্রতিটি সৃষ্টিশীল দিক শতভাগ নিশ্চিত করা। ভাবনাটা এমত হলে, প্রশ্ন রয়ে যায়- এটি কি আদতেই সম্ভব? কিংবা, বাণিজ্যিক কাগজগুলোও কি সেই নির্দিষ্ট জায়গায় নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারে? প্রশ্নগুলোর পরিচিত এবং জনপ্রিয় উত্তর স্বভাবতই নেতিবাচক হবে। প্রকৃতার্থে, কাগজচর্চায় পরিশুদ্ধতার জায়গাটি একটি উত্তীর্ণ হওয়ার পর্যায়, স্তর, গন্তব্য; যার পশ্চাতে সকলেই ধাবমান, চেষ্টা রত। ‘পরিশুদ্ধতা’ একটি অন্তহীন প্রচেষ্টা, পুরনোকে অতিক্রম করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া। এখানে উল্লেখ্য- চিহ্ন ৩৭ যে পরিশুদ্ধতার সেই স্থানটিতে সার্বিক পূর্ণতা পুঁজি করে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছে, তা নয়- মুদ্রণ ও অলংকারজনিত কিছু প্রমাদ রয়েছে; কিন্তু, ‘পরিশুদ্ধতা’য় পৌঁছুবার ’কাক্সক্ষা, প্রচেষ্টা, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা বর্তমান সংখ্যার প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই পরিলক্ষিত হয়েছে। এটিই মূল্যবান, প্রয়োজনীয় এবং বন্দনার যোগ্য। আমরা আগামী ছ’মাস নির্দ্বিধায় প্রতীক্ষা করব, নতুন সংখ্যার জন্য, যেখানে সেই খামতির জায়গাগুলো পূর্ণ করে চিহ্ন আরও খানিকটা অগ্রসর হবে; পত্রিকাটির প্রতি এ অনিবার্য আস্থা রয়ে গেল। 

নাজমুল হাসান পলক : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares