ভ্রমণ : আরাগিল পাখির দেশে : শাহাব আহমেদ

ভ্রমণ

আরাগিল পাখির দেশে

শাহাব আহমেদ

পপি ও ডেইজির গল্প

বাইবেলে বলা হয়েছে : ঈশ্বর মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন স্বর্গের নন্দনকাননে, যেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে চারটি নদীর- ইওফেরাত, টাইগ্রিস, ফিসন ও গিখন নদী। ইওফেরাত, টাইগ্রিস নদীর উৎপত্তি আর্মেনিয়ার পাহাড়ে, বাকি দুটোর জন্মও হয়তো সেখানেই, নামে চেনা যায় না। তার মানে স্বর্গ অন্য কোথাও নয়, আর্মেনিয়ায়। মেসোপটেমিয়ার বীর গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে রওনা দিয়েছিল ‘আরাত্তার’ পথে। হেঁটেছে ইওফেরাত নদীর প্রবাহ ধরে তার উৎসের দিকে এবং পথে সে অতিক্রম করেছে মাসু পর্বত। আরাত্তা (বা উরার্তু বা নাইরি) হচ্ছে সেই দেশ, অমরত্বের ফুল ফোটে। আর মাসু পর্বত হচ্ছে বৃহৎ আরারাত, যাকে ওরা বলে ‘মাসিস’। গিলগামেশের পথ ধরে গেলে যে দেশে পৌঁছানো যায় তা হলো আর্মেনিয়া। মহাপ্লাবন শেষে নুহের নৌকা কোথায় থেমেছিল? বাইবেল বলে, আরারাত পর্বতে। আরারাত আর্মেনিয়ার প্রাচীন বাইবেলীয় নাম।

বাস আমাদের নামিয়ে দেয় জর্জিয়ার বর্ডারে। সেখানে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে সামান্য হেঁটে আসি আর্মেনিয়ার সীমান্তে। পুরনো সোভিয়েত স্টাইলে প্রচুর সময় নেয় এখানে। অভিজ্ঞতায় জেনেছি, ‘দেশ যত দরিদ্র, তত তীব্র তার বর্ডার।’ তবু বাংলাদেশের চেয়ে কম। বাংলাদেশে বর্ডারের দীর্ঘসূত্রতা নান্দনিক ও সনাতন, দেশ স¤পর্কে বিদেশিদের বিরূপ ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশন’ দেওয়ার জন্য দেশের শত্রুদের দ্বারা তৈরি বিশেষ ব্যবস্থা। আমাদের গাইড আর্মেনিয়ান সুন্দরী মার্গারিতা ইমিগ্রেশনে অপেক্ষা করছিল। কোন বাসে যাবো, কোথায় থাকব, কেন এসেছি ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর সে-ই দিয়েছে। মার্গারিতার বয়স ত্রিশের ঘরে, দেখতে সে মন্দ নয়, মুখের, বুকের ও চুলের দিকে তাকানো যায়, হাসিটিও সুন্দর, তবে সে ক্লিওপেট্রা নয়। গাইড সে ভালো। আমরা যেমন ‘সোনার বাংলা’ ও ‘জয় বাংলা’ বলতে নিধিরাম, সেও আর্মেনিয়া বলতে সজ্ঞানে অজ্ঞান। ইমিগ্রেশনের হায়েনা-অক্ষির স্ক্যানিং সেরে আমরা মার্সিডিস কো¤পানির মাইক্রোবাসে চড়ে বসি। গাড়ি ভালো। সুন্দর সবুজ রাস্তা, দু’পাশে ঝোপঝাড়, তারপরে মাঠ, তারপরে পাহাড়। কিছুদূর যেতেই দেখি ডান দিকে ঝোপের আড়ালে আর্মেনিয়ান চরের মতো পিছু ছুটছে নির্জন নদী।

‘নদীর নাম কী?’

‘তেভেত’

বাহ!

সব নদীরই নিজস্ব সৌন্দর্য, সব নারীর মতোই। কারও চোখে লম্বা ঝালর, কারও দাঁতে হীরার চমক, কারও বুকে পপি ক্ষেত। তেভেত আমার দেখা প্রথম আর্মেনিয়ান নদী। আমাদের দীঘলি-কনকসার খালটি এর চেয়ে বড় ছিল, কিন্তু এটি এখনও চলমান, আমাদেরটি মৃত। গাড়ি ধীরে ধীরে উপরে উঠছে পাহাড়ের বুক বেয়ে। সামনে তাকাই পাহাড়, দূরে তাকাই পাহাড়, নিচে তাকাই গা ছম ছম করে। গাড়ি থেকে নামলাম।

সাদা সাদা ফুল দেখি গাছে। কাশতান ফুল। চেস্টনাট। আগে দেখেছি কিনা মনে পড়ে না। হয়তো নয়। গোছা

ফুল, শুভ্র লাইলাক গুচ্ছের মতো। ঘ্রাণ রয়েছে, তীব্র নয়, মৃদু। আরও দেখি ঘন লাল লাল ফুল ঘাসে। জর্জিয়া ছেড়ে আসার আগেই ওই ফুলে ফুলে কারবালা-লাল বিশাল প্রান্তর দেখেছি। দীপ্রাকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী ফুল ওগুলো?’

‘দিকি মাক।’

বুনো পপি ফুল। গাঢ় লাল চারটি দলের বুকে ঘন কালো ক্রস। অদ্ভুত ও অসামান্য। পপি থেকে তৈরি হয় মরফিন, শক্তিশালী বেদনানাশক, মাদক ও ঘুমের ওষুধ। এখানে জর্জিয়ার মাঠের মতো অত নেই, গুচ্ছ গুচ্ছ প্রসূনের কয়েকটি দ্বীপ, লাল, সাদা, হলুদ, সবুজ ঘাসের নদীতে। ‘লাল ফুল’ নামে অসাধারণ একটি গল্প লিখেছিল রুশ লেখক গারশিন ১৮৮০ সালে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছিল সে। নিজে ছিল মানসিক রোগী, অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ মন নিয়ে। একজন মানসিক রোগীর মনোজগৎ, চিন্তার প্রবাহ, রং ও বর্ণাভার নিঁখুত চিত্রণ ছিল তার লেখায়। কয়েকটিমাত্র গল্প লিখে চিরায়ত রুশ সাহিত্যে শক্তিশালী স্থান রেখে গেছে সে। ‘লাল ফুল’ গল্পে মানসিক হাসপাতালের নারকীয় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন রোগীর ‘লাল পপি ফুল’ মনে হয়েছিল মানব সমাজের সমস্ত ‘মন্দের’ কারণ, লাল রং সে পেয়েছে আবহমানকাল থেকে মানবজাতি যে অর্থহীন, লক্ষ্যহীন রক্তপাত করে এসেছে, তার থেকে। এই ফুলকে যদি ধ্বংস করা যায়, তবেই সমস্ত মন্দের অবসান হবে। বহু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ফুল সে সত্যিই ধ্বংস করে এবং তাকে মৃত পাওয়া যায়, কিন্তু ‘মন্দ’ ‘পচনশীল’ পুঁজিবাদের মতো না পচে, আরও শক্তিশালী হয়ে বেঁচে থাকে… গারশিনের লেখার এই এক সুর, ভালো ও মন্দের লড়াই, বন্দিত্ব থেকে মুক্তির অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম কিন্তু বিজয় অর্জন করার পরের অনিবার্য অদৃষ্টবাদী উপলব্ধি, ‘এই কি মুক্তি? এরই জন্য এত ত্যাগ?’

রুশ বিপ্লবের বহু আগে যেন তারই নিঁখুত ভবিষ্যদ্বাণী!

আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি পাহাড়ের শীর্ষে প্রায় ২০০০ মিটার উঁচুতে। অসংখ্য শ্বেতদলের পিরিচে ডিমের কুসুমের মতো হলুদ কেন্দ্র নিয়ে অজস্র ডেইজি। ‘রামাশকা’ রুশ ভাষায় এই ফুলের ডাক  নাম। যে কখনও প্রেমে পড়েছে, সে জানে এর কদর। যেমন সদ্য কৈশোরের দ্বারে টোকা মারা কোন কিশোরী প্রেমে পড়েছে কোনো যুবকের কিন্তু জানে না সেও তাকে ভালোবাসে কিনা। সে মেঠো এই ফুল হাতে তুলে নিয়ে একটি করে দল ছেঁড়ে আর বলে, ‘ল্যুবিত’ (ভালোবাসে), ‘নিয়ে ল্যুবিত’ ভালোবাসে না।  সর্বশেষ দলটি যদি হয় ‘ল্যুবিত’, তার মানে ভালোবাসে। আর যদি ‘নিয়ে-ল্যুবিত’ হয়, সে অন্য ফুল দিয়ে নতুন করে শুরু করে ‘ল্যুবিত’, ‘নিয়ে-ল্যুবিতের’ জিকির। রাশিয়ার মাঠে ডেইজি ফোটে প্রেমিক হৃদয়ের জন্য। আমার হৃদয় ডেইজির মাঠ। আপাদমস্তক হলুদ ডেইজিও আছে অনেক, আগে কখনও দেখিনি, এই দেখলাম। দূরে একটা বড় লেক দেখি। সেই লেক অতিক্রম করে দৃষ্টি উন্মুক্ত করে দিলে আবছা একটি শহর দেখা যায়। মার্গারিতা বলে ওটা আজারবাইজান, ওখান থেকে মাঝে মাঝেই গোলা ছুটে আসে। ‘নাগোরনি কারাবাখ’ নিয়ে দ্বন্দ্ব। ওরা বলে ওদের, তারা বলে তাদের। আর্মেনিয়ানদেরই নাকি ছিল, সোভিয়েত ক্ষমতা এসে আজারবাইজানকে দিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসে আর্মেনিয়া নামে দেশ দেখা যায় হাজার হাজার বছরের পুরোনো। বহু দখলদারি সাম্রাজ্যের অংশ ছিল সে। সেই সব সাম্রাজ্য ইতিহাস এখন। এক সময় নিজস্ব জমির বাইরে গিয়ে ওরাও প্রতিষ্ঠা করেছিল শক্তিশালী ‘কিলিকিয়া’ সাম্রাজ্য। ৩০০ বছর টিকে ছিল তা। প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও মডার্ন পারস্য, আলেকজান্ডার দি গ্রেট, আরব, তৈমুর, তুর্ক, সেলজুক, অটোমান সবার তলোয়ার বার বার মৃত্যু নিয়ে এসেছে এখানে। অথচ আর্মেনিয়া টিকে আছে। বেদানার চামড়ার নিচে রক্তলাল কোষগুলো যেমন একে অন্যের সাথে সমন্বয় সাধন করে থাকে, এরা ঠিক তেমন। তাই বুঝি এই বেদানা ফল ((pomegranate)) প্রতীক এই দেশের, প্রতীক ঐক্য ও উর্বরতার। কিন্তু ইতিহাসে আজারবাইজান নামে কোনো দেশ ছিল বলে জানা যায় না। যেমন ১৯৪৭ সালের আগে পৃথিবীর ম্যাপে পাকিস্তান নামে কোনো দেশ খুঁজতে গেলে পরিশ্রমটাই বৃথা যায়। বস্তুত আজারবাইজান ও নাগোরনি কারাবাখ ভৌগোলিকভাবেও বিচ্ছিন্ন কৃত্রিম পাকিস্তানের মতো। এমন অজস্র ঘটেছে সেই হীরক রাজার দেশে, জনগণের মতামতের দিকে তাকানো হয়নি। ক্রিমিয়া  নিয়ে মদ্যপ রাজনীতিকদের এই একই ঘটনা দেখেছি। সমাধান করার ভাঁওতা দিয়ে বহু সমস্যার সৃষ্টি করে তারা বিগত হয়ে গেছে। এখন জাতিসমূহ রক্ত ঝরাচ্ছে অবিরল। পাপের শাস্তি হয় না কখনও, পাপ যারা করে তাদের শাস্তি অন্যে ভোগ করে, এই নিয়ম।

২.

গোশাভাঙ্ক গাড়ি চলতে থাকে এবার উপত্যকার উপর দিয়ে। এক জায়গায় দেখি খুব বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আছে এক বুনো ছাগল বা খাসি। দুটো শিং বেশ চোখা ও সুন্দর, যেন এখুনি তেড়ে আসতে প্রস্তুত। কাছে আসতে বোঝা গেল ওটা ছাগল বা খাসি নয়, খাসির মূর্তি। জীবনে বহু মূর্তি দেখেছি, পেরুর রাজপথে এমনকি বুনো শুয়োরও পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রশস্ত নাক নিয়ে কিন্তু ছাগল বা খাসির মূর্তি এই প্রথম। ছাগল প্রাণিটি পৃথিবীর শোভা। এক কদমও হাঁটা যায় না কোনো ছাগলের সাথে দৃষ্টিবিনিময় না করে। অথচ শুধু আর্মেনিয়ানদের মাথায় এসেছে এই মহৎ চিন্তাটি। এখানে একটি ছোট নদী বইছে দ্রুত, তেভেত নয়, গেতিক। তার তন্বী শরীর পাথরে ধাক্কা লেগে শব্দ করছে কল কল খল খল। কেউ একজন বলেছিল, স্বর্গে যদি বন, পাহাড় আর মিনারাল ওয়াটারের নির্ঝর থাকত, তাহলে স্বর্গকে ‘দিলিঝানের’ সাথে তুলনা করা যেত। আমরা সেই ‘দিলিঝান’ শহরে এসে পৌঁছাই। ১৫০০ মিটার উঁচু সুস্বাদু জল, পরিষ্কার বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই দিলিঝানকে আর্মেনিয়ার সুইজারল্যান্ড বলা হয়। সোভিয়েত আমলে কবি, সাহিত্যিক শিল্পী ও সৃজনশীল মানুষের অতি প্রিয় মিলনস্থল ছিল এই ‘দিলিঝান’। গোর্কির প্রিয় ছিল এই শহর। এখানেই দেখা হয়েছিল দুই মহান আলেক্সান্দারের, একজন আলেক্সান্দার পুশকিন, অন্যজন আলেক্সান্দার গ্রিবায়েদেভ। পুশকিন যাচ্ছিলেন তুরস্কের আর্জরুমের দিকে পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে, গ্রিবায়েদেভ তেহরান থেকে ফিরছিলেন তিবিলিসির দিকে। পুশকিন দেখতে পান কয়েকজন জর্জিয়ান ঘোড়ার গাড়িতে করে একটি কফিন নিয়ে আসছে উল্টা দিক থেকে।

কোথায় যাচ্ছ?

তিবিলিসি।

কী নিয়ে যাচ্ছ?

গ্রিবায়েদেভকে।

রুশ লেখক ও ডিপ্লোম্যাট গ্রিবায়েদেভ রুশ ভাষায় একটি বই লিখে অমর হয়েছেন।

‘Homo unius libre -A man of one book’ এই তার পরিচিত। মাত্র কিছুদিন আগে তিনি গিয়েছিলেন তেহরানে, অথচ ফিরে আসছেন বাক্সবন্দি হয়ে। দিলিঝান শহরে তাঁদের ঐতিহাসিক সাক্ষাতের স্থানে একটি মনুমেন্ট আছে। কিন্তু আমাদের গাড়ি গিয়েছে অন্য রাস্তায়। তৈমুর লংয়ের রক্তের হোলি হয়েছে এখানে। জেনোসাইডের সময় আর্মেনিয়ানরা অন্য সবকিছু ফেলে শুধু তাদের সন্তান ও প্রাচীন হস্তলিখনগুলো নিয়ে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছে। আমরা তার উপর দিয়ে গিয়ে পৌঁছাই ২০ কি. মি. দূরের গোশ মনাস্টেরিতে। ১১৮৮ সালে এর নির্মাণ শুরু হয়। প্রথমে এর নাম ছিল নোর-গেতিক বা নব-গেতিক। মখিতারিয়ান গোশাভাঙ্ক, সংক্ষেপে গোশ এই মনাস্টেরির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শেষ পর্যন্ত এটাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। আর্মেনিয়ার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন তিনি। আর্মেনিয়ার প্রথম নাগরিক আইনের বই লেখেন। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে নারীর অধিকার যাতে বঞ্চিত না হয় এবং নারী যাতে স¤পদের অংশ পায়, তার আইন লিপিবদ্ধ করেন তিনি। অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপে সে ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল একটি আইন। সন্ত গোশের নাম নিয়ে বিতর্ক আছে। এটা তার আসল নাম না অর্পিত নাম তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। বর্ণনা অনুযায়ী তার দাড়ি-গোঁফ কম ছিল। আর যে পুরুষের দাড়ি-গোঁফ গজায় না, বা খুব কম গজায়, যাকে আমরা ‘মাকুন্দা’ বলি, আর্মেনিয়ায় তাকে বলা হতো ‘গোশ’। আবার যে স্থান খুবই ঊষর, গাছপালা খুবই কম সেই স্থানের নাম ও ‘গোশ’। পাহাড়ের উপরে যেখানে তিনি মন্দিরটি স্থাপন করেন সেখানে নাকি গাছপালা ছিল না। একবার ‘গোশ’ স্বপ্ন দেখেন সাত বছর অনেক শস্য হবে, তারপরে হবে তীব্র খরা। তিনি শস্য সংগ্রহ করে রাখেন, পরে খরার সময় বড় একটি কাঠের চামচে করে শস্য বিলিয়ে লোকজনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। এই চামচকেও বলা হয় ‘গোশ’। মন্দিরে ঢোকার পথে কালো পাথরের একটি মূর্তি রয়েছে এই মহামানবের। তিনি তাকিয়ে আছেন দূরে পাহাড়ের দিকে, যেখানে তার সমাধি এবং ছোট একটি গির্জা দাঁড়িয়ে আছে। এখানে মূল গির্জাটি মাঝে রেখে দু’পাশে দুটি দালান। ডানেরটিও একটি প্রার্থনাঘর তার মধ্য সিলিং থেকে উপরে উঠে যায় ডোমসহ।

বামের দালানে (নাম Scriptaria) থাকত কয়েকজন ভিক্ষু, যাদের দায়িত্ব ছিল নকলনবিশ বা লিপিকারের। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পুস্তকের সংরক্ষণ করাও ছিল তাদের কাজ। অধুনা লাইব্রেরির পূর্বসূরি। আমরা পুরো কমপ্লেক্সটি ঘুরে দেখি। গোশ এটিকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। এখানে বিশাল একটি হলরুমের মতো রয়েছে, যার মূলত একটি দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে। প্রায় পুরো মেঝে জুড়ে ছয় পায়ার একটি টেবিল যেখানে বসে ভিক্ষুরা ক্লাস করত। মেঝেতে সেই গর্তগুলো এখনও রয়েছে। থিওলজি ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পড়াশুনা ও গবেষণা হতো এখানে। এখানে আমাদের প্রথম পরিচয় হয় আর্মেনিয়ান ক্রুশের সাথে, যা অন্যসব ক্রুশের থেকে ভীষণভাবে ব্যতিক্রম। নাম তার ‘খাচকার’। অন্য সব ক্রুশে একটি খাড়া দণ্ডের সাথে আড়াআড়িভাবে বাঁধা একটি বা দুটি দণ্ড থাকে। এবং দেখতে অবিকল সেই ক্রুশের মতো যাতে যিশুকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আর্মেনিয়ানদের ক্রুশ একটি আয়তাকার পাথরের প্লেটের মাঝখানে খোদিত এবং চারিদিক সুন্দরভাবে সুসজ্জিত ও অপূর্ব নান্দনিক। নিচ থেকে উপর পর্যন্ত এর রয়েছে তিনটি স্তর :

সবার নিচে সূর্য বা আদমের মাথা মধ্যস্তরে ক্রুশ, আঙুরলতা দিয়ে সাজানো আর সবার উপরে স্বর্গ। ‘আর্মেনিয়ান ক্রুশ যেন ফুলের বাগান সেখানে ফুলও ফোটে, সুঘ্রাণও বিতরণ করে।’ মার্গারিতা কবিতার মতো সুন্দর করে বলে।

খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার আগে আর্মেনিয়া অন্যান্য জাতির মতোই পৌত্তলিক ছিল এবং সূর্য ছিল তাদের সর্ববৃহৎ বা প্রায় সর্ববৃহৎ দেবতা। তারা সেই দেবতাকে বর্জন না করে তাদের পবিত্র ক্রুশের অংশ করে নেয়। আমরা নির্জন গির্জাটিতে ঢোকার সাথে সাথে কয়েকটি চাতক এত জোরে জোরে আওয়াজ করতে থাকে যেন ঝগড়া শুরু করে দেয়। মার্গারিতার কণ্ঠ আর শুনতে পাচ্ছিলাম না এই অসামাজিক ও অসৌজন্যমূলক পক্ষী-আচরণে। এবং আশ্চর্য ওরা থেমে যায় মার্গারিতার কথা বলা থামানোর সাথে সাথে, যেন তারা দ্বিমত প্রকাশ করছে মার্গারিতার বক্তব্যের সাথে অথবা তীব্র প্রতিবাদ করছে। একটি প্রাচীন আখরোট গাছ দাঁড়িয়ে আছে দেহে বার্ধক্যের ছাপ নিয়ে। গাছটি নাকি গোশের নিজ হাতে লাগানো। সময় পেরিয়ে গেছে, কত কত সময় অথচ দাঁড়িয়ে আছে একজন মহান মানুষের কীর্তি। তিনি একা তৈরি করেননি এই মহামন্দির, বহু মানুষের শ্রম এখানে রয়েছে, কিন্তু একজনই ছিল এর স্বপ্নদর্শী এবং বাস্তবায়নের রূপকার।

শাহাব আহমেদ : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares